কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ধান উৎপাদনে বোরো আবাদে করণীয়

ড. মো. শাহজাহান কবীর১ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন২

ধান উৎপাদনে বোরো মওসুম সর্বাধিক উৎপাদনশীল। একথা অনস্বীকার্য বোরোর ওপর ভিত্তি করেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি রচিত হয়েছে। দেশের মোট উৎপাদনের ৫৮ ভাগ আসে এ মওসুম থেকে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫ থেকে ২.০ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভুমিকা রাখতে পারে। স্বাধীনতার পর পরই সদ্য স্বাধীন দেশের ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক আমদানির মাধ্যমে এবং স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করেন এবং কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘একটা স্বল্প সম্পদের দেশে কৃষি খাতে অনবরত উৎপাদন হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে না। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির সব প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষিদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্য প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।’ তিনি কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন, উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি-অবকাঠামো পুনর্নিমাণ ও কৃষি-যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে ৪০ হাজারটি শক্তিচালিত লো-লিফট পাম্প, ২৯০০টি গভীর নলকূপ ও ৩০০০টি অগভীর নলক‚প স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশে বোরো আবাদ বাড়ানোর ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এক সময় দেশের বোরোর আবাদ কম হলেও সেচব্যবস্থা প্রবর্তনের সাথে সাথে আবাদ বাড়তে থাকে। এর সাথে যোগ হতে থাকে অব্যাহতভাবে ফলন বৃদ্ধির নতুন নতুন উন্নতর জাত। ফলশ্রুতিতে উৎপাদনের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকা বোরো ক্রমে প্রথম অবস্থানে উঠে আসে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরো সুদৃঢ় করেছে এবং করছে।


বোরো ধান নিয়ে এক ধরনের প্রচারণা আছে যে, এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ৩০০০-৫০০০ লিটার পানি লাগে। কিন্তু ব্রি ও অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কর্তৃক এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সেচের পানির হিসেবে কৃষকপর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদন করতে ১২০০-১৫০০ লিটার পানি লাগে। অপচয় বাদ দিয়ে শুধু ধানের উৎপাদনে প্রকৃত পানির খরচ হিসাব করলে প্রতি কেজি ধান উৎপাদন করতে ৫৫০-৬৫০ লিটার পানিই যথেষ্ট। বোরো আবাদ বাড়ানোর জন্য এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা, বিপরীতে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে এবং পাশাপাশি বোরো চাষে পানির অপচয় রোধে কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।


আরেকটি নেতিবাচক প্রচারণা আছে, বোরো চাষে কৃষকের লোকসান হয় কিন্তু ২০০১-২০১৯ পর্যন্ত গত ১৯ বছরের বোরো ধান চাষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষকরা বোরো ধান চাষ করে প্রতি বছর হেক্টরপ্রতি গড়ে ৫০২ টাকা হারে লাভ করছেন। যদিও কোন কোন বছরে লাভের তারতম্য আছে, কিন্তু কৃষকরা সাধারণত বোরো ধান অর্থকরী ফসল (Cash Crop) হিসেবে চাষ করেন। যা তারা প্রয়োজনমাফিক বিক্রি করে দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। কৃষকদের আয়ের একটি বড় অংশ বোরো ধান থেকে আসে। যদি বোরো ধান চাষ না করা হয় তাহলে কৃষকের আয় অনেকাংশে কমে যাবে এবং তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বোরো ধান চাষ অত্যন্ত জরুরি।


এ বছর অতি বৃষ্টিতে ছয় দফা বন্যায় ৩৫টি জেলার আমন ধানের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দেশে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কার নেই বরং সারাবছরের উৎপাদন বিবেচনা করলে আগামী জুন পর্যন্ত দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে প্রায় ৩০ লক্ষ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এ বিষয়ে গত এক মাস ধরে দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলে কৃষক, সম্প্রসারণ কর্মী, এনজিও, মিলার ও ভোক্তাপর্যায়ে জরিপ করে এই তথ্য পেয়েছে ব্রি। এই প্রথম উৎপাদন নির্ণয়ের জন্য স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে ফলন ও উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সুতরাং সারা দেশে চালের উৎপাদন কম এবং খাদ্য ঘাটতি হওয়ার আশংকার কথা যেভাবে ফলাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে তা আদৌ ঠিক নয়।


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীকে বোরোর উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন এবং বোরোর চাষযোগ্য কোনো জমি যাতে খালি না থাকে সে ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহ দেয়ার কথা বলেছেন। বোরোর উৎপাদন ও উৎপাদন শীলতা বাড়াতে মাঠ থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সব কর্মকর্তাকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহŸান জানিয়ে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, “যে করেই হোক চলতি বোরোর যে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তা অর্জন করতে হবে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষকের পাশে থাকতে হবে। এমনিতেই এ বছর ধানের ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরা খুশি ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় আছে। অন্যদিকে আমরা কৃষকদের যে বোরো ধানের উন্নত বীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যে প্রণোদনা দিচ্ছি তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে”।


এরই প্রেক্ষিতে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন আগামী মওসুমে বোরো ধানের আবাদ ৫০ হাজার হেক্টর বাড়ানো হবে। এ ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যাতে চাষযোগ্য কোনো জমি খালি না থাকে। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সে ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহ দিতে বলা হয়েছে। সরকার কৃষকদের বোরো ধানের উন্নত বীজ সরবরাহ করছে। সার, সেচসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রণোদনা দিচ্ছে। তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বোরো উৎপাদন নির্বিঘ্ন করার জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বোরো আবাদে সঠিকজাত নির্বাচন, কৃষিতাত্তি¡ক ও সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও সেচজনিত প্রতিবন্ধকতাসমূহ এবং সম্ভাব্য প্রতিকার ব্যবস্থা বিষয়ে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ও কৃষক প্রতিনিধিদের নিয়ে ব্রি ইতোমধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, ফরিদপুর, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া এবং রাজশাহী অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ১২টি অঞ্চলিক কর্মশালা সম্পন্ন করেছে।


দক্ষিণাঞ্চলের অনাবাদি জমির প্রায় ৩০%। গত তিন বছরে পর্যায়ক্রমে চাষের আওতায় এসেছে। এ বছর আরও এলাকা আবাদের আওতায় আনার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বোরো মওসুমে ৪৭ লাখ ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। চলতি বোরো মওসুমে গত বছরের চেয়ে ৫০ হাজার হেক্টর জমি বাড়িয়ে ৪৮ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অঞ্চল হিসেবে সিলেটে, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্য অর্জনে হাইব্রিড চাষও বাড়ানো হচ্ছে। গত বছর ৯ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রীড ধান চাষ হয়েছিল। এবার ১১ লাখ হেক্টরে হবে হাইব্রীড ধানের চাষ। এ বছর দুই লাখ হেক্টরে বাড়তি হাইব্রিড জাতের ধান চাষের জন্য ১৫ লাখ কৃষককে মাথাপিছু এক বিঘা জমির জন্য দুই কেজি করে বীজ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এবার বোরো মওসুমে হাইব্রিডসহ দুই কোটি ছয় লাখ টন চাল উৎপাদন হবে। যা গত বছরের তুলনায় ৫ লক্ষ টন বেশি।


আমাদের দেশের কৃষকরা বোরো আবাদে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তার সম্মুখিন হন। ফলে অনেক সময় কাক্সিক্ষত ফলন পান না। তাই ফলন বাড়াতে এলাকা, মওসুম, জমির ধরন অনুসারে লাগসই জাত নির্বাচন করা জরুরি। ভালো বীজে ভালো ফলন, ভালোবীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ২০% পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।


জাত নির্বাচনে সতর্কতা
বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমি ৩০টি বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে বিভক্ত। ধান এমন একটা ফসল যা দেশের প্রায় সকল পরিবেশ অঞ্চলে চাষাবাদ করা গেলেও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভেদে এর অভিযোজনশীলতায় কিছুটা তারতম্য রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকরা অনেক সময় এলাকাভিত্তি সঠিক জাত নির্ধারণ করতে পারেন না। যেমন- কোন জমিতে ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন জাত ভালো হবে কিন্তু না জানার কারণে সেখানে কৃষকরা ১৫০ দিনের বেশি জীবনকাল সম্পন্ন জাত নির্বাচন করেন। বোরো ধানের দীর্ঘমেয়াদি (>১৫০ দিন) জাতসমূহ হচ্ছে - ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২। স্বল্পমেয়াদি (<১৫০ দিন) জাতের মধ্যে রয়েছে - ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রিহাইব্রিড ধান৩ এবং ব্রিহাইব্রিড ধান৫। প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাতগুলো হচ্ছে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৮১ এবং উচ্চ মাত্রার জিংক (>২৪ পিপিএম) সমৃদ্ধ জাতসমূহ হচ্ছে- ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪। কৃষি ইকোসিস্টেম ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সঠিকজাত নির্বাচন করতে হবে।


কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা
আদর্শ বীজতলায় চারা তৈরি : অনেক সময় কৃষকরা আদর্শ বীজতলায় চারা করতে চায় না। অনুর্বর জমিতে এবং গাছের ছায়ায় বীজতলা করেন কৃষকরা এবং ফলে চারার গুণগত মান খারাপ হয় এবং পরবর্তীতে  ঐ চারা হতে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায় না। আদর্শ বীজতলা হতে সুস্থ সবল চারা হবে এবং কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাবে এবং বীজের সঠিক হার বজায় থাকে এবং বীজ সাশ্রয় হয়।


সঠিক বয়সের চারা ব্যবহার : কৃষকরা নানান কারণে (সময় মতো সেচের পানি না পাওয়ায়) বেশি বয়সের চারা মাঠে রোপণ করে, ফলে বেশি বয়সের চারা হতে বেশি কুশি হয় না এবং পরবর্তীতে ফলন কমে যায়। বোরো মওসুমে অবশ্যই ৩৫-৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। সঠিক বয়সের চারা রোপণ করলে সর্বোচ্চ কুশির সংখ্যা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব। সাধারণত ১৫ ডিসেম্বর হতে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। এর পরে রোপণ করলে প্রতিদিনের জন্য ফলন কম হবে।
 

সুষমমাত্রায় সার প্রয়োগ : গাছের বাড়-বাড়তির এবং পর্যাপ্ত কুশি উৎপাদনের জন্য সুষম সার প্রয়োগ করা খুবই জরুরি। কৃষকদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় জমির উর্বরতা বিবেচনা করে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।


ইউরিয়া সার ব্যবহারে সতর্কতা : চারা লাগানোর ৭-১০ দিনের ভেতর একবার এবং ফুল আসার আগে আরেকবার উপরিপ্রয়োগ করেন। কিন্তু কুশি আসা ও কুশি উৎপাদনের সময় সার প্রয়োগ করে না। ফলে কুশির সংখ্যা কমে গিয়ে ফলন কমে যায়। আবার অনেক সময় কাইচ থোড় আসার ৫-১০ দিন আগে যে ইউরিয়া সার দিতে হয় তা না জানার জন্য সঠিক সময়ে প্রয়োগ করে না। ঐ সময়ে সার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐ সময় ইউরিয়া সার দিতে না পারলে ধানের ছড়ায় দানার সংখ্যা কমে যায় এবং ফলন কম হয়। সঠিক সময়ে ইউরিয়া/নাইট্রোজেন সার দেওয়ার ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন করে তোলার জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। ক্রান্তিকাল (Critical period) সময়ে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।


সঠিক সময়ে আগাছা দমন : আগাছা সঠিক সময়ে দমন না করলে বোরো মওসুমে প্রায় ৩০-৪০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। বোরো মওসুমে চারা লাগানোর পর দুইবার/তিনবার আগাছা পরিষ্কার করতে হয় বা সঠিক আগাছা নাশক প্রয়োগ করে আগাছা দমন করা যায়। বোরো মওসুমে আগাছা দমনের ক্রান্তিকাল (Critical time) হল ৪৫-৫০ দিন। ঐ সময় পর্যন্ত ধানক্ষেত আগাছা মুক্ত রাখতে পারলে ফসলের ক্ষতি হবে না। কিন্তু অনেক সময় কৃষকরা সঠিক সময়ে আগাছা দমন না করায় আগাছা ধান গাছের সাথে খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা করে ধানের ফলন কমিয়ে দেয়। বোরো মওসুমে চারা লাগানোর অন্তত ৪৫ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে হবে।


জৈবসারের ব্যবহার বাড়ানো : জমিতে জৈবসার তথা ধৈঞ্চা বা গোবর সার বা ফার্ম ইয়ার্ড সার ব্যবহার করলে অন্যান্য অজৈব সার যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সারের কার্যকারিতা বাড়ে; জমির পানি ধারণক্ষমতাও বাড়ে। জমির ভৌত, জৈবিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন এর ফলে পরবর্তীতে ফলন বাড়ে। কিন্তু কৃষকরা প্রায়শই জৈবসারের ব্যবহার করে না। সাধারণত রোপা আমন ধান কাটার পর জমি ১৫-৩০ দিন পতিত থাকে; এসময় ধৈঞ্চা বা অন্যান্য জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া ধান কাটার সময় ২০ সেমি. উচ্চতায় খড় জমিতে রেখে পরবর্তী ফসল চাষের আগে মাটিতে মিশিয়ে দিলে ক্রমান্বয়ে জমিতে জৈবসার ও পটাশের পরিমাণ বাড়ে।


সেচ ব্যবস্থাপনা : দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাবনা, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচ কাজ বিঘœ হচ্ছে। হাওড় এলাকার এপ্রিল-মে মাসে কিছু স্থানে ভূপরিস্থ (ছোটনদী, খাড়ি, নালা ইত্যাদি) পানির অভাবে বোরো ফসলের শেষ পর্যায়ে সেচ প্রদানে সম্ভব না হওয়ায় প্রায়শই ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। উপক‚লীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির জন্য এবং উপক‚লীয় অলবণাক্ত এলাকায় সেচ অবকাঠামোর অভাবে বোরো চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরেন্দ্র এলাকায় সেচসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পানি সাশ্রয়ী শস্যবিন্যাস প্রচলন করতে হবে। স্বল্প ডিস চার্জের গভীর নলক‚পের ব্যবহার করা যেতে পারে। হাওড় এলাকায় বিদ্যমান ছোটনদী, খাড়ি, নালাসমূহ পুনঃখনন করে ভূপরিস্থ পানির মজুদ বৃদ্ধি করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা দিয়ে সম্পূরক সেচ প্রদান করে বোরো উৎপাদন সুনিশ্চিত করা যেতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় সরকারি পর্যায়ে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন।  


অঞ্চলভিত্তিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ ও প্রতিকার
হাওড় অঞ্চল : হাওড় এলাকায় সঠিকজাত নির্বাচন একটি সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঐ এলাকায় যদি আগাম পানির ঢল আসে সেক্ষেত্রে  দীর্ঘ জীবনকাল জাত যেমন ব্রি ধান২৯, বিআর১৭, বিআর১৮ পরিপক্ব অবস্থায় পানিতে তলিয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে  ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬ ইত্যাদি ব্যবহার করে আগাম পানিতে তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে ফসল রক্ষা পেতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক জাত ব্যবহার করলে  হাওড়ে ফসলহানির ঝুঁকি কমবে। সেক্ষেত্রে ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন জাত ১৫-২১ নভে¤¦র পর্যন্ত বীজবপন করতে হবে এবং ৩০-৩৫ দিনের চারা রোপণ করতে হবে। ১৫০ দিনের অধিক জীবনকাল সম্পন্ন জাত ১-৭ নভেম্বর পর্যন্ত বীজ বপন করতে হবে এবং ৩৫-৪৫ দিনের চারা রোপণ করতে হবে।


বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর ঠাণ্ডারপ্রবণ এলাকা : এসব এলাকায় অনেক সময় বীজতলা ঠাণ্ডার প্রকোপে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে চারার গুণগত মান খারাপ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ফলন কমে যায়। এ এলাকায় বেশির ভাগ কৃষকরা বোরো ধানের আগে আলু চাষ করে, যলে বোরো চাষে দেরি হয়ে যায়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বা তার পর তারা বোরো ধান রোপণ করে। এ সময় তাদের বীজতলায় চারার বয়স বেড়ে যায় ফলে ফলনে প্রভাব পড়ে। বীজতলায় ৩-৫ সেমি. পানি ধরে রাখতে হবে এবং স¦চ্ছ পলিথিন সিট দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখতে হবে। দিনের বেলায় বেলা ১০.০০-১১.০০টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখলে ঢাকা অংশের ভেতরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, ফলে গুণগতমান সম্পন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব হয়। শৈত্যপ্রবাহের সময় স্বচ্ছপলিথিন দিয়ে দিন ও রাত উভয় সময় বীজতলা ঢেকে রাখতে হবে, তবে রাতে পলিথিনের কিছুটা অংশ খোলা রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে চারার উপর জমাকৃত শিশির ঝরিয়ে দিতে হবে। বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে পুনরায় নতুন পানি দিতে হবে, তবে এক্ষেত্রে টিউবওয়েলের পানি দিলে ভালো হয়।


দক্ষিণাঞ্চল বা লবণাক্ততা এলাকা : লবণাক্ততা এলাকায় কৃষকরা অনেক সময় স্থানীয় জাত চাষ করে। সেক্ষেত্রে  লবণাক্ততা সহিষ্ণু  ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯, বিনা ধান৮ ও বিনা ধান১০ চাষ করতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলে সাধারণত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ হতে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে আগাম বীজতলায় বীজ ফেলে আগাম রোপণ করলে কুশি আসার সময় (মার্চ-এপ্রিল) লবণাক্ততাজনিত ক্ষতি থেকে ধানকে রক্ষা সম্ভব। ১৫ নভেম্বর বপন ও  ২৫ ডিসেম্বর রোপণ করতে হবে। লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতসমূহ চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। য়

১মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ২ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১৬৫৪০৩৮০, ই-মেইল : smmomin80@gmail.com

বিস্তারিত
নিরাপদ সবজির চারা উৎপাদন প্রযুক্তি

ড. বাহাউদ্দিন আহমেদ

চারা উৎপাদন করে যে সব সবজি চাষ করা হয় তার মধ্যে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, ব্রকলি, বেগুন, টমেটো, ক্যাপসিকাম, লাউ ও মিষ্টিকুমড়া উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে আগাম শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালীন সময়ে সবজি চাষের জন্য চারা উৎপাদন ক্রমে প্রসার লাভ করছে। উৎকৃষ্ট ও নিরাপদ সবজির চারা উৎপাদনের জন্য প্রচুর দক্ষতা  এবং নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত।
 

বীজতলার স্থান নির্ধারণ
বীজতলার জমি অপেক্ষাকৃত উচু হওয়া উচিত যাতে বৃষ্টির বা বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়। ছায়াবিহীন, পরিষ্কার এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী স্থানে বীজতলা করা প্রয়োজন। পানির উৎসের কাছাকাছি বাড়ি, খামার বা অফিসের কাছাকাছি হওয়া উচিত। বীজতলার মাটি বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ এবং উর্বর হওয়া ভালো। বেলেমাটি বেশি হলে কাদামাটি, গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে অথবা অতিরিক্ত কাদামাটি হলে বালু, কম্পোস্ট বা গোবর মিশিয়ে মাটির জল ধারণ ও নিষ্কাশনের উপযোগী করে বীজতলার মাটি উন্নত করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করতে হলে বীজতলা যতদূর সম্ভব ক্রেতাদের কাছাকাছি এবং ভালো যোগাযোগ সম্পন্ন স্থানে স্থাপন করা উচিত।

 

বীজতলা তৈরি
একক বীজতলা বা হাপোর সাধারণত এক মিটার চওড়া ও তিন মিটার লম্বা হবে। জমির অবস্থা ভেদে দৈর্ঘ্য বাড়ানো কমানো যেতে পারে। প্রয়োজনে বড় জমিকে ভাগ করে এভাবে একাধিক বীজতলা তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি দুটি বীজতলার মধ্যে কমপক্ষে ৬০ সেন্টিমিটার ফাঁকা রাখতে হবে। বীজ বপনের কয়েক দিন আগে বীজতলার মাটি ২০-২৫ সেন্টিমিটার গভীর করে ঝুরঝুরা ও ঢেলা মুক্ত করে তৈরি করতে হবে। বীজতলা সাধারণত ১০-১৫ সেন্টিমিটার উঁচু করে তৈরি করতে হবে। মাটি, বালু ও পচা গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেয়াই ভালো। উর্বরতা কম হলে প্রতি  ১০০ গ্রাম টিএসপি সার মিশাতে হবে বীজ বপনের এক সপ্তাহ আগে। যারা বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করেন তাদের জন্য ইট-সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ী বীজতলা তৈরিই শ্রেয়।

 

বীজতলার মাটি শোধন
বীজ বপনের পূর্বে বীজতলার মাটি বিভিন্ন পদ্ধতিতে শোধন করা যায়। এতে অনেক মাটিবাহিত রোগ, পোকামাকড় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়। যেমন- সৌরতাপ ব্যবহার করে (কালো পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে); জলীয় বাষ্প ব্যবহার করে; ধোঁয়া ব্যবহার করে; রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ফরমালডিহাইড ব্যবহার করে; কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে; পোলট্রি রিফিউজ ব্যবহার করে।


উল্লেখিত বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে সবচাইতে সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি হলো সৌরতাপ ব্যবহার করে বীজতলার মাটি শোধন করা। এক্ষেত্রে বীজ বপনের ১২-১৫ দিন পূর্বে বীজতলার  মাটি যথাযথভাবে তৈরি করে ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরে পলিথিন দিয়ে বায়ু নিরোধক করে ঢেকে রাখতে হবে। এতে সারা দিনের সূর্যালোকে পলিথিনের ভেতরে বীজতলার মাটির তাপমাত্রা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে ও অনেকাংশে মাটিবাহিত রোগজীবাণু দমন করবে। এছাড়াও অনেক ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও আগাছা দমন হয়। বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সবজি চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে বীজতলায় রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ফরমালডিহাইড পানিতে মিশিয়ে (৫০: ১) ব্যবহার করা হয়। পোলট্রি রিফিউজ ব্যবহার করেও বীজতলায় মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধির সাথে সাথে আংশিকভাবে বীজতলার মাটি শোধনের প্রক্রিয়া বর্তমানে দেশের অনেক সবজি উৎপাদন এলাকায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 

বীজ শোধন
বীজতলায় বপনের পূর্বে সবজি বীজ কয়েকটি পদ্ধতিতে শোধন করা যায়। এগুলোর মধ্যে গুঁড়ো রাসায়নিক ওষুধ দ্বারা বীজ শোধন পদ্ধতি বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত ও কম ঝামেলা পূর্ণ। প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম প্রোভ্যাক্স-২০০ বা ক্যাপটান ব্যবহার করে বীজ শোধন করা যায়। বীজ শোধনের ফলে বিভিন্ন সবজির অ্যানথ্রাকনোজ, লিফস্পট, বøাইট ইত্যাদি রোগ ও বপন পরবর্তী সংক্রমণ রোধ সম্ভব হয়। বীজ শোধনকারী রাসায়নিক দ্রব্যাদি বিষাক্ত বিধায় শোধিত বীজ, শোধন সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

বীজ পরীক্ষাকরণ
শাকসবজির বীজ বপনের পূর্বে ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেয়া প্রয়োজন। ভালো ও বিশুদ্ধ বীজের অভাবে, নির্দিষ্ট জাতের গুণাগুণ সম্পন্ন সবজির উচ্চফলন আশা করা যায় না। বীজের উৎকৃষ্টতা নির্ভর করে তার অঙ্কুরোদগম ক্ষমতার ওপর।  অঙ্কুরোদগমের হার বের করার জন্য পেট্রিডিশ বা ছোট থালা নিয়ে তার ওপর ঐ মাপের চোষ কাগজ পানি দিয়ে ভিজিয়ে ৫০-১০০টি বীজ সবজিভেদে কয়েক দিন রেখে অঙ্কুরোদগমের শতকরা হার বের করে নিতে হবে। বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরোদগমের শতকরা সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য হার বিভিন্ন সবজির জন্য বিভিন্ন রকম (টেবিল দ্রষ্টব্য)। তাহলে মূল্যবান বীজের সঠিক পরিমাণ, চারার সংখ্যা ইত্যাদি নির্ধারণ করা সহজ হবে।

 

বীজ বপন
বীজতলায় সারি করে বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা যায়, তবে সারিতে বপন করা উত্তম। সারিতে বপনের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট দূরত্বে (৪ সেমি.) কাঠি বা টাইন দিয়ে ক্ষুদ্র নালা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ছোট বীজের বেলায় বীজের দ্বিগুণ পরিমাণ শুকনো ও পরিষ্কার বালু বা মিহি মাটি বীজের সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে মাটিতে বীজ বপন করতে হয়। শুকনা মাটিতে বীজ বপন করে সেচ দেয়া উচিত নয়, এতে মাটিতে চটা বেঁধে চারা গজাতে ও বাতাস চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সেচ দেয়া মাটির জো অবস্থা এলে বীজ বপন করতে হয়। যে সমস্ত বীজের আবরণ শক্ত, সহজে পানি প্রবেশ করেনা, সেগুলোকে সাধারণত বোনার আগে পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা অথবা শতকরা এক ভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে এক রাত ভিজিয়ে বপন করতে হয় (যেমন লাউ, চিচিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, করলা, উচ্ছে ও ঝিঙা)।

 

চারা উৎপাদনের বিকল্প পদ্ধতি
প্রতিক‚ল আবহাওয়ায় বীজতলায় চারা উৎপাদনের জন্য বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে সবজির চারা কাঠের বা প্লাস্টিকের ট্রে, পলিথিনের ব্যাগে, মাটির টবে, গামলায়, থালায়, কলার খোলে উৎপাদন করা যায়। কোন কোন সময় কুমড়া, শিম জাতীয় সবজির চারা রোপণ করার প্রয়োজন দেখা যায় । কিন্তু এসব সবজি রোপণজনিত আঘাত সহজে কাটিয়ে উঠতে পারে না। ছোট আকারের পলিথিনের ব্যাগে বা উপরে উল্লিখিত অন্যান্য মাধ্যমে এদের চারা উৎপাদন করা উচিত যাতে শেকড় ও মাটিসহ চারা রোপণ করা যায়। বীজ বপনের ১৫-২০ দিনের মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে।

 

বীজতলায় আচ্ছাদন
আবহাওয়া এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে বীজতলার উপরে আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে হবে যেন বৃষ্টির পানি ও অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে বীজতলাকে রক্ষা করা যায়। আচ্ছাদন বিভিন্নভাবে করা যায়। তবে কম খরচে বাঁশের ফালি করে বীজতলার প্রস্থ বরাবর ৫০ সেমি. পরপর পুঁতে নৌকার ছৈ এর আকারে বৃষ্টির সময় পলিথিন দিয়ে এবং  প্রখর রোদে চাটাই দিয়ে চারা রক্ষা করা যায়।

 

চারার যত্ন
চারা গজানোর পর থেকে ১০-১২ দিন পর্যন্ত হালকা ছায়া দ্বারা অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে চারা রক্ষা করা প্রয়োজন। পানি সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচর্যা তবে বীজতলার মাটি দীর্ঘ সময় বেশি ভেজা থাকলে অঙ্কুরিত চারার রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। চারার শেকড় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেলে রোদ কোন ক্ষতি করতে পারে না, তখন এটি বরং উপকারী। চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর বীজতলায় প্রয়োজন মতো দূরত্ব ও পরিমাণে চারা রেখে অতিরিক্ত চারাগুলো যত্ন সহকারে উঠিয়ে দ্বিতীয় বীজতলায় সারি করে রোপণ করলে মূল্যবান বীজের সাশ্রয় হবে।


দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ
জমিতে চারা লাগানোর পূর্বে মূল বীজতলা থেকে তুলে দ্বিতীয় বীজতলায় সবজি চারা রোপণের পদ্ধতি অনেক দেশেই চালু আছে। এ পদ্ধতিকে দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ পদ্ধতি বলে। দেখা গেছে ১০-১২ দিনের চারা দ্বিতীয় বীজতলায়    স্থানান্তরিত করা হলে কপি গোত্রের সবজি, বেগুন ও টমেটো চারার শিকড় বিস্তৃত ও শক্ত হয়, চারা অধিক সবল ও তেজি হয়। চারা উঠানোর আগে বীজতলায় পানি দিয়ে এরপর সুচালো কাঠি দিয়ে শিকড়সহ চারা উঠাতে হয়। উঠানো চারা সাথে সাথে দ্বিতীয় বীজতলায় লাগাতে হয়। বাঁশের সুচালো কাঠি বা কাঠের তৈরি সুচালো ফ্রেম দ্বারা সরু গর্ত করে চারা গাছ লাগানো হয়। লাগানোর পর হালকা পানি দিতে হবে এবং বৃষ্টির পানি ও প্রখর রোদ থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন বা চাটাই দ্বারা ঢেকে দিতে হবে।

সবজি অঙ্কুরোদগমের গ্রহণযোগ্য হার (%) বীজ অঙ্কুরোদগম/ গজানোর সময় (দিন)
ফুল কপি ৭৫
বাঁধাকপি ৭৫
টমেটো ৭৫
বেগুন ৭০
মুলা ৭৫
শসা ৮০
তরমুজ ৭০
পালংশাক ৬০
ঢেঁড়স ৫০
মরিচ ৫৫
মিষ্টিকুমড়া ৭৫
গাজর ৫৫
পিয়াজ ৭০
লেটুস ৮০


বীজতলায় চারার রোগ দমন

বীজতলায় বপনকৃত বীজ গজানোর পূর্বে বীজ এবং পরে কচি চারা রোগাক্রান্ত হতে পারে। অঙ্কুরোদগমরত বীজ আক্রান্ত হলে তা থেকে আদৌ চারা গজায় না। গজানোর পর রোগের আক্রমণ হলে চারার কাণ্ড মাটি সংলগ্ন স্থানে পচে গিয়ে নেতিয়ে পড়ে। একটু বড় হওয়ার পর আক্রান্ত হলে চারা সাধারণত মরে না, কিন্তু এদের শেকড় দুর্বল হয়ে যায়। চারা এভাবে নষ্ট হওয়াকে বলে ড্যাম্পিং অফ। বিভিন্ন ছত্রাক এর জন্য দায়ী। ড্যাম্পিং অফ রোগ বাংলাদেশে চারা উৎপাদনের এক বড় সমস্যা। বীজতলার মাটি সব সময় ভেজা থাকলে এবং মাটিতে বাতাস চলাচলের ব্যাঘাত হলে এ রোগ বেশি হয়। এ জন্য বীজতলার মাটি সুনিষ্কাশিত রাখা  রোগ দমনের প্রধান উপায়। প্রতিশেধক হিসাবে মাটিতে ক্যাপটান, কপার অক্সিক্লোরাইড বা ডাইথেন এম-৪৫, ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে বীজতলার মাটি ভালো করে ভিজিয়ে কয়েক দিন পর বীজ বপণ করতে হবে। এছাড়াও কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে, সৌরতাপ ব্যবহার করে, পোলট্রি রিফিউজ ও খৈল ব্যবহার করেও ড্যাম্পিং অফ থেকে চারাকে রক্ষা করা যায়।


চারার কষ্ট সহিষ্ণুতা বর্ধণ
রোপণের পর মাঠের প্রতিক‚ল পরিবেশ যেমন ঠাণ্ডা আবহাওয়া বা উচ্চতাপমাত্রা, পানির স্বল্পতা, শুষ্ক বাতাস এবং রোপণের ধকল ও রোপণকালীন সময়ে চারা নাড়াচারায় সৃষ্ট ক্ষত ইত্যাদি যাতে সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারে সেজন্য বীজতলায় থাকাকালীন চারাকে কষ্ট সহিষ্ণু করে তোলা হয়। যে কোন উপায়ে চারার বৃদ্ধি সাময়িকভাবে কমিয়ে যেমন বীজতলায় ক্রমান্বয়ে পানি সেচের পরিমাণ কমিয়ে বা দুই সেচের মাঝে সময়ের ব্যবধান বাড়িয়ে চারাকে কষ্ট সহিষ্ণু করে তোলা যায়। কষ্ট সহিষ্ণুতা বর্ধণকালে চারার শ্বেতসার (কার্বোহাইড্রেট) জমা হয় এবং রোপণের পর এই শে^তসার দ্রুত নুতন শিকড় উৎপাদনে সহায়তা করে। ফলে সহজেই চারা রোপণজনীত আঘাত সয়ে উঠতে পারে।

 

চারা রোপণ
বীজতলায় বীজ বপনের নির্দিষ্ট দিন পর চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। সবজির প্রকার ভেদে চারার বয়স ভিন্নতর হবে। কপিজাতীয় সবজি, টমেটো, মরিচ, বেগুন ইত্যাদির চারা ২০-৩০ দিন বয়সে রোপণ করতে হয়। চারা উঠানোর পূর্বে বীজতলার মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে। যত্ন করে যতদূর সম্ভব শেকড় ও কিছু মাটিসহ চারা উঠাতে হবে। মূল জমিতে চারা লাগানোর পরপরই গোড়ায় পানি সেচ দিতে হবে। চারা সাধারণত বিকেল বেলায় লাগানো উচিত। চারা লাগানোর কয়েক দিন পর পর্যন্ত গাছে নিয়মিত পানি দিতে হবে।

 

চারার বৈশিষ্ট্য
চারা স্বাভাবিক আকারের অর্থাৎ বেশি বড়ও নয় ছোটও নয়। কমপক্ষে ৫-৬টি পাতা যুক্ত থাকতে হবে। শিকড় অক্ষত ও মাটির দলায় জড়ানো থাকতে হবে। রোগের সবরকম লক্ষণ থেকে মুক্ত হতে হবে। পুরু কাণ্ড ও সতেজ চেহারা থাকতে হবে এবং স্বাভাবিক সবুজ পাতা থাকতে হবে (অত্যাধিক গাঢ় সবুজ চারায় নাইট্রোজেনের আধিক্য নির্দেশিত, এই সব চারা তাই দুর্বল হয়)।

 

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সবজি বিভাগ, উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বারি, জয়দেবপুর, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৫৫৬৩৬৩৯০১,  ই-মেইল : bahauddirahmed57@yahoo.com

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপদতায় প্র্র্রয়োজন সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ

মো: কাওছারুল ইসলাম সিকদার

খাদ্য নিরাপদতা রক্ষার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছে বাংলাদেশের ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা, ৪৯২টি উপজেলা, ১২টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভা, ১৫টি মন্ত্রণালয়, ২০টি এজেন্সি। পাশাপাশি সম্পৃক্ত রয়েছে বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানসমূহ


বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুগত কারণ, মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিশ্ব বাণিজ্যের প্র্রসার, নগরকেন্দ্রিক মানুষের জীবন, পছন্দসই খাদ্য প্র্রাপ্তি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশ্বের প্র্রায় প্রতিটি দেশ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন ও কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে বিশ্ব তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য, নষ্ট হচ্ছে মাটি, পানি ও বাতাসের গুণগত মান। তাই খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে পূর্বে শংকা থাকলেও খাদ্য নিরাপদতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ছিল না। ষাটের দশক হতে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও দরিদ্রতা দূরীকরণে কৃষি উৎপাদনের ওপর ব্যাপক জোর প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে খাদ্যের জোগানের সঙ্গে সঙ্গে এর পুষ্টি ও খাদ্যের গুণগতমান রক্ষায় বিশ্ব আজ অধিকতর সজাগ। কারণ সুস্বাস্থ্যের জন্য কেবল খাদ্য গ্রহণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুষম ও নিরাপদ খাদ্য। আর এ দুটির অভাবে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষ অসুস্থ্য হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে অনিরাপদ খাদ্যজনিত রোগের কারণে বিশ্বব্যাপী ২০১৬ সালে ৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস প্রায়, চিকিৎসায় ব্যয় হয় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশনের লক্ষ্যে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে সজাগ ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। উৎপাদন হতে ভোগ পর্যন্ত এ শৃঙ্খলের কোনো একটি পর্যায়ে যদি খাদ্যের মান যথাযথ রক্ষা করা না হয় তবে সে খাদ্য আর নিরাপদ থাকে না। তাই উত্তম কৃষি চর্চা (GAP), উন্নত উৎপাদন অনুশীলন (GMP), উন্নত স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন (Good Hygiene practice-GHP), ট্রেসিবিলিটি (Traceability), কোল্ড চেইন ম্যানেজমেন্ট (Cold Chain Management) প্রভ‚তি বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার () সহযোগিতায় বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে তথা খাদ্যের গুণগতমান রক্ষার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।


নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ হলো নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন করে এ কার্যক্রমের আইনগত বৈধ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রদান। পরবর্তীতে সে আইনের আলোকে বিধিবিধান, প্র্রবিধানমালা এবং নীতিমালা প্রণয়ন করা পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন হতে ভোক্তা পর্যন্ত শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে দিকনির্দেশনা প্রদান, মনিটরিং ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মূলত নীতিনির্ধারণ পর্যায়ের পরে সরকারের বাস্তবায়নে জনবল নিয়োগ এবং ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সিভিল সোসাইটি, একাডেমিয়া, গবেষক এবং মিডিয়াসহ সকল অংশীজনের নিয়ে সমন্বয়কের ভ‚মিকা পালন করে। কারণ খাদ্য নিরাপদতার সাথে দেশের প্রতিটি মানুষ যেমন জড়িত, তেমনি পরিবেশ রক্ষা থেকে খাদ্য উৎপাদন, শুকানো, মজুদ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজতকরণ, মোড়কীকরণ, লেবেলিং, আমদানি, রপ্তানি, বাজারজাতকরণ, রান্না ও পরিবেশন পর্যন্ত প্রায় সকল পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীরা খাদ্য নিরাপদতার সাথে যুক্ত। সেজন্য GAP, GMP, GHP, Traceability Cold Chain Management প্রভৃতি বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিটি খাদ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। খাদ্য নিরাপদতা রক্ষায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাজ হলো খাদ্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয় অনুসরণ করে যেন খাদ্য প্রস্তুত করে তা মনিটরিং করা, আমদানি/রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করা এবং দেশের সকল অংশীজনদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করা।


বাংলাদেশের ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা, ৪৯২টি উপজেলা, ১২টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভা, ১৫টি মন্ত্রণালয়, ২০টি এজেন্সি খাদ্য নিরাপদতা রক্ষার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানসমূহ খাদ্য নিরাপদতা কার্যের সহিত সম্পৃক্ত। যেমন- নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩;


বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮; Animal Stingless and Meat Quality Control Act, 2011; মৎস্য ও পশু খাদ্য আইন, ২০১০; বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮, মৎস্যসঙ্গ নিরোধ আইন, ২০১৮; আমদানিনীতি আদেশ ২০১৫-২০১৮; রপ্তানিনীতি আদেশ ২০১৮-২০২১; মৎস্য ও মৎস্যপণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০২০


খাদ্য নিরাপদতার জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সংস্থা (Apex Body) হিসেবে কাজ করলেও খাদ্য নিরাপদতামূলত সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের যুগপৎ কার্যক্রমের ফসল। খাদ্য নিরাপদতা নিশ্চিত না করা গেলে জনস্বাস্থ্যহীনতার সাথে সাথে অপুষ্টি, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, খাবারের অপচয় ঘটবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্য ও প্রতিক‚লতার সম্মুখীন হবে। সেইসাথে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও ক্ষুন্ন হবে। বর্তমান বিশ্বে খাদ্যশস্যসহ খাদ্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানি তথা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য খাদ্যের নিরাপদতা অত্যাবশ্যক। কেননা মানুষের আর্থিক সঙ্গতি বৃদ্ধির সাথে সাথে রুচি ও জীবন ধারণের ধরন ও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে নতুন নতুন পণ্যযুক্ত হচ্ছে। তাই দেশে যদি নিম্নমানের খাদ্য ও খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয় তবে তা টেকসই হবে না বরং সেখানে উন্নতমানের পণ্য আমদানির মাধ্যমে দেশে উৎপাদিত নিম্নমানের পণ্যের জায়গা দখল করবে। এছাড়া পর্যটন শিল্পের বিকাশে ও বৈচিত্র্যময়, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। সে কারণে উন্নত দেশসমূহ ভোক্তার স্বাস্থ্য ও রুচির দিকে লক্ষ্য রেখে মানসম্মত খাদ্য প্রস্তুত ও তা পরিবেশনের ওপর গুরুত্বরোপ করছে। উন্নত ও টেকসই পরিবহন ও মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং দেশে উন্নত খাদ্য শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভাবনা হলে খাদ্যের নিরাপদতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যত্রতত্র ছোট ছোট উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যে খাদ্য প্রস্তুত বা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিপণন করছে তা অনেক ক্ষেত্রেই ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর। এসব প্রতিষ্ঠানমূলত নামে-বেনামে, অনুমোদনহীনভাবে এবং গোপনে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রস্তুত করে। এদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও সবসময় ওয়াকিবহাল থাকে না। তাই খাদ্যেরমান রক্ষা করে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুতের জন্য খাদ্য শিল্পকে সহযোগিতা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।


নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত করে দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষাসহ রপ্তানি বৃদ্ধির টেকসই পরিকল্পনা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। দেশের সমুদ্র (নীল) অর্থনীতির প্রসার এবং আহরিত সম্পদ দ্বারা এদেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে সমুদ্রের মাছ, শেওলা ও অন্যান্য প্রাণিজ জাতীয় খাদ্য আহরণের বিষয়ে যথাযথ আইন ও বিধি বিধান প্রণয়ন করতে হবে।


খাদ্যের নিরাপদতা রক্ষায় প্লাস্টিকসামগ্রী যেমন জরুরি তেমনি এর ঝুঁকিও রয়েছে। তাই আমাদের প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করতে হবে। বর্তমানে খাদ্যের গুণগতমান ও নিরাপদতা রক্ষায় যেমনি ভার্জিনরেজিন হতে ফুড গ্রেডে প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরি হচ্ছে তেমনিভাবে সঠিক বৈজ্ঞানিক নীতিমালা অনুসরণ না করে পুরাতন ও ব্যবহৃত প্লাস্টিক হতে রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় পুনরায় পানির বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে। খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত এসব প্লাস্টিকসামগ্রী হতে খাদ্যে বিষক্রিয়া ছড়াতে প্রারে। সে  সাথে অব্যবহৃত প্লাস্টিক জমি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। তাই ব্যবহৃত প্লাস্টিক রিসাইকেল করে পুুনরায় ব্যবহার অত্যবশ্যক। ইউরোপ ও আমেরিকায় রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিক তৈরির নীতিমালা তৈরি করেছে। সে সাথে রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিকসামগ্রী উৎপাদনে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে এবং সরকারের পক্ষ হতে নানামুখী প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। যাতে করে ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রী পুনরায় ব্যবহার করা যায় এবং প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশ ও খাদ্য রক্ষা করা যায়। উন্নত দেশগুলোর ন্যায় রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক উৎপাদন ও এর ব্যবহার নীতিমালা অনুসরণ করে দেশে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক রেজিন আমদানি কমানো যেতে পারে এবং যত্রতত্র ছড়ানো প্লাস্টিক বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য পুনরায় রিসাইকেল করে ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিক তৈরি করে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানো যেতে পারে।


মনিটরিং, নজরদারি, প্র্রশিক্ষণ ও খাদ্যের গুণগতমান যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। সে সাথে প্রয়োজন আধুনিক কারিগরি কৌশলসমৃদ্ধ খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠান; যারা দেশের ও বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাদ্য প্রস্তুত, পরিবহণ, সংরক্ষণ, মোড়কীকরণ ও বাজারজাতকরণে সক্ষম। যেটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা/প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্ভব নয়। আধুনিক খাদ্য শিল্পের অবকাঠামো যেমনটি উন্নত, তেমনি এর লোকবল ও খাদ্য নিরাপদতার বিষয়সমূহ সম্পর্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অবগত। তাই দেশে উৎপাদিত ও সহজ লভ্য কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার, জনস্বাস্থ্যে, পর্যটন, বাণিজ্যের প্রসার ও বেসরকারিভাবে খাদ্য শিল্পের প্রসারে সরকারি সহযোগিতার উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্র্রয়োজন।

উপসচিব, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ভবন, ৭১-৭২ ইস্কাটন গার্ডেন (১৩ তলা), ঢাকা; ই-মেইল : kawserul1173@gmail.com

 

বিস্তারিত
কৃষকের বাজার ও নিরাপদ সবজি

তৌহিদ মোঃ রাশেদ খান

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর।  বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ ভাগ কৃষি কাজের সাথে জড়িত এবং মোট শ্রম শক্তির শতকরা ৬০ ভাগ যোগান দেয়  কৃষি খাত। বাংলাদেশে প্রচুর শাকসবজি উৎপাদিত হয় এবং বিশ্বে শাকসবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। কিন্তু এসব শাকসবজির উৎপাদনে নিরাপদতা নিশ্চিত না হওয়ায় তা দেশের সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে বিপণন পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণ শাকসবজি নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় শতকরা ২৫-৩০ ভাগ। এ জন্য উৎপাদন পর্যায়ে কৃষকদেরকে সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা বিষমুক্ত নিরাপদ শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে আগ্রহী হন। শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি নয় তার সাথে প্রয়োজন কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থায় অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদের বাজার ব্যবস্থায় সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সফল উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচুর শাকসবজি উৎপাদিত হচ্ছে এবং দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।  কিন্তু সবজি উৎপাদনের ভরা মৌসুমে কৃষকগণ তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। অপরদিকে  বিভিন্ন কলাকৌশল ব্যবহারের ফলে নিরাপদ সবজি উৎপাদন হলেও পৃথক বাজার ব্যবস্থা না থাকার কারণে কৃষকগণ নিরাপদ সবজির সঠিক মূল্য হতে বঞ্চিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে ভোক্তাগণও নিরাপদ সবজি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ প্রেক্ষিতে নিরাপদ সবজির প্রাপ্যতা সহজলভ্য করা ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট কৃষকগণের সঠিক মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক সেচ ভবন, মানিকমিয়া এভিনিউ, ঢাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে একটি কৃষকের বাজার (ফার্মারস মার্কেট) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উক্ত কৃষকের বাজারে সপ্তাহে দুই দিন শুক্র ও শনিবার ঢাকা জেলাসহ নিকটবর্তী জেলা যেমনঃ মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে উৎপাদিত নিরাপদ সবজি কৃষক কর্তৃক সরাসরি বাজারজাত করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ঢাকার মানিকমিয়া এভিনিউসহ সেচ ভবনে স্থাপিত কৃষকের বাজারটির সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
ঢাকার সাভার, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জ থেকে চাষিরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই মাঠ থেকে সবজি সরাসরি বাজারে এনে থাকেন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের নিজস্ব রেফ্রিজারেটেড ট্রাকের মাধ্যমে কৃষকদের পরিবহণ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সবজির গুণগত মান নিশ্চিত করছে। এখানে সব ধরনের সবজি পাওয়া যায়। কৃষক তার ক্ষেত থেকে সরাসরি উৎপাদিত সবজি নিয়ে বাজারে বিক্রি করে থাকেন। পরিবহণ সুবিধা প্রদান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য না থাকায় এ বাজারের পণ্যের দামও ক্রেতাদের নাগালে রয়েছে।
এ কৃষকের বাজারে সম্পূর্ণরূপে কীটনাশকমুক্ত সবজি নিয়ে আসেন কৃষক। উৎপাদন পর্যায়ে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদারকিতে যেসব কৃষক এ নিরাপদ সবজি উৎপাদন করছেন তাদেরকেই এ বাজারে পণ্য বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর হতে এ জন্য কৃষকদের নির্ধারিত পরিচয়পত্র দেয়া হয়। তাদের বাইরে কেউ কৃষকের বাজারে এসে সবজি বিক্রি করতে পারেন না। এ বাজারের সফলতার ওপর ভিত্তি করে আগামীতে আরো ব্যাপকভাবে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় এরকম বাজারের আয়োজন করা হবে এবং সারা বছর যেন এ বাজার চালু থাকে, তার ব্যবস্থা করা হবে।
স্থানীয় বাজারের সবজির সঙ্গে এ কৃষকের বাজারের সবজিতে অনেক পার্থক্য। পরিপাটি করে সাজিয়ে বিষমুক্ত এসব সবজি কৃষকরা সরাসরি বিক্রি করেন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর হতে এসব কৃষিপণ্যের জন্য এ বাজারে মূল্য তালিকা টাঙানো থাকে। এ ছাড়া এ বাজারটিতে সত্যিকার অর্থেই কীটনাশক মুক্ত সবজি মিলে কি না, তা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  হতেও এ বাজারের পণ্যের নিরাপদতা পরীক্ষা করা হয়।
বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রথমার্ধে বাংলাদেশের শাকসবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের পরিবহণ এবং বাজারজাতকরণে বিরূপ প্রভাব পড়েছিল এবং কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারছিল না। এসব বিষয় বিবেচনা করে লকডাউনের মধ্যেও চালু ছিল কৃষকের বাজার। এছাড়াও লকডাউন পরিস্থিতিতে ভোক্তা সাধারণ যেন নিরাপদ সবজি হাতের নাগালেই পেতে পারেন সেজন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক চালু ছিল “ভ্রাম্যমাণ কৃষকের বাজার”। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রিফার ভ্যানের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে  কৃষকেরা সরাসরি তাদের উৎপাদিত সবজি বিক্রয় করে।
ঢাকা মহানগরীর ভোক্তাগণের নিরাপদ সবজি প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে কৃষকের বাজার স্থাপন বিষয়টি ইতোমধ্যে বেশ সমাদৃত হয়েছে। উক্ত কৃষকের বাজারে প্রচুর ক্রেতার সমাগম হচ্ছে এবং ক্রমান্বয়ে নিরাপদ সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষক বাজারের ব্যাপক প্রচার ও নিরাপদ সবজির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দেশের প্রত্যেক জেলায় “কৃষকের বাজার” স্থাপনের লক্ষ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কাজ করছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তত্ত¡াবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিরাপদ সবজি বিপণনে “কৃষকের বাজার” স্থাপিত হয়েছে। এ সকল কৃষকের বাজারে প্রান্তিক কৃষক সরাসরি বিক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং ভোক্তা সাধারণ সাশ্রয়ী মূল্যে এ ধরনের বাজার থেকে নিরাপদ সবজি ক্রয় করে তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক দেশের সকল জেলার গুরুত্বপূর্ণ শাকসবজি উৎপাদন এলাকায় এ রকম কার্যক্রম গ্রহণপূর্বক কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সংযোগ স্থাপন করা হলে একদিকে যেমন নিরাপদ শাকসবজি উৎপাদন হবে পরবর্তীতে ক্ষতি কমিয়ে কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব। এমতাবস্থায়, নিরাপদ শাকসবজি উৎপাদনকারীর স্বার্থরক্ষা ও মূল্য বঞ্চনা থেকে মুক্তি, কৃষক ও ভোক্তার কল্যাণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও অযাচিত প্রভাব রোধকল্পে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদান এবং সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দরিদ্রতা হ্রাস করা এবং ভোক্তা সাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এ উদ্যোগ সফল হোক। য়

সহকারী পরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭৭০৫৫১২৩৭, ই-মেইল : rkshahu@gmail.com

 

বিস্তারিত
মাইক্রোগ্রিন- নিরাপদ এক পুষ্টির আধার

মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন

মাইক্রোগ্রিনে পুষ্টি উপাদানগুলো ঘণীভ‚ত অবস্থায় থাকে। ফলে একই পরিমাণে পরিণত সবজি থেকে ভিটামিন, মিনারেল, বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল ও এন্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ মাইক্রোগ্রিনে তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে


মানুষের খাদ্য তালিকায় সালাদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি উচ্চমূল্যের ফসল হলো মাইক্রোগ্রিন। এ ফসলগুলো ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, উচ্চ পুষ্টি মূল্যসম্পন্ন এবং উৎপাদকদের জন্য আয়ের একটি ভালো উৎস। সাধারণত বীজ থেকে কটিলিডন (বীজপত্র) বা কটিলিডনসহ প্রথম পাতা বের হওয়া পর্যায়ের চারাটিকে মাইক্রোগ্রিন বলা হয়ে থাকে। স্প্রাউটের সাথে মাইক্রোগিনের পার্থক্য হলো স্প্রাউটে মূলসহ সমস্ত অংশ ব্যবহার করা হয় আর মাইক্রোগ্রিনে মূল বাদে এর উপরের অংশটুকু ব্যবহার করা হয়।


উদ্ভিদ প্রজাতির ওপর নির্ভর করে একটি মাইক্রোগ্রিন সাধারণত গাছের কাণ্ড, বীজপত্র এবং সে গাছের প্রথম সত্যিকারের পাতা নিয়ে গঠিত। উৎপাদক এবং গ্রাহকের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে প্রথম সত্যিকার পাতা বের হওয়ার পরপর অথবা আগেই মাইক্রোগ্রিন সংগ্রহ করা হয়। এ সময় গাছের আকার প্রায় ৫ থেকে ৭.৫ সেন্টিমিটার (২-৩ ইঞ্চি) হয়ে থাকে। পুষ্টি, গন্ধ, রঙ, গঠন এসব বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে মাইক্রোগ্রিন বাছাই বা পছন্দ করা হয়ে থাকে।


মাইক্রোগ্রিন উৎপাদনে সাধারণত রাসায়নিক সার বা কোনো প্রকার বালাইনাশক ব্যবহার করা হয় না। তাই এটি মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এ ছাড়া মাইক্রোগ্রিন পুষ্টিতে ভরপুর একটি খাবার, যা কাঁচা অবস্থায় খাওয়া হয়। জাতের ওপর ভিত্তি করে পুষ্টি উপাদনের সামান্য তারতম্য হয়ে থাকে, তবে বেশির ভাগ মাইক্রোগ্রিনই পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেসিয়াম এবং কপার সমৃদ্ধ। এ ছাড়া এগুলো এন্টিঅক্সিডেন্টের অন্যতম উৎস। মাইক্রোগ্রিনে পুষ্টি উপাদানগুলো ঘণীভ‚ত অবস্থায় থাকে। ফলে একই পরিমাণে পরিণত সবজি থেকে ভিটামিন, মিনারেল, বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল ও এন্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ মাইক্রোগ্রিনে তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।


মাইক্রোগ্রিন শরীরের জন্য অনেক উপকারী। মাইক্রোগ্রিন হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ক্যান্সার প্রতিরোধী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং শরীরের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়।
অপেক্ষাকৃত কম সময়ে, স্বল্প খরচে এবং অল্পজায়গায় লাভজনকভাবে চাষ করা যায় বলে বিশে^র বিভিন্ন দেশে গত কয়েক বছরে মাইক্রোগ্রিন চাষ যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমাদের দেশেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি লাভজনক হবে কি না তা নির্ভর করে এ জাতীয় পণ্য বিক্রির ক্ষমতার ওপর। এ জন্য বাজার ব্যবস্থার ওপর মনোযোগ দিতে হবে। উৎপাদকদেরকে তাদের ফসল বিক্রির নিশ্চয়তার জন্য টার্গেট মার্কেট এবং ভোক্তাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হবে।
মাইক্রোগ্রিন হিসেবে অনেক জাতের শস্য আবাদ করা যায়। তবে উৎপাদনের সময় উক্ত জাতটি মানুষের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত এবং নিরাপদ কি না সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে বিশে^ প্রায় ১০০ প্রজাতির গাছ মাইক্রোগ্রিন হিসেবে উৎপাদন ও বিক্রয় করা হচ্ছে।
মাইক্রোগ্রিন একটি স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট ফসল। তবে বিভিন্ন জাত ও প্রজাতিভেদে বৃদ্ধির হারে পার্থক্য রয়েছে। সবজি জাতীয় মাইক্রোগ্রিনগুলো ৭-১৪ দিনের মধ্যে কর্তন উপযুক্ত হয় কিন্তু হার্বস জাতীয় উদ্ভিদগুলোর ১৬-২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। উৎপাদন সময়ের ওপর ভিত্তি করে মাইক্রোগ্রিনকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
দ্রæত বর্ধনশীল সবজি (৭-১৪ দিন) : বাঁধাকপি, ভুট্টা, শালগম, সরিষা, মুলা প্রভৃতি।
ধীর বর্ধনশীল সবজি (১৫-২৫ দিন) : ডাটা, বিট, গাজর প্রভৃতি।
ধীর বর্ধনশীল হার্ব বা গুল্ম (১৫-৩০ দিন) : তুলসী, মৌরি, ধনিয়া, পার্সলে প্রভৃতি।
প্রচলিত ফসল উৎপাদনের তুলনায় মাইক্রোগ্রিন উৎপাদন পুরোটাই বীজনির্ভর। উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসার লাভ-ক্ষতিনির্ভর করে বীজ ব্যয়ের ওপর। এজন্য একাধিক বিশ^স্ত ও সাশ্রয়ী মূল্যে বীজ সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। এতে বীজ সঙ্কট, জাতের সীমাবদ্ধতা, খাদ্য সুরক্ষা এবং সন্ধানের সমস্যার ঝুঁকি হ্রাস পায়।


বীজের সংমিশ্রণ ও পোকার সমস্যা এড়াতে বীজগুলো নিরাপদ, বদ্ধ পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত। বীজের সজীবতা নিশ্চিত করার জন্য ঠাণ্ডা (১-৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা), শুষ্ক (আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৩-১০%) এবং অন্ধকার স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণাগারে বীজগুলো পুনরায় যাতে আর্দ্রতার সংস্পর্শে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তানা হলে আগাম অংকুরোদগম হতে পারে এবং বীজের সজীবতা কমে যেতে পারে।


বেশির ভাগ বীজ সাধারণত ৩-৬ শতাংশ আর্দ্রতায় শুকানো হয়ে থাকে। অংকুরোদগম হার বাড়ানোর জন্য কিছু প্রজাতির বীজ পানিতে বা এসিডিক দ্রবণে ভিজিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হয়। প্রতিটি প্রজাতির অংকুরোগদমনের জন্য আলাদা আলাদা পরিবেশের প্রয়োজন হয়ে থাকে। সেজন্য প্রজাতির পরিবেশ সম্পর্কে উৎপাদনকারীর যথেষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। দ্রবীভ‚ত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের মতো দ্রবণগুলো বীজের জীবাণুনাশক হিসেবেও কাজ করে, যা বীজের গায়ে লেগে থাকা জীবাণুু ও ব্যাক্টেরিয়াকে ধ্বংস করে। একইভাবে গরম পানির মাধ্যমেও বীজকে জীবাণুু মুক্ত করা যায়। আবার কিছু বীজ আছে যেগুলো পানি পেলে তার চারদিকে শ্লেষ্মা জাতীয় পদার্থ তৈরি হয়। এ বীজগুলো রোপণের আগে ভেজানো উচিত নয়।


মাইক্রোগ্রিন উৎপাদনের জন্য একজন উৎপাদককে বীজ অঙ্কুরোদগমের প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর দক্ষ হতে হবে। জাতের ওপর ভিত্তি করে উৎপাদনের পরিবেশ বিভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৪০-৬০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশির ভাগ গাছের চাহিদা মেটাতে পারে।


যেহেতু মাইক্রোগ্রিন সাধারণত ঘরের ভেতরে উৎপাদন করা হয় সেক্ষেত্রে কৃত্রিম আলোক ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে হবে। আলোর উৎস যদি গাছ থেকে বেশি দূরে থাকে তবে চারা লম্বা হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া আলোর তীব্রতা অপর্যাপ্ত হলে চারা ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে। সূর্যের আলোর পরিবর্তে জাতভেদে সাধারণত ১২-১৮ ঘণ্টা কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করতে হয়। এক্ষেত্রে ফ্লোরোসেন্ট জাতীয় বাল্ব ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ খরচ অনেক বেড়ে যায়। এর পরিবর্তে এলইডি লাইট ব্যবহার করা যায়। এতে উৎপাদন খরচ অনেক কমে যায়।


মাইক্রোগ্রিন উৎপাদনের জন্য নিয়মিত এবং পরিমিত সেচের প্রয়োজন হয়। অংকুরোদগমের শুরুতে বীজগুলো যাতে স্থানচ্যুত না হয় সেজন্য মিস্টিং নজেল ব্যবহার করে সেচ দিতে হবে যাতে পানি কুয়াশার মতো ছড়ায়। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য শাওয়ার হেড নজেল ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া অতিরিক্ত পানি নিকাশের জন্য উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখতে হবে।


সাধারণত বীজপত্রসহ প্রথম পাতা আসলে মাইক্রোগ্রিন সংগ্রহ করতে হবে। মাইক্রোগ্রিন সংগ্রহের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উদ্ভিদের আকার খুব ছোট হওয়ায় ফসল সংগ্রহ করা কঠিন, তাই যত্ন সহকারে সংগ্রহের কাজটি করতে হয়। ফসল সংগ্রহের সাথে সাথে মাইক্রোগ্রিনকে শীতল পরিবেশে রাখতে হবে। এতে ফসলের সতেজতা, মান এবং খাদ্যগুণ ভালো থাকে। মাইক্রোগ্রিন সাধারণত কাণ্ডের খুব কাছাকাছি কাটা হয়ে থাকে। সেজন্য ফলন যাতে বীজ বা গ্রোয়িং মিডিয়াম দ্বারা দূষিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফসল কাটার আগে কাটার সরঞ্জামগুলো স্যানিটাইজ করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ফসল কাটার সরঞ্জামগুলো যত সরল হবে সেগুলো যথাযথভাবে স্যানিটাইজ করাও তত সহজ হবে।


বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সময়োপযোগী বিভিন্ন কৃষি নীতি গ্রহণ এবং তার সঠিক বাস্তবায়নের জন্য দেশ আজ দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। সরকার এখন নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের প্রতি জোর দিয়েছে। নিরাপদ, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং লাভজনক ফসল হিসেবে মাইক্রোগ্রিন হতে পারে আগামী বাংলাদেশের এক উৎকৃষ্ট ফসল।

তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস। মোবাইল : ০১৯১১০১৯৬১০, ই- মেইল : manzur_1980@yahoo.com

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তায় কালিকাপুর মডেলে সবজি চাষ

কৃষিবিদ কামাল ইসলাম
বেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলহীন হয়ে উঠতে পারে। দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট, নেমে আসতে পারে দুর্ভিক্ষ। আর সে প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এসে পড়বে স্বাভাবিক। একদিকে করোনা মহামারিতে মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে খাদ্য সংকট, এমন পরিস্থিতি মাথায় রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত দূরদর্শী ঘোষণা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন,  ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাননীয়  কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়েছেন নানা পদক্ষেপ।


এমনি এক যুগোপযোগী পদক্ষেপের নাম কালিকাপুর মডেলে বসতবাড়িতে বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন। আর এ সবজি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ৩২টি করে কালিকাপুর মডেলে স্থাপিত হচ্ছে সবজি উৎপাদন বেড। উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে সুসংগঠিত টিম সুনিপুণভাবে এই কর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছে। করোনা দ্বিতীয় ঢেউ পরিস্থিতিতেও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কালিকাপুর মডেলের সবজি বেড প্রস্তুতিতে কৃষকদের সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করছে।


একজন পূর্ণবয়স্ক লোকের দৈনিক ২১৩ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমরা গড়ে মাত্র ৫৩ গ্রাম শাকসবজি গ্রহণ করি। এর কারণে এ দেশের কোটি কোটি মানুষ দৈহিক ও  মানসিক অসুখে ভুগছে। এরমধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে শিশু এবং নারী। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ, বিশেষ করে মহিলারা লৌহের অভাবে রক্তশূন্যতার শিকার। একমাত্র ভিটামিন-এ’ র অভাবে বছরে ৩০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায়। এসব সমস্যা সমাধানে শাকসবজি খাওয়ার বিকল্প নেই। কারণ শাকসবজি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়াও সব ধরনের পুষ্টি সরবরাহ করে।


কালিকাপুর মডেলে সবজি চাষ  
আমাদের দেশে প্রায় দুই কোটি বসতবাড়ি আছে। প্রায় সবারই বাড়ির চারপাশে কিছু পরিমাণ জায়গা সারা বছরই পতিত থাকে, যা সবজি চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। কালিকাপুর মডেলে সবজি চাষের মাধ্যমে বসতবাড়ির পতিত জায়গাগুলোকে উৎপাদনমুখী করে একটি পরিবার সারা বছরের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ও করতে পারে।


পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার কালিকাপুর নামক এলাকায় ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে গবেষকগণ এ মডেল উদ্ভাবন করেন। এ মডেলে সবজি চাষ প্রযুক্তি, বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
 

স্থান নির্বাচন : বসতবাড়ির যে জায়গায় দিনের বেশির ভাগ সময় রোদ লাগে, এমন জায়গা নিবিড় সবজি আবাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। আঙিনায় আলো আসার পথে বাধা দেওয়া বাড়ির আশপাশের বড় গাছের ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে। ভবিষ্যতে বড় হয়ে ছায়া সৃষ্টি করতে পারে এমন গাছও জন্মাতে দেয়া যাবে না।


সবজি বাগানের আকার : বসতবাড়ির আঙিনায় ৫ মিটার ী ৬ মিটার (১৬ ফুট ী ১৯-২০ ফুট) মাপের বাগান তৈরি করতে হবে। বাগানের জন্য খোলা উঁচু স্থান বেছে নিতে হবে। প্রত্যেক বেডের জন্য নির্ধারিত সবজি বিন্যাস অনুসরণ করতে হবে।


কালিকাপুর মডেল অনুসারে বাড়ির পতিত জায়গায় ৫টি বেড তৈরি করতে হবে। নির্বাচিত জমিতে ৫ মিটার (১৬ ফুট) লম্বা ও ৮০ সেমি. (৩২ ইঞ্চি) চওড়া ৫টি বেড তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ২ বেডের মাঝে ২৫ সেমি. (১০ ইঞ্চি) নালা রাখতে হবে। বাগানের যে দিকটা লম্বায় বড় সে দিকটি প্লটের দৈর্ঘ্য হিসেবে ধরে নিয়ে বাগানের নকশা করতে হবে। এ মডেলে জায়গার পরিমাণ, বেড ও সবজির সংখ্যা বাড়লেও অন্যান্য মাপ একই থাকবে।
বাগানের জমি, বেড ও নালা তৈরি : বাগানের জন্য চিহ্নিত জায়গার আবর্জনা পরিষ্কার করে নিতে হবে। বেড়া দেয়ার স্থানের ভেতরে চারপাশে জায়গা খালি রেখে নকশা অনুসারে চারদিকে ২৫-৫০ সেমি. (১০-২০ ইঞ্চি) নালা ও দুই বেডের মাঝখানে ২৫ সেমি. (১০ ইঞ্চি) নালা তৈরি করতে হবে। নালার মাটি বেডগুলোতে তুলে দিতে হবে।


সবজি বিন্যাস : কালিকাপুর মডেল অনুসারে বাড়ির পতিত জায়গা যথাযথভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সারা বছর পারিবারিক শাকসবজির চাহিদা মেটানো যাবে এমন সবজি বিন্যাস করতে হবে। বছরব্যাপী ৮ থেকে ১৪ রকমের শাকসবজি অনায়াসে চাষ করা যায়। বেড বা সবজির সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।


প্রথম খণ্ডে পর্যায়ক্রমে লালশাক/ডাঁটাশাক/টমেটো। দ্বিতীয় খণ্ডে পর্যায়ক্রমে পুঁইশাক/গিমাকলমি/মুলা। তৃৃতীয় খণ্ডে পর্যায়ক্রমে গিমাকলমি/লালশাক/বেগুন। চতুর্থ খণ্ডে পর্যায়ক্রমে ধনিয়াপাতা/কাঁচামরিচ/মুলা। পঞ্চম খণ্ডে পর্যায়ক্রমে পালংশাক/পুঁইশাক/ বেগুন চাষ করা যেতে পারে। তবে, পারিবারিক চাহিদা, বাজারমূল্য, আবহাওয়া, স্থান, মাটির ধরন ও রুচি অনুযায়ী শাকসবজি নির্বাচন করা যেতে পারে।
বসতবাড়িতে নিরাপদ সবজি উৎপাদনে নিমোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করলে কার্যকরী ফলাফল পাওয়া যায়।


পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ- পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ কৌশল অনুসরণ অর্থাৎ সবজির খেত পরিষ্কার রাখা, মরা ডাল, পাতা সংগ্রহ করে নিরাপদ স্থানে গর্ত করে ধ্বংস করা বা পুড়িয়ে ফেলা, আগাছা পরিষ্কার করা, জমিতে আলো বাতাস প্রবেশের জন্য অধিক ঘন করে চারা না লাগিয়ে সঠিক দূরত্বে চারা লাগানো, বিকল্প পোষক (যেখানে পোকামাকড় লুকিয়ে আশ্রয় নেয়) ধ্বংস করা, অধিক ঘন ডালপালা ছেটে দেয়া ইত্যাদি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।


মাটি ও বীজ শোধন- সবজি লাগানোর আগে মাটি শোধন করে নেয়া, এক্ষেত্রে শতকপ্রতি ৩ কেজি চুন প্রয়োগ করা, ফসল সংগ্রহের পর শিকড়সহ গাছ তুলে ফেলা এবং আগুনে পুড়িয়ে মাটি শোধন করা (৩-৪ বছর পর পর ০১ বার)। বীজ শোধন নিম পাতার রস বা রসুন বাটার রস অথবা বাজারের প্রচলিত কার্বক্সিল ও থিরাম গ্রæপের ছত্রাকনাশক যেমন প্রোভাক্স (প্রতি কেজি বীজে ২.০০-২.৫০ গ্রাম হারে) দিয়ে বীজ শোধন করে বপন করা।
ভালো বীজ ব্যবহার- সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। স্থানীয় কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বালাইসহনশীল জাতের তথ্য জেনে সে অনুযায়ী জাত ব্যবহার করা।


আন্তঃপরিচর্যা- মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈবসার প্রয়োগ করা, এক্ষেত্রে গাছপ্রতি ০১ কেজি কেঁচোসার বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। মাটিতে বসবাসকারী পোকার পুত্তলী ধ্বংস করার জন্য মাঝে মাঝে প্লাবন সেচ দেয়া। মালচিং পদ্ধতির অনুসরণ করা, এক্ষেত্রে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্লাস্টিকের মালচিং ব্যবহার করা যেতে পারে।


জাব পোকাসহ ছোট ছোট পোকা দমনে বিঘা প্রতি ২৫-৩০টি হলুদ আঠালো/সাদা আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করা। সবজি ও ফলের মাছি পোকা দমনে চারা রোপণের ১০-১৫ দিনের মধ্যে ফসলভেদে বিঘাপ্রতি ১০-১৫ সেক্স ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করা। মাঝে মাঝে জমিতে পরিমিত পরিমাণে ছাই ছিটিয়ে পোকা দমন করা যায়। বিভিন্ন উপকারী পোকা যেমন- বোলতা জাতীয় ট্রাইকোগ্রামা, ব্রাকন, কোটেসিয়া, রেড লেস উইং, রেড বাগ, পেন্টাটোমিড বাগ, টেট্রাসটিকাস জমিতে ছেড়ে দিলে ক্ষতিকর পোকার ডিম, কীড়া পুত্তলী, মথ খেয়ে ফসলকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করে। বর্তমানে বাজারে এসব উপকারী পোকা কিনতে পাওয়া যায়। উপকারী পোকামাকড়ের আবাসস্থল সৃষ্টির জন্য আইল ফসল হিসেবে শিম, বরবটি, করলা ইত্যাদি লাগানো যেতে পারে।


জৈব বালাইনাশক ব্যবহার বাড়াতে হবে। জৈব বালাইনাশক যেমন-নিম পাতার রস, নিম বীজের গুঁড়োর মিশ্রণ, রসুন ও পেঁয়াজ বাটার রস, নিশিন্দার রস ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন করা যায়। তাছাড়াও বর্তমানে বাজারে প্রায় ৩২টি জৈব বালাইনাশক পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলো ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে পোকামাকড় দমন করা যায়। এসব জৈব বালাইনাশকের কোনো সাইড ইফেক্ট নেই।


পোকার আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমা অতিক্রম করলে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। তাদের পরামর্শ মোতাবেক সঠিক ওষুধ (বালাইনাশক), সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। বালাইনাশক স্প্রে করার পর অপেক্ষমাণ সময় অর্থাৎ কত দিন পর ফসল সংগ্রহ করবেন, সে নির্দেশনা মেনে চলা। এতে করে মানবস্বাস্থ্য ঝুঁকিমুক্ত থাকবে। পরিশেষে সবজি সংগ্রহের পর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে পানি ঝেড়ে নিয়ে বাজারজাত করা উচিত। সর্বোপরি পোকা-রোগ দমনে সবজি বাগান নিয়মিত পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা একান্ত জরুরি। য়

কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার, বাঘা, রাজশাহী, ই- মেইল :  kamrulgepb13@gmail.com,  মোবাইল : ০১৭৬৭০০৭২৮০

 

বিস্তারিত
পেয়ারার ন্যাচারাল জেলি তৈরি প্রযুক্তি

ড. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন মোল্লা

পেয়ারা বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত ফল যার উৎপাদন ও চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৯৬.৬১ হাজার একর জমিতে ২.৩৭ লক্ষ মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপন্ন হয়ে থাকে (বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরো, ২০১৯) যার অধিকাংশই সতেজ ফল হিসাবে ভক্ষণ করা হয়। প্রায় বছরব্যাপী সতেজ ফল হিসাবে এটি পাওয়া গেলেও প্রচলিত জেলি ছাড়া এর তেমন কোনো প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য বাজারে নাই বললেই চলে। আবার যে জেলিটি বাজারে বিদ্যমান তা সর্বত্র অপ্রতুল। তাই কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে AFACI-APPT, Bangladesh শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পেয়ারার বহুমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), গাজীপুর কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়েছে। বাজারে যে কয়টি প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য পাওয়া যায় তার প্রত্যেকটিই কোনো না কোনো কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান খাদ্য বিজ্ঞানী, পুষ্টি বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, সিনথেটিক কেমিক্যাল এবং প্রিজারভেটিভ এর ব্যবহারের ফলে মানব শরীরের কোনো না কোনো অংগে পাশ্বের প্রতিক্রিয়া (Side effect) দেখা দেয় (মোল্লা এবং অন্যান্য, ২০১৬)। বাজারে বিদ্যমান প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের লেভেলে দেখা যায় যে, ফুড প্রসেসিং কোম্পানিগুলো সিনথেটিক কেমিক্যাল এবং প্রিজারভেটিভের নাম সরাসরি ব্যবহার না  করে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে E-number (ই-নম্বর) ব্যবহার করছে যা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে বুঝা কঠিন। বাজার জরিপে দেখা যায় যে, জ্যাম-জেলিগুলোতে সাধারণত ই-৪৪০  (E-440), ই-৩৩০ (E-330), ই-২১১ (E-211), ই-২১৪ (E-214), এসিই-১২৯ (ACE-129), ৪-আর ই-১২৪  (4RE-124) ইত্যাদি ব্যবহার করছে যা ক্রেতার পক্ষে বুঝা দুরূহ ব্যাপার। এখানে উল্লেখ্য যে, ই-৪৪০ হচ্ছে পেকটিন,  ই-৩৩০ সাইট্রিক এসিড, ই-২১১ সোডিয়াম বেনজোয়েট, ই-২২৪ পটাশিয়াম মেটাবাইসালফাইট,  এসিই-১২৯ এবং ৪-আর ই-১২৪ ফুডকালার। পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের গবেষণা দেখা যায় যে, দেশী পেয়ারাতে ১৪-১৬% পেকটিন ন্যাচারালি বিদ্যমান থাকে। ফলে অতিরিক্ত পেকটিন যোগ করার প্রয়োজন হয় না।


সোডিয়াম বেনজোয়েট এবং পটাশিয়াম মেটাবাইসালফাইট প্রিজারভেটিভ দুইটি একই সাথে একই পণ্যে ফুড প্রসেসিং কোম্পানিগুলো ব্যবহার করছে যা একই সাথে ব্যবহার না করলেও চলে । এর যে কোনো একটি আমরা প্রিজারভেটিভ হিসাবে ব্যবহার করতে পারি। মানুষের বর্তমান চাহিদা ও সুস্বাস্থ্য বিবেচনায় রেখে তাই পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর সিনথেটিক কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভ ছাড়াই পেয়ারার জেলি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যা পেয়ারার ন্যাচারাল জেলি নামে পরিচিত। প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি এর সংরক্ষণকাল ৬-৮ মাস। এর পুষ্টিমান বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতি ১০০ গ্রাম জেলিতে ভিটামিন-সি ৩৪.১৬-৩৪৩.০১   মিলিগ্রাম, মোট ফেনলিক অ্যাসিড ৪.০১-৪.১৫ মিলিগ্রাম-গ্যালিক অ্যাসিড এবং মোট অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যাপাসিটি ১০৪.৪০-১০৯.১১ অ্যাসকরবিক এসিড/গ্রাম রয়েছে, যা শরীরে বিদ্যমান  Reactive Oxygen Species (ROS) ধ্বংসের মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি, Acute liver injury এবং Coronary heart disease প্রশমনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


পেয়ারার ন্যাচারাল জেলির প্রস্তুত নিয়মাবলী
জেলি তৈরি করার সময় ফলের রস ব্যবহার করা হয়। বেশি মিহি চালনি বা মসৃণ কাপড়ে ফলের শাঁসকে ছেঁকে নেয়া হয়। পেয়ারায় বিদ্যমান পেকটিন চিনির উপস্থিতিতে রস অথবা পাল্পকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে তাই এতে বাড়তি পেকটিন যোগ করার প্রয়োজন হয় না। পেয়ারার ন্যাচারাল জেলি প্রস্তুতকরণে উপকরণ (সারণি দ্রষ্টব্য)। হ্যান্ড রিফ্রাক্টোমিটার, ব্যালেন্স, সসপেন, ছুরি অথবা বটি, বোতল, চামচ, মসৃণ পাতলা কাপড় ইত্যাদি যন্ত্রপাতি ও দ্রব্যাদি প্রয়োজন।

সারণি : পেয়ারার ন্যাচারাল জেলি তৈরির উপকরণ

উপকরণ পরিমাণ    
পেয়ারার রস  ১ কেজি
চিনি  ৪৫০ গ্রাম
লেবুর রস ১০০ মি.লি.
মধু     ৩০ গ্রাম


প্রস্তুত প্রণালী
রস নিষ্কাশন : পরিপুষ্ট অথচ কাঁচা পেয়ারা পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে নিতে হবে। পেয়ারার ওজনের অর্ধেক পরিমাণ পানি যোগ করে সিদ্ধ করতে হবে (সাধারণত ৩০-৩৫ মিনিট)। সিদ্ধ হওয়ার পর নেট দিয়ে রস আলাদা করে নিতে হবে। পরিষ্কার মসৃণ কাপড় দিয়ে রস ছেঁকে নেয়া ভাল।


জেলি তৈরিকরণ : উপকরণের পরিমাণ অনুযায়ী রস, চিনি, লেবুর রস আলাদা করে ওজন নিতে হবে।  এবার রসের সাথে চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিতে হবে। রান্না চলাকালীন সময় অনবরত নাড়তে থাকুন যাতে পাত্রের তলায় লেগে না যায়। মিশ্রণটি মোটামুটি গাঢ় হয়ে আসলে রিফ্রাক্টোমিটার দিয়ে ঘন ঘন গাঢ়ত্ব পরীক্ষা করতে হবে। রিফ্রাক্টোমিটারের পরিবর্তে শিট পরীক্ষার মাধ্যমে জেলি হয়ে যাওয়ার চ‚ড়ান্ত অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব।  টিএসএস ৫০-৫৫ ডিগ্রি ব্রিক্স অথবা কিছুটা ঘন হয়ে আসলে পরিমাপকৃত লেবুর রস যোগ করা যায়। টিএসএস ৫৬-৫৮ ডিগ্রি ব্রিক্স আসলে পরিমাপকৃত মধু যোগ করা ভাল। মিশ্রণটি ৬৫-৬৭ ডিগ্রি ব্রিক্স আসা (অথবা শিট পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ) পর্যন্ত রানা করতে হবে। অতপর চুলা থেকে পাত্রটি নামিয়ে জীবাণুমুক্ত বোতলে ভরে ভালোভাবে ছিঁপি এঁটে শুকনো ও ঠাণ্ডা জায়গায় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।


শিট পরীক্ষা : এই পদ্ধতিতে রান্নার সময় চামচ মিশ্রণের মধ্যে ডুবানো হয় এবং ঠাণ্ডা করে চামচ বেয়ে মিশ্রণটিকে পানি ভর্তি স্বচ্ছ গ্লাসে পড়তে দেয়া হয় । যদি এটা একাধারে না পড়ে শিটের আকারে স্বচ্ছ গøাসে পড়তে থাকে অর্থাৎ পানির উপরিতল থেকে তলা পর্যন্ত যেতে ছড়িয়ে না যায় তাহলে বুঝতে হবে জেলি হয়ে গেছে।
বোতল জীবাণুমুক্তকরণ : সসপেনে পানি নিয়ে তাতে বোতলগুলোকে ডুবিয়ে দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। ফুটানো হয়ে গেলে বোতলগুলোকে পাত্র থেকে উঠিয়ে পানি নিংড়িয়ে নেয়া ভাল।

 

সতর্কতা
বোতল জীবাণুমুক্ত করার সময় অধিক সময় ধরে ফুটানো যাবে না, এতে বোতলগুলো অস্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে। জেলি তৈরি করার সময় এমনকি বোতলজাত করার পরেও কোনোভাবেই হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাবে না, এতে ছত্রাক জন্মাতে পারে। রস ভালোভাবে ছেঁকে নিতে হবে, কোনোভাবেই রসের সাথে পাল্পের মিশ্রণ থাকা যাবে না। এতে জেলি অস্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে। যেহেতু পেয়ারায় পেকটিন বিদ্যমান তাই এতে বাড়তি পেকটিন যোগ করার প্রয়োজন হয় না।
হ্যান্ড রিফ্রাক্টোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে রস অথবা সিরাপে দ্রবণীয় কঠিন পদার্থের টিএসএস পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। যা ডিগ্রি ব্রিক্স হিসেবে প্রকাশ করা হয়।

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৭১২২৩১১২১, ই-মেইলঃ  mainuddinmolla@yahoo.com

 

বিস্তারিত
সিডেন্টারি লাইফ স্টাইল : স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রণ

মোরসালীন জেবীন তুরিন

বর্তমান যুগে আমরা সবাই ব্যস্ত, এই ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতার কারণে আমাদের জীবনযাত্রা কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, সাথে রয়েছে অসচেতন খাদ্যাভ্যাস। আমরা সবাই মানসিক পরিশ্রম করছি কিন্তু এর সাথে সাথে আমরা কায়িক পরিশ্রম করছি না। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও অসচেতন খাদ্যাভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে আমরা এমন কিছু রোগে আক্রান্ত হচ্ছি, যা একটু সচেতন হলেই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমাদের অসচেতনতার কারণে এই ধরনের রোগ আমাদের মৃত্যু ঝুঁকিতেও ফেলে দেয়।  এই অবস্থা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। সুস্থসবল জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিয়েও সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং জানতে হবে।


সিডেন্টারি লাইফ স্টাইল (Sedentar Life Style) হলো এমন ধরনের জীবনযাপনকে বোঝায় যেখানে ব্যক্তি নিয়মিত প্রয়োজনীয় শারীরিক পরিশ্রম করে না। বলা হয়ে থাকে যে,  একজন প্রাপ্তবয়স্কের ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম অথবা ৭৫ মিনিট ভারী/কঠিন ব্যায়াম সপ্তাহে করা উচিত। স্বাস্থ্যবিদরা বলে থাকেন যে, দিনে ১০ হাজার পদক্ষেপ অথবা ৫ মাইল হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো যা মানুষকে অসুস্থতার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে। WHO এর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ৬০-৮৫% লোক পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করে না। বিশ্বের মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে ৪র্থ কারণ হলো পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম না করা।


সিডেন্টারি লাইফ স্টাইল ঊ-এর ঝুঁকিসমূহ হচ্ছে  ডায়াবেটিস, অবেসিটি, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, উচ্চকোলেস্টেরল, ফ্যাটিলিভার, ক্যান্সার (কোলন, ব্রেস্ট, জরায়ু) প্রভৃতি।


ডায়াবেটিস
যখন শরীর শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না, অপর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন, ডায়াবেটিস বয়স জিন ফ্যাক্টর স্থূলতা  অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অপুষ্টি দুশ্চিন্তা ইত্যাদির কারণে ডায়াবেটিস হয়ে থাকে।
এর ফলে অতিরিক্ত ঘুম, অতিরিক্ত পিপাসা, বেশি বেশি ক্ষুধা পাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, পা জ্বালাপোড়া করা, শরীর দুর্বলতা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়।


প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়
প্রাথমিক প্রতিরোধের মধ্যে আমাদের স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখতে হবে, সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস করতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, তামাক ও দুশ্চিন্তা পরিহার করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপের প্রতিরোধের মধ্যে রোগীকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ/  ইনসুলিন গ্রহণ করতে হবে, ত্বকের (হাত, পায়ের) যত্ন নিতে হবে।


স্থুলতা
যখন শরীরে অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত ফ্যাট জমা হয়। যা স্বাস্থ্যর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়। এটি এক প্রকার অপুষ্টি যা শরীরকে অসুস্থ করে ফেলে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৩০০ মিলিয়নের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্থূলতার স্বীকার, আর স্থূলতা হলো মৃত্যু ঝুঁকি দমন করা যায় এমন রোগের মধ্যে দ্বিতীয়। কারণ এই স্থূলতার কারণে উচ্চরক্তচাপ, নিদ্রাহীনতা, বাত, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং সামাজিক সমস্যাও হয়।


স্থ‚লতার পরিমাপ করা যায় বিএমআইয়ের মাধ্যমে যা ওজন এবং উচ্চতার অনুপাত। প্রাপ্তবয়স্কদের বিএমআই সাধারণত ১৮ থেকে ২৫ থাকা উচিত। বিএমআই ২৫ এর উপরে গেলে স্থ‚লতা বলা যায়।
কোমরের পরিধি পরিমাপের মাধ্যমেও স্থ‚লতা বোঝা যায়। পুরুষদের কোমর ৪০ ইঞ্চি ও মহিলাদের কোমর ৩৫ ইঞ্চির বেশি হলে স্থ‚লতা ধরা হয়। স্থ‚লতার কারণগুলোর মধ্যে শারীরিক পরিশ্রম না করা, সুষম খাবার না খাওয়া, বিভিন্ন ওষুধ গ্রহণ এবং বংশগতকারণও থাকতে পারে। সেজন্য আমরা ফ্যাটজাতীয় খাবার কম গ্রহণ করব। বেশি ফল ও শাকসবজি খাবো, কাঁচা লবণ খাবো না, নিয়মিত ব্যায়াম করব এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকব।

 

হৃদরোগ
হৃৎপিণ্ড যখন রক্ত সরবরাহ করতে পারে না, রক্তশিরায় ব্লকেজ হয় হয় তখন হৃদরোগ হয় । এ ছাড়া বয়স, লিঙ্গ, বংশগত কারণে, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ধূমপান ইত্যাদির কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি থাকতে পারে।

 

প্রতিরোধের উপায়
হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে আমাদের ধূমপান পরিহার করতে হবে, ওজন, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করতে হবে। নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন, নাইট্রেটের ব্যবহার প্রয়োজনে সার্জারি করতে হবে।

 

উচ্চরক্তচাপ
যখন রক্ত শিরায় রক্তচাপ স্বাভাবিকের থেকে সবসময় বেশি থাকে তখন সেটা উচ্চরক্তচাপ ধরা হয়। সাধারণত বংশগতকারণে, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, স্থ‚লতা, বয়স, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে উচ্চরক্তচাপ হতে পারে।  সাধারণত ২০ বছরের ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি  ১৪০/৯০  রক্তচাপ হয় তবে তা উচ্চরক্তচাপ। ৫০ বছরের ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি ১৬০/৯৪  তবে তার ক্ষেত্রে তা উচ্চরক্তচাপ। মাথাব্যথা বুক ধরফর, ক্লান্তি, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি
উচ্চরক্তচাপের লক্ষণ।


প্রতিরোধের উপায়
প্রথমে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হবে, কাঁচা লবণ পরিহার করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, নিজের যত্ন নিতে হবে। প্রয়োজনে ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হবে।

 

ফ্যাটিলিভার
লিভারে যখন অনেক ফ্যাট জমা হয়। তখন সেটা ফ্যাটিলিভার, চর্বি জাতীয় খাবার বেশি গ্রহণের ফলে ফ্যাটিলিভার হয়। ফ্যাটিলিভার থেকে বাঁচতে হলে সঠিক ওজন বজায় রাখতে হবে। সুষম খাবার খেতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, তামাক জাতীয় খাবার গ্রহণে বিরত থাকতে হবে।

 

স্ট্রোক
মস্তিষ্কে যখন রক্ত সরবরাহ কমে যায়, মস্তিষ্কের কোষগুলো মারা যায় তখন তাকে স্ট্রোক বলা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে সকল মৃত্যুর কারণে মধ্য ৬.৭২% মানুষ স্ট্রোক করেই মারা যায়। লিঙ্গ, বয়স, বংশগত কারণে স্ট্রোক হতে পারে, স্ট্রোকের লক্ষণসমূহের মধ্য প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া, কথা বলায় অস্পষ্টতা  ও অসংলগ্নতা, মুখ বাঁকা ইত্যাদি হতে পারে।

 

প্রতিরোধের উপায়
স্ট্রোক হতে মুক্তি পেতে হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, ধূমপান পরিহার করতে হবে। ওজন ঠিক রাখতে হবে, শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।

 

ক্যান্সার
কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হলো টিউমার বা ক্যান্সার। সিডেন্টারি লাইফ স্টাইল এর জন্য কোলন ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার হতে পারে। তাই আমাদের ক্যান্সার বাঁচার জন্য তামাক পরিহার, সুষমখাবার গ্রহণ করা,  সঠিক ওজন বজায় রাখা, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, নিয়মিত মেডিক্যাল চেকআপ, প্রতিষেধক গ্রহণ করা উচিত।


নগর জীবনযাপনের কারণে আমরা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় (Physically inactive) হয়ে পড়ছি তবে সুস্থ থাকতে হলে আমাদের ইচ্ছে করেই পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের দেশে প্রচুর খাবার আছে কিন্তু পুষ্টিজ্ঞানের অভাবে আমরা অপুষ্ট। আমাদের ৪০০ গ্রাম ফল শাকসবজি খেতে হবে। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার নিয়মিত খেতে হবে। সকাল দশটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত রোদ থেকে ভিটামিন ডি গ্রহণ করতে হবে। আমাদের জীবনধারা (Life style) এর পরিবর্তন নিজেকে দিয়ে, নিজের পরিবারকে দিয়ে শুরু করতে হবে, নিরাপদ খাবার খেতে হবে এবং নিরাপদ খাবার উৎপাদনে নজর রাখতে হবে। সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে যে  “স্বাস্থ্যই সম্পদ ’’ য়

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বারটান, আঞ্চলিক কার্যালয় সিরাজগঞ্জ, মোবাইল : ০১৭২৩-৬৭২১৯২, ই-মেইল: rinbsmrau@gmail.com

 

বিস্তারিত
ঘেরের পাড়ে শসা চাষ : পাল্টে দিচ্ছে রূপসার গ্রামের চিত্র

মোঃ আবদুর রহমান

বিশ্ব সভ্যতার এখন সবচেয়ে আলোচিত আশঙ্কা করোনা পরবর্তী অনিবার্য খাদ্য সংকট। এরই মধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে। মহামারি করোনাভাইরাসের থেকেও অধিক ধ্বংসাত্মক এ সংকটে বিশ্বের প্রায় ৩ কোটি লোকের প্রাণহানি হতে পারে ধারণা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হওয়ায় বাংলাদেশও ওই আশঙ্কার আওতাভুক্ত। তবে আশার কথা, আমাদের দেশের উর্বর মাটি ও পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার তথা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারলে আসন্ন খাদ্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।


বাংলাদেশের আবাদি জমির পরিমাণ সীমিত। কিন্তু জনসংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা। কিন্তু জমি বাড়ছে না; বরং কমছে। সে সাথে উর্বরা জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন মাছের ঘের। তাই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার করোনা পরবর্তী খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে এসব মৎস্য ঘেরের পাড়ে বা বেড়িতে শসা ও অন্যান্য উপযোগী সবজি চাষের ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া একান্ত প্রয়োজন।
করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও রূপসা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মৎস্য ঘেরের পাড়ের জমিতে এ বছর ব্যাপক শসার চাষ হচ্ছে। গ্রামের রাস্তার পাশে বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে শুধুই সবুজে ঘেরা শসাক্ষেত ঘেরের পাড়ে সারি সারি মাচায় ঝুলছে শসা আর শসা। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকায় শসার বাম্পার ফলন হচ্ছে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসির ঝিলিক। ক্ষেত থেকে শসা তুলে এনে স্থানীয় আড়তে ব্যবসায়ীদের কাছে ন্যায্যমূল্যে শসা বিক্রি করতে পেরে কৃষকরা অনেক খুশি।


শসা একটি লাভজনক ও অর্থকরী সবজি। বর্তমানে আমাদের দেশে হাইব্রিড জাতের অনেক শসা চাষ হয়ে থাকে। এ জাতের শসার ফলন অনেক বেশি। এটি স্বল্প সময়ের সবজি। জাতভেদে বীজ বপণের ৩৫-৪০ দিন পর থেকেই ফল তোলা যায়। ধানের তুলনায় শসা চাষে ২/৩ গুণ লাভ হয়। অল্প পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় মৎস্য ঘেরের পাড়ে শসা চাষ এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।


মৎস্য ঘেরের পাড়ে শসা চাষ করে মাছের পাশাপাশি জমি থেকে একটা বাড়তি ফসল পাওয়া যায়। এতে পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত শসা বিক্রি করে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হওয়া যায়। ঘেরের পাড়ের মাটি বেশ উর্বর। এতে চাষকৃত শসা গাছ চারদিক থেকেই সূর্যের আলো পায়। এতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়। সাধারণত মৎস্য ঘেরের পাড় উঁচু হয়। তাই বৃষ্টির পানি দ্রæত সরে যায়। এ কারণে বর্ষাকালে ঘেরের পাড়ে খুব সহজে শসা চাষ করা যায়। ঘেরের ভেতর পানির ওপর মাচা তৈরি করে সেখানে শসা চাষ করায় বাড়তি জায়গা লাগে না। ঘেরের পাশে পানি থাকায় শসাগাছে পানি সেচ দিতে সুবিধা হয়। তা ছাড়া ঘেরের পাড়ের শসাগাছের পরিচর্যা করতেও  সুবিধা হয়।


তবে মৎস্য ঘেরের পাড়ে শসা চাষে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পোকার মধ্যে থ্রিপস, সাদা মাছি পোকা ও মাকড় এবং রোগের মধ্যে ডাউনি মিলডিউ শসার বেশি ক্ষতি করে। এ ছাড়া শসাগাছের পাতা ও ফলে অনুখাদ্য বোরন ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব দেখা যায়। অধিকন্তু, নিম্নমানের বীজ ব্যবহারের কারণে অনেক সময় শসার আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। তদুপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা ও অতি বৃষ্টিপাতের কারণে শসা চাষ ব্যাহত হয়। থ্রিপস ও সাদা মাছিপোকা দমনের জন্য ডেনিম ফিট-৫০ ডবিøউজি (১০ লিটার পানিতে ১.৫ গ্রাম) বা  টিডো-২০ এসএল (১০ লিটার পানিতে ২.৫ মিলি.) অথবা মোভেন্টো-১৫০ (১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি.) মাকড়ের জন্য ভারটিমেক-০১৮ ইসি (১০ লিটার পানিতে ১৫ মিলি.) বা অ্যামবুশ-১.৮ইসি (১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি.) অথবা মিটিসল- ৫ইসি. (১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি) আর ডাউনি মিলডিউ রোগ প্রতিকারের জন্য রিডোমিল গোল্ড এমজেড-৬৮ ডবিøউজি (১০ লিটার পানিতে ৫০ গ্রাম) বা এনট্রাকল-৭০ ডবিøউপি (১০ লিটার পানিতে ৫০ গ্রাম) ব্যবহার করা হয়। বোরন ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি পূরণের জন্য যথাক্রমে সলুবর বোরন (১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম) ও ম্যাগমা অথবা ম্যাগাভিট (হেক্টরপ্রতি ১৫ কেজি) ব্যবহার করা হয়। খরা মোকাবিলায় ঘেরের পাশ থেকে শসাগাছে পানি সেচ দেয়া হয়।


বসতবাড়ি কিংবা মাঠের চেয়ে ঘেরের পাড়ে শসা চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। অন্য ফসলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লাভ হওয়ায় মৎস্য ঘেরের পাড়ে শসা চাষে ঝুঁকে পড়েছেন কৃষকেরা। ঘেরে শুধুমাত্র মাছ ও ধান চাষ করে একসময় যাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটত, ঘেরের পাড়ে শসা ও অন্যান্য শাকসবজি চাষে এখন তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। মূলত ঘেরের পাড়ে শসা চাষ পাল্টে দিচ্ছে রূপসা উপজেলার অন্তত আঠাশ গ্রামের চিত্র। রূপসা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামের শসা চাষিরা জানান, এ বছর মৎস্য ঘেরের পাড়ে এক বিঘা জমিতে গ্রীন লাইন নামক হাইব্রিড জাতের শসা চাষ করেছে। এতে বীজ, সার, মাচা তৈরি, শ্রমিক ও কীটনাশক বাবদ প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরই মধ্যে ১শ’ মণ শসা (প্রতি মণ ৪ শ’ টাকা দরে) স্থানীয় আড়তে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। আরো প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার শসা বিক্রি করতে পারবে বলে আশা ব্যক্ত করছে। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকালে শসার ফলন ভালো হয় এবং দামও ভালো পাওয়া যায়। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও শসা চাষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী কৃষকের পাশে থেকে শসা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন ।


ঘেরের পাড়ে উৎপাদিত শসা কেনাবেচার জন্য গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে শসার মওসুমি আড়ত। স্থানীয়ভাবে এ আড়তকে ‘গালা’ বলা হয়। তাই শসা বিক্রি করতে সাধারণত পরিবহন খরচ লাগে না। কৃষকেরা খেত থেকে শসা তুলে এনে আড়তে বিক্রি করেন। শসা চাষে মহিলা ও বেকার যুবকসহ স্কুল-কলেজের ছাত্রদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে ট্রাকযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে এখানকার শসা। এতে করোনা মহামারির কারণে কৃষি ক্ষেত্রে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনসহ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হবে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা। ইমেইল : rahman.rupsha@gmail.com, মোবাইল ঃ ০১৯২৩৫৮৭২৫৬

বিস্তারিত
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ ব্যবস্থাপনা

কৃষিবিদ মোঃ ফজলুল করিম

উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা প্রাণিসম্পদে একটি সহজাত প্রবৃত্তি। স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠনে প্রাণিসম্পদের অবদান অপরিসীম। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে তা হচ্ছে পশুপাখির খাদ্যে গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে এন্টিবায়োটিকসের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং মানব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া।  


দৈহিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার (AGP) দীর্ঘদিন যাবৎ ক্রমাগতভাবে খামারিগণ কর্তৃক পশুপাখির খাদ্যে ব্যবহৃত হওয়ার প্রেক্ষিতে অণুজীব কর্তৃক এন্টিবায়োটিকসের প্রতি প্রতিরোধী হয়। এ ধরনের প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের ফলে মানব দেহে এন্টিবায়োটিকসের প্রতি প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এর ফলশ্রতিতে রোগাক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা অনেক সময় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এন্টিমাইক্রোবিয়ালস বিভিন্ন প্রকার রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। যদি প্রতিনিয়ত এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) তৈরি হতে থাকে তবে অদূর ভবিষ্যৎ জীবাণুুঘটিত রোগ চিকিৎসার জন্য কার্যকর কোনো ওষুধ পাওয়া যাবে না, ফলশ্রæতিতে অতি সাধারণ রোগেই অনেক মানুষসহ প্রাণিকুল এ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। ২০১৬ সালে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) জন্য পৃথিবীতে সাত লাখ (৭০০০০০) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে আমরা এখনই যদি এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করি তবে আগামী ২০৫০ সালে এক কোটি (১০০০০০) মানুষ মারা যাবে।


নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী প্রাণিসম্পদের প্রতিক‚লতা দুই ধরনের।  ১. এলার্জিক প্রতিক্রিয়া, ২. এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যেটি জনস্বাস্থ্যের হুমকির কারণ বলে বিবেচিত। ফলস্বরূপ, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা মতে, প্রাণিজাত পণ্য খাওয়ার ফলে মানব শরীরে কলিব্যাসিলোসিস, এন্টারোকক্কাস, কম্পাইলোব্যাকটার, কলেরা বা ডাইরিয়া, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, ক্লোসট্রিডিয়াম ইত্যাদি এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)  রোগগুলো ছড়িয়ে পড়ে।


এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)  
কোনো জীবাণুু এন্টিমাইক্রোবিয়াল বা এন্টিবায়োটিক এর প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেললে বা এন্টিমাইক্রোবিয়াল (এন্টিবায়োটিক) এর প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে সক্ষম হলে ওই এন্টিমাইক্রোবিয়াল (এন্টিবায়োটিক) দিয়ে ওই  জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট কোনো রোগের চিকিৎসা ফলপ্রসু হয় না বা রোগীকে সুস্থ করা যায় না, জীবাণুুর এ পরিবর্তনকে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বলে। এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)  একটি মারাত্মক সমস্যা যা জনস্বাস্থ্য  সুরক্ষা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবিভূত হয়েছে।


সুপার বাগ (Super bug) বা মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স ওরগ্যানিজম (MDRO)
কোনো জীবাণু যখন একই সাথে অনেকগুলো এন্টিবায়োটিক এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয় তখন তাকে সুপার বাগ বা মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স ওরগানিজম বলে।


এন্টিমাইক্রোবিয়ালস এবং এন্টিবায়োটিক  
এন্টিমাইক্রোবিয়ালস এক প্রকার জৈব বা অজৈব উপাদান যা এক বা একাধিক জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে জীবাণুুর কার্যকারিতা নষ্ট করতে সক্ষম, জীবাণুু ঘটিত নানা রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। যেমন- পেনিসিলিন, টেট্রাসাইক্লিন, মেট্রোনিডাজল ইত্যাদি। এদের মধ্যে যে সব উপাদান শুধুমাত্র ব্যাক্টেবিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর তাদেরকে এন্টিবায়োটিক বলে। যেমন- পেনিসিলিন, জেন্টামাইসিন, স্ট্রেপ্টোমাইসিন ইত্যাদি।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) কেন এবং কিভাবে হয়


বিংশ শতাব্দিতে এন্টিবায়োটিকের আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বার উন্মোচন করেছে। অদ্যবধি এ এন্টিবায়োটিক কোটি কোটি মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীকুলের জীবন রক্ষা করে চলেছে। তবে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) শুরু হয়েছে। এন্টিবায়োটিক এর মাত্রারিক্ত ব্যবহার এবং অপব্যবহার এ এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

প্রাণিজ পণ্য অনিরাপদ হওয়ার কারণসমূহ
গরু মোটাতাজাকরণে ফিড এডিটিভস যেমন প্রোবায়োটিকস্, এনজাইম, এমাইনো এসিড, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স, ইউরিয়া ইত্যাদি এর ফলে ভিটামিন ও খনিজ লবণের ঘাটতি মিটিয়ে প্রাণীর খাবার শরীরে কাজে লাগে এবং পশম খুব চকচকে হয়। তাছাড়া ক্যালসিয়াম জাতীয় ওষুধে প্রাণী খুব শক্তিশালী হয় এবং দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অনুরুপভাবে মেটাবলিক স্টিমুলেন্টস যেমন- বিউটাফসফেন, টলডিমফস ইত্যাদি। অতিদ্রæত গরুর শরীরে মাংস বৃদ্ধির জন্য ভিটামিনের পাশাপাশি টনিক জাতীয় ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধ ব্যবহারের ফলে গরুর মাংসের গুণগত মানের কোনো ক্ষতি হয় না বা মাংস খাওয়ার ফলে মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। এসব রাসায়নিক উপাদান সঠিক মাত্রায় ব্যবহার বিজ্ঞানসম্মত এবং স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ। তবে মাত্রাতিরিক্ত ফিড এডিটিভস, প্রিজারভেটিভস ও কনজারবেটিভস এর  মাধ্যমে প্রাণির মাংস ও মুরগির ডিমে ভেজাল ঢুকে পড়ে।
স্টেরয়েড হরমোন যেমন ডেক্সামেথাসন, ডাইথাইলস্টিলব্রেল, হেক্সাট্রল, জেরানল ইত্যাদি এক ধরনের জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। গরু মোটাতাজাকরণে এর ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। দ্রুত গরুকে মোটাতাজাকরণের জন্য যেসব বাণিজ্যিক স্টেরয়েড ইনজেকশন ব্যবহার করা হয় তা হল ডেক্সাভেট, ডেক্সাকট, জেকাসন, ওরাডেক্স, প্রিক্সোনল-এস, প্রেডনিভেট, প্রেডনিসলন  ইত্যাদি।


এছাড়াও পোলট্রি ডিম ও মাংস সাধারণত ফিডে দূষকের মাধ্যমে পোলট্রির মাংস ও ডিম তথা ফিডে ভেজাল মেশানো হয়। যেমন- ঝিনুকের গুঁড়ার মাধ্যমে ই. কোলাই/ সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে। টাইলসের গুঁড়া লাইমস্টোনের সাথে মেশানোর ফলে পোলট্রি খাদ্য দূষিত হয়। ট্যানারি বর্জ্য বা মিট ও বোন মিলের লেড, ক্রোমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিকের উৎকৃষ্ট উৎস। ভুট্টা হলো পোলট্রি খাদ্য তৈরির সিংহ ভাগ অংশ দখল করে আছে। কিন্তু কালো ভুট্টা রোগজীবাণু তৈরির ডিপো হিসেবে কাজ করে। তেল বিহীন চালের কুড়া পোলট্রিকে খাওয়ানোর মাধ্যমে পোলট্রিতে নানাবিধ রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) এর কারণে, অতিরিক্ত ও সঠিক মাত্রায় ভেট. ওষুধ ব্যবহার করায় সুপারবাগ নামক পৃথিবী ধ্বংসকারী ব্যাধি আজ জেঁকে বসেছে। উত্তম মানের ওষুধের অভাবে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ। উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতায় দক্ষ জনবল ও দক্ষতার বড় অভাব। অতিরিক্ত রোগ সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে উপযুক্ত কৌশলের অভাব। দুর্বল রোগজীবাণু শণাক্তকরণ পদ্ধতি। খামার ও খামারিদের সাথে চিকিৎসার নামে প্রতারণার মাধ্যমে শিশুসহ মানব স্থাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাণিসম্পদে নিষিদ্ধ উপকরণগুলো
জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে গবাদিপ্রাণি ও পোলট্রি খাদ্যে মানবস্থাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে উল্লিখিত উপকরণগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে-১. এন্টিবায়োটিক  ২. এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেসিডউ ৩. গ্রোথ হরমোন ৪. স্টেরয়েড ৫. ক্রোমিয়াম ৬.পেস্টিসাইড ৭. জিএম প্রোডাক্টস ৮. মাইকোটক্রিন ৯. ভারি ধাতু ১০. তেজস্ক্রিয় পদার্থ ১১. বিসমাথ ইত্যাদি।

 

নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে করণীয়
প্রাণিজ শিল্পে এন্টিবায়োটিকসের ব্যবহার সম্পর্কিত তিনটি মূলনীতি অনুসারিত হলে এন্টিবায়োটিকসের প্রতি অহেতুক প্রতিরোধী ক্ষমতা সৃষ্টি করার মূল ফ্যাক্টরগুলো বহুলাংশে হ্রাস বা বিদূরিত করা যাবে। ১. মানুষের মারাত্মক সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য ব্যবহার্য ‘সর্বশেষ’ ধরনের এন্টিবায়োটিকস্ মানুষের খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতিপালিত পশুপাখি বা কৃষিতে ব্যবহার করা উচিত নয়। ২. পশুপাখির রোগ প্রতিরোধকল্পে এন্টিবায়োটিকসের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে। সংক্রমণ প্রতিরোধের পদ্ধতি (এন্টিবায়োটিকস ব্যতীত) উন্নয়ন ও বিস্তৃত করতে হবে। ৩. গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে এন্টিবায়োটিকস ব্যবহার পর্যায়ক্রমে পরিত্যাগ করতে হবে।


বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে পরিমাণ প্রোটিনের প্রয়োজন তার চাহিদা মেটানোর জন্য খামারিদেরকে প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মীরা গরু মোটাতাজাকরণের কলাকৌশল সম্প্রসারিত করছেন। যদিও সরকার খুব সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে আমেরিকা থেকে ব্রাহমান জাতের যাঁড়ের বীজ আমদানি করে সরকার যদি বৈধভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পশু আমদানিসহ ‘বাংলাদেশ ও পশুজাত পণ্য সঙ্গনিরোধ আইন’ ২০০৫ (২০০৫ সনের ৬নং আইন) প্রয়োগ করে তবে এ সমস্যার সমাধান হবে।
 

যেহেতু গবাদিপশুতে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ মাংসের গুণাগুণ নষ্ট করে দেয় এবং মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাই মোটাতাজা করার জন্য গরুতে স্টেরয়েডের ব্যবহার মোটেই কাম্য নয়। ব্যবহৃত ওষুধ হতে পারে  কৃমিনাশক, ফিড এডিটিভ বা মেটাবোলিক স্টিমুলেন্টস।


এছাড়াও ১. প্রাণিসম্পদের খাদ্য ও ফিড এডিটিভের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা। ২.  ওষুধ, হরমোন, স্টেরয়েড ও তার রেসিডিউ এর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা। ৩. বেসরকারি খাতে গুণগত মানসম্পন্ন পশুপাখির খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ উৎপাদনের জন্য গবেষণাগার পরীক্ষার মাধ্যমে সনদ প্রদান করা। ৪. প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় সহায়তা করা। ৫. প্রাণিসম্পদ হতে উৎপাদিত পণ্য ও উপজাতের রুটিন এনালাইসিস পরিচালনা করা। ৬. গুণগতমান সম্পন্ন পশুপাখির খাদ্য ব্যবহারে জনসচেতনতা তৈরি করা। ৭. এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে প্রচার- প্রচারণার মাধ্যমে জাতীয় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ৮. স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ের কারিকুলামে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও এর প্রতিরোধী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ৯. এক স্বাস্থ্য, এক বিশ^ সম্পর্কিত ধারণার অবতারণা করতে হবে (‘এক স্বাস্থ্যনীতি মিশনের’ মতে, মানব স্বাস্থ্য, প্রাণী স্বাস্থ্য ও বাস্তুসংস্থানের পরিবেশ একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল। ভেটেরিনারিয়ান, চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবিদের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই মানুষ ও অন্যান্য প্রজাতির স্বাস্থ্যের উন্নতি করা সম্ভব যা ‘এক স্বাস্থ্যের’ লক্ষ্য)। ১০. জাতীয় রেফারেন্স গবেষণাগার স্থাপন করা প্রয়োজন। ১১. নতুন নতুন আবির্ভাবযোগ্য রোগ ও তার প্রতিরোধী হওয়া সম্পর্কে কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও নির্ণয় করতে হবে। ১২. নতুন চিকিৎসা সম্পর্কে গবেষণা ও দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। ১৩. উত্তম স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও আদর্শিক খামার পরিচালনার নীতি অনুসরণে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১৪. কোনো খামার স্থাপনের আগে মানসম্মত প্রশিক্ষণ এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ১৫. প্রয়োজনীয় লাইসেন্সকৃত ওষুধের তালিকা ও আদর্শ চিকিৎসা নীতিমালা থাকতে হবে। ১৬. খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা  কৌশল প্রস্তুত করতে হবে। ১৭.  উত্তম কৃষি অনুশীলন চর্চা করা ভালো। ১৮. উত্তম শিল্প অনুশীলন ও উত্তম ব্যক্তিগত পরিচর্যা বাড়াতে হবে। ১৯. নিরাপদ খাদ্যে নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতা বাড়াতে হবে। ২০. রোগব্যাধি মুক্ত খামার পরিচালনা করতে হবে। ২১. ইচ্ছামত ড্রাগ নিবন্ধন দেয়া যাবে না। ২২. ওষুধের প্যাকে উত্তম লেবেল, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোতীর্ণের তারিখ সুস্পষ্ট থাকতে হবে। ২৩. ওষুধের প্রত্যাহার কাল অবশ্যই মানতে হবে। ২৫. প্রাণিস্বাস্থ্য ও মানবস্বাস্থ্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ২৬. এন্টিমাইক্রোবিয়াল বা এন্টিবায়োটিক গ্রহণ বা ব্যবহারের আগে বিএমডিসি বা বিভিসি রেজিস্ট্যার্ড ডাক্তার এবং বিশেষজ্ঞের এর ব্যবস্থাপত্র নেয়া প্রয়োজন। ২৭. সংক্রামক রোগের (Infectious diseases) চিকিৎসায় যতদূর সম্ভব স্বল্প বর্ণালীর (Narrow spectrum) এন্টিমাইক্রোবিয়াল বা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা। ২৮. এন্টিমাইক্রোবিয়াল বা এন্টিবায়োটিক এর সঠিক মাত্রায় এবং পূর্ণ কোর্স ব্যবহার করা প্রয়োজন। এন্টিবায়োটিক অপর্যাপ্ত ব্যবহার অগজ এর অন্যতম কারণ। ২৯. অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ¦র সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়া ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা ভালো। ৩০. প্রাণিসম্পদে বা মৎস্যে ওজন বর্ধক (Growth promoter) হিসেবে এন্টিবায়োাটিকের ব্যবহার দন্ডনীয় অপরাধ। ৩১. সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ৩২. গবাদি পশু পাখির খামারের জীব নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ৩৩. নিয়মিত খামার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।


বিজ্ঞানীদের মতামত হচ্ছে, জীব নিরাপত্তা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে এবং এর সাথে ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচি, all-in all-out পদ্ধতি, বিভিন্ন বয়সী মুরগি স্বতন্ত্রভাবে প্রতিপালন, ভ্যাকসিন প্রদান মনিটরিং, সুষম খাদ্য সরবরাহ ইত্যাদি অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পন্থায় গৃহীত হতে হবে। আমাদের দেশের প্রাণিজ আমিষ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশিয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি (মাছ, মাংস, ডিম, দুধ এসবের বিভিন্ন প্রোডাক্ট) বিদেশের বাজারে লোভনীয় সামগ্রী হিসেবে গৃহীত হবে এটাই আমাদের আন্তরিক কামনা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা, মোবাইল : ০১৭২৪১৪১৬৬২; ই- মেইল : fazlurahi@gmail.com      

বিস্তারিত
ভোক্তাপর্যায়ে উত্তম মৎস্য সরবরাহে সচেতনতা

কৃষিবিদ মোঃ আলতাফ হোসেন চৌধুরী

বর্তমানে সারা বাংলাদেশে শীতকালীন মৌসুমি হাওয়া বইছে এবং এ সময়ে তাপমাত্রাও অনেক কম থাকে বিধায় মাছ চাষে অনেক সমস্যা দেখা যায়। মাছ চাষ মূলত : তিনটি বিষয়ের ওপর ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বিষয়গুলো হলো : ১. ফিড (খাবার), ২. সিড (পোনা), ৩. ম্যানেজমেন্ট (ব্যবস্থাপনা)। ওই বিষয়গুলোর একটির ঘাটতি হলে মাছ চাষ ব্যাহত হয়। তাছাড়া মাটি ও পানির ভৌত রাসায়নিক গুণাবলি মাছ চাষের জন্য বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তাপমাত্রা কম ও ভৌত রাসায়নিক গুণাবলির সঠিক সমন্বয় মাটি ও পানিতে বিদ্যমান না থাকার কারণে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং বৃদ্ধি জটিল হয়ে পড়ে। অতীতে প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে ব্যাপক মৎস্য আহরণ সম্ভব ছিল কিন্তু বর্তমানে মনুষ্য সৃষ্টিকারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে মৎস্য আহরণ হ্রাস পাওয়ার ফলে চাষের মাছের ওপর যেমন নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি ভোক্তাপর্যায়ে উত্তম মৎস্য খাদ্য সরবরাহের জন্য পূর্বের তুলনায় আমাদের দায়িত্ব ও অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ভোক্তাপর্যায়ে উত্তম মৎস্য সরবরাহের জন্য নি¤েœাক্ত কাজসমূহ অবশ্য পালনীয়।
 

উত্তম মৎস্য চাষ
উত্তম মৎস্য চাষ হলো মাছ চাষ ও আহরণোত্তর পর্যায়ে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত নিয়মাবলি অনুসরণ করে দূষণমুক্ত ও নিরাপদ মাছ উৎপাদন করা। তবে এটি অর্থনেতিকভাবে লাভজনক, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং পরিবেশ সহনীয় হতে হবে। সামগ্রিকভাবে খামার পরিকল্পনা, পুকুর তৈরি, পোনার মান, খাদ্য ও পানির গুণাগুণ ব্যবস্থাপনা, আহরণ ও আহরণোত্তর পরিচর্যা, পরিবহণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্থাৎ মাছ চাষ থেকে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে উত্তম মৎস্য চাষ অনুশীলন করতে হবে ।

 

উত্তম মৎস্য চাষের উদ্দেশ্য
ভোক্তার জন্য নিরাপদ ও মানসম্পন্ন মাছ উৎপাদন করা। মানবদেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে এমন রোগজীবাণুু দ্বারা যাতে মাছ সংক্রমিত না হয় তা ব্যবস্থা করা। ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক যেমন-ক্লোরাম ফেনিক্যাল, নাইট্রোফুরান বা কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যাদি (ফরমালিন) বা কীটনাশক দ্বারা দূষিত হবে না। মাছ চাষের শুরু থেকে আহরণ ও আহরণোত্তর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা যাতে উৎপাদিত পণ্য মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

 

নিরাপদ মাছ
নিরাপদ মাছ হলো পুকুরে এবং খামারে উৎপাদিত এবং সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত এবং তাতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোনো উপাদান না থাকা। এ ক্ষেত্রে একজন মৎস্য চাষিকে এ মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তার চাষপদ্ধতি সম্পূর্ণ ক্রটিমুক্ত ছিল এবং তাতে পণ্য দূষণের কোনো উপাদান ছিল না।


নিরাপদ মাছ উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার কারণগুলো
পুকুরে ও ঘেরে রোগাক্রান্ত পোনা বা পিএল (পোস্টলার্ভি) মজুদ। রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটতে পারে এমন কোনো উপাদান যেমন-হাঁসমুরগির বিষ্ঠা, গোবর, মানুষের মলমূত্র ব্যবহার করা। মাছ চাষে নিষিদ্ধ ঘোষিত এন্টিবায়োটিক (যেমন-নাইট্রোফুরান) রাসায়নিক দ্রব্যাদি যেমন- ম্যালাকাইট গ্রীন, মিথিলিন বালু ব্যবহার করা। অনুমোদিত ওষুধ বা রাসায়নিক দ্রব্যাদি মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। পুকুরে বা ঘেরে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শ্রমিক দিয়ে কাজ করা। সর্বোপরি মাছে অপদ্রব্য পুশ করা।


অনিরাপদ মাছ উৎপাদনের ক্ষতিকর প্রভাব
অনেক চাষি না জেনে অননুমোদিত ওষুধ  ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি মাছ চাষে ব্যবহার করে থাকে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আহরণোত্তর পরিচর্যার কারণেও মাছ এ খাদ্য হিসেবে অনুপযুক্ত হয়।
পুকুরে এবং ঘেরে নিরাপদ এবং গুণগতমান সম্পন্ন মাছ উৎপাদনে চাষিদের করণীয়
চাষিদের রোগমুক্ত মাছের পোনা ও পিএল মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাদ্যের গুণগতমান নিশ্চিত হয়ে লেবেলিং ভালো মানের খাদ্য ক্রয় করতে হবে এবং নিয়মিত ও প্রয়োজন মোতাবেক ব্যবহার করতে হবে। পচা, বাসি, নিম্নমানের এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার ব্যবহার করা যাবে না। অনুমোদিত এবং নিষিদ্ধ ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি সম্পর্কে ধারনা থাকতে হবে। আহরণের ৭-১০ দিন পূর্বে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিতে হবে। পুকুরে ব্যবহৃত সকল প্রকার খাবার, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ওষুধ, পোনা খাদ্য ইত্যাদির মাত্রা, নাম, উৎস, ব্যবহারের কারণ ও তারিখ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে রেকর্ড বইয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।


ঘের বা খামারে অনুসরণীয় প্রধান প্রধানভালো প্র্যাকটিসগুলো
আশেপাশের বাড়িঘর, গৃহপালিত পশুর খামার, আবর্জনা ইত্যাদি হতে পুকুর বা ঘের দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন স্থানে ঘের নির্মাণ করতে হবে। পার্শ্ববর্তী নদী, খাল, বিল অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে ঘেরে বা পুকুরে পানি দূষণের সম্ভাবনা আছে কি না জানতে হবে। বন্যাপ্রবণ, ময়লা-আবর্জনার স্ত‚পের আশপাশে খামারের স্থান নির্বাচন করা যাবে না। খামার প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং খামারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি (জাল, বাকেট, বাস্কেট ইত্যাদি) পরিষ্কারও জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। খামারে কর্মচারী ও মানুষের যথেচ্ছ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেবল নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে হবে। খাদ্যের মান এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থে ২-৩ মাসের মধ্যে মজুদকৃত খাদ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অতিবর্ধনের জন্য হরমোন জাতীয় খাবার ব্যবহার করা যাবে না। কাঁচা খাবার সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না। কেবল সর্বশেষ উপায় হিসেবে অনুমোদিত ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ওষুধ সংরক্ষণে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সঠিক ব্যবহার বিধি অনুসরণ করতে হবে এবং ওষুধ ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। অবশেষ নিঃশেষে (উইথড্রয়াল পিরিয়ড) সময় মেনে চলতে হবে। ভোরে অথবা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মাছ আহরণ করতে হবে। আহরণের ২ দিন আগে খাবার বন্ধ করতে হবে। আহরণের পূর্বে ক্ষতিকারক জীবাণুু ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যাদি আছে কি না পরীক্ষা করতে হবে। পুকুর ও ঘেরের জমির বৈধ মালিকানা থাকতে হবে। আশপাশের জনগোষ্ঠেীর জীবন-জীবিকা ও যাতায়াত ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন জায়গায় খামার ও চিংড়ির ঘের করা যাবে না। শ্রমিকের লিখিত নিয়োগপত্র থাকতে হবে। শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী খামারে ও ঘেরে শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। ফরমালিনযুক্ত মাছ  ব্যবহারকারী দায়ী ব্যক্তি দায়িত্বরত কর্মকর্তার কাছে ধরা পড়লে ৫০০০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। (মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৯৭  অনুযায়ী)


মাছ ক্রয়ের সময় ভোক্তা কর্তৃক লক্ষণীয় বিষয়গুলো
ফরমালিনযুক্ত মাছের চক্ষুগোলক ভেতরের দিকে থাকে, ফুলকা কালচে বর্ণের হয়, শুষ্ক ত্বক এবং মাছে মাছি পড়বে না ইত্যাদি লক্ষণীয় বিষয় স্মরণ রাখতে হবে।
মাছ উৎপাদনের বিষয়টি এখন আর শুধু আহরণোত্তর পরিচর্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খামারে মাছ উৎপাদনের প্রতিটি স্তর এমনকি ব্যবহৃত উপকরণগুলোর উৎস যথাযথ মাননিয়ন্ত্রণ নিরাপদ মাছ প্রক্রিয়ার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। তাই ভোক্তাপর্যায়ে উত্তম মৎস্য সরবরাহ করতে উত্তম মৎস্য চাষের প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে এটাই  হোক উত্তম মৎস্য চাষের মূলকথা।

খামার ব্যবস্থাপক, মৎস্যবীজ উৎপাদন খামার, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা। মোবাইল : ০১৭১২৪০৮৩৫৩; ই- মেইল : Chowdhari_33@yahoo.com                                                                                         

 

                                                                   

 

বিস্তারিত
কবিতা (মাঘ- ১৪২৭)

নিরাপদ সবজি
ড. খান মোঃ মনিরুজ্জামান১

সবজি সাবলীল তরতাজা দরকারি,
সময়ের চাহিদা শাকসবজি বাহারি।
পুঁই পালং পেঁপে কুমড়া কচু করলা,
লালশাক লাউ কাঁটানটে কাঁচকলা।
ফুলকপি বাঁধাকপি ওলকপি মুলা,
বরবটি টমেটো গাজর শাকছোলা।
সিতালাউ আলু  ব্রোকলি কাঁকরোল,
শালগম উচ্ছে বেগুন ঢেঁড়স পটোল।
ঝিঙা চিচিঙ্গা এমন সবজি সমাহার,
মানব কল্যাণে সব খোদার উপহার।

সবজি খাওয়াতে নেই কোনো বিপত্তি,
মাছ মাংস চাল গমে যতনা আপত্তি।
শাকসবজিতে কোনো অভিযোগ নাই,
নিয়মিত খেলে দেহে আসে না বালাই।
ভাত সাদা, রুটি সাদা, চিনি সাদা রং,
সাদা লবণ বেশি খেলে কি যে ভংচং।
বাড়ে প্রেসার, সুগার, কোলেস্টেরল,
এসব স্বাস্থ্য নষ্টের ভেল্কিবাজি খেল।
সবজি সুন্দর স্বাস্থ্যসম্মত দরকারি,
পরিমিত স্বাস্থ্যে প্রজ্ঞা বেজায় ভারি।

নিরাপদ সবজি উৎপাদন সমাচার,
মুজিববর্ষে মোদের এই অঙ্গীকার।
বালাইনাশকে যে বিষাক্ত তরকারি,
নিরাপদ সবজি আজ বড় দরকারি।
বালাইনাশকের পরিচ্ছন্ন ব্যবহার,
যথা সারে নিরাপদ সবজি উপহার।
সবজিপোকা দমনে ফেরোমন ফাঁদ,
ললনার ছলনায় ঠিক পোকা প্রমাদ।
জৈব বালাইনাশক এ সময়ের দাবি,
ইয়েস দৃষ্টিভঙ্গি ভালো সবজির চাবি।

শাকসবজি ভিটামিনের কারখানা,
মাঠে মাঠে তৈরি এসব সোনা দানা।
ভিটামিন মিনারেলে ভরা সারাদেশ,
স্বর্গসুখে ভরা আমাদের বাংলাদেশ।
দেহে ভিটামিন, মিনারেলের অভাব,
বিলক্ষণ প্রকাশে অভাবেরই স্বভাব।
সবজি সামঞ্জস্য সুন্দর শরীর কাজে,
যেখানে যেমন সেখানে তেমন ত্যজে।
দেহ রাজকাজে বলিহারি জিতেন্দ্রিয়,
সুখস্বাস্থ্য সম্পদে সবজি সবার প্রিয়।

১জেলা প্রশিকক্ষণ অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঝিনাইদহ, মোবাইল : ০১৭১২৮২২৭৪৯, ই- মেইল : dr. md. monir7@gmail.com 2 ঊর্ধ্বতন

 

গমের বøাস্ট রোগের কথা
কৃষিবিদ মোঃ মুজাহিদ-ই-রহমান২

শুনেন শুনেন ভাই সকলে
                             শুনেন দিয়ে মন,
গমের একটি নতুন রোগ
                            বøাস্টের কথা করিব বর্ণন ।
তিন দশক আগের কথা
                     ব্রাজিল দেশের গমে,
এই বøাস্ট রোগের জীবাণু
                         সমস্যা হয়ে জমে ।
এর পর দক্ষিণ আমিরিকায়
                    বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে,
আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে
                               গমের মহামারি হয়ে।
হঠাৎ করে সোনার দেশে
                             বøাস্ট রোগ চলে এলো,
ষোলো সালে কয়েক জেলায়
                              গমের শীষ সাদা হয়ে গেল ।
দিশেহারা আমরা সবাই
                                 কৃষক সরকার মিলে,
বলা হলো দমন হবে
                                 সঠিক নিয়মে ব্যবস্থা নিলে ।।
শুনেন শুনেন ভাই সকলে
                             শুনেন দিয়া মন,
গমের বøাস্ট রোগের লক্ষণ
                         এবার করছি  বর্ণন ।
হঠাৎ করে সবুজ শীষ
                      পুড়ে সাদা হয়ে যায়,
আর্দ্র-গরম আবহাওয়ায়
                    তা অতি দ্রæত ছড়ায় ।
সাধারণত রোগ হয় শীষে
                  শীষের মাঝে, গোড়া বা ওপরে,
আক্রমণ হলে পরে
                          ওপরের দিকে যাবে পুড়ে।।
শুনেন শুনেন ভাই সকলে
                   শুনেন দিয়ে মন,
এ রোগের দমন ব্যবস্থাপনা
                  এবার করিব বর্ণন।
বীজের দ্বারায় ছড়াতে পারে
                  তাই বীজ শোধন করা,
অনেক সুফল বয়ে আনে
                       বীজ শোধনের দ্বারা ।
গমের রোগ প্রতিরোধ নিমিত্ত
                   বারি গম তেত্রিশ,
করিলে চাষ মিলেবে মুক্তি
                  পাবেন রোগমুক্ত শীষ।
অগ্রহায়ণের শুরু দিকে
                   গমের বীজ বপন করুন,
শীষের সময় খারাপ আবহাওয়া
                বুদ্ধি করে পরিহার করুন।
সময় মতো সঠিক যতœ নিলে
                    সঠিক মাত্রায় ছত্রাকনাশক দিয়ে,
এক দুই বার স্প্রে করলে
                  থাকবেন ভাই নির্ভয়ে।
ভয় নাই ভাই গম উৎপাদনে
             সঠিক সময়ে গম বুনে,
সঠিক নিয়মে গম ফলালে
                 থাকব মোরা সুখী মনে।।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর, মোবাইল : ০১৭১৭৪৩৪৯০৬৬, ই- মেইল :mmer_bari@yahoo.com
 

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (মাঘ ১৪২৭)

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মোছা :  শেফালি বেগম,  গ্রাম: সরফরাজপুর, উপজেলা: চৌগাছা, জেলা: যশোর
প্রশ্ন: পেঁয়াজে কাটুই পোকা দমন বিষয়ে জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর: এ পোকা রাতের বেলা মাটি বরাবর গাছ কেটে দেয়। সকাল বেলা চারা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল বেলা কেটে ফেলা চারার আশে পাশে মাটি খুঁড়ে পোকা বের করে মেরে ফেলতে হবে এবং সেচের পানির সাথে কেরোসিন মিশিয়ে সেচ দিতে হবে। রাতে ক্ষেতের মাঝে মাঝে আবর্জনা জড়ো করে রাখলে তার নিচে কীড়া এসে জমা হবে, সকালে সেগুলোকে মেরে ফেলতে হবে। এছাড়া পাখি বসার জন্য ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে দিয়েও এ পোকা দমন করা যায়। আক্রমণ বেশি হলে বাইপোলার ৫০ ইসি বা সার্টার ৫০ ইসি ১.৫ মিলি./লি. হারে পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
মোঃ  শরিফ উদ্দীন, গ্রাম: পিরোজপুর, উপজেলা: মেহেরপুর সদর, জেলা: মেহেরপুর
প্রশ্ন: ছোলা গাছের ভেতরের পাতাগুলো হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায়। এমনকি ছোলা গাছ ঝাকি দিলে সব পাতা ঝরে পড়ে। এ সমস্যা কিভাবে দূর করব ?
উত্তর:  ছোলা গাছের এ সমস্যাটিকে বট্রাইটিস গ্রে মোল্ড বলা হয়ে থাকে। এটি ছত্রাকজনিত। ছোলা গাছের এ সমস্যা দূরীকরণে প্রথমে দেখতে হবে ক্ষেতের ছোলাগাছ ঘনভাবে লাগানো কি না। যদি সেটি হয় তবে ছোলাগাছ পাতলা করতে হবে। এছাড়া আক্রান্ত গাছে অ্যাক্রোবেট এম জেড ২ এমএল প্রতি লিটার পানিতে অথবা অটোস্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর ২ থেকে ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। এমনকি রোগ প্রতিরোধী বারি ছোলা ১০ বা বারি ছোলা ১১ জাতের চাষ করলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
মো. ইব্রাহিম তালুকদার, গ্রাম: দৌলতপুর, উপজেলা: নড়াইল সদর, জেলা: নড়াইল
প্রশ্ন : পেঁয়াজের ভালো ফলন পেতে কী করণীয় ? জানাবেন।
উত্তর : পেঁয়াজের বৃদ্ধি এবং ভালো ফলনের জন্য সালফার সার প্রয়োগ জরুরি। কারণ পেঁয়াজের কন্দ উৎপাদনে সালফার ও ম্যাগনেসিয়ামের মধ্যে সালফারের গুরুত্ব অপরিসীম। পরীক্ষায় পেঁয়াজের বৃদ্ধি পর্যায় থেকে শুরু করে সংরক্ষণ পর্যায়ে র্পেঁয়াজের ফলন নিয়ন্ত্রিত জাতের তুলনায় ২৯.৪১% বেশি পাওয়া যায়। এমনকি প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে পেঁয়াজে গুণগত মান অপেক্ষাকৃত উত্তম। এ প্রযুক্তিতে সালফারের ট্রিটমেন্ট হলো ৩৩ কেজি/হেক্টর। এসব পদ্ধতি মানলে আশা করি অবশ্যই ভালো ফলন পাবেন।
মো: নিয়ামুল কবীর, গ্রাম: রনসিয়া, উপজেলা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন: নেটেড মেলন চাষের সারের প্রয়োগমাত্রা সর্ম্পকে জানাবেন।
উত্তর : নেটেড মেলন চাষের জন্য পচা গোবর সার ১০০০০ কেজি, ইউরিয়া ১৫০ কেজি, টিএসপি ১৭৫ কেজি, এমওপি ১৫০ কেজি, জিপসাম ১১০ কেজি, জিংক সালফেট ১০ কেজি, বোরিক এসিড ১০ কেজি হেক্টর প্রতি প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে অর্ধেক গোবর সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হয়। অবশিষ্ট গোবর এবং সম্পূর্ণ টিএসপি,   জিপসাম, জিংক সালফেট, বরিক এসিড এবং এক-তৃতীয়াংশ এমওপি পিট বা মাদা তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হয়। সম্পূর্ণ ইউরিয়া এবং অবশিষ্ট এমওপি দুইটি সমান কিস্তিতে চারা স্থানান্তরের ২১ দিন ও ৩৫ দিন পর প্রয়োগ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। এভাবে নেটেট মেলনের চাষাবাদ করলে উপকার পাওয়া যায়।
মোঃ রেজাউল শেখ, গ্রাম: বামনডাঙ্গা, উপজেলা: আশাশুনি, জেলা: সাতক্ষীরা
প্রশ্ন:  নারকেলের পাতা ও ফলের দাগ দমন সর্ম্পকে বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর : পাতা ও ফলের দাগ রোগ বাইপোলারিস হ্যালোডিস, পেস্টালোশিয়া পালম্যারাম, গিøওক্ল্যাডিয়াম রোসিয়াম নামক ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে।  
শীতকালে এ রোগের আক্রমণ বেশি দেখা যায়। বর্ষাকালে গাছের বৃদ্ধি শুরু হলে এ রোগের আক্রমণ অনেকটা কমে যায়। এ রোগের লক্ষণ হলো-রোগের আক্রমণে পাতার উপর গোলাকার ছোট ছোট বাদামি দাগের সৃষ্টি হয়। ছোট দাগগুলো বড় হতে থাকে এবং কিছু দাগ একত্র হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। দাগের কারণে পাতার অনেক অংশ নষ্ট হয়ে যায়। দাগের মধ্যে জীবাণুর বীজকণা (কনিডিয়া) উৎপন্ন হয়। আক্রমণ পাতা থেকে ডাবে ছড়িয়ে পড়ে। ডাবের গায়ে বাদামি দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। বাদামি দাগের জন্য ডাবের বা নারিকেলের দাম কমে যায়। এ রোগ প্রতিকারে গাছের রোগাক্রান্ত পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। খরা মৌসুমে চারা গাছে সেচ ও সুষম সার প্রয়োগ করা দরকার। কার্বেন্ডাজিম গ্রæপের ছত্রাকনাশক যেমন-অটোস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম অথবা প্রোপিকোনাজোল গ্রæপের ছত্রাকনাশক যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে গাছের পাতা ও ফলে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে ¯েপ্র করতে  হবে।
মোছা: আসমাউল হুসনা, গ্রাম: খাটুরিয়া, উপজেলা: গোবিন্দগঞ্জ, জেলা: গাইবান্ধা
প্রশ্ন:  মরিচ গাছে মাকড়ের আক্রমণ হয়েছে। কী করণীয় ?
উত্তর:  মরিচ গাছে মাকড়ের লার্ভা এবং পূর্ণবয়স্ক মাইট গাছের কোষ ছিদ্র করে রস শোষণ করে। ফলে পাতা ফ্যাকাশে, মোচড়ানো এবং নিচের দিকে বাঁকানো হয়। পাতা চামড়ার মতো হয়ে যায় এবং শিরাগুলো মোটা হয়। পাতা এবং কচি কান্ড লালচে বর্ণের হয়। ফুল ঝরে পড়ে এবং ফল বিকৃত, অপরিপক্ব এবং অসম আকৃতির হয়। সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে এর আক্রমণ কমানো সম্ভব। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে সালফার জাতীয় মাকড়নাশক  যেমন কুমুলাস ডিএফ বা রনোভিট ৮০ ডবিøউ জি বা থিওভিট ৮০ ডবিøউ জি বা সালফোলাক ৮০ ডবিøউ জি, ম্যাকসালফার ৮০ ডবিøউ জি বা সালফেটক্স ৮০ ডবিøউ জি প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। মাইটগুলো সাধারণত পাতার নিচের দিকে থাকে, এ জন্য স্প্রে করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন পাতার নিচের অংশ সম্পূর্ণভাবে ভিজে যায়। আশা করি     উপকৃত হবেন।
মৎস্য বিষয়ক
মোঃ হাফিজুর রহমান, গ্রাম: লক্ষীরপাড়, উপজেলা: বিশ^ম্বপুর, জেলা: সুনামগঞ্জ
প্রশ্ন: মাছের ভিটামিনের অভাব এবং অপুষ্টিজনিত রোগ হলে কী করব?
উত্তর: পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে এর অভাবজনিত কারণে মাছের অন্ধত্ব এবং ঘাড় বাঁকা রোগ দেখা যায়। ভিটামিন বি এর অভাবে মাছের ক্ষুধামন্দা, ¯œায়ু দুর্বলতা, রক্ত শূন্যতা এবং ত্বক ও ফুলকার ওপর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এছাড়া মাছের খাবারে হজমযোগ্য আমিষের অভাবে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে।  এর কারণেই মাছ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। পুকুরে উদ্ভিদ ও প্রাণিজ কণাসহ প্রাকৃতিক খাবারের পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হয়। আর এসব সমস্যা প্রতিকারে ও প্রতিষেধক ব্যবস্থা হিসেবে ভিটামিনযুক্ত সুষম খাবার পুকুর বা জলাশয়ে প্রয়োগ করলে মাছের         অপুষ্টিজনিত রোগ দূর হয়।
মোছাঃ সালমা বেগম, গ্রাম: এরাইগা, উপজেলা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন: মাছের শরীরে রোগ দেখা যাচ্ছে। কী করব ?
উত্তর: স্বল্প পিএইচ বা অ¤ø পানিতে পুকুরের তলায় বিচরণকারী মাছসমূহের গায়ে জোঁকের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। জোঁকগুলো ত্বক থেকে দেহের রস শোষণ করতে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে যাতে পরবর্তীতে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। হেমিক্লেপসিস মার্জিনেটা এ রোগের কারণ। পুকুর প্রস্তুতিকালে প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চ‚ন প্রয়োগ করলে পরবর্তী মৌসুমে জোঁকের প্রাদুর্ভাব থাকে না। বহিঃপর জীবীনাশক হিসবে টাইকোফেন ভেট ৩ ফুট গভীরতার পুকুরে প্রতি শতকে ৫ গ্রাম পাউডার ২৫০ মিলি পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
মোঃ শরিফুল ইসলাম, গ্রাম: পূর্বভীষণদই, উপজেলা: হাতিবান্দা, জেলা: লালমনিরহাট
প্রশ্ন: গরুর ক্ষুরা রোগ হয়েছে। কী করব ?
উত্তর:  ক্ষুরা রোগের কার্যকর কোনো                 চিকিৎসা নেই। যা করণীয় তা হলো উপসর্গজনিত চিকিৎসা। এন্টিবায়োটিক ওষুধ হিসাবে সেফট্রাইএক্সন অথবা পেনিসিলিন ও স্ট্রেপটোমাইসিন গ্রæপের ইনজেকশন দিতে হবে। এসাথে ক্লোরফেনিরামিন মেলিয়েট গ্রæপের ওষুধ দিতে হবে। জ¦র কমানোর জন্য কিটো প্রফেন বা মেলোক্সিকাম ব্যবহার করা যেতে পারে। মুখে ঘা এর জন্য সোহাগা ব্যবহার করতে পারেন। শুকনো কড়াইতে             সোহাগা ভেজে মধুর সাথে মিশিয়ে লাগাতে হবে। পায়ের ঘায়ে  নেবানল বা ব্যসিট্রামিন মলম লাগাতে পারেন। যা ওলানে চলে আসলে একই মলম লাগাবেন। মাছির আক্রমণ প্রতিহত করতে আক্রান্ত স্থানের আশেপাশে তারপিন তেল লাগাবেন বা স্প্রে করবেন। সেরে ওঠার পর গরুকে ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি সম্বলিত ওষুধ দেয়া ভালো।  
মোঃ রাশেদুল ইসলাম, গ্রাম: তাহেরপুর, উপজেলা: বাগমারা, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন: আমার মুরগির বয়স ১০ দিন। মুরগিগুলো খুব দুর্বল, হাঁটতে পারছে না। প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছে। কী করব ?
উত্তর:  ছোট মুরগির বাচ্চাদেও ভিটামিন বি এর অভাবে এ সমস্যা দেখা যায়। এ সমস্যা  দেখা দিলে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে। অধিক ভালো ফলাফলের জন্য সাথে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট দেয়া যেতে পারে। আশা করি উপকার পাবেন। য়
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫,  ফোন নং: ০২-৫৫০২৮৪০০, ই-মেইল : taufiquedae25@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
ফাল্গুন মাসের কৃষি

(১৪ ফেব্রুয়ারি-১৪ মার্চ)

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

ফাল্গুন মাস। ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। এ সময় প্রকৃতিতে কাননে, পারিজাতের বর্ণিল রঙে ভরে উঠবে চারিদিক। নতুন প্রাণের উদ্যমতা আর অনুপ্রেরণা প্রকৃতির সাথে আমাদের কৃষিকেও দোলা দিয়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন ফাল্গুনের শুরুতেই আসুন সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেই বৃহত্তর কৃষি ভুবনে করণীয় দিকগুলো।
 

বোরো ধান
ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে (আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে) ধানক্ষেত বালাইমুক্ত রাখতে হবে। এ সময় ধানক্ষেতে উফরা, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগ দেখা দেয়। জমিতে উফরা রোগ দেখা দিলে যেকোন কৃমিনাশক যেমন-ফুরাডান ৫ জি বা কিউরেটার ৫ জি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে এবং একরপ্রতি ১৬০ গ্রাম ট্রুপার বা জিল বা ন্যাটিভ বা ব্লাসটিন ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে পাতাপোড়া রোগ হলে অতিরিক্ত ৫ কেজি/বিঘা হারে পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে এবং জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে। টুংরো রোগ দমনের জন্য এর বাহক পোকা সবুজ পাতাফড়িং দমন করতে হবে।

 

গম
এ মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম পাকা শুরু হয়। গম শীষের শক্ত দানা দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট কট শব্দ হয় তবে বুঝতে হবে গম কাটার সময় হয়েছে। সকালে অথবা পড়ন্ত বিকেলে ফসল কাটা উচিত। বীজ ফসল কাটার পর রোদে শুকিয়ে খুবই তাড়াতাড়ি মাড়াইঝাড়াই করে ফেলতে হবে। সংগ্রহ করা বীজ ভালো করে শুকানোর পর ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

ভুট্টা (রবি)
জমিতে শতকরা     ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করে ফেলতে হবে। সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। মোচা সংগ্রহের পর উঠানে পাট বিছিয়ে তার উপর শুকানো যায় অথবা জোড়া জোড়া বেঁধে দড়ি বা বাঁশের সাথে অথবা টিনের চাল বা ঘরের বারান্দায় ঝুলিয়ে শুকানোর কাজটি করা যায়।

 

ভুট্টা (খরিপ)
খরিপ মৌসুমে ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই বীজ বপন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় যতœ নিতে হবে। বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫ প্রভৃতি ভুট্টার উন্নত জাত।

 

পাট
ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। ফাল্গুন মাসে বপন উপযোগী পাটের ভালো জাতগুলো হলো সিসি-৪৫, বিজেআরআই দেশী পাট শাক-১ (বিজেসি-৩৯০), ফাল্গুনী তোষা (ও-৯৮৯৭), বিজেআরআই তোষা পাট-৪ (ও-৭২)। পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়িভাবে ৫-৬টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে আরেকটু বেশি অর্থাৎ ৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। পাটের জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ ফুট) এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭ সেন্টিমিটার (প্রায় ৩ ইঞ্চি) রাখা ভালো। ভালো ফলনের জন্য প্রতি একরে ৭০ কেজি   ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি এমওপি, ১৮ কেজি  জিপসাম এবং প্রায় ৪.৫ কেজি জিংকসালফেট সার প্রয়োগ করতে হবে।

 

শাকসবজি
এ মাসে বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে ডাঁটা, কমলিশাক,
পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। মাদা তৈরি করে চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়ার বীজ বুনে দিতে পারেন। সবজি চাষে পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে জৈবসার ব্যবহার করলে সবজি ক্ষেতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না।

 

গাছপালা
আমের মুকুলে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ এ সময় দেখা দেয়। এ রোগ দমনে গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার পূর্ব পর্যন্ত আক্রান্ত গাছে  প্রোপিকোনাজল আথবা মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া আমের আকার মটর দানার মতো হলে গাছে ২য় বার স্প্রে করতে হবে। এ সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আমগাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার আগেই একবার এবং এর এক মাস পর আর একবার সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক পানির সাথে মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। কাঁঠালের ফল পঁচা বা মুচি ঝরা সমস্যা এখন দেখা দিতে পারে। কাঁঠাল গাছ এবং নিচের জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত ফল ভেজা বস্তা জড়িয়ে তুলে মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করতে হবে। মুচি ধরার আগে ও পরে ১০ দিন পর পর ২/৩ বার বোর্দো মিশ্রণ বা মেনকোজেব গ্রæপের ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বাডিং পদ্ধতিতে বরই গাছের কলম করতে পারেন। এজন্য প্রথমে বরই গাছ ছাঁটাই করতে হবে এবং পরে উন্নত বরই গাছের মুকুল ছাঁটাই করে দেশী জাতের গাছে সংযোজন করতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ
এ সময় মুরগির রাণীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে প্রয়োজনীয় টিকা প্রদান করতে হবে। খাবারের সাথে  ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই সরবরাহ করতে হবে। এসময় গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি), পক্স, ফুট এন্ড মাউথ ডিজিড (এফএমডি) ভাইরাস সংক্রমণে এক গরু হতে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। গবাদিপশুকে প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিতে হবে এবং কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। গবাদিপশুকে উন্নত খাবার যেমন-সবুজ ঘাস, ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র, ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক এসব খাওয়াতে হবে।

 

মৎস্যসম্পদ
মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি ও সংস্কার করার উপযুক্ত সময় এখন। পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং শতাংশপ্রতি ১ কেজি চুন ও ১০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। পানি ভর্তি পুকুরে প্রতি শতাংশে ৬ ফুট পানির জন্য ১ কেজি চুন গুলে ঠাণ্ডা করে দিতে হবে। এ ছাড়া শতাংশপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি একসাথে মিশিয়ে পানি ভর্তি পুকুরে দিতে হবে। শীতের পর এ সময় মাছের বাড়বাড়তি দ্রুত হয়। তাই পুকুরে প্রয়োজনীয় খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।


সুপ্রিয় পাঠক, কৃষিকথায় প্রতি বাংলা মাসেই কৃষি কাজে অনুসরণীয় কাজগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। এগুলোর বিস্তারিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণের জন্য আপনার কাছের কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। আমাদের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের শীর্ষে। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা।

 

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা, টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, editor@ais.gov.bd

 

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook