কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৮:০০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
বিশ^ খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলায় খাদ্য অপচয়রোধে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিতে বর্তমানে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ সবচেয়ে কঠিন হুমকির মধ্যে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রতিনিয়ত কৃষিপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে হিমসিম খেতে হচ্ছে যেখানে কৃষিই অর্থনীতির একমাত্র চালিকাশক্তি ও শিল্প হিসেবে বিবেচিত। জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নত দেশগুলোর রপ্তানি ও শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, ভ‚রাজনীতি, কৌশলগত কারণে অর্থনৈতিক টানাপড়ন মোকাবিলা কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরো বিশ^কে খাদ্য চাহিদা ও সঙ্কট মোকাবিলায় টাল-মাটাল করেছে। জাতিসংঘের ৫টি সংস্থা-এফএও, ইফাদ, ডবিøউএফপি, ডবিøউএইচও এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক গেøাবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ তীব্র খাদ্য সঙ্কটের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে, যা আমাদের জন্য ভবিষ্যতের প্রস্তুতিকে ইঙ্গিত করছে। যদিও যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য আমাদের মজুদ রয়েছে। তবুও প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ঝড়, বৃষ্টি, খরা ও জলবায়ুর পরিবর্তন কৃষিকে প্রতিনিয়ত হুমকির মধ্যে রেখেছে। শুধুমাত্র খাদ্য সঙ্কটই নয় সুষম খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও সার্বিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ মানুষই অপুষ্টির শিকার হচ্ছে, যা জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষিতে দেশের সাফল্য অভ‚তপূর্ব এবং দৃশ্যমান, যা বিশ^বাসীকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কৃষি উৎপাদনে অনেক ফসলের সফলতা সারা বিশে^ শীর্ষ ১০ এর মধ্যে বিদ্যমান।
বিশে^ ব্যক্তি ও পরিবারের অর্থ সঙ্কটের কারণে খাদ্য ক্রয়ের অক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীর্ষ ৩টি দেশের মধ্যে নাইজেরিয়া, সুদান ও কঙ্গোপ্রজাতন্ত্র উল্লেখযোগ্য। শতভাগ মানুষই চরম খাদ্য সঙ্কটে ভুগছে। পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য বিবেচনায় সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান যেখানে ৬০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গত দুই দশকে কিছুটা কমিয়ে বর্তমানে ৪৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি ৭১ লক্ষ মানুষ এ সুবিধা পাচ্ছে না। ভারত রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে অর্থাৎ ৪০ শতাংশ মানুষ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার থেকে বঞ্চিত। প্রতিবেদনে প্রতীয়মান হয়েছে যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর অপুষ্টিজনিত কারণে ওজন কম হওয়ার হার বাংলাদেশে ১০ শতাংশ, ভারতে ১৮ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৭ শতাংশ। আমাদের দেশে এ বয়সী শিশু খর্বকায় কমপক্ষে ২৫ শতাংশ। যথাযথ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। অনেক সময় দেখা যায় যথেষ্ট খাদ্য থাকলেও খাদ্যের সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় ত্রæটি থাকায় খাদ্য সঙ্কট হচ্ছে। আবার নিরাপদ খাদ্য বা স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যেও অভিগম্যতার সমস্যা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশে গত কয়েক দশকে কৃষি তথা খাদ্য উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে এবং মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতদসত্তে¡ও ফসলের পর্যাপ্ত সংগ্রহোত্তর ক্ষতি ও খাদ্য অপচয়ের কারণে খাদ্য সঙ্কট বা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যা বিভিন্ন জরিপে প্রতীয়মান হচ্ছে। দেশের মানুষ ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতা অনুসারে সুষম খাদ্য পেতে জনপ্রতি ৪ দশমিক ৪৯ ডলার ব্যয় করে, যা একজন মানুষের দৈনিক ২৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তির চাহিদা পূরণ করে। সার্বিক দিক থেকে খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলায় একদিকে যেমন খাদ্য অপচয় কমানো অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষির ক্ষতি হচ্ছে। সে অনুযায়ী গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে খাপখাওয়ানোর উপযোগী ফসলের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল ফসলের সম্প্রসারণ বাড়ানো এবং ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে যে ৬টি হটস্পট রয়েছে যেমন- উপক‚লীয়, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ, কোনো জায়গাকে পতিত হিসেবে ফেলে না রেখে চাষাবাদের আওতায় নেওয়া, খামারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বিএআরআই উদ্ভাবিত ও বাস্তবায়িত বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের যে মডেল রয়েছে তা অনুসরণ করা হলে কৃষি উৎপাদন সময়ের সাথে বাড়বে এবং খাদ্য সঙ্কট ঝুঁকি মোকাবিলাতে সহায়তা করবে।
খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলা ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য অপচয়রোধের পরিকল্পনার বিকল্প নেই। ফসল উৎপাদন থেকে স্থানান্তর পর্যন্ত প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে খাদ্যের অপচয় হচ্ছে, যা আমাদের মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ এবং অর্থনৈতিক বিচারে ত্রিশ হাজার কোটি টাকার উপরে, যা খুবই উদ্বেগজনক। উৎপাদন, বাজারজাত, প্রক্রিয়াজাত, বিপণন ও খাদ্য গ্রহণ পর্যন্ত প্রতি স্তরে জনসচেতনতা সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত অঞ্চল গঠন করা হলে এ শিল্পটি ত্বরান্বিত হবে। এতে যেমন সকল শ্রেণির মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে তেমনি প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষি পণ্যের দেশে ও বিদেশে বিপণন বৃদ্ধি পাবে এবং চাহিদা তৈরি হবে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এ ছাড়াও বিশেষায়িত সংরক্ষণাগার অঞ্চলভিত্তিক তৈরি করা এবং বিদ্যুৎ-ডিজেল-সৌরচালিত মডেলের বিভিন্ন কনটেইনার ও বিশেষায়িত স্বল্প খরচের কোল্ডরুম তৈরি করাকে উৎসাহিত করা হলে কৃষি অপচয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে। এতে বিদ্যুতের খরচ সাশ্রয়ী হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়বে।
এফএও এর তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর অপচিত খাবারের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টন যার অর্থনৈতিক মূল্য ২৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রচুর পরিমাণে আমরা খাবার নষ্ট করে থাকি। এ খাবারগুলোর অধিকাংশই যায় ময়লার ঝুড়িতে। আবার খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ বা নষ্ট হওয়া খাবার জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা হলে কার্বন ফুটপ্রিন্ট যেমন কমবে তেমনি মাটির স্বাস্থ্যও কিছুটা সমৃদ্ধ হবে। ইউনেপের চলতি বছরের প্রতিবেদন বলছে আমাদের দেশে বাসাবাড়িতে একজন ব্যক্তি প্রতি বছর ৮২ কেজি পরিমাণ খাবার নষ্ট করে থাকে যা ২০২১ সালের প্রতিবেদন মোতাবেক ১৭ কেজি বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ আয়ের পরিবার মাসিক মাথাপিছু ২৬ কেজি খাবার অপচয় বা নষ্ট করে থাকে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও ভারত আমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে একটি হচ্ছে খাদ্যের অপচয় কমানো। ১২.৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে খাদ্যের অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা, উন্নত দেশের ন্যায় অধিক নষ্ট করা খাদ্যের জন্য অতিরিক্ত অর্থ জরিমানা হিসেবে প্রদানের ব্যবস্থা রাখা বা আইনের প্রণয়নের বিধান তৈরি করা, উচ্ছিষ্ট খাদ্য বা দ্রব্যকে রিসাইক্লিং করে বিভিন্ন দ্রব্য তৈরি করার মাধ্যমে অপচয়রোধ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়ক হবে। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক দূষণ কমানো এবং অধিক বর্জ্য হিসেবে জৈবসার তৈরি কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাবে এবং ফসলের জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। অনেক ক্ষেত্রে মিথেন গ্যাস হিসেবে বাসাবাড়িতে রান্নার জ¦ালানি হিসেবে বিকল্প গ্যাসের চাহিদা পূরণেও সাহায্য করবে।
এ দিকে বিশে^র জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্ষুধার্থ মানুষের সংখ্যাও। গত ২০১৪ সাল থেকে পৃথিবীতে ক্ষুধার্থ মানুষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এফএও এর তথ্য মতে পৃথিবীতে প্রায় ৭৩৫ মিলিয়ন মানুষ চরমভাবে প্রতিদিন ক্ষুধার সম্মুখীন হচ্ছে। কাজেই খাদ্যের পরিমিত ব্যবহার, যথাযথ ক্রয় পরিকল্পনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব। শুধুমাত্র এক-চতুর্থাংশ খাবার নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করার মাধ্যমে ৮৭০ মিলিয়ন মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বৃদ্ধি করা, প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনসহ জৈব প্রযুক্তি গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা, জীন ব্যাংক, তথ্য ভাÐার ইত্যাদির সম্প্রসারণ এবং নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে আধুনিক ও উন্নত কৃষিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো গেলে খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলা এবং খাদ্য অপচয়রোধে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে। এ ছাড়াও কৃষি উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত যথাযথ পরিচর্যা ও উপযুক্ত সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার সুযোগ রয়েছে। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, মোড়কজাতকরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানান্তর এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন করতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ এবং খাবার অপচয়রোধে জাতীয় পরিকল্পনা (ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি) তৈরি ও বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনসচেতনতা সৃষ্টিতে উদ্যোগ গ্রহণ ও যথাযথ পরিকল্পনা খাদ্য অপচয়রোধে তথা খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে, যা খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তায়ও অবদান রাখবে।
লেখক : খাদ্য প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, মোবাইল: ০১৭১২২৭১১৬৩, ই-মেইল:ferdous613@gmail.com,, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর-১৭০১।