কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৪ এ ০৫:০৬ PM

বিপন্ন প্রজাতির মাছ রক্ষার্থে কৃত্রিম প্রজননের গুরুত্ব

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ৩১-০১-২০২৪

বিপন্ন প্রজাতির মাছ রক্ষার্থে কৃত্রিম
প্রজননের গুরুত্ব  
ড. ডেভিড রিন্টু দাস১ শাহনাজ পারভিন২
কৃত্রিম প্রজনন কৌশলের মাধ্যমে পরিপক্ক মাছে একটি নিদ্দিষ্ট মাত্রায় হরমোন প্রয়োগ করে মাছকে প্রজননের জন্য প্ররোচিত করা হয়। এর ফলে একটি নিদ্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে মাছের ডিম্বানু (বমম) ও শুক্রানু (ঝঢ়বৎস) বের হয়। এই কৌশলে পিটুইটারি হরমোন বা অন্য কোন কৃত্রিম হরমোন প্রয়োগ করে মাছকে প্রজননের জন্য উদ্দীপিত করা হয়। কৃত্রিম প্রজনন হ্যান্ড-স্ট্রিপিং (ঐধহফ ংঃৎরঢ়ঢ়রহম) অথবা আধাপ্রাকৃতিক প্রজননের (ঝবসর-হধঃঁৎধষ নৎববফরহম) মাধ্যমে করা যায়। হ্যান্ড-স্ট্রিপিং পদ্ধতিতে মাছের পেট চেপে ডিম্বানু ও শুক্রাণু বের করে একটি ট্রেতে নিয়ে পালকের সাহায্যে মেশানো হয় যা কষ্টসাধ্য। অপরদিকে আধাপ্রাকৃতিক পদ্ধতিতে প্রজনন ট্যাংকে হরমোন প্ররোচিত মাছকে ছেড়ে দিলে তারা নিজেরাই ডিম্বানু ও শুক্রাণু ছেড়ে দেয়। এই পদ্ধতি বেশি সুবিধাজনক। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ভালো মানের পোনা পাওয়া যায়। যদি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ ডিমেরও রেণু পোনা পাওয়া যায় তাও  কৃত্রিম প্রজনন অনেক লাভজনক। কারণ আমরা জানি প্রাকৃতিক প্রজনের মাধ্যমে যে ১-২ শতাংশ রেণু বা পোনা পাওয়া যায় তাও এখন অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। এর বিভিন্ন কারণও রয়েছে। অন্যতম কারণ  প্রাকৃতিক প্রজনন স্থল (ঘধঃঁৎধষ নৎববফরহম মৎড়ঁহফ) নষ্ট হয়ে যাওয়া। আরও অনেক কারণের মধ্যে রয়েছে-
প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো থেকে নির্বিচারে মাছ আহরণ ফলে প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য মাছ না থাকা; জলাশয় গুলো একেবারে শুকিয়ে ফেলে মাছ ধরা; জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতি ও আবহাওয়ার দীর্ঘ মেয়াদী পরিবর্তন। যার ফলে কোনো না কোনো প্রজাতি বিলুপ্তের পথে চলে যাচ্ছে; প্রাকৃতিক জলাশয়ের পরিমাণ কমে যাওয়া। জলাশয় গুলো ভরাট করে চাষের জমি ও আবাসস্থলে পরিণত করা; অবৈধ্য জালের যথেচ্ছা ব্যবহার; চাষের জমিতে নিয়ম না মেনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার; অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট নির্মাণ ; নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ ; নদীতে কারখানার বজ্র নিষ্কাশন; মৎস্য সংরক্ষণ আইন অমান্য করে মাছ ধরা; নদীর নাব্যতা হ্রাস ও গতিপথ পরিবর্তন; জনসচেতনতার অভাব।
মাছের কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি
সাধারণত কৃত্রিম প্রজনন এর জন্য পুকুরে লালন-পালনকৃত মাছ হতে পরিপক্ব স্ত্রী ও পুরুষ মাছ বাছাই করতে হবে; এরপর পরিপক্ব স্ত্রী ও পুরুষ মাছ ১:২ অনুপাতে আলাদা আলাদা ট্যাংকে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃত্রিম ঝর্ণা ব্যবহার করতে হবে; পুরুষ ও স্ত্রী মাছের বক্ষ পাখনার (চবপঃড়ৎধষ ভরহ) নিচে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়। হরমোন হিসেবে পিজি (চএ-চরঃঁরঃধৎু এষধহফ), ওভাপ্রিম (ঝ-এহজঐধ), ওভাটাইড (এহজঐ), এইচ সিজি (ঐঈএ-ঐঁসধহ পযড়ৎরড়হরপ মড়হধফড়ঃৎড়ঢ়রহ) প্রয়োগ করা হয়। শুরুর দিকে কৃত্রিম প্রজননের জন্য পিজি ব্যবহার করা হত কিন্তু পিজি সংগ্রহ করার জন্য মাছকে আত্নত্যাগ করতে হয়। কারণ মাছ ধরার পর মাছের মাথার অংশ হতে পিজি সংগ্রহ করতে হয় যা অনেকটা ব্যয় সাপেক্ষ। এর জন্যই সিনথ্যাটিক হরমোনের আর্বিভাব যার কার্যকারিতাও বেশি এবং সহজলভ্য। ফলে কৃত্রিম প্রজননে জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে অতি দ্রুত; পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে একটি নির্দ্দিষ্ট মাত্রায় হরমোন প্রয়োগ করে ট্যাংকে নেট হাপা (ঐধঢ়ধ) স্থাপন করে উভয় মাছকে ছেড়ে দিতে হবে। হাপায় কৃত্রিম ঝর্ণার মাধ্যমে পানি সরবরাহ করতে হবে; ইনজেকশন প্রয়োগের পর মাছ ভেদে ডিম ছাড়ার (ঙাঁষধঃরড়হ) নির্দ্দিষ্ট সময় থাকে। মূলত ওভারি থেকে ডিম ছাড়ার প্রক্রিয়াকে ওভুলেশন বলে। ডিম ছাড়া শেষ হলে ব্রুড মাছ গুলোকে সরিয়ে ফেলতে হবে। ডিমগুলো হাপার দেয়ালে লেগে থাকে; বিভিন্ন মাছের রেণু প্রষ্ফুটনের বিভিন্ন সময় থাকে। ডিম নিষিক্ত হওয়ার পর রেণু হওয়ার মধ্যবর্তী এই সময়কে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলে। রেণু প্রস্ফুটনের পর রেণু/পোনা এক সপ্তাহ পরিচর্যা শেষে নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করতে হবে।
মাছের কৃত্রিম প্রজননের জন্য ব্যবহৃত কিছু হরমোন
বিপন্ন প্রজাতির মাছ রক্ষায় কৃত্রিম প্রজননের গুরুত্ব
অতীতে দেশের নদ-নদী, খাল-বিল ও প্লাবনভূমিতে প্রচুর পরিমাণ দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত; পরবর্তী সময়ে কিছু প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কারণে মাছের উৎপাদন, জীববৈচিত্র হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে; আমাদের ২৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে মিঠাপানিতে। এরমধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। আইইউসিএন (২০১৫) এর তথ্য অনুযায়ী দেশে মিঠাপানির ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়; এসব বিপন্ন প্রজাতির মাছ পুনরুদ্ধার, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কৃত্রিম প্রজনন এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করছে; কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিপন্ন প্রজাতির অনেক ছোট মাছ আবার বাঙ্গালীর খাবার টেবিলে ফেরত এসেছে; বিপন্ন প্রজাতির এসকল মাছ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনলে মানব দেহের পুষ্টি চাহিদা অনেকাংশে পুরণ করা সম্ভব। এসকল মাছে প্রচুর পরিমাণ আমিষ, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ যেমনঃ আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি থাকে যা দিয়ে মানব দেহ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়; বিপন্ন প্রজাতির মাছ পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ ছাড়াও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পোনার চাষ সম্ভব। প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করলে মিশ্রিত পোনা হতে একক পোনা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার পর্যাপ্ত পোনাও পাওয়া যায় না। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমেই এই চাহিদা মেটানো সম্ভব; কয়েক দশক আগেও যেখানে মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণ হত এখন সেখানে বদ্ধ জলাশয় হতে দেশের মোট উৎপাদনের বেশির ভাগ মাছ আসে। নিচের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এটি সহজেই অনুধাবন করা যায়।
২০২১-২০২২ অর্থবছরে মোট উৎপাদনের শতকরা হার : বদ্ধ জলাশয় (চাষ) ৫৭.৩৯; মুক্ত জলাশয় (স্বাদু) ২৭.৭৮, সামুদ্রিক জলাশয় ১৪.৮৩; কিন্তু ১৯৮৩-১৯৮৪ এর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখি মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আসত ৬২.৫৯ শতাংশ। এখন এত সংখ্যক চাষের মাছের পোনা তো আর প্রকৃতি থেকে আসে না। কৃত্রিম প্রজনন এর মাধ্যমেই এই পোনার সরবরাহ হয়; কৃত্রিম প্রজননের গুরত্ব আরো ভালোভাবে বুঝতে আমরা প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে কার্প জাতীয় মাছের রেণু/পোনার উৎপাদন পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে পারি। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রকৃতি থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মাত্র ১৮৫৫ (০.২৯%) কেজি রেণু/পোনা পাওয়া গেছে। অপরদিকে কৃত্রিম প্রজনন করে পাওয়া গেছে ৬২৯৪৪১ (৯৯.৭১%) কেজি রেণু/পোনা। পরিসংখ্যান অনুসারে বিগত পাঁচ বছরের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে কার্প জাতীয় মাছের রেণু/পোনার উৎপাদন গ্রাফ চিত্রে দ্রষ্টব্য।
বিএফআরআই (ইঋজও), বিলুপ্তপ্রায় মাছ ও কৃত্রিম প্রজনন  
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে জোরদার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে; এরই ধারাবাহিকতায় বিপন্ন ও দেশী প্রজাতির মাছের উপর গবেষণা করে ৩৯টি মাছের কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি ও উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বিএফআরআই; যার ফলে সাম্প্রতিক কালে মাছের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেযেছে এবং মাছের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে; বিএফআরআই এর স্বাদুপানি কেন্দ্র, ময়মনসিংহ, সান্তাহার, সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিপন্ন প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে গবেষণা করে যাচ্ছে; বিএফআরআই কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিভিন্ন মাছের পোনা (মেজর কার্প, এক্সোটিক কার্প, পাঙ্গাশ, থাই পাঙ্গাশ, বাটা, কই, শিং/মাগুর, গনিয়া, চিতল, গুলশা, পাবদা ইত্যাদি) উৎপাদন করে চাষীদের  মধ্যে বিনা মূল্যে সরবরাহ করে থাকে; বাংলাদেশে বিএফআরআই প্রথমবারের মতো দেশী ও বিপন্ন প্রজাতির মাছের লাইভ জিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছসংগ্রহ করে সংরক্ষণ করাই হচ্ছে লাইভ জিন ব্যাংক; দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে লাইভ জিন ব্যাংক এর গুরুত্ব অনেক। ভবিষ্যতে কোনো মাছের প্রকৃতিতে সংকট দেখা দিলে লাইভ জিন ব্যাংক থেকে মাছসংগ্রহ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মাছকে পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণ করা।  
দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ বাঙালির খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব মাছ ভিটামিন ও খনিজ পদার্থে ভরপুর। মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এই পুষ্টিগুণে ভরপুর এ খাদ্যটি থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসকল দেশীয় মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। বিপন্ন প্রজাতির এসকল মাছের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম প্রজনন কৌশল এক পরম আর্শীবাদ। কৃত্রিম প্রজনন এর মাধ্যমেই বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতির মাছ আবার বাঙালীর পাতে ফেরত এসেছে। বাজারে প্রাচুর্যতাও বেড়েছে যা অবদান রাখছে সামগ্রিক মৎস্য উৎপাদনেও। সুতরাং কৃত্রিম প্রজননকে গবেষণার মাধ্যমে আরও উন্নত প্রযুক্তিময় করে তুলতে হবে। সেই সাথে কৃত্রিম প্রজনন কৌশলের যে সকল সীমাবদ্ধতা আছে তা নিরুপন করার চেষ্টা করতে হবে।

লেখক : ১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র, সান্তাহার,বগুড়া। মোবাইল : ০১৭১১৪২২১১৭,  ২বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র, সান্তাহার,বগুড়া। মোবাইল : ০১৭১৮৫৪৩৩৮৭, ই-মেইল :etee2407@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন