কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এ ১০:৪১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৮-২০২৫
সবজিতে হাত পরাগায়ন
মোছা. সাবিহা সুলতানা
প্রায়ই শোনা যায় লাউ-কুমড়া গাছে অনেক ফুল আসে, কিন্তু ফল টেকে না। কচি ফল শুকিয়ে ঝরে যায় বা পচে যায়। এতে ফলন অনেক কমে যায়। কুমড়া গোত্রীয় সবজি বিশেষ করে লাউ, কুমড়া, চালকুমড়া, কাঁকরোল, পটোল ইত্যাদিতে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। নানা কারণে এসব সবজির কচি ফল নষ্ট হতে পারে। যেমন- সঠিকভাবে পরাগায়ন ও গর্ভধারণ না হওয়া, ফলের মাছি পোকার আক্রমণ, ফল পচা রোগের আক্রমণ, অত্যধিক শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি, গাছে বা ক্ষেতে সঠিক অনুপাতে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল না থাকা, তীব্র ঠা-া পড়া ইত্যাদি। তবে সব কারণের মধ্যে উপযুক্ত পরাগায়নের অভাবেই লাউ-কুমড়ার প্রায় ৭৫% ফল টেকে না। আগে প্রাকৃতিকভাবেই পরাগ রেণু যোগকারী বিভিন্ন কীটপতঙ্গ সবজি ক্ষেতে এ কাজ করত। কিন্তু উপর্যুপুরি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এখন প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন অনেক কমে গেছে। এজন্য লাউ-কুমড়ার ফলন বাড়াতে হলে এখন কৃষককেই সে পরাগায়নের কাজটা নিজ হাতে করতে হচ্ছে। এভাবে হাত পরাগায়ন ঘটাতে পারলে সমস্যা দূর করা যায় এবং প্রতিটি স্ত্রী ফুল থেকে একটি করে ফল উৎপাদন করা যায়। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ফলন ৯০% পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
হাত পরাগায়ন : ফুলের পরাগরেণু স্ত্রী কেশরের গর্ভমুন্ডে স্থাপিত হলে তাকে পরাগায়ন বলা হয়। এই রেণু গর্ভমু- থেকে গর্ভদন্ডের মধ্যে এক ধরনের কৈশিক বা সরু নলের মাধ্যমে গর্ভাশয়ে পৌঁছে এবং সেখানে ডিম্বাণুর সাথে নিষিক্তকরণের মাধ্যমে ফল ও বীজ গঠন শুরু করে। প্রকৃতির উপর পুরোপুরি ভরসা না করে হাত দ্বারা পরাগায়ন করা হয় বলে এ পদ্ধতিকে এজন্য হাত পরাগায়ন। সোজা কথায় পুরুষ ফুলের পরাগরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমু-ে ছোঁয়ানো হল হাত পরাগায়ন।
হাত পরাগায়ন প্রয়োজনীয় সবজি : কুমড়া গোত্রীয় বিভিন্ন সবজি যেমন- লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, পটোল, কাঁকরোল, শসা, ফুটি, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, করলা ইত্যাদি সবজিতে হাত পরাগায়ন করা যায়।
হাত পরাগায়নের উপযুক্ত ফুল নির্বাচন : ফুলের চরিত্র বিচারে কুমড়া গোত্রীয় সবজির প্রায় গাছগুলো সহবাসী বা মনোসিয়াস। অর্থাৎ একই গাছে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ফোটে। অধিকাংশ ফুল একলিঙ্গী হওয়ায় একই গাছের একই ফুলের মধ্যে স্ব-পরাগায়ণ ঘটার কোন সম্ভাবনা থাকে না। তাই পুরুষ ও স্ত্রী ফুলের মধ্যে মিলনের দরকার হয়। আবার কিছু কিছু কুমড়া গোত্রীয় সবজি যেমন কাঁকরোল ও পটোলের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটে পৃথক গাছে অর্থাৎ এরা ভিন্নবাসী বা ডায়োসিয়াস গাছ। তাই সেক্ষেত্রেও এক গাছের স্ত্রী ফুলে অন্য গাছের পুরুষ ফুল এনে তাদের মধ্যে মিলন ঘটানো হয়। তবে স্ত্রী ও পুরুষ ফুলের এ মিলন ঘটানোরও ক্ষেত্রে ফুল নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই হাত পরাগায়নের জন্য ফুল নির্বাচনের সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে-
প্রথমে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল চিনতে হবে। সাধারণভাবে যেসব ফুলের গোড়ায় বোঁটার উপরে ফলের একটি অনুকৃতি গঠন থাকে যাকে গর্ভাশয় বলে সেসব ফুলই স্ত্রী। আর যেসব ফুলের গোড়ায় কোন গর্ভাশয় বা এ ধরনের কোন গঠন থাকে না সেগুলো হলো পুরুষ ফুল। স্ত্রী ও পুরুষ ফুল মোটামুটি একই সময়ে ফুটন্ত হতে হবে; স্ত্রী ফুলের গর্ভমু-ের আঠাল পদার্থ শুকিয়ে যাওয়া চলবে না; পুরুষ ফুলের পরাগধানীতে সতেজ পরাগরেণু থাকতে হবে; পুরুষ ও স্ত্রী ফুল যেন রোগ ও কীটপ্রতঙ্গের আক্রমণ না থাকে।
হাত পরাগায়নের উপযুক্ত সময় : কুমড়াজাতীয় সবজির গাছের বয়স সাধারণত ৪০-৪৫ দিন হলে তাতে ফুল ফোটা শুরু হয়। তবে আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে এই সময়ের পার্থক্য হতে পারে। ফুল ফোটা শুরু হলেই একাজ শুরু করতে হবে। সকালে ৮-১০টার মধ্যেই কুমড়া গোত্রীয় অধিকাংশ সবজির ফুল ফোটে। তবে কুমড়া গোত্রীয় সব সবজির ফুল ফোটার সময় এক নয়। যেমন- শসা, বাঙ্গি, তরমুজ ইত্যাদি সবজির ফুল মার্চ মাসে ফোটে সকাল ছ‘টার মধ্যেই, কিন্তু এপ্রিলে আটটা পর্যন্তও ফুটতে দেখা যায়। তাই হাত পরাগায়নের জন্য পুরুষ ও স্ত্রী ফুল যখন ফোটে সময়টা সে হিসেব করে বেছে নিতে হবে।
হাত পরাগায়নের পদ্ধতি
প্রথমে দেখতে হবে একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফুটেছে কি না। ফুটলে যে পুরুষ ফুলের পরাগদ-ের মাথায় রেণুগুলো হলদে গুঁড়োর মতো আলগা দেখাচ্ছে। এছাড়া ফুল নিয়ে পরাগায়ন করতে হলে পুরুষ ফুলটি ছিঁড়ে একটা পাত্রে পানি দিয়ে তার ভেতর ফুলের লম্বা বোঁটা ডুবিয়ে নিয়ে আসতে হবে। পুরুষ ফুলটি গাছ থেকে বোঁটাসহ ছিঁড়ে তার পাঁপড়ি ফেলে দিতে হয়। এ অবস্থায় বোঁটার উপর শুধু পরাগদ-টি দাঁড়িয়ে থাকে। এরূপ একটি পরাগদন্ড নিয়ে স্ত্রী ফুলের গর্ভমু-ে ছুয়ে দিতে হয়। এতে গর্ভমুন্ডের আঠালো পদার্থে পরাগরেণু লেগে যায়।
উল্লেখ্য একটি পুরুষ ফুলের পরাগ দিয়ে কতটি স্ত্রী ফুলে পরাগায়ন ঘটানো যাবে তা নির্ভর করে প্রজাতির উপর, কিংবা একটি পুরুষ ফুল গাছ থেকে ছেঁড়ার পর কতক্ষণ পর্যন্ত তা পরাগায়নে কার্যকর থাকবে তাও নির্ভর করে গাছের ধরনের বা সবজির প্রকারের উপর। তবে সাধারণভাবে একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৫-১০টি স্ত্রী ফুলে পরাগায়ন ঘটানো যায়।
হাত পরাগায়নে সতর্কতা
যেসব সবজির পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে থাকে যেমন- কাঁকরোল, পটল সেসব গাছের হাত পরাগায়ন করা কিছুটা কষ্টসাধ্য। কেননা, এসব সবজির জন্য একই ক্ষেতে পুরুষ ও স্ত্রী গাছ জন্মাতে হয়, অন্তত ১০ শতাংশ পুরুষ গাছ রাখতে হয়। নতুবা অন্য কোন ক্ষেত জমি থেকে পুরুষ ফুল সংগ্রহ করতে হয়। কোন কোন সবজি বিশেষত কাঁকরোলের ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী গাছকে পৃথক সময়ে লাগাতে হয়। কেননা স্ত্রী ফুলের চেয়ে পুরুষ ফুল ফুটতে সময় বেশি লাগে। গাছ গজানোর পর সাধারণত ৩০-৬০ দিন পর স্ত্রী ফুল ফোটে এবং পুরুষ ফুল ফোটে তারও ১০-১৫ দিন পর। কাজেই এই ১০-১৫ দিনে ফোটা স্ত্রী ফুলগুলো সব বিফলে যায়। এজন্য স্ত্রী কন্দ রোপণের অন্তত ১০-১৫ দিন পূর্বে পুরুষ গাছের কন্দ বা মোথা লাগাতে হয়। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন কোন অবস্থাতেই সংগৃহীত পুরুষ ফুলটি শুকিয়ে না যায়। পুরুষ ফুলের পাঁপড়ি ছেঁড়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হয় যেন পরাগদ-ের মাথায় যে পরাগধানী ও হলুদ গুঁড়া গুঁড়া পরাগরেণু থাকে তা যেন নষ্ট না হয় এবং কোন প্রকার ঘষা না লাগে। পুরুষ ফুল ছিঁড়ে সাথে সাথেই পরাগায়ন ঘটানো ভাল। রোদ বেশি হলে অনেক সময় গর্ভমু-ের আঠালো পদার্থ শুকিয়ে পরাগগ্রহীতা হারাতে পারে এবং পরাগরেণুর সজীবতা কমে যেতে পারে। এজন্য রোদ কড়া হওয়ার আগে হাত পরাগায়ন ঘটানো ভাল। অধিকাংশ কুমড়াজাতীয় সবজির স্ত্রী ফুল সাধারণত গর্ভমু-টি চার খাঁজ বিশিষ্ট হয়। তাই পরাগধানী আলতোভাবে ঘষতে হয় যাতে পরাগরেণু সব অংশেই লাগে। তা না হলে ফলের আকার ছোট ও বিকৃত হয়ে যেতে পারে। হাত পরাগায়নের পর অনেক সময় স্ত্রী ফুলটি নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিলে ফল বড় হয়। কাঁকরোলে এই ঘটনা বেশি দেখা যায়। ফলের মাছি পোকার আক্রমণ থেকে পরাগায়িত স্ত্রী ফুল তথা কচি ফলকে রক্ষার জন্য সেটিকে কয়েক দিন পলিব্যাগ দিয়ে আলতো করে বেলুনের মতো ঢেকে রাখা যেতে পারে। কদিন পর ব্যাগ খুলে দিলে ফল বড় হতে থাকবে।
এসব নিয়মকানুন মেনে সঠিকভাবে হাত পরাগায়ন ঘটাতে পারলে কুমড়াজাতীয় সবজির ফলন বহুগুণে বাড়িয়ে নিশ্চিত লাভ করা সম্ভব হবে। (তথ্য সূত্র: কৃষক মাঠ স্কুল সেশন গাইড)
লেখক : উপসহকারী কৃষি অফিসার (প্রেষণে) প্রোগ্রাম কমিউনিটর, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৭১৯৭৫৩৪৩১, ই- মেইল :sabiha.saao@yahoo.com