কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বঙ্গবন্ধু ও কৃষিবিদ দিবস

বঙ্গবন্ধু ও কৃষিবিদ দিবস

ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি

মাননীয় মন্ত্রী, কৃষি মন্ত্রণালয়। www.moa.gov.bd

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এক সোনালি অধ্যায়ের নাম কৃষি। উৎপাদনশীলতা, আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধির জন্য কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাত (ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং বন) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং শ্রম শক্তির প্রায় অর্ধেক কর্মসংস্থান জোগান দেয়। কৃষি সামাজিক কর্মকাণ্ডের এক বিশেষ ক্ষেত্র যা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা, আয়ের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ছাড়া কৃষি বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্যের বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ভোক্তাদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক মালামালের উৎস। 

 

হাজার বছরের অবহেলিত ও শোষিত ছিল এ বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ও সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন। স্বাধীনতার মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করেছিলেন কৃষির উন্নতিই হচ্ছে কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি। কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি মানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য হবে আরো প্রজ্বলিত। এদেশের উর্বর জমি, অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিশ্রমী মানুষ, আমাদের গবেষণা সম্প্রসারণ কাজে সমন্বয় করতে পারলে আমরা খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করতে পারব। বর্তমান  কৃষিতে দেশের যে অনন্য সাফল্য তা বঙ্গবন্ধুরই চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনার ধারাবাহিকতা।

 

বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের পুনর্গঠনে প্রথমেই গুরুত্ব দেন কৃষি উন্নয়নের কাজে। ডাক দেন সবুজ বিপ্লবের। তিনি বলেছিলেন, ‘কৃষক ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে সবুজ বিপ্লব সফল করে তুলুন। বাংলাদেশকে খাদ্যে আত্মনির্ভর করে তুলুন।’ বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এদেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। এজন্য কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ভূমিস্বত্ব আইন জারি করে পরিবার প্রতি ভূমি মালিকানা ৩৭৫ একর থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা সিলিং আরোপ করেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ করে দেন। কৃষকের মাঝে খাস জমি বিতরণ, কৃষির উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি মূল্যে সার, কীটনাশক, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি-উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করেন।  সেচ সুবিধা বাড়াতে সেচপাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় তিন গুণ। ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি-অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি পাকিস্তানি আমলে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকের মুক্তি দেন ও তাদের সব ঋণ মওকুফ করেন। যা ছিল কৃষি উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। 

 

কৃষির উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু কৃষি শিক্ষা ও কৃষি গবেষণার উপর জোর দেন। আর তা প্রতিফলিত হয় বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। সেখানে মোট ৩৩ কোটি টাকা কৃষি শিক্ষা ও কৃষি গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়। কৃষিশিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আয়োজন করেন। এ সময় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সৃষ্টি হয়। আধুনিকায়ন হয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের। মৎস্য ও পশুসম্পদ ও চা উন্নয়ন ক্ষেত্রেও নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হয়। জাতির পিতার দূরদৃষ্টি প্রসূত উন্নয়ন ভাবনার আরও একটি উজ্জ্বল দিক হচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৃষিশিক্ষায় আকৃষ্ট করার জন্য ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদদের চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা ঘোষণা  দেয়া। তিনি জানতেন, কৃষির উন্নয়ন করতে হলে কৃষিতে মেধাবী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।  কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা ঘোষণাকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আন্দোলন করছিস বলে আমি দাবি মেনে নিলাম তা নয়, আমি চাই ভালো ছাত্রছাত্রী কৃষি পড়ুক’ আমি তোদের দাবি মেনে নিলাম তোরা আমার মুখ রাখিস।’

 

এদেশের কৃষিবিদ সমাজ তাদের বোধে ও বিশ্বাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ও অনুপ্রেরণা চির অটুট রাখতে ১৩ ফেব্রুয়ারি নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে কৃষিবিদ দিবস  উদ্যাপন করে আসছে। জাতির পিতার প্রত্যাশা পূরণে কৃষিবিদ সমাজ তাদের প্রতিভা, মেধা ও কর্মদক্ষতা, সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ও আন্তরিকতার সাথে প্রয়োগে ব্রতী হয়ে উঠেন। সেই থেকে এ দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ফসলের শত শত জাত উদ্ভাবন ও প্রবর্তন এবং উন্নত চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা, সহয়ক নীতি কাঠামো, কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, সার, বীজ, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির সফল প্রয়োগে কৃষি বিশেষ করে দানাদার খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। দানাদার ছাড়াও শাকসবজি, ফলমূল, আলু উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলছে। অন্যদিকে ডাল, তেল মসলার চাহিদা এখনও অনেকাংশ আমদানি নির্ভর হলেও স্বল্প জীবনকালের ডাল উদ্ভাবনের ফলে ইদানীং ধানভিত্তিক শস্যবিন্যাসের পাশাপাশি ডালশস্য স্থান করে নিচ্ছে। সরকারের নীতির ফলে হাইব্রিড ভুট্টা ও শাকসবজি উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফসলের নিবিড়তা গত পাঁচ বছরে শতকরা ১৯২ হতে ২১৬ ভাগে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে কৃষিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পাট রপ্তানিতে ১ম, পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে ২য়, ধান উৎপাদনে ৩য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, আলু উৎপাদনে ৭ম, পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন কৃষিতে রোল মডেল। 

 

কৃষি এখন ঘাটতি উৎপাদন ব্যবস্থা হতে উদ্বৃত্ত ও বাণিজ্যিকীকরণ অভিমুখী। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য পরিবেশ সম্মতভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, উচ্চ মূল্যের ফসল যেমন-কাজুবাদাম, কফি প্রভৃতি রপ্তানিমুখীকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ। গবেষণার মাধ্যমে স্বল্প জীবনকালের প্রতিকূলতা সহিষ্ণু শস্যবিন্যাস উদ্ভাবন ও সফল প্রয়োগে কৃষি সমৃদ্ধ লাভ করছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া হয়েছে, যাতে আগামী দিনের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার হাতিয়ার হিসাবে আমাদের সক্ষম উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব হয়। 

 

মুজিব শতবর্ষে করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দেন ‘আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে’  এবং ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’। এই দূরদর্শী নির্দেশনায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সব দপ্তর/সংস্থা কৃষকের পাশে থেকে এপ্রিল-মে ২০২০ এ হাওড়ে বোরো ধান কাটা ও উত্তোলন নিশ্চিত করে। যা সমকালীন ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। এ সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রমিক সংকট নিরসন ও দ্রুত ধান কাটা নিশ্চিতকরণে দুইশত কোটি টাকা জরুরিভিত্তিতে বরাদ্দ প্রদান করেন, যা দিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ১৩০০টি উন্নতমানের কম্বাইন হার্ভেস্টার, ৯৩৪টি রিপারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি হাওড় অঞ্চলসহ সারা দেশে কৃষকের মাঝে সরবরাহ করা হয়। ফলে বিশ্বব্যাপী মহামারীর সময়ে সর্বোচ্চ বোরো ধান ঘরে তুলে বাংলাদেশের জনগণ খাদ্যে নিরাপত্তার স্বস্তি পায়। পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বসতবাড়ি, আঙিনার সামনে সরকারি প্রণোদনায়  প্রতি ইউনিয়নে ৩২টি করে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হয়। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে নতুনভাবে প্রতি ইউনিয়নে আরও ১০০টি করে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে চলমান। একই ভাবে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও প্রভূত উন্নতি হয়েছে। গ্রামে গ্রামে পোলট্রি ফার্ম, গাভী পালন, গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের এবং পুকুর, বিল, বাঁওড় এবং মুক্ত জলাশয়ে মাছ চাষের কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ায় এ খাতেও সাফল্য অর্জন হয়েছে। সমুদ্র জয়ের ফলে সুনীল অর্থনীতির মাধ্যমে মেরিন ফিশারিজ খাতের উন্নয়নে বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

 

কোভিড ১৯সহ প্রাকৃতিক বৈরিতার সাথে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি কৃষি উৎপাদন কৌশল প্রবর্তনে কৃষক ও কৃষিবিদ সমাজ কাঁধে কাঁধমিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সময়ের পালাক্রমে বসতবাড়িতে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পারিবারিক পুষ্টির প্রাপ্যতা বেড়েছে । এখন কৃষকের ঘরবাড়ি, পোশাক পরিচ্ছদ, শিক্ষা দীক্ষা, বিনোদনসহ জীবনযাত্রার সর্বত্রই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। যা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের উদার ও কৃষিবান্ধব সময়োপযোগী কার্যক্রম নীতি গ্রহণ ও তার সঠিক বাস্তবায়নের ফলে। পাশাপাশি এই উজ্জ্বল অর্জনের মহানায়ক কৃষক। সহনায়ক হিসেবে কাজ করেছে কৃষিবিদ সমাজ। আর এসব কিছুর মূলে আছে বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত যা কৃষিবিদ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।

 

পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপকল্প ২০২১ এর ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা ২০৩০ অর্জন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় এবং পাশাপাশি কৃষি সেক্টরে অর্জনের এই ধারা অব্যাহত রাখার জন্য কৃষিবিদদের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরো শানিত ও জোরদার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

 

 

বিস্তারিত
মৌচাষ

ড. ফ. ম. মাহবুবুর রহমান
মধু মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক অপূর্ব নেয়ামত। স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং যাবতীয় রোগ নিরাময়ে মধুর গুণ অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা.) একে ‘খাইরুদ্দাওয়া’ বা মহৌষধ বলেছেন। খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ সহস্রাদের শিলালিপিতে মৌমাছি পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়। ব্যাবিলন সাম্রজ্যে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব ৪র্থ সহস্রাব্দের শেষে ও ৩য় সহস্রাব্দের শুরুতে বিপুলভাবে মৌমাছি পালন করা হতো। মৌমাছি চাষের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও পদ্ধতিগতভাবে সর্বপ্রথম ১৬৩৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৌমাছি চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে ‘মোস্সে কুইনবি’ নামক বৈজ্ঞানিক মৌচাষ শুরু করেন। ১৮৫১ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে মৌচাষ শুরু করেন ল্যাংস্ট্রোথ নামক বৈজ্ঞানিক যাকে আধুনিক মৌচাষের জনক বলা হয়। ভারতবর্ষে ১৮৮৩ খ্রিঃ আধুনিক মৌমাছি পালন কার্যক্রম শুরু হয়।


বাংলাদেশে আকতার হামিদ খান ১৯৬১ সালে কুমিল্লার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে প্রথম মৌচাষ শুরু করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে সাতক্ষীরাতে বিসিক প্রথম মৌচাষের উদ্যোগ নেয় এবং অদ্যাবধি বিসিকের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে ও সারাদেশে বিস্তৃত হয়েছে। বিসিকের প্রচেষ্টার সাথে পরবর্তীতে ৮০’র দশকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সম্পৃক্ত হয় এবং এর মাধ্যমে বর্তমানে মৌপালন সম্প্রসারণে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
 

বাংলাদেশে মৌচাষের সম্ভাবনা
মৌচাষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী আয়েনস্টাইন (Einstein) মৌমাছির উপকারিতা বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, If the bee disappeared the surface of the globe, then the man would only have four years to live (যদি মৌমাছি পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়, তবে মানুষের জীবন পরবর্তী চার বছরেই শেষ হয়ে যাবে)”। ফসল উৎপাদন ও মানব কল্যাণে মধু ও মৌমাছির অপরিসীম ভ‚মিকা বিবেচনা করেই এই উক্তিটি করা হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে নানা ধরনের রোগব্যাধি নিরাময়ে মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাছাড়া বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও সুস্বাদু খাবার তৈরিতে মধু ব্যবহার করা হয়। মৌচাক থেকে প্রাপ্ত মোম দিয়ে নানা সামগ্রী যেমন- প্রসাধনী, মোমবাতি ইত্যাদি তৈরি হয়। এ দেশের ভ‚মিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মৌপালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে। এমন কি মধু বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ইতোমধ্যেই ভারত ও জাপানে বাংলাদেশের মধু রপ্তানি হচ্ছে, যা ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশ পর্যন্ত  বিস্তৃত হতে পারে। ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশের অপরিশোধিত মধু ক্রয় করে সেদেশে পরিশোধন করে পুনরায় বাংলাদেশে রপ্তানি করে প্রচুর মুনাফা করছে। এ ছাড়াও দেশীয় কিছু কোম্পানি মৌচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি মধু ক্রয় করে পরিশোধনের মাধ্যমে দেশে/বিদেশে বাজারজাত করছে। আমাদের দেশে মধু চাষের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। সুজলা সুফলা ষড়ঋতুর বাংলাদেশ, যার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আছে ফসলের মাঠ, বৃক্ষরাজী, সবজি ও ফুলবাগান। এখানে প্রায় প্রত্যেক ঋতুতেই কোন না কোন ফুল ফোটে। এসব জায়গা থেকে মৌমাছি প্রায় সারা বছরই মধু আহরণ করতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২৫০০ জন মৌচাষি বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করছে এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার টন মধু উৎপাদিত হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে মধুর উৎপাদন এক লক্ষ টনে উন্নীত করা সম্ভব। বাছবিচারহীন কীটনাশক প্রয়োগ, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, শিল্পায়ন ও অন্যান্য কারণে প্রকৃতিতে বসবাসরত মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী কীট-পতঙ্গের সংখ্যা ক্রমশ  হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মৌচাষিদের মৌপালনে উৎসাহিত করলে এ অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে, এমন কি অনেক প্রজাতির গাছপালা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মৌচাষের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষ বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, শ্রমিক শ্রেণী এবং সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন হবে। তারা মধু এবং অন্যান্য উপজাত দ্রব্য যেমন, রয়েল জেলি, পোলেন গ্রেইন, মৌ বিষ, প্রপেলিস, মোম ইত্যাদি দেশ-বিদেশে বিক্রির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় বাড়াতে সক্ষম হবেন। ব্যক্তিপর্যায়ে মৌমাছি পালন প্রকল্প স্থাপনের জন্য আলাদাভাবে কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঘরের বারান্দায়, ছাদে কিংবা বাগানেও মৌ-বাক্স রাখা যায়। অ্যাপিস মেলিফেরা প্রজাতির ৫টি মৌ-কলোনি সম্বলিত মৌ-খামার স্থাপনের জন্য মোট ব্যয় হয় ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ১০-১৫ বছর পর্যন্ত মৌ-বাক্স ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা যাবে। এজন্য আর কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। মেলিফেরা প্রজাতির প্রতিটি মৌ-বাক্স থেকে বছরে ৫০ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব, যার বাজারমূল্য প্রতি কেজি ২৫০ টাকা হিসেবে, ৫টি বাক্স থেকে ৬২,৫০০ টাকা। প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে মাত্র ২৫-২৭ হাজার টাকা এককালীন বিনিয়োগ করে প্রতি বছর ৬০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে আয় করা সম্ভব। মৌ-বাক্সের সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধির মাধ্যমে এ আয় অনেকগুণ বাড়ানো যায়। স্বল্প পরিশ্রমে এ ধরনের প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়া যায়, তেমনি ফসলের পরাগায়নে সহায়তাকরণের মাধ্যমে দেশের ফল ও ফসলের উৎপাদনে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা প্রদান করা যায়।


মৌচাষ এমন একটি ব্যবস্থাপনা যেখানে জমিতে বাড়তি কোন চাপ পড়ে না। বর্তমান পরিবেশকেই কাজে লাগিয়ে মৌচাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করা যায়। এছাড়া মৌচাষে চ্যালেঞ্জসমূহ উত্তরণ করলে মৌচাষকে জনপ্রিয় করা সম্ভব। যা দেশের ৮৫ হাজার গ্রামে এর সম্প্রসারণ ঘটলে লাখো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।


মৌচাষের চ্যালেঞ্জ
লাভজনক মৌচাষে চাষিদের জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব; প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য তেমন কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই; সাধারণ কৃষকদের জমিতে মৌ বাক্স স্থাপনে অনীহা প্রকাশ করে; মৌসুমে মধুর মূল্য কম থাকা; মৌ বাক্স চুরি হয়ে যাওয়া; আশেপাশে যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি মারা যাওয়া; অফ সিজনে মৌমাছি বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়; মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের স্বল্পতা; মৌচাষে দলভিত্তিক কাজ করতে হয়, দলীয় কাজে অনেকেই উৎসাহিত না হওয়া; এলাকায় ধারাবাহিকভাবে মধু পাওয়া যায় এমন ফসলের অভাব; মৌ-কলোনিসহ বাক্স পরিবহণে নানা জটিলতা।


মৌচাষ সম্প্রসারণে ডিএই
বাংলাদেশে উন্নতমানের বীজ ব্যবহারের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইউনিয়নভিত্তিক কৃষক উদ্যোক্তা (এসএমই) তৈরির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে ডাল, তেল এবং মসলাজাতীয় ফসলের উন্নতমানের বীজের সরবরাহ ও ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আধুনিক বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষকপর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-৩য় পর্যায় (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো যথাযথ পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মৌচাষ সম্পৃক্তকরণ। এ ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় মৌচাষের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।  প্রকল্পাধীন সময়ে ফসলের পরাগায়ন কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য আগ্রহী বীজ এসএমইগণকে মোট ২০০০টি উন্নতমানের মৌবাক্স, এক্সট্রাক্টর ও এক্সেসরিজ সরবরাহ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এসএমই ও তার পরিবারের সদস্যরা মৌচাষে সম্পৃক্ত থাকবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত হবে। এসব বস্তু থেকে প্রতি বছর ৪০ মে. টন করে অর্থাৎ  প্রকল্পাধীন সময়ে প্রায় ১৬০ মে. টন উৎকৃষ্ট মানের মধু উৎপাদিত হবে যা মূল্যমান প্রায় ২.৫০ কেটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৯০০ জন কর্মকর্তার ডাল, তেল ও মসলা ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি ও মৌপালনের উপর ৬ দিনব্যাপী টিওটি কোর্স সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৬০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মৌচাষের ওপর ৩ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেছেন, যারা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে মৌচাষে মৌ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে কৃষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ মৌ-পালন বিষয়ে সম্পৃক্ত রয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন                  এসএমইগণকে  মৌ-বক্স সরবরাহের ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মধু উৎপাদন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ পরপরাগী ফসলের পরাগায়ন নিশ্চিত হচ্ছে। প্রকল্পে মৌচাষ সম্পৃক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত ১৫-৩০% ফলন বৃদ্ধিসহ মধু উৎপাদন ও পরিবেশ বান্ধব চাষাবাদে কৃষকগণ উৎসাহিত হচ্ছে।

