কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৩ এ ০৩:৪৪ PM

ফসলের খাদ্যাপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ২০-১১-২০২৩

ফসলের খাদ্যাপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার
ড. উৎপল কুমার
আমরা কথা বলে আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু গাছ কথা বলতে পারে না। তবে তারা এমন কতকগুলো লক্ষণ প্রকাশ করে যার মাধ্যমে সহজেই বোঝা যায় তাদের খাবার প্রয়োজন না ঔষধ প্রয়োজন। গাছের এমন কিছু লক্ষণ আছে যার মাধ্যমে তার খাবারের চাহিদা প্রকাশ পায়, আবার এমন কিছু লক্ষণ আছে যার মাধ্যমে তার রোগ জীবাণুর আক্রমণের লক্ষণ বুঝা যায়। খাদ্যোপাদানের অভাবে যে সমস্ত লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং কখন তা সার প্রয়োগের মাধ্যমে নিরসন করা যায় নিম্নে তা বর্ণনা করা হলো-
নাইট্রোজেনের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রতিকার : গাছের নিচের দিকের বয়স্ক পাতা যদি হালকা সবুজ থেকে হলদে বর্ণ ধারণ করে তবে বুঝতে হবে এটা নাইট্রোজেনের অভাবজনিত লক্ষণ। এই লক্ষণ ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগের মাধ্যমে দূর করা যায়। তাৎক্ষণিকভাবে ইউরিয়া প্রয়োগ করা না হলে সম্পূর্ণ মাঠ ফসল ধীরে ধীরে সমানভাবে হলদে হয়ে যাবে। গাছ খাটো হবে ও বৃদ্ধি হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গাছে ফুল ধরবে, ফুল ও ফল আকারে ছোট হবে এবং ফলন কমে যাবে। ধান, গম ও অন্যান্য দানা শস্যে কুশি কম হবে।
ফসফরাসের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রতিকার : যদি ফসল বা গাছের পাতাগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় গাঢ় সবুজ রং ধারণ করে এবং পাতা ও কোন কোন সময় কান্ডে লালচে বেগুনি রং দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ঐ জমির মাটিতে ফসফরাসের অভাব রয়েছে। এরূপ লক্ষণ দেখা গেলে টিএসপি অথবা এসএসপি অথবা  ডিএপি সার প্রয়োগ করতে হবে। ফসল লাগানোর আগেই মাটি পরীক্ষা করে উর্বরতা মান অনুযায়ী এই সার প্রয়োগ করা উচিত। নতুবা মাটিতে অভাব থাকলে দানাদার ফসলে কুশির সংখ্যা কমে যায় ও গাছ খাটো হয়। গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়, ফুল ও ফল কম ধরে এবং বীজ উৎপাদন কম হয়, ফসল পাকতে দেরি হয় এবং শিমজাতীয় গাছে নডিউলের পরিমাণ কমে যায়।
পটাশিয়ামের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রতিকার : বয়স্ক পাতার আগা ও কিনারা ঝলসে বা পুড়ে যাওয়ার মতো হলে এবং কা- দুর্বল ও লিকলিকে হলে বুঝতে হবে পটাশিয়ামের অভাবে হয়েছে। পটাশজাতীয় সার জমি প্রস্তুতির সময়ই প্রয়োগ করা উচিত। তা করা না হলে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমওপি অথবা পটাশিয়াম সালফেট সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। যদি এই সাার প্রযোগ না করা হয় তবে গাছ হেলে পড়বে, রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমন বেশি দেখা দেবে এবং খরা ও শৈত্যঘাতে গাছ তাড়াতাড়ি মারা যাবে। পাতা, ফুল ও ফল ঝরে যেতে পারে, বীজ ও ফল আকারে ছোট হয় এবং কুঁচকে যায়। শিমজাতীয় গাছের পাতা হলদে হয়ে সাদা ছোপ ছোপ দাগে পরিণত হতে পারে।
দস্তার অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রতিকার : কচি পাতার মধ্য শিরা বিশেষ করে গোড়ার দিকে যদি সাদা হয়ে যায় এবং পুরাতন পাতায় মরিচা পড়ার মতো ছোট ছোট দাগ দেখা যায় ও ধীরে ধীরে বাদামি রং ধারণ করতে থাকে তবে বুঝতে হবে এটি দস্তার অভাবে হচ্ছে। জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করলেই এ লক্ষণ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। তা না হলে গাছের পাতা, ফুল ফল আকারে ছোট হবে, পাতার কিনারা কুচকে যাবে। জমিতে ফসলের বৃদ্ধি অসমান মনে হবে এবং ফসল পাকতে দেরি হবে। শিমজাতীয় গাছে বাদামি ফোটা ফোটা দাগ ও সেই সাথে হলদেটে পাতা দেখা যায়।
সালফার/ গন্ধকের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রতিকার : গাছের উপরের দিকের কচিপাতা যদি হলদে সাদা বা ফ্যাকাশে বিবর্ণ রং ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে নিচের পুরাতন পাতার দিকে ছড়াতে থাকে তবে বুঝতে হবে এটি গন্ধকের অভাবজনিত লক্ষণ। জিপসাম জাতীয় সার প্রয়োগ করে এ লক্ষণ দূর করা সম্ভব । কিন্তু এই সার প্রয়োগ করা না হলে ফসল পাকতে দেরি হবে, শস্যের গুণগত মান কমে যাবে, গাছ খর্বাকৃতি হবে এবং ফলন কমে যাবে।
বোরণের অভাবজনিত লক্ষণ : পাতার ফলকের ডগা ফ্যাকাশে সবুজ রং হলে কিংবা ব্রোঞ্জ আভাযুক্ত হলে কিংবা বাড়ন্ত ডগা মারা গেলে বুঝতে হবে এটি বোরণের অভাবে হয়েছে। সলুবর অথবা বরিক এসিড জাতীয় সার প্রয়োগ করে এ অভাব দূর করা য়ায়। অভাব স্থায়ী হলে দানাজাতীয় ফসলে যেমন- গম, ভুট্টা ইত্যাদিতে দানা গঠন বাধাগ্রস্ত হয, চীনাবাদমে শূন্য গর্ভ ও তুলা পাতায় বোঁটা প্রশস্ত ও প্যাঁচানো দাগ হয়।
ক্যালসিয়াম/ম্যাগনেসিয়ামের অভাবজনিত লক্ষণ ও প্রতিকার : নতুন পাতা যদি সাদা হয়ে যায় তবে তা ক্যালসিয়ামের অভাবজনিত লক্ষণ এবং যদি বয়স্ক পাতায় হালকা সবুজ ও হলদে-জ্বলে যাওয়া বিবর্ণ আকার ধারণ করে কিন্তু শিরাগুলো সবুজ থাকে তবে তা ম্যাগনেসিয়ামের অভাবজনিত লক্ষণ। সাধারণত অম্লীয় মাটিতে এ দুটি উপাদানের অভাব দেখা যায়। তাই ডলোচুন প্রয়োগ করলে এ দুটি উপাদানের যেমন ঘাটতি পূরণ হয় অন্যদিকে মাটির অম্লত্ব কমিয়ে আনা যায়।
আমাদের দেশে বর্তমানে উপরে বর্ণিত কয়টি উপাদানের অভাবই পরিলক্ষিত হচ্ছে। অন্যান্য উপাদানগুলো এখনও যথেষ্ট পরিমাণে মাটিতে বিদ্যমান তাই সার হিসেবে প্রয়োগ করার প্রয়োজন পরে না। একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে ‘প্রতিরোধ প্রতিকার অপেক্ষা শ্রেয়’। তাই কৃষাণ-কৃষাণী ভাই ও বোনদের উচিত তাদের মাটি পরীক্ষা করে অথবা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রণীত ‘উপজেলা  নির্দেশিকা’ থেকে তার জমির উর্বরতা মান জানা এবং সেই অনুসারে ফসলে খাদ্যোপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই সার প্রয়োগ করা। তবে কোন কারণে যদি আগে সার প্রয়োগ করা না হয় তবে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দানাদার বা তরল আকারে সার প্রযোগ করতে হবে। নতুবা চরম ফলন বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকবে।

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কার্যালয়, টাঙ্গাইল। মোবাইল ঃ ০১৭১২-৭০৩৩৭৩ , ই-মেইল :uksrdi@yahoo.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন