কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ০১:০৮ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩৩ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৪-২০২৬
মাঠ থেকে ভুট্টা গুদামজাত ব্যবস্থাপনা
মোঃ মনিরুজ্জামান
ভুট্টা বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ অর্থকরী শস্য হিসেবে পরিচিত। খাদ্যশস্য হিসেবে সরাসরি ব্যবহার ছাড়াও পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড শিল্পে ভুট্টার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৬৮ লক্ষ টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়, যার সিংহভাগ আসে রবি মৌসুম থেকে। এই রবি মৌসুমে চাষকৃত ভুট্টা সাধারণত বৈশাখ মাসে সংগ্রহ করা হয়। বৈশাখের প্রচ- রোদ যেমন ভুট্টা দানা শুকানোর জন্য উপকারী, তেমনি অসচেতন হলে এই সময়েই সবচেয়ে বেশি ফসল উত্তোলন পরবর্তী ক্ষতি হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র সঠিক সময় ও কৌশল না মানার কারণে মোট উৎপাদনের ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত ভুট্টা নষ্ট হয়ে যায়, যা সরাসরি কৃষকের আর্থিক ক্ষতির কারণ।
সঠিক পাকার স্তর নির্ধারণ
ভুট্টা ফসল উত্তোলনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সঠিক পাকার স্তর নির্ধারণ। অনেক কৃষক ধারণা করেন যে মাঠে যত বেশি দিন রাখা যাবে, ফলন তত বেশি হবে। বাস্তবে এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। ভুট্টা গাছ যখন সর্বোচ্চ শুষ্ক ওজন বা চযুংরড়ষড়মরপধষ গধঃঁৎরঃু (চগ)- তে পৌঁছে, তখন দানার ভেতরে শুকনো পদার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। সাধারণভাবে বপনের ১২০-১৫০ দিনের মধ্যে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়, যদিও জাত, তাপমাত্রা ও ব্যবস্থাপনার কারণে সময়ের কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। এই পর্যায়ে ভুট্টার মোচার আবরণ খড়ের মতো বাদামি রঙ ধারণ করে, দানা শক্ত হয় এবং দানার নিচের দিকে কালচে স্তর দেখা যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, এই সময় ভুট্টা দানার আর্দ্রতা থাকে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ।
ভুট্টা ফসল উত্তোলনের সময় এবং পদ্ধতিও ফলন ও গুণগত মানের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। সাধারণত সকাল বা বিকেলের দিকে, যখন তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে, তখন সংগ্রহ করা উত্তম। সঠিক সময়ে ভুট্টা সংগ্রহ না করলে নানা ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়। মাঠে অতিরিক্ত সময় ধরে রাখলে দানা ঝরে পড়া, পাখির আক্রমণ, পোকামাকড়ের ক্ষতি এবং ছত্রাক সংক্রমণ বেড়ে যায়। ঋঅঙ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, চগ স্তর পার হওয়ার পর প্রতি সপ্তাহ দেরি করলে ভুট্টার ফলন ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। হাতে বা ধারালো চাকু দিয়ে মোচা সংগ্রহ করা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। বড় জমিতে যান্ত্রিকভাবে মোচা সংগ্রহ করলে শ্রম ও সময় কম লাগে এবং দানার ক্ষতিও তুলনামূলক কম হয়। এ ছাড়া বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক বৃষ্টির কারণে মোচা ভেঙে পড়লে দানা ভিজে যায়, যা পরবর্তীতে সংরক্ষণে বড় সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই সঠিক পাকার লক্ষণ দেখা মাত্রই ফসল উত্তোলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফসল উত্তোলনের পরবর্তী ধাপ
ফসল উত্তোলনের পরবর্তী ধাপ ভুট্টা চাষের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধাপে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। মাঠ থেকে আনার পর ভুট্টার মোচা বা দানাকে যত দ্রুত সম্ভব শুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বৈশাখের রোদ এ ক্ষেত্রে কৃষকের জন্য বড় একটি সুযোগ। তবে সরাসরি মাটির ওপর না রেখে উঁচু মাচা, বাঁশের চাটাই বা পরিষ্কার পলিথিনের ওপর ছড়িয়ে শুকানো উচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির সংস্পর্শে শুকালে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
সংগ্রহোত্তর অপচয় : আধুনিক মাড়াই গবেষণায় দেখা গেছে, অসচেতনতার কারণে সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে প্রতি ১০০ মণ ভুট্টায় প্রায় ১০-১৩ মণ নষ্ট হয়। এই ক্ষতি কেবল ওজনেই কমে না, দানার গুণগত মান নষ্ট করে বাজারমূল্যও কমিয়ে দেয়। সনাতন পদ্ধতিতে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ভুট্টা মাড়াই করলে দানার উপরিভাগ ফেটে যায়, যা ছত্রাক আক্রমণের প্রধান কারণ। আধুনিক ‘পাওয়ার শেলার’ ব্যবহার করলে দানার ভাঙন রোধ করা যায় এবং অপচয় ১% এর নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। দানা ছাড়ানোর পর অবশ্যই পরিষ্কার করে ভাঙা, রোগাক্রান্ত ও ময়লা দানা আলাদা করে ফেলতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিষ্কার ও সমান আকারের দানার বাজারমূল্য সাধারণ দানার তুলনায় ১০-১৫ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।
শুকানো ও আর্র্দ্রতা ব্যবস্থাপনা : বাণিজ্যিক ভুট্টার ক্ষেত্রে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণই হলো সফলতার চাবিকাঠি। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভুট্টা দানার আর্দ্রতা ১৪ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনা নিরাপদ। আর যদি বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়, তবে আর্দ্রতা ১২ শতাংশ বা তার নিচে রাখা উত্তম। পোল্ট্রি ফিড বা মাছের খাবার তৈরির মিলগুলো সাধারণত ১২-১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টা কেনে। আর্দ্রতা এর চেয়ে বেশি হলে ‘অ্যাফলাটক্সিন’ নামক বিষাক্ত ছত্রাক তৈরি হয়, যা পশুখাদ্যের মান মারাত্মক ভাবে কমিয়ে দেয়। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ১৫-২০%। ভুট্টা শুকানোর সময় সরাসরি মাটির সংস্পর্শ এড়িয়ে পাকা চাতাল বা মোটা পলিথিন ব্যবহার করা উচিত।
ঋঅঙ-এর তথ্য অনুযায়ী, আর্দ্রতা ১৫ শতাংশের বেশি হলে মাত্র ২-৩ মাসের মধ্যেই ছত্রাক ও পোকামাকড়ের আক্রমণে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হতে পারে। তাই দানা ভালোভাবে শুকানো ছাড়া কখনোই গুদামজাত করা উচিত নয়। ভুট্টা সংরক্ষণের সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পোকামাকড়, ইঁদুর ও ছত্রাকের আক্রমণ। ঋঅঙ-এর হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ভুট্টা সংরক্ষণের সময় মোট ক্ষতির প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ ঘটে পোকামাকড় ও ইঁদুরের কারণে। এই ক্ষতি কমানোর জন্য পরিষ্কার, শুষ্ক ও বায়ু চলাচলকারী গুদাম ব্যবহার করা প্রয়োজন। বর্তমানে ঐবৎসবঃরপ বা বায়ুরোধী ব্যাগ ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। এই পদ্ধতিতে দানার ভেতরে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকায় পোকামাকড় বাঁচতে পারে না এবং অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রয়োজন পড়ে না।
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি গুদামজাতকরণ কৌশল : অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মৌসুমে ভুট্টার দাম কিছুটা কম থাকে, কিন্তু কয়েক মাস পর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই বাড়তি লাভের সুযোগ নিতে চাইলে চাষিদের গুদামজাতকরণের সঠিক কৌশল জানতে হবে। অবীজ বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভুট্টা গুদামজাত করার ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে:
পাত্র নির্বাচন : সাধারণ চটের বস্তায় ভুট্টা রাখলে বাইরের বাতাস ও আর্র্দ্রতা ভেতরে ঢুকে দানা নষ্ট করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি মজুতের জন্য বায়ুরোধী বা ‘এয়ার টাইট’ ড্রাম সবচেয়ে নিরাপদ। তবে বড় আকারে মজুদ করতে চাইলে প্লাস্টিক লাইনার যুক্ত বিশেষ বস্তা বা ‘হারমেটিক ব্যাগ’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
মাচায় সংরক্ষণ : বস্তায় ভুট্টা ভরার পর তা সরাসরি মেঝেতে রাখা যাবে না। মেঝে থেকে অন্তত ১ ফুট ওপরে কাঠের মাচা বা প্যালেট ব্যবহার করতে হবে। এতে মেঝের নোনা ধরা ভাব থেকে ফসল রক্ষা পাবে। দেয়াল থেকেও বস্তার স্তূপ অন্তত এক ফুট দূরে রাখতে হবে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে।
পোকা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ : গুদামটি হতে হবে অন্ধকারমুক্ত এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসপূর্ণ। প্রতি ১৫ দিন অন্তর গুদাম পরিদর্শন করে দেখতে হবে কোনো গুমোট গন্ধ বা দানার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে কি না। যদি দানা গরম হয়ে যায়, তবে তা দ্রুত বের করে পুনরায় রোদে শুকাতে হবে।
প্রাকৃতিক সংরক্ষণ পদ্ধতি : পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচতে দানার সাথে শুকনো নিম পাতা, গোলমরিচের গুঁড়ো বা লবঙ্গ ব্যবহার করা যায়। তবে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক মজুতের ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ ধূপন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় : যেসব কৃষক কিছুদিন ভুট্টা দানা গুদামজাত করে রাখতে চান, তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতি ১৫-২০ দিন অন্তর দানার রঙ, গন্ধ ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি পরীক্ষা করা উচিত। আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে পুনরায় রোদে শুকানো প্রয়োজন। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে ভুট্টা দানা ৬-৯ মাস পর্যন্ত নিরাপদে রাখা সম্ভব, যা কৃষককে বাজারে ভালো দামের সময় বিক্রির সুযোগ দেয়।
বাজারজাতকরণ ও মুনাফা বৃদ্ধি : ভুট্টার সঠিক বাজারমূল্য পেতে হলে এর ‘গ্রেডিং’ বা শ্রেণিবিভাগ অত্যন্ত কার্যকর। ছোট-বড় দানা আলাদা করা এবং ভাঙা দানা সরিয়ে ফেললে ভুট্টার লটের মান বাড়ে। বাণিজ্যিক ক্রেতারা সবসময় একজাতের এবং পরিষ্কার ভুট্টা বেশি দামে কেনেন। এই ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ছাত্ররা এই বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো সাধারণ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চাষি ভাইদের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা : বৈশাখের হঠাৎ বৃষ্টি থেকে ফসল বাঁচাতে সর্বদা ত্রিপল বা পলিথিন কাছে রাখুন; পুরনো পোকা ধরা বস্তা পরিষ্কার বা রোদ না দিয়ে নতুন ফসল ভরবেন না; অতি-শুকানো (১০% এর নিচে) পরিহার করুন, এতে দানার ওজন ও মান দুই-ই কমে।
সহজে মনে রাখার জন্য জরুরি টিপস
পরিপক্বতা : ব্ল্যাক লেয়ার পরীক্ষা করুন; মাড়াই : পাওয়ার শেলার ব্যবহার করুন; শুকানো : আর্দ্রতা ১২-১৩% নিশ্চিত করুন; সংরক্ষণ : প্লাস্টিক ড্রাম বা মাচার ওপর বস্তা রাখুন।
ভুট্টা চাষে প্রকৃত লাভ আসে মাঠের উৎপাদনের পাশাপাশি সঠিক post-harvest ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। সঠিক পাকার স্তর নির্ধারণ, সময়মতো ফসল উত্তোলন, বিজ্ঞানসম্মত শুকানো ও নিরাপদ গুদামজাতকরণের এই ধাপগুলো মেনে চললে কৃষক সর্বোচ্চ ফলন, উন্নত মানের দানা এবং অধিক বিক্রয় মূল্য নিশ্চিত করতে পারবেন। বৈশাখের রোদ যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে ভুট্টার হাসি শুধু মাঠেই নয়, কৃষকের জীবনেও আনন্দ বয়ে আনবে একইসাথে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রেফারেন্স : FAO (2018). Assessment of Post-Harvest Losses in Maize. World Bank (2019). Reducing Food
লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভুট্টা প্রজনন বিভাগ), বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর। যোগাযোগ : ০১৭১৭০৩১২৫২ ইমেইল : সড়হরৎুুঁধসধহ@নসিৎর.মড়া.নফ