উপপ্রকল্প পরিচালক, কৃষকপর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ  উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-৩য় পর্যায় (১ম সংশোধিত), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৫৫২৩২৭১৮৮, ই-মেইল: mahbubur_fuad@yahoo.com

বিস্তারিত
পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশল

ড. মো. আলাউদ্দিন খান১  কৃষিবিদ মো. মুশফিকুর রহমান২

পেঁয়াজ (Allium cepa L.) বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের খাবারের অত্যাবশ্যকীয় অংশ। ফলে চাহিদার ভিত্তিতে (জনপ্রতি দৈনিক ৩৫ গ্রাম) মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। উৎপাদনের বিবেচনায়ও এ মসলা ফসলটি প্রথম স্থানে আছে।  কিন্তু পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য। সংগ্রহ মৌসুমে পেঁয়াজ এর ব্যাপক সরবরাহ থাকার কারণে কৃষক খুবই কম মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রয় করে থাকে। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় চাষ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলে কৃষক ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারে। পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনায় উপযুক্ত কৃষি প্রযুক্তি (Good Agricultural Practices) প্রয়োগ না করার কারণে উৎপাদিত পেঁয়াজের ৩০-৪০ শতাংশ অপচয় হয়ে যায়। এমনকি পেঁয়াজের গুণাগুণও নষ্ট হয়ে যায়। কখনো কখনো বিভিন্ন কারণে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হয়ে থাকে। যা পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশে বছরে ১৮ লক্ষ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়ে থাকে। বছরে পেঁয়াজ অপচয়ের পরিমাণ প্রায় ৫-৬ লক্ষ মেট্রিক টন। এখানে উল্লেখ্য যে, সরকার দেশের পেঁয়াজের ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে প্রায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। গুণগতমান বজায় রেখে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্টোরে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে সঠিক মূল্যে বিক্রয় করা ও বাজার স্থিতিশীল রাখা সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া পেঁয়াজ সংরক্ষণের  মাধ্যমে ভোক্তার নিকট বছরব্যাপী পেঁয়াজ সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। পেঁয়াজের প্রকৃত বীজ (True seed) সাধারণত বীজ কন্দ (Seed bulb) থেকে উৎপাদন করা হয়ে থাকে। বীজ কন্দকে ভালো রাখাও সংরক্ষণের আরেকটি উদ্দেশ্য। স্টোরে পেঁয়াজ জীবিত অবস্থায় থাকে। তাই পেঁয়াজের শারীরবৃত্তীয় (প্রস্বেদন, শ^সন, অংকুরোদগম/মূল গজানো, পেঁয়াজের খোসা খসে পড়া) এবং বিপাকীয় (এনজাইমের কার্যকারিতা, টিস্যু নরম হওয়া) কার্যক্রম চলতে থাকে। ভালো কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পেঁয়াজের শারীরবৃত্তীয় ও বিপাকীয় কার্যাবলী বন্ধ করে বা নিম্ন পর্যায় রেখে এবং ছত্রাক/ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতাকে বন্ধ করে বা সুপ্তাবস্থায় রেখে পেঁয়াজের সংরক্ষণ কালকে বৃদ্ধি করাই পেঁয়াজ সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মূল চ্যালেঞ্জ। পেঁয়াজের  সংরক্ষণজনিত ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায় রাখা এবং সংরক্ষিত পেঁয়াজের গুণগতমান বজায় রাখার জন্য নিম্নলিখিত প্রযুক্তি প্রয়োগ করা জরুরি।


পেঁয়াজের উৎপাদন মৌসুম
খরিপ মৌসুমে উৎপাদিত পেঁয়াজে স্বভাবতই পানির পরিমাণ বেশি থাকে। স্টোরে এ মৌসুমের পেঁয়াজের অংকুরোদগম ও পচন হার খুবই বেশি। এ পেঁয়াজ ১.৫-২.০ মাস সংরক্ষণ করলে প্রায় ৫০-৬০% পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। তাই খরিপ পেঁয়াজ সংরক্ষণ না করে বাজারজাত করাই ভাল। রবি পেঁয়াজে পানির পরিমাণ কম থাকে বিধায় দীর্ঘ দিন (৮-৯ মাস) সংরক্ষণ করা যায়। এ সময়ে রবি পেঁয়াজের প্রায় ৩০-৪০% নষ্ট হয়ে যায়।

 

পেঁয়াজের জাত নির্বাচন
সংরক্ষণাগারে পেঁয়াজের পচন, অঙ্কুরোদগম ও ওজন হারোনোর পরিমাণ জাতভেদে কম বেশি হয়ে থাকে। দৃঢ় ও আঁটসাঁটে, ঝাঁঝ বেশি, পানি কম, আকারে মধ্যম, গলা চিকন, উচ্চ  শুষ্ক পদার্থ সম্বলিত বৈশিষ্ট্যের জাতের সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি। যেমন- বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪। হাইব্রিড জাত অপেক্ষা স্থানীয় জাতের সংরক্ষণ ক্ষমতা ভাল। যে পেঁয়াজের  শুষ্ক শল্কপত্রের পরিমাণ বেশি থাকে সে পেঁয়াজের সংরক্ষণকাল বেশি হয়। কিউরিং করলেই শুস্ক শল্কপত্রের পরিমাণ বাড়ে। হলুদ ও সাদা রংবিশিষ্ট জাতের পেঁয়াজের তুলনায় লাল রং বিশিষ্ট পেঁয়াজের ফিনোলিক এসিড,  এন্থোসায়ানিন, ফ্লাভোনয়েড (কুয়েরসিটিন, ক্যাম্পফেরল), পলিফেনল নামক এন্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। বারি পেঁয়াজ-৪ জাতের পেঁয়াজে এন্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। তবে লাল রং এবং সাদা রং বিশিষ্ট পেঁয়াজের তুলনায় হালকা লাল রং বারি পেঁয়াজ-১ বিশিষ্ট পেঁয়াজে শ^সন হার কম হয়।  রোপণ পদ্ধতি


হালি পেঁয়াজের (চারা থেকে পেঁয়াজ চাষ) তুলনায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ  (ছোট কন্দ থেকে পেঁয়াজ চাষ) অত্যধিক ফুল হওয়ার কারণে মুড়িকাটা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায় না। মুড়িকাটা পেঁয়াজে পানির পরিমাণও বেশি থাকে। অতি আগাম পেঁয়াজের চারা রোপণ করলে প্রায় ৬০-৭৫ শতাংশ গাছে ফুল আসতে পারে। যাহা সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। পেঁয়াজের বীজ বপনের উপযুক্ত সময় কার্তিক মাসের ১৫-৩০ (নভেম্বর ১-১৫) তারিখ। পেঁয়াজের রোপণ দূরত্ব বেশি হলে গলা মোটা হয়ে যায় এবং পেঁয়াজ ফেটে যায়। সরাসরি বীজ বপনকৃত পেঁয়াজের তুলনায় চারা রোপণ পদ্ধতিতে উৎপাদিত পেঁয়াজে তুলনামূলকভাবে বোল্টার (ফুল উৎপাদনকারী কন্দ) ও বহুকোষী পেঁয়াজের পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে।


সার ব্যবস্থাপনা
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, সাধারণত ৩০ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য এ ফসলটি হেক্টরপ্রতি ৮৫ কেজি নাইট্রোজেন, ৩৬ কেজি ফসফরাস  এবং ৬৮ কেজি পটাশ মাটি থেকে গ্রহণ করে থাকে। তাই জমির ধরন বুঝে পর্যাপ্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার (ইউরিয়া) প্রয়োগ করলে পেঁয়াজের গলা মোটা হয়ে যায়, পেঁয়াজ ফেটে যায় এবং সংরক্ষণাগারে পেঁয়াজের অংকুরোদগম হয় ও পচে যায়। গলা মোটা পেঁয়াজের রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়ে থাকে। পেঁয়াজ সংগ্রহের ২৫-৩০ দিন আগেই নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করা বন্ধ করতে হবে। এই সময়ের ভিতর নাইট্রোজেন সার উপরি প্রয়োগ করলে ছত্রাক ও ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণে সংরক্ষণাগারে বাল্ব পচে যায়। পেঁয়াজ চাষে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ করলে স্টোরে পেঁয়াজের আগাম অংকুরোদগম হয়ে যায়। কোন কারণে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করে থাকলে পরবর্তীতে পটাশ সার  (এমওপি) প্রয়োগ করলে পচনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাছাড়া পটাশ সার প্রয়োগে কার্বহাইড্রেট ভাঙনকারী এনজাইমের কার্যকারিতা কমিয়ে পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ায়। পটাশ সার অংকুরোদগম ও পানি অপচয় রোধেও সহায়তা করে।


প্রয়োজনমতো ফসফরাস সার (টিএসপি) প্রয়োগ করলে সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফসফরাস সার বেশি দিলে পেঁয়াজ বহুকোষী হয়ে যায়। পরিমাণমতো জিপসাম (সালফার/ক্যালসিয়াম সার) প্রয়োগ করলে পেঁয়াজে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে কন্দ দৃঢ় হয় এবং পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা বেড়ে যায়। বোরন জাতীয় সার প্রয়োগ করলে পেঁয়াজ দৃঢ় ও আঁটসাঁট হয়ে সংরক্ষণাগারে ভালো থাকে। জৈবসার প্রয়োগে শুষ্ক পদার্থ বৃদ্ধির মাধ্যমে পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় । ফলে পারতপক্ষে পেঁয়াজের জমিতে জৈবসার প্রয়োগ করা খুবই ভালো।


সেচ ব্যবস্থাপনা
জমির ধরন ও আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে পেঁয়াজের জমিতে ৪-৫ টি সেচ দিতে হয়। অতিরিক্ত সেচ দিলে অথবা মাঠ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহের ১৫-২০ দিন আগে সেচ বন্ধ না করলে পেঁয়াজের গলা পচা (
Neck rot) রোগের মাধ্যমে পচনের হার বেড়ে যায়। পেঁয়াজ সংগ্রহের সময় পানি পেলে ঐ পেঁয়াজ সহজেই অংকুরোদগম হয়ে যায়। তাছাড়া অতিরিক্ত সেচের কারণে গলা মোটা হয়ে যায়। আবার পেঁয়াজে সেচের পরিমাণ কম হলে পেঁয়াজের অংকুরোদগম হার বেড়ে যায় এবং পেঁয়াজ ফেটে গিয়ে সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে যায়। নালা সেচ পদ্ধতির তুলনায় প্লাবন সেচে রোগবালাইর পরিমাণ বেড়ে যায়, ফলে স্টোরে পেঁয়াজ পচনের হার বেশি হয়ে। তবে ড্রিপ (Drip) সেচ পদ্ধতি সবচেয়ে ভাল কিন্তু ইহা ব্যয়বহুল পদ্ধতি।  


রোগবালাই ব্যবস্থাপনা
স্টোরের পেঁয়াজে সাধারণত ছত্রাকজনিত ব্লাক মোল্ড (
Aspergillus niger), গলা পচা বা গ্রে মোল্ড (Botrytis allii), ব্যাসাল রট (Fusarium oxysporum f. sp. cepa) এবং ব্যাক্টেরিয়াজনিত নরম পচা (Erwinia carotovora/ Pseudomonas gladioli) রোগ হয়ে থাকে। এ রোগগুলো পেঁয়াজের মাঠ থেকেই শুরু হয়। স্টোরে বøাক মোল্ডে আক্রান্ত পেঁয়াজের গলা ও কন্দ কালো হয়ে যায়। ব্যাসাল রট রোগের মাধ্যমে মাঠের পেঁয়াজের নিচের দিকে আক্রমণ করে এবং পেঁয়াজের ভেতরে নষ্ট হয়ে যায়। নরম পচা রোগে প্রথমে পেঁয়াজের মাঠে পাতা ভেঙে যায়। পরে স্টোরের পেঁয়াজে পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। বেশি আক্রান্ত হলে পেঁয়াজ হলদে বাদামি রং ধারণ করে নরম হয়ে পচে যায় এবং আক্রান্ত পেঁয়াজ থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। নরম পচা রোগটি পেঁয়াজ পরিবহণের সময়েও দেখা দেয়। স্টোরে ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগের কারণে আক্রান্ত সম্পূর্ণ পেঁয়াজ পচে যেতে পারে। পোকামাকড় বা অন্য কোন কারণে মাঠে পেঁয়াজের ক্ষত হলে এ সমস্ত রোগ সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। এ সমস্ত রোগ থেকে পেঁয়াজকে মুক্ত রাখার জন্য পরিষ্কার পরিছন্ন চাষাবাদ, ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ছত্রাক ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা খুবই জরুরি। সঠিক পরিপক্বতার সময়ে মাঠ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহ করলে এই সমস্ত রোগ থেকে পেঁয়াজকে রক্ষা করা যায়। পেঁয়াজের বীজ এবং চারার গোড়া ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধন করে বপন/রোপণ করা উচিত। প্রতি কেজি বীজ ২ (দুই) গ্রাম ছত্রাকনাশক (রোভরাল/ডায়থেন-এম ৪৫ ইত্যাদি) দ্বারা শোধন করলে এবং ছত্রাকের দ্রবণে পেঁয়াজের চারার মূল ২ (দুই) মিনিট ডুবালে ছত্রাকজাতীয় রোগের আক্রমণ কমে যায়। কোন পেঁয়াজের মাঠে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থার মাধ্যমে সময়মতো রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণাগারে অতি তাড়াতাড়ি পচে যায়। পার্পল বøচসহ অন্যান্য রোগের জন্য রোভরাল/রিডোমিল গোল্ড/ডায়থেম এম-৪৫/নাটিভো ইত্যাদি বালাইনাশক ২.০-২.৫ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৫-২০ দিন পর পর এবং থ্রিপস দমন করার জন্য কুইনালফস ২৫ ইসি/ডাইমেথয়েট ৪০ ইসি ২.০-২.৫ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৫ দিন পরপর প্রয়োগ করতে হয়।


প্রতি বছর একই জমিতে পেঁয়াজ/রসুন না করাই ভালো। পেঁয়াজ সংরক্ষণাগারে চারিদিক থেকে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে সংরক্ষিত পেঁয়াজে এ সমস্ত রোগের আক্রমণ কম হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণের আগে অবশ্যই রোগাক্রান্ত  ও ক্ষতিগ্রস্ত পেঁয়াজ বাছাই করতে হবে। রোগাক্রান্ত পেঁয়াজের শুষ্ক পদার্থ, মোট কঠিন পদার্থের পরিমাণ কমে যায় এবং রং নষ্ট হয়ে বাজার মূল্য কমে যায়।


মাঠ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহ
মাঠের ৬০-৭০ শতাংশ পেঁয়াজের গাছ ভেঙে পড়লে মাঠ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহ করা উচিত। আগাম অপরিপক্ব পেঁয়াজ সংগ্রহ করলে সংগৃহীত পেঁয়াজে বেশি পানি থাকার কারণে ব্যাক্টেরিয়া/ছত্রাকজনিত রোগ দেখে দেয় এবং স্টোরে বাল্ব থেকে পাতা গজায় (অংকুরোদগম)। আবার দেরিতে পেঁয়াজ সংগ্রহ করলে বাল্বের খোসা পড়ে গিয়ে সংরক্ষণাগারে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে। পেঁয়াজের রং নষ্ট হয়ে যেতে পারে।  অন্যদিকে  আগাম বৃষ্টিতে পেঁয়াজ ভিজে গিয়ে স্টোরে পেঁয়াজের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে।


মাঠ থেকে সংগৃহীত পেঁয়াজ শুকানো
সাধারণত বাংলাদেশের কৃষকগণ পেঁয়াজের কিউরিং না করেই পেঁয়াজ স্টোরে সংরক্ষণ করে থাকেন। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে মাঠ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহের পর পাতাসহ ০৫-০৭ দিন হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে পেঁয়াজকে শুকাতে হয়। পেঁয়াজ সংগ্রহের সময় আগাম বৃষ্টিতে পেঁয়াজ ভিজে গেলে দ্রুততার সাথে শুকানোর ব্যবস্থা করতে হয়। প্রয়োজনে ফ্যানের বাতাসে শুকাতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, পেঁয়াজকে রোদে শুকালে ব্যাপক ক্ষতি হয়। শুকানোর পর পেঁয়াজের ৪-৫% ওজন হ্রাস পায় যাতে পেঁয়াজ দৃঢ় ও আঁটসাঁটে হয় এবং পেঁয়াজের গলা সংকুচিত হয়ে ছত্রাক এবং ব্যাক্টেরিয়া প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিউরিং এর ফলে শ^সন হারও কমে যায়। অপর্যাপ্ত কিউরিং এর ফলে রোগের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিউরিং করার কারণে পাতা শুকিয়ে গাছের বৃদ্ধি বাধাদানকারী হরমোন পেঁয়াজে (কন্দ) প্রবেশ করে যাহা পেঁয়াজের সুপ্ততার মেয়াদ বৃদ্ধি করে। পেঁয়াজের সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধি ও গুণগতমান বজায় রাখার জন্যেই পেঁয়াজকে পাতাসহ শুকানো হয়। হালকা ছায়ায় শুকানোর কারণে পেঁয়াজের রং উজ্জ্বল হয়। পেঁয়াজ শুকানোর পর বাল্বের উপরের গলা ২.০-২.৫ সে. মি (সর্বোচ্চ ১ ইঞ্চি) রেখে পাতা কেটে দিতে হয়। পরে বাল্বের মূল কেটে পরিষ্কার করে পেঁয়াজ স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়।


উল্লেখ্য, রোগবালাই, থেঁতলানো, গলা মোটা, বোল্টার, পচা, ক্ষত ইত্যাদি মুক্ত একক দৃঢ় বাল্ব সংরক্ষণের জন্য বাছাই করা হয়। খুবই ছোট/বড় বাল্ব সংরক্ষণের জন্য একসাথে না রাখাই ভালো।


পেঁয়াজ পরিবহণে মোড়কের ধরন
ভালো মোড়ক পেঁয়াজ পরিবহণ ও বাজারজাতকরণের সময় পেঁয়াজের ক্ষতি যেমন ক্ষত, রোগবালাই, পানির অপচয় রোধ করে। পেঁয়াজের ক্ষত সৃষ্টি হলে ঐ পেঁয়াজে মূল/অংকুরোদগম হয়। তাছাড়া ক্ষত পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনুপযুক্ত মোড়কে পেঁয়াজ পরিবহণ করলে পেঁয়াজের রং নষ্ট হয়ে যায়, যা ভোক্তার নিকট অপছন্দনীয়। পেঁয়াজ পরিবহণে চটের বস্তা, নাইলনের বস্তা ও প্লাস্টিক ক্রেট (
Crate) ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে ছিদ্রযুক্ত ব্যাগ ব্যবহার করলে বাতাস চলাচলের মাধ্যমে পেঁয়াজ খুবই ভালো থাকে।


