কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:২৫ PM

মাটির কণা : বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ ও প্রতিকার

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৫

মাটির কণা : বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ ও প্রতিকার
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া
বায়ুদূষণের অন্যতম একটি উৎস হলো মাটির কণা, বিশেষ করে সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম)। মাটি থেকে উড়ে আসা এই ধূলিকণা এবং অন্যান্য কণা বাতাসে মিশে অ্যারোসল তৈরি করে এবং বাতাসের মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের বায়ুর মান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটেছে এবং দেশটি অনিরাপদ/অস্বাস্থ্যকর বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে স্থান পাচ্ছে। 
এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বিভিন্ন ধরনের দূষণ উপাদান যেমন পিএম, কার্বন মনো অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, এবং অজৈব ও জৈব গ্যাসের উপস্থিতি পরিমাপ করে নির্ণয় করা হয়। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফ্যাক্টর থাকলেও অন্যতম ফ্যাক্টর হলো পিএম। পিএম বা পার্টিকুলেট ম্যাটার হলো ছোট আকারের কঠিন কণা বা তরল পদার্থ যা বাতাসে ভাসমান থাকে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে থাকে। পিএম বাংলাদেশের বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মানের চেয়ে ১৫ গুণের বেশি পিএম পাওয়া গিয়েছে বাংলাদেশের বাতাসে। 
২০২৫ সালের প্রকাশিত একিউআই এর তথ্য মতে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা হচ্ছে সব থেকে দূষিত বাতাসের শহর। ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় শহর অর্থাৎ চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, এবং অন্যান্য বড় শহরগুলিতে একিউআই একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ এখানে বায়ু দূষণের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি  পরিমাণে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট চারটি শহরের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (১২ ই ফেব্রুয়ারি ২০২৫) যেমন এক. রাজশাহী -একিউআই:  ১৮৪ (অস্বাস্থ্যকর) অর্থাৎ রাজশাহীর বাতাসের গুণগত মান খারাপ যা সংবেদনশীল গুষ্টির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। দুই. দিনাজপুর (ফুলবাড়ী রোড) একিউআই: ১৮২ (অস্বাস্থ্যকর)  অর্থাৎ রাজশাহী থেকে সামান্য ভালো হলেও অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় রয়েছে। তিন.  চট্টগ্রাম (হালিশহর)- একিউআই:  ৯৯ (মধ্যম মানের)  অর্থাৎ এলাকার বাতাসের মান তুলনামূলকভাবে ভালো তবে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জন্য কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। চার. দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ঢাকা- একিউআই: ১৯৫ (অস্বাস্থ্যকর) অর্থাৎ চারটি স্থানের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বায়ু দূষণ, যা সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রকাশিত এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এখানে ঢাকার কেরানীগঞ্জের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যেখানে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয় ৩২৫৭টি  লোকাল গার্মেন্টস,  ১২৬২৮টি শিল্প কারখানা,  ২২৮টি  ইটের ভাটা থেকে বাতাসের দূষণের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয়, যে শহরে ভারী শিল্প কারখানা অবস্থিত সে শহরেই বায়ু-দূষণের পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আরেকটু ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।  
এক্ষেত্রে যদি রাজশাহীর সাথে তুলনা করা হয়, রাজশাহীতে শিল্পকারখানা তেমন নেই। একই বিষয়টি দিনাজপুরের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়, প্রত্যন্ত  অঞ্চল চিলির বন্দর উপজেলায় একিউআই হচ্ছে ১৮২। যা থেকে সহজেই বোঝা যায় যে শুধুমাত্র শিল্প কারখানা,  ইটের ভাটাই বায়ুদূষণের জন্য দায়ী নয়। এ বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় যখন চট্টগ্রামে একিউআই মাত্র ৯৯,  অথচ  বন্দর নগরী চট্টগ্রামে রয়েছে অসংখ্য শিল্প কারখানা, ইটের ভাটা, রয়েছে অসংখ্য গার্মেন্টস কারখানা অথচ  চট্টগ্রাম শহরের বাতাসের  একিউআই সবচেয়ে কম। তাহলে, অন্য একটি ফ্যাক্টর অবশ্যই বায়ু দুষণের জন্য দায়ী আর সেটা হলো পার্টিকুলেট  ম্যাটার বিশেষ করে পিএম- ২.৫ এবং  পিএম- ১০  যা বায়ু দূষণের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
এ পার্টিকুলের ম্যাটারগুলোর উৎস হিসাবে যানবাহন, কলকারখানা বর্জ্য, জ্বালানি পোড়ানো, পলিথিন অন্যান্য  ধ্বংসাবশেষ পোড়ানো  নির্মাণ কাজ ও রাস্তা মেরামতে সময় তৈরিকৃত ধূলিকণাকে বিবেচনা করলে ও  মৃত্তিকা গঠনকারী মৃত্তিকার প্রাথমিক কণা বিশেষ করে  পলি ও কর্দম কণা সব থেকে বেশি ভূমিকা রাখে। কারণ এগুলোর আকার পিএম-২.৫ এবং  পিএম-১০ এর মধ্যে পড়ে।
যে স্থানে এই পলি ও কর্দম কণার পরিমাণ যত বেশি থাকে, সেখানে বায়ু দূষণের পরিমাণও বেশি হয় অর্থাৎ এ সূক্ষ্ম ধূলিকণার উপস্থিতি আর বায়ু দূষণ সরাসরি সম্পর্কিত বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে। আবার কোনো স্থানে বায়ু দূষণের এ উপাদানগুলোর পরিমাণ ঐসব অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির সাথে মাটি গঠনের প্রকৃতির উপর ও নির্ভর করে । দেখা যায়, ভূমি গঠনের ক্ষেত্রে শিলার উপস্থিতি, যদি ভূপৃষ্ঠের উপরের স্তরে থাকে সে অঞ্চলে পলি ও কর্দম কণা পরিমাণ কম থাকে অথবা অপেক্ষাকৃত ভারী কণা, অর্থাৎ বালির পরিমাণ বেশি থাকে। অন্যদিকে যে স্থানে ভূমি গঠনকারী শিলার অবস্থান ভূপৃষ্ঠ থেকে বেশি গভীরে থাকে সেখানে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র মৃত্তিকা কণা অর্থাৎ পলি ও কর্দম কণা পরিমাণ বেশি থাকে যা খুব সহজে বাতাসে মিশে ঐ এলাকায় বায়ু দূষণ ও  বেশি ঘটিয়ে থাকে।
বাংলাদেশের স্থলভাগ গঠনের দিকে লক্ষ করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হওয়া যায়। বাংলাদেশ নামক ব-দ্বীপটি হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বিধৌত  হয়ে  বিভিন্ন সেডিমেন্টের সাথে বালি,পলি,  কর্দম কণার  স্থিতিকরণের মাধ্যমে  এই অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশ গঠিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে এ অঞ্চলের মাটির প্যারেন্ট ম্যাটেরিয়াল অর্থাৎ বেডরকের উপস্থিতি অনেক গভীরে। বিভিন্ন  অঞ্চলে বোরলগ বিশ্লেষণের  মাধ্যমে মাটির গভীরতা ও স্তরবিন্যাস নির্ধারণ থেকে জানা যায় যে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে  শেল শিলা ৪ থেকে ১০ মিটার  গভীরতার মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ দেশের কেন্দ্রীয় অংশ  অর্থাৎ ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় এটি ৩০ মিটার গভীরতায় ও তা পাওয়া যায় না। সুতরাং, ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাটিতে  শিলা ও বালির পরিমাণ বেশি লক্ষ করা যায় পক্ষান্তরে পলি ও কর্দম কণার  উপস্থিতি কম পাওয়া যায় । সুতরাং, চট্টগ্রামে একিউআই কম হওয়ার এটাও একটি অন্যতম কারণ।
এছাড়াও ঢাকা অঞ্চল, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র  নদী-বিধৌত অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত যেটা এই নদীগুলোর  প্রবাহের সাথে বালি, পলি, কর্দম কণার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। সুতরাং, এটা খুব সহজেই বলা যায়, যেসকল এলাকায় পলিও কর্দম কণার পরিমাণ বেশি সেসকল এলাকাতে বায়ুদুষণের  পরিমাণটা বেশি হবে; যেটা খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে ঢাকা শহরে। সুতরাং, আমাদেরকে মৃত্তিকা কণার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র মৃত্তিকা কণা অর্থাৎ পলি ও কর্দম কণা যাদের আকার পিএম-২.৫ এবং পিএম-১০ এর মধ্যে পড়ে, তাদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়ু দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে।
মাটি কণা দ্বারা বায়ু দূষণের পরিমাণ কমানোর ক্ষেত্রে যেসকল পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে :
া বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন : ধূলিকণা প্রবাহ প্রতিরোধ ও সংস্থাপনের জন্য খোলা জায়গা ও রাস্তাঘাটে বেশি বেশি করে গাছ লাগানো উচিত। ঘাস, গুল্ম ও বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে এবং ধূলিকণা  বাতাসে উড়তে দেয় না।
া রাস্তা ও নির্মাণ স্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ : রাস্তায় পানি ছিটানো বা স্প্রে করা, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে খুবই প্রয়োজন। নির্মাণকাজ চলাকালীন সময়ে খেয়াল রাখতে হবে নির্মাণ সাইট থেকে ধূলাবালু, ভবন ভাঙার অংশবিশেষসহ অন্যান্য সামগ্রী যেন রাস্তার উপরে উন্মুক্ত অবস্থায় না থাকে।  ধূলা কমানোর জন্য ডাস্ট সাপ্রেসেন্ট  বা রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।  
া শিল্প কারখানার ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণ : কারখানাগুলোতে উন্নত ফিল্টার এবং ধূলা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা স্থাপন করতে হবে। কাঠ, কয়লা, কেরোসিনসহ ও অন্যান্য ধুলাযুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আনতে  হবে। 
া আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার :  এয়ার পিউরিফাইং টাওয়ার বা স্মগ টাওয়ার বসানো। 
া কৃষি ও মাটির মান : শস্য নিবিড়তা কমিয়ে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
মাটির কণার উপস্থিতি বায়ু দূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।  সভা, সেমিনার, পোস্টার প্রদর্শনী ও বিভিন্ন উপায়ে মাটির কণার উৎস, এর প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি  এবং তার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরাসহ তা প্রতিরোধের জন্য আমাদের প্রত্যেককেই সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করবে পাশাপাশি একিউআই সূচকে বাংলাদেশকে বেশি বায়ু দূষণের দেশের তালিকা হতে কম বায়ু দূষণের দেশের তালিকাতে পৌঁছে দেবে। 
 
লেখক : মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, মোবাইল : ০১৭৩১২১৪৯২৪, 
ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন