কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৫:২৮ PM

মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কম্পোস্ট সার

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কম্পোস্ট সার
মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম
মাটির গঠন ও গুণাগুণ ঠিক রাখতে হলে জৈবসার ব্যবহার করেই মাটিকে উৎপাদনক্ষম করতে হবে। জৈবসার তৈরি ও সংরক্ষণের ব্যাপারে  কৃষক ভাইয়ের যত্নবান হওয়া উচিত। সামান্য উদ্যোগ নিয়ে নিজস্ব সম্পদ কাজে লাগিয়ে প্রায় বিনা খরচে জৈবসার তৈরি করা সম্ভব। কম্পোস্ট তৈরির আসল কাঁচামাল কচুরিপানা ছাড়াও খড়কুটা, ঝরাপাতা, আগাছা, আবর্জনা, ফসলের অবশিষ্টাংশ একত্রে মিশিয়ে পচানো হয়- যা থেকে উৎকৃষ্ট মানের কম্পোস্ট উৎপাদন সম্ভব। বর্ষায় বাংলাদেশে ডোবা-নালাসহ জলাঞ্চলগুলো কচুরিপানায় ভরে ওঠে। এই কচুরিপানাকেই আমরা কম্পোস্টের আসল কাঁচামাল হিসাবে গণ্য করতে পারি। আমরা সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে কম্পোস্ট তৈরি করতে পারি- স্তূপ পদ্ধতি ও গর্ত পদ্ধতি।
স্তূপ পদ্ধতি 
অতিবৃষ্টি ও বন্যাযুক্ত এলাকার জন্য স্তূপ বা গাদা পদ্ধতিতে কম্পোস্ট সার তৈরি করতে হবে। বসতবাড়ির আশপাশে, পুকুর বা ডোবার ধারে কিংবা ক্ষেতের ধারে যেখানে বন্যার কিংবা বৃষ্টির পানি দাঁড়াবার কোন সম্ভাবনা নেই এমন জায়গাকে স্তূপ পদ্ধতিতে কম্পোস্ট সার তৈরির স্থান হিসাবে নির্বাচন করতে হবে। স্তূপের উপরে চালা দিতে হবে অথবা গাছের নিচে স্থান নির্বাচন করতে হবে যাতে রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পায়।
স্তূপের আকার
এই পদ্ধতিতে গাছের ছায়ায় মাটির ওপর ৩ মিটার দৈর্ঘ্য ১.২৫ মিটার প্রস্থ ও ১.২৫ মিটার উঁচু গাদা তৈরি করতে হবে। সুবিধা অনুযায়ী এই মাপ কম বেশি করতে পারে। প্রথমত, কচুরিপানা অথবা অন্যান্য আবর্জনা ফেলে ১৫ সে. মিটার স্তূপ তৈরি করতে হবে। স্তর সাজানোর আগে কচুরিপানা টুকরা করে ২-৩ দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। এবার সাজানো স্তরের ওপর ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ২০০ গ্রাম টিএসপি ছিটিয়ে দেয়ার পর স্তরের উপরিভাগে ২.৫/৫ সেমি. পুরু করে কাদা ও গোবরের প্রলেপ দিয়ে দিন। এতে পচন ক্রিয়ার গতি বাড়বে। অন্যদিকে সুপার কম্পোস্ট তৈরি হবে। এভাবে ১.২৫ মিটার উঁচু না হওয়া পর্যন্ত ১৫ সেমি. পুরু স্তর সাজানোর পর পর ইউরিয়া ও টিএসপি দিয়ে তার ওপর গোবর ও কাদা মাটির প্রলেপ দেয়া প্রয়োজন। গাদা তৈরি শেষ হয়ে গেলে গাদার ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে ছাউনির ব্যবস্থা করতে হবে।
কম্পোস্ট স্তূপ পরীক্ষা
কম্পোস্ট স্তূপ তৈরি করার এক সপ্তাহ পর শক্ত কাঠি গাদার মাঝখানে ঢুকিয়ে দেখা প্রয়োজন গাদা অতিরিক্ত ভেজা কি না। যদি ভেজা হয় তবে গাদার উপরিভাগে বিভিন্ন অংশে কাঠি দিয়ে ছিদ্র করে দিতে হবে যাতে বাতাস ঢুকতে পারে। ২-৩ দিন পর গর্ত বা ছিদ্রগুলো মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে।
আবার গাদা অতিরিক্ত শুকিয়ে গেলে ছিদ্র করে পানি অথবা গোচনা ঢেলে দিন। এতে সার ভালো হবে। কম্পোস্ট তাড়াতাড়ি পচে সার হওয়ার জন্য স্তর সাজানোর ১ মাস পর প্রথমবার এবং ২ মাস পর দ্বিতীয় বার গাদার স্তরগুলো উল্টিয়ে  দেয়া প্রয়োজন। এ সময় কম পচা আবর্জনাগুলো গাদার মাঝখানে রাখতে হবে। আবর্জনা সার ঠিকমতো পচলে ধূসর বা কালো বর্ণ ধারণ করবে এবং আঙ্গুলে চাপ দিলে যদি গুঁড়া হয়ে যায় তাহলেই মাঠে ব্যবহারের উপযোগী হয়েছে। উল্লেখিত পদার্থের মাপগুলো যদি ঠিকমতো দেয়া হয় তবে এ জাতীয় কম্পোস্ট গাদা ৩ মাসের মধ্যে উন্নতমানের সারে রূপান্তরিত হয়।
গর্ত পদ্ধতি
পানি দাঁড়ায় না কিংবা কম বৃষ্টিপাত এলাকা কিংবা শুকনো মৌসুমে গর্ত পদ্ধতিতে কম্পোস্ট তৈরি করা যায়। গাছের ছায়ার নিচে বাড়ির পেছন দিকে অথবা গোশালার পাশেই কম্পোস্ট গর্ত তৈরি করা সব দিক থেকে সুবিধাজনক। প্রাপ্ত স্থানের সাথে সঙ্গতি রেখে গর্ত তৈরি করতে হবে। তবে ১.২৫ মিটার প্রস্থ, ১ মিটার গভীর ও ২.৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি গর্ত তৈরি করতে হবে।
