কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ এ ০৬:৩৪ PM

ভুট্টা থেকে কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের উপায়

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৩-০৪-২০২৫

ভুট্টা থেকে কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের উপায়
মোঃ মনিরুজ্জামান
বাংলাদেশে কৃষি খাত একটি বিশাল সম্ভাবনাময় খাত। এখানে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ভুট্টা উৎপাদন হয়, যা প্রধানত পোলট্রি ফিড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কর্ন স্টার্চ, যা মেইজ স্টার্চ নামেও পরিচিত। এটি মূল্যবান শিল্পজাত পণ্য যা খাদ্য, ওষুধ, টেক্সটাইল, বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ এবং কাগজ শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ভুট্টা থেকে কর্ন স্টার্চ উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদেরকে সম্ভাব্য সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো, সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা এবং কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
ভুট্টা উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান হার : গত দুই দশকে বাংলাদেশে ভুট্টা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। ২০২৩-২৪ সালে ভুট্টা উৎপাদন ০.৬৪৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে প্রায় ৬.৮৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা ২০০০ সালে ছিল ১.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন (ইডগজও অহহঁধষ জবঢ়ড়ৎঃ, ২০২৩-২৪)। 
কর্ন স্টার্চের ক্রমবর্ধমান চাহিদা : কর্ন স্টার্চের ব্যবহারের পরিধি ব্যাপক। যেমন : খাদ্য শিল্প: স্ন্যাকস, সস এবং পানীয়গুলোর মতো পণ্যে ঘনত্ব, স্থায়িত্ব এবং মিষ্টি স্বাদ প্রদান করতে ব্যবহৃত; টেক্সটাইল শিল্প : সুতা মজবুত করতে সাইজিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়; ওষুধ শিল্প : ট্যাবলেট তৈরিতে বাইন্ডিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত; কাগজ শিল্প : কাগজের মান উন্নত করতে লেপন (পড়ধঃরহম) উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত। বাংলাদেশে প্রসারমান খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং টেক্সটাইল শিল্প কর্ন স্টার্চের জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা তৈরি করেছে, যা বর্তমানে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বাংলাদেশ ২০২২ সালে ২৫,০০০ মেট্রিক টনেরও বেশি কর্ন স্টার্চ আমদানি করেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে এর ব্যাপক চাহিদার সম্ভাবনা নির্দেশ করে (ইধহমষধফবংয ঞৎধফব চড়ৎঃধষ, ২০২৩)।
ভুট্টার স্টার্চ দিয়ে বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ উৎপাদন :  ভুট্টার স্টার্চ বা কর্ন স্টার্চ হলো একটি প্রাকৃতিক কার্বোহাইড্রেট, যা ভুট্টা দানা থেকে তৈরি করা হয়। এটি হচ্ছে বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার (যেমন-পলিল্যাকটিক অ্যাসিড (চখঅ)। যখন এটির সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করানো হয়, তখন এটি পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরির মূল উপাদান হয়ে ওঠে। এই ব্যাগগুলো কম্পোস্টিং পরিবেশে কয়েক মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে যায়। বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের বাজার প্রতি বছর ১৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাজারে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং জাপান এগিয়ে রয়েছে। সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে, বাংলাদেশ এই রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারে।
রপ্তানি সম্ভাবনা
ভারত, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে কর্ন স্টার্চ রপ্তানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একটি শক্তিশালী দেশীয় উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা হলে বাংলাদেশ এই রপ্তানি বাজারগুলোর সুযোগ নিতে পারে এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। 
ভুট্টা থেকে কর্ণ স্টার্চ উৎপাদন  
প্রায় ১.৬ টন ভুট্টা থেকে ১ টন কর্ন স্টার্চ উৎপাদন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রতি একরে কাঁচা ভুট্টা থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে কতটুকু স্টার্চ পাওয়া যায় তা ভুট্টার জাত এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের দক্ষতার উপর নির্ভর করে। 
সাধারণত কাঁচা ভুট্টার দানাতে শুষ্ক ওজনের ভিত্তিতে প্রায় ৬০-৭২% স্টার্চ থাকে। আর ওয়েট মিলিং (ভেজা পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ) প্রক্রিয়ায় দক্ষতার সাথে প্রক্রিয়াজাত করা হলে শুষ্ক ওজনের প্রায় ৬৫-৭০% স্টার্চ পুনরুদ্ধার করা যায়। অর্থাৎ তবে ১০০ কেজি শুষ্ক ভুট্টা থেকে প্রায় ৬৫-৭০ কেজি স্টার্চ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এর মূল্য প্রায় প্রতি টন ২,৪৯৮.০০ (আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য) ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৩ লক্ষ টাকা হতে পারে।
ভুট্টা থেকে কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের মূল ধাপগুলো
পরিষ্কারকরণ : ভুট্টার দানাগুলোকে সবরকম ময়লা, পাথর এবং অন্যান্য ময়লা/অশুদ্ধি থেকে পরিষ্কার করা হয়।
ভেজানো : পরিষ্কার ভুট্টার দানাগুলোকে ২৪-৪৮ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এই প্রক্রিয়া দানাগুলোকে নরম করে এবং স্টার্চ, প্রোটিন এবং ফাইবার আলাদা করতে সহায়তা করে।
মিলিং : ভেজানো দানাগুলোকে প্রাথমিকভাবে গ্রাইন্ড করে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলা হয়।
জার্ম পৃথকীকরণ : গ্রাইন্ড করা মিশ্রণ হাইড্রোসাইক্লোনের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয় যাতে জার্ম (যেটিতে তেল থাকে) অন্যান্য উপাদান থেকে আলাদা হয়।
ফাইবার ধোয়া : অবশিষ্ট মিশ্রণটি আরও প্রক্রিয়া করা হয় যাতে ফাইবার স্টার্চ এবং গ্লুটেন থেকে আলাদা হয়। এটি বিভিন্ন মাত্রার ধোয়া (ধিংযরহম) এবং সেন্ট্রিফিউজেশন ধাপের মাধ্যমে করা হয়।
স্টার্চ পৃথকীকরণ : সেন্ট্রিফিউজের মাধ্যমে ফাইবার এবং গ্লুটেন থেকে স্টার্চকে আলাদা করা হয়। অবশিষ্ট কোনো গাদ/ময়লা দূর করতে স্টার্চকে পুনরায় ধোয়া হয়।
ডিওয়াটারিং : ধোয়া স্টার্চকে রোটারি ড্রাম ফিল্টার বা পিলার সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার করে অতিরিক্ত পানি অপসারণ করা হয়।
শুকানো : ডিওয়াটার স্টার্চকে শুকানোর যন্ত্র ব্যবহার করে পাউডার আকারে শুকানো হয়।
এই ধাপগুলো নির্দিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে সামান্য ভিন্ন হতে পারে (ড্রাই মিলিং বনাম ওয়েট মিলিং)। ওয়েট মিলিং আরও জটিল, উপরন্তু কর্ন তেল এবং কর্ন গ্লুটেনসহ আরও পণ্য উৎপাদন করে।
বাংলাদেশে কর্ন স্টার্চ উৎপাদন উন্নয়নের উপায়
কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নিম্নলিখিত কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে : 
প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ : সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতা আধুনিক কর্ন স্টার্চ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা কৃষি-শিল্প পার্ক নির্ধারণ করা যেতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ছাড় বা স্বল্প সুদের ঋণের মতো প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
কাঁচামালের গুণগত মান উন্নয়ন : কৃষকদের ফসল কাটার পরে সঠিক পরিচালনা, শুকানো এবং সংরক্ষণ প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত। এ ছাড়াও সাইলো এবং অন্যান্য সংরক্ষণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা হলে ক্ষতি কমানো এবং শস্যের গুণমান বজায় রাখা সম্ভব।
ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন : বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তিবিদদের কর্ন স্টার্চ উৎপাদন প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। চীন বা ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জ্ঞান বিনিময় করা যেতে পারে।
গবেষণা ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করা : বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইডগজও)-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টার্চ কনটেন্টের জন্য উপযোগী ভুট্টার জাত উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা এই ধরনের উদ্ভাবনকে আরো বৃদ্ধি করতে পারে।
নীতিগত সহায়তা : সরকারকে কর্ন স্টার্চ শিল্পের বিকাশে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এর মধ্যে স্টার্চ পণ্যের আমদানি সীমাবদ্ধ করা, স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য ভর্তুকি এবং প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা পণ্য রপ্তানির জন্য প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
রপ্তানি নেটওয়ার্ক তৈরি : প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে রপ্তানি বাণিজ্য চুক্তি স্থাপন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার জন্য দক্ষ লজিস্টিক্স এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই বিদ্যমান। দেশে মাটির উর্বরতা, পর্যাপ্ত জলবায়ু এবং ভুট্টা চাষের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং শিল্পের চাহিদা কর্ন স্টার্চ উৎপাদনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে। তবে পর্যাপ্ত আধুনিক প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াকরণ কারখানার অভাব এবং বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধতা এই শিল্পের বিস্তারে প্রধান বাধা। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক স্থান অর্জন করতে পারে। এই শিল্পের উন্নয়ন কৃষি ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভুট্টা প্রজনন), বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর।  মোবাইল :  ০১৭১৭০৩১২৫২ ; ই-মেইল :moniruzzaman@bwmri.gov.bd

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন