কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৩ এ ০৩:২৭ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ২০-১১-২০২৩
স্মার্ট ফসল, স্মার্ট মাটি ও স্মার্ট উদ্ভাবনী চিন্তায় বাঁচাও ধরিত্রি
ড. মোঃ আব্দুল আউয়াল১ ড. মোঃ জাকির হোসেন২
মৃত্তিকা হলো জীব, খনিজ এবং জৈব উপাদান দ্বারা গঠিত একটি জগত যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষ এবং প্রাণীদের জন্য খাদ্য সরবরাহ করে। আমরা জেনে অবাক হবো যে, এক টেবিল চামচ মাটিতে পৃথিবীর মানুষের চেয়ে বেশি জীবন্ত প্রাণী রয়েছে। আমাদের খাদ্যের ৯৫% আসে মাটি থেকে। ১৮ টি প্রাকৃতিকভাবে ঘটমান রাসায়নিক উপাদান উদ্ভিদের জন্য অপরিহার্য, যার ১৫টি মৃত্তিকা সরবরাহ করে থাকে। তাই মানুষের পুষ্টির মতো মাটির পুষ্টি রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি। কারণ মাটিতে পুষ্টির ঘাটতি হলে পুষ্টির ঘাটতিযুক্ত উদ্ভিদ তৈরি হবে এবং পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের চিত্রটি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএ)-এর ১৫ নং লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের টেকসই ব্যবহার রক্ষা, পুনরুদ্ধার এবং প্রচার, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণের বিরুদ্ধে লড়াই, জমির অবক্ষয় বন্ধ ও বিপরীত করা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বন্ধ করতে হবে। সে লক্ষ্যে সকল স্থলজ প্রাণীর খাবারের প্রধান উৎস এবং বাস্তুতন্ত্রের ধারক ও বাহক মৃত্তিকার স্বাস্থ্য রক্ষার টেকসই ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর সকল জীবের খাদ্য উৎপাদনের শুরুটা মাটি থেকেই। মানুষের বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রধান উৎসও এই মৃত্তিকা। তাই মৃত্তিকা সম্পদকে যথাযথভাবে সুস্থ রাখার উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের মানুষের জীবিকা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। প্রতিটি ফসল চাষের পর জমি তার পুষ্টি হারায় এবং উর্বরতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। জমির ক্রমহ্রাসমান উর্বরতা এখন বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্বের জন্য সবচেয়ে জটিল সমস্যা হিসেবে বর্তমান বিশ্বে স্বীকৃত। কারণ মাটির পুষ্টির অবক্ষয় মাটিকে পুনঃ পুনঃ পুষ্টির ক্ষয় করতে প্ররোচিত করে এবং ফসল উৎপাদনের সহযোগিতা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আবার অন্যদিকে মাটিতে বিদ্যমান অদৃশ্য জীবন্ত প্রাণীর মিথস্ক্রিয়ায় একটি বিষাক্ত পরিবেশের প্রতিনিধিত্ব করে, যা পরিবেশকে দূষিত, আবহাওয়াকে অনিশ্চিত এবং জলবায়ুকে অনিয়ন্ত্রিত করে। পাশাপাশি অসমহারে ও যথেচ্ছভাবে মাটির অম্লমান নিয়ন্ত্রণ অথবা পরীক্ষা না করে রাসায়নিক সার প্রয়োগ, জৈবসার ব্যবহার না করা পরিমাণ অনুযায়ী, ফসল চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভূমি কর্ষণ, শস্যপর্যায় নীতিমালা অনুসরণ না করা, উফশী ও হাইব্রিড জাতের ফসলের আবাদ বৃদ্ধি, ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে ব্যবহার না করা ইত্যাদি মাটির স্বাস্থ্য বিনষ্টের প্রধান কারণ।
দৈনন্দিন ব্যবহারে প্লাস্টিক ব্যাগ হয়ে ওঠছে নিত্য সঙ্গী। একটি প্লাস্টিক ব্যাগ ১০ থেকে ২০ বছর, প্লাস্টিক বোতল ৪০০ বছর এবং গ্লাস চার হাজার বছর পর্যন্ত মাটিতে অবিকৃত থেকে মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত ৮.৫ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক না হওয়ার কারণে ভরাট হচ্ছে খাল বিল নদীর তলদেশ। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে শরীরে ঢুকছে মাইক্রোপ্লাস্টিক এর মতো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভয়ংকর উপাদান, যার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন জটিল রোগের। দূষিত মাটি একই সাথে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানির উৎস এবং ভূ-উপরিস্থ জলাধারসহ সব ধরনের পানির উৎসকে আর্সেনিক দূষণের মতো বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান (ঐবধাু সবঃধষং) দ্বারা দূষিত করছে। বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে মিশে দূষণের শিকার হচ্ছে ১০ লাখের বেশি সামুদ্রিক পাখি, মাছসহ নানা জলজপ্রাণী। পুঁজিবাদ এবং এর সাথে শিল্প বিপ্লব-এর বর্ণিল মোড়কে আবাদযোগ্য উর্বর জমির পরিমাণ কমিয়ে, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের শত শত কার্যকলাপের আড়ালে বাণিজ্যিক পরিকল্পনার ‘¯ে¬া-পয়জনিং’-এ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু আর বিদ্রোহী হয়ে উঠছে আমাদের এই প্রিয় ধরিত্রীর কেন্দ্রস্থল মাটি। প্রিয় মাটির কান্না যতদিন আমাদের স্পর্শ না করবে ততদিন বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএ)-গুলো মুখ থুবড়ে পড়বে।
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখন সমগ্র পৃথিবী সোচ্ছার। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও ভুক্তভোগী (মাত্র ০.২%কার্বন নিঃসরণ করে)। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জায়গায় আমেরিকা, ইউরোপসহ প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশ মরুকরণের ঝুঁকিতে আছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’ লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া হয়ে নানা পদক্ষেপের অঙ্গীকার করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের নিঃসরণকে কমানো বা শূন্যে নামিয়ে আনাকে উপায় হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বায়ুম-লে ছড়াতে না দিয়ে বন্দী করা বা ‘কার্বন ক্যাপচার’ বা ‘কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন’-এর পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। ‘কার্বন ক্যাপচার’-কে অনেকটা প্রদীপের দৈত্য বন্দী করার মতো ভাবা যেতে পারে। কোন এক বিশেষ ব্যবস্থায় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসকে মাটির হাজার ফুট নিচে বছরের পর বছর সঞ্চিত করে রাখাকে সবুজ কার্বন আর পানির নিচেও অর্থাৎ সমুদ্রের তলদেশে রাখাকে নীল কার্বন নামে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন টন মানব সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইড সঞ্চয় করে রাখা সম্ভব। এছাড়াও বিজ্ঞানীদের ‘জিওলজিক্যাল কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন’ ‘বায়োলজিক কার্বন সিকোস্ট্রেশন’ বিষয়ে গবেষণা চলমান। ‘বায়োলজিক কার্বন সিকোস্ট্রেশন’ হলো কার্বন সঞ্চয় করার জন্য অর্থাৎ জীবন এবং বাস্তুতন্ত্রের প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার জন্য ফসলি জমি, বন, জলাভূমি এবং উপকূলীয় জলাভূমির বাস্ততন্ত্রের উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে কার্বন সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে স্মার্ট ফসল, স্মার্ট মাটি ও স্মার্ট উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয় দরকার।
বাংলাদেশ স্মার্ট ফসলের বৈচিত্রভরা সোনার দেশ। সোনালী ফসলের বাংলাদেশে রক্ষিত আছে বহু ফসলের হাজারো জার্মপ্লাজম। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)-এ রক্ষিত আছে পাট ও সমজাতীয় আঁশ ফসলের ৬০৭০টি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)-এ ৯৪৯১টি, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই)-এ ৭৯৭৯টি, বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই)-এ ৩২৯৭টি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বিএইউ)-এ ১০২৫৬ টি, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)-এ ৪৭৫টি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমআরএইউ)-এ ৭৬৪টি, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (এসএইউ)-এ ১৭১টি এবং অন্যান্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে বিভিন্ন ফসলের অসংখ্য জার্মপ্লাজম সংগৃহিত আছে। আমরা জানি পাট ও সমজাতীয় আঁশ ফসল পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক বায়ু পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে। ১০০ দিন বয়স পর্যন্ত প্রতি হেক্টর জমির পাট গাছ বাতাসের ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড (ঈঙ২) গ্যাস শোষণ করে এবং ১১ টন অক্সিজেন (ঙ২) গ্যাস বাতাসে ছাড়ে (সুত্রঃ ঋঅঙ)। অপরদিকে জমিতে চাষকৃত অবস্থায় ঝড়ে পড়া পাটপাতা মাটিতে পুষ্টির জোগান দিয়ে থাকে এবং পাটের শিকড় মাটির গভীর দিগন্তে প্রবেশ করার কারণে যে পরিমাণ বাতাস মাটিতে প্রবেশ করে তা ব্যবহার করে মাটির লক্ষ লক্ষ অণুজীবের জীবন সমৃদ্ধ হয়। আরেকটি স্মার্ট উদ্ভিদ হলো ধৈঞ্চা। ধৈঞ্চা উদ্ভিদকে প্রাকৃতিক সারের আঁধার বলা হয়। ধৈঞ্চা গাছের শিকড়ে থাকা নডিউল জমিতে সার সরবরাহ করে থাকে। বিজেআরআই পাট ও ধৈঞ্চার জিনোম নকশা/তথ্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। স্মার্ট উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে পাটসহ নতুন নতুন ফসলকে স্মার্ট ফসলে রূপান্তর করতে পারলে মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে রোল মডেল হয়ে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘাতক জলবায়ু পরিবর্তনের পাগলা ঘোড়াকে থামানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের আবাদি জমি ও মাটির স্বাস্থ্য ক্রমক্ষয়িষ্ণু। অপরদিকে পৃথিবীর জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, বিশ্বের মানুষ্য ও পশু খাদ্য এবং জ্বালানির উচ্চ উৎপাদনশীলতার চাহিদার ক্ষেত্রে অস্থিরতার প্রক্ষেপণ পরিলক্ষিত। বিদ্যমান ফসলগুলোকে দ্বৈত কার্যকারিতা সম্পন্ন স্মার্ট ফসলে (উচ্চ উৎপাদন ও মাটির জৈব কার্বন (ঝঙঈ) সঞ্চয়কারী) রূপান্তর করা আর এই ধরিত্রিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশমনের জরুরি পদক্ষেপগুলো সমার্থক। তাই সালোকসংশ্লেষণ, বায়োমাস সঞ্চয়ন, কার্বন বরাদ্দ বৃদ্ধির ভারসাম্য, রাইজোস্ফিয়ার সিঙ্কের শক্তি বৃদ্ধি এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি-উন্নয়নকারী (চএচ) বিষয়গুলোকে আমলে নিতে হবে। সে অনুযাযী মাটির বাস্তুসংস্থানের অংশীদার ‘উদ্ভিদ-অণুজীব-মাটি’-এর সকল উপাদান বিবেচনা করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিসহ অন্যান্য হাই-থ্রো-পুট জৈব ও ইনসিলিকো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন নতুন স্মার্ট ফসলের জাত দেয়ার উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। কবি নজরুলের ভাষায় কাজে লেগে যেতে হবে-
‘ওঠ রে চাষি জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল।
আমরা মরতে আছি - ভালো করেই মরব এবার চল।’
লেখক : ১মহাপরিচালক, ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরিকল্পনা শাখা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মোবাইল : ০১৩০৬৭৬৯৯০০, ই-মেইল :zakirbjri@ gmail.com