কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২১ মে, ২০২৫ এ ০৫:৩৮ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: জ্যৈষ্ঠ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৫-২০২৫
বরেন্দ্র অঞ্চলে চার-ফসলি ধারা
খাদ্য নিরাপত্তায় ফেলবে সাড়া
কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ মোবারক হোসেন
টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্বব্যাপীই এক উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের বিপর্যয়মূলক জনসংখ্যা বৃদ্ধি খাদ্যের চাহিদা পূরণ করাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা নয় বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে এবং মোট খাদ্যের চাহিদা ২০১০ সালের তুলনায় ৫৬% বৃদ্ধি পাবে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে। চরম জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে পরিবেশগত অবনতি যেমন- বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরার কারণে সেচের পানির ঘাটতি, মাটির উর্বরতা হ্রাস ও ক্ষয় বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, আকস্মিক বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়, নতুন নতুন কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই এবং চাষযোগ্য জমি, পানি এবং শক্তির জন্য ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা টেকসই খাদ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো জটিল করে তুলছে। যদিও এই সমস্যাগুলো দেশভেদে পরিবর্তিত হচ্ছে, তবে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান এশীয় দেশগুলো এইসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখ সারিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তথ্য মতে, দেশে ৮০২৪.৭ হেক্টর নিট ফসলি জমি রয়েছে এবং এই পরিমাণ প্রতিদিন কমছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে আবাদি জমির পরিমাণ বার্ষিক ০.৭৩% হারে হ্রাস পাচ্ছে। তাই আবাদি জমি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা খুবই কম। দেশে প্রায় ৪১০৭.২৫ এবং ১৮৫৮.৮ হেক্টর জমি যথাক্রমে দুই এবং তিন ফসলের আওতায় রয়েছে, যা দেশের নিট ফসলি জমির যথাক্রমে ৫১.১% এবং ২৩.২% । তাই একাধিক ফসলের মাধ্যমে বা এক বছরে একই জমিতে আরও বেশি করে ফসল ফলানোর মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার জোরদার করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। দেশের খাদ্য উৎপাদন স্বাধীনতার সময়ে ১৯৭১ সালের আনুমানিক ১.০১ মিলিয়ন টন থেকে ২০২৩ সালে ১০.০৬ মিলিয়ন টনে উন্নিত হয়েছে। আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত ও উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রভাবে তা সম্ভব হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ফসলের নিবিড়তা ১৯৭১-৭২ সালের ১৪৩% থেকে ২০২২-২৩ সালে ১৯৮% এ উন্নিত হয়েছে। যেখানে দেখা যায় বিগত এক দশকে এ নিবিড়তা কেবল মাত্র ১৯০ থেকে ১৯৮% এ বৃদ্ধি পেয়েছে। উপরন্তু আমাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ৩০০-৪০০% শস্য নিবিড়তা অত্যাবশ্যক। গবেষণা তথ্য মতে, নির্দিষ্ট কৃষি অঞ্চলে ফসলের বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামগ্রিক শস্য নিবিড়তা বাড়ানো যাবে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছরের গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন যে স্থানভিত্তিক ফসলের অঞ্চল (ক্রপ জোনিং) এবং বৈচিত্র্যময় ফসলের ধারা অবলম্বন করার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জমির মধ্যে তিন থেকে চারটি ফসলের চাষ করে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো যাবে। বর্তমান ধানকেন্দ্রিক কৃষি ব্যবস্থায় স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল আধুনিক জাতের ধান, আলু, গম, ভুট্টা, তেল, ডাল ও অন্যান্য ফসল আবাদের মাধ্যমে বর্তমান ফসলের নিবিড়তা ১৯৮% থেকে ৪০০% এ উন্নীত করা যেতে পারে।
ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও অনেক প্রান্তিক দরিদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। গম, ভুট্টা, আলু, ডালসহ অন্যান্য ফসলের ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে খাওয়ানোর একমাত্র উপায় হলো কম জমিতে বেশি ফসল উৎপাদন করা। বিশ্বব্যাপী ম্যান্ডেট হলো সীমিত জমির প্রতি ইউনিটে ৫০% ফলন বৃদ্ধি করা। কিন্তু দেশের উত্তরে অবস্থিত বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪৬% জমি বার্ষিক পতিত থাকে। বরেন্দ্র অঞ্চলটি দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, পাবনা এবং রাজশাহীর বৃহত্তর বিভাগের অধীনে ১৬টি জেলা জেলা নিয়ে গঠিত এবং এর মোট আয়তন ৩৪,৬৫৪ বর্গ কিলোমিটার। অঞ্চলটি খড়াপ্রবণ নিম্ন-উর্বর মাটি সমৃদ্ধ, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা। এখানে উচ্চতাপমাত্রা, সীমিত পরিসরে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ধরন রয়েছে। মে মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে আর জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে পৌঁছায়। জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় গড়ে প্রায় ১৫০০ মিলিমিটার যেখানে অক্টোবর থেকেই মাটির আর্দ্রতা হ্রাস পেতে থাকে। ডিসেম্বরের মধ্যে মাটির অবশিষ্ট আর্দ্রতা রবি ফসল আবাদের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পরে। অন্যদিকে বোরো ধানের উৎপাদন দেশের মোট ধান উৎপাদনের একটি বৃহৎ অংশ যা প্রায় ৫৩%। বোরো ধান উৎপাদনকারী এলাকার ৫০% ই আমন ধান-পতিত-বোরো ধান ধারার অন্তর্গত। বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদনে সেচের পানি সংকটের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলটিতে কৃষি উৎপাদন কম হওয়ায় বর্তমানে ফসলের নিবিড়তা ২২২% রয়েছে। যদি একজন কৃষক জমির উর্বরতা বজায় রেখে বছরে একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে দুটি বা তিনটি ফসলের পরিবর্তে চারটি ফসল আবাদ করতে পারেন, তবে ফসলের নিবিড়তা ৪০০% এ উন্নিত করার সাথে সাথে তার আয়, খাদ্য উৎপাদন এবং নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।
দিনাজপুর, রংপুর এবং রংপুর বিভাগসহ উত্তর-পশ্চিম বরেন্দ্র অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশই উঁচু এবং বেলে-দোআঁশ। এখানে আগাম আলু উৎপাদন সম্ভব। অনেক কৃষক অক্টোবরের মাঝামাঝি আলু বীজ বপন করে কারণ প্রথম দিকে আলু বেশ উচ্চমূল্যে বিক্রি করা যায়। সাধারণত, কৃষকরা জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের ২য় বা ৩য় সপ্তাহে আমন ধান চাষে যান।
তবে, জুনের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত (১৫ জুন -০৫ অক্টোবর) আমন ধানের স্বল্পমেয়াদি (মুল জমিতে ৮৫ দিন) জাত (ব্রি ধান৭৫,৬২,৫৭,৫৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৪, বিনা ধান-১৭, ১৫, ৭) চাষ করলে আগাম আলু (বারি আলু-৮৬, ২৯, ১৩) আবাদ করে ৬০ দিন পর (০৭ অক্টোবর - ০৭ ডিসেম্বর) আলু উত্তোলন করা যাবে। এরপর, কৃষকরা রবি মওসুমে (১০ ডিসেম্বর - ২০ মার্চ) সহজেই স্বল্পকালীন (১০০ দিন), তাপসহনশীল গম (বিডব্লিউএমআরআই গম ১, বারি গম ৩২) চাষ করতে পারেন। গমের পরে খরিফ-২ মৌসুমে (২২ মার্চ-০৬ জুলাই) খুব সহজেই ভুট্টা (বারি হাইব্রিড ভুট্টা ১৭) চাষ করা যেতে পারে যা ১০০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়।
বুুদ্ধিদীপ্ত প্রায়োগিক চিন্তাাধারার মাধ্যমে, ফসলের বপন সময় সমন্বয় করে ভ্ট্টুার পরিবর্তে উচ্চফলনশীল মুগ ডাল (বারি মুগ ৬) ও চাষ করা যেতে পারে যা কি না ৭০ দিনের মধ্যেই তোলা যায়। অতএব, বরেন্দ্র এলাকায় এই দুটি চার-ফসলের ধারা, আমন ধান-আলু-গম-ভুট্টা এবং আমন ধান-আলু-গম-মুগডাল বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
বিগত চার বছরের মাঠ পর্যায়ে গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, এই চার ফসল ধারা দুটি আবাদ করে হেক্টর প্রতি ২২-২৩ টন ধানের সমতুল্য ফলন পাওয়া যায় যা থেকে ১,৭৫,০০০ টাকা খরচ করে প্রায় ২,২২,০০০ টাকা আয় করা যায়। অতএব, আমন ধান-আলু-গম-ভুট্টা এবং আমন ধান-আলু-গম-মুগ ডাল ধারা আবাদের মাধ্যমে শস্য বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধি করে ফসলের নিবিড়তা ৪০০% বৃদ্ধি করতে পারবে, জমি ও শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, যার ফলে খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা বাড়বে এবং দরিদ্রতা দূর হবে। যথাযথ প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কৃষকদের মধ্যে এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য সম্প্রসারণকর্র্মী ও কৃষকদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি, যান্ত্রিকীকরণ, যথাযথ প্রচার, প্রণোদনা, নীতিগত কৌশল প্রনয়ণ, সর্বোপরি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।
লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর-৫২০০, মোবাইল : ০১৭১৪-৭৮২৭০৪; ইমেইল : , mobarak.hossain@bwmri.gov.bd