প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ মোঃ আবু জাফর আল মুনছুর
মো. আবদুল গুফুর, গ্রাম: যাদবপুর, উপজেলা: আলমডাঙ্গা, জেলা: চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন : ধানক্ষেতে শ্যাওলা হচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : জ্যৈষ্ঠমাসে বিঘাপ্রতি ৪ কেজি ধৈঞ্চা বীজ বুনে চারা ৪০-৪৫ দিন বয়সে চাষ দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া। ৩ কেজি/বিঘা তুত অল্প করে কাপড়ে বেধে লাঠির আগায় ঝুলে ধান গাছের সারির মধ্যে টেনে শ্যাওলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মো. আকবর হোসেন, গ্রাম: বেদেরপুকুর, উপজেলা: কাহারোল, জেলা: দিনাজপুর
প্রশ্ন : ধান গাছের পাতা সাদা হয়ে যাচ্ছে ও গোড়া কেটে দিচ্ছে। সমাধান কি?
উত্তর : ক্ষেতে ডাল পুতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা। মেহগনির বীজ পানিতে ভিজিয়ে যে কষ হয় তাহা ৬/৭ গুণ পানি মিশিয়ে স্প্রে করা। কারটাপ গ্রুপের ঔষধ (কীটনাশক) স্প্রে করা।
মো. রবিউল ইসলাম, গ্রাম: তাহেরপুর, উপজেলা: বাগমারা, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন : কুমড়া ছোট অবস্থায় পচে যাচ্ছে। কেন?
উত্তর : মাছি পোকার আক্রমণে হয় পঁচা কুমড়া/ লাউ ছোট অবস্থায় সংগ্রহ করে মাটিতে পুতে ফেলা। ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার। সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি করে মিশিয়ে স্প্রে করা।
মো. রাশেদুল হাসান, গ্রাম: পাঠানতলা, উপজেলা: সিলেট সদর, জেলা: সিলেট
প্রশ্ন : পেয়াজের পাতা লাল হয়ে পুড়ে যাচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : এটা পার্পল ব্লচ রোগ। আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা। ইপ্রোজিয়ন (রোভরাল) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করা।
মো. আসাদুজ্জামান, গ্রাম: লাউযুতি, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : আমের মুকুল আসছে। পরিচর্যা কিভাবে করব?
উত্তর : আমের মুকুল আসছে কিন্তু ফুল ফোটেনি এমতাবস্থায় একবার, গুটি আসা অবস্থায় একবার ও তার ১ মাস পর আর একবার ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক ও সাইপারমেশ্রিন গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করা।
সুমন মজুমদার, গ্রাম : নারায়ণপুর, উপজেলা : কেশবপুর, জেলা: যশোর
প্রশ্ন : আম গাছের পানি ব্যবস্থাপনা কি?
উত্তর : গাছে ফুল সম্পূর্ণভাবে ফোটার ১৫ দিন পর পর মোট চারবার সেচ দিতে হবে।
মোঃ নূর আলম, গ্রাম : তাম্বুলখানা, উপজেলা : ফরিদপুর সদর, জেলা : ফরিদপুর
প্রশ্ন : পানের পাতা পঁচে গেলে করণীয় কি?
উত্তর : পঁচা পাতা তুলে সংগ্রহ করে পুতে ফেলা। কপার অক্সিক্লোরাইড (সানভিট)/ম্যানকোজেব (ডাইথেন এম-৪৫) ১০ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করা।
মোঃ সাইফুল ইসলাম, গ্রাম : লক্ষ্মীরপাড়, উপজেলা : বিশ^ম্ভপুর, জেলা : সুনামগঞ্জ
প্রশ্ন : শসা গাছে পাতা কুকড়ে গেলে সমাধান কি?
উত্তর : জাবপোকা থাকলে কুকড়ে যাওয়া গাছ তুলে নেয়া এবং ইমিডাক্লোরপিড (ইমিটাক/টিডো) ১০ দিন পরে পরে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করা। মাকড় থাকলে তা খালি চোখে দেখা যায় না। এমতাবস্থায় সালফার (কুমুলাস পাউডার) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিশিয়ে মাসে ৩ বার ব্যবহার করা।
মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, গ্রাম : পূর্বভীষণদই, উপজেলা : হাতিবান্ধা, জেলা : লালমনিরহাট
প্রশ্ন : বলসুন্দরী (বাউকুল) জাত কেমন?
উত্তর : এটি বাউকুল ও আপেলকুল এর সংকরায়নে সৃষ্টি। প্রতি গাছে প্রায় ২৫ কেজি কুল হয়। প্রতি ফলের ওজন ১০০ গ্রাম। অত্যন্ত জনপ্রিয় জাত। চারা রোপণের ৮ মাসে ফুল/ফল আসে। মোটামোটি সারা বছর রোপন করা যায়।
সাইদুর রহমান, গ্রাম+ পো: নজরগাছ, উপজেলা : চিলিমাড়ি, জেলা: কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন : গবাদি পশুর টিকা সমন্ধে জানতে চাই?
উত্তর : গবাদি পশুর বিভিন্ন টিকার নাম ও প্রয়োগবিধি সারণি দ্রষ্টব্য।
গরুর জীবাণুঘটিত মারাত্মক রোগ থেকে পশুকে রক্ষা করতে টিকা প্রদানের কোন বিকল্প নেই। উপরোক্ত রোগের টিকা সরকারি প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে সরবরাহ পাওয়া যায়। সময়মতো টিকা প্রয়োগ করলে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
মো: হাবিবুর রহমান, গ্রাম : কালীপুর, পো: কালীপুর, উপজেলা: বাশখালী, চট্টগ্রাম
প্রশ্ন : চিংড়ি নার্সারীতে কিভাবে পোনা মজুদ করতে হবে?
উত্তর : পোনার জন্য খেজুরের পাতা দ্বারা আশ্রয়স্থল স্থাপন করতে হবে; সুস্থ-সবল পোনা ছাড়তে হবে; পোনাকে ভালোভাবে খাপ খাওয়ানোর পর নার্সারীতে মজুদ করতে হবে। চিংড়ি নার্সারীতে সার প্রয়োগ করতে হবে ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগের ৪-৫ দিন পর প্রতি শতাংশে চিটাগুড় ২০০ গ্রাম, রাইচ পলিশ ২০০ গ্রাম, ইষ্ট ৫ গ্রাম। এক সাথে ভিজানোর পর ২৪ ঘণ্টা রাখার পর ঘেরে প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পর প্রতিদিন ৬-৭ বার পানি ঘোলা করতে হবে।
মোঃ আব্দুর রহিম, গ্রাম : আনুলিয়া, উপজেলা : আসাসুনি, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : পটলের কা- থেকে সাদা কষ কষ/আঠা বেরোচ্ছে ও গাছ ঢলে পড়া সমস্যার সমাধান কি?
উত্তর : আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা। বর্দোপেস্ট (১০০ গ্রাম তুত+১০০ গ্রাম চুন+১ লিটার পানি) মিশিয়ে আক্রান্ত কা-ে ভাল করে স্প্রে করা। রোগমুক্ত গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করা।
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)
কৃষির যে কোন প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোন জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নাম্বারে।
লেখক : তথ্য অফিসার (পিপি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৭১৪১০৪৮৫৩; ই-মেইল : রড়ঢ়ঢ়@ধরং.মড়া.নফ
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের পথপ্রদর্শক বঙ্গবন্ধু
ড. মো: আবদুল মুঈদ
১৯৭২, যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভঙ্গুর অর্থনীতি। অর্ধাহার, অনাহার খাদ্যাভাবে অসহায় জনগণ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দায়িত্ব নিলেন দারিদ্র্য ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা গড়ার। সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করলেন কৃষি সেক্টরকে। ডাক দিলেন সবুজ বিপ্লবের। খাদ্য উৎপাদনের কারিগর কৃষকদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কৃষক ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে সবুজ বিপ্লব সফল করে তুলুন। বাংলাদেশকে খাদ্যে আত্মনির্ভর করে তুলুন।’
বঙ্গবন্ধু কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণয়ন করেন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। আধুনিক কৃষিকে ধারণ ও লালন করার যোগ্য কাঠামো-অবকাঠামো তৈরিতে মনোযোগী হন। কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ সময় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিকায়ন হয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের। কৃষিবান্ধব বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ।
কৃষকের পাশে বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধু রাজনীতি জীবনের শুরু থেকে কৃষকের কল্যাণের কথা ভাবতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজে চাষীরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে।’ তাই তো তিনি ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকে কৃষকদের বকেয়া খাজনার সুদ মওকুফ করেন। সাথে সাথে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনাও মওকুফ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জমির মালিকানায় সর্বোচ্চ সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি ও খাসজমি ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেন। পাকিস্তানি শাসনামলে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেন।
উন্নয়ন বরাদ্দে কৃষিকে অগ্রাধিকার : বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম বার্ষিক পরিকল্পনায় ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ কোটি টাকা উন্নয়নের বরাদ্দ থেকে ১০১ কোটি টাকা শুধু কৃষি উন্নয়নের জন্য রাখা হয়েছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ। তিনি বিশ্বাস করতেন খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে সব উন্নয়ন কার্যক্রম বিফলে যাবে। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরা উৎপাদন করতে হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেও আমি চাউল কিনতে পারছি না। চাউল পাওয়া যায় না। যদি চাউল খেতে হয় আপনাদের চাউল পয়দা করে খেতে হবে।
কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা প্রদান ও মেধাবীদের আকৃষ্টকরণ : বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন কৃষি বিপ্লব বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রমী চাষিদের সাথে মেধাবী কৃষিবিদদের প্রয়োজন হবে। মেধাবী ছাত্রদের কৃষি শিক্ষায় আকর্ষণ করার জন্য কৃষিবিদদের তিনি সরকারি চাকুরিতে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দিয়েছিলেন। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে পরবর্তীতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা কৃষি শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। কৃষিতে ¯œাতক ও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর কৃষি গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণসহ কৃষির সর্বক্ষেত্রে অবদান রাখে। উদ্ভাবন হয় নতুন নতুন জাত, প্রযুক্তি, কৃষকদের আধুনিক কৃষি কলাকৌশলের প্রশিক্ষণ প্রদান ও নানাবিধ কৃষি উন্নয়ন কর্মকা-ের কারণে আজ বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে কাক্সিক্ষত সাফল্য, যা বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে পেয়েছে স্বীকৃতি।
কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন : বঙ্গবন্ধুর কৃষি উন্নয়নের বৈপ্লবিক পদক্ষেপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য হলো কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পুনঃসংস্কার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর পাকিস্তান তুলা সরবরাহ বন্ধ করে দিলে স্থায়ীভাবে শিল্প কারখানায় তুলার চাহিদা পূরণে তুলা উৎপাদনের গুরুত্ব অনুধাবন করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে দেশে প্রতিষ্ঠা করেন তুলা উন্নয়ন বোর্ড। শুরু হয় তুলার চাষ সম্প্রসারণের কাজ। কৃষির উন্নয়নে প্রয়োজন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, বিভিন্ন ফসলের উচ্চফলনশীল জাত। কৃষি গবেষণা জোরদার ছাড়া কৃষির উন্নতি সম্ভব নয়, বঙ্গবন্ধু তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল- কৃষি গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। ১৯৭২ সালে পুনর্গঠন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ঢাকার আনবিক গবেষণা কেন্দ্রে কৃষি পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (ইনা) প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন, যা ১৯৭৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তর হয়।
শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন ও জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণে স্থাপন করেন হর্টিকালচার বোর্ড। মানসম্মত বীজ কৃষি উৎপাদনে অন্যতম নিয়ামক। কৃষকের কাছে উন্নত জাতের মানসম্মত বীজ সহজলভ্য করার লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করেন সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি (এসসিএ)। তিনি বীজের উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন, “নিজেরা বীজ উৎপাদন করতে হবে। প্রয়োজনে শুরুতে বিদেশ থেকে মানসম্পন্ন বীজ আমদানী করে দেশের প্রাথমিক চাহিদা মেটাতে হবে। পরে নিজেরাই মানসম্পন্ন উন্নত বীজ উদ্ভাবন -উৎপাদন করব।” সোনালি আঁশ পাটের উন্নয়নে গবেষণার উপর জোর দেন এবং ‘জুট অ্যাক্ট’ এর মাধ্যমে প্রাক্তন জুট এগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পুনর্গঠন করেন।
কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অন্যতম আরেকটি নিয়ামক হলো কৃষি সেচব্যবস্থা। এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি কিংবা তিন ফসলি করার জন্য প্রয়োজন কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন। বঙ্গবন্ধুর এই উপলব্ধি থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) পুনর্গঠন করেন। নগদ ভর্তুকি ও সহজশর্তে ঋণ দিয়ে কৃষকের মাঝে সেচযন্ত্র বিক্রির ব্যবস্থা করেন। যেখানে ১৯৭১-৭২ সালে অগভীর নলকূপের সংখ্যা ছিল ৬৮৫টি, গভীর নলকূপের সংখ্যা ৯০৬টি এবং পাওয়ার পাম্পের সংখ্যা ছিল ২৪,২৪৩টি, তা ১৯৭৪-৭৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪০২৯টি, ২৯০০টি এবং ৪০,০০০টি তে।
কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম- বঙ্গবন্ধু সেটা মনেপ্রাণে উপলব্ধি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্ন এ দেশের শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো। তাই তিনি কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সব সময়ই বলতেন, ‘আমাদের দেশের জমি এত উর্বর যে বীজ ফেললেই গাছ হয়, গাছ হলে ফল হয়। সে দেশের মানুষ কেন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পাবে।’ তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, এ দেশে যেমন সোনার মাটি ও মানুষ আছে, তেমনি আছে কৃষির অপার সম্ভাবনা। এমন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে মজবুত করতে হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘কৃষি ও কৃষক বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।’ তিনি আরও উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষির উন্নতি মানে শুধু ধান, গম বা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। ভাত, রুটি খেয়ে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু মেধাবী জাতি গঠনে দরকার সুষম খাদ্য ও পুষ্টি। এ ছাড়া মেধাবী জাতি ছাড়া কোনো দেশের উন্নতি হয় না। সেজন্য তিনি প্রধান খাদ্যের পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদির উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেন। তিনি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার উপর জোর দেন। যৌথ খামার গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও নিরবচ্ছিন্ন কৃষি উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দেয় কুচক্রী মহল কর্তৃক ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টে মর্মান্তিক ও পৈশাচিক ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে। থেমে যায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি। তবে মুছে যায়নি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শ। মুছে যায়নি তাঁর যুগান্তকারী কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনা। কৃষি উন্নয়নের জন্য যে পথ তিনি রচনা করেছেন, সেই পথ ধরে দেরিতে হলেও তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আরও বলিষ্ঠনীতি নিয়ে এ দেশের কৃষি উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন এখন সর্বজন স্বীকৃত। বাংলাদেশ পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম ও পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম, মৌসুমি ফল উৎপাদনে বিশ্বে দশম। এই সাফল্য ও স্বীকৃতি প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা ও আরও বেগবান করার লক্ষ্যে জোর দেয়া হয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিকে আধুনিকীকরণ, কৃষকের নিকট কৃষিকে লাভজনক করা এবং টেকসই ও নিরাপদ ফসল উৎপাদন করা। এই লক্ষ্যে বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। জোর দেয়া হয়েছে জলবায়ু সহনশীল কৃষির উপর। এ ছাড়াও পাহাড়ি এলাকায় কাজু বাদাম, কফি ও নানান ধরনের ফলমূল চাষ, দেশের দক্ষিণাঞ্চ লবণাক্ত এলাকায় লবণ সহনশীল ফসলের চাষ, রপ্তানিমুখী ফসলের চাষ ইত্যাদির উপর। এগিয়ে যাচ্ছে কৃষি, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তাই তো বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্লোগান, “মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, কৃষি হবে দুর্বার”।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।” তাঁর চাওয়া সেই সোনার বাংলা এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সদস্য, পরিচালনা পর্ষদ, পিকেএসএফ। মোবাইল : ০১৭১৬৯৪০৩১১, মেইল : সুঁববফনফ৬১@মসধরষ.পড়স
মৌ চাষের প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা
মো: খায়রুল আলম
আমাদের দেশে মধু চাষের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সুজলা সুফলা ষড়ঋতুর বাংলাদেশ, যার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আছে ফসলের মাঠ, বৃক্ষরাজি, সবজি ও ফলবাগান। এখানে প্রায় প্রত্যেক Ĺতুতেই কোন না কোন ফুল ফোটে। এসব জায়গা থেকে মৌমাছি প্রায় সারা বছরই মধু আহরণ করতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২৫০০ জন মৌচাষি বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করছে এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার মে.টন মধু উৎপাদিত হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে মধুর উৎপাদন এক লক্ষ টনে উন্নীত করা সম্ভব। আর মৌমাছি দ্বারা পরাগায়নের ফলে পরপরাগায়িত ফসলের গড় উৎপাদন ২০-৩০ ভাগ বেড়ে যাবে।
মৌমাছি চাষের ইতিহাস
প্রাচীন কাল থেকে মৌমাছি চাষ করা হলেও ১৮৫৩ সালে বিজ্ঞানী ল্যাং স্ট্রোথ আধুনিক পদ্ধতিতে মৌচাষ শুরু করেন এবং তাকেই আধুনিক মৌচাষের জনক বলা হয়। ১৮৮৪ সালে সর্বপ্রথম একজন ইংরেজ ডকলাস উপমহাদেশে মৌচাষের প্রবর্তন করেন। পরে ড. আক্তার হামিদ খান ১৯৫৮ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মৌচাষের সূচনা করেন। বাংলাদেশে ১৯৬৩ সালে বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন) প্রথমবার মানুষকে মৌ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে এবং এরপর থেকে বিভিন্ন সংস্থা মৌমাছি পালন বিষয়ে মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া, মৌবাক্স বিতরণ করা ইত্যাদি কাজ চালিয়ে যায়। বিসিকের প্রচেষ্টার সাথে পরবর্তীতে ৮০’র দশকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সম্পৃক্ত হয় এবং এর মাধ্যমে বর্তমানে মৌপালন সম্প্রসারণে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
মধুর উপকারিতা
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: বলেন ‘সকল পানীয় উপাদানের মধ্যে মধু সর্বোৎকৃষ্ট।’ এ কথা দ্বারা স্পষ্ট যে মধু নিঃসন্দেহে উপকারী। পরবর্তীতে বিজ্ঞানের গবেষণা দ্বারা মধুতে উপস্থিত উপাদানগুলো সম্পর্কে জানা যায়। মধুর প্রধান উপকরণ হলো সুগার, যার মধ্যে ডেক্সট্রোজ, ম্যালটোজ, গ্লুকোজ, লেভিউলোজ এবং সুক্রোজ রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম মধুতে ২৮০-৩০৪ গ্রাম ক্যালরি পাওয়া যায়। মধুতে নিয়সিন, রাইবোফ্লাভিন, ভিটামিন বি, এমাইনো এসিড, প্যান্টোথেনিক রয়েছে, এ ছাড়াও ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফরফরাস, পটাশিয়াম, দস্তা, তামা ইত্যাদি খনিজে ভরপুর মধু। মধুতে কোন ফ্যাট বা কোলেস্টেরল থাকে না। মধুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান যা আমাদের শরীরকে বিভিন্ন জীবাণু আক্রমণ রোধ করে কিংবা প্রতিকার করতে পারে, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
বাংলাদেশে মৌচাষের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশে দুই হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক বা পেশাদার মৌ খামার রয়েছে। অপেশাদার বা সৌখিনভাবে মৌ পালন করছে আরো ২৫ হাজার। তার মধ্যে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি মৌ বাক্স রয়েছে। গত বছর ১০ হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হয়েছে। এ বছর এখন সরিষার মাঠ থেকে মধু আহরণ করা হচ্ছে। তবে এ বছর ১২ হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মৌ চাষের প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি চাষিদের উৎপাদিত মধু বাজারজাতকরণে সহায়তা করে যাচ্ছে বিসিক। বাংলাদেশে উৎপদিত ৫০০ মেট্রিক টন মধু জাপান, ভারত ও মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। চাষিরা এখন রপ্তানির জন্য বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষে ঝুঁকছেন। দেশের মৌ খামারগুলো থেকে এক লাখ টন মধু আহরণের সুযোগ রয়েছে। সেই লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। মধুর উৎপাদন বৃদ্ধি, মৌচাষিদের প্রশিক্ষণ ও যাবতীয় উন্নয়নে যৌথভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কাজ করছে বিসিক।
জানা গেছে, বিসিক বাণিজ্যিকভাবে এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মৌ চাষিকে আধুনিক পদ্ধতিতে মৌ চাষের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এই কার্যক্রম প্রসারে মৌমাছি পালন স্থায়ী ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে বিসিক। ক্রমাগতভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন মৌচাষি তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া মৌচাষ উপযোগী আরও ১২টি জেলায় বিশেষ খামার সৃষ্টি করে মধু উৎপাদনে কাজ করছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষকপর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ-৩য় পর্যায় (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের একটি উদ্দেশ্য হলো যথাযথ পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মৌচাষ। ফসলের পরাগায়ন কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য আগ্রহী বীজ এসএমইকে মোট ২০০০টি উন্নতমানের মৌবাক্স, মধু এক্সট্রাক্টর, এক্সেসরিজ এবং মৌ-কলোনি সরবরাহ করা হয়েছে। এ সব বক্স থেকে প্রতি বছর ৪০ মে. টন করে অর্থাৎ প্রকল্পাধীন সময়ে প্রায় ১৬০ মে. টন উৎকৃষ্ট মানের মধু উৎপাদিত হবে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ মে.টন মধু উৎপন্ন হয়েছে। প্রকল্পাধীন সময়ে প্রায় ১৬০ মে. টন উৎকৃষ্ট মানের মধু উৎপাদিত হবে যার মূল্যমান প্রায় ২.৫০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৯০০ জন কর্মকর্তার ডাল, তেল ও মসলা ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি ও মৌপালনের উপর ৬ দিনব্যাপী টিওটি কোর্স সম্পন্ন করা হয়েছে।
এ ছাড়াও ৬০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মৌচাষের ওপর ৩ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেছেন, যারা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে মৌচাষে মৌ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে কৃষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ মৌ-পালন বিষয়ে সম্পৃক্ত রয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় এসএমইগণকে মৌ বক্স সরবরাহের ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মধু উৎপাদন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ পরপরাগী ফসলের পরাগায়ন নিশ্চিত হচ্ছে। প্রকল্পে মৌচাষ সম্পৃক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত ১৫-৩০% ফলন বৃদ্ধিসহ মধু উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে কৃষকগণ উৎসাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মধু একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী খাত। দেশে বর্তমানে দুই প্রজাতির মৌমাছির দ্বারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌ-বাক্সে চাষ করা হয়। মৌ চাষ বিশেষজ্ঞ ও কৃষি গবেষকদের মতে ফসলের মাঠে মৌমাছি বিচরণ করলে সেখানে বাড়তি পরাগায়নের কারণে ফসলের উৎপাদন ৩০ শতাংশ বাড়বে। তার মানে মৌচাষের মাধ্যমে মধু আহরণে লাভ দুটি-১) অর্থকরি খাত হিসেবে মধু আহরণে সমৃদ্ধি, ২) শস্য বা মধুভিত্তিক কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি। অথচ অধিকাংশ কৃষকের এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে চাষিপর্যায়ে এ ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। মৌচাষিরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমে মৌসুমে সরিষা, ধনিয়া, তিল কালজিরা, লিচু এসব ফসলের জমিতে বা বাগানে মৌ বাক্স বসিয়ে মধু আহরণ করে। আধুনিক পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে মৌ চাষ করে শত শত মেট্রিক টন মধু উৎপাদন করা হচ্ছে। এর ফলে মধু আহরিত শস্য যেমন সরিষা, তিল, কালিজিরা, লিচু ইত্যাদির ফলনও বেড়েছে অনেকগুণ। মৌচাষিরা বিভিন্ন ঋতুতে তাদের মৌবাক্স নিয়ে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, শেরপুর, সাভার, দিনাজপুর, রাজশাহী বরগুনা ও সুন্দরবনের সাতক্ষীরায় মধু সংগ্রহে চলে যান। একটা নির্দিষ্ট মৌসুমে তারা অবস্থান করেন এবং মধু সংগ্রহ করে ফিরে আসেন। সংগ্রহকারীর কেউ কেউ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে মধু বিক্রি করেন। বড় খামারিরা সংগ্রহীত মধু প্রসেসিং প্লান্টে পরিশোধন করে বাজারজাত করেন। সরিষা, লিচু, তিল ও কালিজিরা ফুল থেকে সংগৃহীত মধু আলাদা আলাদাভাবে বাজারজাত করছেন ব্যবসায়ীরা।
২০১৯-২০ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মধু উৎপাদনে শীর্ষ দেশ চীন। এশিয়ার মাঝে ভিয়েতনাম এবং ভারতের মধু রপ্তানিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য স্থান। দেশের বাজারে মধু সরবরাহের পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন ভারত, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত ইত্যাদি দেশে মধু রপ্তানিতে বংলাদেশের অবস্থান ৮৩তম এবং আমদানিতে ৬৬তম।
দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে পরিমাণ জমিতে সরিষা, লিচু আম তিল ইত্যাদি ফসলের চাষ হয় তার মাত্র ১০ ভাগ জমিতে মৌ চাষ হয়। তাই বলা যায় যে, মধু চাষে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। শতভাগ জমি যদি মৌ চাষের আওতায় আনা সম্ভব হয়, সেক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন যেভাবে বাড়বে, মধু উৎপাদনও অনুরূপভাবে বাড়বে।
বংলাদেশে মৌ খামার গড়ে তোলার যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান। এপিস সেরানা এ দেশীয় প্রজাতি এবং সহজে লালন-পালন যোগ্য। তাছাড়া এর উৎপাদন ক্ষমতাও মোটামুটি ভালো। ইউরোপীয় গোষ্ঠীর এপিস মেলিফেরা প্রজাতিও আমাদের দেশের আবহাওয়ায় সহনশীল হয়েছে এবং দেশে এ প্রজাতির খামার গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, মধুপুর বনাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় মৌমাছির খামর গড়ে তোলার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান। অধিকন্তু আমাদের দেশে আবহাওয়া এবং সারা বছর মাঠে সুবিধা সমৃদ্ধ ফসলের সমারোহ থাকে। পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী বিশেষত বেদে এবং পাহাড়ে বসবাসকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে মৌ খামার গড়ে তুলতে আগ্রহী করা যেতে পারে।
বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছি চাষের মাধ্যমে আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং মৌ কলোনি ফসলের পরাগায়নে ব্যবহার করে ফসলের অধিক ফলনপ্রাপ্তি সম্ভব। মৌ কলোনির উপজাত মানুষের পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। তাছাড়া ওষুধ ও নানা শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার এবং বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যথেষ্ট সম্ভাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কৃষকদের মৌ খামার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করছে। দেশে প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে মৌ খামার ব্যাপকতা লাভ করলে দেশে গুণগত মানের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে এবং সেই সঙ্গে মৌ কলোনির উপজাত এবং সেসব থেকে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক : প্রকল্প পরিচালক, কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-৩য় পর্যায় (১ম সংশোধিত), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। ফোন : ৫৫০২৮২১৬, ই-মেইল : ঢ়ফঢ়ড়ংঢ়৩ৎফ@মসধরষ.পড়স
আলু সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ পদ্ধতি
কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম
বাংলাদেশে আলুর উৎপাদন এখন কোটি টন ছাপিয়ে। আলু উৎপাদনে বিশ্বে ৭ম স্থানে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে আলুর চাহিদার প্রায় ৩০ ভাগ অধিক উৎপাদন হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে আলু রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১১.৬৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১০০ কোটি (১৭ এপ্রিল ২০২১, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। আলুর বহুবিধ ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। চিপস্, ক্রিপস, ফ্লেক্স, ফ্রেন্সফ্রাই স্টার্চ পাউডার ইত্যাদি তৈরিতে আলু ব্যবহার হচ্ছে এবং দিন দিন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। রপ্তানির মাধ্যমে আলুর নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। সরকার আলু রপ্তানি খাতে ২০% আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করেছে। আলুর গুরুত্ব অনেক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বীজ আলু, খাবার আলু, আগাম আলু, প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আলু, রপ্তানিযোগ্য আলুসহ বিভিন্ন রকমের আলু দরকার। আলু উৎপাদনের পাশাপাশি আলু সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর না দিলে ক্ষতি হতে পারে। আবার সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু পচে নষ্ট হয় বা গুণাগুণ নষ্ট হয়। তাই আলুর সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে কোন কোন বিষয়ের ওপর গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে তা আলোচনা করা হলো।
আলু সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা
টিউবারের পরিপক্বতা : পরিপক্ব আলুর চেয়ে অপরিপক্ব আলুর সংরক্ষণ ক্ষমতা কম। পরিপক্ব আলুর চামড়া শক্ত থাকায় ওজন হ্রাস ধীরগতিতে হয়ে থাকে এবং রোগজীবাণু সহজেই আক্রমণ করতে পারে না। সেজন্য আলু পরিপক্ব হওয়ার পর উত্তোলন করতে হবে। আলু উত্তোলনের কমপক্ষে ৭-১০ দিন আগে আলুর গাছ উঠিয়ে ফেলতে হবে। একে হাম পুলিং (ঐধঁষস ঢ়ঁষষরহম) বলে। এতে আলুর চামড়া শক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
আলু তোলার সময় : আলু শীত-শীত ভাব থাকা অবস্থায় সংগ্রহ করা ভালো। কারণ গরম পড়া শুরু হলে বিভিন্ন রোগজীবাণু খুবই সক্রিয় হয়ে উঠে এবং আলুতে আক্রমণ করে। মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে আলু তোলা ঠিক নয়। তাছাড়া আলু দুপুরের দিকে না উঠিয়ে সকালের দিকে উত্তোলন করতে হবে। জমিতে জো থাকা অবস্থায় আলু সংগ্রহ করা উত্তম। ফসল অবশ্যই পরিপক্ব হলে সংগ্রহ করতে হবে। তাহলে আলুর ড্রাই মেটার বৃদ্ধি পাবে এবং রিডিউসিং সুগারের পরিমাণ কম হবে। টিউবারের এই সম্মিলিত গুণাগুণ ফ্রেন্সফ্রাই এবং চিপসের জন্য উপযোগী। টিউবার মাটি থেকে উঠানোর সময় মারাত্মকভাবে এর গুণাবলি নষ্ট হয়ে থাকে। টিউবার সংগ্রহের সময় মাটির তাপমাত্রা কম হলে টিউবারের আঘাতের ফলে সৃষ্ট কালো দাগ বেশি হয়। ১২ড়প এর নিচে মাটির তাপমাত্রা হলে টিউবার উঠানো উচিত নয়।
সংগ্রহকালীন সতর্কতা : আলু সংগ্রহের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন আলু কেটে না যায়, চামড়া না ছিড়ে যায় এবং দূর বা উঁচু থেকে নিক্ষেপ না করা হয়। কারণ তাতে আলু আঘাত পেতে পারে। তাছাড়া আলু উত্তোলনের সময় বাঁশের টুকরীতে না রেখে এ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের বোল ব্যবহার করতে হবে। বাঁশের টুকরীতে রাখতে হলে তাতে চট বিছিয়ে নিতে হবে। আলু জমি থেকে তোলার পর রোদে বেশিক্ষণ রাখা ক্ষতিকারক। আলু উত্তোলনের পর যদি মাঠে রাখতেই হয় তবে পলিথিন বা ত্রিপাল দিয়ে ঢেকে রাখা যাবে না। সেক্ষেত্রে শুকনা খড় বা কচুরিপানা বা পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে যাতে বায়ু চলাচল স্বাভাবিক থাকে। বৃষ্টি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য আলুর স্তূপের উপর অস্থায়ী শেড নির্মাণ করা যেতে পারে।
ফসল স্থানান্তর ও পরিবহন : বস্তা ভর্তি আলু হিমাগারে রাখলে আঘাতজনিত কালচে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষতযুক্ত আলু চিপস্ এবং ফ্রেন্সফ্রাই তৈরির অনুপযোগী। কিন্তু যদি আলু কাঠের বাক্সে করে হিমাগারের সংরক্ষণ করা হয় তাহলে উক্ত সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। আলুর পরিবহনে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আলুর বস্তা পরিবহনের সময় সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হবে, জোরে বা মাথা থেকে হঠাৎ ফেলে দেয়া যাবে না। একস্থান হতে অন্যস্থানে নেয়ার সময় কোন অবস্থাতেই বস্তার উপর বসা বা দাঁড়ানো যাবে না।
কিউরিং, বাছাই ও গ্রেডিং : সদ্য তোলা আলুকে ১৫-২০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় এবং শতকরা ৮৫ ভাগ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় ৭-১০ দিন রেখে দিলে আলুর ক্ষত নিরাময় ও চামড়া শক্তকরণ প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। এ জন্য আলুক্ষেত থেকে আনার পর ছায়াযুক্ত স্থানে ছড়িয়ে রেখে মুক্ত বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আলুকে সংরক্ষণের আগে ভালোভাবে বাছাই করতে হবে যেন খারাপ, কাঁটা, রোগাক্রান্ত বা ভেজা আলু গুদাম ঘরে না যায়। প্রয়োজনে আলুর আকার অনুযায়ী গ্রেডিং করতে হবে।
আলু সংরক্ষণ পদ্ধতি
প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ব্যবহৃত আলু সংরক্ষণ : উপর্যুক্ত পরিবেশে আলু ৭-৯ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ব্যবহৃত আলু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়গুলো বিবেচনা করার উচিত সেগুলো হলো- আলুর ওজন হ্রাস ও কালচে দাগ প্রতিরোধ কল্পে হিমাগারের বায়ু চলাচল সর্বোনিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে এবং হিমাগারের অভ্যন্তরের আর্দ্রতা ৯২% এর বেশি রাখা দরকার। চিপস্ তৈরিতে ব্যবহৃত আলুকে ৭-১০ড়ঈ তাপমাত্রায় এবং ফ্রেন্সফ্রাই জন্য ব্যবহৃত আলুকে ৬-৭ড়ঈ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ উচিত। আলুর স্প্রাউট গজানো বন্ধ করতে ওচঈ (আইসোপ্রপাইল-৩ ক্লোরোফিনাইল কার্বোনেট) অথবা কেওড়া বীজের নির্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। আলু হিমাগার থেকে বের করে প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় রাখার পূর্বে ১৫-১৮ড়ঈ তাপমাত্রায় তিন দিন রাখলে কালো দাগজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ব্যবহৃত আলুর গুণাগুণ নিরূপণের মানদ-সমূহ সাধারণত আকার, আকৃতি, রোগবালাই, আঘাতজনিত কালচে ক্ষত, শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ এবং চিনির উপস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের জন্য উপযুক্ত আলুর জাত নির্বাচন করা।
হিমাগারে বীজ আলু সংরক্ষণ : বীজ আলু অবশ্যই হিমাগারে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ আলু ৪০ কেজির অধিক ওজনের বস্তায় সংরক্ষণ করা যাবে না। আলু সংরক্ষণের পূর্বে কোল্ডস্টোরেজের কক্ষগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হবে। ব্লিচিং পাউডার ও বর্দো মিকচার ব্যবহার করে কোল্ড স্টোরেজের কক্ষগুলো পরিষ্কার করা হয়ে থাকে। কোল্ডস্টোরেজে দুই ধরনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকে।
প্রথমত প্রিকুলিং/প্রিহিটিং চেম্বার- মাঠ হতে বীজ আলু সংগ্রহের পর কোল্ডস্টোরেজের মূল কক্ষে প্রবেশের পূর্বে আর্দ্রতা কমানোর জন্য এ কক্ষে রাখা হয়। এ কক্ষের তাপমাত্রা ১৫-১৮ ডিগ্রি সে. হয়ে থাকে। মূল কক্ষে সংরক্ষণের পূর্বে এ কক্ষে কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বীজ রাখা উচিত। এ চেম্বারেই আলু হিমাগার হতে বের করার পর স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিয়ে আসার আগে একই পদ্ধতিতে প্রিহিটিং করা যায়।
দ্বিতীয়ত মূল কক্ষ- প্রিকুলিং চেম্বারে ৪৮-৭২ ঘণ্টা থাকার পর আলুর বস্তা এ কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। মূল কক্ষে আলু সংরক্ষণের দিন থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমিয়ে ১৫-২০ দিনের মধ্যে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সে. থেকে ৩.৫ ডিগ্রি সে. এ নামিয়ে আনতে হবে ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৮৫%-৯০% বজায় রাখতে হবে। আলু সংরক্ষণের ১৫-২০ দিন মেয়াদের মধ্যে প্রতিদিন অন্তত পক্ষে ৫/১০ মিনিট করে মুক্ত বাতাস হিমকক্ষগুলোতে সরবরাহের ব্যবস্থা করা দরকার। পরবর্তীতে প্রথম ৩ মাস ৫ দিন অন্তর এবং মৌসুমের অবশিষ্ট সময়ে ৭ দিন অন্তর যথারীতি মুক্ত বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বস্তাবন্দী আলু সমভাবে প্রবাহিত বাতাসের সংস্পর্শে আসার জন্য জুন মাসের মাঝামাঝি একবার ও আগস্টের শেষভাগে আরেকবার আলুর বস্তা উলটপালট করতে হবে। নভেম্বর মাসে জমিতে লাগানোর উদ্দেশ্যে কোল্ডস্টোরেজের মূল কক্ষ হতে আলু প্রিহিটিং চেম্বারে ৪৮-৭২ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। এরপর বাসায় আলু বস্তা এনে বস্তা খুলে বীজ আলু ছায়াযুক্ত স্থানে ছড়িয়ে রাখতে হবে। কাঁটা, ফাটা এবং পচা আলু সরিয়ে ফেলে দিতে হবে।
কৃষকপর্যায়ে আলু সংরক্ষণ : বাংলাদেশে প্রায় ৪০০টি কোল্ডস্টোরেজ এ প্রায় ৬০ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। আবার কোল্ডস্টোরেজ এর পাঁচ ভাগের তিন ভাগ উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। বিগত বছরগুলোতে দেখা যায় বাংলাদেশে মোট আলু উৎপাদনের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। বাকি আলু কৃষক সাধারণ অবস্থায় নিজেদের ঘরে রেখে দেন। সাধারণ অবস্থায় সংরক্ষিত আলু ৪-৫ মাসের মধ্যেই খেয়ে শেষ করতে হবে অথবা অন্য উপায়ে ব্যবহার করতে হবে, যেমন-প্রক্রিয়াজাত করা যেতে পারে। কারণ, সাধারণ অবস্থায় সংরক্ষিত আলু আস্তে আস্তে গুণাগুণ নষ্ট হয়ে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে আলু এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে পচে নষ্ট হওয়ার বিভিন্ন কারণগুলো যথাসম্ভব পরিহার করে চলা যায়। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আলু সংরক্ষণের জন্য যে ঘরটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা, সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে এবং যেটি গাছের ছায়ায় অবস্থিত সেটিকে আলু সংরক্ষণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। তাছাড়া ঘরটি যদি পুকুরের পাড়ে হয় তবে তাতে সর্বদা বায়ু চলাচল থাকতে হবে। নির্বাচিত ঘরটিতে যদি পূর্ববর্তী বছর আলু রাখা হয়ে থাকে তবে তা অবশ্যই ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। তারপর কীটনাশক ছিটিয়ে পোকামুক্ত করে নিতে হবে যাতে আগের বছরের কোন পোকা সংরক্ষিত আলুতে আক্রমণ করতে না পারে। যদি এ বছরই নতুনভাবে সংরক্ষণ করা হয় তবে ঘরে মাচা বা তাক বানানো যেতে পারে। প্রথমে মাটি হতে এক ফুট উপরে একটি মাচা বানাতে হবে। এক মাচা থেকে আর এক মাচা দূরত্ব ২.৫-৩.০ ফুট হলে সংরক্ষণ পরবর্তী বাছাই ও অন্যান্য কাজ সহজতর হয়।
শেষকথা, খাবার আলু, বীজ আলু ও রপ্তানিযোগ্য আলু সঠিক সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ করতে পারলে আলু অপচয় যেমন একদিকে রোধ হবে একই সাথে ভোক্তার টেবিলে গুণগত মানসম্পন্ন আলু পৌঁছে যাবে এবং আলু রপ্তানি বাণিজ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : অতিরিক্ত উপপরিচালক (এলআর), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রেষণে পিএইচডি ফেলো (এনএটিপি), কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর। মোবাইল : ০১৭১৯৫৪৭১৭৯। ংধুবসফধব@ুধযড়ড়.পড়স
প্রতি ইঞ্চি জমির সুষ্ঠু ব্যবহারে উন্নত জাতের হলুদ চাষ
কৃষিবিদ অসিত কুমার সাহা
বাংলাদেশের আয়তনের এক-দশমাংশ স্থান দখল করে রেখেছে বসতবাড়ি। দেশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় রয়েছে বহুবর্ষী বৃক্ষ। তাছাড়া মৌসুমি সবজি চাষের জন্য রয়েছে মাচার ব্যবস্থা। বহুবর্ষী বৃক্ষের ও মৌসুমি সবজি চাষের জন্য জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। একে বহুবিধ ব্যবহারের আওতায় আনতে হলুদ চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এরূপ ছায়াযুক্ত স্থানে, যেখানে অন্য ফসল চাষ করা অসম্ভব, সেখানে হলুদ চাষ করা যায় অনায়াসে।
অধিক জনসংখ্যার চাপে দিনদিন আবাদি জমি কমছে। এ প্রেক্ষাপটে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এরই প্রেক্ষিতে স্বল্প পরিশ্রমে, অল্প ব্যয়ে, পানি জমে থাকে না, এমন ছায়াযুক্ত স্থানে অতি সহজে হলুদ চাষ করা সম্ভব। ছায়াযুক্ত পরিবেশে দেশি বা উন্নত জাতের হলুদ চাষ করা যায়। তবে উন্নত জাতের হলুূদ চাষে ফলন বেশি হয় এবং তাতে আয়ও বেশি হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, নানা জাতের হলুদ রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দুইটি জাতের হলুদ উদ্ভাবন করেছে। এ দু’টি জাত ডিমলা ও সুন্দরী। এ দু’টি জাতের চাষাবাদ পদ্ধতি প্রায় একই রকমের চৈত্র মাসের শুরু থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত হলুদ বীজ বপন করা যায়।
জমি প্রস্তুতকরণ ও বপন
হলুদ চাষে হলুদের কন্দ বীজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতি হেক্টরে ২২০০ থেকে ২৪০০ কেজি কন্দের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি কন্দের দুটি চোখ জরুরি। ভালোভাবে জমি তৈরি করার পর দেশি লাঙ্গল বা বপনের জন্য হাতে টানা লাঙ্গল দ্বারা ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্বে পাঁচ থেকে সাত সেন্টিমিটার গভীর করে ২৫ সেন্টিমিটার দূরে দূরে স্থাপন করতে হয়। এরপর দুই লাইনের মধ্যবর্তী জায়গা থেকে মাটি দিয়ে বীজ কন্দগুলোকে একটু উঁচু করে ঢেকে দিতে হয়। এতে দুই লাইনের মাঝে নালার মতো তৈরি হয় যা দিয়ে পানি সরে বা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যায়। বীজ বপনের প্রায় একমাস পরে চারা গজায়। বহুবর্ষী বৃক্ষের ছায়ায় চাষের ক্ষেত্রে গাছ থেকে এমন দূরত্ব হলুদ চাষ করতে হবে যাতে শিকড় কাটা না পরে।
সার প্রয়োগ
হলুদ চাষে প্রতি হেক্টরে সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো- টিএসপি ১৮০ কেজি, এমওপি ২০০ কেজি এবং ইউরিয়া ২২০ কেজি প্রতি হেক্টর এসব সার ছাড়াও জমিভেদে হেক্টর প্রতি ৫ থেকে ১০ টন জৈব সার জমিতে প্রয়োগ করা যায়। শেষ চাষে টিএসপির পুরো অংশ এবং এমওপি সারের অর্ধেক প্রয়োগ করতে হয়। অতঃপর বীজ বপনের ৫০ থেকে ৬০ দিন পর আগাছা পরিষ্কার করে দুই সারির মাঝে অর্ধেক ইউরিয়া প্রয়োগ করে কোদাল দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে দিতে হয়। দ্বিতীয় উপরি প্রয়োগের আরও ৫০ থেকে ৬০ দিন পর বাকি এমওপি, ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়।
অন্যান্য পরিচর্যা
মাটি অধিক শুষ্ক হলে সেচের প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিবার সেচের পর জমিতে জো আসার সাথে সাথে মাটির উপরের চটা ভেঙে দেওয়া উচিত। অতিবৃষ্টির সময় গাছের গোড়ায় যাতে পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গাছের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে, সময় মতো আগাছা দমন করতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হয়।
ফসল সংগ্রহ
হলুদ লাগানোর ৯ থেকে ১০ মাস পর যখন হলুদের কা- পর্যন্ত শুকিয়ে যায়, তখন হলুদ সংগ্রহ করতে হয়। সুন্দরী জাতের হলুদ, ডিমলা জাতের চেয়ে প্রায় একমাস আগে উত্তোলন করা যায়।
হলুদ গাছ ছায়া সইতে পারে। তাই বসতবাড়ির আঙিনায় ফল বাগানে হলুদের চাষ করা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানে অনেকে হলুদ চাষ করে বাড়তি লাভ করছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের জার্মপ্লাজম সেন্টারে দীর্ঘদিন ধরে বহু স্তরবিশিষ্ট ফল বাগানে নারিকেল ও লেবু গাছের নিচে হলুদ চাষ করে সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া নারিকেলের সাথে পেয়ারা ও হলুদ চাষ করা যেতে পারে। পাহাড়ে হলুদ ক্ষেতের মধ্যে আন্তঃফসল হিসেবে শিমুল, আলু, ভুট্টা ইত্যাদি লাগানো হয়।
বালাই ব্যবস্থাপনা
হলুদ গাছের পোকার চেয়ে রোগের আক্রমণ বেশি হয় এবং এর মধ্যে হলুদের কন্দপচা রোগ প্রধান। তবে পাহাড়ে সম্প্রতি পাতা ঝরা রোগ ও অন্যান্য রোগ ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।
কন্দ পচা রোগ : কন্দ পচা এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগটি প্রায়ই হলুদ ক্ষেতে দেখা যায়। এ রোগের ফলে প্রথমে হলুদ গাছের গোড়ার দিকের পাতা হলুদ হতে শুরু করে। ক্রমে উপরের পাতাগুলো হলুদ হয়ে যায়। শেষে মাটির নিচে কন্দ পচতে শুরু করে। একপর্যায়ে পুরো কন্দ বা মোথাই পচে নষ্ট হয়। পচা মোথা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।
ব্যবস্থাপনা : জমি থেকে অতিরিক্ত পানি যাতে জমতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আক্রান্ত গাছ জমি থেকে তুলে ধ্বংস করতে হবে। রোগ দেখা মাত্র ক্ষেতে ছত্রাকনাশক (রিডোমিল গোল্ড, ডায়থেন এম ৪৫) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম পরিমাণ গুলে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে। ১৫ দিন পর পর তিন থেকে চার বার স্প্রে করলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বীজের জন্য রোগমুক্ত হলুদ গাছ থেকে কন্দ তুলতে হবে। আক্রান্ত জমিতে পরের বছর আর হলুদ চাষ করা ঠিক হবে না।
পাতা ঝলসা বা লিফ ব্লচ রোগ : এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের ফলে প্রথমে পাতা ফ্যাকাশে রং ধারণ করে। পাতার দু পাশেই ছোট ছোট অসংখ্য দাগ দেখা যায়। পরে দাগগুলো একত্র হয়ে পাতা ঝলসানো মতো দেখা যায়। শেষে আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে।
ব্যবস্থাপনা : এ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আক্রান্ত পাতা জমি থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এ রোগ দেখা মাত্র ক্ষেতে ছত্রাকনাশক (ফলিকুর ১০ মিলি বা ২০ গ্রাম ডাইথেন এম ৪৫) প্রতি ১০ লিটার পানিতে গুলে ১৫ দিন পরপর তিনবার পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। বীজের জন্য অবশ্যই রোগ মুক্ত হলুদ গাছ থেকে কন্দ তুলতে হবে, কন্দ তোলার পর বীজ হিসেবে তা মজুদের আগে ব্যাভিস্টিন দিয়ে শোধন করে নিতে হবে।
পাতায় দাগ রোগ : সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এ রোগ বেশি দেখা যায়। নভেম্বর মাসে এ রোগে আক্রান্ত গাছের পাতা শুকাতে শুরু করে। এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের ফলে প্রথমে পাতায় ধূসর কেন্দ্র বিশিষ্ট বাদামি দাগ সৃষ্টি হয়। দাগের চারপাশে গাঢ় বাদামি বেষ্টনী থাকে, তার পাশে থাকে হলুদ রঙের আভা। ধীরে ধীরে দাগগুলো একত্রে মিলে বড় পাতাকে পুড়িয়ে ফেলে।
ব্যবস্থাপনা : এ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আক্রান্ত পাতা জমি থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগ দেখা মাত্র ক্ষেতে ছত্রাক নাশক (ফলিকুর ১০ মিলি বা ২০ গ্রাম ডায়থেন এম ৪৫) প্রতি ১০ লিটার পানিতে গুলে ১৫ দিন পরপর তিনবার পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। কন্দ তোলার পর বীজ হিসেবে তা মজুদের আগে ব্যাভিস্টিন দিয়ে শোধন করে নিতে হবে। আক্রান্ত জমিতে পরের বছর আর হলুদ চাষ করা ঠিক হবে না।
হলুদ প্রক্রিয়াজাতকরণ : হলুদ কাঁচা ও শুকনো দুই অবস্থাতে বিক্রি করা যায়। শুকানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। হলুদ তোলার পর হলুদ পরিষ্কার করে একটি বড় পাত্রে প্রতি ১০০ কেজি কাঁচা হলুদের সাথে ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম খাবার সোডা মিশিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পানিতে সেদ্ধ করতে হয়। গরম পানি থেকে হলুদ উঠিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন কড়া রোদে শুকাতে হবে। শুকিয়ে গেলে শুকনো হলুদ হাতের চাপে মট করে ভেঙে যাবে। ভালোভাবে না শুকালে সেভাবে ভাঙবে না। শুকানোর পর তা হলুদ ভাঙানো কলে নিয়ে গুঁড়া করতে হবে। না করলে পলিথিনের বস্তায় ভরে ঘরের শুকনো জায়গায় মজুদ করে রাখতে হয়।
হলুদ বীজ উৎপাদন ও মজুদ ব্যবস্থাপনা : বীজ হলুদের জন্য ক্ষেত থেকে প্রথমে সুস্থ ও রোগমুক্ত গাছ থেকে হলুদ তুলতে হবে। তারপর সেগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার করে মজুদের ব্যবস্থা নিতে হয়। মজুদের জন্য চালার নিচে সুবিধামতো কোন জায়গায় গর্ত করে গর্তের ভেতর চারপাশে শুকনো খড় বিছিয়ে থলিতে হলুদ ভরে মজুদ রাখতে হয়। তবে বালি দিয়ে মজুদ করা যায়। এজন্য প্রথমে হলুদ মজুদের জায়গায় তিন থেকে চার সেন্টিমিটার পুরু করে বালির স্তর বানাতে হবে। এরপর এর উপরে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পুরু করে হলুদ বিছাতে হবে। হলুদের উপর নিম বা বিষকাটালী পাতার পাতলা স্তর দিয়ে ঢেকে তার উপরে আবার ৩-৪ সেন্টিমিটার পুরু বালুর স্তর দিয়ে ঢেকে রাখলে ভালো হয়। এতে পোকার আক্রমণ কম হয়। এমনকি বীজ মজুদের আগে ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করে নিলে মজুদ করা কন্দের পচা কমে। বীজের পরিমাণ বেশি হলে এভাবে কয়েকটি স্তরে হলুদ রাখা যেতে পারে।
উৎপাদন খরচ ও আয় : স্থানীয় হলুদ চাষে হেক্টর প্রতি কৃষকের খরচ পড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং উৎপাদিত হলুদের স্থানীয় বাজার মূল্য পাওয়া যায় প্রায় এক লাখ টাকার বেশি, খরচ বাদে লাভ হবে ৭০-৭২ হাজার টাকা।
ব্যবহার : হলুদের ব্যবহার বহুমুখী। ভারতবর্ষে বহু আগের থেকে মসলা হিসেবে হলুদ ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। হলুদ প্রসাধনী সামগ্রী, রঙ, ভেষজ ঔষধ তৈরিতে ব্যবহার হয়ে আসছে। শোনা যায় হলুদ দেহে রোগ প্রতিরোধ বাড়ায়। এ ছাড়া হলুদ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহার হয়। বিভিন্ন রান্নাকে রঙযুক্ত আকর্ষণীয়, সুস্বাদু ও সুঘ্রাণ করতে গুঁড়ো হলুদ ব্যবহার হয়। হলুদের খাবার পচনকারী ব্যাকটেরিয়া জীবাণু ধ্বংস করতে পারে।
লেখক : প্রাক্তন উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গোপালগঞ্জ। মোবাইলঃ ০১৭১২-২৫৭০৬২,
গরুর দুধে ভাইরাস মোকাবিলা
ডা: সুচয়ন চৌধুরী
যুগ যুগ ধরে মানুষ আদর্শ খাদ্য হিসেবে দুধ গ্রহণ করেছে। যার মাধ্যমে নিজের অজান্তে বা সজ্ঞানেই মানুষ নিজের মধ্যে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী দুর্গ। কারণ দুধের মধ্যে এমন কিছু উপাদান আছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুদৃঢ় করে।
দুধের এ রকম একটি উপাদান হলো কেসিন, যা দুধের মূল প্রোটিন অংশ। এই কেসিন প্রোটিন এবং তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বা পলি পেপটাইটগুলোও ভাইরাসবিরোধী কাজ করে। এরা শরীরের রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে মূলত দুই উপায়ে। যথা: প্রথমত একটি হলো শরীরের ভিতরে বহিরাগত ভাইরাসকে মেরে ফেলার যে প্রক্রিয়া চলে তাকে ত্বরান্বিত করে। দ্বিতীয়ত শরীরের মারাত্মক আত্মঘাতী কিছু কার্যক্রম (যেমন: পচন বা ঝবঢ়ংরং) কে সে কমিয়ে আনে বা প্রশমিত করে। তাছাড়া শরীরের ভিতরে বি-লিম্পোসাইট এবং টি-লিম্পোসাইটগুলো সচল করে দেয় এবং সচলগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে দেয়। দুধের আরেকটি প্রোটিন হলো ল্যাক্টোফেরন যা সরাসরি ভাইরাসের উপর কাজ করে।
আলফা ল্যাকটো অ্যালবুমিন (α খধপঃড় ধষনঁসরহ) নামের দুগ্ধ প্রোটিনটিও ভাইরাসবিরোধী কার্যক্রমের সাথে জড়িত। সাথে সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে লেকটোফেরন এবং এর থেকে উৎপন্ন পেপটাইটগুলো মূলত ভাইরাস তার পোষক দেহের কোষের সাথে যেখানে ক্রিয়া বিক্রিয়া করে সেখানেই হস্তক্ষেপ করে। পোষক কোষের (ঐড়ংঃ পবষষ) প্রাচীরে যে ঋণাত্মক চার্জধর্মী হেপারেন সালফেট (যবঢ়ধৎরহ ঝঁষঢ়যধঃব) থাকে তার সাথে মিথস্ক্রিয়া করে ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক অবস্থা তৈরি করে। ফলে ভাইরাস আর পোষকের কোষের অভ্যন্তর প্রবেশ করতে পারে না।
অন্যদিকে বিটা-ল্যাকটোগ্লোবিউওলিন বা আলফা ল্যাকটোএলবুমিন জাতীয় দুগ্ধ প্রোটিনের বাইরের আবরণীতে ঋণাত্মক ধর্মী অংশ (অহরড়হরপ ঢ়ধঃপয) থাকে কিন্তু ক্যাসিনের বাইরের দিকে ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক ধর্মী অংশ আছে। তাই দুধের এই দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে এর ভাইরাস এবং পোষকের দেহের মিথস্ক্রিয়ায় জোরালোভাবে বাধা প্রদান করতে পারে।
সাধারণত একটি ভাইরাস তার জীবন চক্রে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে । যেমন : পোষক কোষের সাথে যুক্ত হওয়া, তারপর উক্ত কোষের মধ্যে ডুকে যায়, ভাইরাসের জিনোমের রেপ্লিকেশন সম্পন্ন হয়, ভাইরাস নিজস্ব প্রোটিন তৈরি করে নিজেদের বংশবিস্তার করে এবং আক্রান্ত কোষ থেকে বের হয়ে আসে। এই ধাপগুলো যেকোন পর্যায়ে দুগ্ধজাত প্রোটিন বা ভাইরাসরোধী উপাদান কাজ করে।
ভাইরাসের গাঠনিক প্রোটিনের সাথে যুক্ত : যেই ভাইরাসগুলোর বাইরে কোন আবরণী পর্দা থাকে না (ঘড়হ ঊহাবষড়ঢ়বফ) সেগুলোর বাইরের দিকে গাঠনিক প্রোটিনগুলো অনেক সময় কাঁটা বা আঁশের মত বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে যা পোষক কোষের সাথে প্রাথমিকভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করে। আর সমস্ত ভাইরাসের বাইরে পর্দা থাকে (ঊহাবষড়ঢ়বফ) তারা পোষক কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়।
দুধের এমন কিছু প্রোটিন আছে যা এই দুই ধরনের ভাইরাস প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয় ভাইরাসকে পোষক কোষের সাথে যুক্ত হতে বাধা দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের আবরণীতে হিমাগ্লুটিনিন নামে একধরনের প্রোটিন পাওয়া যায়, যা ভাইরাসকে পোষক কোষের সাথে যুক্ত হতে এবং ভাইরাসের জিনোম ঐ কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। দুধে কিছু প্রোটিন এই হিমাগ্লুটিনিনের সাথে যুক্ত হয়ে হিমাগ্লুটিনেশোনের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ধ্বংস করে দেয় ফলে ঐ ভাইরাস আর পোষক কোষে প্রবেশ করতে পারে না।
ভাইরাসকে পোষক কোষের সাথে সংযুক্ত হতে বাঁধা প্রদান : ভাইরাস পোষক কোষের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য পোষক কোষের কোন রিসেপ্টরকে শনাক্ত করতে হয়। তার সাথে যুক্ত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু যদি ভাইরাস এই রিসেপ্টরকে খুঁজে না পায় তাহলে সে তার জীবনের পরবর্তী ধাপগুলো অতিক্রম করতে পারে না। দুধের প্রোটিন এই রিসেপ্টর গুলোর সাথে ক্রিয়া করে নিষ্কিয় করে দেয়। যার কারণে ভাইরাস তাকে আর খুঁজে পায় না।
ভাইরাসের বংশ বিস্তারে (ৎবঢ়ষরপধঃরড়হ) বাধা প্রদান করা : ভাইরাসের রেপ্লিকেশনের জন্য বিভিন্ন এনজাইম বা উৎসেক প্রয়োজন। দুগ্ধজাত বিভিন্ন প্রোটিন এই সমস্ত এনজাইমকে বাঁধা দিয়ে ভাইরাসের রেপ্লিকেশনকে বাধাগ্রস্ত করে ফলে ভাইরাস বংশবিস্তার করতে পারে না।
পোষক কোষের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা: পোষক দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুই ধরনের। একটি হলো তার সহজাত (রহহধঃব) যা স্বাভাবিকভাবে তার শরীরে থাকে। আর অন্যটি হলো, যখন বাইরের থেকে শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোনকিছু (ঋড়ৎবরমহ অহঃরমবহ) শরীরে প্রবেশ করে শরীরের অভ্যন্তরে বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। যার ফলে বিভিন্ন পদার্থ উৎপন্ন হয়ে উক্ত বিপদ মোকাবিলা করে। এটি হলো তার অভিযোজিত (অফড়ঢ়ঃরাব) রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
শরীরে সহজাত রোগ প্রতিরোধের জন্য আছে বিভিন্ন ধরনের লিয়োকোসাইট। যেমন: ম্যাক্রোফেজ, ডেনড্রাইটিক সেল, কিলার কোষ ইত্যাদি। আবার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন নতুন শত্রু মোকাবিলায় অভিযোজিত হয় তখন মূল ভূমিকা পালন করে বি-লিম্পোসাইট এবং টি-লিম্পোসাইটের মতো কোষ গুলো। আর এই দুইটি পথকে একত্র করতে কাজ করে সাইটোকাইন কেমোকাইন নামক বিভিন্ন সংকেত প্রদানকারী পদার্থ।
ল্যাকটোফেরন প্রাকৃতিক কিলার কোষের (ঘধঃঁৎধষ করষষবৎ ঈবষষ) সাইটোটক্সিক ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সাথে সাথে পলিমরফোনিউক্লিয়ার লিউকোসাইটের গতিশীলতাও বাড়িয়ে দেয় এবং সুপার অক্সাইড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এটি ম্যাক্রোফেজগুলোকে সক্রিয় করে দেয় এবং বিভিন্ন ধরনের সাইটোকাইন উৎপাদনের জন্য উদ্দীপ্ত করে।
অন্যদিকে ল্যাকটোফেরন বিপদকালীন মহূর্তে লিম্পোসাইটের বৃদ্ধিকে উদ্দীপ্ত করে। যার ফলে অপরিণত বি-লিম্পোসাইট এবং টি-লিম্পোসাইটগুলো গঠনগত পরিবর্তন হয়। ফলশ্রুতিতে বি-লিম্পোসাইটগুলো এন্টিজেনকে টি-হেল্পার টাইপ ২ কোষগুলোর সামনে তুলে ধরতে পারে।
অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নিয়োজিত কোষগুলোকে সক্রিয় করা থেকে শুরু করে এন্টিজেন বিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দুগ্ধজাত ল্যাকটোফেরন সহযোগিতা করা মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করে।
দুগ্ধজাত বিভিন্ন পেপ্টাইটেট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ত্বরান্বিত
ল্যাকটোফেরন ছাড়াও বিভিন্ন দুগ্ধ জাত প্রোটিন এবং পেপটাইট ভাইরাসবিরোধী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে। ল্যাকটোফেরন থেকে তৈরি ল্যাকটোরিসিন ও ল্যাক্টোরেফেরাম্পিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করে। কেসিন পেপটাইট অধিক লিম্পোসাইট এর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য উদ্দীপ্ত করে। সাথে সাথে শরীরে যে ম্যাকরোফেজ আছে তাদের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। তাদের কাজ হলো শরীরের জন্য ক্ষতিকর এন্টিজেনকে খেয়ে ফেলা।
তাহলে বিষয়টি দাঁড়ালো, দুধের এমন অনেক প্রোটিন এবং পেপ্টাইট আছে যা ভাইরাসবিরোধী কাজ করে মূলত ভাইরাস রোগ তৈরির জন্য যে যে ধাপের মধ্য দিয়ে যায় সে সে ধাপে বাধা প্রদান করে। আবার এদের মধ্যে অনেকে আছে যারা এন্টি ভাইরাল ওষুধের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। তবে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। দুধের প্রোটিনও হয়তো হতে পারে কোন এন্টি ভাইরাল ড্রাগের টেমপ্লেট। য়
লেখক : উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি। মোবাইল : ০১৭১৮৬৩০২৬৮।
পরমাণু প্রযুক্তিতে বিষমুক্ত শুঁটকি মাছ উৎপাদন
কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ
মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করার সময় এক ধরনের মাছির লার্ভা বা শুককীট শুঁটকি মাছের মারাত্মক ক্ষতি করে। এই ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য শুঁটকি মাছ উৎপাদনকারীরা মাছ শুকানোর আগে কাঁচা মাছে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে। এতে উৎপাদিত শুঁটকি মাছ বিষাক্ত হয়। যা খাওয়া অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ। শুঁটকি মাছ উৎপাদনকারীরা যখন কীটনাশক প্রয়োগ করে তখনই শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তাদের শরীরে কীটনাশক ঢুকে যায়। শুঁটকিভোজী মানুষেরা এই কীটনাশকযুক্ত শুঁটকি মাছ খাওয়ার ফলে মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের খারাপ প্রভাব পরে যেমন- মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, লিভার, ফুসফুস এবং কিডনি সহজেই রোগাক্রান্ত হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, প্রজনন ক্ষমতার উপর প্রভাব পড়ে, মহিলাদের অধিক পরিমাণ গর্ভপাত এবং মৃত অথবা বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম হতে পারে। কাজেই বর্তমানে যুগের দাবি হচ্ছে কীটনাশকমুক্ত শুঁটকি মাছ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১২-১৩ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্র্রিক ও স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫% মাছকে সূর্যের তাপে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তরিত করা হয়।
মাছ রোদে শুকানোর সময় খঁপরষরধ পঁঢ়ৎরহধ (লুসিলিয়া কিউপ্রিনা) প্রজাতির ক্ষতিকারক মাছি মাছে ডিম পেড়ে শুককীট/ লার্ভা উৎপাদন করে। মাছির এই লার্ভাগুলো মাছ খেয়ে বিনষ্ট করে। এই বন্য মাছির আক্রমণে প্রায় ৩০% শুঁটকি মাছ নষ্ট হয়ে যায়। এতে প্রতি বছর ২-৩ শত কোটি টাকার শুঁটকি মাছ নষ্ট হয়। এই মাছির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মাছে ক্ষতিকারক বিষ ও অতিরিক্ত লবণ প্রয়োগ করছে শুঁটকি উৎপাদকরা। এতে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়েরই স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে শুঁটকির গুণগত মান কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে শুঁটকির বাজারমূল্য কমে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে শুঁটকি মাছ বিদেশে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এসব বিবেচনা করে বিষমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে শুঁটকির ক্ষতিকারক আপদ দমনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা।
মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতিকর মাছির বংশ বৃদ্ধি কমিয়ে শুঁটকি মাছের উৎপাদন ও গুণগতমান বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই পদ্ধতিটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই, সহজ ও সাশ্রয়ী। এই পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বিষমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। যার দরুন দেশীয় বাজারে শুঁটকি মাছের চাহিদা বেড়ে যাবে, শুঁটকি উৎপাদনকারীরা চড়া বাজারমূল্য পাবেন এবং ভোক্তাগণ ও উৎপাদকরা উভয়ই স্বাস্থ্যহানি হতে রক্ষা পাবেন। অন্য দিকে, বিষমুক্ত ও নিরাপদ এই শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ পরমাণুু শক্তি কমিশন নব্বইয়ের দশক থেকে কক্সবাজারের মহেশখালির সোনাদিয়া দ্বীপসহ অন্যান্য সামুদ্রিক শুঁটকি মাছ উৎপদান এলাকায় শুঁটকির আপদ নিয়ন্ত্রণে পরমাণু প্রযুক্তিতে উৎপাদিত বন্ধ্যা (শুককীট/লার্ভা উৎপাদনে অক্ষম) মাছি ব্যবহার করে আসছে। যদিও পূর্বে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে এ কাজে। বর্তমানে এই অসুবিধাগুলো কাটিয়ে উঠে কার্যকরী ও সমন্বিতভাবে এই কাজ পরিচালনার নিমিত্তে বন্ধ্যা মাছি উৎপাদনের জন্য কক্সবাজারের কলাতলীতে সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র্রে একটি গবেষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত স্থাপনায় এডিপি প্রকল্পের পরিচালক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকতা ড. প্রতুল কুমার রায়ের তত্ত্বাবধানে মাছি বন্ধ্যাকরণের জন্য ১টি কোবাল্ট-৬০ মোবাইল গামা রেডিয়েটর বসানো হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন করা সম্ভব এই গবেষণাগারে। লক্ষ্য হলো বিষমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদন। বর্তমানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিকিরণ কীটতত্ত্ব ও মাকড়তত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. এ টি এম ফয়েজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই কাজ পরিচালনা করছেন। ড. ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বন্ধ্যাকৃত মাছির মাধ্যমে শুঁটকির আপদ দমন পদ্ধতিকে পোকা বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি বা ঝঃবৎরষব ওহংবপঃ ঞবপযহরয়ঁব (ঝওঞ) বলে। এই প্রযুক্তিটি হলো মাছির এক ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি।
প্রাথমিক অবস্থায় শুঁটকি উৎপাদন এলাকা থেকে ক্ষতিকারক মাছি সংগ্রহ করে গবেষণাগারে বৃহদাকারে প্রতিপালন করে মাছির পিউপা/মূককীটে গামা রশ্মি (কোবাল্ট-৬০) বিকিরণের মাধ্যমে তাদের বন্ধ্যা করা হয়। অতঃপর ওইসব শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় বন্য মাছির কয়েকগুণ বেশি এই বন্ধ্যামাছি অবমুক্ত করা হয়। তখন এই বন্ধ্যামাছিগুলো মাঠের ক্ষতিকারক বন্য মাছির সাথে প্রজনন করে। যেহেতু প্রজননকৃত পুরুষ মাছি বন্ধ্যা তাই এদের শুক্রাণুর সক্রিয়তা থাকে না বিধায় স্ত্রী মাছির ডিম নিষিক্ত হয় না। ফলে স্ত্রী মাছি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর ডিম দেয় না। যদি সামান্য কিছু ডিম দিয়ে থাকে ডিমগুলো নিষিক্ত না হওয়ায় ডিম থেকে আর শুককীট/লার্ভা/লগ বের হয় না। যার জন্য ধীরে ধীরে ক্ষতিকর মাছির বংশ কমে যায়। সাথে সাথে শুঁটকি মাছে মাছির আক্রমণ কমে যায়। এভাবে বিষমুক্ত, লবণমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনে পোকা বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
সোনাদিয়া একটি আইসোলেটেড বা পৃথক দ্বীপ হওয়ায় এই পোকা বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তিটি সেখানে অধিকতর কার্যকর। কারণ বন্ধ্যা মাছি অবমুক্ত করার পর বাহির থেকে সেখানে আর ক্ষতিকর মাছি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে সেখানে ক্ষতিকর মাছির সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায় না বিধায় বন্ধ্যামাছি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এই কার্যক্রমের আওতায় গত বছরের অক্টোবর হতে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত আনুমানিক দশ লক্ষাধিক বন্ধ্যামাছি সোনাদিয়ায় অবমুক্ত করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি সম্পর্কে সরেজমিন অবগত হওয়ার জন্য কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক সংশ্লিষ্ট গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গ, প্রিন্টমিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের নিয়ে কক্সবাজারের কলাতলিতে অবস্থিত বন্ধ্যামাছি উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং সোনাদিয়ার শুঁটকি উৎপাদক, কক্সবাজারের শুঁটকি ব্যবসায়ী, পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন। গত ডিসেম্বরে সোনাদিয়ায় প্রায় তিন লক্ষাধিক বন্ধ্যা মাছি অবমুক্ত করা হয় ও সোনাদিয়ার শুঁটকি উৎপাদকদের সাথে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও শুঁটকি উৎপাদকরা এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সুফল পাওয়ার কথা আলোচনা করা হয়। মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয় শুঁটকি উৎপাদকদের শপথ করান যে কখনো যেন মাছে বিষ ও অতিরিক্ত লবণ মেশানো না হয়। ভবিষ্যতে সোনাদিয়ার শুঁটকি ব্র্যান্ড করা হবে এবং দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা হবে। এই প্রযুক্তিটি দেশের অন্যান্য শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি বিজ্ঞানীদেরকে কার্যকর ভূমিকা রাখার পরামার্শ দেন।
দেশের অন্যান্য শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় এই পোকা বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে অধিকহারে বিষমুক্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদন করার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের নির্দেশনায় এই প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রচার ও প্রসার ঘটানো হচ্ছে। যাতে করে প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজারের শুঁটকি ব্র্যান্ড করার অঙ্গীকার সর্বাত্মকভাবে পূরণ হয়। উৎপাদিত শুঁটকি মাছ সংরক্ষণকালে সংরক্ষণাগারে কয়েক ধরনের পোকা আক্রমণ করে ফলে বেশি দিন শুঁটকি সংরক্ষণ করা যায় না। উৎপাদিত শুঁটকি যাতে পোকার এইসব আক্রমণ থেকে রক্ষা পায় এবং বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় সে লক্ষ্যে ড. এ টি এম ফয়েজুল ইসলামের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীগণ কাজ করছেন। তা ছাড়া কীভাবে প্রোটিনসমৃদ্ধ এই মাছির লার্ভা ও পিউপা বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য মিশ্রিত মাছ ও পোল্ট্রির কৃত্রিম খাবারের পরিবর্তে হাঁস, মাছ ও পোল্ট্রির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
লেখক : কৃষি প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল। মোবাইল : ০১৭১১-৯৫৪১৪৩; ভধৎযধফরহভড়১৯৬৮@মসধরষ.পড়স
এসডিজি ও ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে বিএসআরআইয়ের
অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কৃষিবিদ ড. মো. আমজাদ হোসেন১, কৃষিবিদ ড. তোফায়েল আহমেদ২
মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য মানবদেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান। বিশেষ করে মেধাশক্তি বিকাশে এর বিকল্প নেই। আমাদের দেশে সাধারণত চিনি ও গুড় মিষ্টিজাতীয় খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) নির্ধারিত মান অনুযায়ী জনপ্রতি বার্ষিক ১৩ কেজি চিনি/গুড় খাওয়া প্রয়োজন। সেই হিসাবে দেশের ১৭.০০ কোটি জনসংখ্যা এর জন্য দরকার ২৩ লাখ মে. টন চিনি ও গুড়। বর্তমানে প্রতি বছর ১.৫০ লাখ হেক্টর (মিল জোন ও নন-মিল জোন) জমিতে ইক্ষু আবাদের মাধ্যমে দেশে ১৫টি চিনিকলে ২.১০ লাখ মে. টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে প্রায় ১.০০ লাখ মে. টন চিনি এবং ৬.০০ লাখ মে. টন গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। এতে করে চিনি/গুড়ের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭.০০ লাখ মে. টন, ফলে চিনি/গুড়ের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬.০০ লাখ মে. টন। এই চাহিদা পূরণ করতে সরকারকে প্রতি বছর কমপক্ষে ১৬ লাখ মে. টন চিনি বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়।
এই বিরাট ঘাটতি পূরণের জন্য চিনিকলসমূহের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং নতুন চিনিকল স্থাপন করে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৩ লাখ টনে উন্নীত করা যাবে। ৩ লাখ মে. টন চিনি উৎপাদনের জন্য দরকার হবে ৩৭.৫ লাখ মে. টন আখ (রিকভারি হার ৮% ধরে)। অবশিষ্ট ২০ লাখ মে. টন চাহিদা পূরণ করতে হবে গুড় থেকে। গুড়ের মধ্যে ১৫ লাখ মে. টন গুড় প্রস্তুত করতে হবে আখ থেকে। আর এজন্য দরকার হবে ১৫০ লাখ মে. টন আখ (রিকভারি হার ১০% ধরে)। এর সঙ্গে চিবিয়ে খাওয়া, রস পান এবং বীজের জন্য আরও ১২.৫ লাখ মে. টন আখের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ প্রতি বছর চাহিদা অনুযায়ী চিনি, গুড় ও রসের জন্য মোট আখ উৎপাদন করতে হবে প্রায় ২০০ লাখ মে. টন (৩৭.৫+১৫০+১২.৫)। বাকি ৫ লাখ মে. টন গুড়ের চাহিদা মেটাতে হবে খেজুর ও তালের গুড় দিয়ে।
হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ২ কোটি মে. টন ইক্ষু উৎপাদনের জন্য ইক্ষুর চাষাবাদ ১.৫ লাখ হেক্টর থেকে ৩.৪ লাখ হেক্টরে সম্প্রসারিত করতে হবে। চরাঞ্চলের ২ লাখ হেক্টর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অব্যবহৃত জমির একটা অংশ ব্যবহারের সুযোগ কার্যকর করে ইক্ষুচাষ সম্প্রসারণের এই কাজটি সফলভাবে করার সুযোগ রয়েছে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ইক্ষুর বর্তমান ফলন ৪৬ টন/হেক্টর থেকে বৃদ্ধি করে ৬০ টন/হেক্টরে উন্নীত করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ইক্ষুজাত ও প্রযুক্তিসমূহ সফলভাবে মাঠে প্রয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য যে, দেশে মাঠ পর্যায়ে ইক্ষুর সর্বোচ্চ ফলন ২৮৪ টন/হেক্টর পাওয়ার রেকর্ড আছে। নিবিড় ইক্ষু উৎপাদন কর্মসূচি গ্রহণ করে প্রতিটি ইক্ষু চাষিকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এ ছাড়া ইক্ষুর পাশাপাশি ট্রপিক্যাল সুগারবিট, খেজুর, তাল, গোলপাতা প্রভৃতি অপ্রচলিত মিষ্টি উৎপাদনকারী ফসল থেকেও চিনি ও গুড় উৎপাদনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
এসডিজি ও ভিশন ২০৪১ অনুযায়ী দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন চিনি উৎপাদনকরী ফসল উৎপাদনের জন্য বিএসআরআই উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ নিম্নরূপ :
উন্নত ইক্ষুজাত উদ্ভাবন : বিএসআরআই ইতোমধ্যে ৪৮টি উচ্চফলনশীল ও অধিক চিনিসমৃদ্ধ ইক্ষুজাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করেছে। এ জাতগুলো আগাম, মধ্যম ও নাবি পরিপক্ব; প্রতিকূল পরিবেশ সহ্যক্ষম, মুড়িচাষ এবং গুড় উৎপাদন উপযোগী।
সুগারবিট, তাল ও স্টিভিয়ার জাত নিবন্ধন : সুগারবিটের ২টি, তালের ১টি এবং স্টিভিয়ার ১টি জাত নিবন্ধিত হয়েছে।
রোপা ইক্ষু চাষ পদ্ধতি প্রবর্তন : রোপা ইক্ষু চাষে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় মাত্র ৪০% বীজ ইক্ষুর প্রয়োজন হয়; মাড়াইযোগ্য ইক্ষুর সংখ্যা ও ওজন বৃদ্ধি হয়; প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এতে বীজ বর্ধন অনুপাত বৃদ্ধি পায় (১:৩০)। চারা উৎপাদনে মহিলা ও প্রতিবন্ধী (ফরংধনষব) দের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সাথীফসল চাষ : ইক্ষুর সাথে পর্যায়ক্রমিক এক বা একাধিক সাথীফসল আলু, পিয়াজ, রসুন, ডাল, তেল, মসলা ও বিভিন্ন প্রকার শীতকালীন সবজি চাষ করে শুধু ইক্ষু চাষের চেয়ে ১০০-৩০০% আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।
আগাম ইক্ষুচাষ : সুপারিশকৃত শস্যপর্যায় এবং ধানের সাথে রিলে পদ্ধতি অবলম্বন করে আগাম উচ্চফলনশীল ও অধিক চিনিযুক্ত ইক্ষুজাত চাষ নিশ্চিত করে ইক্ষুর ফলন বৃদ্ধির সাথে সাথে চিনি ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।
উন্নত পদ্ধতিতে মুড়ি ইক্ষু চাষ ব্যবস্থাপনা : এ প্রযুক্তি প্যাকেজটি ০.৫-১.০ ইউনিট অধিক চিনি আহরণ নিশ্চিত করে। তাছাড়াও মুড়ি ইক্ষু চাষে বীজ প্রয়োজন হয়না; জমি তৈরি ও রোপণ খরচ কম এবং মূল আখের চেয়ে তাড়াতাড়ি পরিপক্ব হয় বলে চিনিকলসমূহ আগাম চালু করা সম্ভব হয়।
কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা : জমি নির্বাচন ও প্রস্তুতি, বীজ ইক্ষু নির্বাচন, বপনের সময়, বপন পদ্ধতি, একক জমিতে উপযুক্ত সংখ্যক ইক্ষু, সেচ ও নিষ্কাশন, আন্তঃপরিচর্যা, আগাছা ব্যবস্থাপনা, কর্তন কৌশল ইত্যাদি প্রযুক্তি যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ইক্ষুর ফলন প্রায় ৪০% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। দেশে ইক্ষু চাষ হয় এমন ১২টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চল এর জন্য ইক্ষু, সাথীফসল ও মুড়ি ইক্ষুর সারের মাত্রা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সুপারিশ ও সময়োপযোগী করা হয়েছে যা যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ইক্ষুর ফলন প্রায় ৩০% বৃদ্ধি করা সম্ভব। ইক্ষুর ৪০টি রোগ ও ৭০টি পোকা শনাক্ত করা হয়েছে। রোগ ও পোকা দমনের মাধ্যমে ইক্ষুর ফলন প্রায় ১০-৪০% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। ইক্ষু মাড়াইকল উন্নয়নের মাধ্যমে অধিক রস আহরণ করে গুড় উৎপাদন খরচ যথেষ্ট কমানো সম্ভব হয়েছে। বিএসআরআই উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ কৃষকপর্যায়ে সঠিকভাবে সম্প্রসারণের মধ্যমে ইক্ষুর ফলন প্রায় ১০০% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। রোগমুক্ত, বিশুদ্ধ মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন (ঈষবধহ ংববফ) ও বিতরণ কর্মসূচি জোরদারকরণ করা হয়েছে। নন মিলজোনের আওতায় পাহাড়, চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল এবং পতিত জমিতে (জমির আইল, রাস্তার দুইধার, পুকুর, খালের পাড় ইত্যাদি) মিষ্টিজাতীয় ফসল চাষাবাদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মিল ও মিল বহির্ভূত এলাকায় মিষ্টিজাতীয় ফসল উৎপাদন, ক্রয় ও প্রক্রিয়াকরণ, পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনায় গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী, চিনিকল ব্যবস্থাপক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
বিএসআরআই এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কৃষিতাত্ত্বিক : সুগারবিট, তাল, খেজুর, গোলপাতা, স্টেভিয়া ও অন্যান্য অপ্রচলিত মিষ্টি জাতীয় ফসলের উপর গবেষণা কার্যক্রম জোরদারকরণ; গবেষণার জমি এবং কৃষকের জমিতে ফলন পার্থক্য হ্রাসকরণ; চাষিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ফলিত গবেষণা, সরেজমিন গবেষণা, খামার বিন্যাস গবেষণা এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ গবেষণায় অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা; গুড় উৎপাদনশীল এলাকায় ইক্ষু উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ; অধিক ফলন ও অধিক চিনি আহরণের জন্য মুড়ি ইক্ষু ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি প্যাকেজের উন্নয়ন করা।
জৈব প্রযুক্তি সংক্রান্ত : বায়োটেকনোলজি ভিত্তিক ইক্ষু, সুগারবিট, খেজুর, তাল, গোলপাতা, স্টেভিয়া প্রভৃতি সুগারক্রপের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ; উচ্চফলন ও উৎপাদন সহায়ক জিএম ক্রপ উদ্ভাবনের জন্য জৈব-প্রযুক্তির শক্তি বৃদ্ধিকরণ; সকল ফসলের বিটি (ব্যসিলাস থুরিয়েনজেনসিস) জাত প্রবর্তন; ইক্ষু, সুগারবিট, খেজুর, তাল, গোলপাতা প্রভৃতি সুগারক্রপের মাইক্রোপ্রোপাগেশন এর মাধ্যমে উন্নত বীজ উদ্ভাবন; রোগ প্রতিরোধী গুণাবলী বা উপকরণসমূহকে ডিএনএ পুনর্গঠন প্রযুক্তির মাধ্যমে (এগ্রোব্যাকটেরিয়ামের মাধ্যমে স্থানান্তর) ঈপ্সিত জাতে প্রতিস্থাপন করা; জৈব-প্রযুক্তি ব্যবহার করে বায়োটিক এবং এ্যাবায়োটিক প্রতিকূলতা সহ্যক্ষম চিনিফসলের জাত উদ্ভাবন। অতি উন্নত/কুলীণ ইক্ষুজাতসমূহের মাইক্রোপ্রোপাগেশনের মাধ্যমে দ্রুত বীজ বর্ধন; স্টিভিয়ার মাইক্রোপ্রোপাগেশন করা।
প্রজনন সংক্রান্ত : উচ্চফলনশীল, উচ্চ চিনিসমৃদ্ধ, দ্রুত বর্ধনশীল, লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু পরিপক্ব পাতা ঝরে পড়া ও নেতিয়ে না পড়ার গুণসমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখে খর্ব আকৃতির স্বল্পমেয়াদি বিশেষ ধরণের ইক্ষুজাত উদ্ভাবন করা; ইক্ষুর জার্মপ্লাজম ব্যাংক শক্তিশালীকরণ; গুড় উৎপাদন ও চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী আরও উন্নতমানের ইক্ষুজাত উদ্ভাবন করা।
রোগতাত্ত্বিক : ইক্ষুর রোগসমূহের জৈবিক দমন। প্রধান প্রধান রোগ সৃষ্টিকারী প্যাথোজেনসমূহের শত্রু অনুউদ্ভিদ গরপৎড়ভষড়ৎধ সমূহ শনাক্তকরণ। ডিএনএভিত্তিক প্রটোকল প্রয়োগের মাধ্যমে ইক্ষুর রোগসমূহের তালিকা (ওহফবীরহম) প্রণয়ন; আখের রোগমুক্ত পরিচ্ছন্ন বীজ উৎপাদন ও বিতরণ করা।
কীটতাত্ত্বিক : সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নয়ন।
সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি ও চিনি রসায়ন সংক্রান্ত: স্বাস্থ্যসম্মত গুড় উৎপাদনের জন্য পরিষ্কারক হিসেবে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য হাইড্রোজের পরিবর্তে ভেষজ সংশ্লেষ ব্যবহার। সুবিধাজনক ভেষজ পরিষ্কারক বাছাই করে তার উন্নয়ন; ইক্ষুর ছোবড়াসহ অন্যান্য উপজাতের ব্যবহার বহুমুখীকরণ; সুগারক্রপসমূহের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
অন্যান্য : সুগারক্রপসমূহের বাজারকাঠামো বিশ্লেষণ সংক্রান্ত গবেষণা জোরদারকরণ; পরীক্ষিত প্রযুক্তিসমূহের বিস্তার জোরদারকরণ; প্রযুক্তি প্যাকেজের ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ; কৃষি যান্ত্রিকীকরণের গতি বৃদ্ধিকরণ; বিভিন্ন চিনি ফসলের জন্য কৃষিজ যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করা।
লেখক : ১মহাপরিচালক, ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ^রদী, পাবনা। ফোন : ৫৮৮৮৪৬৬২৮, ই-মেইল : ফম-নংৎর@মড়া.নফ
সফল কৃষকের গল্প
মিশ্র ফল বাগান স্থাপনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন
সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ মিস্ত্রি
রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সোনারাম কারবারি পাড়ায় চারিদিকে হ্রদ বেষ্টিত একটি পাহাড়ে নিজের বসতবাড়ির চারপাশে প্রায় ১০ একর পাহাড়ি ঢালু জমিতে সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা গড়ে তুলেছেন পরিকল্পিত মিশ্র ফল বাগান। আম, কাঁঠাল, কুল, লিচু, আমলকী, পেঁপে, তেতুল, মাল্টা, জাম্বুরা, নারিকেল, সুপারি, কলা, লটকোন, রাম্বুটান, বেল, আনারস, চালতাসহ তার এ বাগানে রয়েছে প্রায় ২৫/৩০ প্রজাতির ফল গাছ। ফল গাছের পাশাপাশি শতাধিক দারুচিনি ও গোলমরিচের চারাও লাগিয়েছেন তার বাগানে। তাছাড়া ফল বাগানের মধ্যবর্তী স্থানে বিভিন্ন মৌসুমি ফসল যেমন- শাকসবজি, বিলাতি ধনিয়া, ক্যাসাভা ইত্যাদি থেকেও আসে বাড়তি আয়।
সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা জানান ২০১৬ সালে পরিকল্পিত ফল বাগান স্থাপনের পূর্বে একপ্রকার বেকারই ছিলেন তিনি। অপরিকল্পিত জুম চাষ আর কাপ্তাই লেকে মাছ ধরে কোনরকমে সংসার চালাতেন তিনি। কিন্তু কৃষি বিভাগের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং উপকরণ সহায়তা পেয়ে আজ তিনি একজন সচ্ছল কৃষক, সফল কৃষি উদ্যোক্তা এবং এলাকায় অনুসরণীয় আদর্শ। বাগানের ফসলের উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে গত বছরে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা নীট লাভ পেয়েছেন। আগামীতে লাভের পরিমান প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এমনটাই আশা করছেন সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা।
সরেজমিন তার মিশ্র ফল বাগান পরিদর্শন করে দেখা যায় উঁচু পাহাড়ে বসতঘর তৈরি করে তার চারপাশে গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের মিশ্র ফল বাগান। পুরো বাড়ির আঙ্গিনার চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ রয়েছে। বর্তমানে তার মিশ্র ফল বাগানের কুল গাছে প্রচুর ফল ধরেছে এবং তিনি নিয়মিত বাগান থেকে বিক্রিও করছেন। সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন আমার বাগানে বল সুন্দরী, কাশ্মীরি, আপেল জাতের শতাধিক গাছের পাশাপাশি ৩০ টির মতো দেশি মিষ্টি ও টক জাতের কুল গাছ রয়েছে। বর্তমানে পাহাড়ের কৃষকরা ব্যাপক হারে বল সুন্দরী, কাশ্মীরি, আপেল এবং বাউকুল চাষ করার কারণে দেশি কুল বাজারে খুব একটা পাওয়া যায় না। কিন্তু আচারসহ অন্যান্য মুখরোচক খাবার তৈরিতে দেশি কুলের বিকল্প না থাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি দাম দিয়ে ক্রেতারা দেশি কুল কিনে থাকেন। এই সুযোগটাকেই আমি কাজে লাগিয়েছি। দেশি কুলে লাভ বেশি ও রোগবালাই কম হওয়ায় আগামীতে আমার বাগানে দেশি কূলের গাছের সংখ্যা আরো বাড়াবো।˝ এ বাগানের আয়ের আর একটি প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে রেডলেডি জাতের পেঁপে। বাগানের প্রায় ৫০০টি ফলন্ত রেডলেডি জাতের পেঁপে গাছ থেকে ইতিমধ্যে লক্ষাধিক টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা। রেডলেডি পেঁপে সহজে নষ্ট না হওয়ায় দূর-দূরান্তে পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাপারিদের কাছে এই পেঁপের চাহিদা বেশি। এজন্য আগামী বর্ষা মৌসুমে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় আরো ১০০০টি রেডলেডি জাতের পেঁপের চারা লাগানোর পরিকল্পন রয়েছে তার। তার বাগানের লটকোন সম্পর্কে বলেন, পাহাড়ের লাল মাটিতে লটকোন খুব ভালো হচ্ছে। আমার বাগানে ৩০০টির মত গাছ থেকে এবার প্রায় ১ লাখ টাকার লটকোন বিক্রি করেছি। এ ফল চাষে তেমন কোন পরিচর্যা বা খরচ না থাকলেও বেশ ভালো আয় করা যায়।
আমার ফল গাছে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর সার, কম্পোস্ট সার বেশি ব্যবহার করি। আর শুষ্ক মৌসুমে গাছের গোড়ায় খড়, শুকনা আগাছা আবর্জনা দিয়ে জাবড়া দিয়ে দেই। ফলবাগানের ভিতর উচ্চমূল্যের ফসল বিলাতি ধনিয়া চাষে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষক সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা। ছায়া পছন্দকারী বিলাতি ধনিয়া চাষে কৃষকরা সাধারণত আলাদাভাবে মাচা তৈরি করে তার নিচে এককভাবে বিলাতি ধনিয়া চাষ করে, যার ফলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার বাগানের উল্লেখযোগ্য অংশে ফলগাছের নিচের ছায়াময় জমিতে বেশ ভালোভাবেই জন্মাচ্ছে বিলাতি ধনিয়া। মসলা হিসাবে পাতাসহ গাছ বিক্রির পর অবশিষ্ট গাছ থেকে নিজেই বীজ তৈরি করেন তিনি। স্থানীয় বাজারে ১ কেজি বিলাতি ধনিয়ার বীজ মানভেদে ৭০০০ থেকে ৮০০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এ বছর আনুমানিক ২ লক্ষ টাকার বিলাতি ধনিয়া বিক্রি করেছেন বলে জানান সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা।
সুশান্তÍ তঞ্চঙ্গ্যা আরও জানায়, আমার বাগানে নিয়মিত ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করে। আমার এ বাগান গড়ে তোলার পর স্থানীয় অনেক বেকার যুবক কাজের সন্ধান পেয়েছেন। আমার নিজের যেমন আয় বেড়েছে অন্যদিকে পাহাড়ের মানুষও ভেজালমুক্ত, রাসায়নিকমুক্ত ফল ও শাকসবজি পাচ্ছেন। আমি মনে করি এতে মানুষের সেবা করাও যাচ্ছে। চাকরির পেছনে না ছুটে বেকার জীবন কাটানোর চেয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হলে সমাজে বেকার মানুষের সংখ্যা কমে আসবে, প্রত্যন্ত পাহাড়ের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ায় এলাকায় বেশ প্রশংসিতও হচ্ছেন কৃষক সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা। অনেকেই এখন তার মত বাগান গড়ে তোলার কথা ভাবছেন। দেখছেন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন।
এজন্য তারা কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগ থেকে সহায়তা পাওয়ার কথা বলছেন। একই এলাকার শ্যামল চাকমা জানান, সুশান্তের বাগানে বিভিন্ন মৌসুম এলে বাগান পরিচর্যার কাজে নারী-পুরুষ অনেকেই কাজের সুযোগ পান। গ্রামের দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানেও তার ভূমিকা রয়েছে। সব মিলিয়ে সুশান্ত আমাদের গ্রামের একজন সফল মানুষ। রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে স্নাতকে অধ্যয়নরত সোনারাম কারবারি পাড়ার বাসিন্দা জয়মঙ্গল চাকমা বলেন, পড়াশোনার মাঝের অবসর সময়ে তেমন কোন কাজ থাকে না আমার মতো অনেক তরুণদের। অবসর সময়ের জন্য সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার মতো আমিও মিশ্র ফল বাগান গড়ে তোলার কথা ভাবছি। রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবু মো: মনিরুজ্জামান বলেন, কৃষক সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা এলাকার একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি একজন আধুনিক কৃষি জ্ঞানসম্পন্ন কৃষক। কৃষি বিভাগ শুরু থেকেই তাকে বাণিজ্যিক মিশ্র বাগান করার বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। এছাড়া বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা ও সম্প্রসারণ কর্মকা-ে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়। প্রত্যন্ত পাহাড়গুলোতে কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার জন্য তিনি একজন প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার উপপরিচালক কৃষিবিদ তপন কুমার পাল বলেন, রাঙ্গামাটিতে কাপ্তাই লেক বেষ্টিত অনেক ছোট বড় পাহাড় বা টিলা রয়েছে। এসব পাহাড়ে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন বিভিন্ন ফল, কফি, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ, কাজুবাদাম ইত্যাদির পরিকল্পিত বাগান স্থাপনের অনেক সুযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে সদর উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে কৃষক সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার পাহাড়ে বারি মাল্টা-১ জাতের ১৫০টি গাছের প্রদর্শনী বাগান স্থাপন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকেও বিভিন্ন মসলা ফসল চাষে বিভিন্ন উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বাগানে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বিদ্যমান বিভিন্ন ফল গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ের সম্ভাবনাময় ফসল কফির বাগান স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তিনি আরো বলেন বাগানের উৎপাদিত পন্য বাজারজাতকরণে কৃষকদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারীদের সাথে কৃষকদের সংযোগ স্থাপনে কৃষি বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা জানান আমি এ বাগানে ইতিমধ্যে ৫০টি রাম্বুটান গাছ লাগিয়েছি। আশা করছি আগামী ২-৩ বছর পর ফলন পেতে শুরু করব। কাপ্তাই লেকের পানি বেষ্টিত আমার এ পাহাড়ের চারপাশে আরো নারিকেল গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নারিকেলে আয় বেশি আর পাহাড় ক্ষয়রোধেও বেশ ভালো ভূমিক রাখে। ১০ একরের আমার এ বাগানের ফাঁকা স্থানে ড্রাগন,কমলা, পার্সিমন ইত্যাদি নতুন নতুন ফল গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া আমার আরো একটি ৮ একরের পতিত পাহাড়ি টিলা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের উঁচুতে সেচ দেওয়ার জন্য ড্রিপ ইরিগেশন উপকরণ, সোলার সেচ পাম্প, ফসল প্রদর্শনী স্থাপন ইত্যাদি সহায়তা পেলে সেখানেও বাণিজ্যিক মিশ্র ফল বাগান স্থাপন করবেন এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা। সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার মতো এলাকার অনেকেই বিভিন্ন সমস্যার উপর আলোকপাত করে বলেন, এসব প্রত্যন্ত এলাকায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় নিজেদের পন্য বিক্রির জন্য একমাত্র নৌ পথের উপরই ভরসা করতে হয় আমাদের। যার ফলে ন্যায্য বাজারমূল্য থেকে বঞ্চিত হই আমরা। তাছাড়া বাগানের পাহাড়ের উঁচু স্থানগুলোতে কার্যকর সেচব্যবস্থা স্থাপনে সাধারণ কৃষকদের আর্থিক অক্ষমতাও রয়েছে।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং প্রচেষ্টা থাকলে সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে সামনে যে এগিয়ে যাওয়া যায় সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার দৃষ্টান্ত সে বার্তাই দিচ্ছে এলাকার আগ্রহী সকল কৃষকদের মাঝে। এলাকার কৃষকদের সমস্যা সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উপযুক্ত সহায়তা প্রদান করা গেলে অদুর ভবিষ্যতে অনাবাদি পতিত পাহাড়ের প্রচলিত আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের আমূল পরিবর্তন ঘটবে, ঘটবে কৃষি বিপ্লব। এক একটি পাহাড় এক একটি বাণিজ্যিক খামারে পরিণত হবে।
লেখক : আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, রাঙ্গামাটি। মোবাইল : ০১৭১২৮১৬৩৫২, ই-মেইল : ঢ়ৎড়ংবহলরঃড়৭৫৯@ুধযড়ড়.পড়স
জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষি
(১৫ মে- ১৪ জুন)
কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম
জ্যৈষ্ঠ মাস। মজার মজার ফলের পাশাপাশি এসময় ফসলের প্রাপ্তিযোগের কারণে কৃষক-কৃষানি ভাইবোনদের মনপ্রাণ আনন্দরসে ভরপুর থাকে। কৃষিজীবী ভাইবোনেরাই কৃষির অগ্রযাত্রার হাতিয়ার। বর্তমান সরকার এর লক্ষ্য কৃষি সমৃদ্ধিতে কৃষকের পাশে থেকে কৃষকের সাথে থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাবে। আর তাই প্রিয় পাঠক চলুন, এক পলকে জেনে নেই জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষি ভুবনের কাজগুলো।
বোরো ধান
জমির ধান শতকরা ৮০ ভাগ পেকে গেলে ধান সংগ্রহ করে কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। এক্ষেত্রে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে সময়, শ্রম ও অর্থসাশ্রয়ী
শুকনো বীজ ছায়ায় ঠান্ডা করে প্লাস্টিকের ড্রাম, বিস্কুটের টিন, মাটির কলসি এসবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
আউশ ধান
এখনো আউশের বীজ বোনা না হয়ে থাকলে অতিদ্রুত বীজ বপন করতে হবে। চারার বয়স ১২ থেকে ১৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের প্রথম কিস্তি হিসেবে একরপ্রতি ১৮ কেজি ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এর ১৫ দিন পর একই মাত্রায় দ্বিতীয় কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা বাড়াতে জমিতে সার প্রয়োগের সময় ছিপছিপে পানি রাখাসহ জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
আমন ধান
নিচু এলাকায় বোরো ধান কাটার ৭-১০ দিন আগে বোনা আমনের বীজ ছিটিয়ে দিলে বা বোরো ধান কাটার সাথে সাথে আমন ধানের চারা রোপণ করলে বন্যা বা বর্ষার পানি আসার আগেই চারা সতেজ হয়ে ওঠে এবং পানি বাড়ার সাথে সাথে সমান তালে বাড়ে।
চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া ছিটিয়ে দিলে চারা তাড়াতাড়ি বাড়ে, ফলন ভালো হয়।
এ মাসের মধ্যেই রোপা আমনের জন্য বীজতলা তৈরি করতে হবে। এছাড়াও স্বল্প সময়ে, অধিক জায়গায় ধানের চারা নির্দিষ্ট, দূরত্বে, সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যায়, নির্দিষ্ট গভীরতায় লাগানোর জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করা প্রয়োজন। এ যন্ত্র দ্বারা চারা রোপণের জন্য ট্রে অথবা পলিথিন সিটের উপর চারা উৎপাদন করতে হয়। ৩-৪ পাতা বিশিষ্ট ২০-২২ দিন বয়সের চারা এ যন্ত্রের সাহায্যে জমিতে রোপণ করা যায়। জমি উর্বর হলে সাধারণত কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না, তবে অনুর্বর হলে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি জৈবসার মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ৮০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
বীজ বোনার আগে অংকুরিত করে নিলে তাড়াতাড়ি চারা গজায়, এতে পাখি বা অন্য কারণে ক্ষতি কম হয়। ভালো চারা পাওয়ার জন্য বীজতলায় নিয়মিত সেচ দেয়া, অতিরিক্ত পানি নিকাশের ব্যবস্থা করা, আগাছা দমন, সবুজ পাতা ফড়িং ও থ্রিপসের আক্রমণ প্রতিহত করাসহ অন্যান্য কাজগুলো সতর্কতার সাথে করতে হবে।
জ্যৈষ্ঠ মাসে আউশ ও বোনা আমনের জমিতে পামরী পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। পামরী পোকা ও এর কীড়া পাতার সবুজ অংশ খেয়ে গাছের অনেক ক্ষতি করে। আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে হাতজাল, গামছা, লুঙ্গি, মশারি দিয়ে পামরী পোকা ধরে মেরে ফেলে আক্রমণ কমানো যায়। তাছাড়া আক্রান্ত গাছের গোড়া থেকে ৫ সেন্টিমিটার (২ ইঞ্চি) রেখে বাকি অংশ কেটে কীড়া ও পোকা ধ্বংস করা যায়। আক্রমণ যদি বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
পাট
পাটের জমিতে আগাছা পরিষ্কার, ঘন ও দুর্বল চারা তুলে পাতলা করা, সেচ এসব কাজগুলো যথাযথভাবে করতে হবে।
ফাল্গুনি তোষা জাতের জন্য একরপ্রতি ৪০ কেজি ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে রস না থাকলে বা দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে হালকা সেচ দিতে হবে এবং বৃষ্টির কারণে পানি জমে থাকলে তা নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। পাটশাক যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর। তাই নিড়ানির সময় তোলা অতিরিক্ত পাটের চারা ফেলে না দিয়ে শাক হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এ মাসে পাটের বিছাপোকা এবং ঘোড়াপোকা জমিতে আক্রমণ করে থাকে। বিছাপোকা দলবদ্ধভাবে পাতা ও ডগা খায়, ঘোড়াপোকা গাছের কচিপাতা ও ডগা খেয়ে পাটের অনেক ক্ষতি করে থাকে। বিছাপোকা ও ঘোড়াপোকার আক্রমণ রোধ করতে পোকার ডিমের গাদা, পাতার নিচ থেকে পোকা সংগ্রহ করে মেরে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। জমিতে ডালপালা পুঁতে দিলে পোকা খাদক পাখি যেমন- শালিক, ফিঙ্গে এসব পোকা খেয়ে আমাদের দারুণ উপকার করে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিকভাবে, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
তুলা
আগামী আষাঢ়-শ্রাবণ মাস তুলাবীজ বপনের উপযুক্ত সময়। আপনার যদি তুলাচাষ উপযোগী উঁচু জমি থাকে এবং আপনি তুলাচাষে আগ্রহী হোন তাহলে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিকটবর্তী অফিস/ইউনিট অফিস যোগাযোগ করূন।
শাকসবজি
মাঠে বা বসতবাড়ির আঙ্গিনায় গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির পরিচর্যা সতর্কতার সাথে করতে হবে। এ সময় সারের উপরিপ্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, গোড়ায় বা কেলিতে মাটি তুলে দেয়া, লতাজাতীয় সবজির জন্য বাউনি বা মাচার ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।
লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি যত বেশি হবে তার ফুল ফল ধারণক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য বেশি বৃদ্ধি সমৃদ্ধ লতার ১৫-২০ শতাংশের কেটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে।
কুমড়াজাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।
এ মাসে কুমড়াজাতীয় ফসলে মাছি পোকা দারুণভাবে ক্ষতি করে থাকে। এ ক্ষেত্রে জমিতে খুঁটি বসিয়ে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। এ ছাড়া সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করেও এ পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়।
সবজিতে ফল ছিদ্রকারী পোকা, জাবপোকা, বিভিন্ন বিটল পোকা সবুজ পাতা খেয়ে ফেলতে পারে। হাত বাছাই, পোকা ধরার ফাঁদ, ছাই ব্যবহার করে এসব পোকা দমন করা যায়। তা ছাড়া আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলে এবং সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। মাটির জো অবস্থা বুঝে প্রয়োজনে হালকা সেচ দিতে হবে। সে সাথে পানি নিকাশের ব্যবস্থা সতর্কতার সাথে অনুসরণ করতে হবে।
বিবিধ
বাড়ির কাছাকাছি উঁচু এমনকি আধা ছায়াযুক্ত জায়গায় আদা হলুদের চাষ করতে পারেন। মাঠের মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই তুলে ফেলতে হবে। গ্রীষ্মকালীন মুগডালের চাষও এ মাসে করতে পারেন। পতিত বা আধা ছায়াযুক্ত স্থানে অনায়াসে লতিরাজ বা পানিকচু বা অন্যান্য উপযোগী কচুর চাষ করতে পারেন। যারা সবুজ সার করার জন্য ধইঞ্চা বা অন্য গাছ লাগিয়ে ছিলেন, তাদের চারার বয়স ৩৫-৪৫ দিন হলে চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। সবুজ সার মাটিতে মেশানোর ৭-১০ দিন পরই ধান বা অন্যান্য চারা রোপণ করতে পারবেন।
গাছপালা
আগামী মাসে চারা লাগানোর জন্য জায়গা নির্বাচন, গর্ত তৈরি ও গর্ত প্রস্তুতি, সারের প্রাথমিক প্রয়োগ, চারা নির্বাচন এ কাজগুলো এ মাসেই শেষ করে ফেলতে হবে।
উপযুক্ত মাতৃগাছ থেকে ভালোবীজ সংগ্রহ করে নারকেল, সুপারির বীজ বীজতলায় এখন লাগাতে পারেন।
প্রাণিসম্পদ
এ সময়ে প্রাণিচিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে হাঁস- মুরগির ভ্যাকসিন দিতে হবে। এ ছাড়া হাঁস- মুরগির কৃমির জন্য ওষুধ খাওয়ানো, ককসিডিয়া রোগ হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জরুরিভাবে অন্যান্য প্রতিষেধক টিকা দিয়ে দিতে হবে। মুরগি ও হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর কাজটি ভরা বর্ষার আগেই সেরে ফেলতে হবে। বর্ষার নিয়মিত এবং পরিমিত গো-খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হবে। গবাদিপশুর গলাফোলা, ডায়রিয়া, ক্ষুরারোগ, নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য রোগের ব্যাপারে টিকা দেয়াসহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
মাছ প্রজননে আগ্রহী চাষিভাইদের স্ত্রী-পুরুষ মাছ (ব্রুড ফিশ), পিটুইটারি গ্রন্থি, হাপা এবং ইনজেকশনের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত রাখতে হবে।
আঁতুড় পুকুর বন্যায় ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে পাড় উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে। আঁতুড় পুকুরে পোনার আকার ১ ইঞ্চি হলে সাবধানে ধরে চারা পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
নিয়মিত তদারকি, রাক্ষুসে মাছ তোলা, আগাছা বা জংলা পরিষ্কার, খাবার দেয়া, সার দেয়া, সম্পূরক খাবার দেয়া, জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এসব প্রাসঙ্গিক কাজগুলো নিয়মিত করতে হবে। এ ছাড়া যে কোনো সমস্যায় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের কল্যাণে ও সফলতার জন্য আমরা এক মাস আগেই আগামী মাসের কৃষির করণীয় দিকগুলো স্মরণ করিয়ে দেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিলে আরও বেশি লাভবান হবেন। য়
লেখক : সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। টেলিফোন:০২৫৫০২৮৪০৪, ইমেইল : editor@ais.gov.bd