বিডাব্লিউএমআরআই উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব উপায়ে ইঁদুর দমন প্রযুক্তি
ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহ১ মোছা. সিরাজুম মুনিরা২ মো. ফরহাদ হোসেন৩
ইঁদুর একটি ছোট আকৃতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে ভয়াবহ শত্রু হিসেবে বিবেচিত। কারণ এই প্রাণীটি কৃষিজ ফসল, গুদামজাত খাদ্য এবং মানুষের সম্পদে নিয়মিত ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে। ধান, গম, ভুট্টা ও বার্লির মতো দানাদার শস্য ছাড়াও ফলমূল, বাদাম, শাকসবজি, ডাল ও কন্দাল ফসলসহ প্রায় ৮০টি ফসল ইঁদুরের আক্রমণের শিকার হয়। এর ফলে কৃষি খাতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে। বাংলাদেশে ইঁদুর শুধু মাঠপর্যায়ে ফসল ধ্বংস করে না, বরং ফসল সংগ্রহের পর গুদামজাত অবস্থাতেও ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। গম ও ভুট্টা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দানাদার খাদ্যশস্য। এই ফসলগুলোতে ইঁদুরের আক্রমণ এখন একটি বড় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গমের ক্ষেতে ইঁদুরের ক্ষতির মাত্রা এতটাই বেশি যে এটি কৃষকদের জন্য দুর্বিষহ বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংরক্ষিত খাদ্যের মধ্যেও ইঁদুর খাবার খেয়ে, চিবিয়ে, মলত্যাগ করে ও পশম ছড়ানোর মাধ্যমে ফসল ও খাদ্যের গুণগত মান মারাত্মকভাবে হ্রাস করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি করছে এবং পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুর ক্ষেত্রবিশেষে গম ফসলের শতভাগ পর্যন্ত ক্ষতি করতে পারে। গবেষণা মতে, শুধুমাত্র দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় গমের ক্ষেতে ইঁদুর এক বছরে মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি সাধন করতে পারে (চরসবহঃবষ বঃ ধষ., ২০০৫)। ১৯৯৯ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় ভারতে গম ফসলে শুধুমাত্র ইঁদুরের আক্রমণেই বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয় (চধৎংযধফ, ১৯৯৯)।
বিডাব্লিউএমআরআই উদ্ভাবিত ইঁদুর দমনে বিশেষ প্রযুক্তি
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডাব্লিউএমআরআই) সহজ ও পরিবেশবান্ধব একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যা রঙের পুরনো বালতি ব্যবহার করে তৈরি করা যায়। এতে রাসায়নিক বা বিষ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না, ফলে এটি নিরাপদ ও টেকসই।
ফাঁদ তৈরির পদ্ধতি
আমরা নতুন বা পুরাতন বাসাবাড়ি কিংবা অফিস ভবনে রং করে থাকি। রঙের যে বালতিগুলো থাকে সেগুলো ব্যবহার করে খুব সহজেই ইঁদুর ধরার ফাঁদ তৈরি করা যায়। প্রথমে একটি রঙের বালতি নেবো, বালতির মুখের মাপমতো একটি হার্ডবোর্ড গোল করে কেটে নিয়ে মাঝ বরাবর ছিদ্র করে সেটাতে এসএস বা জিআই ২-৪ মিমি ব্যসের তার প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে। বালতির মুখের ২-৪ মিমি নিচে সর্বোচ্চ ব্যাস বরাবর দুই দিকে ছিদ্র করে সেখানে হার্ডবোর্ডটি এসএস বা জিআই তারের মাধ্যমে আটকাতে হবে। তার পূর্বে হার্ডবোর্ডের একপাশে এক টুকরা কাঠ নিচের দিকে আটকাতে হবে যাতে একদিকে আটকে থাকে তা না হলে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকলে ইঁদুর সেখানে উঠতে ভয় পাবে। যেদিকে হার্ডবোর্ডের কাঠের টুকরাটি থাকবে সেদিকে বালতির গায়ে ছোট্ট একটি স্ক্রু লাগাতে হবে যাতে হার্ডবোর্ডের ঢাকনাটি ভেতরে ঢুকে যেতে না পারে (চিত্র ১)।
ব্যবহার পদ্ধতি
ফাঁদটি প্রস্তুত হয়ে গেলে ফসলের জমিতে কিংবা গুদাম ঘরের ভেতরেও ইঁদুর ধরার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফসলের জমিতে ব্যবহার করার সময় মাটিতে গর্তখুঁড়ে বালতিটি মাটির উপরিভাগের সমান লেভেলে বসাতে হবে এবং হার্ডবোর্ডের ঢাকনার উপর কিছু গম বা ভুট্টার দানা দিয়ে রাখতে হবে। গম বা ভুট্টার দানা খেতে গেলে ইঁদুর ঢাকনাটি উল্টে বালতির ভেতর পরে যাবে এবং ঢাকনাটি পুনরায় সোজা হয়ে যাবে ফলে ইঁদুর বের হয়ে আসতে পারবে না। অপরদিকে গুদাম ঘরের ভেতরের ইঁদুর ধরতে হলে বালতিটি মেঝের উপর বসিয়ে সেটির একদিকে বা দু’দিকে কাঠ বা বাঁশের ফালি মেঝে থেকে বালতির ওপর পর্যন্ত হেলান দিয়ে রাখতে হবে, যাতে ইঁদুর সহজে ওপরে উঠতে পারে। তারপর ঢাকনার ওপর গম/ভুট্টা/শুঁটকি ইত্যাদি দিয়ে রাখলে ইঁদুর কাঠের তক্তা অথবা বাঁশের ফালি দিয়ে ওপরে উঠে খাওয়ার চেষ্টা করার সময় ঢাকনা উল্টিয়ে নিচে পরে যাবে এবং ঢাকনা আপনা-আপনি লেগে গেলে আর বের হতে পারবে না।
এই পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে সহজেই ইঁদুর দমন করা সম্ভব, যেখানে কোন প্রকারের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
সুবিধা
া কোন প্রকারের রাসায়নিক উপাদানের প্রয়োজন হয় না বিধায় পরিবেশ দূষণ বা মানুষের দেহে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
া প্রথমবার তৈরির সময় সামান্য খরচ হয়, পরবর্তীতে তেমন কোন ব্যয় নেই শুধু পরিষ্কার করলেই যথেষ্ট।
া বিষটোপ ব্যবহারে ইঁদুরের নাজুকতা সৃষ্টি হয়, এক্ষেত্রে যার কোন সম্ভাবনা নেই।
া এটি টেকসই এবং ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফসলের মাঠে ও গুদামে ব্যবহার উপযোগী।
া যারা ইঁদুর ভক্ষণ করেন তারা সহজে জীবিত ইঁদুর সংগ্রহ করতে পারেন।
সীমাবদ্ধতা
া ফসলের জমিতে অনেকেই মাটি খুঁড়ে বসাতে আগ্রহী হন না।
া অনেক সময় চিকাসহ অন্যান্য অবাঞ্ছিত প্রাণিও বালতির মধ্যে পড়ে যায় ফলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে যারা ইঁদুর ভক্ষণ করেন তারা ঐ ইঁদুর খেতে পারেন না, বিধায় এই ফাঁদ ব্যবহারে অনীহা দেখা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, এটি যেহেতু একটি পরিবেশবান্ধব এবং অব্যবহৃত ও সহজপ্রাপ্য উপাদান দিয়ে সহজেই তৈরি করা সম্ভব এবং অত্যন্ত কার্যকরী বিধায় এই ফাঁদ ব্যবহারে কৃষক উৎসাহিত হবেন।
লেখক : ১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান, ২বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর-৫২০০, মোবাইল : ০১৭১২৫৬১৫৯২,