কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৩ এ ০৪:৩৭ PM

প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন “দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে” বাস্তবায়নের রূপরেখা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪২৯ প্রকাশের তারিখ: ১২-০১-২০২৩

প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন “দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে” বাস্তবায়নের রূপরেখা
ড. শামীম আহমেদ
বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে আয়তনে ছোট্ট কিন্তু জনবহুল একটি দেশ এ কথা যেমন সত্য, তেমনি ফসল উৎপাদনে এক সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবেও বিশ্বব্যপী সমাদৃত। একবিংশ শতাব্দীর আজকে এই সময়ে দাড়িয়ে গোটা বিশ্ব ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। এর কারণ হিসেবে ইদানীং ঞযৎবব ‘ঈ’ কে অনেকেই দায়ী হিসেবে বিবেচিত বলে মনে করছেন। আর সেগুলো হলো ১. মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ২.জলবায়ু পরিবর্তন, ৩. কোভিড-১৯। মানব সভ্যতার উপর অতর্কিত করোনার নির্মম হামলা দুমড়ে-মচুড়ে দিয়েছে পৃথিবীটাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব গত কয়েকটি বছর ধরেই চলছে বিশ্বজুড়ে। দুই বছরের করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে চরম খাদ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠে ৯ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। ইউরোপের প্রায় সব দেশ, চীন, কানাডাসহ সব রাষ্ট্রেই মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। আরও বাড়বে বলে শঙ্কার কথা শোনাচ্ছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা। যার ফলে বিভিন্ন দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দুর্ভিক্ষও দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও)-র মতে, বিশ্বের ৪৫টি দেশে ঘাটতিজনিত মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে এশিয়া মহাদেশভুক্ত দেশ আছে ৯টি, যার মধ্যে বাংলাদেশসহ তিনটি দেশ দক্ষিণ এশিয়ার। এফএওর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরেই বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য উৎপাদন কমবে ১.৪ শতাংশ। শুধুমাত্র দক্ষিণ আমেরিকা ছাড়া বিশ্বের আর সব মহাদেশ বা অঞ্চলেই এবার খাদ্যশস্য উৎপাদন কমবে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকবে না। আর এই দিকগুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুশাসন প্রদান করেন সকল দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ‘দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’। প্রধানমন্ত্রীর এই অনুশাসন বাস্তবায়নে এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ ও কর্মসূচি কৃষিবান্ধব এই সরকারের সফল মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশে মোট ১ কোটি ৬১ লাখের মতো ফসলি জমির মধ্যে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ রয়েছে ৮৬ লাখ ২৯ হাজার হেক্টরের মতো। তন্মধ্যে আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজারের (সূত্র : কৃষি বর্ষগ্রন্থ ২০২০, ভূমি ব্যবহার জরিপ ২০১৯-২০)। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পরিমাণ আবাদযোগ্য পতিত জমি যদি আবাদের আওতায় আনা যায়, তাহলে আমাদের খাদ্য সংকট মোকাবেলায় যেমন ভূমিকা পালন করবে, তেমনি গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নে ফলপ্রসূ হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন- ‘গ্রামে গ্রামে বাড়ির পাশে বেগুন গাছ লাগিও, কয়টা মরিচ গাছ লাগিও, কয়টা লাউ গাছ ও কয়টা নারিকেলের চারা লাগিও। বাপ-মারে একটু সাহায্য কর। কয়টা মুরগি পালো, কয়টা হাঁস পালো। জাতীয় সম্পদ বাড়বে’। (বাণী চিরসবুজ, কৃষি মন্ত্রণালয়, জুন ২০২১, পৃষ্ঠা নং ১৪২)। বঙ্গবন্ধুর এই উক্তিই বলে দেয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই লালিত স্বপ্নকে বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব পালন করছেন তাঁর সুযোগ্য কন্যা।
অপরপক্ষে বাংলাদেশে প্রায় ২৫৩.৬০ লাখ বসতবাড়ি রয়েছে, যার পরিমাণ ৫.৪০ লাখ হেক্টর। দেশের বসতবাড়ির গড় আয়তন ০.০২ হেক্টর। কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৬৫.৬২ লাখ এবং আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ ২.২৩ লাখ হেক্টর। এই জমিগুলো আবাদের আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টিবাগান স্থাপন প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প কাজ করছে। প্রকল্পের আওতায় সকল শ্রেণির কৃষক-কৃষানি যাদের বসতভিটা অনাবাদি পড়ে আছে সেই সকল জমি পরিকল্পিত উপায়ে চাষাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে। তাছাড়া মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে গৃহহীনদের জন্য নির্মিত গৃহের বসতভিটায় পারিবারিক পুষ্টিবাগান স্থাপনের মাধ্যমে হতদরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রকল্পটি কাজ করছে। ৬,৮৩,৫৬০টি কৃষক পরিবার এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হবে এবং ৪৫৫৪টি ইউনিয়ন ও ৩৩০টি পৌরসভার প্রায় ৪১ লাখ কৃষক-কৃষানি পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। উল্লেখিত প্রকল্পটির মেয়াদকালে পারিবারিক সবজি পুষ্টিবাগান প্রদর্শনী স্থাপন করা হবে ৪,৮৮,৪০০টি, স্যাঁতসে্যঁতে জমিতে কচুজাতীয় সবজি চাষ প্রদর্শনী স্থাপন করা হবে ৭৩৮০টি এবং ছায়াযুক্ত স্থানে/বসতবাড়িতে আদা/হলুদ চাষ প্রদর্শনী স্থাপন করা হবে ৭৩৮০টি। সকল প্রদর্শনীর সফল বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের ৫,০৩,১৬০টি বসতবাড়ির অনাবাদি/পতিত জমি বছরব্যাপী সবজি চাষাবাদের আওতায় আসবে। আর এভাবেও প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনটি বাস্তব রূপ পাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নের আর একটি বড় ক্ষেত্র হলো আমাদের বনাঞ্চল ও তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাস্তুতন্ত্র। বাংলাদেশে পাহাড়ি বনের পরিমাণ প্রায় ১৩.৭৭ লাখ হেক্টর আর গ্রামীণ বন রয়েছে ৭.৭৪ লাখ হেক্টর। এ সমস্ত বনাঞ্চল থেকে বনজদ্রব্য আহরণের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো কাঠ (প্রায় ৩১.৩২ লাখ ঘনফুট), জ্বালানি (প্রায় ১৬.৮৪ ঘনফুট) ও গোলপাতা (৫৪৬.০২ লাখ কেজি) (সূত্র : বন অধিদপ্তর-২০২১)। এর বাইরেও পাহাড়ে অনেক পতিত জমি রয়েছে।      কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমীক্ষা বলছে, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান; এই তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত পাঁচ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। এই জমিগুলো কাজুবাদাম ও কফি চাষাবাদের উপযোগী। এ ছাড়া পাবর্ত্য জেলায় পাহাড়ে এরই মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছে আম্রপালি, কাটিমন আম, লিচু ও ড্রাগনের বাগান। এ ছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নের আরও বড় খাত হলো সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত পতিত জমি। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক, লাইব্রেরি, ধর্মীয় উপাসনালয়ের অব্যবহৃত জমি রয়েছে যেগুলো অনায়াসেই আবাদের আওতায় আনা যায়। বসতবাড়ির ছাদে বাগান করা হলেও বেশ জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি।
প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনটি বাস্তবায়নে অনুঘটক হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যে কাজগুলো চলমান তার মধ্যে রয়েছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বিশ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলভেদে ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে ধান কাটাসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদেরকে দেয়া হচ্ছে। এটি সারাবিশ্বে একটি বিরল ঘটনা। এ সমস্ত কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে বর্তমানে দেশের প্রায় শতভাগ কৃষি জমি যান্ত্রিক চাষাবাদের আওতায় আসবে। এবারে আমন মৌসুমে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অনেক শস্যকর্তন করা হয়েছে ফলে আগের চেয়ে শ্রম ও খরচ দুটোই কম লেগেছে।
গত ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৭ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে রবি/২০২০-২১ মৌসুমে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, শীতকালীন মুগ, পেঁয়াজ ও পরবর্তী খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মুগ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ সহায়তা প্রদান বাবদ কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ৮৬৪৩.০০ লাখ টাকার অর্থ ছাড় করা হয়। এই অর্থ দেশের ৬৪টি জেলায় ৮ লাখ উপকারভোগীর মাঝে উল্লেখিত ৯টি ফসল চাষের জন্য সহায়তা বিতরণ করা হয়। ফসলভেদে বিভিন্ন পরিমাণে বীজ সহায়তা, ডিএপি ও এমওপি সার সহায়তা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিটি কৃষকের মাঝে পৌঁছে যাচ্ছে।
পরবর্তীতে গত বছর একইভাবে এই প্রণোদনা ১৭ নভেম্বর, ২০২০ তারিখ রবি মৌসুমে বোরো ধানের হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহারকারীদের মাঝে ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চৌদ্দ লাখ সাতানব্বই হাজার কৃষকের মাঝে ৭৬ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার ৭৬০ টাকা, ২৩ নভেম্বর, ২০২০ তারিখ রবি মৌসুমে পেঁয়াজ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পঞ্চাশ হাজার  কৃষকের মাঝে ২৫ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২৫ মার্চ, ২০২১ তারিখ খরিপ-১ মৌসুমে আউশ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার কৃষকের মাঝে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার সার ও বীজ সহায়তা বিতরণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নে এটি বেশ গুরুত্ববহন করে।
কৃষি বাঁচলে দেশের মানুষ দুমুঠো খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারবে, যে কথাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন বর্তমান কৃষিবোন্ধব সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রায় সমস্ত জনসভা কিংবা রাষ্ট্রীয় বক্তৃতায়         কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। আর তাই প্রতিটি ইঞ্চি কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের বিষয়টিকে তিনি সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছে। গত অক্টোবর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে আইএমএফ বলেছে, ২০২৩ সালে একটি মারাত্মক মন্দার মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে যেতে পারে ২ দশমিক ৭ শতাংশে। এই সম্ভাবনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় এনে ‘রূপকল্প-২০৪১’-এর আলোকে জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৮, নিরাপদ খাদ্য আইন, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০ এবং ডেল্টা প্ল্যান-২১০০সহ উল্লেখযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে কৃষি গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ‘দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’ বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই।

লেখক : উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, কৃষি মন্ত্রণালয়, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১১১৭৪৩৪৫, ই-মেইল : ashamim.uni@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন