কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ এ ০৫:৫৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৫
প্রচলিত পেস্টিসাইডের তুলনায় ন্যানোপেস্টিসাইডের উপকারী প্রভাব
সায়মা তাহসীন নীরা১ তাসফিয়া হাসান তাবাসসুম২ ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম৩
বর্তমান বিশে^ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ফসলের ফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পোকামাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আগাছা, রোগজীবাণু, পোকামাকড় দ্বারা ফসলের গড় ক্ষতির হার প্রায় ২০-৪০%। এই বালাই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে কৃষকরা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকে, যা পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ। এই প্রেক্ষাপটে ন্যানো পেস্টিসাইড একটি টেকসই, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ন্যানোপেস্টিসাইড হলো এমন ধরনের বালাইনাশক যা ন্যানো স্কেলে (১-১০০ ন্যানোমিটার) কণার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। এতে কার্যকর উপাদানকে ছোট কণায় রুপান্তর করে নিয়ন্ত্রণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রয়োগ সম্ভব হয়। ন্যানোপেস্টিসাইড তৈরি হয় বিভিন্ন ন্যানোম্যাটেরিয়াল যেমন- ন্যানোসিলিকা, ন্যানোকপার, ন্যানোজিঙ্ক ন্যানোকার্বন ইত্যাদি ব্যবহার করে। এগুলো ফসলের নির্দিষ্ট অংশে পৌঁছে ধীরে ধীরে কাজ করে। প্রচলিত পেস্টিসাইডের অতিরিক্ত ব্যবহার পোকামাকড়ের জিনগত গঠনে পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের মাঝে পেস্টিসাইড প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ফলে অধিকাংশ পেস্টিসাইড বাতাসে উড়ে গিয়ে অপচয় হয়ে যায় এবং পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ন্যানোপেস্টিসাইড একটি বিকল্প হিসেবে উদ্ভাবন করা হয়েছে যেখানে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধাপে ধাপে পেস্টিসাইড নিঃসরণের মাধ্যমে কার্যকর রোগ দমন ব্যবস্থাপনার ফলে পরিবেশ দূষণ সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে।
ন্যানোপেস্টিসাইডকে প্রধানত দুটি মূল শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। সেগুলো হলো ক্যারিয়ার-ফ্রি এবং ক্যারিয়ারভিত্তিক। ক্যারিয়ার-ফ্রি ন্যানোপেস্টিসাইডের ক্ষেত্রে সরাসরি ন্যানোম্যাটেরিয়ালকেই সক্রিয় উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ন্যানোপেস্টিসাইডে সক্রিয় উপাদানটি নিজেই ন্যানোস্কেল আকারে থাকে এবং আলাদা করে কোনো ক্যারিয়ার উপাদান থাকে না (যেমন-সিলভার (অম), কপার (ঈঁ), টাইটেনিয়াম, অক্সাইড (ঞরঙ২)। অপরদিকে, ক্যারিয়ারভিত্তিক ন্যানোপেস্টিসাইড এ সক্রিয় উপাদানটি একটি ন্যানো ক্যারিয়ারের ভেতর আবদ্ধ থাকে। উদাহরণস্বরূপ পলিমারিক ন্যানোপার্টিকেল, লিপোজোম, সিলিকা, ক্লেভিত্তিক ন্যানো উপাদান ব্যবহার করে ন্যানোপেস্টিসাইড প্রস্তুত করা যায়।
ন্যানোপেস্টিসাইডের ফর্মুলেশন
মাইক্রোইমালশন, ন্যানো ইমালশন এবং ন্যানোডিসপারশন হলো পেস্টিসাইডের নতুন ধরনের ন্যানোফরমুলেশন। মাইক্রোইমালশন হলো এমন এক ধরনের পানিভিত্তিক ফর্মুলেশন যার ড্রপলেটের আকার ৫০ ন্যানোমিটারের কম এবং তেলের মধ্যে দ্রবীভূত সক্রিয় উপাদান সার্ফ্যাকট্যান্ট ও কো-সার্ফ্যাকট্যান্ট থাকে। যেখানে মাইক্রোইমালশনে প্রায় ২০% সার্ফ্যাকট্যান্ট ব্যবহৃত হয়। ন্যানোইমালশন তুলনামূলক কম (৫-১০%) সার্ফ্যাকট্যান্ট ব্যবহার করা হয়। ন্যানোডিসপারশন হলো এমন একটি তরল মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা ন্যানোক্রিস্টাল। ন্যানোডিসপারশন পানিতে অদ্রবণীয় সক্রিয় উপাদানে দ্রাব্যতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ধাতু এবং ধাতব অক্সাইডের ন্যানোপার্টিকেল উদ্ভিদের ক্ষতিকর রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সিলভার ন্যানোপার্টিকেলস (অমঘচং) হলো সবচেয়ে সাধারণভাবে ব্যবহৃত জীবাণুনাশক উপাদান বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সিলিকা-সিলভার ন্যানোপার্টিকল ব্যবহার করলে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি। রাইজোকটোনিয়া সোলানি, যা ধানের শিথ ব্লাইট রোগের জন্য দায়ী সেটি ৪-৮ ন্যানোমিটার আকারের (অমঘচং) ব্যবহারে দমন হয়। জিঙ্ক ও টাইটেনিয়াম ড্রাই-অক্সাইডের যৌগিক ন্যানোপার্টিকেল (ঞরঙ২ঘচং/তহ) নতুন প্রজাতির ঢধহঃযড়সড়হধং ব্যাকটেরিয়া যা গোলাপের পাতা দাগ রোগ সৃষ্টি করে তার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমানিত হয়ে ঢধহঃযড়সড়হধং ধীড়হড়ঢ়ড়ফরং ঢ়া. চঁহরপধব ডালিম গাছে ব্লাইট রোগ সৃষ্টি করে, যা কপার ন্যানোপার্টিকেলস ০.২ ঢ়ঢ়স মাত্রায় প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দশগুণ বেশি কার্যকর। ন্যানো-সালফার পাউডারি মিলডিউ দমনে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া ন্যানোসিলভার আলুর লেট ব্লাইট (ঢ়যুঃড়ঢ়যঃযড়ৎধ রহভবংঃধহং) রোগ কমাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
প্রচলিত পেস্টিসাইডের সাথে ন্যানোপেস্টিসাইডের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ন্যানোপার্টিকেলের আকার ১-১০০ ন্যানোমিটারের মধ্যে হওয়ায় এটি সহজে গাছের টিস্যুতে প্রবেশ করতে পারে এবং প্রচলিত পেস্টিসাইডের তুলনায় দ্রুত কাজ করতে পারে। কিছু ন্যানোপেস্টিসাইড সরাসরি রোগজীবাণুর কোষঝিল্লি ভেঙে দেয়। প্রচলিত বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পানি ও মাটিকে দূষিত করে এবং খাদ্যশস্যে জমা হয়। ন্যানোপেস্টিসাইড কম ডোজে কার্যকর হওয়ায় পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি অনেক কম। এ ছাড়া এটি গাছের বৃদ্ধি এবং উৎপাদনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেহেতু ন্যানোপেস্টিসাইড কম মাত্রায় ব্যবহৃত হয়, কার্যকরভাবে রোগ দমন করে এবং পরিবেশে অবশিষ্টাংশ রাখে না, ফলে এটি টেকসই কৃষি বাস্তবায়নের জন্য অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে।
ন্যানোপেস্টিসাইড ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ন্যানোকণার গবেষণায় সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কিছু ন্যানোকণা মিউটেশন করতে সক্ষম যা ন্যানো নন-টার্গেটেড জীবের প্রতি বিষাক্ততা তৈরি করতে পারে; কৃষিতে ন্যানোকণা ব্যবহারের যথাযথ আইন ও নীতির অভাব রয়েছে; কিছু ন্যানোকণার পেটেন্ট রয়েছে, যার জন্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সাধারণত মাটি ও পানিতে ন্যানোপার্টিকেল দীর্ঘদিন থেকে গেলে এগুলো নরড়ধপপঁসঁষধঃরড়হ ঘটাতে পারে, যা উদ্ভিদ, অণুজীব, জলজ প্রাণী এমনকি মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। মাটির উপকারী অণুজীব যেমন: নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়া ন্যানোপেস্টিসাইডের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাটির উর্বরতা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া স্প্রে করার সময় অতি ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ভেসে মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। তবে ন্যানোপেস্টিসাইড ব্যবহারে যেহেতু প্রচলিত পেস্টিসাইডের তুলনায় উপকারী প্রভাব তুলনামূলক অনেক বেশি। ফলে বায়োসেফটি স্টাডি জোরদারকরণের মাধ্যমে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি। ন্যানোপেস্টিসাইড ব্যবহারে ও কঠোর নীতিমালা ও ডোজ নির্দেশনা মেনে চলা উচিত যাতে অপ্রয়োজনীয় ছড়িয়ে পড়া রোধ হয়। পরিবেশবান্ধব ক্যারিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কণাগুলো সহজে ভেঙ্গে যায় এবং জমা হয়ে থাকার ঝুঁকি কমে যায়। তবে কৃষক ও ব্যবহারকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হলে তারা সচেতনভাবে সুষম মাত্রায় ও সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে পারবেন।
ন্যানোপেস্টিসাইড এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
ন্যানোপেস্টিসাইড ব্যবহারের সরকারি নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিভিন্ন গবেষকদের ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ন্যানোপেস্টিসাইড তৈরি বিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে, কৃষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে, প্রচলিত পেস্টিসাইড ব্যবহারের ঝুঁকিগুলো কৃষকদের অবহিতকরণ এবং ন্যানোপেস্টিসাইড ব্যবহারের সুফলগুলো তুলে ধরতে হবে; মাঠপর্যায়ে ব্যবহারযোগ্যতা মূল্যায়ন করা অর্থাৎ প্রচলিত পণ্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করে ন্যানোপেস্টিসাইডের বাস্তব প্রভাব বোঝা।
পরিশেষে বলা যায়, প্রচলিত পেস্টিসাইড কৃষি উৎপাদনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখলেও এর অনেক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মোকাবিলায় ন্যানো প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ন্যানোপেস্টিসাইডের ব্যবহার কৃষক পর্যায়ে বাড়ানোর জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন। এর সঠিক ব্যবহার করতে পারলে দেশের সর্বস্তরের জনগণ উপকৃত হবে। তাই উপযুক্ত নীতিমালা নির্ধারণ করে আমরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং অধিক ফলনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।
লেখক : ১-২ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৩প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর-১৭০১। মোবাইল : ০১৩১৪৪৯৫৭৭০,