কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:৪২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০২-২০২৬
শিমুল তুলার উৎপাদন প্রযুক্তি
ড. খালেদা ইয়াছমীন, সেখ জিয়াউর রহমান
দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃতি সেজেছে এক রঙ্গিন সাজে। গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে নয়নাভিরাম শিমুল ফুল। সব কিছুর মধ্যে ও প্রকৃতিকে যেন সাজিয়েছে শিমুলে ফুলের শোভায় এক নতুন রূপে। বাতাসে দোল খাচ্ছে শিমুল ফুলের রক্তিম আভায়। গাছের ডালে ফুটে থাকা শিমুল ফুলে মানুষের মনকে যেন রাঙিয়ে তুলেছে। প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয় শাহ আব্দুল করিমের সেই গানের লাইনটি ”বসন্ত বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, সেই গো বসন্ত বাতাসে।
শিমুল গাছে বসন্তের শুরুতেই ফুল ফোটে। চৈত্র মাসের শেষের দিকে ফল পুষ্ট হয়। বৈশাখ মাসের দিকে ফলগুলো পেকে শুকিয়ে গিয়ে বাতাসে আপনা আপনিই ফল ফেটে প্রাকৃতিকভাবে তুলার সঙ্গে উড়ে উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকেই এর জন্ম হয়। প্রাকৃতিকভাবেই শিমুল গাছ বেড়ে উঠছে। তা ছাড়া বালিশ, লেপ ও তোষক তৈরিতে শিমুল তুলার জুড়ি নেই। শিমুল গাছ কেবল সৌন্দর্যই বাড়ায় না এই গাছে রয়েছে নানা উপকারিতা এবং অর্থনৈতিকভাবে ও অনেক গুরুত্ব বহন করছে। প্রাকৃতিকভাবে তুলা আহরণের অন্যতম অবলম্বন হচ্ছে শিমুল গাছ। এ গাছের সব অংশেরই রয়েছে ভেষজগুণ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা এখনো নানা রোগের চিকিৎসায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে। বীজ ও কা-ের মাধ্যমে এর বংশ বিস্তার হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার গাছে গাছে শোভা পায় শিমুল ফুল। পাশাপাশি বসন্তের সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃতি যেন নিজ রূপে সেজে উঠে। রাস্তার দু’পাশে, পুকুরপাড়ে শিমুল গাছে ফুল বাতাসে দোলা খাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। পথচারিসহ দর্শনার্থীদের মন কাড়ছে শিমুল ফুল। তা ছাড়া গাছে গাছে আসতে শুরু করেছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিময় বাতাস জানান দিচ্ছে নতুন লগ্নের। ফাল্গুনের আগমনে পলাশ, শিমুল গাছে লেগেছে আগুনে খেলা। লাল ফুলের কারণে পুরো এলাকায় হয়ে উঠেছে রক্তিম আভা।
উৎপত্তি ও বিস্তার : শিমুলের আদি নিবাস পশ্চিম আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে ও শিমুল গাছ আছে। পূর্ব হিমালয় অঞ্চল বিশেষ করে ভারতের আসাম, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিমুল গাছ দেখা যায়। ভারতের শুষ্কাঞ্চল পাকিস্থান, শ্রীলংকা, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ চীন, হংকং, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশে শিমুল চাষ করা হয় বা গাছ লাগানো হয়।
উদ্ভিদতাত্ত্বিক বর্ণনা : শিমুলের পরিবার ইড়সনধপধপবধব বর্তমানে তিন প্রজাতির শিমুল গাছ দেখা যাচ্ছে। বিশে^ এবং বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ইড়সনধীপবরনধ প্রজাতির গাছ। বাংলাদেশে যে শিমুল তুলা পাওয়া যায় তার ইংরেজী নাম ঝরষশ ঈড়ঃঃড়হ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ইড়সনধী পবরনধ যা গধষাধপবধব পরিবারের অর্ন্তভুক্ত। ধারণা করা হয় দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়া এ প্রজাতির আদি নিবাস। এ প্রজাতির গাছ লাল বা রক্ত শিমুল নামে পরিচিত। এর ফুল বড়ো ও পাপড়ি পুরু, ফলও আকারে মোটা এবং বড়ো, গাছ অনেক লম্বা ও মোটা হয়, গাছের কা-ে বড়ো বড়ো কাঁটা হয়, কাঠ নরম। গাছের উচ্চতা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত হয়, কা-ের ব্যাস ৩ মিটার পর্যন্ত হয়। পাতা করতলাকার ও যৌগিক। একটি পত্রবৃন্তে ৬টি অনুপত্র থাকে। গাছ পাতা ঝরা স্বভাবের, শীতে পাতা ঝরে যায়, বসন্তে কুঁড়ি ও ফুল ফোটে, এরপর আবার পাতা হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পাতা বিহীন গাছে প্রচুর ফুল ফোটে। ফলের একটি শক্ত খোলসের মধ্যে বীজ ও বীজের চারপাশে তুলার আঁশ থাকে। শে^ত শিমুলের গাছ রক্ত শিমুলের চেয়ে কম মোটা ও লম্বা হয়। ছোট গাছের কা-ে তেমন কাঁটা থাকে না, বাকলের রং সবুজাভ ও লম্বালম্বি রেখা যুক্ত, ফুল ছোট ও পাঁপড়ির রং সাদা। ফল মাকুর মতো ও কা-ে ঝুলতে থাকে। এ প্রজাতির গাছেও তুলা হয়, তবে সে তুলার আঁশ খাটো। তাই বস্ত্র বয়নে এ তুলা ব্যবহার করা যায় না। আর এক প্রজাতিকে বলে সোনালি শিমুল। এ প্রজাতির গাছ কম দেখা যায়। শিমুলের চারা গাছের কা- সরু ও লম্বা, চারা অবস্থায় কা-ে ও ডাল হয় না। প্রায় ১ বছর বয়সের পর থেকেই কা-ের গায়ে কাঁটা উঠতে শুরু করে। চারার শিকড় গাজরের মতো স্ফীত ও কমলা রঙের । শিকড়ের অগ্রভাগ ও গোড়া সরু মাঝ খানে মোটা।
ব্যবহার : গ্রামীন তুলার চাহিদার বেশিভাগই আগে পূরণ করা হতো শিমুল তুলা দিয়ে। বিশেষ করে বালিশ, তোষক, জাজিম ইত্যাদি তৈরিতে শিমুল তুলা লাগে। আধুনিক তুলা চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে শিমুলের কদর কিছুটা কমলেও এখনো বালিশের জন্য শিমুল তুলার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। সম্প্রতি কৃত্রিম আঁশের তৈরি বিদেশি বালিশ দেশে আমদানি হওয়ায় শিমুলের চাহিদা শহরবাসীদের কাছে কিছুটা কমে গেছে সত্য, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে এখনো শিমুল তুলা জনপ্রিয়। তুলা ছাড়াও শিমুলে গাছের রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। এ গাছের কাঠ দেশলাইয়ের বাক্স বা খোল তৈরিতে কাজে লাগে, শিমুল তুলার বীজ থেকে তেল তৈরি করা হয়। অল্প বয়সি শিমুলের গাছের গোড়ায় মাটির নিচে গাজরের মতো ফোলা মূল হয়। মূল শাখায়িত। শিমুলের মূল ভেষজ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তিন ভাবে শিমুলের মূল খাওয়া হয়-সরাসরি জমি থেকে তুলে কাঁচা মূলের বাকল তুলে ফেলে ভেতরের নরম শাঁস চিবিয়ে খাওয়া যায়, মূল চাক চাক করে কেটে শুকিয়ে খাওয়া যায় এবং শুকনো মূল কলে ভাঙিয়ে গুড়া করে সেই গুড়া পানি বা দুধের সাথে মিশিয়ে শরবত করে খাওয়া যায়। এতে পেট পরিষ্কার থাকে। দিল্লীতে ৫০ জন হৃদরোগীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় কোলেস্টেরল কমাতে শিমুলের মূলের কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এছাড়া এই মূলের গুড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ও কাজ করে। ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশায়, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, জ¦ালাপোড়া প্রভৃতি রোগ সারাতে শিমুল মূল ব্যবহৃত হয়। শিমুলের মূল ঠা-া, অল্প পিচ্ছিল ও মিষ্টি। শিমুলের মূলে গ্লাইকোসাইডস ও ট্যানিন আছে। ঘা বা কাটা সারাতে, কাটা জায়গা থেকে রক্ত বন্ধ করতে শিমুল গাছের বাকল ব্যবহার করা হয়। গনোরিয়া সারাতে শিমুলের বীজ কাজে লাগে। কচি ফল ফোলা, কিডনি ও পিত্তথলির আলসার সারাতে ব্যবহার করা হয়। শিমুল গাছের আঠাও ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। শিমুল গাছের ঔষধ হিসেবে এখনো কোন পাশর্^প্রতিক্রিয়ার কথা জানা যায়নি। এ দেশের চাকমারা শিমুলের ফুল সবজির মতো রেঁধে খায়। শিমুলের পাতা গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়। হংকংয়ে বেশ শিমুল গাছ লাগানো হয়। প্রাচীন কালে সে দেশের লোকেরা শিমুল গাছের তলায় পড়া শুকানো ফুল দিয়ে চা বানিয়ে খেত।
মাটিও জলবায়ু : সাধারণত ফসল হিসাবে শিমুল গাছের চাষ করা হয় না বা শিমুল গাছ লাগানো হয় না। তবে সুনামগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর প্রভৃতি জেলায় চরম বালি প্রধান মাটি যেখানে বাঁশ ছাড়া অন্য কোন ফসল হতে চায় না বা ভালো হয় না সেসব মাটিতে কেউ কেউ শিমুলের বাগান করে তুলা উৎপাদন করছেন। শিমুল চাষের জমি উচুঁ বা মাঝারি উঁচু হতে হবে। যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে না এবং সারা দিন রোদ পড়ে এমন জমিতে শিমুলের চাষ ভালো হয়। যেরূপ জমিতে বেগুন-টমেটো হয় সেরূপ জমি শিমুল চাষের জন্য উপযুক্ত। শুষ্ক বাদল বনে বেশি হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত শিমুল গাছ জন্মে থাকে।
জমি চাষ ও সার প্রয়োগ : যেহেতেু শিমুল মূল চাষে খরচ তেমন নেই বললেই চলে এবং অনুর্বর মাটি যেখানে অন্য কোন ফসল চাষ করলে ভালো হয় না তাই নাটোরের চাষিরা বানিজ্যিভাবে শিমুলের চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তা ভেষজ হিসাবে ব্যবহারের জন্য। ভেষজ হিসেবে শিমুল চাষের জন্য বীজ বপন থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রায় প্রায় ১ বছর লাগে। শিমুল চাষের জন্য প্রথমে জমি পরিষ্কার করে অন্য ফসল চাষের মতোই চাষ দিতে হয়। জমি চাষের সময় বিঘা প্রতি প্রায় ১.৫ টন জৈব বা গোবর সার মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত অন্য কোন রাসায়নিক সার দেওয়া হয় না। তবে মাটির উর্বরতা কম থাকলে বিঘা প্রতি ২০ কেজি টিএসপি ও ১ কেজি এমওপি সার ব্যবহার করা যায়। সব সারই জমি তৈরির সময় চাষের সাথে মিশিয়ে দিতে হয়।
বীজ বপন ও পরিচর্যা : ফাল্গুন মাসে শিমুলের ফুল ফোটে ও এর কিছুদিন পরই সেসব ফুল থেকে ফল হয় ফল ফেটে গেলে সেসব ফল থেকে তুলা আহরণ করা হয়। তুলা জিনিংয়ের পর বা আঁশ আলাদা করার পর প্রচুর বীজ পাওয়া যায়। বৈশাখ মাসে সেসব বীজ জমিতে সরাসরি বোনা হয়। বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়। এতে বিঘা প্রতি প্রায় ৯ থেকে ১০ কেজি বীজ লাগে। মাটিতে জো থাকলে বোনার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই বীজ গজিয়ে চারা বের হয়। বোনার এক মাসের মধ্যে মাত্র ১ বার নিড়ানি দিয়ে জমির আগাছা পরিষ্কার করা হয়। আর ঐ জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হয় না। গাছ ঘন হয়ে বেড়ে ওঠায় আগাছা চাপা পড়ে যায়। যেহেতু মূলের জন্য চাষ করা হয়, তাই শিমুল গাছে কোন ইউরিয়া সার দেওয়া হয় না। জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দেওয়া হয়। আর কোন পরিচর্যার দরকার পড়ে না। এখনো পর্যন্ত এ ফসলের কোন রোগ বা পোকা আক্রামণ দেখা যায়নি।
শিমুলের মূল সংগ্রহ : গাছের বয়স ৯-১০ মাস হলে শিমুলের গাছ তোলা শুরু হয়। শাবল বা খন্তা দিয়ে একটি একটি করে গাছ মাটি থেকে শিকড়সহ তোলা হয়। মূল টুকু রেখে বাকি অংশ কেটে বাদ দেয়া হয়। বাদ দেওয়া এসব অংশ জ¦ালানি হিসাবে ব্যবহার করা। এটি এক বছরের ফসল। এক বছর পর আবার ওই জমিতে শিমুলের চাষ একইভাবে করা হয়। বিঘার প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ কেজি শিমুল মূল উৎপাদিত হয়। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রতি কেজি শুকনো শিমুল মূলের খুচরা দাম ৫০ টাকা। তবে চাষিরা এই দামে বিক্রি করতে পারে না। তারা ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা মণ দরে শিমুল মূল বিক্রি করেন। এতে প্রতি বিঘা থেকে প্রায় ৬৫ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকার মূল বিক্রি হয়। চাষের খরচ খুব কম, কিন্তু মূল তোলার খরচ বেশি। বিশেষ করে শ্রমিক বাবদ বেশি খরচ হয়।
তথ্য সূত্র : বাংলাদেশের অর্থকারী ফসল ও বিভিন্ন ধরনের জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা।
লেখক : প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা, সহকারী তথ্য অফিসার, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, ময়মনসিংহ অঞ্চল, ময়মনসিংহ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল নং ০১৭১৬৭৮৮৭৫৫