কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন

সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ

মোঃ নাসিরুজ্জামান

আজ ১৬ অক্টোবর ২০২০। বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ দিবসটির গুরুত্ব অপরিসীম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) তার জন্মকাল ১৯৪৫ সাল থেকে ১৬ অক্টোবরকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে ‘বিশ^ খাদ্য দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে আসছে। বিশাল পৃথিবীর সব মানুষের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের যোগান নিশ্চিতকরণ, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ এবং দরিদ্রতার মূলোৎপাটন করে ক্ষুধামুক্ত নির্মল পৃথিবী গড়ার কাজে FAO নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্ব খাদ্য দিবস প্রতিপাদ্যভিত্তিক পালিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ খাদ্য সুরক্ষা এবং কৃষির বিভিন্ন দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে Grow, nourish, sustain. Together. Our actions are our future যার ভাবানুবাদ ‘সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ’।


বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত কৃষি, যা এ দেশের বিপুল  জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৩%। এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এখনও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য জীবনের সারাংশ এবং আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। কোভিড-১৯ মহামারিতে সরকারের মূল লক্ষ্য সবার জন্য নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা, বিশেষ করে যারা দরিদ্র এবং দুর্বল। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশ কৃষিক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে আমরা প্রয়োজনীয় খাবারের বেশি উৎপাদন করছি। কিন্তু খাদ্য ব্যবস্থায় ভারসাম্য না থাকায় ক্ষুধা, অপুষ্টি, স্থ‚লতার মতো বিষয়গুলো থেকেই যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুকাল থেকেই সুষম খাবারের পাশাপাশি নিরাপদ মৌসুমি সবজি ও ফল গ্রহণের খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা এবং গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে।


বৈশি^ক মহামারি করোনার দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে বিশে^র সঙ্গে বাংলাদেশ বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। কারণ সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান কৃষকবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়ে প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল আবাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং সবার সহযোগিতার ফলে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের অসহনীয় দুর্যোগের মাঝেও লক্ষ্যমাত্রার অধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। করোনাকালীন জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিক সরবরাহ এবং যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি শ্রমিক সংকটের মধ্যেও হাওড়সহ সারা দেশের বোরো ফসল কর্তন শতভাগ অর্জিত হয়েছে। দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখাসহ দেশে যাতে খাদ্যের কোনো ঘাটতি না হয়, সেজন্য কৃষি মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট অভিঘাতসহ বিভিন্ন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য সময় উপযোগী স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।  

 
প্রতি বছর দেশে কৃষি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। সে সাথে মাটির অবক্ষয়, উর্বরতা হ্রাস এবং লবণাক্ততা বাড়ার কারণে মাটির গুণাগুণ হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, ঝড়, রোগবালাই, নদীভাঙন ইত্যাদি কৃষির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে প্রতিনিয়ত। গত ১০ বছরে বর্তমান সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়কালে গৃহীত পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কৃষি উন্নয়নে নানা ধরনের কৃষিবান্ধব নীতি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কৃষির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সার, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে।


২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মন্ত্রিপরিষদ সভার প্রথম বৈঠকেই সার ব্যবস্থাপনা সংস্কারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯’ প্রণয়ন করা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন সার ডিলার ও ৯ জন খুচরা সার বিক্রেতা নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে, সার বিতরণ অনেক সহজ হয়, কৃষকের দোরগোড়ায় সার প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এবং কৃষকের সার প্রাপ্তিতে ভোগান্তির অবসান হয়। বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার সারের মূল্য ৪ দফায় কমিয়ে কৃষি ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ টাকা থেকে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ টাকা থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ টাকা থেকে ২৫ টাকা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিএপি সারের দাম পুনরায় কমিয়ে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি মাত্র ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে, কৃষক স্বল্পমূল্যে সার ক্রয় করতে পারছে। সারের বাজার স্থিতিশীল ও সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 
ফসলের উৎপাদন খরচ কমিয়ে সঠিক সময়ে ফলন নিশ্চিত করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অঞ্চলভেদে শতকরা ৫০ থেকে ৭০ ভাগ ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিস্তৃত করার পাশাপাশি কৃষকদের ঋণ সুবিধা প্রদান, নগদ আর্থিক ও উপকরণ সহযোগিতা প্রদান, নিত্যনতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণ করা হয়েছে। স্বল্প জমি থেকে অধিক উৎপাদনের জন্য কৃষকদের মাঝে ভর্তুকি ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমের সফল ধারাবাহিকতায় বিশ্ব বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে তৃতীয়, শাকসবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় ও কাঁচা পাট রপ্তানিতে প্রথম, আম ও আলু উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম।
ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে খাদ্য উৎপাদনই শেষ কথা নয়। বরং পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের যোগানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে লক্ষ্যে পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, সহজলভ্যতা ও প্রাপ্যতার বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগ প্রয়োজন। সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠনে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ জরুরি। পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতকরণে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। সরকারের সঠিক নীতি সহায়তা, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তাভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে পুষ্টিকর খাবার প্রাপ্তি অনেকাংশেই সহজতর হয়েছে। কৃষক ও কৃষি অংশীজনের পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনে ভবিষ্যতে আরো বেশি সচেষ্ট হতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা ও সব অংশীজনের সমন্বয়, সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিশ^ খাদ্য দিবসের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। আমরা যদি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের চিত্র পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই এক অনন্য সাফল্যগাথা। মাত্র দেড় দশকেরও কম সময়ে আমাদের দারিদ্র্য যে হারে কমেছে তা অনেক দেশের জন্যই অনুকরণীয়। বিবিএস-এর সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দরিদ্রতার হার নেমে এসেছে ২০.৫% যা ২০০৫ সালে ছিল ৪০% এবং ২০১৬ সালে ছিল ২৪.৩%। অন্যদিকে ২০১৯ সালে হতদারিদ্র্যের হার নেমে হয়েছে ১০.৫% যা ২০০৫ সালে ছিল ২৫.১% এবং ২০১৬ সালে ছিল ১২.৯%। পুষ্টিসম্মত উন্নত দেশের অভিযাত্রায় সবার কার্যকর অংশগ্রহণে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী, সমৃদ্ধ, সোনার বাংলা গড়ে তুলতে আমাদের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধামুক্তির সংগ্রামে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সুশীল সমাজ ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ যথাযথ ভূমিকা রেখে সফলকাম হবে সে প্রত্যাশা আমাদের সবার। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ সফল বাস্তবায়নপূর্বক রূপকল্প ২০৪১ অনুযায়ী উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনানুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর কর্মপরিকল্পনা সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।


সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়।  www.moa.gov.bd

বিস্তারিত
মুজিব শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে পারিবারিক পুষ্টি বাগান

কৃষিবিদ মো: আসাদুল্লাহ১ মো: মিজানুর রহমান২

সবুজ বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করতে হলে আরো ব্যাপকভাবে পুষ্টি সমৃদ্ধ ফসল উৎপাদন, শস্যের বহুমূখীকরণ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি কার্যক্রমকে শক্তিশালীকরণ  প্রয়োজন। ফসল উৎপাদনের মূল কাণ্ডারী এই দেশের মেহনতি কৃষক। তাই উন্নত প্রযুক্তি ও কলাকৌশল কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব। এতে কৃষক আর্থিকভাবে যেমন উপকৃত হবে তেমনি দেশের খাদ্য ভাণ্ডারে যুক্ত হয় অধিক শস্য। দেশ হবে আরো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই লক্ষ্যে বিগত বছরগুলোতে খাদ্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধশালী ও টেকসই করতে সরকার সারা বছর সময়ের চাহিদার নিরীখে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।


বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবিলায় নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য চাহিদা পূরণ এবং পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বসতবাড়িতে শাকসবজি বাগান সৃজন এবং ফলগাছ লাগানো অপরিহার্য। এতে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং পারিবারিক শ্রমের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে। সে লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২টি কর্মসূচি গ্রহণ করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৩৬.২১৯২০ লাখ টাকা খরিপ-১/২০২০-২১  মৌসুমে পারিবারিক কৃষির আওতায় সবজি-পুষ্টি বাগান স্থাপনের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ/চারা ও সার সরবরাহ সহায়তা প্রদান বাবদ কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি । যার ফলে ৬৪ জেলার ৪৯১টি উপজেলার ৪৪৩১টি ইউনিয়নের ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৯২ কৃষক পরিবার উপকার পাবে।  পাশাপাশি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫২৯১.০৭৩৬০ লাখ টাকার মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু কৃষি উৎসব উপলক্ষ্যে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। যার ফলে ৬৪ জেলার ৪৯১টি উপজেলার ৪৫৯৭টি ইউনিয়ন এবং ১৪০টি পৌরসভার ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৭০০ কৃষক পরিবার সংখ্যা পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা উপকার ভোগ করবে। সে সাথে বসতবাড়িতে পরিকল্পিতভাবে লাগসই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবজির বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পারিবারিক খাদ্য, পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধি সম্ভব হবে। পরিবারের সকল সদস্যের শ্রম উৎপাদন কাজে লাগিয়ে স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধান বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষমতায়ন করা হবে। বসতবাড়ির বিদ্যমান সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন হবে। বসতবাড়িতে পরিকল্পিত ফলগাছ লাগানো ও পরিচর্যার মাধ্যমে ফল-ফলাদির উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে।


বাংলাদেশে প্রায় ৫.৪০ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ২৫৩.৬০ লাখ বসতবাড়ি রয়েছে, আমাদের দেশে বসতবাড়ির আয়তন খুব ছোট। বসতবাড়ির গড় আয়তন ০.০২ হেক্টর। এ সব বসতবাড়িতে শাকসবজি বাগান সৃজনের মাধ্যমে আমাদের পুষ্টির চাহিদার অনেকাংশ মেটানো সম্ভব (ক্যালরি চাহিদা ৩-৪৪%, প্রোটিন ৪-৩২%)। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উচ্চফলনশীল শাকসবজি আবাদে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করে উক্ত ফসলগুলোর আবাদ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন এসব গৃহীত পদক্ষেপের ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পুষ্টি চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি আর্থিক সমৃদ্ধির পথকেও প্রসারিত করবে। বিগত বছরগুলোতে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে কৃষকদের সবজি ও ফল চাষাবাদে আগ্রহ  বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া পতিত জমি চাষের আওতায় আনার ফলে শস্য নিবিড়তাও বেড়ে যাবে।


দেশে জাতীয় শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রচেষ্টায় বিগত বছরগুলোর ন্যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরেও প্রণোদনাসহ অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উল্লিখিত দুইটি কর্মসূচির আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে খরিপ মৌসুমে শাকসবজি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ, সার, বেড়া, খুঁটি ও অন্যান্য উপকরণ সরবারাহ সহায়তা প্রদানের কাযক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহীত কার্যক্রম উক্ত ফসলগুলোর আবাদ বৃদ্ধি করবে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পারিবারিক সচ্ছলতা ও দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শাকসবজি জাতীয় ফসল আবাদের মাধ্যমে কৃষকের সবজি চাহিদার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া পারিবারিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টির সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করবে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক মানসিক প্রশান্তির সাথে অন্যান্য পুষ্টি সমৃদ্ধ ফসল চাষাবাদে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হবে।


শাকসবজি ফসল ভিটামিন-খনিজসহ পুষ্টির প্রধান উৎস। দেহে উদ্ভিদজাত প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান শাকসবজি জাতীয় ফসল থেকে নিশ্চিত হয়। তাই মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু কৃষি উৎসব উপলক্ষ্যে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন কর্মসূচি গ্রহণ বর্তমান কৃষি উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে সফল করে তুলবে।


বর্তমান কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ১-১.৫ শতক জমি চাষাবাদের জন্য বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হবে এবং ১.৫ শতক জমির উপকরণ ও উপকরণ বাবদ আর্থিক সহায়তা সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
সময় উপযোগী সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পারিবারিক পুষ্টি বাগানে স্থাপনের এ প্রণোদনা দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের মুখে সচ্ছলতার হাসি ফুটিয়ে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা খাত কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল করবে। য়

১পরিচালক, সরেজমিনউইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, ফোনঃ ৯১৩৪৫৮৭, ২উপপরিচালক, মনিটরিং, সরেজমিন উইং, ডিএই, মোবা : ০১৭১৬৮৫২১৮৬, ইমেইল : ddmonitoring@yahoo.com

 

বিস্তারিত
SDG : খাদ্য পুষ্টি ও প্রবৃদ্ধি টেকসই হোক একসাথে

ড. মো. শাহজাহান কবীর১ কৃষিবিদ মো. আব্দুল মোমিন২

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ১৬ অক্টোবর সাড়ম্বরে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর দিনটিতে জাতিসংঘের অন্যতম একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও কৃষি সংস্থা Food and Agriculture Organization (FAO) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মানুষের প্রধানতম মৌলিক চাহিদা হলো তার খাদ্য। মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে খাদ্যের অপরিহার্যতা, এর ব্যাপ্তি, সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি গুরুত্বপ‚র্ণ বিষয়ে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ১৬ অক্টোবরকে প্রতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিভিন্ন বছরে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে এ দিবস পালিত হয়। এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২০এর প্রতিপাদ্য হলো- ‘সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ’।


বর্তমান বাস্তবতায় এবারের প্রতিপাদ্য সময়োপযোগী ও যথার্থ বলেই বিবেচিত হয়। শেষ অংশ দিয়ে শুরু করতে চাই। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ব্যক্তির কর্মফল যেমন তার ভবিষ্যৎ জীবনকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে তেমনি মানবজাতির সামষ্টিক কর্মফলও তার ভবিষ্যত পথ নির্দেশ করে। কর্মের আগে আসে সুষ্ঠু পরিকল্পনা। পরিকল্পনা যদি বাস্তব ও সময়োপযোগী হয় তাহলে সফলতা আসবেই। তবে এর সাথে বিশেষভাবে দরকার মূল্যায়ন, তদারকি এবং যোগ্য নেতৃত্বের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এর নির্দেশনায় বাংলাদেশের কৃষিতে এর ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। বাংলদেশের কৃষি এখন অনেক সমৃদ্ধ। কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব দরবারে রোলমডেল।


মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় জীবনটাকে আরও একটু উন্নততর বা আয়েশি করার জন্য বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন কর্মকাÐের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন অভিঘাত এখন সর্বত্র অনুভ‚ত হচ্ছে। যার পরিণতিতে এ গ্রহটির ভবিষ্যৎ নিয়েই অনেক চিন্তাবিদ, গবেষক যে আশঙ্কা করছেন তা মানবজাতির সামগ্রিক কর্মফলেরই পরিণতি। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘ সারা পৃথিবীর সামগ্রিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ঘোষণা করেছে। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। যার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও নিশ্চিত হয় আবার প্রকৃতি, পরিবেশ এবং ইকোসিস্টেমের ওপর যেন কোন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে বর্তমান উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়া।


২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ এজেন্ড’ গৃহীত হয়। সারাবিশ্বের মানুষের শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ‘২০৩০ এজেন্ডা’ এমন একটি কর্ম-পরিকল্পনা যা বিশ্ব শান্তি জোরদার করবে এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যসহ সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান ঘটাবে। অতি দারিদ্র্যসহ সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসান ঘটানোই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আর এটাই হলো টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আগামী একদশক বিশ্বের সকল দেশ এই অভীষ্টগুলো বাস্তবায়নে কাজ করবে যার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে জনগণের সকল ধরনের দারিদ্র্যের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে; সকল ধরনের বৈষম্যের অবসান ও অসমতা হ্রাসের গুরু দায়িত্ব পালন করাসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার কাজ এগিয়ে নেয়া যাবে। আর এসব কর্মকাণ্ডের মূলমন্ত্র হবে ‘কাউকে পশ্চাতে রেখে নয় (Leaving no one behind)  নীতি অনুসরণ।


টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের অন্যতম এজেন্ডা হচ্ছে ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার। দারিদ্র্য নিরসনের পরই দ্বিতীয় এজেন্ডা হিসেবে এটি কর্মপরিকল্পনায় সংযুক্ত করা হয়েছে। কেননা খাদ্য হলো আমাদের জীবনের নির্যাস এবং আমাদের সংস্কৃতি ও সমাজের মূলভিত্তি। নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা চলমান করোনা মহামারীর সময়ে একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যের প্রয়োজন অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।


এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২০ এর প্রতিপাদ্যের শুরুর অংশে বলা আছে-সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। ঠিক এই কাজটিই করার চেষ্টা করছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার। বর্তমান সরকারের সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল এখন বিশ্বের সাধারণ দেশ থেকে শুরু করে উন্নত দেশগুলো আগ্রহ গ্রহণ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চরম খাদ্য ঘাটতির একটি দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এমনকি উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশে পরিণত হয়েছে। এ দেশে এখন আর কেউ না খেয়ে থাকে না, আমাদের পুষ্টিহীনতাও অনেকটা দূর হয়েছে। দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা আগের তুলনায় বেড়েছে। এটি জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের দ্বিতীয় এজেন্ডার পরিপূরক।


শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টিসাধন ও ক্ষয় পূরণের জন্য মানুষ যা খায় তাই তার খাদ্য। পুষ্টি উপাদান অনুযায়ী খাদ্যেরও শ্রেণিবিভাগ আছে। তবে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে হলে দু’টি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, পুষ্টিকর খাবারের পর্যাপ্ততা (availability) নিশ্চিতকরণ, দ্বিতীয়ত সব জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার প্রাপ্তির সামর্থ্য (affordable) নিশ্চিতকরণ। নোবেল  বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর অমর্ত্য সেন বলেছেন শুধুমাত্র খাদ্যের পর্যাপ্ততা কোনো দেশ বা জাতিকে ক্ষুধামুক্ত করতে পারে না যতক্ষণ না সব জনগোষ্ঠীর জন্য ওই খাদ্য প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।


আমাদের বর্তমান কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড.  মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, এমপি প্রায়শই বলেন, খাদ্য শুধুমাত্র পর্যাপ্ত হলে হবে না এটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য, নিরাপদ ও পুষ্টিকর হতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন আমাদের দেশীয় সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন- FAO, IFAD, WFP, IFPRI, CIMMYT প্রভৃতি এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এসব সংস্থা তাদের নিজস্ব কর্ম পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার প্রণীত কৃষি ও খাদ্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অথবা কর্মসূচিতে সহায়তার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখছে।


বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে এই খাদ্য নিয়েই বেশি শঙ্কিত উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশগুলো। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ইতোমধ্যে আশংকা ব্যক্ত করেছে যে, করোনা মহামারী খাদ্য মহামারী রূপ নিতে পারে। কেননা ঠিকমতো উৎপাদন না হলে যে কোন দেশের ফরেন কারেন্সি  রিজার্ভ যতই শক্তিশালী হোক না কেন অনেক সময় খাদ্য আমদানি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে পারে। করোনা মহামারীর কারণে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত সকল দেশেই কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত তথা দরিদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হয়েছেন। কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বস্বাস্থ্য এমন একটি সংকটময় সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে আমরা শুধু আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং মৌলিক চাহিদাগুলোর কথা চিন্তা করতে শুরু করেছি।


বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির যোগান দিতে উৎপাদনের বৈচিত্র্যতা আনয়ন ও খাদ্য ব্যবস্থার সুষম বণ্টনে সকলকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। এই অনিশ্চিত সময়ে খাদ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনাকে অটুট রেখে মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।


সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বব্যাপী কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। যদিও আমরা প্রত্যেকের চাহিদার অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি তবে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াটি ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে। পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের ভারসাম্যহীনতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, পরিবেশের অবক্ষয়, কৃষিপরিবেশ বৈচিত্র্যের ক্ষতি, বর্জ্য এবং খাদ্য শৃঙ্খলকর্মীদের সুরক্ষার অভাব। করোনা পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রয়োগ শুরু করার সাথে সাথে খাদ্য বন্টন ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে এ খাতে টেকসই ভিত্তি তৈরির সুযোগ রয়েছে।


বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক বিশ্বব্যাপী সংহতি শক্তিশালী করার মাধ্যমে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলা এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মীদের যথাযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও কাজ করা। উন্নত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রণয়ন, ই-কমার্স ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সৃষ্ট সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কাক্সিক্ষত ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ অর্জন করা সম্ভব।  

১মহাপরিচালক, ২সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, মোবাইল : ০১৭১৬৫৪০৩৮০,  ইমেইল :  smmomin80@gmail.com

বিস্তারিত
খাদ্যের পুষ্টি ও নিরাপদতা

প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল আলীম

খাদ্য সকলেরই খেতে হয় হোক সে রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার। সুস্থ ও সবলভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। তাই খাদ্যের উপাদান সম্পর্কে সকলেরই কিছু না কিছু সাধারণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। উন্নত দেশের প্রতিটি নাগরিক কোনো না কোনোভাবে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা কমিউনিটির শিক্ষার মাধ্যমে খাদ্যের পুষ্টি উপাদান, খাদ্যের নিরাপদতা বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান অর্জন করে থাকে। আমাদের দেশে সকলেরই বিশেষ করে মহিলাদের খাদ্যের পুষ্টি ও নিরাপদতা সম্পর্কে জানা একান্ত প্রয়োজন। কারণ মহিলারাই আমাদের দেশে ছেলে মেয়েদেরকে লালন পালন করে থাকেন।