হরমোন/রেডিয়েশনের ব্যবহার
স্টোরে পেঁয়াজের অংকুরোদগম বন্ধ করার জন্য ফসল সংগ্রহের ১৫-২০ দিন আগে বিভিন্ন প্রকার হরমোন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তার মধ্যে ম্যালেইক হাইড্রাজাইডই সবচেয়ে বেশি কার্যকরি। এ ধরনের বৃদ্ধি প্রতিরোধী হরমোন ব্যবহারের মাধ্যমে সংরক্ষণকৃত পেঁয়াজের কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অংকুরোদগম ক্ষমতা হ্রাস পায়। মাঠের শতকরা ১০ ভাগ পেঁয়াজ গাছ ভেঙে পড়লে প্রতি লিটার পানিতে ২৫০০-৩০০০ মি. গ্রাম ম্যালেইক হাইড্রাজাইড এর দ্রবণ তৈরি করে স্প্রে করা হয়। তবে হরমোনকে পানিতে মেশানোর আগে অ্যালকোহলে দ্রবীভূত করে নিতে হয়। হরমোনের দ্রবণে আঠা জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে স্প্রে করা ভালো। অনেক সময় গামা রেডিয়েশনের মাধ্যমে অংকুরোদগম বিলম্বিত করে সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করা হয়।


সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা
বিশ্বে সাধারণত ০৩টি পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে যথা- কোল্ডস্টোরেজ (তাপমাত্রা ০-২/৪  ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৫-৭০%), অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ/হিট স্টোরেজ (সাধারণ তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৫-৭০%) এবং কন্ট্রোল্ড অ্যাটমোসফিয়ার স্টোরেজ (অক্সিজেন ১-২%, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ৩% ও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)। নিম্ন তাপমাত্রা অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের জন্য কোল্ডস্টোরেজ উপযুক্ত পদ্ধতি। বাংলাদেশের মতো গরম অঞ্চলের দেশেসমূহে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করাই উপযুক্ত পদ্ধতি, যাকে অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ (
Ambient storage) বা হিট স্টোরেজ (Heat storage) বলে। অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজে ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সংরক্ষণকৃত পেঁয়াজে অংকুরোদগম/মূল উৎপাদনকারী হরমোন (সাইটোকাইনিন) উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের দেশে অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ সাধারণত বাঁশের তৈরি হয়ে থাকে। বাঁশ দ্বারা এক বা দুই স্তর বিশিষ্ট মাচা/চাং তৈরি করা হয়। পেঁয়াজের মাচা বাঁশের বানা দিয়ে তৈরি করা হয়। স্টোর ঘরের চাল বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। খড়ের/অ্যাসবেসটস দ্বারা নির্মিত চাল থেকে টিন দ্বারা নির্মিত চালে বেশি তাপ উৎপন্ন হয়ে থাকে। সংরক্ষণাগারের চাল টিনের হলে টিনের নিচে অ্যালুমিনিয়াম ইনসুলেটর দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তাছাড়া পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থার জন্য পেঁয়াজের মাচার চারিদিক থেকে ভেন্টিলেটারের ব্যবস্থা করতে হয়।


বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে অরিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে গুদামজাত রোগ বøাক মোল্ড/গ্রেমোল্ড এবং নরম পচা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পারে। টিন দ্বারা নির্মিত সংরক্ষণাগারে স্তুুপীকৃত পেঁয়াজের পুরুত্ব ৩০ সেমি. (১২ ইঞ্চি) এবং খড় বা অ্যাসবেসটস দ্বারা নির্মিত সংরক্ষণাগারে স্ত‚পীকৃত পেঁয়াজের পুরুত্ব ৩৭ সেমি. (১৫ ইঞ্চি) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ভালো। দৈনন্দিন রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য প্লাস্টিক বা বাঁশের তৈরি র‌্যাকে ১৫ সেমি. (৬ ইঞ্চি) পুরুত্বে সংরক্ষণ কর যায়।     

                                                           
এখানে উল্লেখ্য যে, অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজের  স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও আর্দ্রতা ৬৫-৭০%। যা পেঁয়াজের গুণাগুণ, রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পায়। স্টোর থেকে ১৫-২০ দিন পর পর পেঁয়াজ নামিয়ে পচা, অংকুরোদগমকৃত এবং রোগাক্রান্ত বাল্ব আলাদা করে পুনরায় সংরক্ষণ করতে হয়। এভাবে মাঝে মাঝে বাছাই না করলে পেঁয়াজের ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। পেঁয়াজ সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ার সাথে সাথে পেঁয়াজের ওজনেরও হ্রাস পেতে থাকে। আবহাওয়াজনিত কারণে পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা বছর থেকে বছরে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কৃষকপর্যায়ে ৪০০-৫০০ মন পেঁয়াজ সংরক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিস্তর বিশিষ্ট একটি অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ তৈরি করতে প্রায় ৩-৩.৫ লক্ষ টাকা প্রয়োজন হবে। এ ধরনের স্টোর প্রায় ২০-৩০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত এ ভাবে ভালো কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পেঁয়াজের সংরক্ষণজনিত ক্ষতির পরিমাণ গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব।

১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, ফরিদপুর, মোবাইল : ০১৭২৩৭৯৪৫৩৮, ই-মেইল : musfiqur.bari@gmail.com, ২ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, ফরিদপুর

 

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তায় চার ফসলি শস্যবিন্যাস

কৃষিবিদ মোঃ আব্দুল্লাহ-হিল-কাফি

জনসংখ্যার ঘনত্বে দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম। ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রায় ১৯ কোটি জনসংখ্যার জন্য ৪ কোটি টন খাদ্য প্রয়োজন হবে। তাই বর্তমান দানা ফসলের হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ২.৮ টন হতে ৪ টনে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে মাত্র চার ভাগের এক ভাগ লোক শরীরে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য শক্তি পায়। ভয়ংকর হলেও সত্য এদেশে শতকরা মাত্র এক ভাগ লোক ভিটামিন-বি এবং ২৩ ভাগ লোক ভিটামিন-সি এর চাহিদা পূরণ হয়। আমাদের দেশে দানাদার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে সকলের নিজ নিজ জায়গা হতে কাজ করতে হবে।  এজন্য আমিষের অন্যতম উৎস ডাল আবাদ বৃদ্ধির দিকে সকলের নজর দিতে হবে।


মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন ধান এই শস্যবিন্যাসটি চালের আবাদ ঠিক রেখে পুষ্টিকর ডাল আবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। খাদ্য নিরাপত্তা সহজভাবে বললে, কোন দেশের সকল জনসংখ্যার সহজভাবে খাদ্যশস্য ও পুষ্টি লভ্যতাকে বুঝানো হয়। তবে অনেকেই মনে করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজার বিশৃংখলার কারণে হঠাৎ আসা আপদের সময় উদ্ভ‚ত খাদ্যসংকটের মোকাবেলায় খাদ্যশস্য মজুদ থাকাকে খাদ্য নিরাপত্তা বলে। এফএও (FAO) (১৯৯৬) এর মতে ‘খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে যা মানুষের জন্য সব সময়ের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের লভ্যতা, যার ফলে তারা তাদের পথ্যের অভাব এবং খাদ্যের অভিরুচী ও  অগ্রাধিকার মিটিয়ে একটি কর্মঠ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারে।’


বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের প্রায় এক চতুর্থাংশ (১৬০০ বর্গকিলোমিটার) জুড়ে উঁচু-নিচু অর্থাৎ অসমতল যে ভুমি তাকেই বরেন্দ্র অঞ্চল বলে। এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। তাই এ অঞ্চল একটি খরাপ্রবণ এলাকা হিসাবে পরিচিত। বরেন্দ্র আঞ্চলে চাষাবাদে সমস্যা হলো শুষ্ক মৌসুমের শুরুর দিকেই মাটিতে রসের স্বল্পতা, কিছু কিছু জায়গায় অগ্রহায়ণ মাসের প্রথমেই মাটির রস শুকিয়ে যাওয়া, জৈব পদার্থ মাটিতে কম থাকা, শুষ্ক মৌসুমে মাটি শক্ত হয়ে যাওয়া, বর্ষাকালে অবিরাম মাটি ভিজে থাকা, খরিফ খন্দে বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা এবং স্বল্পতা।


এই রকম প্রতিকুল আবহাওয়া এলাকায় ফসল উৎপাদন কিছুটা কষ্টকর। বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করে চার ফসলি ধরনের শস্যবিন্যাস এই এলাকায় যেখানে বোরো-পতিত-রোপা আমন শস্যবিন্যাস আছে সেখানে কার্যকর হতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য আরো পানি কম ব্যবহার হয় এমন শস্যবিন্যাস কৃষি বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে উদ্ভাবন করে যাচ্ছেন। তবে নিম্নলিখিত চার ফসলি শস্যবিন্যাস বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য উপযোগী  হবে।
মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন/তিল- মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন/আলু- মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন/সরিষা-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন/গম- ধৈঞ্চা-রোপা আউশ-রোপা আমন। নিম্নে মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন শস্যবিন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কর্র্তৃক উদ্ভাবিত বারি মসুর-৩, বারি মসুর-৬ ও বারি মসুর-৭ খনিজ সমৃদ্ধ জাত যার জীবনকাল  ১১০-১২০ দিন। বারি মসুর-৩ জাতটির এখনও মাঠপর্যায়ে ভালো ফলন পাওয়া যায় এবং কৃষকের কাছে পছন্দনীয়। তবে এই বিন্যাসে বারি মসুর-৬ বেশি কার্যকরি।


বারি মুগ-৬ স্বল্পমেয়াদিজাত । এর জীবনকাল ৬০-৬৫ দিন। এই জাতটি এই বিন্যাসের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। মুগ ডালের পড বা ফল তুলে গাছগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং আমন ধানে কম ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। তবে মুগডালের গাছ মাটির সাথে মিশানোর ৪-৫ দিন পর আমন ধানের চারা লাগালে বেশি লাভ হয়। আর মুগডাল চাষে পানির তেমন প্রয়োজন হয় না এবং উৎপাদন খরচ কম হয়।


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উদ্ভাবিত রোপা আউশের একটি উচ্চফলনশীল জাত ব্রি ধান-৪৮ যা চারা রোপণের ৭০-৭৫ দিনের মধ্যে কর্তন করা সম্ভব। আউশের জন্য ব্রি ধান৪৮ (জীবনকাল-১১০ দিন এবং ফলন-৫.৫ টন/ হেক্টর), ব্রি ধান৫৫ (জীবনকাল-১০৫ দিন এবং ফলন-৫.০ টন/ হেক্টর) করলে সঠিক সময়ে আমন চাষ করা যাবে। তবে এই বিন্যাসে ব্রি ধান৪৮ বেশি উপযোগী। তবে এ ক্ষেত্রে আউশের চারা  ২০-২৫ দিন বয়সের হতে হবে। এই শস্য বিন্যাসে রোপা আউশ ধান হিসেবে ব্রি ধান৪৮ জাতটি বেশি কার্যকরি।


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) কর্তৃক স্বল্পমেয়াদি আগাম কর্তনযোগ্য আমন ধানের জাত ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬২ ও বিনা ধান৭ উদ্ভাবিত হয়েছে যার জীবনকাল মাত্র ১১০-১২০ দিন। এ সব জাতের চারা রোপণের পর ফসল কর্তন করতে ৮০-৮৫ দিন সময় লাগে। এক্ষেত্রে আমনের জন্য বিনা-৭ (জীবনকাল- ১১০-১১৫ দিন এবং ফলন-৫.০ টন/ হেক্টর) বা ব্রি ধান৫৬ (জীবনকাল-১১০ দিন এবং ফলন-৫.০ টন/ হেক্টর), ব্রি ধান৫৭ (জীবনকাল-১০৫ দিন এবং ফলন-৪.৫ টন/ হেক্টর) চাষ করা যেতে পারে। তবে আমনের চারা ২৫-৩০ দিন বয়সের হতে হবে। এই শস্যবিন্যাসে রোপা আমন ধান হিসেবে ব্রি ধান ৫৭ জাতটি বেশি কার্যকরি।


বাংলাদেশ কৃষি গাবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বরেন্দ্র কেন্দ্র, রাজশাহী মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন এই চার ফসলের শস্যবিন্যাসটির পরীক্ষা সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছে। এই ফসল ধারা প্রবর্তন করে পতিত জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং ভুগর্ভস্থ পানির উত্তোলন কমানো সম্ভব।


সুতরাং বাংলাদেশে যে সব এলাকায় রোপা আমন পতিত বোরো ফসল ধারা রয়েছে সেই সব এলাকায় মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন ধান ফসলধারা প্রচলন করা সম্ভব অর্থাৎ চার ফসলভিত্তিক ফসলধারাসমূহ কৃষিতাত্তি¡কভাবে চাষ করা সম্ভব, এতে করে শস্য নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে আমাদের দেশে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। ফসলধারাটি আগামীতে ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমি থেকে বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদনের একটি অন্যতম প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করবে।


আমরা জানি এক বছর=৩৬৫ দিন।
এই ফসলধারায় বারি মসুর-৬ উৎপাদনের মোট সময় ১১৫ দিন বারি মুগ-৬ উৎপাদনের এর মোট সময় ৬৭ দিন।
রোপা আউশ ধান হিসেবে ব্রি ধান৪৮ উৎপাদনের এর মোট সময় ৮৫ দিন, রোপা আমন ধান হিসেবে ব্রি ধান৫৭ উৎপাদনের এর মোট সময় ৭৭ দিন। সে হিসেবে এই বিন্যাসটি করলে ১ বছরে মোট প্রয়োজনীয় সময় ৩৪৪ দিন। অবশিষ্ট সময় (৩৬৫-৩৪৪) =২১ দিন বছরে বাকি থাকছে।


এক নজরে মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন ধান ফসল ধারায় অন্তর্ভুক্ত ফসলের নাম ও চাষের সময় সারণি দ্রষ্টব্য।

                                                মসুর-মুগ-রোপা আউশ-রোপা আমন ধান

ফসলের নাম মসুর মুগডাল রোপা আউশ ধান রোপা আমন ধান
উপযোগী জাত
বারি মসুর-৬

 

বারি মুগ -৬

 
ব্রি ধান৪৮ ব্রি ধান৫৭
আগস্ট
ফসল চাষের সময় নভেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহে বপন এবং মার্চ মাসের প্রথম সপ্তহে ফসল কর্তন মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে বপন এবং মে মাসের ২য় সপ্তাহে কর্তন

মে মাসের ২য়, ৩য়, সপ্তাহে চারা রোপণ এবং আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কর্তন

 


 

মাসের তৃতীয় সপ্তাহে রোপণ এবং নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে কর্তন
 
প্রয়োজনীয় সময় ১১৫ দিন ৬৭ দিন। ৮৫ দিন। ৭৭ দিন।


জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে প্রতি বছর জমির পরিমাণ কমছে ০.৪৪% হারে। এই ফসল ধারায় শস্যনিবিড়তা বিদ্যমান ১৯৪% হতে ৪০০% করা যাবে। সময় এসেছে সুচিন্তিতভাবে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলকে বিভিন্ন ফসলের আওতায় ভাগ করে চাষাবাদ করলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।  তবে ধান যেহেতু বাংলাদেশের প্রধান ফসল একে বাদ দিয়ে শুধু অন্য ফসলের উন্নয়ন কখনই কাক্সিক্ষত হবে না। যেহেতু এই শস্যবিন্যাসটিতে দুইটি ধান থাকায় খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি আজ হুমকির মুখে পড়েছে। এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ হলে বরেন্দ্র অঞ্চলে আসবে এক সুন্দর সকালের সূর্যাদয়। আর তখনই আমরা গানের কয়েকটি লাইন বলতে পারব- ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা, ওসে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সেদেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সেযে আমার জন্মভূমি।’

আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী, ফোন : ০৭২১-৭৭৩২৭৭, ই-মেইল : rajshahi@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত
কৃষিতে আধুনিক পূর্বাভাসের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন

ড. মোঃ শাহ কামাল খান

‘ঠাণ্ডা গরম বন্যা খরা কিংবা জলোচ্ছাস
বাঁচিয়ে দিবে ঠিক সময়ে একটু পূর্বাভাস’

জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকা  দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। কাজেই নির্ভরযোগ্য কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য কৃষকদের মাঝে সময়মতো পৌঁছে দেওয়া কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে প্রতিক‚ল আবহাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব  থেকে যেমন ফসল রক্ষা করা যাবে তেমন অনুক‚ল আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়ানো যাবে। সে কারণেই বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারা দেশব্যাপী “কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প” বাস্তবায়ন করছে। আইসিটি নির্ভর এই গুরুত্বপূর্ণ, স্মার্ট এবং যুগোপযোগী প্রকল্পটি নিম্নলিখিতভাবে দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।
 

* কৃষি উৎপাদন টেকসই করার লক্ষ্যে কৃষকের কাছে কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দিয়ে আসছে এবং আবহাওয়া ও জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবসমূহের সাথে কৃষকের খাপখাওয়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আসছে।
* বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত কৃষি-আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি প্রচলন এবং যথোপযুক্ত তথ্য এবং উপাত্ত প্রণয়ন করে আসছে।
* কৃষি ক্ষেত্রে আবহাওয়া সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য কৃষি আবহাওয়া এবং নদ-নদীর সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কিত তথ্যাদি কৃষকের উপযোগী ভাষায় বিভিন্ন সম্প্রসারণ পদ্ধতির মাধ্যমে  কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসছে।
* কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণের মাধ্যমে ডিএইর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আসছে।
ফসল উৎপাদন করে কৃষকের লাভবান হওয়া নির্ভর করে মূলত তিনটি বিষয়ের উপর।
 

   ক) সময়মতো ও যথাযথ ফসল ব্যবস্থাপনা;
    খ) ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো;
    গ) নিরাপদে ফসলকর্তন;

 

প্রকল্পটি উল্লেখিত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে   যথোপযোগী পরামর্শ কৃষকদের প্রদান করে যাচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য কৃষি আবহাওয়া এবং জলবায়ু বিষয়ক ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্যউপাত্ত কৃষকের উপযোগী করে প্রস্তুত করে তা বিভিন্ন সম্প্রসারণ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে       ৪০৫১টি ইউনিয়ন পরিষদে অটোমেটিক রেইনগেজ এবং কৃষি আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন, ৪৮৭টি উপজেলায় কিওস্ক স্থাপন ও এসএএওদের কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য প্রেরণের জন্য ইন্টারনেট কানেক্টিভিটিসহ ৬৬৬৪টি  ট্যাব সরবরাহ করা হয়েছে।