গর্তের তলায় বালু অথবা কাঁকর দিয়ে দরমুজ করে দিন যাতে জলীয় পদার্থ শোষণ করে নিতে পারে। প্রয়োজনে ধানের খড়ও বিছিয়ে দিতে পারেন, তাও সম্ভব না হলে গোবর কাদার সাথে মিশিয়ে গর্তের তলা এবং চারপাশে লেপে দেয়া প্রয়োজন। মনে রাখা প্রয়োজন গর্তের ওপর দিকে ভূমি থেকে খানিকটা উঁচু করে আইল তৈরি করে দিতে হবে যাতে কোন রকমে পানি গড়িয়ে গর্তে পড়তে না পারে।
এখন গাদা পদ্ধতির মতো করে গর্তে কচুরিপানা স্তরে স্তরে সাজিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করতে হবে। অথবা গোয়াল ঘরে গোবর, গোরোচনা পাতা, আখের ছোবড়া, কলাপাতা যাবতীয় উচ্ছিষ্ট অংশ গর্তে ফেলুন। সম্ভব হলে গো-চনার সাথে কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে দিতে পারলে ভালো হয়। এমনি এক একটি স্তরের ওপর মাটির প্রলেপ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাটির প্রলেপ দেয়ার আগে স্তর ভালোভাবে ঠেসে দিতে হবে। গর্ত ভরাট না হওয়া পর্যন্ত এমনিভাবে স্তর তৈরি করতে হবে।
প্রত্যেকটি স্তর তৈরির পর মাটির প্রলেপ দেয়ার আগে পরিমান মতো ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিন। এরূপ একটি গর্তে তিন টন আবর্জনার জন্য ১-২ কেজি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হবে। গর্ত ভরাট হয়ে যাওয়ার পর গোবর ও মাটি মিশিয়ে উপরিভাগে প্রলেপ দিতে হবে।
সার যাতে শুকিয়ে না যায় তা পরীক্ষা করতে হবে। গর্তের মাঝখানে ছিদ্র করে দেখতে হবে, যদি শুকনো মনে হয় তবে ছিদ্র দিয়ে পানি ঢালতে হবে। জৈব পদার্থে পানির পরিমাণ ৬০-৭০ ভাগ থাকা বাঞ্ছনীয়। এভাবে তিন মাস রাখার পর এই সার ব্যবহার উপযোগী হবে।
কম্পোস্ট ব্যবহারের নিয়ম
ধান পাট, আলু, গম ও শাকসবজির মাঠে কম্পোস্ট ব্যবহার করা যায়। বেলে দোআঁশ, বরেন্দ্র ও লালমাটি এবং মধুপুরগড় এলাকার জন্য কাম্পোস্ট বেশ কার্যকরী। কম্পোস্ট জমিতে ছিটিয়ে দেয়ার সাথে চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।
জৈবসার জীববৈচিত্র্য এবং মাটির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা উন্নত করতে পারে এবং অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড ধারণ করতে পারে। জৈব পুষ্টিসমূহ, জৈব পদার্থ এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহের মাধ্যমে মাটিস্থ অণুজীবগুলোর (যেমন: মাইকোরাইজা ছত্রাক) কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর মাইকোরাইজা ছত্রাক উদ্ভিদকে পুষ্টি শোষণে সহায়তা করে।
জৈব চাষের আওতায়, মাটির উর্বরতার জন্য উপযুক্ত ফসল চক্র এবং জৈবসার ও জৈবসার প্রয়োগের পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত। 
জৈবসার এর উপকারিতা 
উদ্ভিদকে পুষ্টি এবং গৌণ উপাদান সরবরাহ করে জৈবসার। মাটির গঠন, জল ধারণক্ষমতা উন্নত করে এবং মাটির ঘনত্ব কমিয়ে দেয়। মাটি বাফার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অ্যাসিড মাটিকে  অ্যালুমিনিয়াম ও ফেরিক বিষাক্ততা থেকে মুক্ত করে। কার্বন-ডাই অক্সাইড পচনের সময় নির্গত হয়, যা কার্বন-ডাই অক্সাইড সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটা হরমোনের মতো বৃদ্ধি সহায়ক পদার্থ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। মাটির জীবাণুর খাদ্য উৎস হিসেবে এবং জীবাণুর কার্যকলাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। মাটি জৈব, হিউমিক সংক্রান্ত বিষয়বস্তু এবং সামগ্রিক উর্বরতা বৃদ্ধি করে। উদ্ভিদের শিকড়ের গভীরে অনুপ্রবেশ ঘটায়।
উদ্ভিদের পরজীবী নেমাটোড এবং ছত্রাক মাটিতে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে মাটিতে অণুজীবের ভারসাম্য পরিবর্তন করে। সামগ্রিক মাটির সমষ্টিগত স্থায়িত্ব, যা মাটিকে সর্বোত্তম পর্যায়ে কাজ করতে সাহায্য করে এবং সর্বোত্তম ফলন পেতে সাহায্য করে।

লেখক : উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার, উপজেলা কৃষি অফিস, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা, মোবাইল ০১৭১৮৬১২৩৯২, ইমেইল :aqiaiyum3@gmail.com 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন