কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ এ ১১:০৫ AM

বারান্দায় সবুজ বাগান

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৩-২০২৬

বারান্দায় সবুজ বাগান
মৃত্যুঞ্জয় রায়
যারা আমরা শহরে থাকি, সবসময়ই নানারকম মনখারাপ করা বিষয়ের সাথে থাকি। কখনও দেখা যায় গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে রিকশা-সিএনজির গুতা খাওয়া, যানবাহনের মধ্যে উঠে গাদাগাদি মানুষের চাপ খাওয়া, দশ মিনিটের রাস্তা যেতে এক ঘণ্টা লেগে যাওয়া, ছিনতাই আর খুনের আতঙ্ক তো আছেই। কত আর মন খারাপ করে থাকা যায়? কাজের জায়গায় তো যেতে হয়। কখনো কখনো সেই মন খারাপের প্রভাব পড়ে কর্মস্থলে, প্রিয় মানুষদের ওপর। মন ভালো করার দাওয়াই তো আর ওষুধের দোকানে পাওয়া যায় না যে এক পাতা পিল কিনে খেয়ে মনটাকে ভালো করে ফেলব। অথচ দৈহিক স্বাস্থ্যের সাথে মনেরও একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভালো থাকতে সেই খারাপ হওয়া মনটাকেই আমরা মেরামত করার চেষ্টা করি প্রতিনিয়ত।
সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা ফ্রেশ মুডে দিনটা শুরু করতে চাই। সকালে সূর্য জানালার কাঁচে রোদ ঢেলে দেওয়ার আগেই জানালার পর্দাটা সরিয়ে যদি ঝুল বারান্দায় দেখি, গ্রিলে ঝুলানো টবগুলোতে ফুটে রয়েছে নানারকম ফুল, জানালার পাল্লা সরাতেই কোনো কোনো ফুল থেকে ভেসে আসছে সুগন্ধ, বাহারি পাতায় পাতায় নেচে বেড়াচ্ছে টুনটুনি পাখির মতো নানারকম নকশার ঢেউ- কেমন লাগবে বলুন তো? সকালটাই হয়ে যাবে অন্যরকম। কাজ থেকে ফিরে এসে কয়েক মিনিট ওসব গাছদের যত্ন নিতে যদি আমরা সময় দিতে পারি, দেখবেন গাছগুলোর সাথে আপনার এক অসাধারণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। গাছেরা কিন্তু ঠিকই মানুষের যত্ন ও মমতা বুঝতে পারে। তাই দেখবেন, ওরাও উজাড় করে ওদের সৌন্দর্য ঢেলে দেবে আপনার ঝুল বারান্দায় আপনাকে খুশি করার জন্য।
ঝুল বারান্দাকে জোর দিচ্ছি এ কারণে যে, বাগান করার মতো শহরে আমরা যারা থাকি, বড় বড় বিল্ডিংয়ে বাস করি, ভাড়াটিয়া হিসেবে ছাদে যাওয়ারও অনেক সময় অনুমতি মেলে না- তারা বাগান করবে কোথায়? তাদের জন্য সম্বল ওই এক চিলতে ঝুল বারান্দা বা ব্যালকনি। পরিকল্পনা করে সেই ব্যালকনির মেঝে ও গ্রিলে রাখতে পারি নানা রকমের বাহারি গাছ, সুদর্শন লতা ও ফুলগাছ। এমনকি একটা লতানে চেরি টমেটো গাছ লাগিয়ে সে গাছ থেকে থোকা থোকা আঙুরের মতো টাটকা চেরি টমেটো ছিঁড়ে খেতে পারি। ভর্তার সাথে ডলে নিতে পারি দুটো ঝাঁঝালো লঙ্কা বা বোরহানিতে দিতে পারি পুদিনা পাতার দু-চারটা ডগার পাতা, সালাদের সাথেও তা মন্দ না। পেটের পীড়ায় দ্রুত উপকার পেতে একটা টবে লাগিয়ে রাখতে পারি কয়েকটা থানকুনি গাছ, একটা তুলসীগাছও আপনার কাশির উপশম করতে পারে, সন্ধ্যেবেলায় তুলসী চা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারেন। আজকাল অনেক রকমের তুলসীগাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে, দেশি তুলসীর গাছ তো আশেপাশেই আছে, পছন্দ করতে পারেন থাই তুলসী ও কর্পূর তুলসীকে। থাই তুলসীতে পাবেন দারুচিনির ঘ্রাণ, কর্পূর তুলসীতে কর্পূরের। মটরশুঁটি, পালংশাক, ধনিয়াপাতা, লেটুস, লেমন ঘাস, অ্যাসপ্যারাগাস, পার্সলি ইত্যাদিও লাগাতে পারেন।
ফুলগাছ লাগাতে চাইলে যেসব ঝুল বারান্দায় দিনের অনেকটা সময় ধরে রোদ পড়ে সেসব ঝুল বারান্দায় তা লাগাতে পারেন। তবে সেসব ফুলের গাছই লাগাবেন যেসব ফুলের গাছ খাটো ও ঝোপালো প্রকৃতির। পিটুনিয়া, বিগোনিয়া, জেরানিয়াম, জার্মান প্রিমরোজ, অ্যাডেনিয়াম, মানিপ্লান্ট, ঘৃতকুমারি বা অ্যালোভেরা, সেনসিভিয়েরা বা ¯েœক প্লান্ট, ফিলোডেনড্রন বার্কিল (ডোয়ার্ফ জাতের), অ্যাগ্লাওনিমা, তিলান্ডশিয়া, নাইট কুইন, অর্কিড, ফার্ন, এয়ার প্লান্ট ইত্যাদি ফুল ও বাহারি গাছ। ঘরে শিশুরা থাকলে কাঁটাওয়ালা ও বিষাক্ত গাছ লাগাবেন না।
যে গাছই লাগান, মাথায় রাখতে হবে আপনার ঝুল বারান্দাটা কতটুকু বড়, কতটুকু জায়গা আছে গাছ রাখার জন্য। খুব বেশি গাছ রেখে ঝুল বারান্দা ভরে দেওয়া যাবে না। কয়েকটা গাছ রাখবেন, আর সে গাছগুলোও যেন সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা যায় সে দিক খেয়ায় রাখবেন। বাগানটা করেছে সৌন্দর্যের জন্য, তাই আপনার শিল্পরুচির পরিচয় পাওয়া যাবে সে ব্যালকনিতে কি গাছ লাগাচ্ছেন, কিভাবে কি ধরনের টবে সেগুলো রাখছেন তার ওপর।
রেলিংয়ের কোল দিয়ে সারিতে, বারান্দার কোনায় রাখতে পারেন লতানে গাছ, গ্রিলে ঝুলিয়ে দিতে পারেন থরে থরে ঝুলানো বা হ্যাঙ্গিং বাস্কেট টব। বারান্দায় বেশি গাছ রাখার জন্য এ ধরনের তরুসজ্জা চমৎকার। অন্য বাসা থেকেও আপনার ঝুল বারান্দার সৌন্দর্য দেখে প্রতিবেশীরা মুগ্ধ হবেন। বেশি বড় আকারের টব না রাখা ভালো। টবগুলো হালকা হলে সেগুলো নাড়াচাড়া করতে সুবিধা হয়। পানির ব্যবস্থা তো ঘরেই আছে, অতএব, ওটা নিয়ে না ভাবলেও চলবে। শুধু লাগিয়ে রেখে দিলে হবে না, গাছগুলোর যত্নও নিতে হবে। রোজ অল্প অল্প করে গাছগুলোতে পানি দিলে ভালো থাকবে সেগুলো, টবের মাটিকে শুকাতে দেবেন না। মাঝে মধ্যে গোড়ার মাটির হালকা কুপিয়ে বা খুঁচে তার সাথে ভার্মিকম্পোস্ট মিশিয়ে দেবেন। প্রতি দুই থেকে তিন মাস পর পর সার দিতে পারেন, কোনো রাসায়নিক সার দেবেন না। তবে গাছের প্রকৃতি বুঝে নিয়মমতো ট্যাবলেট সার দিতে পারেন।
চার ফুট বাই পাঁচ ফুটের একটা খুদে বারান্দা, ওখানে কি বাগান হবে? আমি বলছি, হবে। ওইটুক জায়গাতেই আপনি বেহেশতের সুধা ছড়িয়ে দিতে পারবেন, মোলায়েম সবুজ ঘাসের ওপর খালি পা ফেলে চলার সুখ পাবেন। হোক না সেটা কৃত্রিম ঘাস। যারা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, তারা এর চেয়ে বড় বারান্দা কোথায় পাবেন? আসুন আমরা একটা পরিকল্পনা করে ফেলি। পড়শিদের সাথের অংশটায় পার্টিশন আছে সে দেয়াল থেকেই আপনি শুরু করুন। ওখানে ছাদ পর্যন্ত একটা আট-দশ ইঞ্চি চওড়া তাক বানিয়ে ফেলুন। তাকের পেছনে অর্থাৎ পার্টিশন দেয়ালটা সাদা বা অফহোয়াইট রং করবেন। এতে গাছগুলোর সবুজ পাতার রং সে রঙের জমিনে ভালো ফুটবে। সেসব তাকে ছোট ছোট টবে অন্দর বাগানের উপযুক্ত বিভিন্ন গাছ বা হাউজ প্লান্ট লাগান। এসব গাছ লম্বা হয়ে উপরের তাক ছোঁয়ার আগেই তার মাথা ছেঁটে দিন। এতে গাছগুলো ঝোপালো ও খাটো হয়ে সৌন্দর্য বাড়াবে। সেসব তাকে রাখতে পারেন মানিপ্লান্ট, স্পাইডার প্লান্ট, ড্রেসিনা, অ্যালোভেরা, ডোয়াফ ¯েœক প্লান্ট, অ্যাগ্লাওনিমা ইত্যাদি গাছ। চাইলে এক একটা তাক এক ধরনের গাছ দিয়ে সাজাতে পারেন, মিশেল করেও লাগাতে পারেন। টবের রং সাদা হলে ভালো দেখাবে। টবগুলো থেকে আলগা মাটি যাতে না পড়ে সেজন্য গাছগুলোর গোড়ায় মাটি উপরে হালকা করে ছোট ছোট নুড়ি পাথর বা মার্বেল কুচি বিছিয়ে দিতে পারেন। কোনাটায় একটা কাটাপাতার মনস্টেরা, ফিলোডেনড্রন, ভেরিগেটেড ফাইকাস বা চায়না ডল গাছ রাখতে পারেন।
এবার সামনে থাকা রেলিঙের সাথে দুইপাশেই ঝুলিয়ে দিতে পারেন রঙ-বেরঙের পিটুনিয়া। রাখতে পারেন জেব্রিনা, ব্রোমেলিয়া, তিলান্ডিশায়াও। গ্রিলের ফাঁকে ফাঁকে অল্প করে ঝুলিয়ে দিতে পারেন নান্দনিক এয়ার প্লান্ট। শিকল দিয়ে দুই প্রান্তে উপরের বিম থেকে ঝুলিয়ে রাখতে পারেন বিভিন্ন ঝুলন্ত লতানে গাছ যেমন হোয়া, লিপিস্টিক প্লান্ট, মানিপ্লান্ট, হার্টলিফ ফিলোডেনড্রন, স্ট্রিং অব পার্ল, পর্টুলেকা, ওয়ান্ডারিং জিউ, বেবি টিয়ারস, বিগোনিয়া, ফার্ন, স্পাইডার প্লান্ট, ক্যাঙ্গারু পকেট প্লান্ট বা অ্যান্ট প্লান্ট ইত্যাদি গাছ। এবার মেঝেতে রেলিঙের গোড়া থেকে চার-পাঁচ ইঞ্চি ফাঁকা রেখে ঘরের দেয়াল পর্যন্ত বিছিয়ে দিন কৃত্রিম সবুজ গ্রাস কার্পেট। আর ওই ফাঁকে ছোট ছোট নুড়ি পাথর বিছিয়ে দিন। যদি একটা ছোট বেতের টেবিল ও চেয়ার রাখতে চান, সেটি রাখতে পারেন। আর টেবিলের ওপর একটা ছোট কালো রঙের টবে রাখুন ফিলোডেনড্রন বার্কিল গাছ। এক কোনে একটা টেবিল ল্যাম্পের মতো আলো রাখুন। দেখবেন, শুধু দিনেই না- রাতের বেলায়ও ওখানে একটু বসে থাকতে ইচ্ছে করবে। আর ওখানে বসেই আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। চারপাশের এত অশান্তির মধ্যেই হয়তো পেয়ে যাবেন একটু শান্তির পরশ।

লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক (অব:), ডিএই; পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, পার্টনার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা এবং প্রকৃতি বিষয়ক লেখক। মোবাইল : ০১৭১৮-২০৯১০৭

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন