কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৪ এ ০৫:১২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৪
প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ ড. আকলিমা খাতুন
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
জনাব সবুজ মিয়া, উপজেলা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : ক্যাপসিকাম বা মিষ্টিমরিচ লাগানোর নিয়ম সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : ক্যাপসিকাম বা মিষ্টিমরিচ চাষের জন্য দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি ভাল। এটি খরা ও গোড়ায় পানি জমা কোনটাই সহ্য করতে পারেনা। অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস ক্যাপসিকাম এর বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। প্রতি শতকের জন্য এক গ্রাম বীজ দরকার হয়। বীজ থেকে প্রথমে চারা তৈরি করা হয়। এর জন্য বীজগুলোকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে বীজতলায় ১০ সেমি. দূরে দূরে লাইন করে বীজ বুনতে হবে। সাত থেকে দশ দিন পর চারা ৩-৪ পাতা হলে চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। এরপর মূল জমি চাষ ও মই দিয়ে বেড তৈরি করে নিতে হবে। প্রতিটি বেড চওড়া ২.৫ ফুট রাখতে হবে। দুই বেডের মাঝখানে নালা রাখতে হবে। প্রতি শতক জমির জন্য গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ১.৪ কেজি, এমওপি ১ কেজি, দস্তা ২০ গ্রাম জিপসাম ৪৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। এর মধ্যে অর্ধেক গোবর সার জমি তৈরির সময়, বাকি অর্ধেক গোবর সম্পূর্ণ টিএসপি, দস্তা, জিপসাম, ১/৩ ভাগ এমওপি এবং ১/৩ ভাগ ইউরিয়া চারা রোপণের গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ২/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং ২/৩ ভাগ এমওপি দুইভাগ করে চারা রোপণের ২৫ এবং ৫০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত ৩০ দিন বয়সের চারা বেডে ১.৫ ফুট দূরে লাইনে রোপণ করতে হয়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায় বলে পলিথিনের ছাউনি দিলে ভেতরের তাপমাত্রা বেশি থাকে।
জনাব মো: ফারুক, উপজেলা : ঈশ্বরদী, জেলা : পাবনা
প্রশ্ন : মসুরের গাছ গোড়া পচে মারা যাচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : গোড়া পচা মসুরের একটি ক্ষতিকর রোগ। এটি মূলত চারা আক্রমণকারী একটি ছত্রাকজনিত রোগ। সাধারণত এক মাস বা তার চেয়ে কম বয়সের চারাকে এটি আক্রমণ করে থাকে। অতি অল্প বয়সে আক্রান্ত হলে চারা হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে এবং শুকিয়ে খড়ের রং ধারণ করে মারা যায়। বয়স্ক চারা আক্রান্ত হলে হলুদ হয়ে যায় ও শুকিয়ে যায়। গাছের মূল এবং শিকড় আক্রান্ত হলে গাছের আকার খাটো হয় এবং গাছ ঢলে পড়ে যায়। বপনের সময় জমিতে যাতে অতিরিক্ত রস না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে কারণ রস বেশি থাকলে জমিতে গোড়া পচা রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। রোপণের পূর্বে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি বীজের সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিলে রোগের প্রকোপ অনেকাংশে হ্রাস পায়। এছাড়া রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউজি (কার্বেন্ডাজিম) ২ গ্রাম/লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
জনাব আব্দুল হাকিম, উপজেলা : শ্রীপুর, জেলা : গাজীপুর
প্রশ্ন : ধনিয়ার উন্নত জাত এবং এর ফলন সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : ধনিয়ার উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে বারি ধনিয়া-১, বারি ধনিয়া-২, এলবি-৬০, এলবি-৬৫, সুগন্ধা, বারি বিলাতি ধনিয়া-১ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। লাইন বা বেড পদ্ধতিতে বীজ বোনার জন্য বিঘা প্রতি ১.৩-১.৬ কেজি বীজ প্রয়োজন। ছিটিয়ে বোনার জন্য দ্বিগুণ বীজ প্রয়োজন। জাতভেদে শতকপ্রতি ফলন পাতা ১৪-১৬ কেজি এবং ধনিয়া ৬.৮-৮.০ কেজি। বিলাতি ধনিয়া-১ এর ফলন প্রায় ১২১-২০২ কেজি পাতা ও বীজ ১.৬১-২.০২ কেজি/শতক।
জনাব আনিসুর রহমান, উপজেলা : মিঠাপুকুর, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : আলুর জমিতে সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর :
গোরব, অর্ধেক ইউরিয়া, টিএপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট রোপণের সময় জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি ইউরিয়া রোপণের ৩০-৩৫ পর অর্থাৎ দ্বিতীয়বার মাটি তোলার সময় প্রয়োগ করতে হবে। অম্লীয় বেলে মাটির জন্য ৩৫০ গ্রাম/শতক ম্যাগনেসিয়াম সালফেট এবং বেলে মাটির জন্য বোরন প্রতি শতকে ৩৫ গ্রাম প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।
জনাব মাহমুদুল হাসান, উপজেলা : ফুলবাড়ী, জেলা : কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন : গাজরের চারা ঢলে পড়ছে, কী করতে হবে?
উত্তর : এই রোগে আক্রান্ত চারার গোড়ায় চারদিকে পানিভেজা দাগ দেখা যায়। গোড়ায় সাদা ছত্রাক জেলি ও অনেক সময় সরিষার মতো ছত্রাকের অনুবীজ দেখা যায়। এর ফলে শিকড় পচে যায়, চারা নেতিয়ে পড়ে গাছ মারা যায়। এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পরিমিত সেচ ও পর্যাপ্ত জৈবসার প্রদান করা ও পানি নিষ্কাশনের ভাল ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরিষার খৈল ৩০০ কেজি/ হেক্টর হারে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিলিটার পানিতে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের রোভরাল ২ গ্রাম বা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ব্যাভিস্টিন ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে মাটিসহ ভিজিয়ে দিতে হবে। বপনের আগে প্রতি কেজি বীজ ২-৩ গ্রাম প্রোভ্যাক্স বা কার্বেন্ডাজিম মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে।
জনাব মঞ্জুরুল, উপজেলা : মানিকছড়ি, জেলা : খাগড়াছড়ি
প্রশ্ন : সরিষা বীজ বপনের সময় ও বীজের হার সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : বপনের সময় : বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য ও জমির জো অবস্থা অনুসারে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, টরি-৭, কল্যানীয়া, সোনালী সরিষা, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ এর বীজ মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য কার্তিক মাস (অক্টোবর) পর্যন্ত বোনা যায়। রাই-৫ এবং দৌলত কার্তিক থেকে অগ্রহায়ন (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য ও জমির জো অবস্থা অনুসারে বারি সরিষা-১৩ জাতের বীজ কার্তিক মাসের ১ম সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) বপনের উপযুক্ত সময়।
বীজের হার : সরিষার জাত টরি-৭, কল্যানীয়া, সোনালী সরিষা, ধলি, বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ এর জন্য প্রতি হেক্টরে ৮-১০ কেজি বীজ লাগে। রাই ও দৌলত সরিষার জন্য প্রতি হেক্টরে ৭-৯ কেজি বীজের প্রয়োজন। বারি সরিষা-১৩ চাষের জন্য প্রতি হেক্টর জমিতে ৮ থেকে ১০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
জনাব সামাদ আলী, উপজেলা : ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা : ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : আমন ধানের বীজ সংগ্রহ করার জন্য কী করণীয় জানতে চাই।
উত্তর : ধান বীজ সংগ্রহ করার জন্য বীজ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে আদ্রতা শতকরা ১২ ভাগের নিচে আনতে হবে। পুষ্ট ধান বীজ কুলা দিয়ে ঝেড়ে বাছাই করতে হবে। বীজ রাখার জন্য ড্রাম, বিস্কুট বা কেরোসিনের টিন ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাটির পাত্র ব্যবহার করলে পাত্রের গায়ে দুবার আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। রোদে শুকানো বীজ ঠা-া করে পাত্রে ভরতে হবে। পুরো পাত্রটি বীজ দিয়ে ভরে রাখতে হবে। যদি বীজে পাত্র না ভরে তাহলে বীজের উপর কাগজ বিছিয়ে তার উপর শুকনো বালি দিয়ে পাত্র পরিপূর্ণ করতে হবে। পাত্রের মুখ ভালভাবে বন্ধ করতে হবে যেন বাতাস না ঢুকতে পারে। এবার এমন জায়গায় রাখতে হবে যেন পাত্রের তলা মাটির সংস্পর্শে না আসে। প্রতি টন ধানে ৩.২৫ কেজি নিম, নিশিন্দা বা বিশ কাটালি পাতার গুঁড়া মিশিয়ে গোলাজাত করলে পোকার আক্রমণ হয় না।
জনাব রফিকুল ইসলাম, উপজেলা : বাঘা, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : আখ চাষ করতে সারের পরিমাণ ও আন্তঃপরিচর্যা বিষয়ে জানতে চাই।
উত্তর : আখ চাষ করতে প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ১২০-১৫০ কেজি, টিএসপি ৮০-১১০ কেজি, এমওপি ১০০-১৪০ কেজি, জিপসাম ৫০-৬০ কেজি, জিংক সালফেট ১০-১৫ কেজি, ডলোচুন ১০০-১৫০ কেজি, জৈবসার ২-৩ টন প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও এমওপি সার ছাড়া অন্যান্য সব সার শেষ চাষের সময় মাটিয়ে মিশিয়ে দিতে হবে। অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি নালায় দিতে হবে। বাকি ইউরিয়া ও এমওপি চারা রোপণের পর কুঁশি গজানো পর্যায়ে (১২০-১৫০ দিন) উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। গাছ যাতে হেলে না পড়ে সেজন্য আখ গাছ বেঁধে দিতে হবে। গাছের বয়স ৭-৮ সপ্তাহ হলে প্রথমবার এবং ১২-১৪ সপ্তাহ হলে দ্বিতীয়বার মাটি উঠিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজন হলে বাঁশের সাহায্যে গাছে ঠেস দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনমতো আগাছা দমন ও সেচ দিতে হবে।
জনাব রাকিব, উপজেলা : বীরগঞ্জ, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : ফুলকপির পাতায় হালকা বাদামি থেকে ছাই রংয়ের দাগ দেখা যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : ফুলকপির পাতা ব্লাক রট রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত পাতায় হালকা বাদামি থেকে ধুসর ছাই রংয়ের দাগ দেখা যায়। ধীরে ধীরে দাগ বড় হয় ও মধ্য শিরার দিকে অগ্রসর হলে অনেকটা ইংরেজি ভি অক্ষরের মতো আকার ধারন করে। দাগের কিনারা হলুদ থাকে। ফুলকপি লাগানোর সময় রোগমুক্ত বীজ বা চারা ব্যবহার করতে হবে। বপনের পূর্বে ৫০ সে. তাপমাত্রার গরম পানিতে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। ফসলের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতে হবে। লাল মাটির ক্ষেত্রে ৩ বছর পর পর প্রতি শতকে চার কেজি হারে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে (মেনকোজেব+ মেটালেক্সিন) গ্রুপের রিডোমিল গোল্ড ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার ১৫ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যাবে না।
লেখক : তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল : aklimadae@gmail.com