কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ এ ০৭:০৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৩-০৪-২০২৫
বীজের মাধ্যমে জিরো ক্যালরি মিষ্টি ফসল স্টেভিয়ার বংশবৃদ্ধি প্রযুক্তি
ড. নাদিরা ইসলাম১ মোঃ আব্দুল আজিম২
স্টেভিয়া কম্পোজিটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি ট্রপিক্যাল বা সাব-ট্রপিক্যাল ও কষ্টসহিষ্ণু বহু বর্ষজীবি গুল্ম জাতীয় ঔষধি গাছ। পৃথিবীতে ২৪০টির মতো প্রজাতি এবং ৯০টির মতো জাত আছে। গাছটির অনেক শাখা প্রশাখা গজায়। মোটামূল মাটির নিচের দিকে গমন করে এবং চিকন মূলগুলো মাটির পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। পাতাগুলো বিপরীত দিকে অবস্থিত, খাঁজকাটা, ও গাঢ় সবুজ। ফুলগুলো সাদা, নলাকৃতি এবং উভয়লিঙ্গ। গাছগুলো সুগন্ধ ছড়ায় না কিন্তু পাতাগুলো মিষ্টি। তাপমাত্রা ১৫০ সে. থেকে ৩০০ সে. এবং আর্দ্রতা ৬৫-৮৫% স্টেভিয়ার জন্য ভাল। বছরে ১৪০ সেমি. বৃষ্টিপাত হলে ভাল হয়। এটি ছোট দিনের উদ্ভিদ। স্টেভিয়ার গাছ সহজে উৎপাদন করা যায়। এমন কি মাটির টবে চাষ করা যায়। চিনির বিকল্প হিসাবে জিরো ক্যালরি স্টেভিয়ার পাতা ব্যবহার করা যায়। স্টেভিয়ার পাতা চিনি অপেক্ষা ৩০-৪০ গুণ এবং পাতার স্টেভিয়াসাইড চিনি অপেক্ষা ৩০০ গুণ বেশি মিষ্টি। এটিকে মিষ্টি পাতা, মধুপাতা এবং মিষ্টি হার্ব প্রভৃতি নামে বলতে পারি। স্টেভিয়ার বীজ থেকে চারা অঙ্কুরোদগমের হার কম। সাধারণত স্টেম কাটিং বা টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে স্টেভিয়ার চারা উৎপাদন করা হয়। সাম্প্রতিককালে স্টেভিয়ার বীজ থেকে চারা উৎপাদনের সফল কৌশল উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে।
স্টেভিয়ার পাতা চিনি অপেক্ষা ৩০-৪০ গুণ এবং পাতার স্টেভিয়াসাইড চিনি অপেক্ষা ৩০০ গুণ বেশি মিষ্টি। ক্যালরিমুক্ত এই মিষ্টি ডায়াবেটিক রোগী সেবন করলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরিবর্তন হয় না। এটি প্যানক্রিয়েজ ইনসুলিন উৎপাদন উদ্দীপ্ত করে। রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ব্যাকটেরিয়া সাইডাল এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। এটি খেলে দাঁতের ক্ষয়রোগ রোধ করে। স্কিন কেয়ার হিসাবে কাজ করে বিধায় ত্বকের কোমলতা এবং লাবণ্য বৃদ্ধি করে। স্বাদ বৃদ্ধিকারক হিসাবে কাজ করে। চা, কফি, মিষ্টি, দই, বেকড ফুড, আইসক্রিম, কোমল পানীয় ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর ভেষজ উপাদান মানুষের দেহে কোন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।
বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার: প্রকৃতিতে এটি বীজ, মূলের বিভাগ এবং কা- লেয়ারিং এর মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। বীজের মাধ্যমে এর অঙ্কুরোদগমের হার কম। তাছাডা টিস্যু কালচারের মাধ্যমেও বংশবিস্তার করা সম্ভব হয়েছে। অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এ সাধারণ টেক্সারের মাটি, অনুর্বর অম্লযুক্ত বালু মাটি এবং তৃণভূমিতেও জন্মাতে পারে। সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে স্টেভিয়ার গাছ থেকে সংগৃহীত শুকনো ফুল থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। একটি ট্রেতে ৩ ভাগ মাটি ও ১ ভাগ গোবরের মিশ্রণের মধ্যে বীজ বসানো হয়। লক্ষ্য রাখা হয় মাটি যেন বীজের উপর বেশি না পড়ে। এরপর মাটিতে সামান্য পানি দিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ মাটিতে রসের পরিমাণ কম থাকে। ট্রের উপর একটা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এতে মাটিতে বিদ্যমান সামান্য রস বাষ্প হয় না এবং প্রতিদিন সকালে পলিথিনে টোকা দিয়ে পলিথিনে লেগে থাকা পানি ট্রের ভিতর ফেলে দিতে হবে। কয়েকদিন (৫-৭) দিন পর অঙ্কুরোদগম হতে থাকে। ৩০-৩৫ দিন পর পলিব্যাগে চারা দেওয়া হয়। সঠিক সময়ে চারাগুলো মাঠে লাগানো হয়।
চাষের জন্য উপযুক্ত মাটি, সময়, জমি তৈরি : দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি স্টেভিয়া চাষের জন্য বেশ উপযোগী। উচু জমি স্টেভিয়া চাষের জন্য ভাল। মাটির পিএইচ ৬.৫ থেকে ৭.৫ থাকা ভাল। বছরের যে কোন সময় চাষ করা যায়। তবে জানুয়ারি থেকে মার্চ (মধ্য পৌষ থেকে মধ্য চৈত্র) মাসে চাষ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে চাষ করলে ফলন বেশি হয়। জমি খুব ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করতে হয়। জমির অবস্থা ও মাটির প্রকারভেদে ৪-৬টি চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ভালভাবে ঝুরঝুরা করে চাষ করতে হয়। চাষের সময় প্রয়োজনে জমির মাঝে কিছুটা উঁচু করে তৈরি করলে ভাল যাতে বৃষ্টির পানি সহজেই নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাষণের সুব্যবস্থা থাকা ভাল।
সারি ও গাছের দুরুত্ব : সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০-৫৫ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫০-৫৫ সেমি. করে রোপণ করা যেতে পারে। এক হেক্টর জমিতে ৪০,০০০ গাছ লাগানো যায়।
সার প্রয়োগ: স্টেভিয়া গাছে খুব কম পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়। মাটি পরীক্ষার পর প্রয়োজন মতো সার প্রয়োগ করা ভাল। তবে অনুমোদিত গড় সারের মাত্রা হেক্টর প্রতি ১৪০ কেজি ইউরিয়া, ৪২ কেজি টিএসপি এবং ৩৫ কেজি এমপি (বিঘা প্রতি ২০ কেজি ইউরিয়া, ৬ কেজি টিএসপি, ৫ কেজি এমপি)। জমি চাষের সময় সমুদয় টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিযা ও এমপি সার তিন বারে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর ১ মাস পর হতে প্রতি মাসে ইউরিয়া ও এমপি সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
সেচ ও নিষ্কাশন: চারা লাগানোর পরপরই সেচ দিতে হয়। মাঠে মাঝে মাঝে হালকা সেচ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। বৃষ্টির পানি মাঠে জমা হলে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মাটির টবে স্টেভিয়ার চাষ: মাটির টবেও স্টেভিয়ার চাষ করা যায়। মাটির টবে লাগানোর জন্য অর্ধেক দো-আঁশ মাটি এবং অর্ধেক পচা গোবর ভালভাবে মিশিয়ে রৌদ্রে শুকায়ে টবে ভর্তি করা হয়। একটি মাধ্যম সাইজের (৩৫ সেমি. ী ২৫ সেমি.) মাটির টব ভর্তি করার জন্য ১০ কেজির মত পচা গোবর মিশ্রিত মাটির প্রয়োজন হয়। টবে মাটি ভর্তির পর স্টেভিয়ার চারা সাধারণভাবে রোপণ করতে হয়। টবে রোপণের পরপরই গাছের গোড়ায় হালকা পানি দিতে হয়। তাছাড়া টবের গাছে নিয়মিত হালকা পানির সেচ দিতে হয়। সেচ দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে টবের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে। লাগানোর পর গাছ যাতে হেলে না পরে সেজন্য খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। রোপণকৃত গাছ উন্মুক্ত রৌদ্রোযুক্ত স্থানে, বাসার ছাদে অথবা বারান্দায় রাখা রাখা যায়। বারান্দায় রাখলে লক্ষ রাখতে হবে গাছে যাতে রোদ লাগে। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে গাছসহ টবটিকে একস্থান থেকে অন্য স্থানে সরাতে হবে অথবা ১৮০০ কোণে ঘুরিয়ে দিতে হবে। যাতে গাছের সবদিকে সমান বৃদ্ধি ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে ফেব্রুয়ারি ও সেপ্টেম্বর মাসে রোপণ করলে মাটির টবে ভালো ফলন পাওয়া যায়। মাটির টবে জন্মানো গাছের উচ্চতা ১-১.৫ মিটার হয়ে থাকে। প্রথম বার পাতা সংগ্রহের পর দ্বিতীয় বার হতে মুড়ি হিসাবে টবে ভাল ফলন পাওয়া যায়। প্রতিটি গাছ হতে প্রথমবারে প্রায় ২০০টি এর মতো পাতা পাওয়া যায়, কাঁচা অবস্থায় যার ওজন ৩০-৪০ গ্রাম হয়ে থাকে। উক্ত পাতা শুকায়ে পাতা গুড়া করলে ৭-১০ গ্রাম পাউডার পাওযা যায়। মুড়ি ফসলের ক্ষেত্রে প্রতি টবে ১০-১৫টির মতো কুশি বের হয়ে ঝোপালো আকারে গাছের বৃদ্ধি ঘটে। ফলে মুড়ি ফসলের ফলন ১০-১৫ গুণ বেশি পাওয়া যায়। চারবার মুড়ি ফসল সংগ্রহের পর পাতার আকার ছোট হতে থাকে। মুড়ি ফসলের কুশি হতেও চারা তৈরি করা যায়। ঠিক ফুল ফোটা শুরু হওয়ার পূর্বে ফসল সংগ্রহ করতে হয়। গাছ হতে সংগ্রহকৃত পাতা রৌদ্র্রে ২৪-৪৮ ঘণ্টা শুকিয়ে তারপর গুঁড়া করে পলিথিন ব্যাগ, কাচের বোতলে সংরক্ষণ করা যায়। টবে উৎপাদন করা গেলেও বাংলাদেশের আবহাওয়াতে উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তঃপরিচর্যা: প্রয়োজনমতো জমিতে আগাছা দমন ও সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। চারা লাগানোর পর সতেজ চারার গোড়ায় যাতে পানি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে চারার গোড়ায় অল্প মাটি তুলে দেওয়া যেতে পারে। মাঝে মাঝে মাটি আলগা করে দিলে ফসল ভাল হয়।
মুড়ি ফসল চাষ: মাটির টবে বা জমিতে একবার চারা রোপণ করে স্টেভিয়ার চাষ করলে পরবর্তী তিন-চার বছর আর নতুন করে চারা রোপণ করার প্রয়োজন পড়ে না। ফসল সংগ্রহের পর মাটির উপর পাঁচ-ছয় সেন্টিমিটার রেখে গাছ কেটে দিলে গোড়া হতে কুশি বের হয়ে নতুনভাবে মুড়ি ফসলের সৃষ্টি করে। এভাবে তিন/চার বছর চারা রোপণ না করেই সফলভাবে মুড়ি ফসল হিসাবে স্টেভিয়া চাষ করা যায়।
পোকামাকড় ও রোগবালাই: স্টেভিয়া চাষের ক্ষেত্রে পোকামাকড় এবং রোগবালাই এর তেমন কোন উপদ্রব লক্ষ্য করা যায় না।
ফলন: মাঠে চাষ করলে আষাঢ়-শ্রাবণ মাস হতে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্টেভিয়া গাছ হতে পাতা সংগ্রহ করা যায়। মাটির টবে লাগানো গাছ বড় হওয়ার পর সারা বছরই পাতা সংগ্রহ করা যায়। একটি মাটির টবে লাগানো গাছ হতে ৩০-৪০ গ্রাম সবুজ পাতা সংগ্রহ করা হয় যা হতে ৭-১০ গ্রাম শুকনা পাতার গুঁড়া পাওয়া যায়। মাঠে চাষ করলে গাছে ফুলের কুঁড়ি আসার পূর্বে এবং ফুলের কুঁড়ি দেখা দেওয়ার সাথে সাথে পাতা সংগ্রহ শুরু করতে হয়। সকাল বেলা পাতা সংগ্রহ করলে মিষ্টতা বেশি পাওয়া যায়। গাছের সমস্ত পাতা দুই-তিন বারে সংগ্রহ করা হয়। বিঘাপ্রতি ৪৫০-৫৫০ কেজি সবুজ পাতা পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমি হতে ১৫৫-১৯০ কেজি শুকনা গুঁড়া পাওয়া সম্ভব।
স্টেভিয়ার গুঁড়া মিষ্টি দ্রব্য, চা ও কফিতে ব্যাবহার: সংগ্রহকৃত পাতা রৌদ্রে অথবা ছায়াতে শুকায়ে গুড়া করে চা অথবা কফির সাথে এবং অন্যান্য মিষ্টি দ্রব্যে চিনির বদলে ব্যবহার করা হয়। এক কাফ চা অথবা কফি তৈরীতে ২ গ্রাম চা বা কফির গুঁড়ার জন্য ০.২৫ গ্রাম স্টেভিয়া পাতার গুঁড়াই যথেষ্ট। অর্থাৎ চা বা কফি এবং স্টেভিয়ার অনুপাত হলো ৮ ঃ ১। তৈরির সময় স্টেভিয়ার গুঁড়া পরিমাণ মতো পানির সাথে মিশিয়ে ১৫-২০ মিনিট ধরে ফুটাতে হবে। উক্ত স্টেভিয়া গুড়া মিশ্রিত ফুটানো পানি দিয়ে সাধারণভাবে চা বা কফি তৈরির মতো করে পান করতে হয়। অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য তৈরির ক্ষেত্রে চিনির অনুপাত অর্থাৎ চিনির পরিবর্তে ৩০-৪০ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ স্টেভিয়ার শুকনো পাতার গুঁড়া ব্যবহার করতে হবে।
লেখক: ১বিভাগীয় প্রধান, ২বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বিভাগ, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইল: ০১৭৫৭৪১৭৭৫৬ ই-মেইল-azimabdul547@gmail.com