কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৫:৫২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
শস্যভা-ারে যুক্ত হলো নতুন ছয় ধানের জাত
ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন
দেশের শস্যভা-ারে যুক্ত হলো আরো ছয়টি নতুন ধানের জাত। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত সর্বশেষ এই ৬টি জাতের ৫টিই বৈরী পরিবেশ সহনশীল। এই পাঁচটিসহ এখন ব্রির ৩৭টি জাত রয়েছে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন বৈরী পরিবেশ সহনশীল। ব্রি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ফলেই বর্তমানে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। যেখানে স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ, এখন তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে লোকসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়েছে কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণ। স্বাধীনতার পর প্রথম ব্রি উদ্ভাবিত জাত বিআর-৩ বা বিপ্লব জাতের মাধ্যমে ধান উৎপাদনে সত্যিকারের সবুজ বিপ্লব সাধিত হয়। ১৯৯৪ সালে ব্রি ধান২৮ ও ২৯ জাতের ধান উদ্ভাবন করে, যা প্রচুর ফলনের কারণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বর্তমানে ব্রি উদ্ভাবিত ব্রি ধান৮৭, ৮৯, ৯২, ৯৬, ৯৮, ১০০, ১০২, ১০৫, ১০৭ এবং ১০৮ জাতগুলো মৌসুমভেদে মাঠে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। তবুও জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের অবিরাম ছুটে চলা থেমে নেই।
এবার ব্রি আনলো জোয়ার-ভাটা সহনশীল ব্রি ধান১০৯, বন্যা বা জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান১১০, অগভীর বন্যার পানিযুক্ত (১ মিটার) নিচু অঞ্চলে টিকে থাকতে পারে জলি আমনের জাত ব্রি ধান১১১, লবণাক্ততা সহনশীল জাত ব্রি ধান১১২, ব্রি ধান২৯ এর বিকল্প উফশী বোরো ধানের জাত ব্রি ধান১১৩ এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত ব্রি ধান১১৪। ব্রি এখন পর্যন্ত ১২১টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে ৮টি হাইব্রিড ধানের জাত।
জোয়ার-ভাটা সহনশীল ব্রি ধান১০৯
ব্রি ধান১০৯ জাতের ডিগ পাতা খাঁড়া, গাড় সবুজ, প্রশস্ত ও লম্বা, পাতার রং সবুজ। পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১২৮ সেমি.। জাতটির গড় জীবনকাল জোয়ার-ভাটা পরিবেশে ১৪৭ দিন। চালের আকার আকৃতি লম্বা ও মাঝারি মোটা এবং রং সাদা। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ৩১.০ গ্রাম। এ ধানের দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৫.৪ ভাগ। এ ছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ১০.৬ ভাগ এবং ভাত ঝরঝরে। ফলন পরীক্ষায় জোয়ার-ভাটা মুক্ত এলাকায় জাতটি ৬.৩২টন/হে. এবং জোয়ারভাটা প্রবণ এলাকায় জাতটি ৫.৪০টন/হে. গড় ফলন দিয়েছে। উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনায় জাতটি হেক্টরপ্রতি ৬.৫০টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম ।
বন্যা বা জলমগ্নতা সহনশীল-ব্রি ধান১১০
ব্রি ধান১১০ জাতের ডিগ পাতা খাড়া, গাঢ় সবুজ, প্রশস্ত ও লম্বা। পূর্ণ বয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১২০ সেমি.। জাতটির গড় জীবনকাল বন্যামুক্ত পরিবেশে ১২৩ দিন এবং দুই সপ্তাহের বন্যায় ১৩৩ দিন। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ১৯.৯ গ্রাম। চালের আকার আকৃতি লম্বা ও মাঝারি চিকন এবং রং সাদা। এ ধানের দানায় এ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৪.০ ভাগ। এছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৮.৮ ভাগ এবং ভাত ঝরঝরে। এ জাতের ধানের দানার অগ্রভাগে এবং গাছের গোড়ার দিকের লিফশিথে কালচে গোলাপী বর্ণ বিদ্যমান।
এটি দেশের আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকার উপযোগী এবং স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত। যার গড় জীবনকাল ১২৩ দিন। কিন্তু গড়ে বিনাধান-১১ এর চেয়ে ২০.৫০% বেশি ফলন দিতে সক্ষম। বন্যামুক্ত এলাকার জন্যও এ জাতটি চাষাবাদযোগ্য। ফলন পরীক্ষায় বন্যামুক্ত এলাকায় জাতটি ৬.০ ট/হে. এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় জাতটি ৫.০ ট/হে. গড় ফলন দিয়েছে। উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে এ জাতটি হেক্টরে ৬.৬৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
জলি আমনের জাত ব্রি ধান১১১
ব্রি ধান১১১ লম্বা ও হেলে পড়া সহিষ্ণু। গাছের উচ্চতা ১৬২ সেমি.। ডিগ পাতা খাঁড়া ও গাঢ় সবুজ। এ জাতের কা-ের গোড়া বাঁশের মতো শক্ত, কা-ে শর্করার পরিমাণ প্রচলিত জাতের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। এ জাতের কা- বহু-বর্ষজীবী, ধান পেকে যাওয়ার পরও কা- সবুজ ও জীবিত থাকে। তাই কাটিং বা মুড়ি ফসল করে গাছের বংশ বৃদ্ধি করা যায়। মুড়ি ফসলের ফলনও প্রায় মূল ফসলের মতই।
ব্রি ধান১১১ ধানের চাল মাঝারি মোটা ও লম্বা এবং ভাত সাদা ও ঝরঝরে। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৭.৫ গ্রাম। এই জাতটি আলোক-সংবেদনশীল, জীবন কাল ১৪৬-১৬০ দিন। উপকূলীয় জোয়ার-ভাটা ও অগভীর পানিযুক্ত নিচু জমিতে ব্রি ধান৯১ ও স্থানীয় আমনের জাতের চেয়ে বেশি ফলন দেয়। ধান কাটার উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বরের ১ম হতে ২য় সপ্তাহ। আমন মওসুমে ব্রি ধান১১১ এ ধান পাকা পর্যন্ত ১৪৬-১৬০ দিন সময় লাগে। ব্রি ধান১১১ রোপা আমন মওসুমে উপকূলীয় জোয়ার-ভাটা ও অগভীর পানিতে নিমজ্জিত থেকে হেক্টরপ্রতি ৪.৩-৪.৭ টন ফলন দিতে পারে। উপকূলীয় জোয়ার-ভাটা ও বন্যার মাত্রা কম হলে, উপযুক্ত পরিচর্যায় হেক্টরপ্রতি ৫.২- ৫.৭ টন ফলন দিতে সক্ষম।
লবণাক্ততা সহনশীল জাত ব্রি ধান১১২
ব্রি ধান১১২ লবণাক্ততা সহনশীল ও মাঝারি জীবনকালীন রোপা আমনের জাত। এ জাতের ডিগপাতা খাড়া। ব্রি ধান১১২ লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টর প্রতি ৪.১৪-৬.১২ টন ফলন দিতে সক্ষম, যা এর মাতৃসারি ব্রি ধান৭৩ এর থেকে ১.০-১.৫টন/হে বেশি। এ জাতের জীবনকাল ১২০-১২৫ দিন এবং গাছের উচ্চতা ১০৩-১০৫ সেমি.। গাছের কা- মজবুত এবং ঢলে পড়া প্রতিরোধী। এ ধানের শীষে পুষ্ট দানার সংখ্যা গড়ে ২১০টি, যা ব্রি ধান৭৩ এর থেকে ৮০-৯০টি বেশি। চাল মাঝারি চিকন, সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। ব্রি ধান১১২ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় ১২ ডিএস/মি. (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। উপরন্তু এ জাতটি অংগজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সকল ধাপে (ঝধষঃ-ংবহংরঃরাব ংঃধমবং) ৮ ডিএস/মি. মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম। এ জাতটির দানা মাঝারি চিকন ও শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। জাতটির জীবনকাল তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ফসল কর্তনের পর মধ্যম উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমূখী ও লবণাক্ততা সহনশীল সরিষা আবাদের সুযোগ তৈরি হবে।
ব্রি ধান২৯ এর বিকল্প উফশী বোরো-ব্রি ধান১১৩
ব্রি ধান১১৩ জাতটি বোরো মওসুমের জনপ্রিয় জাত ২৯ এর বিকল্প হিসেবে ছাড়করণ করা হয়েছে। এটি মাঝারি চিকন দানার উচ্চফলনশীল জাত। এ জাতের ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা এবং ধান পাকলেও সবুজ থকে। পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০২-১০৫ সেমি.। এ জাতের গাছ শক্ত এবং মজবুত বিধায় সহজে হেলে পড়ে না। জাতটির গড় জীবনকাল ১৪৩ দিন। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ১৯.৪ গ্রাম। চালের আকার আকৃতি মাঝারি চিকন এবং রং সাদা, দেখতে অনেকটা নাইজারশাইলের মতো। এ ধানের চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৮.০ ভাগ এবং ভাত ঝরঝরে। এছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৮.৪ ভাগ। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় এ জাতটি ব্রি ধান৮৮ এর চেয়ে ১১.৫% বেশি ফলন দিয়েছে। এ জাতের গড় ফলন হেক্টরে ৮.১৫ টন। উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনা পেলে জাতটি হেক্টরে ১০.১ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
ব্লাস্টরোগ প্রতিরোধী জাত ব্রি ধান১১৪
ব্রি ধান১১৪ বোরো মওসুমের দীর্ঘ জীবনকালীন ব্লাস্টরোগ প্রতিরোধী জাত। এ জাতের ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা, গাছ মজবুত এবং হেলে পড়ে না। পাতার রং গাঢ় সবুজ। এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৭.৭৬ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যায় এর ফলন হেক্টরে ১০.২৩ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ জাতের দানা মাঝারি মোটা এবং সোনালী বর্ণের। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪৯ দিন, ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ১৭.৪ গ্রাম। চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৭.০ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৭.৭ ভাগ। ভাত ঝরঝরে।
লেখক : ঊধ্বর্তন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), মোবাইল : ০১৭১৬৫৪০৩৮০, ই-মেইল: smmomin80@gmail.com