কিওস্ক ব্যবহার করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন ব্যক্তি কৃষি আবহাওয়া তথ্য পোর্টাল (bamis.gov.bd, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ((dae.gov.bd)), বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (bmd.gov.bd), বন্যাপূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (ffwc.gov.bd) থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ওয়েবসাইট পরিদর্শন ও প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ/প্রিন্ট করে নিতে পারেন। সর্বসাধারণের সহজে ব্যবহারের জন্য এ কিওস্কটি সকাল ৯.০০টা থেকে বিকাল ৫.০০টা পর্যন্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের উন্মুক্ত স্থানে রাখা থাকে। এসএএওদের প্রদত্ত ট্যাব ব্যবহার করে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সদর দপ্তর থেকে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য সহজে আদান প্রদান সম্ভব হয়। অটোমেটিক রেইনগেজ এর সাথে কানেক্ট করে প্রতিদিনের বৃষ্টিপাতের তথ্য ট্যাবের মাধ্যমে বামিস পোর্টালে পাঠানো যায়।  


প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত সপ্তাহে দুই দিন ৬৪ জেলার জন্য এবং এক দিন জাতীয়পর্যায়ে কৃষি আবহাওয়া বুলেটিন তৈরি ও সরবরাহ করা হয়। এ পর্যন্ত জেলাপর্যায়ে প্রায় ২০০টি এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১০০টি বুলেটিন প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড় ফণী, বুলবুল, বন্যা ও  আকস্মিক বন্যা, শৈত্যপ্রবাহ, আম্পানসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ) এর আগে ও পরে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করে এ পর্যন্ত ২৯টি বিশেষ কৃষি আবহাওয়া বুলেটিন প্রদান করা হয়েছে। বুলেটিনসমূহ নিয়মিত কৃষি আবহাওয়া তথ্য পোর্টালে আপলোড করা হয়। প্রকল্পের আওতায় সরবরাহকৃত ট্যাবের মাধ্যমে এসএএওবৃন্দ এই পোর্টালে প্রবেশ করেন। প্রত্যেক জেলার নির্দিষ্ট তারিখের বুলেটিনে আগের চার দিনের উপলব্ধ আবহাওয়ার তথ্য এবং পরবর্তী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস সন্নিবেশিত থাকে। এর পাশাপাশি থাকে জেলাভিত্তিক বিস্তারিত কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ। বুলেটিন থেকে  এসএএওবৃন্দ সংশ্লিষ্ট জেলার নির্দিষ্ট তারিখের আগের তিন দিনের উপলব্ধ আবহাওয়ার তথ্য ও পরবর্তী তিন দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস (বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, বাতাসের গতি, বাতাসের দিক,  মেঘের পরিমাণ প্রভৃতি) সংগ্রহ করেন এবং সংগৃহীত তথ্য ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ডিসপ্লে বোর্ডের নির্দিষ্ট জায়গায় প্রদর্শন করা হয়। যার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার সকলের কাছে কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজলভ্য হয়।


প্রকল্পের আওতায় সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষক গ্রুপ থেকে কৃষক প্রতিনিধির নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর সম্বলিত ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এ ডাটাবেজে ১৫০০০ সুনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত কৃষক গ্রæপ থেকে ৩০০০০ প্রগতিশীল, কর্মঠ ও  নেতৃত্বদানকারী কৃষক প্রতিনিধির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এসএমএস ও আইভিআর (ভয়েস ম্যাসেজ) এর মাধ্যমে জরুরি অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে উক্ত কৃষকদের নিয়মিত অবহিত করা হয়ে থাকে। উল্লেখিত কৃষক প্রতিনিধিগণ প্রাপ্ত তথ্য তাদের গ্রুপের ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য কৃষকদের মাঝে বিস্তার করে থাকেন। কৃষক প্রতিনিধির পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দের কাছেও এসএমএস  পৌঁছানো হয়। প্রাপ্ত তথ্য ও কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ কাজে লাগিয়ে কৃষকগণ প্রতিক‚ল আবহাওয়া মোকাবিলার পাশাপাশি অনুক‚ল আবহাওয়ায় করণীয় বিষয়ক তথ্যসমূহ সদ্ব্যবহার করে মাঠের ফসলরক্ষা, অর্থের সাশ্রয় ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন।


এ ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৪৮৭ উপজেলার   আবহাওয়ার রিস্ক ম্যাপিং এবং এগ্রোমেট ডাটা এনালাইসিস সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উপজেলাভিত্তিক আবহাওয়ার ভবিষ্যৎ চিত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় যা কৃষি সম্পর্কিত  নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত সরঞ্জামাদি যেমন: কিওস্ক, অটোমেটিক রেইনগেজ, ট্যাব, আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড প্রভৃতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কৃষি ও কৃষকের অভ‚তপূর্ব উন্নয়ন হবে। কৃষি আবহাওয়া তথ্য পোর্টাল (bamis.gov.bd) ও বামিজ মোবাইল অ্যাপলিকেশন ব্যবহার বিষয়ে কৃষক, সম্প্রসারণ কর্মী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন যাতে তারা নিয়মিত প্রয়োজনীয় হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন।


“প্রকল্পেরই BAMIS পোর্টাল এবং মোবাইল App  
ব্যবহার করুন
নিয়মিত প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখুন”।

প্রকল্প পরিচালক, কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। ই-মেইল: kamalmoa@gmail.com,  মোবাইল: ০১৭১২১৮৪২৭৪

 

বিস্তারিত
ফল আর্মিওয়ার্মের সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ
বাংলাদেশে একটি নতুন পোকা যা ২০১৮ সালে প্রথম শনাক্ত হয়। যদিও এটি ভুট্টা ফসলের পোকা তবে অন্যান্য ফসল যেমনÑ ধান, জোয়ার, গম, আখ, নেপিয়ার ঘাস ও সবজিসহ ৮০ প্রজাতির ফসলকে আক্রমণ করতে পারে।
ফল আর্মিওয়ার্ম শনাক্তকরণের উপায় : ১. কীড়ার মাথা কালচে রঙের এবং তাতে উল্টাণ- আকৃতির বড় কীড়ায় দেখা যাবে। ২. শেষ থেকে দ্বিতীয় দেহখণ্ডের চারটি কালচে দাগ একটি বর্গাকৃতি সৃষ্টি করবে। ৩. পোকার প্রত্যেক দেহখণ্ডের উপর থেকে সুসজ্জিত চারটি উঁচু দাগ দৃশ্যমান হবে।


ফল আর্মিওয়ার্ম জীবনচক্র ও ভুট্টার ক্ষতি
ফল আর্মিওয়ার্মের জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপগুলো হলো ডিম, কীড়া (৬টি দশা), পুত্তলি এবং মথ।
ডিম : পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মথ সাধারণত গুচ্ছাকারে পাতার উপরের অংশে ১০০-২০০টি ডিম পাড়ে। একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মথ তার জীবনকালে ১৫০০-২০০০টি ডিম পাড়তে পারে। ডিমগুলো সুরক্ষিত পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। ডিম থেকে কীড়া পর্যায় যেতে প্রায় ১-৩ দিন সময় নেয়।


কীড়ার বৃদ্ধি পর্যায় (১-২) : প্রাথমিক পর্যায়ের কীড়া পাতা খেয়ে অর্ধস্বচ্ছ জাল তৈরি করে যাকে উইন্ডো বলে। নতুন ফোটা পোকাগুলো চকচকে সিল্কের মতো গুটি তৈরি করে, যার সাহায্যে এগুলো ঝুলে একই গাছের অন্য অংশে বা এক গাছ থেকে অন্য গাছে যায়। অল্প বয়স্ক গাছে কীড়া পাতার গোড়া  খেলেও পরিণত গাছের মোচার সিল্কের চারপাশের পাতা খেতে বেশি পছন্দ করে। কীড়ার বৃদ্ধি পর্যায় (১-২) সম্পন্ন করতে প্রায় ৩-৬ দিন সময় লাগে।


কীড়ার বৃদ্ধি পর্যায় (৩-৬) : ৩-৬ ধাপের কীড়াগুলো পাতার গোড়ার সুরক্ষিত স্থানে পৌঁছে বেশির ভাগ ক্ষতি সাধন করে, যার ফলে পাতায় জালিকা বা ছিদ্র তৈরি হয়। কম বয়স্ক গাছের পাতা খাওয়ার ফলে গাছের বর্ধিতাংশ মারা যায় এবং যার ফলে নতুন কোনো পাতা বা মোচা তৈরি হয় না। যখন কীড়াগুলো বড় হয় তখন প্রতিটি পত্রাবর্তে মাত্র ১-২টি কীড়া পাওয়া যায়। এ অবস্থায় এগুলো নিজেদের মধ্যকার  খাদ্যের প্রতিযোগিতা কমানোর জন্য অনেক সময় একে অপরকে খেয়ে ফেলে।  বেশকিছু পরিমাণ ‘ফ্রাজ’ (কীড়ার বিষ্ঠা) পত্রাবর্তে জমা হয় যা শুকিয়ে গেলে মিহি গুঁড়ার মতো দেখায়। পূর্ণবয়স্ক গাছে যখন মোচা বের হয় তখন কীড়া মোচায় আক্রমণ করে এবং পত্রমঞ্জুরি ভেদ করে মোচায় প্রবেশ করে বিকাশমান শস্যদানা (বীজ) খেয়ে ফেলে। কীড়ার বৃদ্ধি পর্যায় (৩-৬) সম্পন্ন করতে প্রায় ৭-১৪ দিন সময় লাগে।


পুত্তলি থেকে পূর্ণবয়স্ক : প্রায় ১৪ দিন পর পরিণত কীড়া মাটিতে পড়ে যায়, যাতে এরা পুত্তলি গঠন করতে পারে। পুত্তলি হওয়ার আগে কীড়া মাটির ২-৮ সেমি. গভীরে প্রবেশ করে। যদি মাটি খুব বেশি শক্ত থাকে তাহলে পাতার খড়কুটা/উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে নিজেদের ঢেকে ফেলে। পুত্তলিগুলো ২-৩ সেমি. লম্বা ও বাদামি রঙের হয়। প্রায় ৭-১০ দিন পর পুত্তলি থেকে পূর্ণবয়স্ক মথগুলো বের হয় যা পুনরায় জীবনচক্র শুরু করে। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে ফল আর্মিওয়ার্মের জীবনকাল পরিবর্তিত হয়। উষ্ণ তাপমাত্রায় এদের জীবনকাল সম্পন্ন হতে ১০-১৩ দিন সময় লাগে যেখানে শীতল তাপমাত্রায় এদের সময় লাগে ১৪-২১ দিন।
 

প্রতিরোধ
ফল আর্মিওয়ার্মের সর্বোচ্চ আক্রমণকে এড়ানোর জন্য ভুট্টা বীজ আগাম বপন করতে হবে। এজন্য খরিফ মৌসুমে, ফেব্রæয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বীজ বপণ করতে হবে। রবি মৌসুমে, নভেম্বরের শুরু থেকে ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত বীজ বপণ করতে হবে। ভুট্টা বপনের পূর্বে সায়ান্ট্রনিলিপ্রলি বা ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক দিয়ে বীজ শোধন করলে ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়।
ভুট্টা বীজ কিছুদিন পরপর কয়েক দফায় বপন করলে দীর্ঘ সময় ধরে খাবার পাওয়ার ফলে পোকাটির আক্রমণ ক্রমাগত চলতেই থাকবে। তাই বারবার না করে একসাথে পুরো মাঠে/এলাকায় বীজ বপন করা উত্তম। সম্ভব হলে ফল আর্মিওয়ার্ম প্রতিরোধী ভুট্টার জাত ব্যবহার করতে হবে। স্বল্প জীবনকালের ভুট্টার জাত চাষ করতে হবে।


পোকার আক্রমণ হলেও যেন গাছ সজীব থাকে এবং ক্ষতি কম হয় সেজন্য সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। জমি, আইল ও আশপাশের জায়গা আগাছামুক্ত রাখতে হবে (বিশেষত : ঘাস জাতীয় আগাছা)। উপকারি পোকা ও পাখির বাসস্থানের জন্য জমির চারপাশে ডালজাতীয় (লিগিউম) ফসল অথবা বহুবর্ষজীবী ফুলগাছের বেড়া দিতে হবে। ভুট্টার সাথে সাথী ফসল হিসেবে শিম, চীনাবাদাম, অড়হর, সয়াবিন ইত্যাদি সহনশীল ফসল চাষ করা ভালো।


পর্যবেক্ষণ
বীজ অংকুরিত হওয়ার পর সপ্তাহে দুইবার মাঠ পরিদর্শন করতে হবে। খুব সকালে অথবা সূর্যাস্তের সময় এ পোকার উপস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে, কারণ এ সময় পোকাটির আনাগোনা সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রতি বিঘা (৩৩ শতক) মাঠের যেকোনো পাঁচটি স্থানে পরপর দশটি করে গাছ ইংরেজি ‘’ি এর মত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পর্যবেক্ষণকালে, গাছে আর্মিওয়ার্মের ডিম, কীড়া বা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আক্রমণের লক্ষণ এবং আক্রান্ত গাছের সংখ্যা লিখে রাখতে হবে।
পাতায় আর্মিওয়ার্মের আক্রমণের লক্ষণ, পাতা অথবা মোচায় ছোট কীড়া দেখা যেতে পারে। উপরের কুণ্ডলিত কচি পাতায় জানালা আকৃতির ছোপ (উইন্ডো পেন), পাতায় লম্বা ছিদ্র এবং কচিপাতায় মলদানা দেখে পোকাটির উপস্থিতি শনাক্ত করতে হবে। বড় খামারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ সম্ভব না হলে ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করে পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিদর্শনের সময় পোকার ডিম পেলে তা তৎক্ষণাৎ নষ্ট করে ফেলতে হবে যেন ভবিষ্যতে সেগুলো ফুটে কীড়া বের না হয়। গাছ যখন হাঁটু উচ্চতায় থাকে সে অবস্থায় ২০ শতাংশের বেশি গাছ আক্রান্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে এবং গাছ যদি কাঁধ উচ্চতায় থাকে তবে ৪০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত হলে দমন ব্যবস্থা নিতে হবে। উল্লেখ্য যে, যদি গাছ টাসেল ও সিল্ক পর্যায়ে থাকে তখন কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না।


দমন ব্যবস্থাপনা
যদি ফসলে ফল আর্মিওয়ার্ম পাওয়া যায় তাহলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সাথে সাথে প্রতিবেশীদের সতর্ক করতে হবে।
যান্ত্রিক দমন : ফসলের কোন ডিমগুচ্ছ এবং কীড়া পাওয়া গেলে নিয়মিতভাবে হাত দিয়ে তুলে নষ্ট করা; প্রতি একরে ৫টি ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করা; গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে হাঁটু উচ্চতা পর্যন্ত শতকরা ২০টির বেশি এবং মাঝারি  উচ্চতা থেকে পরিণত অবস্থায় শতকরা ৪০টিরও বেশি গাছ আক্রান্ত হয় তবে যান্ত্রিক দমনসহ নিম্নে উপযুক্ত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে হবে।


জৈব দমন : জমিতে যদি পূর্ণাঙ্গ মথ বা ডিমের উপস্থিতি দেখা যায় তাহলে প্রাকৃতিক শত্রæ হিসেবে বিঘাপ্রতি ১৪-১৫ হাজার ট্রাইকোগ্রামা এবং যদি কীড়ার আক্রমণ পরিলক্ষিত হয় তবে বিঘা প্রতি ১০০-১৫০টি ব্রাকন হেবিটর অবমুক্ত করা।


জৈব বালাইনাশক : প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ মিলি হারে নিম জাতীয় কীটনাশক এজাডিরেক্টিন প্রয়োগ করা। প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে এসএফএনপিভি (ভাইরাস ভিত্তিক জৈব বালাইনাশক) প্রয়োগ করা। পোকার আক্রমণের পর প্রথমবার প্রয়োগের ১০ দিন পরপর করে দুইবার প্রয়োগ করা। প্রতি লিটার পানিতে ০.৪ মিলি হারে স্পিনোস্যাড প্রয়োগ করা।


সরাসরি দমন ও সীমাবদ্ধতা
বিস্তৃত পরিসর কার্যকারিতার কীটনাশক ব্যবহার না করাই উত্তম কেননা এতে উপকারি পোকারাও মারা যায় এবং তা প্রয়োগকারীর স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। রাসায়নিক এমনকি জৈব কীটনাশক ব্যবহার করার সময়ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন : প্রতিরক্ষাকারী পোশাক যেমন হাতমোজা, মুখোশ, বুট, এপ্রোন/কোট ইত্যাদি পরিধান করা। কীটনাশকের গায়ে লেখা নির্দেশিকা ও ব্যবহারবিধি মেনে চলা যেমন-প্রয়োগ মাত্রা, কয়দিন অন্তর অন্তর প্রয়োগ করতে হবে, সর্বোচ্চ কতবার প্রয়োগ করা যাবে, ফসল তোলার সর্বোচ্চ কতদিন আগে প্রয়োগ করা যাবে ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে যে, অব্যবহৃত কীটনাশক বা এর পাত্র কখনোই পানির উৎসে ধোয়া বা ফেলা যাবে না।


পোকার আক্রমণ বেশি হলে ছোট কীড়া দমনের জন্য পুরো ফসলে এবং বড় পোকার জন্য শুধুমাত্র আক্রান্ত গাছগুলোতে স্প্রে করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের পর তা পোকার উপর প্রভাব ফেলতে কিছু সময় লাগে এজন্য তাৎক্ষণিক কোনো ফলাফল পরিলক্ষিত নাও হতে পারে। তাই প্রয়োগের এক সপ্তাহ পর গাছে নতুন করে আক্রমণের লক্ষণ আছে কি না তা দেখে পরবর্তী কীটনাশক প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


আক্রান্ত কুণ্ডলিত কচিপাতাকে লক্ষ্য করে সিস্টেমিক কীটনাশক (বিশ্বখাদ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত, ইউ শ্রেণীর অধিভুক্ত) প্রয়োগ করতে হবে। যেমন- এবামেকটিন ১.৮ ইসি ১.৫ মিলি/লিটার; এমামেকটিন বেঞ্জয়েট ৫এসজি ০.৪ গ্রাম/লিটার; ক্লোরান্ট্রিনিলিপ্রলি ১৮.৫ এসসি ০.৪ মিলি/লিটার। সাধারণত এ জাতীয় কীটনাশক ব্যবহারে পরিবেশ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রয়োগের ২১ দিনের মধ্যে ফসল কোনোভাবেই খাবার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
পরবর্তী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বনের ৭ দিন ফল আর্মিওয়ার্মের অবস্থা যাচাই করতে হবে।

সহকারী তথ্য অফিসার (শ.উ.), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা; ফোন : ৫৫০২৮৪৪১, ই- মেইল : aiocp@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত
অতি ঘন পদ্ধতির আম বাগানে ফলন বৃদ্ধির প্রযুক্তি

ড. মো. শরফ উদ্দিন

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। নদী মাতৃক এই দেশ আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও জনসংখ্যায় ভরপুর। এ ছাড়াও প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। বাড়তি জনসংখ্যার এই দেশে মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন দেশের নীতিনির্ধারকরা। এর সাথে যোগ হয়েছে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী ১০-১২ লাখ কর্মহীন রোহিঙ্গা। ফলে এসব জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে, বাড়তি খাদ্যশস্য ও ফলমূল। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত নির্মাণে প্রতি বছর চাষাবাদযোগ্য জমি ১% হারে কমছে এমনটিই শোনা যায়। আম্পান, আইলারমতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পিছু ছাড়েনি এ দেশের। তারপরও কৃষিবান্ধব সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ, দিকনির্দেশনা, কৃষি ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের লাগসই উদ্ভাবন কৃষি উৎপাদনকে সুসংহত করেছে। আজ আমরা দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পর্ণ। তবে ফল ও সবজি উৎপাদনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সবাই ব্যস্ত। ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে। দেশীয় ফলের সাথে সাথে বিদেশী ফলসমূহ দেশের চাহিদা পূরণে ভ‚মিকা রাখছে। এদেশের মানুষের সবচেয়ে পছন্দনীয় ফল হলো আম। সারা বছর চাহিদানুযায়ী ফল খেতে না পেলেও আমের মৌসুমে সাধ্যমতো পুষিয়ে নেন ভোক্তারা। ফলে বিগত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে আমের উৎপাদন বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণে ২৩টি জেলায় আমের বাণিজ্যিক চাষাবাদ সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে অন্য জেলাগুলোতেও আমের উৎপাদন বাড়ছে। তারপরও নতুন বাগান স্থাপনে থেমে নেই জমির মালিক ও আম চাষিরা। বিগত কয়েক বছরে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় আম চাষ সম্প্রসারিত হলেও নওগাঁ জেলায় সবচেয়ে বেশি আম বাগানের সম্প্রসারণ হয়েছে। ধানের চেয়ে তুলনামূলক লাভজনক হওয়ায় প্রথমে ধানের জমিতে আমগাছ লাগানো শুরু করেছেন। এরপর তা শুধু আম বাগানে রূপান্তরিত হচ্ছে। ছবিতে ধানের জমিতে আমগাছ লাগানো হয়েছে। এই জেলার সবচেয়ে বেশি আম বাগান সম্প্রসারিত হয়েছে পোরশা ও সাপাহার উপজেলায়। এই জেলায় সবচেয়ে বেশি চাষ হয় বারি আম-৩ তথা আ¤্রপালি জাতের এবং এর পরের স্থান বারি আম-৪। অন্য জাতগুলোও কম পরিমাণে চাষ করতে দেখা যায়। সকল মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে, বারি আম-৩ জাত বা আ¤্রপালি সম্পর্কে। অনেকের ধারণা গাছটি আকারে বড় হয় না এবং বেশি বছর বাঁচে না। এই ধারণাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫ বছর বয়সের গাছ রয়েছে এবং এই গাছগুলোর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ফলধারণক্ষমতায় বাড়ছে। এই জাতের গাছ বেশি বড় হয় না বিধায় চাষিরা অতি ঘন পদ্ধতিতে আম বাগান স্থাপন শুরু করেছেন।


অতি ঘন পদ্ধতি
সকলের জানার সুবিধার জন্য আম বাগান স্থাপনের অতি ঘন পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা দেয়া হলো। এদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে যে আম বাগানগুলো দেখা যায়, সেগুলো কমপক্ষে ৩০ দ্ধ ৩০ ফুট দূরত্বে অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে ১০০টি কলম লাগানো হতো তবে কোন কোন ক্ষেত্রে ৪০ দ্ধ ৪০ ফুট  দূরত্বের বাগানও দেখতে পাওয়া যায়। অনেক বড় আম বাগানে এক বিঘা জমিতে  একটি বা দুইটি আমগাছ দেখা যায়। ১৯৮৫ সালে আম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর বড় জাতগুলোর জন্য ৩০ দ্ধ ৩০ ফুট (প্রতি হেক্টরে ১০০টি গাছ) এবং ছোটজাতগুলোর জন্য ১২ থেকে ১৮ ফুট (৬২৫টি হতে ৫৫৫টি গাছ প্রতি হেক্টরে) দূরত্বে রোপণের জন্য পরামর্শ দেয়া হতো। ফলে ১০-১২ বছর অনায়াসে আম বাগানে অন্য ফসল চাষ ও আমের ফলন পেতে তেমনটি অসুবিধা হতো না। এরপর চালু হলো দুইটি বড় জাতের গাছের মধ্যে একটি ছোট জাতের গাছ লাগানো এবং ১০-১২ বছর পরে বড় গাছের সাথে প্রতিযোগিতা শুরু হলে মাঝের গাছটি কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়া হতো। তবে অনেকে মাঝের ছোট গাছটি কাটতে চাইতেন না। ফলে উভয় গাছের ফলন বাধাগ্রস্ত হতো এবং রোগ ও পোকার আক্রমণের কারণে ভালো আম উৎপাদন করা সম্ভব হতো না। আর অতি ঘন পদ্ধতিতে লাইন হতে লাইন ৩ মিটার এবং গাছে থেকে গাছ ২ মিটার দেয়া হয়। ফলে এক হেক্টর জমিতে ১৬৬৭টি গাছ লাগানো হয়ে থাকে। এই বিশাল চাহিদাপূরণে অত্র এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত নার্সারি যেখানে গুণগত মানসম্পন্ন কলম উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। তবে কেউ কেউ ৩ মি.দ্ধ ৩ মি. অথবা ৪ মি. দ্ধ ৩মি. দূরত্বে আম বাগান করছেন। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে নার্সারি মালিকগণ জমির মালিককে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, যত গাছ তত আম। অপরপক্ষে আম গবেষকগণ এবং আম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এখন অতি ঘন পদ্ধতিতে আম বাগান স্থাপনে পরামর্শ প্রদান করেন না কারণ আমাদের দেশে সবাই জানেন একবার আমগাছ লাগালে ৩০-৪০ বছর অনায়াসে আম উৎপাদন ও বিক্রয় করা যাবে।


এমনও অনেক চাষি আছে, যারা শুধুমাত্র আমের মৌসুমে বাগানে গমন করেন এবং বছরের অন্যান্য সময় আম বাগানে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। তবে বেশির ভাগ চাষি আম বাগানে শুধুমাত্র সার প্রয়োগ ও বালাইনাশক ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু অতি ঘন পদ্ধতির আম বাগানে ১২ মাস বাগান পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। যেমন সময়মতো সার প্রয়োগ, সেচপ্রয়োগ, প্রæনিং, ট্রেনিং, মরা ডালপালা অপসারণ ইত্যাদি। যদি কোন চাষি গাছ লাগানোর পর তিন বছর প্রুনিং না করে থাকেন তাহলে পরের বছরে আমের ফলন বাড়ার পরিবর্তে কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সঠিক জাত নির্বাচন করে অতি ঘন এবং ঘন পদ্ধতিতে আম বাগান স্থাপন করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।


পোরশা, সাপাহার, নাচোল, গোমস্তাপুর উপজেলার অনেক আম বাগান সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, নতুন বাগানগুলো আমগাছ রোপণের সাধারণ দূরত্ব অনুসরণ না করে ঘন ও অতি ঘন পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। সেক্ষেত্রে প্রতি হেক্টর জমিতে ১২০০ থেকে  ১৭০০ পর্যন্ত আমের কলম রোপণ করছেন। ফলে গাছ রোপণের ৩-৪ বছরের মধ্যেই একটি গাছ অন্য গাছের মধ্যে প্রবেশ করেছে। কোন কোন চাষি আম সংগ্রহ করার পর প্রুনিং, ট্রেনিং করে গাছগুলোকে ছোট রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে অধিকাংশ চাষির এই ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এসব আম বাগানে ২-৩ বছরের মধ্যে ভালো ফলন পাওয়ার পরিবর্তে ফলন কমার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। অতি ঘন পদ্ধতিতে আম বাগান করলে আম বাগান ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। আম গবেষক ও আম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, এ সব চাষিদের এই মুহুর্তে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, অল্প সময়ে ফলের চাহিদা মেটাতে ও আমের ফলন বাড়াতে এই ধরনের উদ্যোগ যুক্তিসংগত কিন্তু সঠিক নিয়মকানুন না জেনে অতিঘন পদ্ধতিতে আম বাগান করলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে।


অতি ঘন পদ্ধতিতে স্থাপিত আম বাগান হতে ভালো ফলন পেতে করণীয়
প্রতি  বছর গাছের বয়সানুযায়ী সুষমমাত্রার সার প্রয়োগ করতে হবে। শুধুমাত্র রাসায়নিক সার প্রয়োগ না করে সাথে পচা গোবর সার/ জৈবসার/ ভার্মিকম্পোস্ট/ ট্রাইকোকম্পোস্ট/ আবর্জনা পচা সার ব্যবহার করা উত্তম।
আম সংগ্রহ করার পরপরই প্রুনিং করতে হবে। তবে প্রয়োজন হলে ট্রেনিং করতে হবে।


নতুন পাতা বের হলে এ্যানথ্রাকনোজ রোগ এবং পাতাকাটা উইভিল পোকার আক্রমণ দেখা যায় সেক্ষেত্রে কার্বারিল গ্রুপের কীটনাশক ও মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। অন্যথায় নতুন ডগাপাতা শূন্য হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। খরা মৌসুমে এবং সার প্রয়োগের পর পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।


অতি ঘন পদ্ধতিতে আম বাগানে পর্যাপ্ত আলো প্রবেশ করতে পারে না। ফলে হপার পোকা ও মাছি পোকার উপদ্রব বেশি হতে পারে। সেজন্য হপার পোকা যেন না থাকে সেজন্য ইমিডাক্লোপ্রিড/কার্বারিলগ্রুপের যে কোন ভাল কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে এবং মাছি পোকা দমনের জন্য সঠিক সময় ও পদ্ধতি অনুসরণ করে ফ্রুটব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
এ ছাড়াও আম বাগানে অন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেজন্য আম গাছের পরিচর্যার মাস-পঞ্জি অনুসরণ করতে হবে।

 

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর, মোবাইল: ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল: sorofu@yahoo.com

 

বিস্তারিত
পুষ্টি নিরাপত্তায় পারিবারিক খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

ড. সালমা লাইজু

আমরা জীবন ধারণের জন্য খাদ্য গ্রহণ করি। খাদ্যের সঙ্গে জীবন স্পন্দনের সম্পর্ক সরাসরি। নির্ভেজাল, পুষ্টিকর খাবার পরিমিত গ্রহণ করার মধ্যে রয়েছে আমাদের সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা। নিরাপদ খাবার হলো সেই খাবার যা কোন মানুষ গ্রহণ করলে তার ক্ষতি হবে না, তার শরীরের পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। মানুষ তার কঠোর পরিশ্রমের অর্জিত অর্থ দিয়ে খাদ্য কিনে প্রতারিত হয়, ভেজাল খাবার খেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। এ রকম অবস্থার সম্মুখীন আমরা সবাই।


অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় তৈরি; প্যাকেটজাতকরণ, স্টোর করার দরুন প্রকৃত গুণ নষ্ট হয়ে গেছে; বিষাক্ত হয়ে গেছে; পচা, গলা, রোগাক্রান্ত, পোকায় আক্রান্ত, প্রাণী আক্রান্ত সবজির অংশবিশেষ থাকার ফলে খাওয়ার অনুপযুক্ত; বিষাক্ত অথবা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান আছে; রং ব্যবহার করা হয়েছে যা অনুমোদিত নয়; প্রিজারভেটিভ  আছে যা অনুমোদিত না অথবা অনুমোদিত হলেও মাত্রাতিরিক্ত আছে এ রকম খাবার আমরা সবসময়  খাচ্ছি অথচ আমাদের দেশের জলবায়ুর বৈচিত্র্যের কারণে ঋতু ভিত্তিক নানা প্রকারের শাকসবজি উৎপন্ন হয়ে থাকে। মৌসুমে অনেক খাদ্যদ্রব্যের দাম খুবই কম থাকে। তখন পুষ্টিকর এ সব খাদ্য দ্রব্য হয়ে পড়ে উপেক্ষিত। অথচ এসব খাদ্যদ্রব্য যথাযথ সংরক্ষণ করতে পারলে সারা বছর পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা যাবে, সেই সাথে অর্থ সাশ্রয় হবে।


আবহমানকাল থেকে গ্রাম বাংলার মেয়েরা খাদ্য সংরক্ষণ করতেন। বর্তমানে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবারের প্রাপ্যতা বেড়ে যাওয়া এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই ঐতিহ্য দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে প্রক্রিয়াজাত খাবার পাওয়া যায় না, সেখানেই কেবল কিছু মানুষ এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।


আমাদের গ্রামে গঞ্জের শিশুরাও আজকাল চিড়া, মুড়ি, খই, মোয়া, হাতের সেমাই, বিভিন্ন সাজ পিঠা, পাতা পিঠা, ছাতু, লাড্ডু, আচার, চাউলের ঝুরি, নারকেলের নাড়–, ছাতুর নাড়–, চালকুমড়ার মোরব্বা ইত্যাদি খাবারের সঙ্গে পরিচিত নয়। আজকাল মায়েরা এইসব ঝামেলা করতেও চান না। উপকরণ প্রাপ্যতারও সমস্যা রয়েছে কিছুটা। দশ টাকা দিয়ে সহজেই চিপস, জুস, আইসক্রিম, বিস্কুট, আচার, ক্যান্ডি, শামুচা, সিঙ্গারা পাওয়া যায়, তাহলে এসব ঝামেলা কে করতে যায়? অথচ নিম্নমানের এসব খাবারে কোন পুষ্টি তো নেই-ই বরং তাতে রয়েছে নানা ধরনের রাসায়নিক বস্তু যা শরীরের পুষ্টি সাধনের পরিবর্তে নানা রকম রোগব্যাধির সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে।


আমরা জীবন ধারণের জন্য খাদ্য গ্রহণ করি। খাদ্যের সঙ্গে জীবন স্পন্দনের সম্পর্ক সরাসরি। নির্ভেজাল, পুষ্টিকর খাবার পরিমিত গ্রহণ করার মধ্যে রয়েছে আমাদের সুস্থ্য জীবনের নিশ্চয়তা। নিরাপদ খাবার হলো সেই খাবার যা কোনো মানুষ গ্রহণ করলে তার ক্ষতি হবে না, তার শরীরের পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। মানুষ তার কঠোর পরিশ্রমের অর্জিত অর্থ দিয়ে খাদ্য কিনে প্রতারিত হয়, ভেজাল খাবার খেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। এ রকম অবস্থার সম্মুখীন আমরা সবাই।


উদহারণস্বরূপ, মরিচের গুঁড়া বেশি লাল করার জন্য সুদান ডাই, ইটের গুঁড়া দেয়া হয়। কখনো এতে লাল রং ও কাঠের গুঁড়া মেশানো থাকে। যে কোনো গাছের পাতা গুঁড়া করে পিকরিক এসিড দিলে লাল রঙ হয়ে থাকে। অনেকে পিকরিক এসিড দয়ে মেহেদি তৈরি করে এ মেহেদি বেশি ব্যবহার করলে স্কিন ক্যান্সার হবে। আজকাল খাবারকে আকর্ষণীয় করার জন্য স্বাদ লবণের  টেষ্টিং সল্ট) ব্যবহার খুবই বেড়েছে। স্বাদ লবণ বেশি খেলে বাচ্চাদের আচরণ পরিবর্তিত হয়ে যায়।


সুজিকে ভারী করার জন্য লৌহ চ‚র্ণ দেয়া হয়। আয়রন ট্যাবলেটেও লৌহ চূর্ণ দেয়া হয়। সাগুদানার মধ্যে ট্যালকম পাউডার যোগ করা হয়। মশুর ডালকে বেশি লাল বানাতে লেড ক্রোমেট দেয়া হয়। ঘি/মাখনের মধ্যে ডালডা মেশানো থাকে।


টমোটোতে হরমোন, ক্যামিক্যালস দিয়ে কাঁচা টমেটো পাকানো হয়, রান্না করলে শক্ত হয়ে থাকে। আম, কলা কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় যা খুবই বিষাক্ত। আম কলা গাছে ফরমালিন স্প্রে করা  হয়, এতে দীর্ঘদিন ভালো থাকে সহজে পচে না। সবজিতে এবং ফলে প্রচুর  হরমোন স্প্রে করা হয়। সুদান ডাই/লাল রঙ- যা তরমুজকে বেশি লাল করতে ব্যবহৃত হয়।


পটেটো চিপসে ওলেষ্ট্রা (Olestra) নামক কৃত্রিম চর্বি দেওয়া হয়। বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। কিন্তু ওলেষ্ট্রা পাকস্থলী হজম এবং শোষণ করতে পারে না। যার ফলে পেটে অস্বাভাবিক গোলমাল দেখা যায়। গুড়ে জীবাণু নাশক ফিটকিরী দেওয়া হয়, চাল ধবধবে চিকন করার জন্য ইউরিয়া টিএসপি সার দেয়া হয়। মেশিনে চাল কেটে চিকন করা হয় ফলে পুষ্টিমান কমে যায়। লিচু অতিরিক্ত লাল করার জন্য কৃত্রিম ডাই দেয়া হয়।


এসব প্রায়ই আমরা পত্রিকাতে পড়ি খাবারে ভেজাল দ্রব্যের ছড়াছড়ি। কিন্তু বাহির থেকে দেখে আমরা বুঝতে পারি না।  অতিরিক্ত লবণ, ক্ষতিকর তেল বা ক্ষতিকর চর্বি দিয়ে এইসব খাবার তৈরি হয়ে থাকে। অপুষ্টিকর চর্বিযুক্ত এইসব খাবার সব বয়সের মানুষের জন্যই ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুরা মারাত্মক ক্ষতিকর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে। এগুলো খেয়ে প্রায়ই তাদের পেটের গোলযোগ হয়ে থাকে। এর ফলে তাদের ক্ষুধামন্দা, খিটখিটে মেজাজ, ওজনহীনতাসহ জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।


গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব খাবার পুষ্টিকর পরিচ্ছন্ন এবং মুখরোচক, এখানে ক্ষতিকর কোন রং বা প্রিজারভেটিভ দেয়া থাকে না। যুগ যুগ ধরে আমাদের দাদী নানীরা এই ঐতিহ্যের ধারকবাহক ছিলেন। রৌদ্রে শুকিয়ে লবণ, চিনি, তেল বা ভিনেগার দিয়ে, আগুনে ফুটিয়ে, বরফে রেখে নানা রকমের খাবার সংরক্ষণ করা সম্ভব।


আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে গোলআলু, মিষ্টিআলু উৎপাদিত হয়। আলু ভাতের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিকর অথচ আলু মৌসুমে তা রাস্তায় পড়ে থাকে। আলুর চিপস তৈরি করে রাখলে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যায়। টমেটো আরেকটি অতি উপকারী ফলজাতীয় সবজি, যা দিয়ে কেচাপ, সস, চাটনি তৈরি করা যায়। চালকুমড়ার মোরব্বা ও ক্যান্ডি, আনারস ও পেয়ারার জ্যাম-জেলি, মৌসুমী সব ফল যেমন আম, জলপাই, বরই, আমড়া, চালতা, জাম, পেয়ারা এবং বিভিন্ন সবজির মিশ্র আচার, তিল, নারকেল, বাদাম, চিড়া ভাজা দিয়ে মোয়া ইত্যাদি ছোট ছোট শিশুদের খাবারে বৈচিত্র্য আনে, সেই সঙ্গে পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করে।


ছোলার ডাল, গম, ভুট্টা, চাল সব কিছু একত্রে ভেজে গুঁড়া করে তৈরিকৃত ছাতু একটি আন্তর্জাতিক মানের পুষ্টিকর খাবার যা গর্ভবতী ও প্রসূতি মা এবং শিশু-কিশোরদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে অত্যন্ত কার্যকর। পাকা চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, কচু, কুমড়ার বড়ি, শুঁটকী মাছ সারা বছর খাওয়া যায়, সেই সঙ্গে এগুলোর অনন্য স্বাদ যার তুলনা মেলা ভার।


শহরে যাদের সুবিধা আছে তারা বাঁধাকপি, মূলা, টমেটো, মটরশুঁটি, গাজর ইত্যাদি বঞ্চিং  (Blanching) করে সংরক্ষণ করতে পারে। সবজিগুলো ধুয়ে বড় টুকরা করে নিতে হবে, এর পর বড় হাঁড়িতে পানি গরম করতে হবে, পানি এমন গরম হতে হবে যাতে হাত পানিতে ডুবানো যায় কিন্তু রাখা যাবে না (৬০০ সে.), এর পর সবজিগুলো ৩-৪ মিনিট রেখে পানি থেকে উঠিয়ে নিতে হবে এরপর ঠাÐা করে প্যাকেট করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে।
হাতে তৈরি খাবার সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ। বর্তমান সময়ে যেখানে নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাবার পাওয়া দুঃসাধ্য সেখানে হাতে তৈরি খাবারের বিকল্প নেই। শিশুদের টিফিনে এবং বিভিন্ন সময়ে আমরা এই খাবার তাদের খেতে দিতে পারি কারণ পুষ্টি অর্জনের প্রথম শর্ত নির্ভেজাল এবং সুষম খাবার যা খোলা খাবার বা বাইরের খাবারে অনুপস্থিত।


পুষ্টি একটি ব্যাপক বিষয়-পুষ্টির সঙ্গে জীবনের সুস্থতা এবং কর্মক্ষমতা জড়িত। পুষ্টির ঘাটতি একটি পরিবার তথা জাতিকে রোগগ্রস্ত করে ফেলতে পারে। খাবারের রুচি, স্বাদ-গন্ধ ঠিক রেখে উন্নত খাবার নির্বাচন, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করতে হবে যাতে গুণগত মানও ঠিক থাকে সেই সঙ্গে খাবার হয় মুখরোচক এবং পুষ্টি সমৃদ্ধ। যুগে যুগে প্রচলিত গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য হাতে তৈরি খাবার গুণে মানে সেরা এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। য়

জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নেত্রকোনা, মোবাইল :  ০১৭১৫ ৭৯০৭৬৭,  ই-মেইল : slsnns@yahoo.com

 

বিস্তারিত
সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টার

শুভাশিষ ভৌমিক
সবুজশক্তি বিশ্বাস করে কৃষক বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে সম্ভাব্য ৪০ লক্ষ কৃষি পরিবার প্রচলিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা থকে বঞ্চিত। পাশাপাশি কৃষি জমিতে রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ব্যাপকহারে ভুক্তভোগী। এই রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশে এখন প্রায় ৬২% জমি কৃষিকাজে অনুপযোগী। এই ৪০ লক্ষ পরিবার যাদের ২-৩ টি গবাদি পশু রয়েছে তারা সরাসরি সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টারের সুফলভোগী হতে পারে। শুধু তাই নয়, কাঠ সংগ্রহ বাবদ বাঁচাতে পারে বছরে ১০৯৫ ঘণ্টা। সবুজশক্তির বায়োগ্যাস কালো ধোঁয়া থেকে বাঁচায় যা ৮০% শারীরিক ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং শ্বাস-  প্রশ্বাসজনিত রোগব্যধি থেকে ফুসফুসকে রক্ষা করে। এছাড়া জ্বালানি এবং সার বাবদে বছরে সাশ্রয় হয় প্রায় ২৪,০০০ টাকারও অধিক।


পরিবেশ রক্ষায় সবুজশক্তির অবদান অনন্য। প্রতিটি বায়োডাইজেস্টার সিস্টেম ২৫ বছরে ১১২ টন কার্বন নিঃসরণ করে। এর থেকে উৎপাদিত জৈবসার মাটির গুণগত মান বৃদ্ধি করে অধিক ফলনে ভুমিকা রাখে।


বাংলাদেশে অস্ট্রলিয়ান প্রযুক্তির সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টার  
অস্ট্রেলিয়ান সোস্যাল এন্টারপ্রাইজ
ATEC* (Appropriate Technology) ২০২০ সালে বায়োডাইজেস্টার ব্র্যান্ড ‘সবুজশক্তি’ সূচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। অঞঊঈ* ২০১৫ সাল হতে গ্রামীণ কৃষক পরিবারের জন্য বায়োডাইজেস্টার প্রস্তুত করে আসছে যা বিনামূল্যে বায়োগ্যাস এবং জৈবসার সরবরাহ করে। এটি অস্ট্রেলিয়ান মানদণ্ডের প্রস্তুতকৃত বিশ্বের এক অভাবনীয় উদ্ভাবন যা ইতোমধ্যে কম্বোডিয়ায় ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। কম্বোডিয়ায় গত ৫ বছরে ১৫০০ এরও অধিক সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে যার প্রতিটি সমান কার্যক্ষম। ATEC* এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৫ টি দেশে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা এবং ১ মিলিয়ন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা।


গতানুগতিক ইট-সিমেন্ট দ্বারা প্রস্তুতকৃত বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের তুলনায় সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টার অত্যান্ত কার্যকর যা বৃষ্টি বা বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এটি মাত্র ২-৩ ঘণ্টায় যে কোন স্থানে, এমনকি বর্ষা মৌসুম এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্থাপনযোগ্য।


সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টারের টেকসই ডিজাইন নিশ্চিত করে ২৫ বছরের বেশি স্থায়িত্ব, ফলে একবার বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫ বছরের বেশি নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। এর রয়েছে ইউভি প্রতিরোধক LLDPE (Linear Low Density Poly Ethylene) উপাদান যা গতানুগতিক প্লাস্টিক ম্যাটেরিয়ালের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। সাথে থাকছে ৩ বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি।


কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তন নয়, সর্বোচ্চ বিক্রয় পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জন সবুজশক্তির অন্যতম লক্ষ্য। এর ধারাবাহিকতায় সবুজশক্তি নিয়ে এলো ফ্রি হটলাইন সার্ভিস যার মাধ্যমে একজন ক্রেতা বিনাখরচে সেবা গ্রহণ করতে পারবে। এ ছাড়াও রয়েছে দক্ষ ও অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দ্বারা বিক্রয়োত্তর দ্রুততম সময়ে সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা।


বাংলাদশের সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টার সফলতা
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের একটি কৃষক পরিবারের প্রধান বিপ্লব হোসেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা মোট ৮ জন। কৃষিকাজের জন্য বর্তমানে তার রয়েছে ৫টি গরু। প্রতিদিন ৮ জন সদস্যের ৩ বেলা রান্নার পেছনে লাকড়ি বাবদ প্রতি মাসে বাড়তি প্রায় ৮০০-১০০০ টাকা ব্যয় বিপ্লব হোসেনের জন্য ছিল একটি বড় ধরনের বোঝা। আসমা আক্তার, যিনি বিপ্লব হোসেনের সহধর্মিণী, রান্নার পেছনে তার সীমাহীন কষ্ট বিপ্লব হোসেনের কপালে চিন্তার রেখা ফেলেছিল। লাকড়ি চুলার পেছনে রান্না বাবদে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় তিন ঘণ্টা বাড়তি সময় ব্যয় হতো। আসমা আক্তারের ২ সন্তানকে বঞ্চিত রাখতো তাদের যত্নআত্তির ব্যাপারে তদারকি করার থেকে। শুধু তাই নয়, আসমা আক্তার ভুগতেন নানা শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যায় যার মূলে ছিল লাকড়ি চুলা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া। মাঝেমধ্যে সময়মতো লাকড়ির যোগান না হলে আসমা আক্তারকে ছুটতে হতো লাকড়ি সন্ধানে যার জন্য ব্যয় হতো বাড়তি সময়। বিপত্তি আরো বাড়ত যখন সময়টা থাকত বর্ষাকাল, লাকড়ি শুকানোর প্রতিক‚লতা প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আরো ব্যাহত করত। বিপ্লব হোসেন সবমিলিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, আশংকায় থাকেন তার সন্তানদের মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে।


এমন অবস্থায় ইডকলের ((IDCOL- Infrastructure Development company Limited) পক্ষ থেকে তার সাথে যোগাযোগ করা হয় একটি বায়োডাইজেস্টার সিস্টেম (যা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নামে বহুল পরিচিত) বসানোর ব্যাপারে। বিপ্লব হোসেন তখনো জানতেন না কি আমূল পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে তার এবং তার পরিবারের জীবনযাপনে। ATEC Australia- International Ltd এর প্রতিনিধিগণ IDCOL এর বায়োগ্যাস কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তকরণ প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে বগুড়ায় বিপ্লবের বাড়িতে একটি বায়োডাইজেস্টার সিস্টেম স্থাপন করেন। এরপর থেকেই রান্নার জ্বালানি বিপ্লব হোসেনের জন্যে আর কোন বড় সমস্যা হয়ে বাধা পড়েনি। তার সহধর্মিণী আসমা আক্তার এখন অনেকটাই নির্ভর। ৮ জন সদস্যের প্রতিদিনের রান্নার জন্যে যে পরিমাণ গ্যাস দরকার হয় তার পর্যাপ্ত সরবরাহ পান ATEC* এর স্থাপন করা বায়োডাইজেস্টার থেকে যা গরুর গোবরকে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় বায়োগ্যাস এবং জৈবসারে রূপান্তর করে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ব্যয়বহুল এলপি গ্যাসের সরবরাহ থেকে বঞ্চিত বিপ্লব হোসেনের পরিবার এখন সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্ন দেখে।


প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল এলপি গ্যাসের সরবরাহ থেকে বিপ্লব হোসেনের মতো আরো কোটি পরিবার বঞ্চিত, যার অধিকাংশই কৃষি পরিবার।  নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমানে মাত্র প্রায় ১৫% পরিবার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের আওতাধীন যার অধিকাংশই শহরের বাসিন্দা। অন্যদিকে এলপি গ্যাসের বাজার মাত্র প্রায় ১২%। দামের বিষয় বিবেচনায় কৃষিনির্ভর পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ  সমাধান। দুঃখজনকভাবে, গ্রামীণ পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ এখনো লাকড়ির ওপর নির্ভরশীল যা প্রতি বছর ৩.৩% হারে বন উজারকরণে উল্লেখযোগ্যভাবে দায়ী।


বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানির সার্বিক পরিস্থিতি হতে উত্তরণের একমাত্র উপায় বিকল্প নির্ভরযোগ্য জ্বালানির সন্ধান করা। কৃষি প্রধান যে দেশে গবাদিপশুই  কৃষি কাজের প্রধান হাতিয়ার, সে গবাদিপশুর বর্জ্য থেকে ATEC* এর সবুজশক্তি বায়োডাইজেস্টারের মাধ্যমে উৎপন্ন বায়োগ্যাস হতে পারে জ্বালানির নির্ভরযোগ্য বিকল্প সমাধান।

কান্ট্রি ডিরেক্টর, এটিইসি অস্ট্রেলিয়া ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, হট লাইন : ০৯৬১২২০০৫০০, ই-মেইল : sbhowmick@atecbio.com

বিস্তারিত
প্রাণিসম্পদের সম্মিলিত প্রয়াস : সুস্থতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ

ডা. মো. আব্দুল্লাহ্১  ডাঃ মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান২

বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্য সরবরাহ এবং পুষ্টি ঘাটতি দূরীকরণে সারা বিশ্ব নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষ এখন পুষ্টিকর ও ভালো মানের খাবার গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করার জন্য কৃষি বিভাগের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছয়টি খাদ্য উপাদানের মধ্যে অন্যতম উপাদান  আমিষ, খনিজ লবণ, স্নেহ,  ভিটামিন ও পানি সরবরাহ করে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। আমিষের অন্যান্য উৎসের মধ্যে প্রাণিসম্পদ উৎপাদিত আমিষের মান ও গুণাগুণ সবচেয়ে ভাল।    
জায়গা এবং পরিবেশের  নির্দিষ্টতা থাকা সত্তে¡ও বাড়তি খাদ্য চাহিদার জোগান দিতে উন্নত ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশি প্রজাতির প্রাণীর চেয়ে সংকর জাতের প্রাণীর মাংস ও দুধ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। প্রাণিসম্পদের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এই কাজটি সঠিকভাবে করা হচ্ছে।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা কথা বিবেচনা করে ক্রমবর্ধমান জনগণের খাদ্যের জোগান দিতে করণীয় বিষয়ে আগে থেকেই দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু কুমিল্লায় এক বিশাল জনসভায় বলেছিলেন, আমার মাটি আছে, আমার সোনার বাংলা আছে, আমার পাট আছে, আমার মাছ আছে, আমার লাইভস্টক আছে, যদি ডেভেলপ করতে পারি ইনশাআল্লাহ, এদিন আমাদের থাকবে না (ভিডিও থেকে ধারণকৃত, ভিডিও সংগ্রাহক- ড. অমিতাভ চক্রবর্তী, উপসচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়)। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খাদ্য উৎপাদনে সর্বদাই গুরুত্ব দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে তিনি বলেন ‘খাদ্য শুধু চাউল, আটা নয়; মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, তরিতরকারিও আছে।’


দেহের স্বাভাবিক গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রাণিজ আমিষের কোন বিকল্প নেই। যেসব মানুষ নিয়মিত ভাবে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপকরণ গ্রহণ করেন তাদের সুস্থতা ও মেধাশক্তি ভালো থাকে। প্রাণিসম্পদের পণ্য মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যসমূহ মানুষের শরীরের সকল পুষ্টিগুণ পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে।


বাড়তি জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা পূরণ করতে সমর্থ হয়েছে ব্রয়লার মুরগী। উন্নত মানস¤পন্ন প্রোটিনে ভরপুর এই ব্রয়লার এখন প্রতিটি মানুষের খাবার টেবিলে, সকালে , বিকেলে ও সন্ধ্যার নাস্তায়।
প্রাণিসম্পদ কৃর্তক উৎপাদিত প্রাণিজ আমিষ ও চর্বি উন্নত মানের  


প্রাণিসম্পদ সেক্টর প্রাণিজ আমিষের বিশাল ভাণ্ডার। সবচেয়ে উন্নত গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের প্রোটিন ও ফ্যাট রয়েছে এমন অসংখ্য উপাদানের মধ্যে অন্যতম, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যসমূহ। নিম্নে পণ্যসমূহের বর্ণনা দেয়া হলো।
১.  পোলট্রি বলতে সে সব পাখিকে বোঝায় যারা মানুষের তত্ত¡াবধানে থেকে বংশবিস্তার করে এবং আর্থিক অবস্থার  উন্নতি ঘটায়। ১৩ প্রজাতির পাখি এই পোলট্রির মধ্যে পড়ে। যা মাংস এবং ডিম অনেক পুষ্টিকর ও উন্নত প্রোটিন।  
২. ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি লাল মাংসের প্রোটিন সুউচ্চ মান সম্পন্ন।  বর্তমানে আমাদের দেশের এসব গবাদি প্রাণীর সংখ্যা দিয়ে পূরণ হচ্ছে।  কোরবানির জন্য প্রাণীও এখন আর বাইরে থেকে আসে না। দেশের গবাদিপ্রাণী দিয়েই তার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
৩। আমাদের দেশের গরু ও মহিষের দুধ অন্যতম সুষম খাদ্য। দুধের মধ্যে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও আমিষ, ভিটামিন, মিনারেল সকল পুষ্টিমান  বিদ্যামান রয়েছে। সব বয়সের মানুষের জন্য মহান আল্লাহ তালায়া এই দুধের মধ্যে অসংখ্য নেয়ামতে পূর্ণ উপকার রেখেছেন।
সুস্থ থাকতে প্রাণিজ আমিষের ভ‚মিকা
সুষম খাদ্য উপাদানের ৬টি উপাদানের মধ্যে প্রাণিজ উৎসে প্রায় সকল পুষ্টি উপাদানই পাওয়া যায়। এসব উপাদান দেহের সকল চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এর সকল উপাদান নিরাপদ উৎস হতে তৈরি। প্রাণী থেকে যেহেতু প্রাণিজ আমিষ উৎপাদিত হচ্ছে সে ক্ষেত্রে ভেজাল বা অনিরাপদ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। কেবল মাত্র সঠিক পরিচর্যা এবং ভাল মানের ফিড বা খাদ্য খাওয়ালেই সেই সব  ফুড এনিমেল থেকে সর্বোচ্চ গুণ সম্পন্ন খাবার উৎপাদন করা সম্ভব।
প্রাণিজ আমিষের সকল উপাদানের মধ্যে প্রয়োজনীয় সকল এমাইনো এসিড বিদ্যমান  থাকে। তাই এসব প্রোটিন সম্পূর্ণ প্রোটিন। যা আমাদের শরীরের সকল এমাইনো এসিডের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।  পাশাপাশি প্রাণিজ চর্বি যেমন, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রী আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। প্রাণিসম্পদের অন্যতম পণ্য দুধ আমাদের দৈনিক সকল খনিজ ও ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এসব নিয়মিত গ্রহণ করলে শারীরিক ও মানসিক অসংখ্য সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।


বর্তমানে ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রাণিসম্পদের সকল খাদ্য উপাদান মানুষের নাগালে এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এখন ডিম, মাংস কিছুই আর আমদানি করার প্রয়োজন হয় না। মাংস উৎপাদনে আমাদের চাহিদার তুলনায় বেশি হয়েছে। ডিমের ক্ষেত্রেও চাহিদার কাছাকাছি আমাদের অর্জন।


এখন শুধুমাত্র দুধের উৎপাদন বাড়াতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। গাভীর সংখ্যা বৃদ্ধি না করে শুধু দুধ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা ঘাটতি মোকাবেলা করতে পারব। ডেইরি শিল্পের বিকাশ সাধনের জন্য প্রাণিসম্পদের একক বড় প্রকল্প প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) কাজ  করে যাচ্ছে। ডেইরি খামারিদের টিকিয়ে রাখতে কোভিড-১৯ মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত ডেইরি খামারিদের প্রণোদনাও দিচ্ছে এলডিডিপি।  


বর্তমানে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়েছে নিরাপদ খাদ্যের। আমাদের প্রাণিজ আমিষটুকু যখন ভোক্তার কাছে যাবে তা যেন এন্টিবায়োটিক রেসেডিউ মুক্ত থাকে। বাস্তবতা এমন যে আমাদের সবচেয়ে বেশি মাংস আসে মুরগি থেকে, বিশেষত ব্রয়লার ও সোনালি। এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক এর ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। তাই এন্টিবায়োটিক যেন শুধুমাত্র প্রয়োজনে ব্যবহার করা নিশ্চিত করতে হবে।   


খামারিরা যেসব ডিলারের কাছ থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করেন। তারাই প্রথমে এক বস্তা ওষুধ দিয়ে দেয়। যার অধিকাংশই প্রয়োজনীয় নয়। অনেকাংশে তাদের মুনাফার জন্যই এমন করে থাকে।  তারা মুরগিকে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত একটির পর একটি এন্টিবায়োটিক প্রদান করে যার কোনটারই প্রয়োজন থাকে না। একটি গবেষণায় দেখা যায় বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদে যা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার হয় তার ৬০ শতাংশ ব্যবহার হয় ডিলারদের পরামর্শে। যেখানে তাদের এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দেয়ার কোন নিয়ম বা যোগ্যতা নেই। পুরোটায় ব্যবহার হওয়া উচিত ছিল রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শে। প্রতিটি এন্টিবায়োটিকের একটি নির্দিষ্ট উইথড্রাল পিরিয়ড (শরীরে সক্রিয় থাকার সময়) আছে। অনেক ডিলার ও খামারি এসব মানা হয় না। ফলে একটি ব্রয়লারের ২৫-২৮ দিন বয়সেও এন্টিবায়োটিক দেয়া হয় আর তা এন্টিবায়োটিক শরীরে নিয়েই বাজারে ভোক্তার প্লেটে চলে আসে।


এসব এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ আমাদের শরীরে আসলে তা জীবাণুদের এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী করে তোলে। যা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মানুষের শরীরের জন্য কার্যকর এন্টিবায়োটিক কমে যাবে।
এমনকি খামার থেকে সংগ্রহ করা ব্রয়লার মুরগি বিক্রির জন্য দোকানে রাখার সময়ও তারা ফিডে বা পানিতে এন্টিবায়োটিক দিয়ে থাকে। এসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।  
অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে খামারির খরচ বেড়ে যায় এবং বাজার পতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যা একসাথে আমাদের উৎপাদনের বিষয়টি নিয়েও চিন্তায় ফেলতে পারে।


নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনের বিষয়ে তদারকীর কাজ করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। একদিকে খামারিদের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি খামারিদের নতুন নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ব্যবহারের অভ্যস্ত করা হচ্ছে। খামারির উৎপাদিত নিরাপদ খাদ্যকে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন খারাপ করতে না পারে সে জন্য সরাসরি খামারি ও ভোক্তা লিংকেজ তৈরিতেও কাজ করছে সরকার।  নিয়মিত দুধ, ডিম,  মাংস গ্রহণ করলে অপুষ্টিজনিত নানা রোগবালাই থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দুগ্ধজাত পণ্য দই, ঘি ইত্যাদি খাদ্য মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়াসহ আয়ুও বাড়িয়ে দেয়৷ উৎপাদিত নিরাপদ খাদ্যের বিপণন ব্যবস্থাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে ভোক্তারা যেমন নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ পাবে অন্যদিকে উৎপাদকেরাও লাভবান হতে পারবে।


উৎপাদিত নিরাপদ পণ্য  যেন বিপণন ব্যবস্থায় কারণে আবার অনিরাপদ না হয়ে যায় এই বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আইন প্রয়োগ শাখা এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ একসাথে কাজ করলে ভালো ভ‚মিকা পালন করতে পারে। অসাধু খামারি এবং ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হলে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিত করা যেতে পারে।  সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে আমাদের আমিষ ও চর্বির নিরাপদ উৎসের ভাণ্ডার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকর হবে।


প্রাণিস¤পদ স¤প্রসারণ কর্মকর্তা, এলডিডিপি, উপজেলা প্রাণিস¤পদ দপ্তর, ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মোবাইল : ০১৭১৬১২৬৩২৪, ই- মেইল :ulobholahat 1@gmail.com

 

বিস্তারিত
মাছের খাদ্য

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ

মাছ চাষিরা মাছের খাদ্য সম্পর্কে প্রায়ই জানতে চান । মাছ দ্রুত বড় করার চেষ্টা করেন। মাছের দৈহিক দ্রুত বৃদ্ধি ও সুস্থ রাখার জন্য সঠিক পরিমাণে, সময়মতো ও সঠিক পদ্ধতিতে খাদ্য দেয়া প্রয়োজন । এতে মাছ উৎপাদন  খরচ কম হয় বলে লাভবান হওয়া যায়। মাছ প্রাকৃতিক ও সম্পূরক খাদ্য খায়। এ ছাড়াও নালা-নর্দমার পচা পানির উচ্ছিষ্টাংশ ভক্ষণ করে। তবে এরা উদ্ভিদ কণা ও প্রাণিকণা  খেতে পছন্দ করে। এগুলো খালি চোখে স্পষ্ট দেখা যায় না। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়।


মাছের খাদ্য  প্রধানত দুই রকম- ক. প্রাকৃতিক খাদ্য খ. সম্পূরক খাদ্য।
ক. প্রাকৃতিক খাদ্য (
Plankton)  


সূর্যালোকের সাহায্যে জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়। জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে মাছের যে খাদ্য (উদ্ভিদ কণা ও প্রাণিকণা) তৈরি হয়, তাকে প্রাকৃতিক খাদ্য বা প্লাঙ্কটন বলে। ইহা দুই রকম
১. উদ্ভিদ কণা (
Phytoplankton) : জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ কণা তৈরি হয়, যা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- শেওলা, ফেকাস, নষ্টক, ডায়াটম, ভলবক্স, এনাবিনা ইত্যাদি।

২. প্রাণিকণা (Zooplankton) : জলাশয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী কণা তৈরি হয় যা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন-ময়না, ড্যাফনিয়া, বসমিনা, কেরাটেলা, ফিলিনিয়া, সাইক্লপস, প্রোটোজোয়া, রটিফার ইত্যাদি।


প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরির পদ্ধতি
প্রাকৃতিক খাদ্য জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। তবে বেশি পরিমাণে জন্মানোর জন্য জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। পুকুর  প্রস্তুতির  সময় ও ১৫ দিন পর সার প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি করতে হয় । পুকুর প্রস্তুতির সময় প্রতি শতাংশে ৬-৭ কেজি গোবর সার, কম্পোস্ট সার ৮-৯ কেজি, ইউরিয়া  ২০০ গ্রাম, টিএসপি  ১০০ গ্রাম, একটি পাত্রে পানির সাথে ভালোভাবে গুলে সূর্যালোকিত দিনে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হয়। মাছের পোনা পুকুরে ছাড়ার ১৫ দিন পর পর প্রতি শতাংশে গোবর সার ১ কেজি, ইউরিয়া ৪০ গ্রাম ও টিএসপি ২০ গ্রাম হারে পানিতে দিতে হয় । এতে সম্পূরক খাদ্য না দিলে বা কম দিলেও হয়।   


প্রাকৃতিক খাদ্যের গুরুত্ব
প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়া উৎপাদিত মাছ দ্রত বড় হয়। মাছ খেতে সুস্বাদু। মাছের সম্পূরক খাদ্য খরচ লাগে না । মাছের উৎপাদন খরচ কমে। পুকুরে গ্যাস তৈরি হয় না। পানির পরিবেশ ভালো থাকে। উদ্ভিদ কণা অক্সিজেন গ্রহণ করে ও কার্বন-ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। এতে পুকুরে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।


পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি না হলে বা কম হলে সুষম সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়। এজন্য পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।


প্রাকৃতিক খাদ্যের উপস্থিতি পরীক্ষা  
পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য বোঝার পদ্ধতি যেমন: (১) কাঁচের গ্লাসে পুকুরের স্বচ্ছ পানি নিয়ে সূর্যের আলোর দিকে ধরলে যদি গ্লাসে ৮-১০টি কণা দেখা যায় তবে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। (২) হাত কুনুই পর্যন্ত পুকুরের পানিতে ডুবালে যদি হাতের তালু দেখা যায় তবে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য নাই। (৩) পুকুরের পানির রঙ হালকা সবুজ বা বাদামি দেখা গেলে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। (৪) প্লাঙ্কটন নেটের ভেতর দিয়ে ২০ লিটার পানি ঢাললে ২ সেমি. সবুজ  কণা জমা হলে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। (৫) সেক্কি ডিস্ক জলাশয়ে ৩০ সেমি. ডুবালে সাদা কালো রং দেখা গেলে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য নেই। প্রাকৃতিক খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও মজুদ মাছের মোট ওজনের ২-৫% সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়।    

 

খ. সম্পূরক খাদ্য
যে খাদ্যে সকল পুষ্টি উপাদান সুনির্দিষ্ট অনুপাতে থাকে তাকে সুষম সম্পূরক খাদ্য বলে। পুকুরে উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাব হলে মাছের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধির নিমিত্তে প্রাকৃতিক খাবারের পাশাপাশি সম্পূরক খাবার সরবরাহ করা একান্ত প্রয়োজন। মাছ ছাড়ার পরের দিন হতে প্রতিদিন সকালে ও বিকালে মজুদকৃত মাছের মোট শরীরের ওজনের শতকরা ৫-৬ ভাগ হারে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখ্য, প্রতি ২০ কেজি মাছের জন্য অন্তত পক্ষে এক কেজি খাবার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি ১৫ দিন বা ১ এক মাস অন্তর একবার জাল টেনে কিছু মাছ ধরে ওজনের গড় বের করে নিয়ে মোট ওজনের ওপর আনুপাতিক হারে খাবার দিতে হবে।


সরিষার খৈল ৩০% ও গমের ভুসি বা চালের কুঁড়া ৭০% অনুপাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে দুটি খাবারের মিশ্রণ পুকুরের বিভিন্ন স্থানে অথবা ৩-৪টি নির্দিষ্ট স্থানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ভাসানো খাবার হিসাবে গমের ভুসি বা কুঁড়া পানির উপরে শুকনা অবস্থায় সপ্তাহে অন্তত ২-৩ দিন সরবরাহ করা ভালো। সহজ ব্যবস্থাপনায় অল্প খরচে শুধুমাত্র গমের ভুসি বা চালের কুঁড়া শতাংশ প্রতি ১ম মাসে ৫০ গ্রাম, ২য় মাসে ১০০ গ্রাম, ৩য় মাসে ১৮০ গ্রাম, ৪র্থ মাসে ২২০ গ্রাম, ৫ম মাসে ২৬০ গ্রাম ও ষষ্ঠ মাসে ৩০০ গ্রাম দিতে হবে।


সম্পূরক খাদ্য তৈরির নিয়ম
 ফিশমিল ১০%, চালের কুঁড়া ৫৩%, সরিষার খৈল ৩০.৫০%, ভিটামিন ও খনিজ মিশ্রণ ০.৫% ও চিটাগুড় ৬% মেপে নিতে হয়। এগুলো গুঁড়ো করে মিশাতে হবে। এরপর পানি দিয়ে মণ্ড তৈরি করে পিলেট মেশিনে দিয়ে ছোট ছোট বড়ি তৈরি করতে হবে। এগুলো শুকিয়ে মাছকে খেতে দিতে হয়। উল্লেখ্য, এগুলো উপাদান দিয়ে তৈরি ভাসমান খাদ্যও দেয়া যায়। সম্পূরক খাদ্য বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।

 

খাদ্য প্রয়োগ পদ্ধতি
 প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়। খাদ্যগুলো পুকুরে পানির নিচে নির্দিষ্ট গভীরতায় দিতে হয়। ভাসমান খাদ্য দিলে খাদ্যের অপচয় কম হয়। সম্পূরক খাদ্য দিলে মাছের খাদ্যের অভাব নিশ্চিত দূর হয়। মাছ দ্রæত বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও টোপাপানা, ক্ষুদিপানা, কলাপাতা, নেপিয়ার বা প্যারাজাতীয় নরম ঘাস, পাতা ইত্যাদি প্রতিদিন লবণ-পানিতে ধুয়ে সকাল-বিকাল পুকুরে খাদ্য পাত্রে দেয়া যেতে পারে। মাছের দেহে খাদ্য ও পুষ্টির অভাব বোঝার জন্য প্রতিমাসে অন্তত একবার জাল টেনে মাছের নমুনা দেখে শারীরিক বৃদ্ধি পর্যবেষক্ষণ করা উচিত।


মাছ চাষ করে লাভবান হওয়ার জন্য মাছকে পরিমাণমত, সময়মত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়াতে হবে। খাদ্যের ঘাটতি হলে মাছের দৈহিক বৃদ্ধি কমে যাবে। আবার পুকুরে অতিরিক্ত খাদ্য দিলে খাদ্য পচে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে মাছ মারা যাবে। মাছ রোগাক্রান্ত হলে পুকুরে অক্সিজেনের অভাব হলে, গ্যাস হলে, বেশি শীতে অথবা মাছের অন্য কোন সমস্যা হলে মাছ খাদ্য খুব কম খায় অথবা খায় না। এ সময় খাদ্য প্রয়োগ কময়ে রাখতে হবে অথবা বন্ধ রাখতে হবে। মাছ কয়েক দিন না খেয়েও বাঁচতে পারে। মাছের চলাচল স্বাভাবিক হলে খাদ্য প্রয়োগ স্বাভাবিক করতে হবে।


দেশে মাছ উৎপাদনে অনেক উন্নতি হয়েছে। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে মাছ চাষিরা মাছকে খাদ্য খাওয়াতে সচেতন হয়েছে। বিগত প্রায় দুই দশক দেশে মাছের চাহিদার চেয়ে ঘাটতি ছিল। এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। এজন্য ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি এখন আবার বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে।

সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল, মোবাইল : ০১৭১১-৯৫৪১৪৩, ই-মেইল : farhadinfo1968@gmail.com

 

বিস্তারিত
কবিতা (ফাল্গুন- ১৪২৭)

কৃষির টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
মোঃ রাকিবুল ইসলাম১


বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে
উন্নয়নের ধারায় গিয়ে,
কৃষি অগ্রগতি সামনে রেখে
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও কৃষি।

উন্নয়নের মাপকাঠি লক্ষ্যমাত্রা সতেরো
কৃষি খাতে সংশ্লিষ্ট এসডিজি-দুই।
ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা আছে আরো
উন্নত পুষ্টি ও কৃষি ব্যবস্থা টেকসই।

ক্ষুধা মুক্তি সূচকে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ
শুধু এখন প্রয়োজন
দরিদ্র জনগণ ও শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ
বছরব্যাপী নিরাপদ ও পুষ্টির খাদ্য নিশ্চিতকরণ।

কিশোরী, গর্ভবতী, স্তন্যদায়ী নারী
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদাপূরণ,
২০৩০ এর মধ্যে অপুষ্টির অবসান
সকল অভীষ্ট অর্জন।

ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড়চাষী
বিশেষত নারী ও আদিবাসী
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে
সুরক্ষা ও সমান সুযোগ আছে বেশি বেশি।

জলবায়ু পরিবর্তনে চরম আবহাওয়ায়
দুর্যোগের সাথে মানিয়ে নিয়ে
উৎপাদনমুখী সক্ষমতা বৃদ্ধি সহায়ক
মৃত্তিকার গুণগতমানের উৎকর্ষ সাধন হোক।

বীজ ও উদ্ভিদ ব্যাংকের ব্যবহার
বিধি অনুযায়ী ন্যায্যতা ও সমতার
কৌলিকসম্পদ সংরক্ষণ
টেকসই কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন।

গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ সেবা
প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উদ্ভিদ জিন ভাÐার সমৃদ্ধকরণ
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও কৃষির
আশাব্যঞ্জক বাস্তবায়ন।

১ কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, মোবাইল: ০১৭০১২৩৭১৬৯ ই-মেইল: aeo1tungipara@dae.gov.bd

 

 


সোনার বাংলা ফসলে বসন্তরাঙ্গা দৃশ্য
মো. জুন্নুন আলী প্রামাণিক২

ফুলের সুবাসে ফাগুন হাসে ফুলফলের কলি,
বসন্ত জানায় শুভেচ্ছা প্রিতী দুঃখব্যথা ভুলি।
মৌমাছি প্রচুর উড়ায় জোরে ফুল সুবাসে ছোটে,
মধুর সন্ধানে নিবিষ্ট প্রাণ সারাদিবস খাটে।
মৌচাকে জমায় সুমিষ্ট মধু পুষ্টিকারক অতি,
নতুন মৌসুমে তরুণ বৃক্ষ ক্ষেত খামারে গতি।
লাগানো বোরোর সতেজ পাতা অনবরত দোলে,
চাষির সেবার সহায় নিয়ে অধিকতর ফলে।
শিমুল মান্দার ফুলের শোভা কৃষ্ণচ‚ড়ার মত,
আকৃষ্ট প্রকৃতি রূপের মাঝে দৃষ্টিনন্দন শত।
শীতের বিমর্ষ গাছের ছবি নীরব কাÐে ব্যথা,
মৌসুমী ধারায় চেতনা ফেরে তরু তাজায় পাতা।
পেয়ারা কুলের মুকুল শোভে সুবাসমাখা বায়ু,
পুষ্টির যোগান ফলের মাঝে দীর্ঘমেয়াদি আয়ু।
কলার বাগানে প্রচুর কলা বারমাসের ফল,
বিচিত্র জাতের কলার মেলা রোগমুক্তির বল।
লিচুর ফুলের উপর নেচে প্রজাপতির খেলা,
ভ্রমর সেথায় আসন পাতে উড়াউড়ির মেলা।
গমের ক্ষেতের বাঁধন দেখে চাষাচাষির খুশি,
সরিষা কলাই কুমড়া লাউ শাকসবজি বেশি।
অধিক বৃষ্টির প্রকোপ নাই মাঠপ্রান্তরে শস্য,
সোনার বাংলা ফসলে পূর্ণ বসন্তরাঙ্গা দৃশ্য।
বিচিত্র ফুলের সুবাসে মুগ্ধ ফুলপ্রেমিক লোক,
হরেক জাতের ফুলের চাষে ফুলচাষির ঝোঁক।
সবুজ দেশের সবুজ মাঠ শস্যসেবায় ধন্য,
পতিত জমির মেলেনা দেখা ক্ষেতখামারে পূর্ণ।

 ২ মো. জুন্নুন আলী প্রামাণিক, গ্রাম : বিদ্যাবাগীশ ডাকঘর ও উপজেলা : ফুলবাড়ী, জেলা : কুড়িগ্রাম, মোবা: ০১৭৩৫২০২৭৯৮

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (ফাল্গুন ১৪২৭)

প্রশ্নোত্তর

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।

মো. আবদুল গুফুর, গ্রাম: যাদবপুর, উপজেলা: আলমডাঙ্গা, জেলা: চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন: তরমুজের পাতাগুলো এক ধরনের পোকা খেয়ে ফেলছে। এ বিষয়ে পরামর্শ দিবেন।
উত্তর : তরমুজের বিটল পোকার আক্রমণ হলে এমনটি হয়ে থাকে। এজন্য এ পোকার আক্রমণরোধে ক্ষেতের আশেপাশের আগাছা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তাছাড়া পাতার ওপর ছাই ছিটিয়ে সাময়িকভাবে দমন করা যায়। এছাড়া চারা বের হওয়ার পর থেকে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত মশারির জাল দিয়ে চারাগুলো ঢেকে রাখা যেতে পারে। এ পোকার আক্রমণ বেশি হলে সাইপারমেথ্রিন গ্রæপের কীটনাশক, যেমনÑ রেলোথ্রিন বা রিপকর্ড ১ মিলি করে ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে আপনি উপকার পাবেন।
মো. আকবর হোসেন, গ্রাম: বেদেরপুকুর, উপজেলা: কাহারোল, জেলা: দিনাজপুর
প্রশ্ন : আলুর কাটুই পোকা দমন সম্পর্কে জানাবেন।  
উত্তর :  এই পোকার কীড়া দিনের বেলা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে এবং রাতের বেলা চারা গাছ কেটে দেয়। এছাড়া আলুতে ছিদ্র করে আলু ফসলের ক্ষতি করে। আক্রান্ত কাটা আলু গাছ দেখে তার কাছাকাছি মাটি উল্টে পাল্টে কীড়া খুঁজে সংগ্রহ করে মেরে ফেলা দরকার। কাটুই পোকার উপদ্রব কমানোর জন্য কার্বোফুরান গ্রæপের কীটনাশক যেমন ফুরাডান ৫জি প্রতি হেক্টরে ২০ কেজি জমি তৈরির সময় এবং শেষ সেচের আগে প্রয়োগ করলে এই পোকার আক্রমণ কমে যায়। এছাড়া প্রতি লিটার পানির সাথে ক্লোরোপাইরিফস ২০ ইসি জাতীয় কীটনাশক ৫ মিলি হারে মিশিয়ে গাছের গোড়া ও মাটিতে স্প্রে করে ভিজিয়ে দিতে হবে। আর এ কাজটি আলু লাগানোর ৩০-৪০ দিন পর করতে হবে। আশা করি এসব ব্যবস্থা নিলে আপনি উপকার পাবেন।  
মো. রবিউল ইসলাম, গ্রাম: তাহেরপুর, উপজেলা: বাগমারা, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন : পান ফসলের ক্ষতিকর কালো ও সাদা মাছি পোকা দমন সম্পর্কে জানাবেন।
উত্তর : গরমকালে পান ফসলে ক্ষতিকর কালো ও সাদা মাছি পোকার আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এ পোকাগুলো সাধারণত পাতার নিচে অবস্থান করে থাকে। এ পোকার সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনার জন্য পানের বরজ সবসময় পরিষ্কার রাখা জরুরি। এছাড়া রোগাক্রান্ত পাতাগুলো সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলা উচিত। এসবের পাশাপাশি আঠালো হলুদ রঙের ফাঁদ ব্যবহার এবং জৈব    বালাইনাশক ফিজিমাইট অথবা বায়োট্রিন প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। আশা করি উপকৃত হবেন।  
মো. রাশেদুল হাসান, গ্রাম: পাঠানতলা, উপজেলা: সিলেট সদর, জেলা: সিলেট
প্রশ্ন :  আখের ডগার মাজরা পোকা দমন সম্পর্কে জানাবেন।  
উত্তর :  আখের মাজরা পোকা দমনের জন্য কার্বোফুরান গ্রæপের কীটনাশক যেমন ফুরাডান ৫ জি প্রতি বিঘাতে ৫ কেজি আর যদি ফিপ্রোনিল গ্রæপের কীটনাশক হয় তবে তা বিঘাপ্রতি ৪  কেজি মার্চ এবং মে মাসে জমিতে প্রয়োগ করতে হয়। সময়মতো এসব ব্যবস্থা নিলে আপনি উপকার পাবেন।
মো. আসাদুজ্জামান, গ্রাম: লাউযুতি, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা:           ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন :  লেবু গাছের পাতায় ধূসর বা বাদামি রঙের গুটি বসন্তের মতো দাগ পড়ে। ঘন ঘন বৃষ্টি হলে এ রোগ বৃদ্ধি পায়। কী করণীয়।
উত্তর : এ সমস্যারোধে আক্রান্ত শাখা ও ডগা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। আর কাটা অংশে বর্দোপেস্ট এর প্রলেপ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বর্দোপেস্ট তৈরির জন্য ১০০ গ্রাম চুন, ১০০ গ্রাম তুঁতে এবং ১ লিটার পানি দিয়ে বর্দোপেস্ট তৈরি করতে হয়। বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কপার জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন সানভিট বা হেমক্সি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া এ রোগটি যেহেতু লিফ মাইনার পোকার দ্বারা বিস্তার হয়ে থাকে সেজন্য ইমিটাফ ২০ এসএল ০.৫ মিলি করে ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে ১৫ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে আপনি অবশ্যই উপকৃত হবেন।
সুমন মজুমদার, গ্রাম : নারায়ণপুর, উপজেলা : কেশবপুর, জেলা: যশোর
প্রশ্ন :  লিচু গাছের মুকুল, কচি ফলে এবং নতুন ডগায় সাদা পাউডারের আবরণ পড়ে। এ অবস্থায় কী করণীয় ?
উত্তর :  লিচু গাছের এ ধরনের সমস্যাকে লিচুর পাউডারি মিলডিউ রোগ বলে। এ রোগ দমনের জন্য প্রাথমিক অবস্থায় পানি স্প্রে করলে সফলতা পাওয়া যায়। তবে আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ম্যাকসালফার ৮০ ডবিøউপি বা থিয়োভিট ৮০ ডবিøউজি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে স্প্রে করলে আপনি উপকার পাবেন।
মৎস্য বিষয়ক
মোঃ নূর আলম, গ্রাম : তাম্বুলখানা, উপজেলা : ফরিদপুর সদর, জেলা : ফরিদপুর
প্রশ্ন : পুকুরে রেণুপোনা ছাড়া হয়েছে কিভাবে পরিচর্যা করব ?
উত্তর :  রেণু ছাড়ার ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে পুকুরে চট/গুজরি জাল টানা যাবে না। রেণু ভেসে উঠলে পানির ঝাপটা দিতে হবে। সম্ভব হলে নতুন পানি দিতে হবে। পুকুরের পানির রঙ লালচে সবুজ এবং মেকি ডিস্কের দৃশ্যমানতা ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার এর মধ্যে থাকতে হবে। যে  কোন ধরনের খাদ্য অত্যন্ত মিহি হতে হবে। মেঘলা দিনে সার ও খাদ্য দেয়া যাবে না। কুড়া ব্যবহার করলে তুষ পরিহার করতে হবে। এভাবে  রেণু পোনার পরিচর্যা করতে হবে।  
মোঃ সাইফুল ইসলাম, গ্রাম : ল²ীরপাড়, উপজেলা : বিশ^ম্ভপুর, জেলা : সুনামগঞ্জ
প্রশ্ন : মাছের ফুলকা পঁচে যাচ্ছে। কী করব ?
উত্তর : চাইনিজ কার্প এবং দেশীয় কার্পে এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। পুকুরের তলায় বেশি কাদা, ছত্রাকের আক্রমণ হলে এ রোগ দেখা যায়। বছরের যেকোন সময় এ রোগ হতে পারে তবে গরমের সময় বেশি হয়। ফুলকায় লাল গোল দাগ দেখা যায়। পরে ফুলকাটি সাদা হয়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় পুকুরে শতাংশ প্রতি ০.৫ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে খাদ্য ও সার প্রয়োগ বন্ধ করে সম্ভব হলে ১০ থেকে ২০% পানি বদল করতে হবে। আক্রান্ত মাছকে ২ থেকে ৩% লবণ পানিতে ৩ থেকে ৫ মিনিট লবণ পানিতে গোসল করাতে হবে। লবণ পানিতে রাখার ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে যদি মাছ চিৎ হয়ে যায়, তবে তা তাড়াতাড়ি পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে। পুকুর প্রস্তুতিকালে অতিরিক্ত কাদা সরিয়ে ফেলতে হবে।
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
মোঃ আব্দুর রহিম, গ্রাম : আনুলিয়া, উপজেলা : আসাসুনি, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : গরুর গা খসখসে এবং ঘা হচ্ছে। কী করণীয় ?
উত্তর :  ইনজেকশন ভারমিক প্রতি ২৫ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ১ সিসি ১ বার চামড়ার নিচে পুশ করতে হবে। যদি সমস্যাটি বেশি হয় তবে ৭ দিন পর বুস্টার ডোজ দিতে হবে আবারো একবার। এছাড়া ইনজেকশন অ্যাসচাভেট ১০০ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ৫ সিসি করে দৈনিক ১বার ৩ থেকে ৫ দিন মাংসে পুশ করতে হবে এবং ইনজেকশন অ্যামক্সিভেট ১ ভায়াল করে রোজ ১ বার ৩ দিন মাংসে পুশ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে আপনার গরু সুস্থ হয়ে যাবে।  
মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, গ্রাম : পূর্বভীষণদই, উপজেলা :  হাতিবান্ধা, জেলা : লালমনিরহাট
প্রশ্ন : আমার ছাগলের বাচ্চা হয়েছে ৩ দিন হলো। ওলান শক্ত হয়ে গেচে ও বাঁট ফুলে ওঠেছে। এমতাবস্থায় কী করব ?  
উত্তর : প্রথমত পরিচ্ছন্ন বাসায় স্থানান্তর করতে হবে। সংক্রমিক ওলান থেকে দুধ দিনে ২ থেকে ৩ বার বের করে আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। এমপিসিলিন প্রতি ৮ ঘন্টা পর পর ৩ মিলিগ্রাম প্রতি কেজিতে ইনজেকশন প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। সাথে কিটোপ্রোফেন গ্রæপের ওষুধ খাওয়াতে হবে অথবা ইনজেকশন  প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে আপনি উপকার পাবেন।
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫,  ফোন নং: ০২-৫৫০২৮৪০০, ই মেইল :  aufiquedae25@gmail.com

 

বিস্তারিত
চৈত্র মাসের কৃষি (ফাল্গুন- ১৪২৭)

চৈত্র মাসের কৃষি
(১৫ মার্চ-১৩ এপ্রিল)

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

চৈত্র মাস দিয়েই শেষ হয় বাংলা বছর। বসন্ত ঋতু নতুন করে সাজিয়ে দেয় প্রকৃতিক। আর জানান দেয় গ্রীষ্মের আগমণ। চৈত্র মাসে রবি ফসল ও গ্রীষ্মকালীন ফসলের  প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এক সাথে করতে হয় বলে বেড়ে যায়  কৃষকের ব্যস্ততা। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, কৃষিতে আপনাদের শুভ কামনাসহ সংক্ষিপ্ত শিরোনামে জেনে নেই এ মাসে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো।
বোরো ধান
যারা শীতের কারণে দেরিতে চারা রোপণ করেছেন তাদের ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া দিয়ে থাকলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে না। সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। এলাকার জমিতে যদি সালফার ও দস্তা সারের অভাব থাকে এবং জমি তৈরির সময় এ সারগুলো না দেয়া হয়ে থাকে তবে ফসলে পুষ্টির অভাবজনিত লক্ষণ পরীক্ষা করে শতাংশপ্রতি ২৫০ গ্রাম      জিপসাম ও ৪০ গ্রাম দস্তা সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে,                 উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাই মুক্ত করতে পারেন। এসব পন্থায় রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
গম
দেরিতে বপন করা গম পেকে গেলে কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। শুকনো বীজ ছায়ায় ঠাÐা করে প্লাস্টিকের ড্রাম, বিস্কুটের টিন, মাটির কলসি ইত্যাদিতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
ভুট্টা (রবি)
জমিতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রং কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।
ভুট্টা (খরিফ)
গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এ মাসে বীজ বপন করতে হবে। খরিফ মৌসুমের জন্য ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫ প্রভৃতি। শতাংশপ্রতি বীজ লাগবে ১০০-১২০ গ্রাম। প্রতি শতাংশ জমিতে ইউরিয়া ৩৬৫ গ্রাম, টিএসপি ২২২ গ্রাম, এমওপি ১২০ গ্রাম, জিপসাম ১৬০ গ্রাম এবং দস্তা সার ১৬ গ্রাম সার দিতে হবে ।
পাট
চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপন করা যায়। পাটের ভালো জাতগুলো হলো ও-৯৮৯৭, বিজেআরআই তোষা পাট-৪, বিজেআরআই তোষা পাট-৫, বিজেআরআই তোষা পাট-৬, বিজেআরআই দেশি পাট-৫, বিজেআরআই দেশি পাট-৬, বিজেআরআই দেশি পাট-৭, বিজেআরআই দেশি পাট-৮। পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়িভাবে ৫/৬টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে আরেকটু বেশি অর্থাৎ ৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। পাটের জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ ফুট) এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭ সেন্টিমিটার (প্রায় ৩ ইঞ্চি) রাখা ভাল। ভাল ফলনের জন্য প্রতি একরে ৭০ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি এমওপি, ১৮ কেজি জিপসাম এবং প্রায় ৪.৫ কেজি জিংকসালফেট সার প্রয়োগ করতে হবে।
অন্যান্য মাঠ ফসল
রবি ফসলের মধ্যে চিনা, কাউন, আলু, মিষ্টি আলু, চিনাবাদাম, পেয়াজ, রসুন যদি এখনো মাঠে থাকে তবে দেরি না করে সাবধানে তুলে ফেলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে এ সময়ে বা সামান্য পরে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেজন্য পচনশীল ফসল তাড়াতাড়ি কেটে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
শাকসবজি
গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষ করতে চাইলে এ মাসেই বীজ বপন বা চারা রোপণ শুরু করা প্রয়োজন। সবজি চাষে পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। এ সময় গ্রীষ্মকালীন টমেটো, ঢেঁড়স, বেগুন, করলা, ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, শসা, ওলকচু, পটোল, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লালশাক, পুঁইশাক এসব সবজি চাষ করতে পারেন ।
গাছপালা
এ সময় বৃষ্টির অভাবে মাটিতে রসের পরিমাণ কমে আসে। এ অবস্থায় গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়। আম গাছে হপার পোকার আক্রমণ হলে অনুমোদিত  কীটনাশক যেমন- সিমবুস/ফেনম/ডেসিস/ফাইটার ২.৫ ইসি প্রভৃতি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস/ ফাইটার ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করা প্রয়োজন। এ সময় আমে পাউডারি মিলডিউ ও এ্যান্থ্রাকনোজ রোগ দেখা দিতে পারে। টিল্ট, রিডোমিল গোল্ড, কানজা বা ডায়থেন এম ৪৫ অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। কলা বাগানের পার্শ্ব চারা, মরা পাতা কেটে দিতে হবে। পেঁপের চারা রোপণ করতে পারেন এ মাসে। নার্সারিতে চারা উৎপাদনের জন্য বনজ গাছের বীজ বপন করতে পারেন। যাদের বাঁশ ঝাড় আছে তারা বাঁশ ঝাড়ের গোড়ায় মাটি ও  জৈবসার প্রয়োগ করা ভালো।
প্রাণিসম্পদ
শীতকাল শেষ হয়ে গরম পড়ার সময়টিতে পোল্ট্রি খামারি ভাইদের বেশ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ শীতকালে মোরগ-মুরগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। সে কারণে এ সময় রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। তাই আগ থেকেই টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ সময় ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই এর অভাব দেখা দিতে পারে। সে জন্য খাবারের সাথে ভিটামিন সরবরাহ করতে হবে। চৈত্র মাসে বেশ গরম পড়ে, তাই গবাদিপশুর এ সময় বিশ্রাম দিতে হবে। আপনার গবাদিপশুকে ছায়ায় এবং বেশি বেশি পানি খাওয়াতে হবে, সে সাথে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। গবাদিপশুর গলাফুলা, তড়কা, বাদলা রোগ প্রতিরোধে    প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
মৎস্যসম্পদ
মাছের আঁতুর পুকুর তৈরির কাজ এ মাসে শেষ করতে হবে। পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং শতাংশ প্রতি ১ কেজি চুন ও ১০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। পানি ভর্তি পুকুরে প্রতি শতাংশে ৬ ফুট পানির জন্য ১ কেজি চুন গুলে ঠাÐা করে দিতে হবে।
সুপ্রিয় পাঠক প্রতি বাংলা মাসেই কৃষিকথায় কৃষি কাজের জন্য অনুসরণীয় শিরোনামে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এগুলোর বিস্তারিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণের জন্য আপনার কাছের কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। এছাড়া কৃষি বিষয়ক যে কোনো সমস্যায় আপনার মোবাইল থেকে ১৬১২৩ নম্বরে কল করে নিতে পারেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। আপনাদের সবাইকে নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা। য়

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা, টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, মেইল: editor@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook