কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১ এ ১১:৪৪ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪২৭ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০২-২০২১
ড. ফ. ম. মাহবুবুর রহমান
মধু মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক অপূর্ব নেয়ামত। স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং যাবতীয় রোগ নিরাময়ে মধুর গুণ অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা.) একে ‘খাইরুদ্দাওয়া’ বা মহৌষধ বলেছেন। খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ সহস্রাদের শিলালিপিতে মৌমাছি পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়। ব্যাবিলন সাম্রজ্যে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব ৪র্থ সহস্রাব্দের শেষে ও ৩য় সহস্রাব্দের শুরুতে বিপুলভাবে মৌমাছি পালন করা হতো। মৌমাছি চাষের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও পদ্ধতিগতভাবে সর্বপ্রথম ১৬৩৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৌমাছি চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে ‘মোস্সে কুইনবি’ নামক বৈজ্ঞানিক মৌচাষ শুরু করেন। ১৮৫১ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে মৌচাষ শুরু করেন ল্যাংস্ট্রোথ নামক বৈজ্ঞানিক যাকে আধুনিক মৌচাষের জনক বলা হয়। ভারতবর্ষে ১৮৮৩ খ্রিঃ আধুনিক মৌমাছি পালন কার্যক্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশে আকতার হামিদ খান ১৯৬১ সালে কুমিল্লার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে প্রথম মৌচাষ শুরু করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে সাতক্ষীরাতে বিসিক প্রথম মৌচাষের উদ্যোগ নেয় এবং অদ্যাবধি বিসিকের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে ও সারাদেশে বিস্তৃত হয়েছে। বিসিকের প্রচেষ্টার সাথে পরবর্তীতে ৮০’র দশকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সম্পৃক্ত হয় এবং এর মাধ্যমে বর্তমানে মৌপালন সম্প্রসারণে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে মৌচাষের সম্ভাবনা
মৌচাষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী আয়েনস্টাইন (Einstein) মৌমাছির উপকারিতা বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, If the bee disappeared the surface of the globe, then the man would only have four years to live (যদি মৌমাছি পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়, তবে মানুষের জীবন পরবর্তী চার বছরেই শেষ হয়ে যাবে)”। ফসল উৎপাদন ও মানব কল্যাণে মধু ও মৌমাছির অপরিসীম ভ‚মিকা বিবেচনা করেই এই উক্তিটি করা হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে নানা ধরনের রোগব্যাধি নিরাময়ে মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাছাড়া বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও সুস্বাদু খাবার তৈরিতে মধু ব্যবহার করা হয়। মৌচাক থেকে প্রাপ্ত মোম দিয়ে নানা সামগ্রী যেমন- প্রসাধনী, মোমবাতি ইত্যাদি তৈরি হয়। এ দেশের ভ‚মিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মৌপালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে। এমন কি মধু বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ইতোমধ্যেই ভারত ও জাপানে বাংলাদেশের মধু রপ্তানি হচ্ছে, যা ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশের অপরিশোধিত মধু ক্রয় করে সেদেশে পরিশোধন করে পুনরায় বাংলাদেশে রপ্তানি করে প্রচুর মুনাফা করছে। এ ছাড়াও দেশীয় কিছু কোম্পানি মৌচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি মধু ক্রয় করে পরিশোধনের মাধ্যমে দেশে/বিদেশে বাজারজাত করছে। আমাদের দেশে মধু চাষের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। সুজলা সুফলা ষড়ঋতুর বাংলাদেশ, যার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আছে ফসলের মাঠ, বৃক্ষরাজী, সবজি ও ফুলবাগান। এখানে প্রায় প্রত্যেক ঋতুতেই কোন না কোন ফুল ফোটে। এসব জায়গা থেকে মৌমাছি প্রায় সারা বছরই মধু আহরণ করতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২৫০০ জন মৌচাষি বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করছে এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার টন মধু উৎপাদিত হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে মধুর উৎপাদন এক লক্ষ টনে উন্নীত করা সম্ভব। বাছবিচারহীন কীটনাশক প্রয়োগ, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, শিল্পায়ন ও অন্যান্য কারণে প্রকৃতিতে বসবাসরত মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী কীট-পতঙ্গের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মৌচাষিদের মৌপালনে উৎসাহিত করলে এ অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে, এমন কি অনেক প্রজাতির গাছপালা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মৌচাষের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষ বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, শ্রমিক শ্রেণী এবং সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন হবে। তারা মধু এবং অন্যান্য উপজাত দ্রব্য যেমন, রয়েল জেলি, পোলেন গ্রেইন, মৌ বিষ, প্রপেলিস, মোম ইত্যাদি দেশ-বিদেশে বিক্রির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় বাড়াতে সক্ষম হবেন। ব্যক্তিপর্যায়ে মৌমাছি পালন প্রকল্প স্থাপনের জন্য আলাদাভাবে কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঘরের বারান্দায়, ছাদে কিংবা বাগানেও মৌ-বাক্স রাখা যায়। অ্যাপিস মেলিফেরা প্রজাতির ৫টি মৌ-কলোনি সম্বলিত মৌ-খামার স্থাপনের জন্য মোট ব্যয় হয় ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ১০-১৫ বছর পর্যন্ত মৌ-বাক্স ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা যাবে। এজন্য আর কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। মেলিফেরা প্রজাতির প্রতিটি মৌ-বাক্স থেকে বছরে ৫০ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব, যার বাজারমূল্য প্রতি কেজি ২৫০ টাকা হিসেবে, ৫টি বাক্স থেকে ৬২,৫০০ টাকা। প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে মাত্র ২৫-২৭ হাজার টাকা এককালীন বিনিয়োগ করে প্রতি বছর ৬০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে আয় করা সম্ভব। মৌ-বাক্সের সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধির মাধ্যমে এ আয় অনেকগুণ বাড়ানো যায়। স্বল্প পরিশ্রমে এ ধরনের প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়া যায়, তেমনি ফসলের পরাগায়নে সহায়তাকরণের মাধ্যমে দেশের ফল ও ফসলের উৎপাদনে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা প্রদান করা যায়।
মৌচাষ এমন একটি ব্যবস্থাপনা যেখানে জমিতে বাড়তি কোন চাপ পড়ে না। বর্তমান পরিবেশকেই কাজে লাগিয়ে মৌচাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করা যায়। এছাড়া মৌচাষে চ্যালেঞ্জসমূহ উত্তরণ করলে মৌচাষকে জনপ্রিয় করা সম্ভব। যা দেশের ৮৫ হাজার গ্রামে এর সম্প্রসারণ ঘটলে লাখো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।
মৌচাষের চ্যালেঞ্জ
লাভজনক মৌচাষে চাষিদের জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব; প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য তেমন কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই; সাধারণ কৃষকদের জমিতে মৌ বাক্স স্থাপনে অনীহা প্রকাশ করে; মৌসুমে মধুর মূল্য কম থাকা; মৌ বাক্স চুরি হয়ে যাওয়া; আশেপাশে যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি মারা যাওয়া; অফ সিজনে মৌমাছি বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়; মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের স্বল্পতা; মৌচাষে দলভিত্তিক কাজ করতে হয়, দলীয় কাজে অনেকেই উৎসাহিত না হওয়া; এলাকায় ধারাবাহিকভাবে মধু পাওয়া যায় এমন ফসলের অভাব; মৌ-কলোনিসহ বাক্স পরিবহণে নানা জটিলতা।
মৌচাষ সম্প্রসারণে ডিএই
বাংলাদেশে উন্নতমানের বীজ ব্যবহারের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইউনিয়নভিত্তিক কৃষক উদ্যোক্তা (এসএমই) তৈরির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে ডাল, তেল এবং মসলাজাতীয় ফসলের উন্নতমানের বীজের সরবরাহ ও ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আধুনিক বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষকপর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-৩য় পর্যায় (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো যথাযথ পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মৌচাষ সম্পৃক্তকরণ। এ ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় মৌচাষের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রকল্পাধীন সময়ে ফসলের পরাগায়ন কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য আগ্রহী বীজ এসএমইগণকে মোট ২০০০টি উন্নতমানের মৌবাক্স, এক্সট্রাক্টর ও এক্সেসরিজ সরবরাহ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এসএমই ও তার পরিবারের সদস্যরা মৌচাষে সম্পৃক্ত থাকবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত হবে। এসব বস্তু থেকে প্রতি বছর ৪০ মে. টন করে অর্থাৎ প্রকল্পাধীন সময়ে প্রায় ১৬০ মে. টন উৎকৃষ্ট মানের মধু উৎপাদিত হবে যা মূল্যমান প্রায় ২.৫০ কেটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৯০০ জন কর্মকর্তার ডাল, তেল ও মসলা ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি ও মৌপালনের উপর ৬ দিনব্যাপী টিওটি কোর্স সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৬০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মৌচাষের ওপর ৩ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেছেন, যারা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে মৌচাষে মৌ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে কৃষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ মৌ-পালন বিষয়ে সম্পৃক্ত রয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন এসএমইগণকে মৌ-বক্স সরবরাহের ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মধু উৎপাদন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ পরপরাগী ফসলের পরাগায়ন নিশ্চিত হচ্ছে। প্রকল্পে মৌচাষ সম্পৃক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত ১৫-৩০% ফলন বৃদ্ধিসহ মধু উৎপাদন ও পরিবেশ বান্ধব চাষাবাদে কৃষকগণ উৎসাহিত হচ্ছে।
উপপ্রকল্প পরিচালক, কৃষকপর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-৩য় পর্যায় (১ম সংশোধিত), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৫৫২৩২৭১৮৮, ই-মেইল: mahbubur_fuad@yahoo.com