কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬ এ ১২:২৫ PM

বালাইনাশক লেবেল : নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ কৃষক ও টেকসই কৃষির নীরব নির্দেশিকা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৩-২০২৬

বালাইনাশক লেবেল : নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ কৃষক ও টেকসই কৃষির নীরব নির্দেশিকা
শামীম হোসেন
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে- একদিকে খাদ্য উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য, অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ; স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে আজ বাংলাদেশ প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নীরব কিছু ঝুঁকি, যার অন্যতম হলো বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ও অজ্ঞতাপূর্ণ ব্যবহার, কারণ আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় বালাইনাশক এখন প্রায় অবিচ্ছেদ্য উপাদান হয়ে উঠেছে- পোকা-মাকড়, রোগ ও আগাছার আক্রমণ মোকাবিলা না করলে কাক্সিক্ষত ফলন নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব, বিশেষ করে ধান, সবজি ও ফল চাষে কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বালাইনাশক কি আমরা নিরাপদ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করছি এর ব্যবহারবিধি কি আমরা যথাযথভাবে জানি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বালাইনাশকের বোতল বা প্যাকেটে সংযুক্ত যে লেবেলটি রয়েছে, সেটিকে কি আমরা পড়ি বা তার নির্দেশনা অনুসরণ করি; বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের কাছেই বালাইনাশক লেবেল একটি উপেক্ষিত বিষয়- কারও চোখে এটি অপ্রয়োজনীয় লেখা, কারও কাছে দুর্বোধ্য ছোট অক্ষরের তথ্য, আবার অনেকেই মনে করেন দোকানির মুখের কথাই যথেষ্ঠ, কারণ দীর্ঘদিন ধরে কৃষি উপকরণ কেনাবেচা অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অভ্যাসের ওপর, অথচ এই লেবেলই কৃষকের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা, যা না মানলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয় এবং যার খেসারত দিতে হয় কৃষক, ভোক্তা ও পরিবেশ- তিন পক্ষকেই; সবুজ বিপ্লবের পর থেকে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, উচ্চফলনশীল জাতের ফসলের সঙ্গে সঙ্গে রোগ ও পোকার প্রকোপও বেড়েছে, উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদে আমরা অনেক সময় ঝুঁকির বিষয়টি উপেক্ষা করেছি, ফলে আজ গ্রাম পর্যায়ে প্রায়ই দেখা যায় অনুমোদন ছাড়া বা নিবন্ধনবিহীন বালাইনাশক ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ, একই বালাইনাশক বারবার ব্যবহার করে পোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা, এমনকি ফসল তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে স্প্রে করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা, যার ফলে বাজারে যাওয়া সবজি বা ফল সরাসরি মানুষের শরীরে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ বহন করে নিয়ে যায়, আর এই সব অনিয়মের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে একটি বিষয়ই বারবার সামনে আসে- লেবেল না পড়া ও না মানা; সহজ ভাষায় বলতে গেলে বালাইনাশক লেবেল হলো বালাইনাশকের পরিচয়পত্র ও ব্যবহার নির্দেশিকা, এটি কোনো সাধারণ কাগজ নয় বরং একটি আইনি দলিল, কারণ বালাইনাশক আইন ২০১৮ অনুযায়ী নিবন্ধনকৃত প্রতিটি বালাইনাশকের জন্য অনুমোদিত লেবেল থাকা বাধ্যতামূলক এবং লেবেল ছাড়া বা ভুল লেবেলযুক্ত বালাইনাশক উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় ও ব্যবহার আইনত দ-নীয় অপরাধ, একইভাবে বালাইনাশক বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী লেবেলে যে তথ্যগুলো সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে- যেমন সক্রিয় উপাদানের নাম, ব্যবহারমাত্রা, সতর্কতা ও ঝুঁকির মাত্রা- সেগুলো মূলত কৃষককে নিরাপদ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করার জন্যই প্রণীত; একটি আদর্শ বালাইনাশক লেবেলে সাধারণত চার ধরনের তথ্য থাকে- পরিচিতিমূলক, ব্যবহারিক, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তামূলক এবং পরিবেশগত, যেখানে প্রথমেই থাকে বালাইনাশকের বাণিজ্যিক নাম, সক্রিয় উপাদানের নাম ও পরিমাণ, ফর্মুলেশন টাইপ (যেমন EC,WP,SC), নিবন্ধন নম্বর এবং প্রস্তুতকারক বা আমদানিকারকের নাম ও ঠিকানা, যাতে কৃষক বুঝতে পারেন এটি বৈধ ও অনুমোদিত পণ্য কি না, এরপর উল্লেখ থাকে কোন ফসলের জন্য বালাইনাশকটি প্রযোজ্য, কোন পোকা বা রোগ দমনে কার্যকর, প্রতি লিটার পানিতে কত মিলি প্রয়োগ করতে হবে, কতদিন পরপর ব্যবহার করা যাবে এবং সর্বশেষ প্রয়োগের কতদিন পর ফসল সংগ্রহ নিরাপদ- যা না জানলে কৃষক নিজের অজান্তেই বিষাক্ত খাদ্য উৎপাদনের ঝুঁকি তৈরি করেন এবং বাজারে ভোক্তার আস্থাকে বিপন্ন করেন; লেবেলের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নির্দেশনা, যেখানে বলা থাকে কিভাবে বালাইনাশক মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে- ত্বক, শ্বাসনালী বা মুখের মাধ্যমে, চোখ বা ত্বকে লাগলে কী করতে হবে, প্রাথমিক চিকিৎসা কী, স্প্রে করার সময় কেন গ্লাভস, মাস্ক বা সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার করা জরুরি এবং কেননা শিশু, গর্ভবতী নারী ও গবাদিপশুকে স্প্রে এলাকা থেকে দূরে রাখতে হবে, পাশাপাশি পরিবেশগত সতর্কতায় উল্লেখ থাকে মাছ, মৌমাছি ও উপকারী পোকামাকড়ের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব, জলাশয়ের পাশে ব্যবহার নিষেধাজ্ঞা এবং খালি প্যাকেট কিভাবে মাটিতে পুঁতে বা নির্দিষ্ট স্থানে নষ্ট করতে হবে- যাতে তা পুনর্ব্যবহার হয়ে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি না করে; অথচ বাস্তবে দেখা যায় অনেক কৃষক শুধু দোকানির পরামর্শে বালাইনাশক কিনে মাঠে প্রয়োগ করেন, লেবেলের দিকে তাকানোর প্রয়োজনও মনে করেন না, ফলে অজান্তেই নিজের স্বাস্থ্য, পরিবারের সদস্য, ভোক্তা ও পরিবেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজের চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তোলেন; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বালাইনাশককে বিষাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেছে-ClassII ও Ib অত্যন্ত ও অতি বিপজ্জনক, Class II মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ, Class III কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং Class U অত্যন্ত কম ঝুঁকিপূর্ণ, আর এই ঝুঁকির মাত্রা বোঝাতে লেবেলে লাল, হলুদ, নীল ও সবুজ রঙ ব্যবহার করা হয়, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় বিশেষভাবে কার্যকর, কারণ অনেক কৃষক লেখার চেয়ে রঙ ও চিহ্ন দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো অনেক কৃষক জানেনই না যে লাল বা হলুদ রঙ মানেই বেশি ঝুঁকি এবং এ ধরনের বালাইনাশক ব্যবহারে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন, এখানেই সচেতনতার বড় ঘাটতি স্পষ্ট হয়; লেবেলের নির্দেশনা অমান্য করার পরিণতি শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না- প্রথম আঘাত আসে কৃষকের স্বাস্থ্যের ওপর, কারণ গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়া স্প্রে করার ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে মাথা ঘোরা, বমি, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের সমস্যা এমনকি দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের কারণ হতে পারে, যা কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং পরিবারকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ফেলে, দ্বিতীয়ত ক্ষতি হয় ভোক্তার, কারণ মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে খাদ্যে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ থেকে যায় যা শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তৃতীয়ত পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাছ মারা যায়, মৌমাছি ও উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস হয়, মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং দীর্ঘদিন পরেও তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে যায়, আর চতুর্থত ক্ষতি হয় জাতীয় অর্থনীতির, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য অতিরিক্ত অবশিষ্টাংশের কারণে প্রত্যাখ্যাত হলে দেশের ভাবমূর্তি ও বৈদেশিক আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে; এই বাস্তবতায় প্রশ্ন আসে কৃষক কেন লেবেলের নির্দেশনা অনুসরণ করবেন- এর উত্তর খুবই সহজ, কারণ লেবেল মানা মানে শুধু আইন মানা নয় বরং নিজের স্বার্থ রক্ষা করা, সঠিক মাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার করলে খরচ কমে, ফলন ভালো হয়, পোকার আক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পোকামাকড়ের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কৃষক নিজের স্বাস্থ্য, পরিবারের নিরাপত্তা ও ভোক্তার আস্থা রক্ষা করতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে লাভজনক ও টেকসই করে তোলে; নিরাপদ কৃষি চর্চার প্রথম ধাপই হলো লেবেল মেনে চলা, আর এই জায়গায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লেবেল বোতলে থাকলেই হবে না, তা কৃষকের বোধগম্য করে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে, চিত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ, বাস্তব ডেমোনস্ট্রেশন, কৃষক সমাবেশ, ব্লক পর্যায়ে লেবেল পড়ার কৌশল শেখানো এবং ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, একই সঙ্গে লেবেলবিহীন ও অনুমোদনহীন বালাইনাশকের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং ও আইন প্রয়োগ জরুরি; সবশেষে বলা যায়, বালাইনাশক লেবেল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি কৃষকের নীরব সহচর, একটি অদেখা নিরাপত্তা বর্ম, যা উপেক্ষা করলে আজ হয়তো সাময়িকভাবে ফলন বাড়বে, কিন্তু আগামী দিনে তার মূল্য দিতে হবে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, তাই নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ কৃষক ও টেকসই কৃষির স্বার্থে লেবেল পড়া ও মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন বাংলাদেশের কৃষির জন্য সবচেয়ে বড় ও সময়োপযোগী দাবি।

লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭২২৪৯৯৯৮৭,

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন