কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫ এ ০৫:২৫ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: শ্রাবণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৭-২০২৫
বিভিন্ন হটস্পটে মসলা ফসলের উন্নত
জাতের চাষাবাদ কৌশল
ড. মো. আলাউদ্দিন খান
বাংলাদেশে মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ৭৭.৩৬% এবং ২.৭২% জমিতে যথাক্রমে দানাদার শস্য ও মসলা ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে (ইইঝ, ২০২৪)। এ দেশে ৪.৩৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে বছরে ৪১ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি বিভিন্ন মসলা ফসল উৎপাদন হয় (ইইঝ, ২০২৪)। মসলা ফসলের বার্ষিক চাহিদা এবং ঘাটতি যথাক্রমে প্রায় ৫৯.৩৯ ও ১৮.৩৩ লক্ষ মে.টন। উদ্বেগজনক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এদেশে প্রতি বছর প্রায় ১% হারে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে (ইঅজও, ২০১৬)। ফসল বিন্যাস মূলত ধানভিত্তিক হওয়ায় চাষযোগ্য জমি থেকে ধানের জমি হ্রাস করে মসলা ফসলের জমি বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় দেশের ৬টি অঞ্চল, যথা- ১) উপকূলীয় অঞ্চল, ২) বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, ৩) হাওর এবং আকস্মিক বন্যা অঞ্চল, ৪) পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, ৫) নদী অঞ্চল এবং মোহনা এবং ৬) নগর এলাকাসমূহকে হটস্পট হিসাবে চিহ্নিত করেছেন (এঊউ, ২০১৮)। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জযুক্ত প্রতিটি হটস্পটে অনেকগুলো জেলা অন্তর্ভুক্ত। প্রতিকূল হটস্পটের ইকোসিস্টেমে আনুভূমিক এবং উলম্ব উভয় পদ্ধতিতেই কৃষি-জলবায়ু উপযোগী বিভিন্ন মসলা ফসলের উৎপাদন ও ফলন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। নি¤েœ বিভিন্ন হটস্পটে অভিযোজনভিত্তিক মসলা ফসলের উন্নত জাতের আধুনিক চাষাবাদ কলাকৌশল বর্ণনা করা হলো।
উপকূলীয় অঞ্চল
বাংলাদেশের মোট চাষযোগ্য জমির ৩০% এর বেশি উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলের প্রায় ৫৩% জমি বিভিন্ন মাত্রার যেমন খুব সামান্য (২.০-৪.০ফঝ/স), সামান্য (৪.১-৮.০ফঝ/স), মধ্যম (৮.১-১২.০ফঝ/স), প্রবল (১২.১-১৬.০ফঝ/স) এবং খুব প্রবল (>১৬.০ ফঝ/স) লবণাক্ততা দ্বারা আক্রান্ত, জমির পরিমাণ সর্বমোট ১০,৫৬,০০০ হেক্টর (ঝজউও, ২০১০)।
মসলা চাষাবাদে সমস্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার : উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও পানির লবণাক্ততা ছাড়াও অন্যান্য প্রধান সমস্যাগুলো হলো বর্ষা মৌসুমে (জুন-অক্টোবর) লবণাক্ত পানির প্লাবন, শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর-মে) জমিতে ভূগর্ভস্থ লবণ পানির বিস্তার, জলাবদ্ধতা, অনুর্বর মাটি (জৈব পদার্থ/ঘ/চ/তহ/ঈঁ এর ঘাটতি), মাটি সিল্ট কে/ক্লে ইত্যাদি (ইধৎঁধ ধহফ জধযসধহ, ২০২০)। অতিরিক্ত লবণের (ঘধ+ ও ঈষ-) উপস্থিতিতে ফসলের বিভিন্নভাবে ক্ষতি হয় যেমন, পাতা পুড়ে যায়; গাছের উচ্চতা/পাতা/মূল ছোট হয়ে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়; মূল/পাতার সংখ্যা হ্রাস পায় এবং পরিশেষে গাছ মারা যায়। কোনো রকম টিকে থাকা লবণাক্রান্ত গাছের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। পেঁয়াজ, রসুন এবং কালিজিরার যথাক্রমে ১.৪, ১.৭ ও ২.০ লবণাক্ততার (ফঝ/স) থ্রেশহোল্ড স্তর থেকে প্রতি ইউনিট লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য যথাক্রমে ১৮.৫২, ১.৬৮ এবং ১৮.৫০% ফলন হ্রাস পায়। লবণাক্তমাত্রা ১, ৪, ৬ ও ১১ লবণাক্ততায় ঝাল মরিচের ফলন যথাক্রমে ০, ২৫, ৫০ এবং ১০০% হ্রাস পায় (গধহমধষ, ১৯৯৩)। হলুদের ক্ষেত্রে লবণাক্ততার মাত্রা ২, ৪, ৬ ও ৮ হলে ফলন যথাক্রমে ৩১, ৫৭, ৬৯ এবং ৮১% হ্রাস পায় (ঐধৎরংযধ বঃ ধষ., ২০২২)।
লবণাক্ত জমিতে পেঁয়াজের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ’ডায়াটোমাসিয়াস আর্থ’ (উরধঃড়সধপবড়ঁং বধৎঃয) নামক সার থেকে হেক্টরপ্রতি ৭৮.৫ কেজি সিলিকন ব্যবহার করা যায় (ঠবহধহপরড় বঃ ধষ., ২০২২)। মরিচের ফসলে সালফার ১০ গ্রাম/লিটার এবং ক্যালসিয়াম ৩৫ মিলি গ্রাম/লিটার দ্রবণ স্প্রে করে মরিচ গাছের লবণাক্ততার সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। মাটি ও পানির উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং লবণ সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে খুব সামান্য এবং সামান্য লবণাক্তার জমিতে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। এ সব অঞ্চলে খড়কুটা, কচুরিপানা ইত্যাদি দিয়ে জাবড়া প্রয়োগের মাধ্যমে ফসলের মাটির রস ধরে রাখে। জৈব পদার্থ প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন মত পটাশ সার প্রয়োগ করে ফসলকে সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে (ঐধয়ঁব, ২০০৬)। এসব এলাকায় পোল্ডার যেমন- পরিখা, পুকুর ইত্যাদিতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বীজ প্রাইমিং, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, মাইক্রোবিয়াল ইনোকুল্যান্টের ব্যবহার এবং উদ্ভিদ হরমোন ও বায়োস্টিমুল্যান্ট প্রয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে লবণের প্রভাবকে হ্রাস করে মসলা ফসলের লবণ সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। খুব সামান্য মাত্রার লবণাক্ত জমিতে রবি মৌসুমে স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট বিভিন্ন মসলা ফসল যেমন, বারি রসুন-৫, বারি রসুন-৪, বারি পেঁয়াজ-৪, বারি মরিচ-২, বারি কালিজিরা-১, বারি চুইঝাল-১, বারি মেথি-৩, বারি ধনিয়া-২ ইত্যাদি সহজেই চাষ করা যায়। হালকা ছায়াযুক্ত বারির আঙ্গিনা, রাস্তার ধারসহ বিভিন্ন জমিতে বস্তায় বারি আদা-২ চাষ করা এ অঞ্চলের জন্য একটি নতুন উন্নত প্রযুক্তি। উপকূলীয় অঞ্চলে সরজান পদ্ধতি, চিংড়ি ঘেরের বাঁধ, ভাসমান কৃষি, বসতবাড়ির বাগান ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে লবণ সহিষ্ণু মসলাজাতীয় ফসল চাষাবাদের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে (ইধৎঁধ ধহফ জধযসধহ, ২০২০)।
বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল
রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগের বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট এবং নওগাঁ জেলাসমূহের অধিকাংশ এলাকা নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল বিস্তৃত। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাসমূহ উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, যা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ২১% (গঁংধ বঃ ধষ., ২০০১)। উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূসংস্থান উঁচুনিচু। মাটির বৈশিষ্ট্য ধুসর সোপান মাটি, বুনট পলি-দো-আঁশ /পলি-কর্দম যুক্ত, জৈব পদার্থের পরিমাণ ০.৮-১.২%, ঢ়ঐ মান ৪.৫-৫.৫।
মসলা ফসল চাষাবাদে সমস্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার : এ অঞ্চল বর্তমানে খরা প্রবণ হওয়ায় এবং পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অতিরিক্ত পানিনির্ভর ফসল চাষ করা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অসম ধারা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই বিভিন্ন মাত্রার খরার সৃষ্টি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের দৈনিক গড় তাপমাত্রা আগামী ২০৩০, ২০৫০ এবং ২১০০ সালের মধ্যে যথাক্রমে প্রায় ১.০, ১.৪ এবং ২.৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পাবে । উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪৫ লক্ষ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার খরা দ্বারা আক্রান্ত হয়। চরম তাপমাত্রায় মসলা ফসলের বীজের অংকুরোদগম বাধাগ্রস্ত হয়, গাছের কোষের ক্ষতি হয় কিংবা কোষ মারা যায়, মূল/চারা/গাছের বৃদ্ধি হ্রাস পায়, ফুল ঝরে যায় এবং পরাগরেণুর সজীবতা/পরাগায়ন/ফল ধারণ/ফলন হ্রাস পায়। তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেলে গাছের ফলন হ্রাস পায়। মরিচে দৈনিক ৩১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় প্রতি গাছে গড়ে ১২০টি ফুল উৎপাদন হয়, অথচ ৩৩ ও ৩৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় প্রতি গাছে গড়ে যথাক্রমে ৫৮ (৫১.৬৭% কম) এবং ৩৩ (৭২.৫০% কম)টি ফুল উৎপাদন হয়)।
ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃচ্ছতা সাধনপূর্বক ভূগর্ভস্থ পানি সর্বনিম্ন উত্তোলন করে এবং পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন ভূউপরিস্থ উৎস (নদী, খাল, পুকুর) থেকে পানি ব্যবহারের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম পানি চাহিদাযুক্ত উচ্চমূল্যের ফসল চাষ এ অঞ্চলের অন্যতম প্রযুক্তি হওয়া উচিত। পানি সেচের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ অঞ্চলে ড্রিপ সেচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ সব অঞ্চলে খড়কুটা, কচুরিপানা ইত্যাদি দিয়ে জাবড়া প্রয়োগের মাধ্যমে ফসলের মাটির রস ধরে রাখতে হবে। সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগের পাশাপাশি সাধ্যমত জৈবসার প্রয়োগ করা জরুরি। বরেন্দ্র অঞ্চলের অম্লীয় মৃত্তিকার ভৌত, রাষায়নিক ও জৈব গুণাগুণ উন্নয়ন এবং সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি ৩ বছর পর পর ৪ কেজি/শতাংশ মাত্রায় চুন প্রয়োগ করা আবশ্যক (ঝজউও, ২০২৩)। খরা/তাপ সহনশীল মসলা ফসলের জাতের উদ্ভাবন এবং এর চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। এ অঞ্চলে মসলা ফসল (পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া) ভিত্তিক স্থায়ী/অস্থায়ী ৩৭ টিরও অধিক ফসল বিন্যাস রয়েছে (জধংযরফ বঃ ধষ., ২০১৭)। তুলনামূলকভাবে কম পানি চাহিদাযুক্ত মসলা ফসলের জাত বারি মরিচ-২, বারি আদা-২, বারি ধনিয়া-২, বারি কালিজিরা-১, বারি জিরা-১, বারি মেথি-৩, বারি মৌরি-২, বারি পুদিনা-১, বারি পুদিনা-২, বারি জাওন-১, বারি চিভস-১, বারি পাতা পেঁয়াজ-১, বারি নেগি অনিয়ন-১ ইত্যাদি চাষ করা লাভজনক। তা ছাড়া বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪, বারি পেঁয়াজ-৬ ও বারি রসুন-১, বারি রসুন-২, বারি রসুন-৪, বারি রসুন-৫ ভালভাবেই চাষ করা যায়। তাপসহনশীল মসলা ফসলগুলো হলো আদা, খরিপ পেঁয়াজ (বারি পেঁয়াজ-৫), পুদিনা (বারি পুদিনা-১, বারি পুদিনা-২), দারুচিনি (বারি দারুচিনি-১) ইত্যাদি। নতুন ফল বাগানসমূহে পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, আদা, মরিচ ইত্যাদি মসলা ফসল চাষোপযোগী। তাছাড়া বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪, বারি পেঁয়াজ-৫ এর বীজ উৎপাদন লাভজনক। পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪ এর মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং এর কালি (ফুলদ-) উৎপাদন খুবই জনপ্রিয়। হালকা ছায়াযুক্ত বারির আঙ্গিনা, রাস্তার ধারসহ বিভিন্ন পতিত জমিতে বস্তায় আদা চাষ করা এ অঞ্চলের জন্য একটি নতুন উন্নত প্রযুক্তি। বরেন্দ্র এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এলাকার আখ চাষের ভেতর বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪, বারি পেঁয়াজ-৫, বারি পেঁয়াজ-৬, বারি রসুন-১, বারি রসুন-২, বারি রসুন-৩, বারি রসুন-৪, বারি রসুন-৫ আন্তঃফসল চাষ খুবই উপযোগী।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল
বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১০% জমি নিয়ে গঠিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সম্পদের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং এর ৯০% জমিই ঢালু এ অঞ্চলে মূলত ২টি পদ্ধতি যথা, পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমি/উপত্যকায় চাষের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন এবং পাহাড়ের ঢালে বিনাচাষে ফসল উৎপাদন। এ অঞ্চলের অন্যতম চিরাচরিত প্রথা হলো ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সম্প্রদায় কর্তৃক বন-জঙ্গল কেটে ও পুড়িয়ে বৃষ্টির পানির সাহায্যে ফসল উৎপাদন করা হয়, যাকে জুম/স্থানান্তর চাষ বলা হয়। এক স্থানে ২-৩ বছর চাষ করার পর অন্য স্থানে একইভাবে জমি তৈরি করে জুম চাষ করা হয়ে থাকে।
ফসল চাষাবাদে সমস্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার : দীর্ঘ দিন থেকে জুম চাষের পরিণতিতে ক্রমহ্রাসমান জীববৈচিত্র্য, মাটির ক্ষয় এবং উর্বরতা এ অঞ্চলের অন্যতম মারাত্মক সমস্যার রূপ নিয়েছে। এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে মৃত্তিকার ক্ষয়রোধে সম্ভাব্য স্থানে পাহাড়ের গায়ে সমান ঢালের জায়গা বরাবর কন্টুর এবং ধাপ/সোপান প্রযুক্তির মাধ্যমে মসলা ফসল চাষ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে ঢালের আড়াঅড়ি ধাপ তৈরি মসলা ফসলসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা হয়। তাছাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে মৃত্তিকা ক্ষয়রোধে হেজ-রো বা ঝাড়ের বেড়া পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে ঢালের আড়াআড়ি উপর থেকে নিচে ৪-৫ মিটার পরপর ভ্যাটিভার (বিন্না ঘাস), ন্যাপিয়ার, আনারস, বগা মেডুলা, খাগড়া, লেমন ঘাস ইত্যাদি গাছকে কৃষকের চাহিদা অনুসারে ঘনভাবে লাগিয়ে হেজ-রো তৈরি করতে হবে (গরংঃৎু, ২০২৩)। ঢালে দুটি হেজ-রো এর মাঝে মসলা ফসল চাষ করতে হবে। এ অঞ্চলের মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণের জন্য জাবড়া প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে আদিবাসী কৃষি ব্যবস্থা যেমন- জুম চাষ পদ্ধতির টেকসই উন্নয়ন করে মসলার জাত বারি আদা-২, বারি হলুদ-৪, বারি হলুদ-৫, মরিচ, স্থায়ী মসলা ফসল যেমন-কাজুবাদাম, বারি তেজপাতা-১, বারি দারুচিনি-১, বারি আলুবোখারা-১, বারি গোলমরিচ-১ চাষ করতে হবে। পাহাড়ের উত্যকায় এবং বসতবাড়ির আঙ্গিনায় বারি আদা-২, বারি হলুদ-৪, বারি হলুদ-৫, মরিচ, বারি পেঁয়াজ-৫, বারি বিলাতি ধনিয়া-১ ইত্যাদি মসলা জাতীয় ফসল চাষ করা যায়। এ অঞ্চলে বস্তায় বারি আদা-২ চাষ খুবই উপযোগী।
নদী অঞ্চল এবং মোহনা
বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র, তিস্তা, ধলেশ^রী ইত্যাদি নদীর তীরে প্রায় ৮.৩ লক্ষ হেক্টর চর আছে, যার প্রায় ৫.২-৭.৯ লক্ষ হেক্টর চাষযোগ্য (ইঅজও, ২০১৬)।
মসলা ফসল চাষাবাদে সমস্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার : চরাঞ্চলের সমস্যাগুলো হলো খরা, অনুর্বর জমি (পুষ্টি উপাদান এবং জৈব পদার্থের ঘাটতি), জমির পানি ধারণক্ষমতা কম, স্থানীয় জাতের ফসলের চাষাবাদ ও অনুন্নত ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা। সাধারণত বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্যাংশের চরগুলোতে বালু এবং পলি বেশি থাকে কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলের চরগুলোতে কাদামাটি ও লবণ বেশি থাকে।
উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন চরে মসলা ফসল (মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া ও কালিজিরা) ভিত্তিক অনেকগুলো ফসল বিন্যাস রয়েছে (কধৎরস বঃ ধষ., ২০১৭)। সংযুক্ত চরাঞ্চলে বারি রসুন-১, বারি রসুন-২, বারি রসুন-৪, বারি রসুন-৫, বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪, বারি পেঁয়াজ-৬, মুড়িকাটা পেঁয়াজ, বারি মরিচ-৩, বারি হলুদ-৪, বারি হলুদ-৫, বারি ধনিয়া-২, বারি মৌরি-১ সাধারণত একক, বা আন্তঃ/মিশ্র ফসল হিসাবে চাষ করা যায়। অন্যদিকে দ্বীপ চরাঞ্চলে সাধারণত পেঁয়াজ একক ফসল কিংবা পেঁয়াজের ভিতর বারি কালিজিরা-১, বারি ধনিয়া-২ মিশ্র ফসল হিসাবে চাষ করা যায়।
নগর এলাকাগুলো
বাংলাদেশে ২০৪৫ সালের মধ্যে জনসংখ্যার অধিকাংশ লোকই বসবাস করবে শহরে (এঊউ, ২০১৮)। জাতিসংঘের এসডিজি ১১-এর লক্ষ্যমাত্রা হলো “টেকসই শহর এবং সমাজ”। টেকসই শহর এবং সমাজ গঠনে নগর কৃষির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। শহর এবং এর আশেপাশে যে কোনো কৃষি (উদ্যানতাত্ত্বিক কৃষি, মাছ চাষ, পশু পালন ইত্যাদি) কার্যক্রমকে নগর কৃষি বলে।
মসলা ফসল চাষাবাদে সমস্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার : শহরের যে কোনো উপযুক্ত জমি, পাত্র, শহুরে বাগান, ব্যালকনি, ছাদ, হাইড্রোপনিক্স, গ্রীনহাউজ, ঊর্ধ্বমুখী কাঠামো ইত্যাদি জায়গায় নগর কৃষি বাস্তবায়ন করা হয়। ঊর্ধ্বমুখী কৃষি পদ্ধতিতে অনুভূমিক এর পরিবর্তে উল্লম্বভাবে তৈরিকৃত কাঠামোতে স্তূপীকৃত স্তরে ফসলের চাষ। উল্লম্ব চাষ একটি বিশ^-পরিবর্তনকারী উদ্ভাবন, যার সময় বর্তমান জনবহুল যুগে এসে গিয়েছে। শহরের জনগোষ্ঠীর খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে নগর কৃষি অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
শহরের অধিবাসীর চাহিদা মেটানোর জন্য উচ্চমূল্যের মসলা ফসল বর্ণিত যে কোনো স্থানে চাষ করা সম্ভব। এ অঞ্চলে বারি আদা-১, বারি আদা-২, বারি রসুন-৫, বারি মরিচ-২, বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪, বারি ধনিয়া-২, বারি নেগি অনিয়ন-১, বারি পাতা পেঁয়াজ-১, বারি পুদিনা-২, বারি হলুদ-৪, বারি হলুদ-৫, বারি চিভস-১, ক্যাপসিকাম, লেমন গ্রাস, রাধুনি পাতা ইত্যাদি মসলা ফসল চাষের উপযোগী। হালকা ছায়াযুক্ত বারির আঙ্গিনা, রাস্তার ধারসহ বিভিন্ন পতিত জমিতে বস্তায় বারি আদা-১, বারি আদা-২ চাষ করা এ অঞ্চলের জন্য একটি নতুন উন্নত প্রযুক্তি।
লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ফরিদপুর। মোবাইল : ০১৭১১-৫৭৩৩৬১, ই-মেইল :khanalauddinsrsc@gmail.com