কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ৭ আগস্ট, ২০১৭ এ ১০:২৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আষাঢ় সাল: ১৪২৪ প্রকাশের তারিখ: ০৩-০৮-২০১৭
বছরে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়। এর প্রায় অর্ধেক ফল আমরা ভালো ফল হিসেবে খেতে পারি। বাকি অর্ধেক নষ্ট হয় বিভিন্ন বালাইজনিত ক্ষতি ও সংগ্রহের পর অপচয় বা নষ্ট হওয়ার কারণে। কৃষকের উৎপাদিত এত কষ্টের ফল এভাবে নষ্ট হওয়া মেনে নেয়া যায় না। ফলের বালাইজনিত ক্ষতি কমানোর ওপর যেমন জোর দিতে হবে, তেমনি সংগ্রহোত্তর ক্ষতিও ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।
সব ফসলের মতো ফলেরও বালাই আছে। বিভিন্ন রোগ, পোকামাকড়, ইঁদুর, বাদুড়, কাঠবিড়ালি, শিয়াল, খরগোশ, আগাছা, পরগাছা ফল ও ফলগাছের ক্ষতি করে। ক্ষতিকর এসব জীবই বালাই। ফলের বালাই নিয়ন্ত্রণে সাধারণত ফলচাষিরা ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপরই বেশি নির্ভর করেন। অন্যান্য ফসলে বালাইনাশকের ব্যবহারে যতটা না জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, ফলে বালাইনাশক ব্যবহারে ক্ষতি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। কেননা ফল আমরা সরাসরি গাছ থেকে পেড়ে কাঁচা ও পাকা খাই, রান্না বা প্রক্রিয়াজাত করার পর খাই না। তাই রাসায়নিক বালাইনাশক সরাসরি আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। এজন্য অন্য ফসলের আগে ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা করা দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা যেমন জটিল তেমনি গবেষণালব্ধ তথ্যের অভাব রয়েছে। অন্য ফসল বলতে একক ফসলকে বুঝায়। তাই সেসব ফসলের বালাইও সীমিত। কিন্তু ফল আছে শত রকমের। তাই বালাইয়ের সংখ্যাও অসংখ্য। ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সেজন্য খুব সহজ নয়। তবে বিভিন্ন ফলের বালাই সুনির্দ্দিষ্ট, কিছু বালাই একাধিক ফলে আক্রমণ করে। সেজন্য ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থানার কিছু সাধারণ নীতি অনুসরণ করলে বালাইমুক্ত ফল উৎপাদন করা খুব কঠিন নয়।
ফলের বালাই ব্যবস্থাপনায় এত বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা? বালাইনাশক বাজারে সুলভ, চাইলেই হাতের কাছে পাওয়া যায়, সহজে ব্যবহার করা যায় এবং দ্রুত ফল দেয়। অধিকাংশ ফলচাষি এসব কথা বিশ্বাস করেন। পক্ষান্তরে আইপিএম বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ধারণাটি সাধারণ চাষিদের কাছে ততটা বোধগম্য নয়, অনেক কৌশল সম্পর্কে তারা জানেন না ও সেসব কৌশলের কার্যকারিতা সম্পর্কে বেশ অনাস্থা রয়েছে। বাণিজ্যিক ফলচাষিরা চান রোগ ও পোকামুক্ত সুদর্শন ফল, তাতে যতবার যত বালাইনাশক দেয়া লাগে তারা তা দেন। সেজন্য ফলচাষিদের কাছে আইপিএম ধারণার গ্রহণযোগ্যতা এখনও বালাইনাশকের মতো হয়ে ওঠেনি। তবে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত যদি বিদেশে ফল রপ্তানি করতে হয় তাহলে সেসব দেশের ক্রেতারা ক্ষতিকর রাসায়নিক দেয়া ফল কিনবে না। তাছাড়া উপর্যুপরি ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে পাঁচটি ঘটনা ঘটছে। ঘটনাগুলো হলো- অধিকাংশ বালাইয়ের পুনরুজ্জীবন লাভ, পুনরুত্থান, নতুন বালাইয়ের আবির্ভাব, মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট ও পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি। তাই মানসম্মত ও লাভজনক ফল উৎপাদনে এখন ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ ফল উৎপাদনে যেসব কৌশলগুলো গ্রহণ করা যায়-
বালাই সহনশীল জাতের ফল চাষ : এটি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার একটি উপাদান সত্য, তবে ফলের ক্ষেত্রে এ উপাদানের কার্যকারিতা কম। কেননা এ দেশে ফলের যত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে সেসব জাতের বালাই সহনশীলতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কিত তথ্য খুব বেশি নেই। তবু যা আছে তার ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যায়। বিশেষ করে যেসব এলাকায় যদি কোনো নির্দ্দিষ্ট বালাইয়ের আক্রমণ নিয়মিতভাবে প্রতি বছর বা মৌসুমে ঘটতে থাকে তাহলে নতুন বাগান করার ক্ষেত্রে সেই বালাই প্রতিরোধী জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করে তা লাগাতে হবে। অ্যানথ্রাকনোজ রোগ প্রতিরোধী জাতের পেয়ারা চাষ করে এ রোগের আক্রমণ থেকে পেয়ারা রক্ষা করা যেতে পারে। বাউ পেয়ারা ১, বাউ পেয়ারা ২, বাউ পেয়ারা ৩, মুকুন্দপুরী ও কাঞ্চননগর জাতে এ রোগের আক্রমণ কম হয়। অন্য দিকে স্বরূপকাঠি ও কাজী পেয়ারাতে এ রোগ বেশি হয়।
জৈবিক পদ্ধতিতে ফলের বালাই নিয়ন্ত্রণ : এটা হলো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। প্রকৃতিতেই বালাই নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু সেসব ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো দরকার। প্রকৃতিতে প্রায় সব বালাইয়েরই কম-বেশি প্রাকৃতিক শত্রু রয়েছে। এসব প্রাকৃতিক শত্রুর কেউ পরভোজী, কেউ পরজীবী আবার কেউবা বালাইয়ের দেহে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু। ফলবাগানে কোনো রাসায়নিক বালাইনাশক প্রয়োগ না করলে এসব উপকারী প্রাকৃতিক শত্রুদের সংখ্যা বাড়ে ও প্রকৃতির নিয়মে তারাই বিভিন্নভাবে বালাইদের নিয়ন্ত্রণ করে রাখে। এতে পরিবেশের মধ্যে শত্রু-মিত্রর ভারসাম্য বজায় থাকে। এজন্য বালাই চাষির কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
ফল বাগানে বন্ধু জীবদের বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে; মরিচের গুঁড়া, আদা ও রসুনের রস জৈব পদার্থগুলো স্প্রে করে বিভিন্ন পোকাকে বিতাড়িত করা যায়; প্রাকৃতিক বা জৈবিক বালাইনাশকও আছে, যেমন- বাইকাও। রাসায়নিক বালাইনাশকের চেয়ে জৈবিক বা প্রকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে; ট্রাইকোডার্মা বা ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহার করা।
আধুনিক নিয়মে ফল চাষ : ফল চাষের যত ভালো প্রযুক্তি আছে সব মেনে ফল চাষ করাই হলো আধুনিক নিয়মে ফল চাষ। এতে সুস্থ সবল গাছ হয়, গাছের বৃদ্ধি ও তেজ ভালো থাকে। স্বভাবত সেসব গাছ প্রাকৃতিকভাবে অনেক বালাই প্রতিরোধ করতে পারে। এজন্য ফলগাছের উন্নত চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যেসব বিষয়াদি বিবেচনা করা যায় তাহলো এলাকার উপযোগী উন্নত জাতের ফলগাছ লাগানো। সঠিকভাবে সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় সার দেয়া। অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ফলগাছে দেয়া চলবে না। আগাছা ও পানি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা। নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করা। আক্রান্ত ফল ও গাছের আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে ধ্বংস করা।
যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ : ফলের বালাই নিয়ন্ত্রণে হাত বা যে কোনো যন্ত্রের ব্যবহারই হলো যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে বালাইগুলো বিতাড়িত হয়, মরে যায় অথচ উপকারী জীবের কোনো ক্ষতি হয় না। যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যেসব বিষয়াদি বিবেচনা করা যায়- ফলের মাছি পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ বা বিষটোপ ফাঁদ ব্যবহার। কাইরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করা। গাছ যখন দুর্বল বা আঘাতপ্রাপ্ত হয় তখন তা থেকে কাইরোমোন নিঃসৃত হয় যা অনেক পোকাকে আকৃষ্ট করে। কৃত্রিমভাবে এরূপ কাইরোমোন ব্যবহার করে ফাঁদ তৈরি করে পোকাদের আকৃষ্ট ও ফাঁদে আটকে মারা যায়। আলোক ফাঁদ ব্যবহার। বর্ণফাঁদ ব্যবহার করা। ইঁদুরের কল বা ফাঁদ ব্যবহার করা। গাছের তলার মাটি চষে দেয়া। পাখি ও বাদুড় তাড়ানোর জন্য আওয়াজ সৃষ্টিকারী টিন-যন্ত্রের ব্যবস্থা করা। ব্যাগিং বা ফল ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেয়া। মালচিং করা। করাত বা দা দিয়ে কেটে আক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা।
রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা : রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা হলো কোনো না কোনো রাসায়নিক দ্রব্য বিশেষ করে বালাইনাশক ব্যবহার করে বালাই নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে বিভিন্ন জৈব ও জৈব রাসায়নিক দ্রব্যও ব্যবহার করা হচ্ছে। রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যেসব বিষয়াদি বিবেচনা করা যেতে পারে- এসিটিক এসিড, লবঙ্গের তেল, ফ্যাটি এসিড প্রভৃতি স্প্রে করা। সালফার ও চুন প্রয়োগ করা। বোর্দো মিশ্রণ প্রয়োগ করা। সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বুদ্ধিমত্তার সাথে বালাইনাশকের যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার করা। যে কোনো বালাইনাশক ব্যবহারের আগে তার লেবেল বা ব্যবহারের নির্দেশনা পড়ে নিতে হবে। বালাইনাশক সাধারণত কারখানায় তৈরি করা কৃত্রিম রাসায়নিক দ্রব্য হয়। কিছু বালাইনাশকের কার্যকারিতা ব্যাপক, একই বালাইনাশক বহু রকমের বালাইকে মেরে ফেলতে পারে। কিছু বালাইনাশকের কার্যকারিতা পোষক বা বালাই সুনির্দ্দিষ্ট। কেবলমাত্র নির্দ্দিষ্ট বালাইকে তারা মারতে পারে। এরূপ বালাইনাশক ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিছু বালাইনাশকের অবশেষ ক্রিয়া দ্রুত শেষ হয়ে যায়, কিছু বালাইনাশকের অবশেষ ক্রিয়া থাকে অনেক দিন। অবশেষ স্বল্পক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। কোনো তীব্র বিষাক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করা যাবে না।
ফলের আইপিএম বাস্তবায়ন কৌশল
ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাকে ফলপ্রসূ করার জন্য যেসব কৌশলগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে-
ফলের বালাইগুলো চেনা ও সে সম্পর্কে তথ্য জানা : সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের প্রথম কাজই হলো কোন ফলগাছে ও ফলে কী কী রোগ, পোকা ও অন্যান্য বালাইয়ের আক্রমণ ঘটে সে সম্পর্কে তথ্য নেয়া। যথাসম্ভব সেসব বালাইগুলো শনাক্তকরণে দক্ষতা অর্জন করা। সেসব বালাই দ্বারা কী ক্ষতি হচ্ছে সেসব লক্ষণ চেনাও দরকার। পাশাপাশি কোনো বালাইয়ের আক্রমণ কোন স্তরে ও কোন পরিস্থিতিতে বাড়ে তাও জানতে হবে।
নিয়মিত ফলগাছ পর্যবেক্ষণ : দ্বিতীয় ধাপ হলো ফলগাছ অন্তত সপ্তাহে একবার পর্যবেক্ষণ করা। ফলগাছে উপস্থিত রোগ, পোকামাকড় (শত্রু ও বন্ধু পোকা) ও অন্যান্য বালাই পরিস্থিতি জরিপ করে কোনো বালাইয়ের তীব্রতা কত তা নির্ণয় করা দরকার। নমুনায়ন করেও এ কাজ করা যায়। এ কাজে চাক্ষুষ পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো। বিভিন্ন ফাঁদ পেতেও বালাই জরিপ কাজ করা যায়।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন : ফল ও ফলগাছের বালাই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বালাই ব্যবস্থাপনার প্রাপ্য সব কলাকৌশল বিবেচনা করে সর্বোত্তম কৌশল নির্বাচন করাই হলো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এ সময় বিবেচনা করা দরকার কোন কৌশলটি প্রয়োগ করলে সবচেয়ে সহজে করা যাবে, খরচ কম হবে ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া যাবে। অবশ্যই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে শুধু একটি কৌশলের ওপর নির্ভর করা উচিত হবে না, একাধিক কৌশলকে ব্যবহার করতে হবে। সবশেষে প্রয়োগের জন্য রাখতে হবে রাসায়নিক ব্যবস্থাপনাকে।
কার্যকারিতা মূল্যায়ন : সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার প্রতিটি কৌশল প্রয়োগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে তার ফল যাচাই করতে হবে ও তার তথ্য রাখতে হবে। এতে পরবর্তীতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও বেশি আস্থার সাথে করা যাবে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়*
*উপপ্রকল্প পরিচালক, আইএফএমসি প্রকল্প, খামারবাড়ি, ঢাকা