কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:২৯ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫
হাওর অঞ্চলের বাস্তবতা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভবনা
ড. মো: হুমায়ূন কবীর
বাংলাদেশের ভূবৈচিত্র্যের এক অনন্য স্বতন্ত্র দিক হচ্ছে হাওর। বাংলাদেশের বিশাল অংশ হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া অর্থাৎ এই সাত জেলার প্রায় ৮ দশমিক ৫৮ লাখ হেক্টর জমি নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে ছোটো-বড়ো ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে। জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার। বিল রয়েছে ৬ হাজার ৩০০।
অসীম সম্ভাবনা বুকে ধারণ করে জেগে আছে হাওর। সম্ভাব্য সবকিছু থাকা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে হাওরাঞ্চল গুরুত্বহীন অব্যবস্থাপনার অনগ্রসরমাণ অবস্থায় পতিত। যদি হাওরের অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ কাজে লাগানো যায়, তাহলে একদিকে যেমন হাওরবাসী উপকৃত হবে, তেমনি দেশের অর্থনীতি আরোও সমৃদ্ধিশালী হবে। শুকনো ও বর্ষায় হাওরাঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বহুমুখী ও পরিকল্পিত উপায়ে উদ্যোগ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিলে খুলে যাবে অপার সম্ভাবনাময় দুয়ার। হাওরাঞ্চল উন্নয়নের জন্য বিবেচ্য বিষয় হতে পারে :
হাওরবাসীর ফসল রক্ষার জন্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাজা-মজা পুকুর-ডোবা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় খনন করতে হবে; নদীর দুই পাড়ে, হাওরের পতিত উঁচু জমিতে, গ্রামের চারপাশে ব্যাপক হারে পানিসহিষ্ণু বৃক্ষ রোপণের জঙ্গল তৈরি করে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মেটানো যেতে পারে। জঙ্গলে বর্ষায় মাছের উত্তম জায়গা হবে। প্রচুর খাবার মিলবে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি হবে; ঢেউয়ের আঘাতে অরক্ষিত ভিটেবাড়ি রক্ষার ববস্থা নিতে হবে; শুধু ধান চাষে নির্ভরশীল না করে হাওরবাসী কৃষকদের বহুমুখী চাষাবাদে আগ্রহী করতে হবে। কৃষকদের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; পাহাড়ি বোর্ডের ন্যায় হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে প্রশাসনিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে; হাওর মৎস্য ও কৃষি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যেতে পারে; হাওরাঞ্চলের অবস্থা, প্রকৃতির ধরন, অবকাঠামোর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী অবকাঠামোগত ব্যবস্থা এবং ভাসমাণ বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করতে হবে; হাওরাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরের জীববৈচিত্র্য বিষয়ক ফ্যাকাল্টি রাখা যেতে পারে; ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুবিধা দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প চালু করতে হবে; হাওরাঞ্চলের প্রকৃত পরিবেশকে উপজীব্য করে সেখানে পর্যটনের ব্যবস্থা করতে হবে; উন্নত পাথর, বালু ও সিমেন্টের সহজলভ্যতা থাকায় বৈদ্যুতিক পোল এবং সিরামিক কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে; দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হাওরাঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও পাঠ পরিক্রমা চালু করতে হবে; হাওর এলাকার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য,সংস্কৃতি, জীবন-সংগ্রাম প্রভৃতি সংরক্ষণে সেখানে একটি ‘হাওর মিউজিয়াম’ করা অত্যাবশ্যক; হাওরে সৌর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; নারীদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে; মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, একাধিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বর্ষায় হাওরের পানিতে নির্দিষ্ট স্থানে ঘের করে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ব্যাপকভাবে অবমুক্ত করতে হবে। এই পোনা বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার পর মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পারে। মুক্ত জলাশয়ে ঘের পদ্ধতিতে মাছের চাষ এবং ভাসমান সবজি চাষের কথা ভাবা যেতে পারে; শুকনো মৌসুমে দেখা যায় মাঠের পর মাঠঘাস আর ঘাস। এই ঘাস আর মাঠকে কেন্দ্র করে দুগ্ধখামার, গরু মোটাতাজাকরণ ও ছাগল পালন প্রকল্প করা যেতে পরে; শুকনো সময়ে পতিত জমিকে কী করে উৎপাদনশীল হিসেবে তৈরি করা যায়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
অকালবন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য ফসল রক্ষা বাঁধের পাশাপাশি নদী খননের মাধ্যমে পানি ধারণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। হাওরের ইজারাদারদের যেসব শর্ত সাপেক্ষে ইজারা দেওয়া হয়, সেগুলো হলো: হাওরের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য খনন করা, হিজল করচগাছ লাগানোসহ হাওরের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভূমিকা রাখা। সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০০৯ এর ৭ এর ক্রমিক নং ২১. বন্দোবস্তকৃত/ ইজারাকৃত জলমহালের কোথাও প্রবাহমান প্রাকৃতিক পানি আটকে রাখা যাবে না, ২২. যে সকল জলমহাল থেকে (নদী, হাওর, খাল ইত্যাদি) জমিতে সেচ প্রদানের সুযোগ রয়েছে সেখান থেকে সেচ মৌসুমে সেচ প্রদান বিঘিœত করা যাবে না। যেসব বদ্ধ জলমহাল বন্দোবস্তু/ইজারা দেয়া হবে, সেখান থেকে মৎস্য চাষের ক্ষতি না করে পরিমিত পর্যায়ে সেচ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকবে। এ ব্যাপারে ২০ একরের ঊর্ধ্বেও সরকারি জলমহালের ক্ষেত্রে জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ২০ একর পর্যন্ত সরকারি জলমহালের ক্ষেত্রে উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং ২৩. সরকারি জলমহালের পাড়ে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বনজ সম্পদ বৃদ্ধির জন্য বন্দোবস্তু গ্রহীতা সমিতি চুক্তিবদ্ধ থাকবেন (ইজারা চুক্তিতে তার উল্লেখ থাকবে) কৃষকদের বিনামূল্যে/ভর্তুকিমূল্যে বীজ, সার এবং অন্যান্য উপকরণসহ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো ও চাহিদামাফিক অন্যান্য প্রণোদনা কার্যক্রম বৃদ্ধি ও চলমান রাখা প্রয়োজন।
হাওর এলাকার বোরো ধান তোলার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষকরা ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য কাজের জন্য ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নেয়া।
টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওরসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমান এখানে। কিন্তু যথাযথ কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেয়া কোনো নিয়মনীতি না মানায় পর্যটকরা হাওরে ভ্রমণের সময় বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলে পরিবেশদূষণ করেন। এদিকে দৃষ্টি না দিলে ভবিষ্যতে এসব হাওরে মাছ উৎপাদন পিছিয়ে পড়বে। এর জন্য কিছু লোক নিয়োগ করে পর্যটকদের নিয়মনীতিগুলো কঠোরভাবে মানতে হবে। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এ এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। এ ছাড়া অতিথি পাখির নিরাপত্তা প্রদান, পোনা মাছ সংরক্ষণসহ গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কাজেই হাওর অঞ্চলের এসব সমস্যা দূর করতে হলে একটি বৃহৎ পরিকল্পনা নেয়া দরকার। আর হাওর এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য ব্যক্তি উন্নয়নমুখী নীতি পরিহার করে প্রকৃতপক্ষে দেশের উন্নয়নমুখী নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
হাওর এলাকার কৃষির সমস্যা/প্রতিবন্ধকতা
রবি মৌসুমে সেচ সুবিধার অভাব; কৃষি কাজে শ্রমিকের অভাব; জমির মালিকদের অধিকাংশই বিদেশে অবস্থান করেন; সেচ নালা ভরাট হয়ে যাওয়া; অকাল ও আকস্মিক বন্যা এবং খরা; কৃষি জমিতে ইটের ভাটা ও কল কারখানা স্থাপন; ফসলি জমির টপ-সয়েল অপসারণ; কৃষি কাজে অনীহা; অবাদ গোচারণ; মাটির অম্লতা ও এটেল মাটি।
হাওর এলাকার কৃষির উন্নয়নে সুপারিশ/পরামর্শ
উন্নয়ন সহায়তায় পাওয়ার টিলার/ট্রাক্টর বিতরণ করলে আবাদি জমি বৃদ্ধি পাবে; উন্নয়ন সহায়তার আওতায় সেচের জন্য গভীর নলকূপ/সোলার সেচ স্থাপন করলে আবাদ বৃদ্ধি পাবে; বিনামূল্যে/উন্নয়ন সহায়তায় ফিতা পাইপ ও এলএলপি বিতরণ করলে আবাদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে; বিদেশী মালিকানা জমি পতিত রাখা যাবে না এরূপ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে; গরু- ছাগলের অবাধ বিচরণ রোধে ইউনিয়ন ওয়ার্ডভিত্তিক খোয়াড় নির্মাণ করা প্রয়োজন; খাল-ছড়া, নদী পুনঃখনন; ফসলি জমির টপ-সয়েল অপসারণ বন্ধ করা; কৃষি জমিতে শিল্প কারখানা, বাড়িঘর, হাটবাজার, ইটের ভাটা স্থাপন বন্ধ করা; ভর্তুকি মূল্যে কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার টিলারসহ অন্যান্য কৃষিযন্ত্র সরবারাহ করা; অনাবাদি জমির মালিক/কৃষকদের তালিকা তৈরী করে তাদেরকে ফসল চাষে উৎসাহী করা; উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদনে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করা; কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধকরণ এর মাধ্যমে মহিলাদের অংশগ্রহন বাড়ানো; খাল/ছড়া/নদী নালা/জলাধার খনন/সংস্কারপূর্বক পানির উৎস তৈরিপূর্বক সোলার সেচ, বারিডপাইপ স্থাপন ও সেচযন্ত্র বিতরণ; সেচকাজে ব্যবহত প্রাকৃতিক জলাধার লিজ না দেয়া; নসুরমা, কুশিয়ারা ও অন্যান্য নদী থেকে ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে সেচ সুবিধা চালুকরণ; জমির প্রবাসী মালিকদের বছরব্যাপী চাষাবাদে আগ্রহী করতে কৌশল নির্ধারণ; পাইলটিং গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন করে সেচসুবিধা বৃদ্ধির সম্ভাবতা যাচাইকরণ; পতিত জমি চাষাবাদে আনয়নের জন্য বিনামূল্যে সেচ সুবিধা প্রদান; হাওরে আশ্রয়শেড ও থ্রেসিং ফ্লোর নির্মাণ।
লেখক : সহকারী প্রকল্প পরিচালক (প্রশিক্ষণ); ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন এমারজেন্সি এসিস্টেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ); কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১২৫৩৭৩৬৪;