খাদ্যের উৎস, উৎপাদন ও পুষ্টি
প্রাথমিকভাবে খাদ্যের যোগান আসে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদ থেকে। এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদের ভ‚মিকা অপরিসীম। নানা প্রতিক‚লতার মাঝে এবং বিগত বছরগুলোতে গবেষণায় উদ্ভাবিত নতুন নতুন জাত ও উৎপাদন প্রদ্ধতির প্রযুক্তিসমূহ কৃষক বা খামারিদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার ফলে দৃশ্যমান ফসল, প্রাণি ও মৎস্য উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার মাত্রা প্রশংসনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষির সকল শাখা (কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদ) উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে বাংলাদেশ বিশে^র দরবারে স্বীকৃতি পেয়েছে।


খাদ্যের উপাদান প্রধানত : ছয়টি যথা- পানি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও মিনারেলস। এই ছয়টি উপাদানকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায় যথা : ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট (কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট) ও মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট (ভিটামিন ও মিনারেলস)। আমাদের দেশে এখন ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্টের আর অভাব নেই। আমাদের দেশে এখন মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আর মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের উৎস হচ্ছে শাকসবজি। তাই দৈনন্দিন জীবনে প্রতিদিনই আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া দরকার। এখানে উল্লেখ্য যে, শাকসবজি ও ফলমূল ফরমালিন আছে বলেই অনেকে সেগুলো কম খেয়ে থাকেন। কিন্তু আমি এখানে তাদেরকে নিশ্চিত করে বলতে চাই শাকসবজি ও ফলমূলে ফরমালিন দেওয়া হয় না বা ফরমালিন শাকসবজি ও ফলমূলের উপর কোনোভাবে কাজ করে না। তাই, এটি একটি ভুল ধারণা। পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে যা আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ করে থাকে। করোনাকালীন সময়ে ডবিøউএইচও এবং ডাক্তারদের নির্দেশনা অনুসারে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি ও ভিটামিন সি খাওয়া দরকার। এই নিউট্রিয়েন্টগুলো আমাদের করোনার হাত থেকে নিরাপদ রাখবে।   


খাদ্যের নিরাপদতা
খাদ্য নিরাপদতা হলো এক বা একাধিক পদক্ষেপ যা ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য খাদ্যকে খাদ্যের বিভিন্ন বিপত্তি থেকে রক্ষা করে। খাদ্যকে দূষিত করতে পারে তথা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক খাদ্য স্থিত যে কোনো কিছুকে খাদ্য বিপত্তি বলা হয়। এক্ষেত্রে খাদ্য ব্যবসার সাথে জড়িত খাদ্যকর্মীর গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে খাদ্য সংশ্লিষ্ট বিপত্তি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে। মানুষের জীবনে মৌলিক চাহিদাসমূহ যথা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, ও চিকিৎসার মধ্যে প্রথম প্রয়োজনীয় হচ্ছে খাদ্য। বাকি সবগুলোর সাথে আপস করা গেলেও খাদ্য ছাড়া বেঁচে থাকাটাই অসম্ভব। জন্মলগ্ন থেকেই একটি শিশুর প্রাথমিক চাহিদা থাকে খাদ্য যা তার বেড়ে উঠার জন্য অপরিহার্য। আর সেই খাদ্য যদি নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ না হয়, তাহলে শিশুটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি তাঁর বিকাশ ঘটে না। শিশুটি তখন জাতির কাছে মানবসম্পদে পরিণত না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, তথা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সাথে খাদ্যের নিরাপদতা জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। এক কথায় বলা যায়, একটি সুস্থ সবল জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হলো জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা ও সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি। বিষয়টি গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশের আপামর মানুষের জীবন ও স¦াস্থ্য সুরক্ষায় ভেজাল ও দূষণমুক্ত নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগোপযোগী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে চঁৎব ঋড়ড়ফ ঙৎফরহধহপব,১৯৫৯ রহিত করে যুগান্তকারী নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণীত হয়। ১ ফেব্রæয়ারি ২০১৫ থেকে কার্যকর এ আইনের অধীন সরকার ২ ফেব্রæয়ারি ২০১৫ তারিখে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। শুধু তাই নয়, বিগত দশ বছরের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশকে একটি শিক্ষিত ও মেধাসম্পন্ন জাতি উপহার দেয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নির্বাচনি বিশেষ অঙ্গীকার ও   পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাকে সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। উপরোক্ত  প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি দেশের খাদ্য শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন হতে খাবার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যকে জনগণের জন্য নিরাপদ করা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক পর্যায়ে সমস্যাবলী এবং চ্যালেঞ্জসমূহ চিহ্নিত করে উত্তোরণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশে মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপদতার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য সংস্থার মাধ্যমে এসডিজির অভীষ্টসমুহ অর্জনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি নিয়োগ, বিএফএস এর কার্যক্ষেত্র সম্প্র্রসারণ, ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য শৃঙ্খলের নিরাপদতার মান উন্নয়ন, তদারকি আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল এদেশের গণমানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তাঁর এই স্বপ্নকে বাস্তব করার নিমিত্ত বর্তমান সরকার নিরাপদ খাদ্য   কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলশ্রæতিতে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালে উন্নতদেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করবে এবং দেশের সকল মানুষের পুষ্টিসম্মত নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে- এ প্রত্যাশা সকলের।


খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার কারণসমূহ
* খাদ্যে ক্ষতিকর অনুজীব ও মাত্রাতিরিক্ত কোনো দূষক, টক্সিনের উপস্থিতিতে;
* খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক বা বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং পশু বা মৎস্য রোগের ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকলে;
* খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত খাদ্য সংযোজন দ্রব্য এবং প্রক্রিয়াকরণ সহায়ক দ্রব্য মিশ্রিত হলে;
* অননুমোদিত খাদ্য সংস্পর্শক মোড়কে বা আধারে খাদ্য রাখলে;
* খাদ্যে এলার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতিতে।


খাদ্য বিপত্তি যেমন অণুজীব ঘটিত, ভৌত, রাসায়নিক অথবা এলার্জি সৃষ্টিকারী বা অসহিষ্ণু প্র্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী খাদ্য বিপত্তি মাঠ থেকে পাত পর্যন্ত খাদ্য শৃঙ্খলের  যেকোনো পর্যায়ে ঘটতে পারে। খাদ্য শৃঙ্খলের এমন কোনো পর্যায় নেই যেখানে জৈব বিপত্তি তথা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নেই। তাছাড়া যে কোনো পর্যায়ে ইস্ট, মোল্ড ও ভাইরাস ও আসতে পারে। রাসায়নিক খাদ্য বিপত্তি ইচ্ছাকৃৃত এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারে। অনিচ্ছাকৃত বিপত্তির মধ্যে আছে বালাইনাশক, আগাছানাশক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদি। আর ইচ্ছাকৃত বিপত্তিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অননুমতি খাদ্য সংযোজন দ্রব্য যেমন : খাদ্য সংরক্ষণকারী রাসায়নিক দ্রব্য, রঞ্জকদ্রব্য, সুগন্ধিদ্রব্য ইত্যাদি। খাদ্য বিপত্তি প্রাকৃতিকভাবে ও আসতে পারে যেমন, এলার্জি সৃষ্টিকারী বা অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী খাদ্যদ্রব্য, বায়োটক্সিন এবং হিস্টামিন যা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব থেকে আসতে পারে। ভৌত বিপত্তির মধ্যে ভাঙ্গাকাচ, ভাঙ্গা লোহার টুকরা, প্লাস্টিকের টুকরা ইত্যাদি খাদ্যশৃঙ্খলের যে কোনো পর্যায়ে আসতে পারে। বিভিন্ন বিপত্তি থেকে খাদ্যকে রক্ষা করে জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুসারে, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধিতি (Food Safety Managment System) বলতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, প্রস্তুতকরণ, ও বিপণনে উৎকৃষ্ট পদ্ধতির (Good Agricultural Practices, Good  Manufacturing Practices, Good Hygienic  Practices) অনুশীলনসহ গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা, বিপত্তি বিশ্লেষণ (Hazard Analysis), সংকটকালীন জরুরি নিরাপত্তা সাড়া (Food Safety Emergency Response), অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (Residual Control System) ও খাদ্যের অনিরাপদতার উৎস নিরীক্ষা পদ্ধতি (Food Safety Auditing System) এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় অনুশীলন, এতদসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে নির্ধারিত মানদণ্ড ও বাধ্যবাধকতা প্রতিপালন নিশ্চিতকল্পে খাদ্য ব্যবসা পরিচালনার জন্য অনুমোদিত নির্দেশনায় (Approved   Guidelines or Directives)  বিদ্যমান।


নিরাপদ খাদ্য খেয়ে সুস্থ সুখী জীবন গড়ি। আমাদের সচেতনতাই পারবে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ পরিহার করতে ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে।

সদস্য (খাদ্য শিল্প), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, মোবাইল : ০১৭৩২২৫২২২৯, ই-মেইল : maalim07@yahoo.com

 

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তায় তুলা চাষের অবতরণিকা

ড. মোঃ ফরিদ উদ্দিন১ মোঃ মাহমুদুল হাসান২

বাংলাদেশ একটি কৃষি নির্ভরশীল দেশ। এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।  বিশে^র কাছে বাংলাদেশ আজ খাদ্য নিরাপত্তায় রোল মডেল। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে মূলত দুটি বিষয়কে বোঝানো হয় একটি ‘খাদ্যের সহজলভ্যতা’ ও অপরটি ‘খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা’। কোনো একটি দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা তখনই শতভাগ নিশ্চিত হবে যখন দেশটিতে তার জনগণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য বিদ্যমান থাকবে এবং জনগণের খাদ্য ক্রয় করার সামর্থ্য থাকবে।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কৃষি ব্যবস্থা উন্নয়নের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। দেশের অধিকাংশ জনগণ গ্রামে বসবাস করে যার অধিকাংশ প্রত্যক্ষভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবদি  কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন সমগ্র বিশ্বের কাছে আদর্শস্বরূপ। সাম্প্রতিক সময়ে দানাদার শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, সাথে সাথে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে লক্ষণীয় হারে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে কৃষকের আয়। কিন্তু কৃষকের এই বর্ধিত আয় বাজারে খাদ্যের মূল্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। চাহিদার অতিরিক্ত পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদনের কারণে প্রতি বছর কৃষকদের বেশ বড় অঙ্কের ক্ষতি হচ্ছে। তাই খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থকরী ফসল (তুলা, চা, পাট ইত্যাদি) উৎপাদন কৃষকদের এই ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে লাভের মুখ দেখাতে পারে।


বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল তুলা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প সম্পূর্ণভাবে এই তুলার ওপর নির্ভরশীল যার বেশির ভাগ অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা আমদানিকারক দেশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের দেশে প্রায় ৮১ লাখ বেল তুলা আমদানি করা হয়েছে যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৪০,০০০ কোটি টাকা। তুলা একটি আঁশজাতীয় ফসল এবং এর বীজ হতে উপজাত হিসেবে ভোজ্যতেল ও খৈল পাওয়া যায়। তুলা বীজ হতে ১৫-১৭% ভোজ্যতেল ও ৮০% উন্নত মানের খৈল পাওয়া যায়। দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ১৮টি জিনিং শিল্পে প্রায় ১০০টি জিনিং মেশিন ও তুলার বীজ হতে তেল আহরণের জন্য ১৫-২০টি    ঊীঢ়বষষবৎ মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। অপরিশোধিত তেলকে পরিশোধনের মাধ্যমে ভোজ্যতেলে পরিণত করার জন্য কুষ্টিয়ায় বেসরকারি উদ্যোগে একটি রিফাইনারি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। তুলার খৈল মাছ ও গবাদি পশুর উৎকৃষ্ট মানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তুলা ফসল উৎপাদনের পর তুলা গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কৃষক শুকনা তুলাগাছ জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করে অর্থের সাশ্রয় করে অথবা তুলাগাছ জ¦ালানি হিসেবে বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। তুলার বীজ বপন থেকে শুরু করে বীজতুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জিনিং পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া যে জমিতে তুলা চাষ করা হয় সে জমিতে তুলার পাতা পড়ে জমির ঊর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায় ফলে তুলা পরবর্তী ফসলের উৎপাদন খরচ কম হয় এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। কৃষক ১ হেক্টর তুলা চাষে ৭৫-৯০ হাজার টাকা খরচ করে ৩.৫-৪.৫ টন বীজ তুলা পায় যার বাজার মূল্য ২.২৫-২.৬২ লাখ টাকা। ফলে কৃষক ১ হেক্টর তুলা চাষ করে ১.৫-১.৯ লাখ টাকা (বিঘাপ্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা) লাভ পায় ।   

কৃষক উক্ত টাকা দিয়ে খুব সহজে খাদ্য ক্রয় করে পরিবারের সুষম খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। অন্যান্য ফসলের  তুলনায় তুলা ফসলে ঝ্ুঁকি কম। তুলা মধ্যম মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল ফসল। তুলা হালকা কাষ্ঠল (ঝযৎঁন) জাতীয় উদ্ভিদ বিধায় সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে তুলা ফসল তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়না যেখানে অন্যান্য ফসল বিশেষ করে সবজি জাতীয় ফসল নষ্ট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে তুলা ফসলের টিকে থাকার নিশ্চয়তা বেশি। তুলা মধ্যম মাত্রার খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসল। প্রতিকূল পরিবেশে তুলা চাষ বেশ লাভজনক, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো-


ক. খরাপ্রবণ অঞ্চলে তুলা চাষ  : বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলটি খরাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। এই উঁচু বরেন্দ্র ভ‚মি রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত যা তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত। বরেন্দ্র ভ‚মিতে মোট ৫.৮২ লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমির ৮৪% এক ফসলি, উক্ত অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা মাত্র ১১৭%। অতিরিক্ত খরার জন্য খাদ্য শস্য উৎপাদন তেমন একটা লাভজনক হয় না। কিন্তু তুলা খরাসহিষ্ণু হওয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাতও সম্পূরক সেচে উক্ত অঞ্চলে তুলা চাষ করার মাধ্যমে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।


খ. পাহাড়ি অঞ্চলে তুলা চাষ : প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় ঝুম পদ্ধতিতে তুলা চাষ হয়ে থাকে। ঝুম পদ্ধতিতে তুলার ফলন কম হয় ফলে কৃষকদের লাভের পরিমাণ কম হয়। বর্তমানে তুলা উন্নয়ন বোর্ড বিগত কয়েক বছর গবেষণার মাধ্যমে পাহাড়ের ঢালে আন্তঃফসল পদ্ধতিতে দুই সারি ধান ও এক সারি আপল্যান্ড জাতের তুলা চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যার মাধ্যমে উক্ত এলাকার চাষিরা ধান ও তুলা উভয়ের অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের ঢালে (ঠধষষবু) মাটিরাঙ্গা, খাগড়াছড়ি, লামা, বান্দরবান এলাকায় প্রচুর পরিমাণে তামাক চাষ হয়। সে সমস্ত ঠধষষবু তে তুলা চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের কৃষকেরা তামাক থেকে তুলা চাষের দিকে ঝুঁকছে। পাহাড়ি অঞ্চলে লাভজনকভাবে তুলা চাষ করে উপজাতিদের জীবনমান উন্নত করা হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে।


গ. লবণাক্ত এলাকায় তুলা চাষ : বাংলাদেশের আবাদি জমির একটি বিরাট অংশ দখল করে আছে উপকূলীয় এলাকা (২৮.৫ লাখ হেক্টর)  যা দেশের সমগ্র আয়তনের ২০%। উপক‚লীয় এলাকার মাটি লবণাক্ত হওয়ার কারণে সকল প্রকার খাদ্যশস্য খুব একটা ভালো হয় না। তুলা মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসল হওয়ায় আমন ধান কাটার পর পতিত জমিতে রবি মৌসুমে তুলা চাষের গবেষণাও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে উপক‚লীয় এলাকার    কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে।


ঘ. চরাঞ্চলে তুলা চাষ : বাংলাদেশের নদ-নদীর অববাহিকায় জেগে উঠা চরাঞ্চলের মাটি বেলে প্রকৃতির হওয়ায় এর উর্বরতা ও পানি ধারণক্ষমতা কম। এই কারণে চরাঞ্চলসমূহে কৃষকরা খাদ্যশস্য চাষাবাদ করে তেমন লাভবান হয় না। তুলা গভীরমূলী ফসল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে তুলা চাষ করা হচ্ছে। তাছাড়া চরাঞ্চলে তুলা চাষের ফলে জমিতে তুলার পাতা যোগ হয়ে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চরাঞ্চলে তুলা চাষ হতে পারে কৃষকদের অধিক আয়ের একটি সম্ভাবনাময় ফসল ।


ঙ. কৃষি বনায়ন জমিতে তুলা চাষ : বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় আম, পেঁপে এবং লিচু বাগানের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে (বর্তমানে প্রায় ৭০০০০ হেক্টর জমি ফলদ ও বনজ বাগানের আওতাভুক্ত)। এসকল ফলজ বা বনজ জমিতে গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে ২-৩ বছর সফলভাবে তুলা চাষ করার লক্ষ্যে তুলা উন্নযন বোর্ড বিগত কয়েক বছর যাবত নব্যসৃজনকৃত বাগানে তুলাচাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে কৃষকরা তাদের ফলদ ও বনজ বাগানে তুলা চাষ করে অধিক লাভবান হতে পারবে।


তাই যেসব প্রতিক‚লতার কারণে অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় সেখানে খুব সহজে তুলা চাষ করে কৃষক লাভবান হয় এবং খাদ্য ক্রয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকের অধিক আয় নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। পরিশেষে বলা যায় বাংলাদেশের কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে তুলা একটি সম্ভাবনাময় ফসল।

১নির্বাহী পরিচালক, ২তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, ফোন : ৫৫০২৮৩৫৫, ই-মেইল : mfaridcdb@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
পরিবেশবান্ধব ও পুষ্টি সমৃদ্ধিতে পাট

কৃষিবিদ মোঃ মুকুল মিয়া

পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যময় অর্থকারী ফসল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পাটখাতের রপ্তানি আয় ছিল ৮৯.৮৬ শতাংশ। তখন পাটজাত দ্রব্যের চেয়ে কাঁচা পাট রপ্তানি করে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হতো যা দেশের অর্থনীতিতে সোনালি যুগের সৃষ্টি করে। কাঁচা পাট রপ্তানি করে অধিক পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হতো বলে এই বাংলার পাট বা পাটের আঁশ ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত হয়।


বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ২য় হলেও রপ্তানিতে ১ম স্থান দখল করে নিয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ পাটের ঐতিহ্য রক্ষার্থে পাটের প্রতি বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভালোবাসার কারণেই ক্রমাগত পাটের চাষ বেড়ে যাচ্ছে। পাট ছাড়াও বাংলাদেশে অন্যান্য আঁশ ফসল যেমন কেনাফ Hibischus cannabinus ও মেস্তার (Hibischus sabdariffa চাষ করা হয়। এ ফসলগুলো প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী এবং কম খরচে পতিত জমিতে চাষাবাদযোগ্য। পাট গাছের ছাল থেকে উৎপন্ন হয় আঁশ যা ফ্লোয়েম তন্তু বা বাস্ট ফাইবার নামে পরিচিত। গাছের ভেতর থেকে উৎপন্ন হয় কাঠি। এ দেশে তোষা পাটের চেয়ে দেশি পাটের চাষ বেশি হতো যার অনুপাত ছিল ২০ ঃ ৮০, কিন্তু বর্তমানে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক কারণে এটির অনুপাত বিপরীত অর্থাৎ তোষা ঃ দেশি = ৮০ ঃ ২০। বিজেআরআই কর্তৃক এ পর্যন্ত দেশি পাটের ২৭টি (আঁশের জন্য ২৪টি, দেশি শাকের জন্য ৩টি), তোষাপাটের ১৮টি, কেনাফের ৪টি এবং মেস্তার ৩টি জাতসহ সর্বমোট ৫২টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৮-৯ লাখ হেক্টর জমিতে পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের চাষ হয়ে থাকে যা থেকে প্রায় ৮৫-৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়। দেশের কৃষি জিডিপিতে পাটের অবদান ১.৪ শতাংশ; জিডিপিতে পাট খাতের অবদান ০.২৬ শতাংশ। বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র অধিক পরিমাণে কাঁচা পাট আঁশ রপ্তানিকারক দেশ। এর মূলে রয়েছে বিশ্বব্যাপী পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহারে অনাগ্রহ। পাট একটি পরিবেশবান্ধব আঁশ ফসল। পাটের আঁশমূলত সেলুলোজ এবং লিগনিন দ্বারা গঠিত। এই সেলুলোজ সংগ্রহ করে এক ধরনের বায়ো ডিগ্রেডে বল শিট উদ্ভাবন করা হয় যা পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এই বায়ো ডিগ্রেডে বল প্লাস্টিক শিট থেকে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এক ধরনের পলিথিনব্যাগ উদ্ভাবন করা হয়েছে যা ‘সোনালিব্যাগ’ নামে পরিচিত। এই সোনালিব্যাগ এর উদ্ভাবক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা  ড. মোবারক আহমদ। ‘সোনালিব্যাগ’ নামটি দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়াও, এই বিজ্ঞানী ২০০৯ সালে পলিমারের মিশ্রণে পাট থেকে আবিষ্কার করেন জুটিন (পাটের ঢেউটিন)। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বা পলিথিন বা পলিইথাইলিন থেকে উৎপাদিত পলিথিনব্যাগ মাটিতে সহজে মিশে যায় না। এর ক্ষতিকর উপাদানগুলো প্রায় ১০-১৫ বছর মাটিতে থেকে যায় যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে, মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে, ফসলের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলে, পলিথিন পোড়ানোর পরে এ থেকে উদ্ভ‚ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও কার্বনমনোঅক্সাইড পরিবেশের ব্যাপক দূষণ ঘটায়, শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। অপরদিকে, পাটের আঁশের সোনালিব্যাগ ৪-৫ মাস পরে সহজে পঁচে যায়, মাটিতে সারের কাজ করে এবং পরিবেশেও কোনো ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে না। সোনালিব্যাগে  খাদ্যসামগ্রী ও পোশাকসহ বিভিন্ন সামগ্রী বহন করা যাবে স্বাচ্ছন্দ্যে। পাটের তৈরি পলিমারের ব্যাগ সাধারণ পলিব্যাগের চেয়ে দেড়গুণ টেকসই ও মজবুত। পানি নিরোধক এই পলিব্যাগ পলিথিন ব্যাগের চেয়ে কম মূল্যে পাওয়া যাবে। সহজলভ্য উপাদান এবং সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এ সোনালিব্যাগ বিদেশে রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য সোনালিব্যাগের উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে বাড়াতে হবে এবং সেইসাথে বাজারে পলিথিনব্যাগ নিষিদ্ধ করে সোনালিব্যাগ ব্যবহারের  জন্য আইন করা জরুরি।


পরিবেশের ভারসাম্য এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় এর অবদান অপরিসীম। পাটগাছের মূল মাটিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ সেমি. গভীরে প্রবেশ করে মাটিতে থাকা অজৈব তরল খাদ্য মাটির উপরে নিয়ে আসে। এর ফলে অন্যান্য অগভীর মূলবিশিষ্ট ফসল সমূহের চাষাবাদে মাটির পুষ্টির সমস্যা হয় না এবং মাটির গুণাগুণও ঠিক থাকে। পাট ফসলের চাষাবাদে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাট পাতা মাটিতে মিশে নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম যোগ করে। এছাড়াও, পাটগাছ কাটার পর জমিতে থাকা পাটের গোড়া মাটিতে পচে গিয়ে জৈব সারে পরিণত করে। পাট পচানো পানি জমির জন্য উপকারী। পাট ফসল চাষে কৃষকের খরচ খুব কম লাগে। সার ও কীটনাশক খুব কম লাগে। প্রতি হেক্টর জমিতে পাট চাষে ১০০ দিন বয়সে পাটগাছ প্রায় ১৪.৬৬ টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং ১০.৬৬ টন অক্সিজেন নিঃসরণ করে পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখে। পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের আঁশ ও কাঠি থেকে পেপার পাল্প তৈরি করা যায়, জ্বালানি হিসেবে, ঘরের বেড়া, ছাউনি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। বাঁশ ও কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টিকেল বোর্ড, কাগজের মÐ ও কাগজ তৈরিতেও পাটকাঠি ব্যবহৃত হয়। পাটকাঠি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে বন উজাড়ের প্রবণতা কমবে, পরিবেশ ও প্রাণিকুল ভালো থাকবে। পাটকাঠি থেকে উৎপাদিত কার্বনের গুণগতমান সর্বাধিক। তাই বিশ্ববাজারে এর চাহিদা ও মূল্য দুটিই বাড়ছে। এছাড়াও পাট কাঠি থেকে কয়লা/চারকোল উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশের পাট এখন পশ্চিমা বিশ্বের গাড়ি নির্মাণ, পেপার অ্যান্ড পাল্প, ইনসুলেশন শিল্পে, জিওটেক্সটাইল হেলথ কেয়ার, ফুটওয়্যার, উড়োজাহাজ, কম্পিউটারের বডি তৈরি, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিএমডবিøউ কোম্পানি পাট দিয়ে তৈরি করছে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিনকার’ যার চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশি।


পাটের বহুবিদ ব্যবহারের পাশাপাশি শুকনো পাটপাতার পানীয় ‘চা’ হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। এছাড়াও মেস্তার মাংসল বৃতি (শাঁস) থেকে জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চা উদ্ভাবন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে এই ঐতিহ্যবাহী স¦নামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। উল্লেখ্য যে, পাটপাতা এবং মেস্তারবৃতি থেকে উৎপাদিত পানীয় ‘চা’ এর কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বলে জানা যায়। তাছাড়া, বিজেআরআইসহ কিছু প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে এই পানীয় ‘চা’ ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং খুব কম মূল্যে পাটপাতা এবং মেস্তারবৃতি থেকে উৎপাদিত পানীয় ‘চা’ ব্যবহার করা যেতে পারে।


পাটফসল শুধু আঁশের উদ্দেশ্যেও চাষ করা হয় না, শাক হিসেবেও পাটপাতা খাওয়া যায়। দেশিপাট পাতা স্বাদে তিতা, আর তোষাপাট অনেকটা মিষ্টি লাগে। বর্তমানে প্রচলিত বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত দেশিপাট শাকের পুষ্টিসমৃদ্ধ ৩টি জাত : বিজেআরআই পাট শাক-১, সম্প্রতি উদ্ভাবিত বিজেআরআই পাটশাক-২ (ম্যাড়ালাল) এবং বিজেআরআই পাট শাক-৩ (ম্যাড়াসবুজ)। এই জাতগুলো শাকের জন্যই চাষ করা যায়, আঁশের জন্য নয়। কারণ, এ জাতগুলো খাটো এবং ঝোপালো হয়। দিন নিরপেক্ষ বলে এ জাতগুলো দেশের সব ধরনের জমিতে প্রায় সারাবছর চাষ করা যায়। মৃদু লবণাক্ত এলাকাতেও চাষ করা যায়। রোগবালাই ও প্রতিক‚ল পরিবেশ সহনশীল এই জাতসমূহ অল্প যত্ন ও কম খরচে চাষ করে ২৫-৩০ দিন পর কয়েক বার শাক খাওয়া যায়। গড়ে প্রতি ১০০ গ্রাম পাটশাকে ক্যালরি থাকে ৭৩ গ্রাম, আমিষ ৩.৬ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২.১৫ গ্রাম, পটাশিয়াম ১.৬৪ গ্রাম, প্রোটিন ২০.৫ গ্রাম; প্রতি কেজিতে থাকে আয়রন ০.৭৯ গ্রাম, ভিটামিন-এ ১২৬.৪৫ মিগ্রা., ভিটামিন-সি ৭৫১.১৭ মিগ্রা.। তাছাড়া পাটশাকে রয়েছে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ক্যানসার প্রতিরাধী উপাদান, ক্যারোটিন এবং খাদ্যআঁশ। এ সকল উপাদান মানুষের শরীরে হাড় ভালো রাখে; হজমে সাহায্য করে; খাবারে রুচি বাড়ায়; কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে; স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে; নিরবচ্ছিন্ন ঘুম হয়; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়; রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে; কোলেস্টেরল কমায়; হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়; হিমোগেøাবিন তৈরি করে; তাপমাত্রা এবং কর্মদক্ষতা বাড়ায়; বাতব্যথা দূর করে; উচ্চমাত্রার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরে ক্যানসার প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে। এর ফলিক অ্যাসিড ত্বক ও চুল সতেজ রাখে। তাই এই সকল রোগের জন্য পাটশাক একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ্য।


পাট বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটের   সোনালিআঁশ ও রূপালীকাঠি দুইয়েরই বহুমুখী ব্যবহার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এনে দিতে পারে অপার সম্ভাবনার পথ। ‘সোনালিআঁশের সোনার দেশ, পাটপণ্যের বাংলাদেশ’ এই স্লোগান বাস্তবায়িত করলে অবশ্যই বাংলাদেশ একদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশে পরিণত হবে বলে আশা করি। পলিব্যাগের বিকল্পে সোনালিব্যাগ করি ব্যবহার, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করি সবার, এটাই হোক সবার অঙ্গীকার।

সাইন্টিফিক অফিসার, প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিকমিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল:  ০১৫২০-০৮৩০৮৮, ই-মেইল: mukulbjribreeding@gmail.com

 

বিস্তারিত
রসনা বিলাস ও পুষ্টির হিসাব নিকাশ

কাজী আবুল কালাম

মানুষ প্রতিদিন খাদ্য গ্রহণ করে। কেউ বেঁচে থাকার জন্য খেয়ে থাকেন, আবার কেউ বা রসনা বিলাসের জন্য খেয়ে থাকেন। খাবার কি শুধুই রসনা বিলাসের জন্য, নাকি এর অন্য কোনো দিকও আছে? আছে বৈকি! আচ্ছা, কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়- আপনি খাদ্য চয়নে (food choice) কি করেন? এক্ষেত্রে কি পুষ্টিগুণের কথা ভাবেন? নিশ্চিতভাবেই  সিংহভাগের উত্তর হবে খাদ্য চয়নের ক্ষেত্রে খাবারের তৃপ্তি বা জিহ্বার স্বাদই মুখ্য। তবে দুয়েকজন হয়তো বলবেন, তারা পুষ্টিগুণের কথাও বিবেচনাতে নেন। পুষ্টিগুণের পাশাপাশি জানা প্রয়োজন ‘স্বাস্থ্যকর খাবার’ এবং ‘অস্বাস্থ্যকর খাবার’ কী? এ বিষয়ে পুষ্টি বিজ্ঞানী বা স্বাস্থ্যবিদের মত কী? ‘অস্বাস্থ্যকর খাবার’ হলো সেই খাবার যা উচ্চ ক্যালরি ও চিনি যুক্ত, লবণের পরিমাণ বেশি, খাদ্য আঁশ কম, অণুপুষ্টি (micronutrient) অপর্যাপ্ত এবং অপরিচ্ছন্ন জায়গায় প্রস্তুতকৃত। এ খাবারগুলো নিরাপদ খাবার নয়। অপরদিকে খাদ্যের মান অর্থাৎ ভেজালমুক্ত, আঁশযুক্ত, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার পরিমাণমতো অর্থাৎ দেহের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে খাবার গ্রহণ করলেই তাকে বলা যায় ‘স্বাস্থ্যকর খাবার’। প্রতিদিন সম্ভব হলে স্বল্প পরিমাণে প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ (টক/মিষ্টি দই, পনির, পান্তাভাত) খাবার খাওয়া যেতে পারে। প্রোবায়োটিক অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি ও অপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ এবং গৃহীত খাবার পরিপাকের সহায়তা করে; এর ফলে পরিপাক নালীর কাজকর্ম সুস্থভাবে সম্পন্ন হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সময় ও পরিমাণটাও গুরুত্বপূর্ণ। না খেয়ে যতজন মারা যান, বেশি খেয়ে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক লোক মারা যান - এটিই সত্যি। পরিসংখ্যানও সে কথার সাক্ষ্য দেয়। দেশে ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে ওজনাধিক্যের সংখ্যা এবং অসংক্রামক রোগীর সংখ্যা। অসংক্রামক রোগের (উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, লিভারজনিত, কিডনির জটিলতা, ডায়াবেটিস  প্রভৃতি) কারণই হলো ‘অস্বাস্থ্যকর খাবার’ অধিক পরিমাণে গ্রহণ করা, যা ওজন বেড়ে যাওয়ার কারণও বটে।  বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৫৯% মারা যায় অসংক্রামক রোগের কারণে। ২০১৭ সালে বেড়ে হয়েছে ৩.৪%। [সূত্র : এফএও : বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি প্রতিবেদন]


প্রতিটি মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে তার প্রাত্যহিক জীবনাচারণের উপর। তিনি শরীরের কতটা যত্ন নিচ্ছেন, পরিবারের সবাই কতটা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছেন এবং সকলের মনের উদারতা, চিন্তার প্রসারতা কতটা বিকশিত এসবই সকলকে সার্থকভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগায়। স্বাস্থ্যকর খাদ্য চয়নে যে বিষয়গুলো কাজ করে, তা হলো ক্ষুধা, স্বাদ, খাবারের মূল্য, ক্রয়ক্ষমতা, বাজার, ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দ, মানসিক অবস্থা, পরিবারের সংস্কৃতি, বিশ্বাস, খাদ্যজ্ঞান, পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা ইত্যাদি। ফলে, দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচন মোটেও সহজ কাজ নয়। কোন খাবারে কোন পুষ্টিগুণ আছে সে বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা জরুরি। কিন্তু মুশকিল হলো মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সুষম খাদ্য নির্বাচন একসাথে হাত ধরাধরি করে যায় না। পারিবারিক সংস্কৃতি, জিহŸার স্বাদ এবং তৃপ্তি -এ  বিষয়গুলো এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে, খাবার সময় পুষ্টি জ্ঞান সেখানে গৌণ হয়ে যায়।


আমাদের মোটামুটি একটা ধারণা আছে পুষ্টি কী এবং কোন কোন খাবার থেকে কী কী পুষ্টিগুণ পাওয়া যায়। পুষ্টি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে গৃহীত খাদ্য শোষিত হয়ে শরীরে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করে, শরীরের বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণ করে এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এসবের ব্যবহারিক দিক কী? সে কারণে ফলিত পুষ্টির জ্ঞান থাকাও আবশ্যক। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সঠিক খাদ্য নির্বাচন, নির্বাচিত খাবার সঠিক উপায়ে রান্নার জন্য প্রস্তুতকরণ, সঠিক উপায়ে রান্না করা এবং সঠিক উপায়ে খাবার গ্রহণ -এসবের যোগফলই  হলো ফলিত পুষ্টি। কোন্ কোন্ খাবার থেকে তাপ ও শক্তি পাওয়া যায়? ভাত, রুটি, আলু, চিনি, তেল, মাখন, ঘি, মধু, বাদাম থেকে তাপ ও শক্তি পাওয়া যায়। আমিষ জাতীয় খাবার যেমন - মাছ, মাংস, ডাল, দুধ, ডিম, শরীর বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে। ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার যেমন -শাকসবজি, আম, পেঁপে, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, আমলকি, আমড়া, লেবু, গাজর, মিষ্টিকুমড়া, দুধ, ডিম, কলিজা রোগ প্রতিরোধ করে।


আমাদের মাঝে যারা রান্না-বান্নায় সকল সময় সম্পৃক্ত থাকেন তাদের আরও কিছুটা জ্ঞান থাকলে ভালো হয় বৈকি। যেমন- শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে আ্যন্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নেই। শাকসবজিতে যে পরিমাণ ভিটামিন থাকে তা দিয়েই আমাদের দিনের চাহিদাপূরণ করা সম্ভব। শাকসবজির ভিটামিন ধরে রাখার সর্বোত্তম উপায় হলো ভাপে বা প্রেশার কুকারে রান্না করা। সবজি কাটতে হবে ধারালো বটি বা ছুরি দিয়ে। ভোঁতা ছুরি/বটি দিয়ে কাটলেও ভিটামিন নষ্ট হয়। শাকসবজি কাটতে হবে বড় বড় টুকরা করে, এতে আলো ও বাতাসের সংস্পর্শে ভিটামিনের ক্ষয় কম হয়। ভিটামিন সি, ভিটামিন বি ও খনিজ উপাদান এর অপচয় রোধে সবজির খোসা ছাড়ানো ও টুকরা করার পর আবার ধোয়া যাবে না, পানিতে ভিজিয়ে রাখা যাবে না। খোসাসহ সবজি রান্না করলে পুষ্টি উপাদান বেশি মাত্রায় ধরে রাখা যায়। পুষ্টির উপাদান ধরে রাখতে রান্নার ঠিক আগের মুহূর্তে কাটতে হবে। ঢাকনা দেওয়া পাত্রে রান্না করা ভালো। এতে রান্না দ্রæত হয়, খাবার অক্সিজেনের সংস্পর্শে কম আসে বলে ভিটামিন নষ্ট কম হয়। রান্নায় যতটা সম্ভব কম পানি ব্যবহার করতে হবে। দীর্ঘ সময় ও উচ্চতাপে রান্নায় শাকসবজির ভিটামিন নষ্ট হয়। পরিমাণ মতো তেল দিয়ে শাকসবজি রান্না করলে ক্যারোটিন অক্ষুণœ থাকে। সেই সঙ্গে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোও সহজেই দেহে শোষিত হয়। একটু চেষ্টা করলেই পুষ্টি উপাদান রক্ষা করে রান্না করা সম্ভব।


জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা অনুযায়ী একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির দিনে ১০০ গ্রাম শাক, ২০০ গ্রাম সবজি এবং ১০০ গ্রাম ফল গ্রহণ করা উচিত। জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা  অনুযায়ী একজন মানুষের প্রতিদিন ২৪০০ কিলোক্যালরি খাবার গ্রহণ করতে হবে। তবে মানুষের বয়স, লিঙ্গ, ওজন, উচ্চতা, পেশা এবং তিনি শারীরিক পরিশ্রম করেন কি না ইত্যাদি বিষয়ের উপর নির্ভর করে, তিনি কী পরিমাণ কিলোক্যালরির খাবার গ্রহণ করবেন। এই মোট কিলোক্যালরির ৬০% কার্বহাইড্রেট থেকে, ১৫% প্রোটিন এবং ২৫% ফ্যাট/চর্বি থেকে গ্রহণ করতে হবে। তার খাবার গ্রহণের পরিকল্পনা হতে পারে নিম্নরূপ: [Ref: Food Composition Table for Bangladesh]
সকালের খাবার - আনুমানিক ৭০ গ্রামের ২টি আটার রুটি (২০০ কিলোক্যালরি), ২০০ গ্রামের ১ বাটি মিশ্র সবজি (১০০ কিলোক্যালরি), ৬০ গ্রামের ১টি ডিম (৭০ কিলোক্যালরি), ৫০ গ্রাম ওজনের একটি কলা (৫০ কিলোক্যালরি), চিনিসহ ১ কাপ রঙ চা (২৯ কিলোক্যালরি)। সকাল ১১টার পর ৫০ গ্রাম ওজনের চীনাবাদাম (২৯৩ কিলোক্যালরি) খেতে পারেন। [মোট-৭৪২ কিলোক্যালরি]


দুপুরের খাবার - ২০০ গ্রাম ওজনের ১ বাটি ভাত (২০০ কিলোক্যালরি), ১০০ গ্রাম ওজনের ২ পিছ মুরগির মাংস (১২৮ কিলোক্যালরি), ২০০ গ্রাম ওজনের ১ বাটি শাক (১০০ কিলোক্যালরি), ২০০ গ্রামের ১ বাটি মিশ্র সবজি (১০০ কিলোক্যালরি), ২০০ মিলি. ওজনের ১ বাটি ঘন ডাল (১৮০ কিলোক্যালরি) খাওয়া যেতে পারে। [মোট-৭০৮ কিলোক্যালরি]
বিকালের নাশতা - ২৫ গ্রাম ওজনের ১ বাটি মুড়ি (৯০ কিলোক্যালরি), ৫০ গ্রাম ওজনের ১ বাটি ছোলা (১৮০ কিলোক্যালরি), ১০০ গ্রাম ওজনের কয়েক টুকরা পেয়ারা (৬৩ কিলোক্যালরি), ৫০ গ্রাম ওজনের ১টি কলা (৫০ কিলোক্যালরি), চিনিসহ ১ কাপ রঙ চা (২৯ কিলোক্যালরি) পান করতে পারেন। [মোট-৪১২ কিলোক্যালরি]
রাতের খাবার - ২০০ গ্রাম ওজনের ১ বাটি ভাত (২০০ কিলোক্যালরি), ৮০ গ্রাম ওজনের ১ পিছ মাছ (১০০ কিলোক্যালরি), ২০০ গ্রামের ১ বাটি মিশ্র সবজি (১০০ কিলোক্যালরি), ১৫০ মিলি. ওজনের ১ কাপ দুধ (১০০ কিলোক্যালরি) এবং ১১৫ গ্রাম ওজনের মৌসুমি ফল (৩৮ কিলোক্যালরি) খেতে পারেন। [মোট-৫৩৮ কিলোক্যালরি]


এতক্ষণ ধরে যে খাবারের কথা উল্লেখ করা হলো তার মধ্যে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, অত্যন্ত লোভনীয় খাবার ফাস্টফুড নেই, নেই কোমল পানীয়! আরও মজার খাবার সিঙ্গারা, পুরি, আলুর চপ, সমুচা, ফুসকা, ডিমের চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু, ডালপুরি কোথায়? আর মজার সব খাবার যে তেলে ভাজা হয় সেই তেল বারবার উত্তপ্ত করা হয়। একই তেল বারবার ব্যবহার করলে উচ্চ মাত্রায় এলডিহাইড তৈরি হয়, যা ক্যানসার, হৃদরোগ, আলঝেইমার, স্মৃতিভ্রংশ এবং পারকিনসন রোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। এছাড়া, রান্নার সময় ফ্রিজ থেকে বের করেই সরাসরি উচ্চ তাপমাত্রায় অনেকক্ষণ ভাজা হলে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদান (Heterocyclic Amines) খাদ্যের মধ্যে তৈরি হয়। একইভাবে Grill (গ্রিল) করা খাবারেও পলিএরোমেটিক হাইড্রোকার্বনসমূহ (পি.এ.এইচ) তৈরি হয়, যা প্রোস্টেট ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একই তেল বারবার ব্যবহার করলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ট্রান্স ফ্যাট সম্পৃক্ত ফ্যাট থেকে অধিক ক্ষতিকর, কারণ এরা একদিকে যেমন দেহে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ হ্রাস করে। ট্রান্স ফ্যাট হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার এবং লিভারজনিত রোগসমূহের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে আমরা যদি পুষ্টিকর খাবার খেয়ে সুস্থ থাকি তাহলে শরীর ভালো থাকবে, মনও ভালো থাকবে। আমরা কাজ করতে শক্তি পাবো, যা আমাদের সুন্দর, সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল ভবিষৎ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। সবশেষ যে কথাটি বলব, তা হলো খাবার গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে - এ কথা সত্য; কিন্তু কী খাবো? জেনেশুনে এবং বুঝে খাবো। জিহŸাকে সংবরণ করব। জিহ্বাকে সংবরণ করতে পারলে সুষম খাবার যেমন খেতে পারা যাবে তেমনি জিহ্বার যখন তখন বা যেখানে সেখানে অযাচিত ব্যবহারের কারণে জীবনের অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকেও মুক্তি মিলবে।

পরিচালক, বালাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মোবাইল : ০১৭২৭৫৩১১০০, ই-মেইল : kaziabulkalam@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
প্রাণী ও পোলট্রিসম্পদ ঃ পুষ্টি উন্নয়নের সম্ভাবনা

ড. নাথুরাম সরকার১ ড. গৌতম কুমার দেব২


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নলালিত সোনার বাংলা বিনির্মাণে আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশ। আগামী ২০৪১ সালের উন্নত দেশে উপনীত হওয়ার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন।  উন্নত দেশে উপনীত হওয়ার জন্য সকল সেক্টরের সুষম উন্নয়ন প্রয়োজন। সরকার সেই লক্ষ্যে   কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।  কর্মপরিকল্পনগুলোর মধ্যে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ভিশন ২০২১,  বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ (এসডিজি), ভিশন ২০৪১ এবং ডেল্টা প্লান অন্যতম। সরকারের ভিশন ২০২১ অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ৮৫% জনগণের জন্য প্রাণিজ পুষ্টি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এসডিজিতে উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়া এবং প্রতিটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন ন্যূনতম দ্বিগুণ করা আবশ্যক। বর্তমান সরকারের গৃহীত নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। সেইসাথে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানা ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ দুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। চামড়াসহ বিভিন্ন উপজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।


গবাদিপশু ও পোলট্রি প্রজাতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি
বিগত ২০১০ থেকে ২০২০ সালে দেশে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মুরগি ও হাঁসের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ০.৫৮, ০.৭৪, ০.৯৬, ১.৮৬, ২.৩২ এবং ২.৯০%। বাংলাদেশ ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে চতুর্থ এবং গবাদিপশু উৎপাদনে বিশে^ ১২তম অবস্থান। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তির ২০১৫ সালের তথ্য মতে বাংলাদেশের বøাক বেঙ্গল ছাগল বিশে^ অন্যতম সেরা মাংস ও চামড়া উৎপাদনকারী জাত।


জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ উপখাতের অবদান
স্থির মূল্যের ভিত্তিতে বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের প্রাক্বলিত শতকরা অবদান হচ্ছে ১.৪৩ ভাগ। যা টাকার অংকে প্রায় ৪৬,৬৭৩ কোটি টাকা। প্রাণিসম্পদ খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৩.০৪ ভাগ। জাতীয় জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে কমলেও কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মূল্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান শতকরা ১৩.৪৪ ভাগ।  ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় শতকরা ২.৪৯ ভাগ অর্থাৎ ১.০১ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার সমপরিমাণ টাকা আসে বিদেশে চামড়া ও চামড়া জাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে বাংলাদেশ চামড়াজাত পণ্য হতে ২০২৪.১০ কোটি, মাংস ও মাংসজাত উপজাত হতে ৯.৮৮ কোটি, প্রক্রিয়াজাত তরল দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য হতে ১৫.৯৭ কোটি এবং প্রাণিজাত উপজাত হতে ১২৬.৮১ কোটিসহ সর্বমোট ২১৭৬.৭৭ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।


প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ
এফএও এর সুপারিশ অনুযায়ী একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন ন্যূনতম ২৫০ মিলি দুধ ও ১২০ গ্রাম মাংস এবং বছরে ১০৪টি করে ডিম খাওয়া প্রয়োজন। বর্তমান দেশজ উৎপাদন দুধ, মাংস ও ডিমের ন্যূনতম জাতীয় চাহিদার শতকরা ৭০.২৫, ১০৪.১৫ এবং ৯৯.৮৯ ভাগ সরবরাহ করছে। দেশ এখন মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ৩৬২.০৩, ৩৮৫.৬৩ এবং ২৮৫.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।  


দুগ্ধ শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে দেশে দুধের চাহিদা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেইরি শিল্প বিপুলসংখ্যক বেকার যুবক-যুবতির কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনসহ পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এক টন দুধ উৎপাদন এবং ইহার প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারজাতের সাথে সম্পৃক্ত ৩৭টি শ্রমজীবী পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। বর্তমানে শিশু খাদ্যের জন্য গুঁড়া দুধ আমদানিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ডেইরি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে দেশে শিশু খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব হলে অদূর ভবিষ্যতে দেশে দুধ এবং দুধজাত পণ্য আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। সরকার দেশীয় গবাদি পশুর জাত উন্নয়নের জন্য নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য যে, ডেইরি শিল্পের বিকাশে সরকার বিগত ২০১৮ সাল থেকে দেশে ৫% হারে স্বল্প সুদে প্রতি বছর ২০০ কোটি টাকা করে উদ্যোক্তাগণকে ঋণ প্রদান করছেন। মাংস শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা


দেশে উৎপাদিত মাংসের প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া এবং ৪০ ভাগ যোগান দেয় পোল্ট্রি। বর্তমানে দেশে  বছরব্যাপী হৃষ্টপুষ্টকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে বিদেশে মাংস রপ্তানির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার এফএমডি ও ক্ষুরারোগ মুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, মাংস ও মাংসজাত পণ্যের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ^মানের কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি স্থাপন, গরুর জাত উন্নয়নসহ নানাধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন। উপক‚লীয় চরাঞ্চলগুলিতে ঘাস চাষসহ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যম মহিষ ও ভেড়াগুলোকে হৃষ্টপুষ্টকরণের আওতায় এনে মাংস উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।


পোলট্রি শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা
দেশে উৎপাদিত মোট ডিমের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে বাণিজ্যিকভাবে মুরগি থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আসে দেশী মুরগি ও হাঁস থেকে। মানুষের আর্থিক উন্নয়নের ফলে ডিম ও মাংস খাওয়ার পাশাপাশি মুরগির মাংসভিত্তিক ফাস্ট ফুড গ্রহণের প্রবণতা উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দেশে ডিম ও ব্রয়লার মাংসের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করছে। দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় বর্তমানে দেশে পোলট্রি শিল্প একটি কাঠামোয় দাঁড়িয়েছে। দেশে চাহিদার সমপরিমাণ ব্রয়লার ও লেয়ার বাচ্চা উৎপাদন সক্ষমতা, খাদ্য উৎপাদন কারখানা/শিল্প গড়ে উঠা, খামারিদের আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনাজনিত জ্ঞান অর্জন, বাণিজ্যিক লেয়ারের ডিম ও ব্রয়লারের মাংস খাওয়ার প্রতি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পোল্ট্রির রেশন সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ খাদ্য উপাদান দেশে উৎপাদনসহ পোলট্রি শিল্পের সাথে সংযুক্ত খাতগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে করে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।


প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও করোনা মহামারী
বিশ^ব্যাপী চলমান কোভিড-১৯ মহামারী এর প্রভাবে ডেইরি, পোলট্রি, মাংস, খাদ্যসহ অন্যান্য শিল্পগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে কোভিড সংকট শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ উৎপাদিত পণ্য দুধ, ডিম ও মাংস এবং এদের থেকে উৎপাদিত পণ্য ও উপজাতসমূহ সরবরাহের সাপ্লাই চেইন ভেঙে যায়। ফলশ্রæতিতে দুধ ও ডিমের বাজারমূল্য হঠাৎ করে কমে যায়। এতে করে প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক খামারি তাদের খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। যার প্রভাব পরবর্তীতে দেশের পোলট্রি ব্রিডিং খামারসহ পশু ও পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোভিডের পাশাপাশি উপকুলীয় অঞ্চলে আম্ফান এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে বন্যা হচ্ছে। যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব প্রাণিসম্পদ খাতে প্রতীয়মাণ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল রুম খোলার মাধ্যমে  প্রাণিসম্পদ খাতের নানাবিধ সংকট মোকাবেলা এবং প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ (দুধ, মাংস,  ডিম) সচল রাখার লক্ষ্যে দুধ, মাংস, ডিমসহ পোল্ট্রি ও পশু খাদ্য/বিভিন্ন উপকরণ, উৎপাদন, পরিবহণ এবং বাজারজাতকরণে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। পোলট্র্রি ও দুগ্ধ শিল্পে সহায়তার জন্য সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে।


খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুষম পুষ্টি সরবরাহ, আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কৃষি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনের লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমান সরকারের সময়ে বিগত দশ বছরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আঞ্চলিক কৃষি, কৃষক ও আবহাওয়াকে সম্পৃক্ত করে পরিবর্তনশীল প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অঞ্চলভিত্তিক বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনার আলোকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান সমুন্নত রাখতে সম্ভবপর হবে।

১মহাপরিচালক ২ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা,বায়োটেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার,  ঢাকা ১৩৪১, ফোন : ৭৭৯১৬৭৬, ই-মেইল : ফম@নষৎর.মড়া.নফ

 

বিস্তারিত
নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি উৎপাদনে করণীয়

মোঃ জিয়াউল হক
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। অর্থনৈতিক খাত হিসেবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপিতে স্থির মূল্যে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৪.২৩ ভাগ তন্মধ্যে কেবল শস্য ও শাকসবজি উপখাতের অবদান শতকরা ৭.৫১ ভাগ। দেশের মোট শ্রমশক্তির শতকরা ৪০.৬২ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত (অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮)।


মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা এবং উৎপাদন প্রযুক্তির সাথে সাথে বিপণন কৌশলের উন্নয়ন অনস্বীকার্য। তাই যে কোন ফসল উৎপাদনে উত্তম কৃষি চর্চা  অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদভাবে উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থায় কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে দামের ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজার সংযোগ  সুবিধা সৃষ্টি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি পাইকারি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি এবং বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পণ্যের গ্রেডিং, ওয়াশিং, প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করাও প্রয়োজন।


বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুল উৎপাদন শুরু হয় ১৯৮৩ সালে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসরা গ্রামে। বর্তমানে বাংলাদেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৫,৬৬৫ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে (ডিএই ২০১৭-১৮)। ফুল উৎপাদন ও বিপণনে প্রায় ১.৫০ লক্ষ মানুষ সরাসরি নিয়োজিত রয়েছে। ফুল শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে ফুলের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে।


বিশ্বে বর্তমানে ফুলের বাজারমূল্য প্রায় ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্যে এ খাতে দেশের অবদান মাত্র শতকরা ৩.৫ ভাগ। আশা করা যায় আগামীতে বৈশ্বিক ফুলের বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের পরিবেশ, জলবায়ু ও মাটি ফুল চাষের জন্য উপযোগী বিধায় এ খাতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে প্রায় ১৩ জাতের ফুল উৎপাদিত হচ্ছে। তন্মধ্যে গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, গাঁদা, গøাডিওলাস, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা ও চন্দ্রমল্লিকা বেশি উৎপাদিত হচ্ছে।


অপরদিকে দেশের মোট ফসলি জমির প্রায় ৫% অর্থাৎ আবাদযোগ্য জমির প্রায় ১০% সবজি উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অল্প পরিমাণ জমি থেকে ক্রমবর্ধিষ্ণু বিপুল জনগোষ্ঠীর সবজি চাহিদা মেটানো হচ্ছে। বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ১২.৫২ লক্ষ হেক্টর জমি থেকে ২৬৮.১৬ লক্ষ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। এ ছাড়াও ৭ লাখ ২৯ হাজার জমি হেক্টর থেকে ১২৩.৮৯ লক্ষ ফল উৎপাদিত হয়েছে। যদিও সবজিভিত্তিক পুষ্টি গ্রহণের উপাত্ত ও পরিমাণে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: গড়ে দৈনিক পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির গ্রহণ করা প্রয়োজন ২০০-৩০০ গ্রাম। আর গ্রহণ করছে মাত্র ১০০-১৬৬ গ্রাম। সেক্ষেত্রে সবজির উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় আরও দ্বিগুণের বেশি বাড়াতে হবে।


দেশে প্রায় ১০০টি জাতের সবজি উৎপাদন হচ্ছে। আমাদের দেশে প্রায় ১ কোটি ৬২ লক্ষ কৃষক পরিবার রয়েছে।  প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবার কম বেশি সবজি চাষ করছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (ঋঅঙ) এর তথ্য মতে গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে বাংলাদেশের ৫০ জাতের সবজি রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে  ৬৫০ কোটি ৪১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার সবজি রপ্তানি হয়েছে এবং রপ্তানির পরিমাণ প্রতি বছর বাড়ছে। দেশের রপ্তানিকৃত সবজির প্রায় ৬০% মধ্যপ্রাচ্যে এবং বাকি ৪০% ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে যাচ্ছে।  বিদেশে বাংলাদেশের সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা চাহিদার মাত্র ২-৫ শতাংশ রপ্তানি করতে পারছে।


বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার রপ্তানিযোগ্য ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কার্যকর বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।   নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি উৎপাদনে করণীয়সমূহ
১. সারাদেশে ফুল ও সবজি উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কলাকৌশল বিষয়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা/উপসহকারী  কৃষি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কৃষককে জমি নির্বাচন, জমি তৈরি, ফসলের পরির্চযা, উত্তোলন ইত্যাদি বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে;
২. দেশীয় গবেষণাগার অথবা প্রয়োজনে আমদানি করে উন্নত জাতের বীজ ও চারা সরবরাহকরণ, বীজ ও চারা সংরক্ষণের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং তা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে;
৩. পরিমিত মাত্রায় সার ও বালাইনাশক প্রয়োগে সচেতনতা  বৃদ্ধি করে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান এবং ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে;
৪. ফুল ও সবজি উৎপাদনে সেচের পানি বিতরণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য ফসলে যে পদ্ধতিতে সেচ প্রয়োগ করা হয় ফুল ও সবজিতে তা করা সম্ভব হয় না। ফুল ও সবজিতে ড্রিপ এবং স্প্রিংকলার সেচ পদ্ধতিই সঠিক সেচ প্রযুক্তি। স্প্রিংকলার ও ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে প্রতিটি গাছের গোড়ায় প্রয়োজনীয় ও পরিমিত সেচ প্রয়োগ করা যায়। ফলে পানির অপচয় হয় না। অপরদিকে, ড্রিপ ও স্প্রিংকলারের সাথে পরিমিত মাত্রায় সার মিশিয়ে ফার্টিগেশন করা যাবে। তাই নিরাপদ ফুল ও সবজি উৎপাদনে ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ পদ্ধতির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে;
বিএডিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান বর্তমান কৃষি সচিব জনাব মোঃ নাসিরুজ্জামান এর নির্দেশনায় “যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলায় ফুল ও সবজি উৎপাদন সম্প্রসারণে ড্রিপ ইরিগেশন” শীর্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি উৎপাদনের কার্যক্রম ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করার ফলে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি উৎপাদিত হচ্ছে এবং কৃষক তার সুফল পাচ্ছে।     
৫. নিরাপদ ফুল ও সবজি উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো অর্থাৎ পলি হাউজ নির্মাণ প্রয়োজন। উক্ত পলি হাউজে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অতি বেগুনি রশ্মি, ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ হতে রক্ষা করে শীত গ্রীষ্মসহ সব মৌসুমে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। ফগার ইরিগেশনের মাধ্যমে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে গুণগতমান অক্ষুণœ রেখে ফলনও বৃদ্ধি করা যাবে। “পলিশেডে পানি সাশ্রয়ী সেচাবাদ, খাবার হবে পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ” এছাড়াও পলি হাউজে ভার্টিক্যাল হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ভূমির উপর ৫ স্তরে ফুল ও সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হবে;

৬. ফুল ও সবজি সংরক্ষণের পর রপ্তানির লক্ষ্যে প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সাময়িক সংরক্ষণ করা হলে একদিকে অপচয় কমবে, অপরদিকে উৎপাদনকারীর ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করে সবার জন্য বছরব্যাপী পুষ্টি নিশ্চিত করা যাবে। ফলে ফুল ও সবজি সর্বোচ্চ বাজারমূল্য প্রাপ্তি ও রপ্তানি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং পোস্ট হারভেস্ট লস কমে যাবে। উক্ত কার্যক্রমের জন্য হারভেস্টিং ইয়ার্ড, গ্রেডিং, ওয়াশিং, এসেম্বল ও প্রসেসিং সেন্টার নির্মাণ করতে হবে;
৭. উৎপাদিত ফুল ও সবজি সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে  ২৫-৪০% নষ্ট হয় এবং ভরা মৌসুমে ফুল ও সবজির দাম কমে যায়। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন প্রকার শীতলীকরণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সংগৃহীত ফুল ও সবজি রপ্তানির পূর্ব পর্যন্ত কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি  নিশ্চিতকরণের জন্য স্বল্প মেয়াদে সংরক্ষণ এবং কুলিং পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে;
৮. রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের শহরগুলোতে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি বিক্রয়ের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা  কৃষক বাজার প্রতিষ্ঠা করতে হবে;
৯. নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য ফুল ও সবজি চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের সহজ শর্তে স্বল্পসুদে  কৃষি ঋণের ব্যবস্থা অথবা সরকারি পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে   সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে;
১০. নিরাপদ ফুল ও সবজি উৎপাদনে এবং খাদ্য মানের উপযোগিতা, উপকারিতা, বিক্রয় বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা করতে হবে;
১১. কৃষিজাত দ্রব্যের স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণে হিমায়িতকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণসহ বিভিন্ন পদ্ধতির সংরক্ষণ ব্যবস্থা করার ফলে সংরক্ষিত কৃষিজাত পণ্য এখন সারা বছরব্যাপী স্থানীয় বাজারে বিক্রয়সহ বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগের ফলে শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে আগামী দশকটিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে শতকরা ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ অংশীদার হবে বলে আশা করা যায়। উল্লিখিত পরিমাণ প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতি অর্জনের জন্য সাধারণ শিল্প ও কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের সরকারি পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য পলিসিগত পরিবর্তন এনে কৃষি শিল্প উদ্যোক্তা/রপ্তানিকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।য়

প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), বিএডিসি, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭১৮৭৮১৯৭৯, ই-মেইল: aeirigation 2bade@gmail.com

 

বিস্তারিত
কৃষিতেই হবে সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ

কৃষিবিদ ড. মোঃ আবদুল মুঈদ

১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। বিশ্ব খাদ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য Grow, Nourish, Sustain. Together. Our Actions are our Future’. এর ভাবানুবাদ “সবাইকে নিয়ে একসাথে  বিকশিত হোন, শরীরের যতœ নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ”। যা অত্যন্ত যৌক্তিক ও অর্থবহ। প্রতিবারের তুলনায় এবারের খাদ্য দিবসের প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। একবিংশ শতাব্দীর আজকে এই সময়ে দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্ব সম্মুখীন এক ভয়াবহ অদৃশ্য শত্রæ কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসজনিত রোগ করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ে। করোনার মহামারীর তাÐব থেকে মুক্তি পায়নি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও। করোনার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক মহাসংকট। বাড়ছে খেতে না পাওয়া মানুষের সংখ্যা। এ দিকে বিশ্বজুড়ে করোনা রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়ি়য়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে দিনে দিনে মৃত্যুর মিছিল যখন বাড়ছে, ঠিক তখন এই রোগ হতে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ঢালরূপে আবির্ভূত হয়েছে বাংলার কৃষি। সেই ঢাল হাতে নিপুণ সৈনিক বাংলার কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বস্তরের কর্মচারীবৃন্দ। আর এই পুরো কর্মযজ্ঞের সফল পরিচালক বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয়, যার মূল চালিকা আসনে বসে আছেন এই কৃষি পরিবারেরই একজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব মন্ত্রণালয়ের মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, এমপি।


করোনাভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে, তারই জের ধরে বাড়ছে খেতে না পাওয়া মানুষের সংখ্যা। জেনেভায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য পরিকল্পনার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা ১৩ কোটি ৫০ লাখ। করোনার প্রকোপে সংখ্যাটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থাৎ, প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এ বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে   গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ প্রদান করেন “এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে”। এই নির্দেশনাকে পালনের জন্য দেশের এই মহামারীতে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর পদক্ষেপগুলো রীতিমতো বিশ্ব নজির হিসেবে ইতোমধ্যেই সমাদৃত হয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে খেটে খাওয়া, হতদরিদ্র ও ভাসমান মানুষেরা। এদের কথা মাথায় রেখে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সারাদেশে নিম্নআয়ের মানুষদের ১০ টাকা কেজি দরে ৯০ হাজার টন চাল দেওয়া হয়েছে।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা মোকাবেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ছয় মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সারা দেশে অতিরিক্ত সাড়ে ৬ কোটি টাকা ও ১৩ হাজার টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। এসব চাল ও টাকা ত্রাণ হিসেবে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় ১২ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা এবং প্রায় ৪৬ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। সরকারি এই সমস্ত কার্যক্রমে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের সকল পর্যায়ের কর্মচারীরা টেকসই সুষম খাদ্য উৎপাদন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি পণ্য উৎপাদনে যতœ ও সতর্কতা এবং সর্বোপরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করোনার বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে চার শতাধিক ডিএই কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। বগুড়া জেলার উপপরিচালকসহ মোট দশ জন করোনায় ইন্তেকাল করেছেন। তবুও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একটি মুহ‚র্তের জন্যও কৃষকের পাশ ছাড়েননি।


বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় খাদ্য সংগ্রহের কাল হিসেবে পরিচিত বোরো মৌসুমের প্রায় শতভাগ ধান করোনাকালেই কর্তন সম্পন্ন হয়েছে দেশজুড়ে। আসন্ন আমনের বীজতলা প্রস্তুতেও ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। করোনার  মধ্যে আবার “মড়ার উপর  খাঁড়ার ঘা” হিসেবে হয়ে গেল সামুদ্রিক ঝড় আম্ফানের তাÐব। এই ঝড়ের তাÐবে বাংলাদেশের প্রধান ফল মৌসুমে যেসব ফল উৎপাদিত হয় যেমন আম, কাঁঠাল, লিচুসহ অন্যান্য ফলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এলাকাভিত্তিক ভিন্ন হলেও গড়ে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ আম ও লিচুর ফলন নষ্ট হয়েছে। এতকিছুর পরও এবার বাংলাদেশ ৭ (সাত) কোটি টন বার্ষিক শস্য উৎপাদনের    মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ধান ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩য়, পাট উৎপাদনে ২য়, আলু ও আম উৎপাদনে ৭ম স্থানের পাশাপাশি ইলিশ উৎপাদনে ১ম ও মাছ উৎপাদনে ২য় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন দানাদার শস্য ধান উৎপাদনে বিশ্বে ৩য় স্থান অর্জনকারী দেশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন চাহিদা ছিল ৩.৫০ কোটি টন, সেখানে আমরা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি ৩.৬৪ কোটি টন। এই উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের কারণেই এখন আমাদের ১৯.৩ লক্ষ টন ধারণক্ষমতার মধ্যে ইতোমধ্যেই ১২.৬৫ লক্ষ টন মজুদ করা সম্ভব হয়েছে। কৃষি নির্ভর এই বাংলাদেশ যেন করোনাকালীন সময়ে কোনোরূপ খাদ্য সংকটে না পড়ে তার পূর্ণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩.২৯৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে ৩৬.৪৫ লক্ষ মেট্রিক টন, আমন ৫৮.৯৫ ২৯৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১৫৩.৮ লক্ষ মেট্রিক টন। বিশ্ব খাদ্য সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশের এই অর্জন বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আর এই সফলতা সম্ভব হয়েছে বাংলার নায়ক কৃষক, কৃষি মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।


যেকোন দুর্যোগকালে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম হয়ে বেঁচে থাকাতে প্রয়োজন পুষ্টিকর খাদ্য। যে কোনো খাবার খেয়ে পেট ভরানো যায়, কিন্তু তাতে দেহের চাহিদা মিটিয়ে সুস্থ থাকা যায় না। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতি পূরণ হলেও পুষ্টি সমস্যা অনেক বড় আকারে বিরাজিত রয়েছে। ফলে এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পুষ্টিহীনতার কারণে নানা ধরনের রোগের শিকার হয়ে অহরহ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার উপরে এবার যোগ হয়েছে করোনার প্রভাব। এসমস্ত সমস্যা মোকাবেলায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন কার্যক্রম  গ্রহণ করেছেন। ২০১৮-১৯ সালের হিসাব মতে বাংলাদেশে মোট ৭ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফলের আবাদ হয়েছিল।  উৎপাদন হয়েছিল ১২১.৫২ লক্ষ মেট্রিক টন। এ বছর ২০১৯-২০ সালে সেই লক্ষমাত্রা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফলের আবাদ এবং ১২৩.৮৯ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে।


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে গণভবন প্রাঙ্গণে একটি ফলদ, একটি বনজ এবং একটি ঔষধি গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে সারাদেশে ১ কোটি চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। সমসাময়িককালে করোনাকালীন মহামারী ও আম্ফান ঝড়ের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পূরণে কৃষি মন্ত্রণালয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপটি নিয়েছে সেটি হলো,তার আওতাধীন সকল দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শক্রমে দশটি (১০) সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করেছেন। এর মধ্যে  অন্যতম হচ্ছে, মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য পরিবহণে দেশের বিভিন্ন এলাকায়  ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহণের অবাধে যাতায়াত নির্বিঘœ করা; পরিবহণের সময় যাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর মাধ্যমে কোনরূপ হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; বিআরটিসির ট্রাক ব্যবহারে উদ্যোগ গ্রহণ; স্থানীয়ভাবে ব্যাংকের লেনদেনের সময়সীমা বাড়ানো; পার্সেল ট্রেনে মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য পরিবহণের আওতা বাড়ানো, হিমায়িত ওয়াগন ব্যবহার করা যায় কিনা তা নির্ধারন; ফিরতি ট্রাকের বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল হ্রাস; ত্রাণ হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে আম, লিচুসহ মৌসুমি ফল অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নিকট অনুরোধ জানানো; অনলাইনে এবং ভ্যানযোগে ছোট ছোট পরিসরে কেনাবেচার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ; প্রাণ, একমি, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যারা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে জুস, ম্যাঙ্গোবার, আচার, চাটনি প্রভৃতি তৈরি করে,তাদেরকে এবছর বেশি বেশি আম-লিচু কেনার অনুরোধ জানানো ও মৌসুমি ফলে যেন কেমিক্যাল ব্যবহার করা না হয় সেজন্য জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা, আম্ফান ঝড়ে ঝরে পরা আমকে রক্ষা করতে স্টিপিং পদ্ধতিতে কাঁচা আম সংরক্ষণ বিষয় সচেতনতা বৃদ্ধি ও এ সংক্রান্ত লিফলেট বিতরণ। সুপারিশগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ইতোমধ্যেই  বাস্তবায়নরে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পত্রজারীসহ আদেশ প্রদান সম্পন্ন করেছেন। আশা করা যায়, ধানের মতো আমাদের আরেক প্রধান কৃষি পণ্য মৌসুমি ফল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণেও কৃষি মন্ত্রণালয় সফল হয়েছে।


কৃষিবান্ধব এই সরকার বরাবরই মনে করেন, যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় কৃষি হবে প্রধান রক্ষাকবচ হাতিয়ার। সমসাময়িক সময়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার পর্যায়ে রয়েছে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিকায়ন কর্মসূচি। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০২০ (তিন হাজার বিশ) কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫১ হাজার ৩০০টির মতো কৃষি যন্ত্রপাতি প্রকৃত কৃষকদের মাঝে বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ‘যন্ত্রের মাধ্যমেই হবে আগামীর কৃষি’ এবং‘কৃষিতেই হবে সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ’ এই প্রত্যয় নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২০ সফল হোক এটাই আমাদের অঙ্গীকার।

 

মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, ফোন : ৯১৪০৮৫০, ই-মেইল : dg@dae.gov.bd

 

 

বিস্তারিত
মুজিববর্ষে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা : শূন্য চাষ পদ্ধতি

ড. মো. আব্দুল মালেক১ ড. মো. আজিজুল হক২

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দেশ আজ  দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে দেশের মানুষকে এখন আর ক্ষুধায় না খেয়ে থাকতে হয় না। তবে চাহিদার তুলনায় ভোজ্যতেলের মোট দেশজ উৎপাদন অনেক কম হওয়ায় প্রতি বছর ঘাটতি মোকাবেলায় বিদেশ হতে ভোজ্যতেল আমদানি করতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। দেশে ভোজ্যতেলের মূল উৎস হলো সরিষা এবং সামান্য পরিমাণে সূর্যমুখী, সয়াবিন ও তিল এবং রাইস ব্রান যা থেকে সর্বমোট ৫.০ লক্ষ টনের কাছাকাছি ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। এ হিসেবে দেখা যাচ্ছে দেশের প্রয়োজনীয় ভোজ্যতেলের ঘাটতি থাকে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র ৪.০ শতাংশ তেলফসল আবাদে ব্যবহৃত হয়। এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে আমাদের এখনই প্রয়োজন তেল ফসলের চাষাবাদ বৃদ্ধি করে তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া।


বাংলাদেশের ধান নির্ভর রোপা আমন-পতিত-বোরো শস্য বিন্যাসটি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বিগত প্রায় এক দশকের ও বেশি সময় হতে দেশে স্বল্প জীবনকালের আমন ধান যেমন বিনা ধান-৭ ও ব্রি ধান-৩৩ এবং পরবর্তীতে বিনা ধান-১৬, বিনা ধান-১৭, ব্রি ধান-৭১ ও ব্রি ধান-৭৫ এবং সম্প্রতি ব্রি ধান-৯০ ও বিনাধান-২২ উদ্ভাবিত হয়েছে। স্বল্প জীবনকালের আমনের এ জাতগুলো কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হওয়ায় রোপা আমন-পতিত-বোরো শস্য বিন্যাসে স্বল্প  জীবনকালের আমন ধান সংগ্রহের পর স্বল্প জীবনকালের অথচ উচ্চফলনশীল সরিষা জাত বিনা সরিষা-৪, বিনা   সরিষা-৯ ও বিনা সরিষা-১০, বারি সরিষা- ১৪,  বারি    সরিষা- ১৫ এবং বারি সরিষা-১৭ চাষ করা হচ্ছে ফলে প্রচলিত আমন ধান-পতিত-বোরো ধান শস্য বিন্যাসটি পর্যায়ক্রমে রোপা আমন-সরিষা-বোরো শস্যবিন্যাসে রূপান্তরিত হচ্ছে। প্রচলিত শস্য বিন্যাসটিকে সম্পূর্ণ রূপে রোপা আমন-সরিষা-বোরো ধান শস্য বিন্যাসে রূপান্তরিত করতে হলে বাস্তবতার নিরিখে সরিষা চাষাবাদ পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। দেশে বর্তমানে চাষকৃত স্বল্প জীবন কালের রোপা আমন ধানের জাতসমূহ সংগ্রহের পর প্রচলিত পদ্ধতিতে জমি প্রস্তুত সরিষা চাষ করতে হলে জমি সম্পূর্ণ জো অবস্থায় আসার পর ভালোভাবে শুকিয়ে বীজ বপন করতে হয়, কারণ জো অবস্থায় আসার আগেই জমি চাষ দিলে এবং মাটির বেশি আর্দ্রতায় বীজ বপন করলে অংকুরোদগম ঠিকভাবে হলেও পরবর্তীতে সবিষার বৃদ্ধি খুবই ধীর গতিতে হয়। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে এ পদ্ধতিতে সরিষা চাষ করা সম্ভব হলেও নিচু এবং ভারি বুনটের মাটিতে আমন ধান সংগ্রহের পর মাটির আর্দ্রতা বেশি থাকায় জমিতে জো আসার পর চাষ দিয়ে সরিষা আবাদ করতে গেলে বিলম্ব হয় বিধায় সরিষা চাষ করা সম্ভব হয় না। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেরিতে বপন করে সরিষা আবাদ করা সম্ভব হলেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না এবং পরবর্তী বোরো ধান চাষের ক্ষেত্রেও চারা দেরিতে রোপণ করতে হয় বিধায় বোরো ধানের ফলন কমে যাওয়াসহ সংগ্রহের সময় ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ফলন হ্রাসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলশ্রæতিতে  কৃষকগণ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া বিগত কয়েক বছরে আমন ধান সংগ্রহকালীন পরিবর্তিত আবওহাওয়াজনিত কারণে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে মাটির আর্দ্রতা প্রায় শতভাগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, ফলে চাষ দিয়ে সরিষা আবাদ করা সম্ভব হয়ে উঠে না বিধায় জমি পতিত রাখতে হয়। তাছাড়া দেশের বরিশাল অঞ্চলের কিছু এলাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত রোপা আমন-পতিত-পতিত শস্যবিন্যাসে রোপা আমন সংগ্রহ পরবর্তী পতিত জমি এবং বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের বোরো-পতিত-পতিত শস্য বিন্যাসে বোরো ধান চাষের পূর্বে পতিত জমিতে শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সরিষা চাষের সুযোগ আছে। উল্লিখিত সমস্যা হতে উত্তরণ কল্পে রোপা আমন ধান সংগ্রহের পর এবং বোরো ধান চাষের পূর্বে বিনা চাষে সরিষা চাষের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।


এ পদ্ধতিতে সরিষা চাষ দেশে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো (বিবিএস) এর তথ্যে দেখা যায় গত ২০১৮ সালে দেশে ৪৬.২১ লক্ষ টন ভোজ্যতেল আমদানিতে ২৭.৭৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কর হয়েছে, যদিও আমদানিকৃত তেলের বড় একটি অংশ শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হয়। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওযায় বিগত কয়েক বছরে এই আমদানিহার পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক ৪০ গ্রাম হারে ভোজ্যতেল প্রয়োজন হলে ২০২১ সালে দেশে ভোজ্যতেলের মোটচাহিদা হবে প্রায় ২৫.০ লক্ষ মেট্রিক টন।


আমরা জানি সরিষার ফলন রাসায়নিক সারে বেশ সাড়া দেয়। তাই শূন্য চাষ পদ্ধতির মাধমে সরিষা চাষে সারের বিভিন্ন মাত্রার প্রভাব পর্যবেক্ষণে বিনা উপকেন্দ্র মাঠ, ঈশ্বরদী, পাবনায় বিনা উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও স্বল্প জীবনকালের সরিষার জাত বিনা সরিষা-৯ ব্যবহার করে একটি পরীক্ষণ সম্পন্ন করা হয়। উল্লেখ্য পরীক্ষণটি ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে স্থাপন করা হয়েছিল, যা সরিষা বপনের উপযুক্ত সময়ের এক মাস পর। পরীক্ষণটিতে রাসায়নিক সারের বিভিন্ন কম্বিনেশনের ফলাফলে দেখা যায় যে, সুপারিশকৃত সকল রাসায়নিক সারের ১০০% প্রয়োগে ১১১৭ কেজি/হে. ফলন পাওয়া যায়। উল্লেখ্য বিলম্বে অর্থাৎ সঠিক সময়ের চেয়ে একমাস পরে বপনজনিত কারণে ফলন আশানুরূপ হয়নি।


উক্ত ফলাফলদ্বারা  প্রতীয়মান হয় যে, শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদে সুষম মাত্রার সার প্রয়োগের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধিসহ সরিষার দেশীয় মোট উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। উপযুক্ত সময়ের চেয়ে প্রায় একমাস পরে  বপনজনিত কারণে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে ২০১৯-২০ মৌসুমে নভেম্বর মাসের প্রথম হতে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে চাষবিহীন জমিতে বীজ বপন করে বিনা প্রধান কার্যালয় খামার এবং উপকেন্দ্র ঈশ্বরদী, মাগুরা, কুমিল্লা ও সাতক্ষীরার মাধ্যমে উপকেন্দ্র গবেষণা মাঠ এবং কৃষকের মাঠে সুপারিশকৃত সকল রাসায়নিক সারের ১০০% তবে ধীরগতিতে দ্রবণশীলটি   এসপি’র পরিবর্তে অধিকতর দ্রæত দ্রবনশীল ডিএপি প্রয়োগের মাধ্যমে জাতটি চাষ করে হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৪৩০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।


শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সার ও সেচ প্রয়োগ : এ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদের ক্ষেত্রে ইউরিয়া সারের এক তৃতীয়াংশ (একরপ্রতি ২০ কেজি) এবং অন্যান্য রাসায়নিক সারের পুরোটাই (একর ডিএপি ৭৫ কেজি, এমওপি ৫০ কেজি, জিপসাম ৫৫ কেজি, জিংকসালফেট ৪ কেজি এবং বোরিক এসিড ৩ কেজি) একত্রে জমিতে প্রয়োগ করে পরে বীজ বপন করতে হবে এবং ইউরিয়ার এক তৃতীয়াংশ (একর প্রতি ২০ কেজি) বীজ বপনের ১৫ দিন পর আর অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া (একর প্রতি ২০ কেজি) ফুল আসা পর্যায়ে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখ্য, শূন্য চাষ পদ্ধতিতে টিএসপির পরিবর্তে ডিএপি ব্যবহার করতে হবে, কারণ টিএসপির তুলনায় ডিএপি দ্রæত দ্রবনশীল। তাছাড়া এ  পদ্ধতিতে সরিষা আবাদের ক্ষেত্রে ফলনে পানি সেচ ও বিশেষ ভ‚মিকা রাখে তাই হালকা  বুনটজনিত কারণে মাটিতে রসের অভাব হলে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায় ও ফুল আসার সময় সেচ প্রয়োগ করতে হবে।


বীজ হার, বপন সময় ও জমি নির্বাচন : একর প্রতি ৩ কেজি বীজ ব্যবহার করতে হবে। ভাল ফলন পেতে হলে উপযুক্ত সময়ে অর্থাৎ কার্তিক মাসের ২য় সপ্তাহ হতে শেষ পর্যন্ত (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ হতে মধ্য নভেম্বর) বীজ বপন করতে হবে। তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের নিচু জমিতে আমন ধান দেরিতে রোপণজনিত কারণে দেরিতে সংগ্রহ হয় বিধায় দুইটি অঞ্চলে জানুয়ারি মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত নাবিতে বপনযোগ্য বিনা সরিষা-৪ ও বিনা  সরিষা-৯ এর বীজ বপন করা যাবে। আরও বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেসব এলাকায় আমন ধান কাটার পর জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকে অর্থাৎ জমিতে হাটলে মাটিতে পায়ের ছাপ পড়ে এমন জমিতে শূন্য চাষে সরিষা আবাদ করতে হবে। তাছাড়া আমন ধান সংগ্রহের পর জমিতে আগাছার উপদ্রব হয় না বা তুলনামূলকভাবে কম হয় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে।


বাণিজ্যিক কৃষিতে প্রভাব : বর্তমান বাণিজ্যিক কৃষিতে শস্যবিন্যাসে ফসলসহ এমন চাষাবাদ পদ্ধতি নির্বাচন করতে হবে যাতে ফসল চাষে লাভ তুলনামূলকভাবে বেশি আসে। এক্ষেত্রে রোপা আমন - পতিত - বোরো শস্য বিন্যাসে শূন্য চাষ পদ্ধতিতে রোপা আমন এবং বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে খুবই কম খরচে সরিষা আবাদ করে কৃষকগণ লাভবান হতে পারেন। কারণ এ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হয়।এ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদে একর প্রতি রাসায়নিক সার প্রয়োগ, প্রয়োজনে একটি সেচ দেয়া এবং পাতা ও  ফলের অল্টারনারিয়া বøাইট রোগ ও জাবপোকা দমনে বালাইনাশক প্রয়োগ এবং সরিষা সংগ্রহ ও মাড়াই বাবদ আনুমানিক ১৩ হতে ১৪ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। একরপ্রতি গড়ে ১২ মণ সরিষার ফলন প্রাপ্তিতে আয় হতে পারে প্রায় ২৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিনাচাষ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদ করে উৎপাদন খরচ বাদে একরপ্রতি প্রায় ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব।
বিনা চাষে সরিষা আবাদের মাধ্যমে দেশীয় সরিষার উৎপাদন তথা ফলন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে রাসায়নিক সার ও সেচ প্রয়োগ এবং বিভিন্ন আন্তঃপরিচর্যা বিষয়ে মাঠপর্যায়ে আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন। শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সরিষা চাষ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাগণকে বিশেষ ভ‚মিকা পালনসহ সংশ্লিষ্ট সরিষা চাষাধীন এলাকায় কৃষক প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মাঠ প্রদর্শনী স্থাপনসহ মাঠ দিবসের আয়োজন করতে হবে।


মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ-২২০২  মোবাইল: ০১৭১২১০৬৬২০, ইমেইল: malekbina@gmail.com   

বিস্তারিত
টেকসই খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা

ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার১ড. সুস্মিতা দাস২  
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নিমিত্তে পুষ্টি সমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক। এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই সম্মিলিতভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশও প্রতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে আসছে। বিশ্ব খাদ্য দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য-
ÒGrow, Nourish, Sustain. Together. Our Actions are our Future”. অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ। বৈশ্বিক খাদ্যপুষ্টির মান উন্নয়ন বিবেচনায় এবারের প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়পোযোগী।


 ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) লক্ষ্যগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়া এবং বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রচিত ১৯৭২ সালের সংবিধানে নাগরিকের পুষ্টি উন্নয়নকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭২ এর সংবিধানে উল্লেখ করা হয় “জনগণের পুষ্টির উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবে”। তাই এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা এবং এসডিজির ২নং অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্য পরিপুরক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সবসময় কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর বাণী  ‘কৃষক বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে তা না হলে বাংলাদেশ বাঁচতে পারবে না।’ এর বহিঃপ্রকাশ আজকের বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা । খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সাথে সাথে বাংলাদেশেকে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। যার গুরুত্ব¡ উপলব্ধি করে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবুজ বিপ্লবের ঘোষণাসহ কৃষি উন্নয়নে বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। জাতির পিতার দূরদর্শী এ সিদ্ধান্তে  বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ কৌশল প্রবর্তনের মাধ্যমে টেকসই কৃষির যাত্রা সূচিত হয়। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়ে কৃষি গবেষণায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবতারনা হয়।  

 
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন যা স্বাধীনতা উত্তরকালে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নেতৃত্বে জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম সমন্বয় সাধনের জন্য বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা   কাউন্সিল গঠন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে আইন ১৯৯৬ সালে পাশের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বর্তমানে নার্স এর শীর্ষ সংস্থা (অঢ়বী ইড়ফু) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড এবং রেশম গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট এর গবেষণা কর্মকাণ্ড সমন্বয় সাধন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।


প্রতিষ্ঠার পর থেকে অন্যান্য সহযোগী কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় সাধন করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছে। এক ও দুই ফসলি জমি অঞ্চল বর্তমানে চার ফসলি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। খাদ্য শস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দশম যা সম্ভব হয়েছে কৃষি গবেষণার নিরলস প্রচেষ্টায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্যের লক্ষমাত্রা ছিল ৪১৫.৭৪ লাখ মেট্টিক টন উৎপাদিত হয়েছে ৪৩২.১১ লাখ মেট্রিক টন। যার ফলে দেশ আজ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে ৩য়, মাছ উৎপাদনে ২য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আলু ও আম উৎপাদনে ৭ম এবং মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ১ম হয়েছে, যা দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।


কৃষি গবেষণায় প্রভূত উন্নতির ফলে বাংলাদেশের কৃষি আজ Subsistence Agriculture (জীবিকানির্ভর কৃষি) থেকে Commercial Agriculture (বাণ্যিজিক কৃষি)-তে রূপান্তরিত হয়েছে। পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক অসংখ্য লাগসই প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ দেশের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে। তাছাড়া পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক গবেষণার ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফলদ ও শাকসবজির সব মওসুমে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন হয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে বর্তমানে সারা বছর বিভিন্ন শাকসবজি ও ফল-ফলাদির চাষ হচ্ছে যা দেশের সার্বিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে ধান বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিক গবেষণার ফলে লবণাক্ততা, খরা, জলমগ্নতা   সহনশীল ও জিংক সমৃদ্ধ ধানসহ অদ্যাবধি ১০৫টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান যেমন- জিংক, আয়রন, প্রোটিন, মিনারেলস্সহ  শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ করছে। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবনে বিশ্বের সর্বাধুনিক বায়োফর্টিফিকেশন ও জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি বিভিন্ন ফসলের ৫৭৯টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৫৫১টি প্রযুক্তিসহ মোট ১১৩০টিরও অধিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
গম ও ভুট্টা গবেষণা  ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে ৩৬টি গমের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। উল্লেখ্য, জিংকসমৃদ্ধ বারি গম-৩৩ পুষ্টি বিবেচনায় উল্লেখযোগ্য। অনুরূপভাবে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন ফসলের প্রায় ১১২টি আধুনিক জাত উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। পুষ্টির দিক থেকে জিংক ও আয়রন সমৃদ্ধ বিনাধান-২০ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট এর ধারাবাহিক গবেষণার ফলে আখের প্রায় ৪৭টি জাত উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে।


মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক গবেষণার ফলে দেশ আজ আমিষ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে।  যার ফলে মাছের উৎপাদন বিগত দশ বছরে ২৭.০১ লক্ষ টন থেকে বেড়ে ৪১.৩৪ লক্ষ টনে উন্নীত হয়েছে। জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান দেশের আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দেশের বাস্তবিক ও বিজ্ঞানসম্মত খামার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণসহ    নানাবিধ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
১৫ বছর মেয়াদি জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্প (ঘঅঞচ) কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত¡াবধানে ২০০৮ সাল থেকে দেশব্যাপী খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পটি শিশু ও নারীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে দেশের গম, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলমূল ও দুধ মাংস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।


ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তালমিলিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মানসম্মত কৃষি গবেষণার কোন বিকল্প নেই। কৃষি গবেষণাকে আরো যুগোপযোগী করে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় আরো বেশি সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। কৃষি মন্ত্রণালেয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সমন্বয়ে জাতীয় কৃষি নীতি  ২০১৮ প্রণীত হয়েছে। এ নীতেতে কৃষিকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত বিভিন্ন প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চত করার লক্ষ্যে কৃষি নীতিতে নতুন করে ন্যানো প্রযুক্তির মত আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এসব কিছুই ছিল জাতির পিতার স্বপ্নের কৃষিনীতির প্রতিফলন। এ নীতিতে কৃষি খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা, গবেষণা ও উন্নয়ন, কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষিতে সমবায়, কৃষি বিপণন, বিশেষায়িত  কৃষি যেমন: ছাদে কৃষি, হাইড্রোফোনিক, সংরক্ষণমূলক কৃষি, ভাসমান কৃষি, প্রিসিশন কৃষি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ, শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল টেকসই কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন কৃষি নীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে মেধা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ের উপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।


বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার    নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের পথে হাঁটছে।  টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত হবে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল অন্যান্য জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। য়

১নির্বাহী চেয়ারম্যান, বিএআরসি, ফার্মগেট, ঢাকা, ফোন : ৯১৩৫৫৮৭, ই-মেইল : ec.barc@barc.gov.bd 2 প্রধান ডকুমন্টেশন কর্মকর্তা, কৃষি তথ্য কেন্দ্র, বিএআরসি, ফার্মগেট, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭১১১০২১৯৮

বিস্তারিত
গুড় খান, সুস্থ থাকুন, বিকশিত হোন

ড. মো. আমজাদ হোসেন১ ড. সমজিৎকুমার পাল২

‘সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ’। সুন্দর এমন সব কথানিয়েই সাজানো হয়েছে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি। শরীরের যত্ন না নিলে শরীর সুস্থ থাকে না। আর শরীর সুস্থ না থাকলে বিকশিত হওয়া যায় না। অতএব, এ কথাগুলো পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আর শেষ কথা হলো কর্মের  দ্বারাই নির্ণীত হয় আমাদের ভবিষ্যৎ। আমরা জানি পুরানো কথাগুলো যা কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার লিখে গেছেন ১৮৬১ সালে-
‘দেখি এই চরাচরে, যে যেমন কম্ম করে, সে তেমন ফল পায়। যে চাষা আলস্য ভরে, বীজ না বপন করে,পক্ব শস্য পাবে সে কোথায়?’
(যেমন কর্ম্ম তেমন ফল/ সদ্ভাব শতক/ কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার/ পৃষ্ঠা ১৫৪/ প্রকাশকাল: ঢাকা ১৮৬১)
তাই আমাদের কাজের দ্বারাই প্রকাশিত হয় আমাদের নিজেদের পরিচয়ও। তবে কর্ম করতে হলেও দরকার সুস্থ শরীর। কারণ সুস্থতাই সকল চালিকাশক্তির চাবিকাঠি। আবার সুস্থ থাকার জন্য দরকার শরীরের যতœ নেয়া। শরীরের যত্ন নিতে প্রথমেই দরকার সুষম খাদ্যাভাস। কারণ এর থেকেই গড়ে ওঠে শরীরের যাবতীয় শক্তি। আর এভাবেই বিকশিত হয় দেহ-মন এবং মনন। বিকশিত ও মননশীল মানুষই সমাজের আশীর্বাদ। তারাই পারে সমাজকে সঠিক কাজে পরিচালনা করতে। এভাবেই এগিয়ে গেছে মানবসভ্যতা। আজ বিজ্ঞানের এই চরম উন্নয়নের যুগে এসে শরীরের যত্ন নিয়ে সুস্থ থাকার বিষয়টির গুরুত্ব পেয়েছে সর্বাধিক। তাই সুষম খাদ্যাভাসের বিষয়টি এখন অগ্রাধিকার পেয়েছে।
সুষম খাদ্যাভাসের বিষয়টি সামনে এলেই আগে আসে পুষ্টির বিষয়টি। পুষ্টির কথা বল্লেই বলতে হয় নানানরকম খাদ্যের কথা। বিশেষ করে ফলমূল, শাকসবজি, ডাল-তেল-মসলাসহ মিষ্টিজাতীয় খাবারের কথা। অন্য সব খাবারের কথা নানাভাবে সামনে এলেও মিষ্টিজাতীয় খাবারের কথা সচরাচর অনুক্ত থেকে যায়। আর এখানেই ঘটে বিপত্তি। কারণ মিষ্টি জাতীয় প্রতিটি খাবারে কিংবা ফসলে রয়েছে উন্নত পুষ্টি যা আমাদের চালিত করে এবং নিয়ন্ত্রিত করে। আরো স্পষ্ট করে বলতে  মস্তিষ্কই আমাদের পরিচালিত করে, নিয়ন্ত্রিত করে। আর এই মস্তিষ্কের পুষ্টি যোগায় মিষ্টিজাতীয় খাবার।
মস্তিষ্কের উপযুক্ত বিকাশ ও পূর্ণ কার্যকারিতার জন্য গুড় বা চিনি একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে খাদ্যের শতকরা ১১ ভাগ ক্যালরি চিনি বা গুড় থেকে আসা উচিত। প্রতি ১০০ গ্রাম ব্রেনের জন্য প্রতি মিনিটে গøুকোজ (গুড়/ চিনির সরল উপাদান) দরকার ৫.৫ মিলিগ্রাম, অক্সিজেন দরকার ৩.৫ মিলিগ্রাম, এবং গøুুটামেট দরকার হয় ০.৪ মিলিগ্রাম। এ হিসাবে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের ব্রেনের উপযুক্ত কার্যকারিতার জন্য প্রতি মিনিটে গøুুকোজ দরকার ৭৭ মিলিগ্রাম। অক্সিজেন দরকার ৪৯ মিলিগ্রাম, এবং গøুটামেট দরকার হয় ৫.৬ মিলিগ্রাম। পক্ষান্তরে প্রতি ১০০ গ্রাম ব্রেন থেকে প্রতি মিনিটে উৎপাদিত হয় ৩.৫ মিলি. কার্বন ডাইঅক্সাইড ও ০.৬ মিলিগ্রাম গøুুটামিন। সে কারণেই চিনি বা গুড় গ্রহণ করা আবশ্যক।
মস্তিষ্কের চাহিদার কথা বিবেচনা করে চিনি বা গুড়ের যে কোন একটি পরিমাণগত ভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে পুষ্টি মানের বিবেচনায় চিনি অপেক্ষা গুড় গ্রহণ করাই ভাল। কারণ গুড়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন রয়েছে। অতএব, আমাদের গুড় খাওয়া দরকার। তবে অবশ্যই সেটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত হতে হবে। আশার কথা, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিউিট এ পর্যন্ত ৪৭টি ইক্ষুজাত উদ্ভাবন করেছে। এর বেশির ভাগ জাত থেকেই ভাল গুড় উৎপাদিত হয়। উদ্ভাবিত জাত থেকে পছন্দমতো যেকোন একটি ইক্ষুজাত বাছাই করে কোন ইক্ষু চাষী কিংবা গুড় উৎপাদনকারী ভাল গুড় উৎপাদন করতে পারেন। য়

১মহাপরিচালক,২পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিউিট, ঈশ্বরদী-৬৬২০, পাবনা,  ফোন : ০৭৩২৬৬৬২৮,  ই-মেইল : bsridg123@gmail.com

বিস্তারিত
উদ্ভিজ্জ প্রোটিন সমৃদ্ধিতে গম ও ভুট্টা

ড. মোহাম্মদ রেজাউল কবীর১, ড. মো. আশরাফুল আলম২ ড. মুহ. রেজাউল ইসলাম৩

গম বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত একটি ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ যার উৎপত্তি খ্রিষ্টপূর্ব ৯৬০০ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রিসেন্ট ফার্টাইল অঞ্চলে। বর্তমানে সারা বিশে^ ব্যাপকভাবে গম চাষ হয়। বিশ্বব্যাপী যে কোন দানাদার ফসলের তুলনায় গম বেশি জায়গায় আবাদ হয়ে থাকে। গম কার্বোহাইড্রেট এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভিজ প্রোটিনের প্রধান উৎস হলো গম। অন্যদিকে ভুট্টা একটি দানাদার শস্য যা ১০০০০ বছর পূর্বে মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলের আদিবাসীরা প্রথম চাষাবাদ শুরু করেন। সারা বিশে^ গম ও ধানের তুলনায় ভুট্টার উৎপাদন বেশি। তবে এর সামান্য অংশই মানুষের খাদ্য হিসেবে সরাসরি ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে ভুট্টা প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৯-২০ মৌসুমে  পৃথিবীতে গম ও ভুট্টার উৎপাদন যথাক্রমে ৬০৯ ও ১০৫০ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশে দানাজাতীয় খাদ্যশস্য হিসেবে গম ও ভুট্টার গুরুত্ব অপরিসীম। ধানের তুলনায় গম অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন, কৃষি সম্পদ সাশ্রয়ী ও পরিবেশ বান্ধব। উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ায় কৃষকদের জন্য গম আবাদ লাভজনক। অপরদিকে, অধুনা দেশে পোল্ট্রি ও মৎস্য খাত বিকশিত হওয়ায় এবং এক্ষেত্রে ফিড হিসেবে বিপুল পরিমাণে ভুট্টা ব্যবহৃত হওয়ায় পরোক্ষভাবে এটি পুষ্টি চাহিদা পুরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা অধিক হওয়ায় কৃষকদের জন্য ভুট্টার আবাদ লাভজনক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং পোল্ট্রি ও ডেইরি খামার বিকাশের সাথে সাথে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এ দুটি ফসলের চাহিদা দ্রæত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি গম আমদানিতে বাংলাদেশ বিশে^র শীর্ষ পঞ্চম দেশে পরিণত হয়েছে। দেশের বর্তমানে ৩.৪২ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১২.৫ লক্ষ টন গম এবং ৫.৫৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ৫৪ লক্ষ টন ভুট্টা উৎপাদনের পাশাপাশি বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে প্রতি বছর প্রায় ৬০ লক্ষ টন গম এবং ১৪ লক্ষ টন ভুট্টা আমদানি করতে হচ্ছে। বিদেশ থেকে এই ব্যাপক আমদানি নির্ভরতা কমাতে হলে গবেষণা ক্ষেত্রের  আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে গম ও ভুট্টার দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।
গম ও ভুট্টার পুষ্টিমাণের তুলনামূলক চিত্র
পুুষ্টিগুণ বিবেচনায় গম ও ভুট্টা গুরুত্বপূর্ণ দানাদার খাদ্যশস্য। গম উদ্ভিজ্জ প্রেটিনের প্রধান উৎস । প্রতি ১০০ গ্রাম গম, ভুট্টা ও চালের খাদ্যমান এর তুলনামূলক চিত্র সারণি- ১ দ্রষ্টব্য।
খাদ্য হিসেবে গমের ব্যবহার ও উপকারিতা
গম থেকে নানা ধরণের খাদ্য দ্রব্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। যেমন: পাউরুটি, পরিজ, ক্রেকার্স, বিস্কুট, কেক, রোল, বার্গার ইত্যাদি। গমজাত খাদ্য দ্রব্য উৎপাদনে গমের যে খামির (উড়ঁময) তৈরি করা হয় তার একটি গুরত্ব¡পূর্ণ উপাদান হলো গøুটেন। জৈব জ্বালানি তৈরি করতেও বর্তমানে গম ব্যবহৃত হচ্ছে। গমের খড় গৃহপালিত পশুর খাদ্য এবং নির্মাণসামগ্রী হিসেব ব্যবহার করা হয়।
গমের লাল আটাতে (ডযড়ষব যিবধঃ) তিনটি অংশ থাকে: ক) ব্রান (ইৎধহ) খ) জার্ম (এবৎস)  এবং গ) এন্ডোস্পার্ম (ঊহফড়ংঢ়বৎস)।  ব্রান হলো গমের বাইরের শক্ত আবরণ যাতে থাকে আঁশ, খনিজ ও এন্টিঅক্সিডেন্ট। জার্ম হলো উচ্চ প্রোটিনের সমৃদ্ধ একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য। জার্ম থেকেই গম গাছ গজায়। জার্মে ২৩টি পুষ্টি উপাদান আছে এবং প্রতি আউন্সে যে পুষ্টি আছে তা অন্য যে কোন শস্য কণা বা      শাকসবজির চেয়ে বেশি। এতে প্রায় ২৮ ভাগ প্রোটিন আছে এবং এই পরিমাণ অধিকাংশ প্রাণিজ প্রোটিনের চেয়ে বেশি। জার্মে পটাশিয়াম ও আয়রন এর পরিমাণ অন্য যে কোন খাদ্যের চেয়ে বেশি। সাদা আটা (জবভরহবফ যিবধঃ) গমের ব্রান ও জার্মকে অপসারেণের মাধ্যমে তৈরি হয়। গমে এর ওজনের ১২-১৫% আঁশ থাকে। সাদা আটাতে এই ফাইবারের পরিমাণ খুবই কম থাকে। তাই গম থেকে পরিপূর্ণ পুষ্টি পেতে লাল আটা খাওয়া উত্তম।
খাদ্য হিসেবে ভুট্টার ব্যবহার ও উপকারিতা
ভুট্টা মানুষের খাদ্য, পশু-পাখির খাদ্য, জ¦ালানি এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এশিয়ার অনেক দেশে শুধু ভুট্টার আটা দিয়ে রুটি অথবা গম বা চালের আটার সাথে ভুট্টার আটা মিশিয়ে বিভিন্ন খাবার প্রস্তুত করা হয়। আমাদের দেশে ভুট্টার কচি মোচা আগুনে পুড়িয়ে বা লবণ পানিতে সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। বারি মিষ্টি ভুট্টা ১ জাতের ভুট্টার মোচা কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায়। দানা যখন অল্প নরম থাকে (গরষশ ধহফ ফড়ঁময ংঃধমব) তখনই মোচা সংগ্রহ করতে হয়। সিল্ক বের হওয়ার ২০-২৫ দিনের মধ্যে অর্থাৎ রবি মৌসুমে মাত্র     ১১৫-১২০ দিনে খাওয়ার উপযোগী মোচা গাছ থেকে সংগ্রহ করা যায়। এ সময় দানায় চিনির ভাগ গড়ে ১৮%। হলুদ দানায় প্রচুর পরিমান ভিটামিন এ থাকে। চাউল, গম ও ভুট্টা দিয়ে বিভিন্ন খাবার তৈরি করা হলেও পুষ্টি বিবেচনায় গম ও ভুট্টা দিয়ে তৈরি খাবেরের পুষ্টিমান বেশি।
মানবদেহের জন্য উপকারী অনেক গুণাগুণ ভুট্টায় রয়েছে। ভুট্টার ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ত্বক, চুল, হার্ট, ব্রেইন এবং হজমের জন্য উপকারী। ভিটামিন এ, সি, কে,  বিটা ক্যারোটিন এরং সেলেনিয়াম থায়রয়েড গ্রন্থির কার্যক্রম ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উন্নত করে। ভুট্টার তেলে বিদ্যমান অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড বিশেষ করে লিনোলিক এসিড উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।  ভুট্টার তেলে বিদ্যমান ভিটামিন কে এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধিনস্ত গম গবেষণা কেন্দ্র ও ভুট্টা শাখাকে একীভ‚ত করে “বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট” ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত এ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান কার্যালয় দিনাজপুর জেলার নশিপুরে অবস্থিত। বর্তমানে প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপকেন্দ্রে গম ও ভুট্টার নানাবিধ গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক এ পর্যন্ত গমের ৩৪টি, হাইব্রিড ভুট্টার ১৮টি এবং কম্পোজিট ভুট্টার ৭টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি গম ও ভুট্টার ফলন বৃদ্ধির জন্য আধুনিক চাষাবাদ কলাকৌশল, ফসল বিন্যাস, মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রকার কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএআরআই এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় গত   ২০১৯-২০ মৌসুমে ৩৮৬১ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ ও ২০২০টি প্রদর্শনী স্থাপনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। বীজ উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রমের আওতায় ২০১৯-২০ মৌসুমে গম ও ভুট্টার ১০৩ টন প্রজনন ও মানঘোষিত বীজ উৎপাদন করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি মলিকুলার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ে অধিক ফলনশীল গম ও ভুট্টার জাত উদ্ভাবন চলমান। পাশাপাশি আধুনিক জীবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগবালাই প্রতিরোধী ও প্রতিক‚ল পরিবেশ সহিষ্ণু গম ও ভুট্টার জাত উদ্ভাবন করার প্রচেষ্টা চলছে।
গম ও ভুট্টার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন: ঈওগগণঞ, টঝঅওউ, অঈওঅজ, টঝউঅ, কঝট, ঝখট এবং ওঈঅজ এর সাথে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা।

 

১ -২বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর-৫২০০ ৩ আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রংপুর, ই-মেইল : rezaulw@yahoo.com, মোবাইল : ০১৭৯৬৫৮৬০৩৯

বিস্তারিত
কবিতা (কার্তিক- ১৪২৭)

সুস্থতার জন্য নিবেদিত পঙক্তিমালা

আবু হেনা  ইকবাল আহমেদ১

শরীরের যত্ন
এইযে সুঠাম দেহ       সর্বদা জাগ্রত
যদি এটি ভালো থাকে  পূর্ণ হবে ব্রত।
সুস্থতার জন্য চাই       সুনির্মল বায়ু
তা হলে পাওয়া যাবে   দীর্ঘকাল আয়ু।

খাদ্য আর পরিবেশ      নানা দোষে দুষ্ট
তার মাঝে থেকে থেকে শরীরটা রুষ্ট।
ফেলে দেয়া বর্জ্যগুলো   মিশে জলে স্থলে
শেষমেশ ফিরে আসে    শস্য আর ফলে।
শরীরের যত্ন নিতে       নির্মল ধরাতে
র্কম ও ব্যয়াম চাই        খাবারের সাথে।

খাদ্য  অপচয়
আমিষ র্শকরা স্নেহ       শরীরের বল
অধিক খাবারে তার       হয় রসাতল।
খনিজ লবণ আর         সাথে খাদ্যপ্রাণ
শুদ্ধ পরিবেশে করে       সুস্থতা প্রদান।

না খেয়ে কত মানুষ      ধুঁকে ধুঁকে মরে
খাদ্য অপচয় হয়         কারো কারো ঘরে।
যুদ্ধব্যয়  ছুঁড়েফেলে      খাদ্য জোগানোয়
কবে হবে মনোভাব      অর্থ খাটানোয়।
পর্যাপ্ত মুখের গ্রাস        যদি পায় সবে
মর্ত্য রবে প্রাণভরে       আনন্দ উৎসবে।


মান্য স্বাস্থ্যবিধি
এখন ভুবনজুড়ে         করোনার কাল
ঝুঁকিতে রয়েছে সবে    বিস্তীর্ণ সে জাল।
কোভিড উনিশ সেতো  অতি খুদে কণা
মানব শরীর পেলে      মেলে ধরে ফণা।


খেলেই খাবার হবে     এমনতো নয়
মদ বা তামাক  ত্রস্তে   সদা বর্জনীয়।
সফেদ  শর্করা অতি     বৃদ্ধি করে ব্যাধি
পরিমিত খাদ্য আর      মান্য স্বাস্থ্যবিধি।
দীর্ঘদিন সুস্থতার         ঠিক মাপকাঠি
ব্যত্যয়ে ঘটাতে পারে    সবকিছু মাটি ।

 

আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ
ড. খান মোঃ মনিরুজ্জামান২

সুন্দর পৃথিবীকে বাসিব ভালো মনো প্রাণদিয়া,
বিকচ কুসুমবিক শিত আপনাকে যতন করিয়া।
প্রত্যেক নিজের যতনে সুস্থ সবে সম্মিলিতভাবে,
চরাচরে মোদের তরে এ ধারা ধরিব সবে স্বভাবে।
করিব কাজ মানবসমাজ গড়িব মোদের ভবিষ্যৎ,
সুস্থ স্বাস্থ্যসহ মানব বিকাশে সম্মিলিত অভিমত।
আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ জ্ঞানে ভাবি,
এটা এক সুন্দর সকালের সুন্দর পৃথিবীর চাবি।

সুস্থ দেহে সুস্থ মন করলে মোরা শরীরের যতন,
মোদের সম্মিলিত কর্মে মোদের ভাবি বিকাশন।
পরিমিত আহার, পরিমিত চলা এজনমের সার,
নীতিবোধে পরিপাটি জীবনাচরণ সুখে দরকার।
সম্মিলিত কর্ম প্রয়াসে ফুটে স্বপ্ন সুখের শতদল,
যতনে রতনে জীবনের মানে পরিপাটি পরিমল।
সবার স্বকীয় বিকাশে দেশে দেশে সুস্থ প্রতিবেশ,
জ্বরা, ব্যাধি হবে শেষ, নির্বিকার নীরব নিরুদ্দেশ।

অকরুণ করোনার নিদারুণ আঘাতে ধরনীবাসী,
সর্বাগ্রে প্রতিরোধ কর্মকৌশলে মুখে ফুটবে হাসি।
আমাদের সচেতন কর্মকাজে আমাদের কল্যাণ,
আঁধার আলোকিত করে জ্বলবে শিখা অনির্বাণ।
সম্মিলিত সবার স্বীয় সজাগে আসবে রাঙা ভার,
সবার শরীরের যত্নে সবাই রহিবো মোরা বিভোর।
সবাই সবার ব্যাপারে হলে পরে সমবেত সচেতন,
আমাদের কর্মই করবে মোদের ভবিষ্যৎ বিরচন।

পুষ্টি সমৃদ্ধ পরিমিত খাবার সুস্থ স্বাস্থ্যে দরকারি,
মাছ, মাংস, ডিম, দুধ শাকসবজি তরিতরকারি।
বিকাশলাভে শরীরের যত্নে খাদ্য খাবে ডাক্তারি,
সুস্থজাতি গঠনে মোরা একসাথে করতে পারি।
শরীরের যত্নে যাতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে,
সুস্থস্বাস্থ্যের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সবার নজর কাড়ে।
সবকিছুর মূলে খাদ্য উৎপাদন অতীব প্রয়োজন,
আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ করে নির্ধারণ।

 

১পরিচালক (অব.),বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, কৃষি মন্ত্রণালয়,  সেল: ০১৬১ ৪৪৪ ৬ ১১১, ই-মেইল: ahiqbal.ahmed@yahoo.com
২জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার, ঝিনাইদহ, মোবাইলনং- ০১৭১২-৮২২৭৪৯,dr.md.monir7@gmail.com

বিস্তারিত
আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ

ড. মোঃ নাজিরুল ইসলাম১ ড. মোঃ ওমর আলী২

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর জন্মলগ্ন থেকেই এদেশের আবহাওয়া উপযোগী এবং কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। শরীর সুস্থ রাখতে হলে সুষম খাদ্যের যোগান অত্যাবশ্যক। একটি বহু ফসল ভিত্তিক গবেষণা- প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএআরআই ২১১টি ফসল নিয়ে গবেষণা করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৫৭৯টি উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত এবং ৫৫১টি বিভিন্ন প্রযুক্তিসহ মোট ১১৩০টিরও অধিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। আর আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ যা আমাদের  জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে এক অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বিএআরআই সেই সুষম ও নিরাপদ খাদ্যের যোগান দিতেই এই প্রতিপাদ্যকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে বিএআরআই নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে যে সাফল্য লাভ করেছে এবং যে সমস্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে চলেছে তার উল্লেখযোগ্য কিছুকার্যক্রম উপস্থাপন করা হলো।
কন্দাল ফসল
বিএআরআই-এর কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র থেকে আজ পর্যন্ত উদ্ভাবিত আলুর ৯১টি উচ্চফলনশীল জাত অনুমোদন লাভ করেছে। এছাড়া বারি টিপিএস-১ এবং বারি টিপিএস-২ নামে ২টি হাইব্রিড আলুর জাত প্রকৃত আলুবীজ থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। মিষ্টি আলুর ১৬টি, পানি কচুর ৬টি, মুখীকচুর ২টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং এ জাতগুলোর অধিকাংশই পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং অধিক উৎপাদনশীল।
ডাল
ডাল বাংলাদেশের ফসল ধারায় প্রকৃতির দান এক অনন্য নিয়ামক, যা শুধু ডালই উৎপাদন করে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে না অধিকন্তু, মাটির ঊর্বরতা বৃদ্ধি করে এক পরিবেশবান্ধব কৃষি উপহার দেয়। ডালে জাতভেদে বিদ্যমান আমিষ      (২০-২৮%) এবং পর্যাপ্ত অ্যামাইনো এসিডসহ নানাবিধ পুষ্টি উপাদানের কারণেই আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য সংস্কৃতিতে ডাল এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ডালে বিদ্যমান আমিষের পরিমাণ গমের চেয়ে দ্বিগুণ এবং ভাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। ডালের পুষ্টিসহজেই হজমযোগ্য। এজন্য ডালকে গরিবের মাংস বলা হয়। বর্তমানে করোনা মহামারীর সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করোনা ভাইরাসসহ নানাবিধ সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে ডালের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ডালের উৎপাদন বৃদ্ধি। লক্ষ্যেই  বিএআরআই-এর ডাল গবেষণা কেন্দ্র ডালের ৪৩টি উন্নতজাত ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, আমরা যদি প্রতিদিন পুষ্টি সমৃদ্ধ ডাল বিশেষ করে আয়রন, জিংক ও সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ মসুর ডাল খাই তাহলে আলাদা করে আয়রন ও জিংক ট্যাবলেট খাওয়া প্রয়োজন হবে না।
তেলবীজ
বাংলাদেশের কৃষিতে বিভিন্ন প্রকারের তেলবীজ ফসলের মধ্যে সরিষা এদেশে প্রধান যা তেল ফসলের আবাদি এলাকার শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়। তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্র এ পর্যন্ত সরিষা, তিল, চীনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিসি ইত্যাদি বিভিন্ন তেল ফসলের মোট ৪৩টি জাতসহ বেশ কিছু অন্যান্য উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবিত জাতের উৎপাদন ক্ষমতা আগের প্রচলিত জাতসমূহের চেয়ে অনেক বেশি। সরিষার উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭ জাতটির ফলন ক্ষমতা প্রচলিত জাত টরি-৭ এর চেয়ে শতকরা ১৫-২০ ভাগ বেশি। এ জাতটি স্বল্পমেয়াদি (৮০-৮৫ দিনে পাকে) বিধায় রোপা আমন ও বোরো ধান চাষের মধ্যবর্তী সময় আবাদ করা সম্ভব। বারি সরিষা-১৮ খুবই উচ্চফলনশীল। তেলের এ সমস্তজাতসমূহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তেলের চাহিদা পূরণপূর্বক পুষ্টি চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
সবজি
সুস্থ সবল জীবনের জন্য প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়া অপরিহার্য। কারণ জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যক ভিটামিন ও খনিজের অন্যতম উৎস হল সবজি। বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক মাথাপিছু সবজি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৭০ গ্রাম (বিবিএস ২০১৮) যা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন ভাগের ১ ভাগ। পুষ্টিবিদগণ দৈনিক মাথাপিছু ২২০ গ্রাম সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সবজির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত মোট ৩৫টি সবজির ১৩২টি উন্নত জাতসহ (ওপি-১০৫, হাইব্রিড-২৩ ও বিটি-৪) উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে সবজির আবাদ এবং বীজ উৎপাদনের প্রযুক্তিও উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব উন্নত সবজির জাত ও প্রযুক্তি দেশে সবজির চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজিচাষ
বাংলাদেশের কৃষিতে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ উৎপাদন পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এদেশে মোট কৃষি পরিবারভুক্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লক্ষ ১২ হাজার ৫৮০ লাখ, যার গড় আয়তন ৩৫০ বর্গ মিটার। পরিকল্পিত নিবিড় চাষ প্রবর্তনের মাধ্যমে বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। অধিক সবজি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বিএআরআই এর সরেজমিন গবেষণা বিভাগ বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য সবজি চাষের ৯টি মডেল উদ্ভাবন করেছেন। এ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের প্রকট পুষ্টি সমস্যার সমাধান এবং পুষ্টি সমস্যাজনিত রোগ-বালাই থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া অতিসহজে সম্ভব।  বর্তমানে সরকার এ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে ‘আমার বাড়ী আমার খামার’ শিরোনামে প্রকল্প গ্রহণ করেছেন, যা এ দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে সুস্থ শরীর গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
ফুল ও ফল
মানুষের পেটের ক্ষুধানিবারণের পাশাপাশি মনের ক্ষুধানিবারণ একটি বড় বিষয়। আর ফুলও তেমনই একটি মাধ্যম, যা মনের ক্ষুধানিবারণ করে। আর সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই সাম্প্রতিককালে বিএআরআই ফুল বিভাগ ১২টি ফুলের ২১টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। আশা করা হচ্ছে বাংলাদেশ আগামীতে ফুল রপ্তানি করে উল্লেখযোগ্য হারে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবে।
মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে একজন মানুষের দৈনিক ২০০ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন কিন্তু আমরা খাই মাত্র ৮২ গ্রাম। ফল ওষধি গুণাগুণে সমৃদ্ধ বিধায় একে ’রোগ প্রতিরোধী খাদ্যও’ বলা হয়। এসমস্ত বিষয়ের প্রতি খেয়াল রেখেই ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই ৩৫ প্রজাতির ফলের ৮৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে, যার অধিকাংশই মাঠ পর্যায়ের ফলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে এ সকল ফল গ্রহণে দেহের ভাইরাস যেমন কোভিড-১৯ সহঅন্যান্য রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা সুস্থ সবল ও মেধাবী জাতি বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
মসলা
মসলা গবেষণা কেন্দ্র গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন মসলার মোট ৪৪টি জাতও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। উল্লেখ্য যে, মসলা শুধু খাবারের স¦াদ বৃদ্ধিতেই নয়, সুস্থতার জন্য ও জরুরী।
বালাই ব্যবস্থাপনা
শস্য উৎপাদনে বিএআরআই প্রায় ২১১টির মতো ফসলকে রোগ এবং পোকামাকড় মুক্ত রাখার জন্য গবেষণার কাজ পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ফসলের প্রায় ১০০০টি রোগ আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা হয়েছে। এ দেশে ধানসহ অন্যান্য ফসলে ৭০০-এর বেশি পোকামাকড় শনাক্ত করা হয়েছে। সমনি¦তবালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বিএআরআই কাজ করে চলেছে।
কৃষি যন্ত্রপাতি
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যান্ত্রিক চাষাবাদ প্রচলনের ফলে অল্পসময়ে জমি চাষ করে সময়মতো পরবর্তী ফসল বপন করা সম্ভব হয়েছে। ফলশ্রæতিতে, মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে পাশাপাশি পুষ্টির প্রাপ্যতাও বাড়ছে।
সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা
বর্তমানে মোট আবাদযোগ্য জমির ৭০ শতাংশ সেচের  আওতাধীন রয়েছে। সেচ দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ সেচসম্পর্কিত বেশ  কিছু তথ্য গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।
খামার পদ্ধতি গবেষণা
দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে মোট ৯টি খামার পদ্ধতি গবেষণা এবং ৭২টি বহুস্থানিক গবেষণা এলাকা আছে। খামার পদ্ধতি গবেষণার মাধ্যমে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের ভিত্তিতে উন্নত শস্যবিন্যাস, শস্যভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সমস্যার ভিত্তিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়।
জৈব প্রযুক্তি
জৈব প্রযুক্তি বর্তমান সময়ে ফসলের জাত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উন্নতবিশে^ এর মাধ্যমে জিন প্রতিস্থাপন করে উন্নত উচ্চফলনশীল জাত, রোগমুক্ত ও পোকামাকড়রোধী জাত উদ্ভাবন করা যায়। এ পদ্ধতিতে জীব বৈচিত্র্যের মলিকুলার চরিত্রায়ন করা হয়ে থাকে, যা নতুন জাত উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া অল্পসময়ে অধিক পরিমাণে রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের মুখ্য ভূমিকা রাখে।
শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি
শস্য সংগ্রহোত্তর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্যশস্য, সবজি ও ফলমূলের অপচয় রোধ এবং পুষ্টি গুণাগুণ অক্ষুণ রাখবে।  ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তিসমূহ উদ্ভাবনে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
সর্বোপরি, বলা যায় এ দেশের কৃষির সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিজ্ঞানীবৃন্দের দেশের প্রয়োজনে ও সমস্যাসম্পর্কে সচেতন তাদের পেশাগতজ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং প্রচেষ্টা আর আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে নির্মিত আগামী দিনের কৃষি উন্নয়ন। য়

১মহাপরিচালক, বিএআরআই, গাজীপুর, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ডাল গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৭১২৫৪৩৭২০, ই-মেইল : omaraliprc@gmail.com

 

বিস্তারিত
মৎস্য খাত : আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ

কাজী শামস আফরোজ

‘সবাই নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যতœ নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ’। এ প্রতিপাদ্যে উদযাপন হচ্ছে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২০। যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও কাক্সিক্ষত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জনে খাদ্য নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের আপামর জনগণের পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের যোগান আজ অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ দেশের ক্রমবর্ধিষ্ণু ১৬ কোটির অধিক জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহের মাধ্যমে সুষম খাবারের নিশ্চয়তা বিধানে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের অবদান সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সেক্টর-সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে মৎস্যখাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জিডিপির ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির এক-চতুর্থাংশের বেশি (২৫.৭২ শতাংশ) মৎস্যখাতের অবদান (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯)। বিগত ৫ বছরে মৎস্যখাতে গড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬.২৮ শতাংশ। দেশের রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মৎস্যখাত হতে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের অধিক মানুষ এ সেক্টরের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে।


মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ আজ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশের সাফল্য আজ বিশ্বজন স্বীকৃত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ২০২০ রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মৎস্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার ধীরগতিসম্পন্ন হলেও বিগত এক দশকে বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৯.১%, যা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় এবং বিশে^ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ ৩য় স্থান এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম স্থান যথারীতি ধরে রেখেছে। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপক‚লীয় ক্রাস্টাশিয়ান্স ও ফিনফিস উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম স্থান অধিকার করেছে।


সর্বোপরি মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মৎস্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার ১৪২৩ এ স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হয়েছে। এসব অর্জন সরকার কর্তৃক মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে বাস্তবায়িত যথোপযুক্ত কার্যক্রমেরই ফলাফল।


ভিশন-২০২১, বাংলাদেশ ঃ সমৃদ্ধ আগামী প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত অগ্রাধিকারমূলক সেক্টর-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমসমূহ বিশেষত- পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা, দারিদ্র্য নির্মূল, আধুনিক কৃষি-ব্যবস্থা- লক্ষ্য যান্ত্রিকীকরণ, বøু-ইকোনমি- সমুদ্রসম্পদ উন্নয়ন-কে সামনে রেখে সমন্বিত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এর মৎস্য সেক্টর-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের উদ্দেশ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে টেকসই করার লক্ষ্যে সরকার চলমান বহুবিধ সমাজ ও পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্যান্য সময়োপযোগী ও লাগসই কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে গৃহীত উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমসমূহ হলো:


অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের আবাসস্থল উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ; বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে উৎকর্ষতা সাধন; পরিবেশ ও সমাজবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ; সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সহনশীল আহরণ, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা; জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থার উন্নয়ন; পুষ্টি-সংবেদনশীল মৎস্যচাষ ব্যবস্থা প্রবর্তন ও সচেতনতা বৃদ্ধি; সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমের পরিধিসম্প্রসারণ; এবং স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।


নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি যোগানে মাছ
বিবিএস’র ২০১৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী জনপ্রতি প্রতিদিন মাছ গ্রহণের পরিমাণ ঈপ্সিত চাহিদার (৬০ গ্রাম) চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৬২.৫৮ গ্রাম-এ উন্নীত হয়েছে। আমাদের খাদ্যে প্রাপ্ত প্রাণিজ আমিষের  প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান দেয় মাছ। মাছ একটি উচ্চ আমিষসমৃদ্ধ দামে সস্তা ও সহজ পাচ্য, কম চর্বি ও শ্বেতসার যুক্ত নিরাপদ খাদ্য। মানুষের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানগুলোর সবগুলো উপাদানই সুষম পরিমাণে মাছে বিদ্যমান।  
কোভিড-১৯ কালীন মৎস্য সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন: কোভিড-১৯ কালীন মৎস্যচাষিদের মাছ বাজারজাতকরণ গতিশীল করতে মৎস্য অধিদপ্তর স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কতিপয় ফলপ্রসূ কার্যক্রম গ্রহণ করে; যা মৎস্যচাষিদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এটি সুধীমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়। কার্যক্রম হলো ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রয় কেন্দ্র/ গ্রোথ সেন্টারের মাধ্যমে মাছ বিক্রয়; অনলাইনে মাছ বাজারজাতকরণ এবং দরিদ্র্য ও অসহায় মানুষকে ত্রাণের সাথে মাছ বিতরণ।


স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মাছ সরবরাহে গৃহীত পদক্ষেপ
 

১. আইনি পরিকাঠামো তৈরি : জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির দ্রব্য মৎস্য অধিদপ্তর বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। আইনি কাঠামোর আওতায় প্রণীত হয়েছে আইন, বিধিমালা, নীতি ও গাইডলাইন এবং এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তন্মধ্যে মৎস্য হ্যাচারি আইন, ২০১০ ও মৎস্য হ্যাচারি বিধিমালা, ২০১১; মৎস্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ ও মৎস্য খাদ্য বিধিমালা, মৎস্য ও মৎস্য পণ্য (পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৮৩, এবং মৎস্য ও মৎস্য পণ্য (পরিদর্শন ও  মাননিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৭); জাতীয়  চিংড়ি নীতিমালা, ২০১৪; মৎস্য সঙ্গনিরোধ আইন, ২০১৮; ন্যাশনাল রেসিডিউ কন্ট্রোল প্ল্যান ও পলিসি গাইডলাইন্স ২০১১; ফিস এন্ড ফিসারি প্রোডাক্টস অফিসিয়াল কন্ট্রোল প্রোটোকল ২০১৫; অ্যাকোয়াকালচার মেডিসিনাল প্রোডাক্টস কন্ট্রোল গাইডলাইন্স ২০১৫ অন্যতম।
 

২. উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলন ও ব্যবস্থাপনা : বাজারে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাছ/চিংড়ি সরবরাহের অন্যতম শর্ত হলো উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলনের পাশাপাশি উত্তম ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন। সঠিক উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি এ ব্যবস্থাপনার আওতায় নি¤œবর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ ধাপসমূহ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জৈবনিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে খামার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা। মজুদপূর্ব এবং মজুদকালীন ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে উত্তম চাষ ব্যবস্থা অনুসরণ।


৩. ন্যাশনাল রেসিডিউ কন্ট্রোল প্ল্যান বাস্তবায়ন ((NRCP)) : ন্যাশনাল রেসিডিউ কন্ট্রোল প্ল্যান  কার্যক্রমের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ভোক্তার জন্য বাংলাদেশী মৎস্যপণ্য নিরাপদ করা। এনআরসিপি কার্যক্রমের মাধ্যমে মৎস্য ও মৎস্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হলো দূষণের সহনশীল সীমা ও সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশের সীমার জন্য নির্ধারিত সম্মত নীতির সামঞ্জস্যতা মূল্যায়ন করা, নিষিদ্ধ/অননুমোদিত পদার্থের অবৈধ ব্যবহার উদঘাটন করা এবং দূষণ অবশিষ্টাংশের উৎস নির্ণয় করা।


৪. মৎস্য মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি পরিচালনা
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় তিনটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মৎস্য মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি পরিচালিত হচ্ছে। মৎস্য ও মৎস্যজাতপণ্যের মাননিয়ন্ত্রের সাফল্যের স্বীকৃতস্বরূপ ২০১৫ সালে
EU-FVO Audit Team –এর সুপারিশে মৎস্যপণ্য রপ্তানিতে প্রতিটি কনসাইনমেন্টের সাথে টেস্ট রিপোর্ট পাঠানোর বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হয়।  


মৎস্য অধিদপ্তর আপামর জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাণিজ আমিষের চাহিদাপূরণে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ মাছ সরবরাহে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং সে লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে একক প্রয়াস এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত সকলের সমন্বিত উদ্যোগ। এর ফলে অর্জিত হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত আর্থসামাজিক উন্নয়ন। বাস্তবায়িত হবে সরকারের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।

মহাপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, রমনা, ঢাকা, ফোন : ৯৫৬২৮৬১, (ইমেইল: dg@fisheries.gov.bd)

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (কাতিক ১৪২৭)

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মোছাঃ মরিয়ম বেগম, গ্রাম: কেরাদারি, উপজেলা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন: পেয়ারায় এক ধরনের সাদা মাছি পোকার আক্রমণ হয়েছে। এ সমস্যা দূরীকরণে কী করবো। জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর:  পেয়ারা গাছের এ ধরণের সমস্যা সাদা মাছি আক্রমণের ফলে হয়ে থাকে।  এ অবস্থায় আপনি এডমায়ার ২০০ এমএল ০.৫০ মিলি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করবেন। অথবা আপনি ইমিটাফ ০.২৫ মিলি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে পারেন। মোছাঃ শারমীন ইয়াছমীন, গ্রাম: দক্ষিণ পাতাকাটা,  উপজেলা: বরগুনা সদর, জেলা: বরগুনা
প্রশ্ন: কাঁঠাল গাছে এক ধরণের পোকার আক্রমণ হয়েছে। এতে করে কাঁঠালের শিকড় ও গুড়ি খেয়ে নষ্ট করে ফেলছে। এ অবস্থায় কী করণীয়?
উত্তর: কাঁঠাল গাছে উঁই পোকার আক্রমণ হলে এমনটি হয়ে থাকে।  প্রতি লিটার পানিতে ক্লোরপাইরিফস গ্রæপের ৫ মিলি মিশিয়ে গাছের গোড়া বা কাÐে স্প্রে করতে হবে।
আবদুর রহিম, গ্রাম: আনুলিয়া, উপজেলা: আসাসুনি, জেলা: সাতক্ষীরা
প্রশ্ন:  বেগুন গাছের পাতা কেমন জানি ছোট হয়ে গেছে এবং পাতাগুলো গুচ্ছাকারে দেখা যাচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান জানাবেন।
উত্তর:  এ ধরণের রোগাক্রান্ত গাছ ক্ষেতে দেখামাত্রই সেটি তুলে ফেলা দরকার। আর আক্রান্ত জমিতে বেগুন ফসলের চাষ না করা। আর বেগুন গাছের বয়স ১ মাস হলেই বাহক পোকা অর্থাৎ জ্যাসিড দমনের জন্য ইমিডাক্লোরপ্রিড যেমন এডমায়ার ১.২ মিলি ও এমিটাফ ০.২৫ মিলি সঠিক নিয়মে স্প্রে করা।
তাবরিজ, গ্রাম: বিষকা, উপজেলা: তারাকান্দা, জেলা:   ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: শসা গাছের পাতা ও ফলে কালো কালো পচা দাগ দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কী করণীয় ?
উত্তর: কলেটোট্রিকাম নামক ছত্রাকের আক্রমণে এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা দূরীকরণে কার্বেনডাজিম গ্রæপের যেমন নোইন ১ গ্রাম বা প্রপিকোনাজল গ্রæপের টিল্ট ০.৫মিলি বা চ্যাম্পিয়ন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে।
মো. রবিউল ইসলাম, গ্রাম: তাহেরপুর, উপজেলা: বাগমারা, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন: তুলার গোড়া ও মূল পঁচা রোগ সমস্যা দূরীকরণে কী করণীয়?
উত্তর: তুলার গোড়া ও মূল পঁচা  রোগ প্রতিরোধের জন্য জমিতে কার্বেন্ডাজিম গ্রæপের যেমন অটোস্টিন প্রতি ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে  মিশিয়ে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
মৎস্য বিষয়ক
মোঃ শরিফ ইকবাল, গ্রাম: সামাইর, উপজেলা: সাভার, জেলা: ঢাকা
প্রশ্ন: পুকুরে বেশি পরিমাণে গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করার কারণে মাছ মারা যাচ্ছে, কী করবো ?
উত্তর: আপনার সমস্যাটি থেকে মুক্তি পেতে পুকুরে নতুন পানি ঢুকাতে হবে। পুকুরে শতকপ্রতি ৫০০ গ্রাম করে চুন প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ ও কম্পোস্ট সার দিয়ে পুকুরের পানির রঙ সবুজ করতে হবে। তারপর পুকুরে পোনা মজুদ করতে হবে ।
মোঃ হুমায়ুন কবির, গ্রাম: পূর্বভীষণদই, উপজেলা: হাতিবান্ধা, জেলা: লালমনিরহাট
প্রশ্ন: পানির উপর লাল স্তর পড়েছে, কিভাবে দূর করব ?
উত্তর: এগুলো এক ধরণের প্ল্যাংটন। এগুলোকে কাপড় দিয়ে টেনে অথবা ধানের খড় বা কলার পাতা দিয়ে দড়ি তৈরি করে টানা দিয়ে লাল স্তরটি তুলে ফেলতে হবে। এ সময় খাবার এবং রাসায়নিক সার বন্ধ রাখতে হবে। এছাড়া পুকুরের পানিতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক যেন পৌঁছাতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।  
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
মোছাঃ রাহেলা বেগম, গ্রাম: পীড়ানচর, উপজেলা: শিবগঞ্জ, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রশ্ন: আমার বাড়ির মুরগিগুলোর পায়ুস্থানে ময়লা লেগে থাকছে। পালকগুলো কুঁচকে আছে,ডায়রিয়া হচ্ছে। এমতাবস্থায় কী করণীয়। পরামর্শ চাই।  
উত্তর:  আপনার মুরগিগুলোর গামবোরো রোগ হয়েছে। এই রোগ যাতে না হয় সেজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১০ থেকে ২১ দিনে বয়সে গামবোরোর টিকা প্রদান করতে হয়। আর রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য এনফ্লক্স ভেট সলিউশন অথবা কট্রা ভেট পাউডার এবং সাথে ইলেকট্রোমিন পাউডার খাওয়াতে হবে।  
মোঃ তালেবুর রহমান, গ্রাম: দাশের গাও, উপজেলা: বন্দর, জেলা: নারায়ণগঞ্জ
প্রশ্ন: আমার ছাগলের বাচ্চা হয়েছে ৩ দিন হলো। ওলান শক্ত হয়ে গেছে ও বাঁটসহ ফুলে ওঠেছে। এমতাবস্থায় কী করবো?
উত্তর: প্রথমত পরিচ্ছন্ন জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। সংক্রমিত ওলান থেকে দুধ দিনে ২-৩ বার বের করে আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। এমপিসিলিন প্রতি ৮ ঘন্টা পরপর ৩ মিলিগ্রাম/ কেজি ইনজেকশন প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। সঙ্গে কিটোপ্রফেন গ্রæপের ওষুধ খাওয়াতে হবে অথবা ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হবে।য়
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫,  ফোন নং: ০২-৫৫০২৮৪০০, ই-মেইল : taufiquedae25 @ gmail. com

 

 

বিস্তারিত
মুজিববর্ষে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা : শূন্য চাষ পদ্ধতি

ড. মো. আব্দুল মালেক১ ড. মো. আজিজুল হক২

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দেশ আজ  দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে দেশের মানুষকে এখন আর ক্ষুধায় না খেয়ে থাকতে হয় না। তবে চাহিদার তুলনায় ভোজ্যতেলের মোট দেশজ উৎপাদন অনেক কম হওয়ায় প্রতি বছর ঘাটতি মোকাবেলায় বিদেশ হতে ভোজ্যতেল আমদানি করতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। দেশে ভোজ্যতেলের মূল উৎস হলো সরিষা এবং সামান্য পরিমাণে সূর্যমুখী, সয়াবিন ও তিল এবং রাইস ব্রান যা থেকে সর্বমোট ৫.০ লক্ষ টনের কাছাকাছি ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। এ হিসেবে দেখা যাচ্ছে দেশের প্রয়োজনীয় ভোজ্যতেলের ঘাটতি থাকে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র ৪.০ শতাংশ তেলফসল আবাদে ব্যবহৃত হয়। এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে আমাদের এখনই প্রয়োজন তেল ফসলের চাষাবাদ বৃদ্ধি করে তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া।


বাংলাদেশের ধান নির্ভর রোপা আমন-পতিত-বোরো শস্য বিন্যাসটি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বিগত প্রায় এক দশকের ও বেশি সময় হতে দেশে স্বল্প    জীবনকালের আমন ধান যেমন বিনা ধান-৭ ও ব্রি ধান-৩৩ এবং পরবর্তীতে বিনা ধান-১৬, বিনা ধান-১৭, ব্রি ধান-৭১ ও ব্রি ধান-৭৫ এবং সম্প্রতি ব্রি ধান-৯০ ও বিনাধান-২২ উদ্ভাবিত হয়েছে। স্বল্প জীবনকালের আমনের এ জাতগুলো কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হওয়ায় রোপা আমন-পতিত-বোরো শস্য বিন্যাসে স্বল্প  জীবনকালের আমন ধান সংগ্রহের পর স্বল্প জীবনকালের অথচ উচ্চফলনশীল সরিষা জাত বিনা সরিষা-৪, বিনা   সরিষা-৯ ও বিনা সরিষা-১০, বারি সরিষা- ১৪,  বারি    সরিষা- ১৫ এবং বারি সরিষা-১৭ চাষ করা হচ্ছে ফলে প্রচলিত আমন ধান-পতিত-বোরো ধান শস্য বিন্যাসটি পর্যায়ক্রমে রোপা আমন-সরিষা-বোরো শস্যবিন্যাসে রূপান্তরিত হচ্ছে। প্রচলিত শস্য বিন্যাসটিকে সম্পূর্ণ রূপে রোপা আমন-সরিষা-বোরো ধান শস্য বিন্যাসে রূপান্তরিত করতে হলে বাস্তবতার নিরিখে সরিষা চাষাবাদ পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। দেশে বর্তমানে চাষকৃত স্বল্প জীবন কালের রোপা আমন ধানের জাতসমূহ সংগ্রহের পর প্রচলিত পদ্ধতিতে জমি প্রস্তুত সরিষা চাষ করতে হলে জমি সম্পূর্ণ জো অবস্থায় আসার পর ভালোভাবে শুকিয়ে বীজ বপন করতে হয়, কারণ জো অবস্থায় আসার আগেই জমি চাষ দিলে এবং মাটির বেশি আর্দ্রতায় বীজ বপন করলে অংকুরোদগম ঠিকভাবে হলেও পরবর্তীতে সবিষার বৃদ্ধি খুবই ধীর গতিতে হয়। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে এ পদ্ধতিতে সরিষা চাষ করা সম্ভব হলেও নিচু এবং ভারি বুনটের মাটিতে আমন ধান সংগ্রহের পর মাটির আর্দ্রতা বেশি থাকায় জমিতে জো আসার পর চাষ দিয়ে সরিষা আবাদ করতে গেলে বিলম্ব হয় বিধায় সরিষা চাষ করা সম্ভব হয় না। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেরিতে বপন করে সরিষা আবাদ করা সম্ভব হলেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না এবং পরবর্তী বোরো ধান চাষের ক্ষেত্রেও চারা দেরিতে রোপণ করতে হয় বিধায় বোরো ধানের ফলন কমে যাওয়াসহ সংগ্রহের সময় ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ফলন হ্রাসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলশ্রæতিতে  কৃষকগণ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া বিগত কয়েক বছরে আমন ধান সংগ্রহকালীন পরিবর্তিত আবওহাওয়াজনিত কারণে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে মাটির আর্দ্রতা প্রায় শতভাগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, ফলে চাষ দিয়ে সরিষা আবাদ করা সম্ভব হয়ে উঠে না বিধায় জমি পতিত রাখতে হয়। তাছাড়া দেশের বরিশাল অঞ্চলের কিছু এলাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত রোপা আমন-পতিত-পতিত শস্যবিন্যাসে রোপা আমন সংগ্রহ পরবর্তী পতিত জমি এবং বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের বোরো-পতিত-পতিত শস্য বিন্যাসে বোরো ধান চাষের পূর্বে পতিত জমিতে শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সরিষা চাষের সুযোগ আছে। উল্লিখিত সমস্যা হতে উত্তরণ কল্পে রোপা আমন ধান সংগ্রহের পর এবং বোরো ধান চাষের পূর্বে বিনা চাষে সরিষা চাষের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।


এ পদ্ধতিতে সরিষা চাষ দেশে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো (বিবিএস) এর তথ্যে দেখা যায় গত ২০১৮ সালে দেশে ৪৬.২১ লক্ষ টন ভোজ্যতেল আমদানিতে ২৭.৭৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কর হয়েছে, যদিও আমদানিকৃত তেলের বড় একটি অংশ শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হয়। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওযায় বিগত কয়েক বছরে এই আমদানিহার পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক ৪০ গ্রাম হারে ভোজ্যতেল প্রয়োজন হলে ২০২১ সালে দেশে ভোজ্যতেলের মোটচাহিদা হবে প্রায় ২৫.০ লক্ষ মেট্রিক টন।


আমরা জানি সরিষার ফলন রাসায়নিক সারে বেশ সাড়া দেয়। তাই শূন্য চাষ পদ্ধতির মাধমে সরিষা চাষে সারের বিভিন্ন মাত্রার প্রভাব পর্যবেক্ষণে বিনা উপকেন্দ্র মাঠ, ঈশ্বরদী, পাবনায় বিনা উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও স্বল্প জীবনকালের সরিষার জাত বিনা সরিষা-৯ ব্যবহার করে একটি পরীক্ষণ সম্পন্ন করা হয়। উল্লেখ্য পরীক্ষণটি ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে স্থাপন করা হয়েছিল, যা সরিষা বপনের উপযুক্ত সময়ের এক মাস পর। পরীক্ষণটিতে রাসায়নিক সারের বিভিন্ন কম্বিনেশনের ফলাফলে দেখা যায় যে, সুপারিশকৃত সকল রাসায়নিক সারের ১০০% প্রয়োগে ১১১৭ কেজি/হে. ফলন পাওয়া যায়। উল্লেখ্য বিলম্বে অর্থাৎ সঠিক সময়ের চেয়ে একমাস পরে বপনজনিত কারণে ফলন আশানুরূপ হয়নি।


উক্ত ফলাফলদ্বারা  প্রতীয়মান হয় যে, শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদে সুষম মাত্রার সার প্রয়োগের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধিসহ সরিষার দেশীয় মোট উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। উপযুক্ত সময়ের চেয়ে প্রায় একমাস পরে বপনজনিত কারণে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে ২০১৯-২০ মৌসুমে নভেম্বর মাসের প্রথম হতে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে চাষবিহীন জমিতে বীজ বপন করে বিনা প্রধান কার্যালয় খামার এবং উপকেন্দ্র ঈশ্বরদী, মাগুরা, কুমিল্লা ও সাতক্ষীরার মাধ্যমে উপকেন্দ্র গবেষণা মাঠ এবং কৃষকের মাঠে সুপারিশকৃত সকল রাসায়নিক সারের ১০০% তবে ধীরগতিতে দ্রবণশীলটি   এসপি’র পরিবর্তে অধিকতর দ্রæত দ্রবনশীল ডিএপি প্রয়োগের মাধ্যমে জাতটি চাষ করে হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৪৩০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।


শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সার ও সেচ প্রয়োগ : এ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদের ক্ষেত্রে ইউরিয়া সারের এক তৃতীয়াংশ (একরপ্রতি ২০ কেজি) এবং অন্যান্য রাসায়নিক সারের পুরোটাই (একর ডিএপি ৭৫ কেজি, এমওপি ৫০ কেজি, জিপসাম ৫৫ কেজি, জিংকসালফেট ৪ কেজি এবং বোরিক এসিড ৩ কেজি) একত্রে জমিতে প্রয়োগ করে পরে বীজ বপন করতে হবে এবং ইউরিয়ার এক তৃতীয়াংশ (একর প্রতি ২০ কেজি) বীজ বপনের ১৫ দিন পর আর অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া (একর প্রতি ২০ কেজি) ফুল আসা পর্যায়ে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখ্য, শূন্য চাষ পদ্ধতিতে টিএসপির পরিবর্তে ডিএপি ব্যবহার করতে হবে, কারণ টিএসপির তুলনায় ডিএপি দ্রæত দ্রবনশীল। তাছাড়া এ  পদ্ধতিতে সরিষা আবাদের ক্ষেত্রে ফলনে পানি সেচ ও বিশেষ ভ‚মিকা রাখে তাই হালকা বুনটজনিত কারণে মাটিতে রসের অভাব হলে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায় ও ফুল আসার সময় সেচ প্রয়োগ করতে হবে।


বীজ হার, বপন সময় ও জমি নির্বাচন : একর প্রতি ৩ কেজি বীজ ব্যবহার করতে হবে। ভাল ফলন পেতে হলে উপযুক্ত সময়ে অর্থাৎ কার্তিক মাসের ২য় সপ্তাহ হতে শেষ পর্যন্ত (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ হতে মধ্য নভেম্বর) বীজ বপন করতে হবে। তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের নিচু জমিতে আমন ধান দেরিতে রোপণজনিত কারণে দেরিতে সংগ্রহ হয় বিধায় দুইটি অঞ্চলে জানুয়ারি মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত নাবিতে বপনযোগ্য বিনা সরিষা-৪ ও বিনা  সরিষা-৯ এর বীজ বপন করা যাবে। আরও বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেসব এলাকায় আমন ধান কাটার পর জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকে অর্থাৎ জমিতে হাটলে মাটিতে পায়ের ছাপ পড়ে এমন জমিতে শূন্য চাষে সরিষা আবাদ করতে হবে। তাছাড়া আমন ধান সংগ্রহের পর জমিতে আগাছার উপদ্রব হয় না বা তুলনামূলকভাবে কম হয় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে।


বাণিজ্যিক কৃষিতে প্রভাব : বর্তমান বাণিজ্যিক কৃষিতে শস্যবিন্যাসে ফসলসহ এমন চাষাবাদ পদ্ধতি নির্বাচন করতে হবে যাতে ফসল চাষে লাভ তুলনামূলকভাবে বেশি আসে। এক্ষেত্রে রোপা আমন - পতিত - বোরো শস্য বিন্যাসে শূন্য চাষ পদ্ধতিতে রোপা আমন এবং বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে খুবই কম খরচে সরিষা আবাদ করে কৃষকগণ লাভবান হতে পারেন। কারণ এ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হয়।এ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদে একর প্রতি রাসায়নিক সার প্রয়োগ, প্রয়োজনে একটি সেচ দেয়া এবং পাতা ও  ফলের অল্টারনারিয়া বøাইট রোগ ও জাবপোকা দমনে বালাইনাশক প্রয়োগ এবং সরিষা সংগ্রহ ও মাড়াই বাবদ আনুমানিক ১৩ হতে ১৪ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। একরপ্রতি গড়ে ১২ মণ সরিষার ফলন প্রাপ্তিতে আয় হতে পারে প্রায় ২৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিনাচাষ পদ্ধতিতে সরিষা আবাদ করে উৎপাদন খরচ বাদে একরপ্রতি প্রায় ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব।


বিনা চাষে সরিষা আবাদের মাধ্যমে দেশীয় সরিষার উৎপাদন তথা ফলন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে রাসায়নিক সার ও সেচ প্রয়োগ এবং বিভিন্ন আন্তঃপরিচর্যা বিষয়ে মাঠপর্যায়ে আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন। শূন্য চাষ পদ্ধতিতে সরিষা চাষ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাগণকে বিশেষ ভ‚মিকা পালনসহ সংশ্লিষ্ট সরিষা চাষাধীন এলাকায় কৃষক প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মাঠ প্রদর্শনী স্থাপনসহ মাঠ দিবসের আয়োজন করতে হবে।

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ-২২০২ মোবাইল: ০১৭১২১০৬৬২০, ইমেইল: malekbina@gmail.com   

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook