কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৮ জুন, ২০২৫ এ ১২:০৪ AM

ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে বছরব্যাপী পুষ্টি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আষাঢ় সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৬-২০২৫

ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে বছরব্যাপী পুষ্টি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান
রবিউল ইসলাম১ মো. হাফিজুল হক খান২
কৃষিপণ্যের মধ্যে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের অবদান স্বীকৃত। উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের মধ্যে ফল অন্যতম। বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে বিশ্বের ১ থেকে ১০টি শীর্ষ ফল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে রয়েছে। সরকার কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কৃষিপণ্য সরাসরি বিক্রির জন্য কৃষকের বাজারসহ  ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য ই-কৃষি এবং বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্ম চালু রয়েছে। তৎসত্ত্বেও, উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের সংগ্রহোত্তর ক্ষতির পরিমাণ মোট ফসল উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি। ভরা মৌসুমে যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষি পণ্য অধিক পরিমাণে অপচয় হচ্ছে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। মধু মাসে বিভিন্ন রকম ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বাসাবাড়িতে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
কাঁচা আম কাগজে মোড়ানো অবস্থায় ঠা-া ও বাতাস চলাচলযুক্ত স্থানে ৭-১০ দিন পর্যন্ত ভালো রাখা যায়। পাকা আম কাগজে মোড়ানো অবস্থায় রেফ্রিজারেটরে ৫-৭ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। এ ছাড়া আমের খোসা বা চামড়া ছাড়িয়ে টুকরো করে ব্লেন্ড করে বা কিউব করে ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে ৬ মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়, যা পরবর্তীতে জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি, জুস, মিল্কশেক তৈরি করা যায়। আবার লবণ, মসলা, তেল ও ভিনেগার বা অ্যাসেটিক এসিড যুক্ত করে আচার বানিয়ে সঠিকভাবে পরিষ্কার বোতলে রেখে ১ বছরের অধিক সময় গুণগতমান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা যায়। পাকা আম পেস্ট করে চিনি, মিশিয়ে রোদে শুকিয়ে আমসত্ত্ব বা লেদ তৈরি করলে বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা যায়।
বাণিজ্যিকভাবে আম সংরক্ষণ
কোল্ডস্টোরেজে ১০-১৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় এবং ৮৫-৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় পরিপুষ্ট আম প্রায় ৩-৪ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়। এ ছাড়া ১০% লবণ, ০.১% অ্যাসেটিক এসিড দ্রবণে আম ০৬ মাসের বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায়। আমের পাল্প বা ম্যাশ ফর্মে -১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে এক বছরের বেশি সময় মান বজায় রাখা যায়। আমের স্লাইস বা পাল্প চিনি ও সংরক্ষক পদার্থ যুক্ত করে ক্যান বা কাচের বয়ামে ভর্তি করে গরম পানিতে কিছুক্ষণ রাখা হলে ১-২ বছর সংরক্ষণ করা যায়। মোড়কের ভেতরের গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করেও সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করা হয়। এটি শিল্পপর্যায়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং প্রযুক্তির সাহায্যে আমের চিপস তৈরি করে ৬ মাসের অধিক সময় সংরক্ষণ করা যায়। 
খাদ্য সংরক্ষণে আয়ন বিকিরণ (ঋড়ড়ফ ওৎৎধফরধঃরড়হ) হলো একটি আধুনিক প্রযুক্তি, যেখানে আয়ন বিকিরণ ব্যবহার করে খাদ্য পণ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পোকামাকড় ও অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করা হয়, যাতে খাদ্যের সংরক্ষণকাল বাড়ে এবং এটি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা যায়। দ্রুত আম যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য আয়ন বিকিরণ একটি নিরাপদ এবং কার্যকর প্রক্রিয়া। অক্সিজেন-কাবর্নডাই অক্সাইডের বিনিময় হার এবং পচনশীলতা বাধা দিয়ে সংরক্ষণের সময়কাল বৃদ্ধি করে। ঋঅঙ এবং ডঐঙ খাদ্য বিকিরণকে নিরাপদ বলে ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারতসহ অনেক দেশে খাদ্য বিকিরণ অনুমোদিত।
কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ 
কাচা কাঁঠালের (৫-৭ সপ্তাহ) উপরের চামড়া বা ত্বক ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরা করে ৫০০-৭৫০ পিপিএম পটাশিয়াম মেটাবাই সালফাইট বা লেবুর রস মিশ্রিত পানিতে ৩-৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে পরে গরম পানিতে শোধন করে মোড়কে ভর্তি করে রেফ্রিজারেটরে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত এবং ডিপ ফ্রিজে ৬-৮ মাস সংরক্ষণ করা যায়। পরে সবজি, আচার, পাপড়, ভেজিটেবল রোল, কাটলেটসহ ইত্যাদি বছরব্যাপী তৈরি করা যায়। 
কাঁঠালের আচার তৈরির জন্য ত্বক ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরা করে টুকরাগুলো সিদ্ধ করতে হবে এবং পরে তেলে ভেজে নিতে হবে। পরিমাণমতো আদা ও রসুন, ১% গ্লাসিয়াল এসিটিক এসিডসহ বেটে/ব্লেন্ডার করে পেস্ট তৈরি করে তাতে পরিমাণমতো মরিচ ও হলুদ মিশিয়ে মিশ্র পেস্ট তৈরি করতে হবে। কোষ/টুকরাগুলো তেলে ভেজে তাতে আদা, রসুন, মরিচ ও হলুদের পেস্ট মিশিয়ে কষাতে হয়। কষানো হলে পরিমাণমতো চিনি, মেথির গুঁড়া, জিরার গুঁড়া, সরিষার গুঁড়া, লবণ ও অন্যান্য মসলা যোগ করে রান্না করতে হবে। শেষে মিশ্রণটিতে পরিমাণমতো অ্যাসিটিক এসিড মিশিয়ে গরম অবস্থায় জীবাণুমুক্ত কাচের বয়াম/বোতলে ভরে ছিপি এঁটে দিতে হবে। তৈরিকৃত কাচা কাঁঠালের আচার কাচের বয়াম/বোতলে ভরে শুকনো ও পরিষ্কার জায়গায় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বছরব্যাপী সংরক্ষণ করা যায়।
পরিপুষ্ট পাকা কাঁঠাল বাছাই করে কাঁঠালের কোষগুলো ব্লেন্ডিং করে পাল্প বা রস বের করে নিয়ে পরিমিত পরিমাণ চিনি, লবণ, বিভিন্ন রকম মসলা ও সরিষার তেল যুক্ত করে মিশ্রণটি ঘন না হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে। যাতে পাল্প ২৫ ডিগ্রি বিক্স এ পৌঁছে। অতঃপর স্টেইনলেস স্টিলের ট্রেতে নিয়ে ঘন পাল্পকে কেবিনেট ড্রয়ারে ৫৫-৬০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ২৪-৪৮ ঘণ্টা শুকাতে হবে। কেবিনেট ড্রায়ারের পরিবর্তে সোলার ড্রায়ার বা সূর্যের আলোতে শুকানো যেতে পারে। কাঁঠালসত্ত্বকে নির্দিষ্ট পুরুত্বে কেটে এইচডিপিই/স্বচ্ছ ফিল্ম মোড়ক বা বয়ামে ভর্তি করে শুষ্ক ও ঠা-া স্থানে ৮-১০ মাস পর্যন্ত স্বাভাবিক তাপমাত্রায় অনায়াসে সংরক্ষণ করা যায়। 
কাঁঠালের পাল্প তৈরি করতে কাঁঠালের কোষগুলো একটি ব্লেন্ডার দিয়ে ভালোভাবে পাল্প বা রস তৈরি করে পরিমিত পরিমাণ চিনি (৪৫০-৫০০ গ্রাম/কেজি পাল্প) মেশাতে হবে। মিশ্রণটিকে ভালোভাবে জ্বাল দিয়ে ঘন/গাঢ় করতে হবে যাতে মোট দ্রবণীয় ঘনত্ব ৫৫-৫৮ ডিগ্রি ব্রিক্সএ পৌঁছে। এতে ১০% হারে লেবু/আম বা মাল্টার রস যোগ করে অধিকতর জমাট বাঁধতে ১.২৫-১.৫% হারে পেকটিন মেশাতে হবে যাতে মিশ্রণের ঘনত্ব ৬৫-৬৭ ডিগ্রি ব্রিক্স হবে। রিফ্রাক্টোমিটার না থাকলে শিটিং পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। তৈরিকৃত জীবাণুমুক্ত বয়ামে বছরব্যাপী গুণগতমান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা যায়। একইভাবে কাঁঠালের জেলি, জুস, পাউডার, রেডি-টু-কুক, রেডি-টু-ইট ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা যায়।
লিচু সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
লিচু অন্যতম জনপ্রিয় রসালো ফল। কিন্তু এর ব্যাপ্তিকাল খুবই কম। সতেজ লিচু ভালোভাবে ক্যালসিনেটেড ক্যালসিয়াম মিশ্রিত পানিতে ধৌত করে পরে বাতাসে শুকিয়ে নিয়ে পলিব্যাগ বা জিপার ব্যাগে ভর্তি করে রেফ্রিজারেটরে ৪-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। আবার লিচুর খোসা ও বিচি ছাড়িয়ে কোষকে ব্লেন্ড করে তাতে নির্দিষ্ট অনুপাতে পানি, পাল্প, সাইট্রিক এসিড ইত্যাদি যুক্ত করে লিচুর ড্রিংক্স তৈরি করা যায়। লিচুর কোষ দিয়ে উৎকৃষ্টমানের জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি তৈরি করা যায়। লিচুর রেডি-টু-ইট ক্যান প্রডাক্ট তৈরিতে লিচুর কোষ, চিনি, সাইট্রিক এসিড ব্যবহার করা হয় যা ১-২ বছর সংরক্ষণ করা যায়। 
আনারস সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
আনারস সতেজ অবস্থায় সংরক্ষণের জন্য ছত্রাকনাশক ফানজিসাইড ও জিব্রালিক এসিড ব্যবহার করে ১% ছিদ্রযুক্ত পলিপ্রপাইলিন মোড়কে ভর্তি করে প্লাস্টিক ক্রেট্স অথবা করোগেটেড ফাইবার বোর্ড কার্টুনে রেখে ১৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৮৫+৫% আর্দ্রতায় ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত গুণগতমান বজায় রেখে সম্পূর্ণ বাজারজাতকরণের উপযোগী অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায় এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৫-৭ দিন পর্যন্ত বিক্রয়ের উপযোগী থাকে। ফ্রেশ-কাট হিসেবে আনারসের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে আনারসকে ত্বক বা চামড়া ছাড়িয়ে ত্রিকোনাকৃতি ছোট ছোট টুকরা করে ১% এসকরবিক এসিড দ্রবণ বা সাইট্রিক এসিড মিশ্রিত দ্রবণে ২-৩ মিনিট রেখে পরে ট্রান্সপারেন্ট বক্সে বা ক্লিং র‌্যাপিংয়ের মাধ্যমে রেফ্রিজারেটরে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। পরিপুষ্ট আনারসের রস দিয়ে জেলি ও পাল্প দিয়ে জ্যাম তৈরি করা যায়। আনারসের জেলি তৈরির পর অবশিষ্ট আঁশের সাথে চিনি, ঘি, বাদাম ইত্যাদি যুক্ত করে আকর্ষণীয় লাড্ডু তৈরি করা যায়। আবার আনারসের কোষকে চিনির সিরাপে ডুবিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করে পরে ড্রায়ারে শুকিয়ে ডিহাইড্রেটেড পণ্য, ক্যান্ডি তৈরি করা যায়। এ ছাড়াও আনারসের কোষ ব্যবহার করে ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং প্রযুক্তিতে চিপ্স তৈরি করা যায়।   
রপ্তানি উন্নয়ন বু্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, বাংলাদেশ ১৯৪টি দেশে বিভিন্ন কৃষি পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত ও আধা প্রক্রিয়াজাত খাবার রপ্তানি করে। হিমায়িত, তাজা ফল ও সবজি, জুস, জ্যাম, জেলি, আচার, সস ইত্যাদি কিছু এশিয়ন, আফ্রিকান এবং দক্ষিণ-এশীয় দেশের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে চাহিদা তৈরি করেছে। 
বস্তুত আমাদের কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নয়ন আমাদের       কৃষি পণ্যের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। সর্বোপরি প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষি পণ্য রপ্তানি করে দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করবে।

লেখক : ১রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ও খাদ্য প্রযুক্তিবিদ, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর, ই-মেইল : : robiulislam14026@gmail.com, মোবাইল : ০১৭০৭৭৭৪১০৮; ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, ই-মেইল : : cso.pht@bari.gov.bd ফোন : ০২-৪৯২৭০১৭৬, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর-১৭০১।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন