কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৩ এ ০৯:৩৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ১৭-১২-২০২৩
সেচে বারিড পাইপ : পানিসম্পদ ও অর্থ সাশ্রয়
প্রকৌশলী মোঃ জিয়াউল হক
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রধানতম খাদ্যশস্য ধান। দেশে মোট আবাদি জমির প্রায় ৭৫% ধান চাষ হয়। সেচনির্ভর রবি মৌসুমে বোরোতে মোট ধানের প্রায় ৫৫-৬০% উৎপাদিত হয়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তির আধুনিক কলাকৌশল উন্নয়ন অনস্বীকার্য। ফসল উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ তিনটি-উন্নতজাতের বীজ, সার ও সেচ। সেচ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমানোর মুখ্য ভূমিকা পালন করে। রবি মৌসুমে বোরো উৎপাদনে সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৩০-৩৫% অর্থ ব্যয় হয়। সেচ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবহন ও প্রয়োগ। সেচের পানি পরিবহন ও প্রয়োগ যথাযথভাবে নিশ্চিত হলে খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বর্তমানে দেশে কাঁচা সেচনালায় সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে উন্মুক্ত ডিসচার্জ বক্স এবং কাঁচা সেচনালায় অনুস্রাবণ, চোয়ানো, ইঁদুর/পোকামাকড়ের গর্ত, আগাছা ও বাষ্পীয়ভবনে প্রায় ৪০-৫০% পানির অপচয় হয় (বারি বুকলেট-১৯৯৭)। কাঁচা সেচনালায় সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়ার ২-৪% জমিও অপচয় হয়। সেচের পানি উৎস হলো-ক) ভূপরিস্থ ও খ) ভূগর্ভস্থ। সারাদেশে সেচ মৌসুমে সেচকাজে উত্তোলিত পানির পরিমাণ প্রায় ৫৫ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিক মিটার)। তন্মধ্যে শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলিত প্রায় ৭২%, যার পরিমাণ প্রায় ৪০ বিসিএম। তাই আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তির বারিড (ইঁৎরবফ) পাইপে সেচের পানির অপচয় ১% নিচে এবং জমির অপচয় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া বৃদ্ধি এবং জমি ও পরিবহন অপচয়বিহীন স্বল্প সময়ে সহজে সুষ্ঠুভাবে সেচসুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে মাটির নির্দিষ্ট গভীরতায় পাইপ লাইনের যে নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয় তাকে বারিড পাইপ সেচ পদ্ধতি বলা হয়। বর্তমানে আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তির পলি-ভিনাইল ক্লোরাইড ও আন-প্লাস্টিসাইজড পলি-ভিনাইল ক্লোরাইড এবং হাই-ডেনসিটি পলি ইথিলিন পাইপের মাধ্যমে বারিড পাইপ সেচ পদ্ধতি স্থাপিত হচ্ছে। যার স্থায়িত্বকাল প্রায় ৪০-৫০ বছরেরও অধিক। ফলে মেরামতের প্রয়োজন হয় না এবং যেকোন মৌসুমে সেচ প্রদান করা সম্ভব। আবার যে সকল এলাকা বারিড পাইপে পানি পরিবহনে অসুবিধা সময়মতো সেচ প্রদান করা সম্ভব হয় না, সে সকল এলাকায় ফিতা/হাজ পাইপ খুবই উপযোগী ও কার্যকরী পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে পানি প্রবাহের মাধ্যমে সেচ প্রদানে পানি ও জমির অপচয় হয় না এবং সেচ খরচ অর্ধেক হয়।
বারিড পাইপে সুবিধাসমূহ
জমির অপচয় হয় না, ফলে সেচনালায় ব্যবহৃত জমিতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদিত হয়; অনুস্রাবণ, চোয়ানো, আগাছা, বাষ্পীয়ভবন হয় না। এতে পানির অপচয় মাত্র ১% নিচে নামানো সম্ভব; বন্যা/বৃষ্টি/প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারিড পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ফলে মেরামত প্রয়োজন হয় না; প্রাথমিক খরচ বেশি, তবে দীর্ঘমেয়াদি খরচ কম। সেচে সময় কম লাগে, শ্রম ও জ্বালানি সাশ্রয় হয়; উঁচু-নিচু বা খাল-বিল অতিক্রম করে সেচ প্রদান এবং কৃষিজ যন্ত্রপাতি, ফসল পরিবহন ও ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়; সেচযন্ত্রের ১০-১২% কমান্ড এরিয়া বৃদ্ধিসহ সেচ দক্ষতা ও সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পায়; সর্বোপরি ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগামিতা রোধ এবং পরিবেশসম্মত আধুনিক লাগসই ও টেকসই সেচ প্রযুক্তি।
বারিড পাইপ স্থাপনে করণীয়সমূহ
রবি সৌসুমে বোরোতে সেচকৃত এলাকা প্রায় ৭৩%। কৃষকদের বারিড পাইপ ব্যবহারের সুবিধাদি, সম্প্রসারণ ও কম জীবনকালের ধানের জাত নির্বাচনে ব্যাপক প্রশিক্ষণ এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে সচেতন করতে হবে। সেলক্ষ্যে সেচের পানি সুষ্ঠু ব্যবহারে কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশে মাথাপিছু আবাদি জমি মাত্র ০.০৪৯ হেক্টর। এ খ- খ- জমিতে বারিড পাইপে সেচ প্রদান অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই সমবায় ভিত্তিতে সেচ কার্যক্রম সম্পাদনের নিমিত্ত পানি ব্যবহারকারী দলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১৮ ও তদ্বীয় বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী সেচযন্ত্র স্থাপন করতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বারিড পাইপ সেচের সুবিধাদির বোধগম্যের ডকুমেন্টেশন তৈরি এবং কৃষকদের মাঝে প্রচার-প্রচারণা করতে হবে। কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষিমূখীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। বারিড পাইপ মাঠপর্যায়ে বিস্তার ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সেচপাম্প মালিক/ম্যানেজারকে সহজশর্তে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা অথবা সরকারি পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০২১-২২ সেচমৌসুমের সেচযন্ত্র জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট সেচকৃত এলাকা ৫৬,৮৯,৫৮০ হেক্টর এবং সেচযন্ত্রের সংখ্যা ১৭,১২,৫১৫টি। তন্মধ্যে আধুনিক সেচযন্ত্রে (গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ, সৌর শক্তিচালিত ও শক্তিচালিত পাম্প) সেচকৃত এলাকা ৫৪, ২৯,৫৬৯ হেক্টর এবং সনাতনী গঙঝঞও ও ‘গ্র্যাভিটি ফ্লো’তে মোট ২,৬০,০১২ হেক্টর (সূত্রঃ জওপ প্রকল্প, বিএডিসি)। সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়ার ওপরভিত্তি করে বারিড পাইপের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা হয়। সারা দেশে মোট সেচকৃত এলাকায় বারিড পাইপের চাহিদা প্রায় ৪.২৫ লক্ষ কিলোমিটার (কিমি.)। ইতোমধ্যে বিএডিসি ১২,৫২৪ কিমি. এবং বিএমডিএ কর্তৃক ১৫,০২৬ কিমি. অর্থাৎ মোট ২৭,৫৫০ কিমি. বারিড পাইপ স্থাপিত হয়েছে। যা মোট চাহিদার মাত্র ৬.৫% (প্রায়)। বাকি ৩.৯৭ লক্ষ কিমি. বারিড পাইপ স্থাপন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া, সেচের নিবিড়তা ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খরচ হ্রাস ও অপারেটর ভাতার বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় করা সম্ভব। এমতাবস্থায় নি¤েœ সাশ্রয়কৃত অর্থের পরিসংখ্যান প্রদত্ত হলো-
কাঁচা সেচনালার জমি উদ্ধার : কাঁচা সেচনালা তৈরিতে জমি অপচয় গড়ে ৩% হিসেবে মোট সেচকৃত এলাকা ৫৪,২৯,৫৬৯ হেক্টরে অপচয়ের পরিমাণ প্রায় ১.৬৩ লক্ষ হেক্টর। ইতোমধ্যে বিএডিসি এবং বিএমডিএ কর্তৃক ২৭,৫৫০ কিমি. বারিড পাইপ স্থাপনে প্রায় ১০.৫০ হাজার হেক্টর জমি উদ্ধার এবং আবাদের আওতায় এনে অতিরিক্ত প্রায় ৫২.৫ হাজার মে. টন খাদ্য শস্য উৎপন্ন করা সম্ভব হয়েছে (৫ টন/হেক্টর)। অতএব, বাকি কাঁচা সেচনালাসমূহ বারিড পাইপে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রায় ১.৫২ লক্ষ হেক্টর জমি উদ্ধার করে আবাদের আওতায় এনে রবি মৌসুমে আরও অতিরিক্ত প্রায় ৭.৬২ লক্ষ মে.টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হবে। যার বাজারমূল্য প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা।
সেচযন্ত্রে তৈল-জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ: কাঁচা সেচনালায় সেচমৌসুমে ইঞ্জিনচালিত গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ ও শক্তিচালিত পাম্পে ব্যবহৃত তৈল-জ্বালানি বাবদ খরচের পরিমাণ প্রায় ১১,১০০ কোটি টাকা (তেলসহ ডিজেল ১১০ টাকা/লিটার)। অপরদিকে মোটরচালিত গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ ও শক্তিচালিত পাম্পে বিদ্যুৎ বাবদ খরচের পরিমাণ প্রায় ১,০৯০ কোটি টাকা (বিদ্যুৎ ৪.৮২ টাকা/ইউনিট, রিবেট ২০%)। অর্থাৎ প্রতি সেচমৌসুমে ইঞ্জিন ও মোটরচালিত সেচযন্ত্রে মোট খরচের পরিমাণ ১২,১৯০ কোটি টাকা। তাই মাঠে কাঁচা সেচনালাগুলোকে বারিড পাইপে রূপান্তর করা হলে পরিবহন অপচয় প্রায় ৫০% হ্রাস পাবে। ফলে সেচমৌসুমে প্রায় ৬,০৯৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
সেচমৌসুমে পাম্প অপারেটর ভাতা : সেচমৌসুমে সেচযন্ত্র প্রতি একজন পাম্প অপারেটর প্রতি মাসে ১৫,৫০০/- টাকা (পাম্প পরিচালনা ও কাঁচা সেচনালা মেরামত ও সংরক্ষণ) হিসেবে ৩ মাসে মোট ১৭,১২,৫১৫ টি সেচযন্ত্রের অপারেটর ভাতা বাবদ মোট ৭,৯৬৩ কোটি টাকা। বারিড পাইপে রূপান্তর করার হলে সেচমৌসুমে পরিবহন অপচয় ৫০% হ্রাস হিসেবে সময়ও অর্ধেক কম লাগবে বিধায় পাম্প অপারেটর ভাতা ৩,৯৮২ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
এমতাবস্থায়, সেচমৌসুমে মোট সাশ্রয়কৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২,০৭৭ কোটি টাকা। তাই কৃষিবান্ধব সরকার কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে, সীমিত পানিসম্পদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সেচযন্ত্রের প্রধান, শাখা ও উপশাখা কাঁচা সেচনালাগুলো বারিড পাইপে রূপান্তর করা হলে জমি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও শ্রমের অপচয় হতে প্রতি সেচমৌসুমে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, এতে সেচ খরচও হ্রাস পাবে। প্রতি সেচমৌসুমে প্রায় ২০ বিসিএম পানি কম উত্তোলিত, ভূগর্ভস্থ পানি নিম্নগামিতা হ্রাস এবং লবণ পানির অনুপ্রবেশ রোধ হবে। এ ক্ষতি জাতীয় কৃষিসম্পদের অর্থাৎ সরাসরি প্রতিটি কৃষকের ক্ষতি। বছরের পর বছর এ ক্ষতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষককুলকে করছে নিঃস্ব। আর কৃষিকে করছে অলাভজনক। শুধুমাত্র প্রকৌশলগত প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বল্প সময়ে অল্প ব্যয়ে এবং সহজে এ ক্ষতি পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই অবশিষ্ট ৩.৯৭ লক্ষ কিমি. বারিড পাইপ স্থাপনে মোট প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। যা মাত্র আড়াই সেচমৌসুমে খরচোত্তর পুনঃপ্রাপ্তি (জবপড়াবৎু) নিশ্চিত হবে। ফলে প্রতিটি সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া, সেচ দক্ষতা, সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পাবে। দেশের পানিসম্পদ, যা কৃষি ও মাৎস্যসম্পদের উৎপাদনশীল রাখবে, তার নিরাপত্তা বিধানে আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি প্রয়োগে অগ্রসর হতে হবে। অন্যথায়, আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার জন্য চিহ্নিত হতে হবে। এতে সেচযন্ত্রসমূহ সেন্সর যুক্ত রিমোট কন্ট্রোলে পরিচালিত হবে। ফলে বারিড পাইপ সেচ পদ্ধতি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে প্রবেশ করবে।
“কাঁচা নালা ভাল নয়, পানির অপচয় বেশি হয়”
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্রসেচ), বিএডিসি। ২৭/২ পশ্চিম নাখালপাড়া, এডাপ্টরহমান গার্ডেন (ফ্ল্যাট নং ৭/এ), তেজগাঁ, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৮৭৮১৯৭৯