কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ০৪:৩২ PM

শত্রু নয়, সুযোগ : কৃষকের বন্ধু ইঁদুর শিকারি জুরেল সরেন

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আশ্বিন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৯-২০২৫

 শত্রু নয়, সুযোগ : কৃষকের বন্ধু 
ইঁদুর শিকারি জুরেল সরেন
কৃষিবিদ মোছাঃ ফরিদা ইয়াছমিন১ মোঃ এমদাদুল হক২
বাংলাদেশের কৃষি শুধু পেশা নয়, বরং জাতির আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বেঁচে থাকার কৌশল। তার বাস্তব প্রমাণ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার এক সাঁওতাল কৃষক জুরেল সরেন। তিনি শুধু জমিতে ফসল ফলিয়ে খাদ্য উৎপাদন করেন না, বরং ফসল ধ্বংসকারী ইঁদুরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছেন। আর এই লড়াইয়ে তিনি শুধু নিজের নয়, গোটা জাতির খাদ্য নিরাপত্তার সেবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
গোড়ার কথা 
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মান্ডইল নামক গ্রামে সাঁওতাল কৃষক সরল সরেনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন জুরেল সরেন। সবুজে ঘেরা, গাছগাছালিতে পূর্ণ, পাখির কলতানে মুখর এই গ্রামটি যেন এক স্বপ্নপুরী। এখানকার উঁচু-নিচু লাল মাটির জমিতে চাষ হয় ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, শাকসবজি প্রভৃতি। জুরেল সরেন সেই শস্যভান্ডারের একজন নিবেদিত প্রাণ চাষি।
ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি ছিল তার অগাধ আগ্রহ। নিজ উদ্যোগে কৃষিকাজ শিখেছেন, মাটি হাতে মেখেছেন, আবহাওয়া বুঝেছেন, আর শিখেছেন কীভাবে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলাতে হয়। কিন্তু কৃষকজীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে যখন দেখলেন তার রাতদিনের খাটনির ফসল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ইঁদুরের আক্রমণে।
ইঁদুর : এক অব্যক্ত শত্রু 
ইঁদুর, দেখতে ছোট একটি প্রাণী হলেও এর ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ। শুধু খাদ্য নয়, বৈদ্যুতিক তার, আসবাব, কাগজপত্র, ফসলি জমিতে আক্রমণ করে এই প্রাণী। ইঁদুরের দাঁত ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং ক্রমাগত দাঁত বৃদ্ধি ঠেকাতে ইঁদুর সবসময় কাটাকাটি করে থাকে। 
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের পণ্যের বিরাট অংশ ইঁদুর নষ্ট করে ও খেয়ে কৃষকের ক্ষতি করে থাকে। ইঁদুরের ক্ষতি ও ক্ষতির ধরন বিবেচনা করে ইঁদুর মানুষের ব্যক্তিগত এবং জাতীয় শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়। এজন্য ১৯৮৩ সাল থেকে জাতীয়ভাবে ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। 
ইঁদুর শিকারির পথে যাত্রা 
জুরেল সরেন যখন দেখলেন বারবার তার ফসল নষ্ট হচ্ছে, তখন তিনি এই সমস্যার সমাধানে নিজের মতো করে উদ্যোগ নিলেন, শুরু করলেন ইঁদুর দমন, তাছাড়া সাঁওতালদের কাছে ইঁদুর খুবই সুস্বাদু, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইঁদুরের লেজ খুবই পছন্দের খাবার। জুরেল সরেনের ইঁদুর নিধনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফসল রক্ষা এবং খাদ্য জোগানের তাগিদ থেকে। তিনি লক্ষ্য করলেন, ফসলী জমিতে ইঁদুর গর্ত করে বাসা বাঁধে, আর সেখান থেকেই ফসল কেটে নিয়ে যায়। তিনি শুরু করলেন গর্ত চিহ্নিত করে ইঁদুর ধরার কাজ।
প্রথমে কোদাল হাতে নিয়ে ধান, গম, ভুট্টা কাটা খোলা মাঠে খুঁজে বের করতেন ইঁদুরের গর্ত। মাটির গন্ধ আর গর্তের আকৃতি দেখেই বুঝে যেতেন কোথায় ইঁদুর আছে। কখনো জাল, কখনো ফাঁদ, লাঠি, রড আবার কখনো নিজেই হাত দিয়ে গর্ত খুঁড়ে ধরে ফেলতেন ইঁদুর। তিনি আস্তে আস্তে ইঁদুর নিধনে আরো দক্ষ হয়ে ওঠেন। এক সময় শুধু ফসল বাঁচানোর চেষ্টাই নয়, এটি হয়ে ওঠে তার জীবনের এক অভিন্ন অংশ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন তার এলাকার একজন চেনা মুখ ‘ইঁদুর শিকারি জুরেল’ এবং একজন বুদ্ধিমান কৃষক। 
জাতীয় স্বীকৃতি ও সাফল্য
ইঁদুর দমনে একাগ্রতার জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের নজরে আসেন জুরেল সরেন। তারা তাকে উৎসাহিত করেন, জানান যে প্রতি বছর জাতীয় ইঁদুর দমন অভিযানের আওতায় পুরস্কার দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি ইঁদুর দমনকারীদের। এই খবরে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে ইঁদুর ধরার কাজে মনোনিবেশ করেন।
তিনি নিজের প্রচেষ্টায় এক বছরে ধরে প্রায় ৭৬ হাজার ইঁদুর। প্রতিটি ইঁদুরের লেজ জমা দেন উপজেলা কৃষি অফিসে।     জাতীয়পর্যায়ে জাতীয় ইঁদুর দমনে অভিযান ২০২৩ এর কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে ৫টি ক্যাটাগরীতে পুরস্কারের তালিকা অনুযায়ী জুরেল সরেন কৃষক ক্যাটাগরিতে মনোনীত হন। এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের কারণে তিনি “জাতীয় ইঁদুর নিধন অভিযান ২০২৪”-এ কৃষক ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থানলাভ করেন। জাতীয়পর্যায়ে কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন সফল মানুষ হিসেবে তিনি উঠে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
জীবনযুদ্ধের অনুপ্রেরণা 
জুরেল সরেন শুধুমাত্র একজন ইঁদুর শিকারি নন, তিনি হলেন এক সংগ্রামী কৃষক, যিনি প্রতিকূলতাকে জয় করে জীবনের নতুন পথ নির্মাণ করেছেন। ইঁদুর খেকো ভেবে সবাই যেখানে ক্ষুব্ধ হতেন, জুরেল সেখানে দেখেছেন সুযোগ। তিনি বলেন, “ইঁদুর শুধু ক্ষতির কারণ নয়, সঠিকভাবে ব্যবস্থা নিলে এটি রূপ নিতে পারে এক বিকল্প সম্পদে।” 
তিনি ইঁদুর শিকার করে শুধু পুরস্কারই পাননি, বরং নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছেন। গর্তে ঢুকে থাকা ইঁদুরকে বের করে ধরে তিনি শুধু ফসল রক্ষা করেননি, সেই গর্তে জমা থাকা ধান, গম ও ভুট্টা সংগ্রহ করেও বাড়তি আয়ের উৎস তৈরি করেছেন, পরিবারে সচ্ছলতা এনেছেন। আর এই কাজে তিনি শুধু নিজেই নিয়োজিত নন, বরং উৎসাহ দিয়েছেন আশপাশের সাঁওতাল সম্প্রদায়কে। এখন গ্রামের অন্য কৃষকরাও তার দেখাদেখি ইঁদুর নিধনে এগিয়ে এসেছেন। তিনি নিজেই প্রশিক্ষণ দেন, কিভাবে গর্ত চিনে ইঁদুর ধরতে হয়। একা নয়, তিনি বিশ্বাস করেন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইঁদুরের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব। 
প্রশাসনিক প্রশংসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা 
গোদাগাড়ি উপজেলার উপজেলা কৃষি অফিসার বলেন, ইঁদুর জীব বৈচিত্র্যের অংশ হলেও আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং নিরাপদ পরিবেশের জন্য এটি দমন অত্যন্ত জরুরি। এ উপজেলাতে সারা বছর ইঁদুর দমনের কাজ চলে তবে বর্ষা মৌসুমে জোরালো ভাবে ইঁদুর নিধন কার্যক্রম চলে। ইঁদুর অত্যন্ত চতুর এবং খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য সর্বদা স্থান পরিবর্তন করে বিধায় ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সঠিক পদ্ধতি, সঠিক স্থান ও সঠিক সময়ে একযোগে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন। এককভাবে ইঁদুর নিধন করলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই একক ইঁদুর দমন করার সাথে সাথে সম্মিলিত ইঁদুর নিধনে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কাজেই ফসল ও সম্পদের ক্ষতিরোধ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও দূষণমুক্ত পরিবেশের স্বার্থে ইঁদুর ক্ষেত-খামার, বসতবাড়িসহ সর্বত্র ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই করে ইঁদুর দমনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুরেল সরেনের মতো উদ্যমী কৃষকদের অংশগ্রহণে ইঁদুর দমন কার্যক্রম আরও কার্যকর হচ্ছে। “ইঁদুর দমন একটি টেকসই প্রচেষ্টা, যা এককভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু জুরেল সরেন এককভাবে যা করে দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনন্য উদাহরণ।”
জুরেল সরেন বলেন, “পুরস্কার পাওয়ার পর আমার মনোবল আরও বেড়ে গেছে। এখন আমি শুধু নিজের জন্য না, গ্রামের সকল কৃষকের স্বার্থে ইঁদুর দমনের কাজ করছি। আমি চাই, আমাদের ফসল যেন নিরাপদে মাঠে বেড়ে ওঠে।”
তিনি ভবিষ্যতে তার নিজ সম্প্রদায়ে একটি “ইঁদুর দমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” স্থাপন করতে চান, যেখানে তরুণদের ইঁদুর নিধনের কৌশল শেখানো হবে। এতে যেমন ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ যেমন রোধ করা যাবে, তেমনি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। ইঁদুর ধরাকে পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে পারলে তারা অন্যান্য কৃষকের ক্ষেত-খামার, বসতবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে টাকার বিনিময়ে ইঁদুর দমন করে কৃষির পাশাপাশি বাড়তি আয় করতে পারবেন। ফলে তার সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। 
একজন অনন্য পথপ্রদর্শক 
জুরেল সরেনের গল্প কেবল একজন ইঁদুর শিকারির গল্প নয়; এটি একজন সংগ্রামী কৃষকের সফল অভিযাত্রার গল্প। কৃষি শুধু মাটি চাষ নয়, বরং পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানের মিশ্রণ। আর এই পরিবর্তনের অগ্রদূত হতে পারেন যেকোনো সাধারণ মানুষ, যদি তার মধ্যে থাকে জুরেল সরেনের মতো সাহস, চিন্তা ও উদ্যোগ।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি শুধু একজন সফল কৃষক নন, বরং একজন জাতীয় সম্পদ। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যদি আরও কৃষক এগিয়ে আসে, তাহলে ফসলের অপচয় কমে যাবে, খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

লেখক : ১আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, ২কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয় রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭৩৭৯৯১২৪৭, ই-মেইল : ভুবধংসরহসড়হ@মসধরষ.পড়স


কৃষিবিদ মোছাঃ ফরিদা ইয়াছমিন১ মোঃ এমদাদুল হক২
বাংলাদেশের কৃষি শুধু পেশা নয়, বরং জাতির আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বেঁচে থাকার কৌশল। তার বাস্তব প্রমাণ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার এক সাঁওতাল কৃষক জুরেল সরেন। তিনি শুধু জমিতে ফসল ফলিয়ে খাদ্য উৎপাদন করেন না, বরং ফসল ধ্বংসকারী ইঁদুরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছেন। আর এই লড়াইয়ে তিনি শুধু নিজের নয়, গোটা জাতির খাদ্য নিরাপত্তার সেবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
গোড়ার কথা 
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মান্ডইল নামক গ্রামে  সাঁওতাল কৃষক সরল সরেনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন জুরেল সরেন। সবুজে ঘেরা, গাছগাছালিতে পূর্ণ, পাখির কলতানে মুখর এই গ্রামটি যেন এক স্বপ্নপুরী। এখানকার উঁচু-নিচু লাল মাটির জমিতে চাষ হয় ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, শাকসবজি প্রভৃতি। জুরেল সরেন সেই শস্যভান্ডারের একজন নিবেদিত প্রাণ চাষি।
ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি ছিল তার অগাধ আগ্রহ। নিজ উদ্যোগে কৃষিকাজ শিখেছেন, মাটি হাতে মেখেছেন, আবহাওয়া বুঝেছেন, আর শিখেছেন কীভাবে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলাতে হয়। কিন্তু কৃষকজীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে যখন দেখলেন তার রাতদিনের খাটনির ফসল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ইঁদুরের আক্রমণে।
ইঁদুর : এক অব্যক্ত শত্রু 
ইঁদুর, দেখতে ছোট একটি প্রাণী হলেও এর ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ। শুধু খাদ্য নয়, বৈদ্যুতিক তার, আসবাব, কাগজপত্র, ফসলি জমিতে আক্রমণ করে এই প্রাণী। ইঁদুরের দাঁত ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং ক্রমাগত দাঁত বৃদ্ধি ঠেকাতে ইঁদুর সবসময় কাটাকাটি করে থাকে। 
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের পণ্যের বিরাট অংশ ইঁদুর নষ্ট করে ও খেয়ে কৃষকের ক্ষতি করে থাকে। ইঁদুরের ক্ষতি ও ক্ষতির ধরন বিবেচনা করে ইঁদুর মানুষের ব্যক্তিগত এবং জাতীয় শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়। এজন্য ১৯৮৩ সাল থেকে জাতীয়ভাবে ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। 
ইঁদুর শিকারির পথে যাত্রা 
জুরেল সরেন যখন দেখলেন বারবার তার ফসল নষ্ট হচ্ছে, তখন তিনি এই সমস্যার সমাধানে নিজের মতো করে উদ্যোগ নিলেন, শুরু করলেন ইঁদুর দমন, তাছাড়া সাঁওতালদের কাছে ইঁদুর খুবই সুস্বাদু, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইঁদুরের লেজ খুবই পছন্দের খাবার। জুরেল সরেনের ইঁদুর নিধনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফসল রক্ষা এবং খাদ্য জোগানের তাগিদ থেকে। তিনি লক্ষ্য করলেন, ফসলী জমিতে ইঁদুর গর্ত করে বাসা বাঁধে, আর সেখান থেকেই ফসল কেটে নিয়ে যায়। তিনি শুরু করলেন গর্ত চিহ্নিত করে ইঁদুর ধরার কাজ।
প্রথমে কোদাল হাতে নিয়ে ধান, গম, ভুট্টা কাটা খোলা মাঠে খুঁজে বের করতেন ইঁদুরের গর্ত। মাটির গন্ধ আর গর্তের  আকৃতি দেখেই বুঝে যেতেন কোথায় ইঁদুর আছে। কখনো জাল, কখনো ফাঁদ, লাঠি, রড আবার কখনো নিজেই হাত দিয়ে গর্ত খুঁড়ে ধরে ফেলতেন ইঁদুর। তিনি আস্তে আস্তে ইঁদুর নিধনে আরো দক্ষ হয়ে ওঠেন। এক সময় শুধু ফসল বাঁচানোর চেষ্টাই নয়, এটি হয়ে ওঠে তার জীবনের এক অভিন্ন অংশ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন তার এলাকার একজন চেনা মুখ ‘ইঁদুর শিকারি জুরেল’ এবং একজন বুদ্ধিমান কৃষক। 
জাতীয় স্বীকৃতি ও সাফল্য
ইঁদুর দমনে একাগ্রতার জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের নজরে আসেন জুরেল সরেন। তারা তাকে উৎসাহিত করেন, জানান যে প্রতি বছর জাতীয় ইঁদুর দমন অভিযানের আওতায় পুরস্কার দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি ইঁদুর দমনকারীদের। এই খবরে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে ইঁদুর ধরার কাজে মনোনিবেশ করেন।
তিনি নিজের প্রচেষ্টায় এক বছরে ধরে প্রায় ৭৬ হাজার ইঁদুর। প্রতিটি ইঁদুরের লেজ জমা দেন উপজেলা কৃষি অফিসে।     জাতীয়পর্যায়ে জাতীয় ইঁদুর দমনে অভিযান ২০২৩ এর কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে ৫টি ক্যাটাগরীতে পুরস্কারের তালিকা অনুযায়ী জুরেল সরেন কৃষক ক্যাটাগরিতে মনোনীত হন। এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের কারণে তিনি “জাতীয় ইঁদুর নিধন অভিযান ২০২৪”-এ কৃষক ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থানলাভ করেন। জাতীয়পর্যায়ে কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন সফল মানুষ হিসেবে তিনি উঠে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
জীবনযুদ্ধের অনুপ্রেরণা 
জুরেল সরেন শুধুমাত্র একজন ইঁদুর শিকারি নন, তিনি হলেন এক সংগ্রামী কৃষক, যিনি প্রতিকূলতাকে জয় করে জীবনের নতুন পথ নির্মাণ করেছেন। ইঁদুর খেকো ভেবে সবাই যেখানে ক্ষুব্ধ হতেন, জুরেল সেখানে দেখেছেন সুযোগ। তিনি বলেন, “ইঁদুর শুধু ক্ষতির কারণ নয়, সঠিকভাবে ব্যবস্থা নিলে এটি রূপ নিতে পারে এক বিকল্প সম্পদে।” 
তিনি ইঁদুর শিকার করে শুধু পুরস্কারই পাননি, বরং নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছেন। গর্তে ঢুকে থাকা ইঁদুরকে বের করে ধরে তিনি শুধু ফসল রক্ষা করেননি, সেই গর্তে জমা থাকা ধান, গম ও ভুট্টা সংগ্রহ করেও বাড়তি আয়ের উৎস তৈরি করেছেন, পরিবারে সচ্ছলতা এনেছেন। আর এই কাজে তিনি শুধু নিজেই নিয়োজিত নন, বরং উৎসাহ দিয়েছেন আশপাশের সাঁওতাল সম্প্রদায়কে। এখন গ্রামের অন্য কৃষকরাও তার দেখাদেখি ইঁদুর নিধনে এগিয়ে এসেছেন। তিনি নিজেই প্রশিক্ষণ দেন, কিভাবে গর্ত চিনে ইঁদুর ধরতে হয়। একা নয়, তিনি বিশ্বাস করেন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইঁদুরের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব। 
প্রশাসনিক প্রশংসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা 
গোদাগাড়ি উপজেলার উপজেলা কৃষি অফিসার বলেন, ইঁদুর জীব বৈচিত্র্যের অংশ হলেও আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং নিরাপদ পরিবেশের জন্য এটি দমন অত্যন্ত জরুরি। এ উপজেলাতে সারা বছর ইঁদুর দমনের কাজ চলে তবে বর্ষা মৌসুমে জোরালো ভাবে ইঁদুর নিধন কার্যক্রম চলে। ইঁদুর অত্যন্ত চতুর এবং খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য সর্বদা স্থান পরিবর্তন করে বিধায় ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সঠিক পদ্ধতি, সঠিক স্থান ও সঠিক সময়ে একযোগে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন। এককভাবে ইঁদুর নিধন করলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই একক ইঁদুর দমন করার সাথে সাথে সম্মিলিত ইঁদুর নিধনে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কাজেই ফসল ও সম্পদের ক্ষতিরোধ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও দূষণমুক্ত পরিবেশের স্বার্থে ইঁদুর ক্ষেত-খামার, বসতবাড়িসহ সর্বত্র ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই করে ইঁদুর দমনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুরেল সরেনের মতো উদ্যমী কৃষকদের অংশগ্রহণে ইঁদুর দমন কার্যক্রম আরও কার্যকর হচ্ছে। “ইঁদুর দমন একটি টেকসই প্রচেষ্টা, যা এককভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু জুরেল সরেন এককভাবে যা করে দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনন্য উদাহরণ।”
জুরেল সরেন বলেন, “পুরস্কার পাওয়ার পর আমার মনোবল আরও বেড়ে গেছে। এখন আমি শুধু নিজের জন্য না, গ্রামের সকল কৃষকের স্বার্থে ইঁদুর দমনের কাজ করছি। আমি চাই, আমাদের ফসল যেন নিরাপদে মাঠে বেড়ে ওঠে।”
তিনি ভবিষ্যতে তার নিজ সম্প্রদায়ে একটি “ইঁদুর দমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” স্থাপন করতে চান, যেখানে তরুণদের ইঁদুর নিধনের কৌশল শেখানো হবে। এতে যেমন ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ যেমন রোধ করা যাবে, তেমনি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। ইঁদুর ধরাকে পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে পারলে তারা অন্যান্য কৃষকের ক্ষেত-খামার, বসতবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে টাকার বিনিময়ে ইঁদুর দমন করে কৃষির পাশাপাশি বাড়তি আয় করতে পারবেন। ফলে তার সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। 
একজন অনন্য পথপ্রদর্শক 
জুরেল সরেনের গল্প কেবল একজন ইঁদুর শিকারির গল্প নয়; এটি একজন সংগ্রামী কৃষকের সফল অভিযাত্রার গল্প। কৃষি শুধু মাটি চাষ নয়, বরং পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানের মিশ্রণ। আর এই পরিবর্তনের অগ্রদূত হতে পারেন যেকোনো সাধারণ মানুষ, যদি তার মধ্যে থাকে জুরেল সরেনের মতো সাহস, চিন্তা ও উদ্যোগ।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি শুধু একজন সফল কৃষক নন, বরং একজন জাতীয় সম্পদ। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যদি আরও কৃষক এগিয়ে আসে, তাহলে ফসলের অপচয় কমে যাবে, খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

লেখক : ১আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, ২কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয় রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭৩৭৯৯১২৪৭, 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন