কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৯:১৭ PM

হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫

হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে
সমীরণ কুমার সিংহ১ নায়লা ফাহমিন রাসহা২
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। বৈশ্বিক অগ্রগতির পরেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনও নিরাপদ খাদ্য থেকে বঞ্চিত। ক্ষুধা এখনও অনেক স¤প্রদায়ের জন্য প্রধান সমস্যা এবং পুষ্টিকর ও টেকসই খাবারের নিশ্চয়তা এখনও সর্বজনীন নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) দীর্ঘদিন ধরে টেকসই কৃষি, উন্নত পুষ্টি, পরিবেশ রক্ষা এবং সবার জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে পথটা এখনও দীর্ঘ, তাই এখনই প্রয়োজন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের।
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস, যার মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ২০২৫ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে’, যা সা¤প্রতিক সময়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আহŸান। সারাবিশ্বের খাদ্যাভাব দূরীকরণ একক কোনো সংস্থা, সরকার বা নীতি দ্বারা সম্ভব নয়- এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস। শুধু ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ গড়তে পারি- যেখানে প্রতিটি মানুষ খাদ্যের নিশ্চয়তা পায়, শুধু বাঁচার জন্য নয় বরং উন্নতি ও নিজেদের বিকাশের জন্য এটি অপরিহার্য।
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৭০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও নিরাপদ খাদ্য পায় না  (FAO, ২০২৪)। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষ ক্ষুধাজনিত কারণে প্রাণ হারায়, যাদের বড় অংশ শিশু (UNICEF, ২০২৩)। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ- প্রভৃতি সংকটগুলো বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটাচ্ছে। এই সংকট শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিকও। পুষ্টিহীনতা উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে, কর্মক্ষমতা দুর্বল করে এবং জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। চাল, শাকসবজি, মাছ, ডিম ও পশুপালনে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। তারপরও দেশ পুষ্টি সমস্যায় ভুগছে প্রায় ১৪% শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত এবং ২৮% শিশু বিকাশে বিলম্বিত, যা তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে (বিশ্বব্যাংক ও UNICEF, ২০২৩)। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখনও খাদ্য উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), একটি বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি, ঋঅঙ বাংলাদেশ নীতি নির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক তথ্য, বৈশ্বিক মানদÐ, টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমে দেশকে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো :
টেকসই কৃষি স¤প্রসারণ 
এফএও কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার প্রতিটি খাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফসল ((Programme on Agricultural and Rural Transformation for Nutrition, Entrepreneurship and Resilience-PARTNER),পশুপালন (The Livestock and Dairy  Develpment Project-LDDP),মৎস্য¨ (Sustainable Coastal and Manine Fisheries Project-SCMFP) এবং বনজ (Sustainable Forests and Livelihood Project-SUFAL) খাতে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রকল্প, এ প্রকল্পগুলো জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি (ঈঝঅ) নির্ভরকেন্দ্রিক উৎপাদন বাড়ায়, জলবায়ু সহনশীলতা তৈরি করে এবং খাদ্য ব্যবস্থার কার্বন নির্গমন কমায়।Codex Alimentarius এর বিধানকারক এবং উত্তম কৃষি চর্চা এর প্রচারক হিসেবে ঋঅঙ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। Sustainable Agricultural        Mechanization (SAM) ফ্রেমওয়ার্ক বাংলাদেশে কৃষক মাঠ স্কুলে প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ  Laureate’ হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে- এটি টেকসই  কৃষি উদ্ভাবন ও জ্ঞান আদান প্রদানে বাংলাদেশের নেতৃত্বকে প্রতিফলিত করে।
পুষ্টি উন্নয়ন উদ্যোগ
অপুষ্টজনিত সমস্যা সমাধানে FAO Nutrition Smart  Village I Nutri-Finance  ধারণা প্রচার করছে, যা সরকার, এনজিও ও উৎপাদক সংগঠনকে এক করে স্থানীয়পর্যায়ে পুষ্টি উন্নয়নে কাজ করে।
Monitoring Food and Agricultural Policies (MAFAP)- এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঋঅঙ গ্রামীণ খাদ্য ব্যয়ের প্রবণতা এবং খাদ্যাভাস বিশ্লেষণ করছে, যা নীতি নির্ধারকদের পুষ্টিসম্মত নীতি এবং বিনিয়োগের পথ তৈরি করতে সাহায্য করছে।
৩. দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা বাড়ানো
জলবায়ু-সংক্রান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় ঋঅঙ কমিউনিটি ও সরকারের সক্ষমতা বাড়াচ্ছেQ Community-driven Climate Finance Insurance (CDRFI)  মডেলের মাধ্যমে যা স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং ভ‚মিধস ও খরার মোকাবিলায়Early Warning Systems (EWS)  এর মাধ্যমে প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
Integrated Food Security Phase Classification (IPC) Ges Data in Emergencies Monitoring System (DIEM)  এর মতো তথ্যভিত্তিক সহায়ক টুলস ব্যবহার করে নীতিনির্ধারকদের তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করে, যার মাধ্যমে দ্রæত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়, যা জীবন বাঁচায় এবং জীবিকা রক্ষা করে।
কৃষি মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়ন
ক্ষুদ্র কৃষকদের বাজার, অর্থসেবা ও প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করার জন্য ঋঅঙ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম RuralInvest, FAO Micro Banking System (MBWin) I Open Foris Arena Tool  চালু করেছে। এগুলো কৃষক সংগঠনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং বাজারে টেকসই অংশগ্রহণকে সহজ করে তোলে; যার ফলে গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য ব্যবস্থার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়।
ক্ষুধামুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে একটি সম্মিলিত দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশ সরকার খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি সহায়তায় উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে যেমন: Vulnerable Group  Development Programme (VGD), Viability Gap Financing (VGF), Trading Corporation of Bangladesh (TCB), স্কুল ফিডিং প্রকল্প, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রচেষ্টা এবং গবেষণা ও উৎপাদনে ব্যবহৃত কৃষি উপকরণে ভর্তুকি ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপ খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং কৃষিখাতে ব্যয় সাশ্রয়ে ভ‚মিকা রেখেছে। শক্তিশালী নীতি, সমতা নিশ্চিত ভর্তুকী এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রযুক্তি, অর্থ এবং সক্ষমতা স¤প্রসারণের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করছে। খাদ্য অপচয় রোধ এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে জনগণকে সচেতন হতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, টেকসই কৃষি, অগ্রগতিশীল নীতি, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং জনগণের সচেতনতা- এসব একইসাথে প্রবাহিত হলে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য ‘হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে’ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অপুষ্টির মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত প্রয়াসই একমাত্র সমাধান যাতে সবাই, সর্বত্র নিরাপদ, পুষ্টিকর ও টেকসই খাবারে প্রবেশাধিকার পায়।
আসুন, আমরা সবাই হাতে হাত রেখে কাজ করি, যাতে বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবী ক্ষুধামুক্ত, সুস্থ ও টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে। 

লেখক :  ১প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), মোবাইল : ০১৬৭৬৪৪২৬৮০, ই-মেইল : Samiron.Singh@fao.org  ২কমিউনিকেশন্স স্পেশালিস্ট, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ), ই-মেইল : naila.rasha@fao.org

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন