কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ৯ জুন, ২০২৪ এ ১০:৪৮ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আষাঢ় সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ০৯-০৬-২০২৪
প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ আকলিমা খাতুন
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো: আমজাদ হোসেন, উপজেলা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : রোপা আমন ধানের বীজতলা তৈরি এবং সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : পরিমিত ও মধ্যম মাত্রার উর্বর মাটিতে বীজতলার জন্য কোন সার প্রয়োগ করতে হবে না। তবে নিম্ন, অতিনিম্ন বা অনুর্বর মাটির ক্ষেত্রে গোবর অথবা খামারজাত সার প্রতি শতকে ২ মণ হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। বীজতলায় চারা হলুদ হয়ে গেলে প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার চারা গজানোর ২ সপ্তাহ পর মাটিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া প্রয়োগের পরও বীজতলায় চারা হলুদ হয়ে গেলে প্রতি শতকে ৪০০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এর মতে উফশী জাতের আমনের উচ্চফলন পেতে বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) ২১ কেজি ইউরিয়া, ৭-১০ কেজি টিএসপি/ডিএপি ১৪ কেজি এমওপি ৮-১১ কেজি জিপসাম ১-২ কেজি জিংক সালফেট এবং জৈব সার ৭০০-৮০০ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের আগে জমি তৈরির চূড়ান্ত পর্যায় সমুদয় সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। জমি তৈরির সময় জিংক সালফেট না দিলে স্প্রে আকারে চিলেটেড জিংক ব্যবহার করা যায়। ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে দিতে হবে। জমি তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে বা চারা রোপণের ৭-১০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ২৫-৩০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন আগে তৃতীয় কিস্তির সার ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
ফারুক মিয়া, উপজেলা : শ্রীপুর, জেলা : গাজীপুর
প্রশ্ন : ক্ষিরা গাছের কচি পাতা ও ডগা পোকা আক্রমণ করে নষ্ট করে ফেলছে। করণীয় কী?
উত্তর : সাধারণত বিটল পোকার আক্রমণে এই সমস্যা হয়ে থাকে। বিটল পোকা দ্বারা আক্রান্ত হলে করণীয় হলো ক্ষেতের আশে পাশের আগাছা নষ্ট করা। হাতজাল দিয়ে পোকা ধরা ও মেরে ফেলা। পতার উপরে ছাই ছিটিয়ে সাময়িকভাবে দমন করা যায়। চারা বের হওয়ার পর থেকে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত মশারির জাল দিয়ে চারাগুলোকে ঢেকে রাখতে হবে। চারা বা গাছের মাদার চারিদিকে ২-৫ গ্রাম দানাদার কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের ওষুধ ১ মিলি, মিপসিন/সপসিন (আইসোপ্রোকার্ব) ২ গ্রাম একতারা (থায়োমোথোক্সাম) ১ গ্রাম, সেভিন (কার্বারিল) ২ গ্রাম মিশিয়ে ৮-১০ দিন পর পর তিনবার স্প্রে করতে হবে।
আব্দুল হাকিম, উপজেলা : পলাশবাড়ি, জেলা : গাইবান্ধা
প্রশ্ন : ডাঁটা গাছের কা-ে ক্ষতর মতো সৃষ্টি হচ্ছে এবং গাছ মারা যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি একটি ছত্রাকজনিত সমস্যা। এই রোগে আক্রমণের ফলে প্রথমে গাছের কা-ে লম্বাটে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পরে পুরো কা-ই এতে আক্রান্ত হয়ে ও গাছ মারা যায়। এই রোগের জন্য করণীয় হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা, পরিত্যক্ত অংশ নষ্ট বা পুড়ে ফেলা, রোগ প্রতিরোধ সম্পন্ন জাত ব্যবহার করা। বপনের আগে প্রোভেক্স ২.৫ গ্রাম বা ব্যাভিস্টিন-২ গ্রাম দিয়ে প্রতি কেজি বীজ শোধন করে নিতে হবে। রোগের আক্রমণ দেখা দিলে টিল্ট ২৫০ ইসি (প্রোপিকোনাজল) ০.৫ মিলি, অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউজি (কার্বেন্ডাজিম) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে এক সপ্তাহ পর পর ২-৩ বার স্প্রে করে দিতে হবে।
মো: নুরে আলম, উপজেলা : ঈশ্বরদী, জেলা : পাবনা
প্রশ্ন : জামরুল গাছের পাতায়, ফলে কাল ময়লার আস্তরণ জমা হচ্ছে, এ থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পেতে পারি?
উত্তর : এটি জামরুলের শুঁটিমোল্ড রোগ নামে পরিচিত। এই রোগের আক্রমণে পাতায় ফলে কা-ে কালো ময়লা জমে। খোসা পোকা, মিলিবাগ বা সাদা মাছির আক্রমণ এ রোগ ডেকে আনে। এই রোগে করণীয় হলো আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাঁটাই করে ধ্বংস করা। মিলিবাগ বা সাদা মাছির আক্রমণ এ রোগ ডেকে আনে তাই এদের দমনের জন্য এডমায়ার ২০০ এসএল (ইমিডাক্লোরপিড) ১ মিলি./লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে আট থেকে দশ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। টিল্ট ২৫০ ইসি প্রোপিকোনাজল) ১০ লিটার পানিতে ৫ মিলি. মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করতে হবে। বাগান অপরিচ্ছন্ন রাখা যাবে না। ফল সংগ্রহ শেষে গাছের মরা ডালপালা রোগ বা পোকা আক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করে পরিষ্কার করতে হবে।
সাকিল শরীফ, উপজেলা : চৌদ্দগ্রাম, জেলা : কুমিল্লা
প্রশ্ন : আমার ঢেঁড়সের সব পাতা হলুদ ও সবুজ রঙের ছোপ ছোপ দেখা যাচ্ছে এবং পাতার শিরাগুলো স্বচ্ছ ও হলুদ হয়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : এটি ঢেঁড়সের পাতার শিরা স্বচ্ছতা রোগ (ঠবরহ পষবধৎরহম ফরববধংব ড়ভ ষধফুং ভরহমবৎ ভাইরাস রোগ)। এই রোগের আক্রমণ হলে পাতা ও পাতার শিরাগুলো স্বচ্ছ ও হলুদ, সবুজ ছোপ ছোপ রঙের পাশাপাশি গাছের পাতাগুলো ছোট ও খর্বাকৃতি হয়ে যাবে। এই ভাইরাসের পোকা সাদা মাছির মাধ্যমে এই রোগটি ছড়ায়। বাহকপোকা (জ্যাসিড/সাদা মাছি) দমনের জন্য ইমিজক্লোরপিড গ্রুপের এডমায়ার ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার ১৫ দিনের মধ্যে সেই গাছের সবজি খাওয়া যাবে না এবং বাজারে বিক্রি করা যাবে না। এছাড়াও আক্রান্ত গাছ দেখামাত্র তুলে নষ্ট বা পুঁতে ফেলতে হবে, আক্রান্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ না করা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
সুমন আহম্মেদ, উপজেলা : জলঢাকা, জেলা : নীলফামারী
প্রশ্ন : আমার বেগুন গাছের ফল, কা- ও পাতায় কালো ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে, ফল পচে যাচ্ছে এবং গাছ মারা যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি বেগুনের ফল ও কা- পচা রোগ (ঋৎঁরঃ ধহফ ঝঃবসৎড়ঃ ড়ভ ইৎরহলধষ) এটি চযড়সড়ঢ়ংরং াবীধহং নাম ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। এই রোগের আক্রমণ হলে আক্রান্ত গাছের ডালে বা কা-ে ক্যাংকার সৃষ্টি হয়। ডাল চক্রাকারে পচে যায় ফলে গাছ মারা যায়। বেগুনের বীজ রোপণের পূর্বে বীজ কে শোধন করতে হবে (গরম পানি ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এ ১৫ মিনিট) অথবা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন+থিরাম গ্রুপের (প্রোভেক্স ২০০ঢ়ি) ২ গ্রাম/প্রতি কেজি বীজ শোধন করে নিতে হবে। মাঠে এই রোগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ব্যভিস্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাওয়া বা বাজারে বিক্রি করা যাবে না। এছাড়াও একই জমিতে প্রতি বছর বেগুন চাষ না করা এবং ফসল সংগ্রহ শেষে শুকনো ডাল, কা-, ফল ইত্যাদি সংগ্রহপূর্বক নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে।
রৌশন আলম, উপজেলা : ভুরুসমারী, জেলা : কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন : আমার আম গাছের শাখার অগ্রভাগের কিছু নিচে কালো দাগ দেখা যাচ্ছে। রোগটি প্রথমে কচি পাতা ও ডগায় শুরু হয় পরে আক্রান্ত ডাল শুকিয়ে ও সমস্ত পাতা ঝড়ে যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি আমের আগা মরা রোগ (সধহমড় ফরব-নধপশ) এটি ঈড়ষষবপঃড়ঃৎরপযঁস ঝঢ়. নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। এই রোগের আক্রমণ হলে আক্রান্ত গাছের কা- কেটে অনেক সময় হলুদ রঙের আঠা ঝরে। এই রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত ডগা কিছু সুস্থ অংশসহ কেটে ফেলতে হবে। কাটা অংশে বর্দ্দোপেস্ট (প্রতি লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম তুঁত ও ১০০ গ্রাম চুন) এর প্রলেপ দিতে হবে। এ ছাড়াও প্রতি লিটার পানিতে প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাক নাশক টিল্ট ০.৫ মিলি মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
মুরাদ হোসেন, উপজেলা : ফুলগাজী, জেলা : ফেণী
প্রশ্ন : আমার লিচু গাছের লিচুর বোঁটায় প্রথমে বাদামি বা কালো দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে ফলের খোসায় আক্রমণ করে এবং ফল দ্রুত পচে যায়। করণীয় কী?
উত্তর : এটি লিচু পচা রোগ (খরপযর ৎড়ঃ ফরংবধংব) । এই রোগটি উরঢ়ষড়ফরধ ংঢ়. নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। গাছ থেকে ফল পারার সময় যাতে আঘাত প্রাপ্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বৃষ্টির দিনে লিচু পারা যাবে না। লিচু পারার পর গরম পানিতে ১০ মিনিট ডুবিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। গাছে ফল থাকা অবস্থায় রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক ডায়থেন এম-৪৫ ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
মো: জাকির হোসেন, উপজেলা : বাকেরগঞ্জ, জেলা : বরিশাল।
প্রশ্ন : কাঁকরোল হলুদ হয়ে পচে ঝরে যাচ্ছে। কী করতে হবে?
উত্তর : মাছি পোকার আক্রমণে কাঁকরোল পচে ঝড়ে যায়। স্ত্রী মাছি কচি ফলের নিচের দিকে ওভিপজিটর ঢুকিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার স্থান থেকে পানির মতো তরল পদার্থ বেড়িয়ে আসে যা শুকিয়ে বাদামি রঙ ধারণ করে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাস খেতে শুরু করে এবং ফল সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। কচি ফল কাগজ বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। প্রথম ফুল আসা মাত্র ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের (রিপকর্ড) কীটনাশক ১ মিলি./লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করা যাবে না।
লেখক : তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল :aklimadae@gmail.com