কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ০৪:৩০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আশ্বিন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৯-২০২৫
পোল্ট্রি খামারে ইঁদুরের প্রভাব
ও দমন ব্যবস্থাপনা
মোঃ ফজলুল করিম
পোল্ট্রি পরিবেশে পরজীবী ও মাটি উপরে অবস্থানকারী উভয় ধরনের বালাই দেখা যায়। বহিঃপরজীবী জীব হলো মাইট, লাইস, ফ্লি ও টিকস এবং বহিভাগে অবস্থানকারী জীব হলো বিটল, ফ্লাইস, মথ, তেলেপোকাও ইঁদুর। মুরগির খামারের কাচা ভিটি, নোংরা পরিবেশ, নিকটস্থ ফসলের মাঠ ইত্যাদির কারণে এ সব জীব মুরগির খামারের স্থানান্তরিত হয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি করে থাকে। এসব বালাইয়ের মধ্যে ইঁদুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। ইঁদুর গর্ত তৈরি ও কাটাকুটি স্বভাবের মাধ্যমে মুরগির খামারের কাঠামো ক্ষতি করে। এরা ডিম, মুরগির বাচ্চা ও মুরগির খাবার খেয়ে ক্ষতি করে, তাছাড়া ইঁদুরের মলমূত্র ও পশম মুরগির খাবারের সাথে মিশে পরোক্ষভাবে ক্ষতি করে। তদুপরি মুরগি ও মুরগির বাচ্চা এবং খামারের কর্মীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগ বিস্তার করে। ইঁদুর মুরগির খাবার খেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি করে। ১০০টি ইঁদুর বছরে ১ টন খাদ্য খেয়ে ফেলতে পারে। তাছাড়া ইঁদুর যতটুকু খায় তার ১০ গুণ খাবার ইঁদুরের বিষ্ঠাজনিত কলুষের কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়।
মুরগির খামারে ইঁদুরের সমস্যা
ইঁদুরের প্রজাতিভেদে সঠিকভাবে কার্যকরী দমন ব্যবস্থা গ্রহণ বা পরিকল্পনা করতে বিভিন্ন প্রজাতির ইঁদুরের জীবন বৃত্তান্ত জানা জরুরি। এরা হলো মাঠের কালো ইঁদুর, গেছো ইঁদুর ও নেংটি ইঁদুর।
কালো ইঁদুর
ছোট ব্যান্ডিকুট/কালো ইঁদুর ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু শহরের সব এলাকায় এদের দেখা যায়। এরা মোটাসোটা আকারের ইঁদুর। এদের শরীরের ওজন ২০০-৩০০ গ্রাম এদের মাথা গোলকার ও চওড়া। লেজ, মাথা ও শরীরের তুলনায় ছোট এবং পৃষ্ঠ দেশের রঙ বাদামি ও মোটা পশমযুক্ত। এরা মুরগির খামারে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতি করে।
গেছো ইঁদুর
গেছো ইঁদুর ছোট এবং এদের ওজন ৮০-১২০ গ্রাম। এদের লেজ দুই রঙওয়ালা, পেঁচানো, লম্বা এবং মাথা ও শরীরের তুলনায় অনেক বড়। এরা সাধারণত বসতবাড়ি ও মুরগির খামারের ওপরের অংশে বাস করে, অনেক সময় পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপেও এরা বাস করে।
ঘরের নেংটি ইঁদুর
নেংটি ইঁদুর ছোট আকারের ইঁদুর। এদের ওজন প্রায় ১৫ গ্রাম, নাক কিছুটা সরু, লেজ পশমহীন কিন্তু বৃত্তাকার আঁশযুক্ত। এরা মুরগির খামারে খাবার খেয়ে, ডিম নষ্ট করে এবং বিভিন্ন রোগ ছড়ায়।
মুরগির খামারের ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি
মুরগির খাবারের ক্ষতি : ইঁদুর মুরগির খাবার খায় এবং খাবার নষ্ট করে এবং যে পরিমাণ খায় তার চেয়ে বেশি নষ্ট করে থাকে। ইঁদুর তার শরীরের ওজনের তুলনায় ১০ শতাংশ খাবার খায় এবং প্রতিদিন ২৫ গ্রাম এবং বছরের ৯.১ কেজি খাবার খায়, গড়ে প্রতি দিন একটি মুরগির খামারে ৮.৬ গ্রাম মুরগি খাবার খেয়ে থাকে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে যে, মুরগির খামারে প্রতি দিন প্রায় ২-৫০ কেজি খাবার খেয়ে এবং খাবারে ব্যাগ কেটে নষ্ট করে থাকে। ইঁদুরের মলমূত্র ও পশমের মাধ্যমে মুরগির খাবার দূষিত করে এবং এর পরিমাণ প্রায় ০.৪- ৩.৩%। ইঁদুর দ্বারা মুরগির খাবার নষ্ট একটি অর্থনৈতিক ক্ষতি যার পরিমাণ চলমান খরচের প্রায় ৫০-৭৫%।
মুরগির ডিমের ক্ষতি : বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, ইঁদুর দ্বারা ডিমের ক্ষতির পরিমাণ ০৫% এবং তা ১০% পর্যন্ত হতে পারে যদি সংরক্ষণের অবস্থা দুর্বল থাকে। ডিমের প্লাস্টিক ট্রে ও ইঁদুর কেটে নষ্ট করে। ইঁদুর প্রায়ই ৩০ দিন বয়স পর্যন্ত বাচ্চাকে আক্রমণ করে এবং প্রায় একটি খামারে ৫.৯% বাচ্চাকে মেরে ফেলে। ইঁদুর প্রায়ই মুরগিকে ভয় দেখায় ও কামড় দিয়ে থাকে এবং মুরগির ডিম পাড়া, বৃদ্ধি ও খাদ্য গ্রহণে প্রভাব ফেলে থাকে।
অবকাঠামোর ক্ষতি : খামারের ঘর ও যন্ত্রপাতির নষ্ট করার মাধ্যমে বাস্তবিক পক্ষে ক্ষতি অনেক ব্যয়বহুল। ইঁদুরের কাটাকুটি স্বভাবের জন্য মুরগির ঘর ও দেয়াল দুর্বল হতে পারে। তারা খাবারের পাত্র, পানির পাত্র কেটে নষ্ট করে। মুরগির খামারের মেঝেতে প্রচুর গর্ত তৈরি করে যা বর্ষাকালে ঘরে পানি ঢুকে এবং অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পরে। ইউএসএইডের হিসাব মতে, প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা নষ্ট খাবার ঘর ও যন্ত্রপাতির ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ ইউএস ডলার (প্রায় ৩ হাজার টাকা)। ইঁদুর বৈদ্যুতিক ইনসুলেটর ও তার কেটে শর্টসার্কিট সৃষ্টির মাধ্যমে খামারের ক্ষতি করে থাকে।
বিভিন্ন রোগের বাহক ও সংরক্ষক : ইঁদুর প্রায় ৬০ ধরনের বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে থাকে যা দ্বারা মুরগির খামার কর্মী আক্রান্ত হয়ে থাকে। ইঁদুর বিভিন্ন মুরগির রোগ যেমন- সালমোনেলোসিস, কলিব্যক্সিলোসিস, মাইকোপ্লাজমেসিস ইত্যাদি, ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত রোগগুলো হলো লেপটোসপাইরোস, টিউবারকোলোসিস, ফাউল কলেরা, ফাউল টাইফয়েড, এভিয়ান প্যারাটাইফয়েড, ভাইরাল ডিজিজ, ক্যাটল ডিজিজ এবং প্রটোজোয়ান সংক্রমণ যেমন টক্সোপ্লাজমোসিস, কক্সিডোসিস এসব রোগ ছড়িয়ে থাকে। সবগুলো রোগ মুরগির ডিম, মাংস উৎপাদনের মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে এ রোগ গুলোর মধ্যে সালমোনেলা ও ফাউল কলেরা মুরগির খামার উৎপাদনকারীদের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। সালমোনেলা এমন একটি ক্ষতিকর রোগ যা মুরগির এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তর হয়ে থাকে। কাজেই ইঁদুর দ্বারা খাবার সংক্রমণ হওয়া কমানো এবং ইঁদুরের সংখ্যা কমানোই হল মুরগির খামারির প্রধান কৌশল।
মুরগির খামারে ইঁদুর ধরার জন্য বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলো, গ্লু-ট্র্যাপ, মরণফাঁদ, জীবন্তফাঁদ এসব। সট্র্যাপ, গ্লু-বোর্ড সাধারণ কাডবোর্ড শিট বা প্লাস্টিক শিটের হয়ে থাকে যেখানে উচ্চ মাত্রার আঠা ব্যবহার করা হয় সেখানে ইঁদুর আটকে থাকে।
১.তাৎক্ষণিক বা তীব্র ইঁদুরনাশক যেমন- অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড, জিংক ফসফাইড ইত্যাদি।
২. দীর্ঘমেয়াদি ইঁদুরনাশক যেমন- ওয়ারফারিন, ব্রোমাডিয়লন ইত্যাদি।
ক. তীব্র/তাৎক্ষণিক ইঁদুরনাশক
তাৎক্ষণিক ইঁদুরনাশক দ্রুত কার্যকর এবং সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইঁদুর মারা যায়। দুটি অজৈব রাসায়নিক দ্রব্য হলো বেরিয়াম কার্বোনেট এবং জিঙ্ক ফসফাইড। তাদের মধ্যে ফসফাইড বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত তীব্র ইঁদুরনাশক। বিষটোপ সাবধানে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে যেন মুরগি খেতে না পারে।
খ. দীর্ঘস্থায়ী ইঁদুরনাশক
আস্তে আস্তে কার্যকরী সব ইঁদুরনাশক দীর্ঘমেয়াদি বিষের অন্তর্ভুক্ত। যা প্রাথমিকভাবে রক্ত জমাট বাধতে বাধা সৃষ্টি করে। এর সুবিধা হল এ যে এ বিষ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনকারী প্রজাতির ওপর ভালোভাবে কাজ করে মেরে ফেলে এবং পরিমাণ ও কম লাগে।
আমাদের করণীয়
খামারের আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খামারে ইঁদুর প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিতে হবে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। খামারের ঝোপ-ঝাড়-আগাছা, ছাদ ঘেঁষে উঠা গাছ বা লতাজাতীয় গাছ পরিষ্কার করতে হবে। ফিড সামগ্রী ভালোভাবে মুখ বন্ধ করে ইঁদুরের সংস্পর্শে আসা খাদ্য বা পানীয় ফেলে দিতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় ইঁদুরের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেলে সেখানে জুতা পরতে হবে এবং সেখানে শোয়া বা ঘুমানো যাবে না। যেখানে সারা বছর খাদ্য, বাসস্থান ও পানির নিশ্চয়তা প্রদানের স্থায়ী পরিবেশ রয়েছে সেখানে ইঁদুরের সংখ্যা বেশি। ড্রেন ও ছিদ্র পাইপ ইঁদুরকে পানির নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। পোল্ট্রি খামারে সারা বছর ইঁদুর দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। খামারে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে।
আন্তঃপ্রতিষ্ঠান যোগাযোগ বৃদ্ধি
সরকারের জনস্বাস্থ্য বিভাগ জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত রোগের অতন্ত্র জরিপ, প্রাদুর্ভাব অনুসন্ধান ও গবেষণা কাজ পরিচালনা করে। অপরদিকে প্রাণী চিকিৎসা বিষয়ে এ দেশে অনেকগুলো শিক্ষা-গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান। জনস্বাস্থ্য ও কৃষিতে অনিষ্টকারী ক্ষতিকর এ প্রাণী নিয়ন্ত্রণে কৃষি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা-গবেষণা-সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষের চিকিৎসক, প্রাণী চিকিৎসক এবং কৃষি বিশেষজ্ঞ/সম্প্রসারণবিদদের মাঝে আন্তঃযোগাযোগ বা জ্ঞান বিনিময়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে। মহামারি বিষয়ে গবেষণাসহ অংশীজনের মাঝে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
ইঁদুরের সামাজিক সমস্যা। কোনো ব্যক্তি বা সরকারের পক্ষে স্থায়ীভাবে সমাধান করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা মডেল সব জেলায় গ্রহণ করা যেতে পারে। খামারিদের জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে খামার ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, ইঁদুরবাহিত রোগ জীবাণু রোধ, পরিবেশের দূষণ কমানো এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইঁদুর দমন প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, কারণ ইঁদুর দমন প্রযুক্তি অন্যান্য বালাই ব্যবস্থাপনা হতে সম্পূর্ণ বিভন্ন রকমের।
লেখক : অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, গাইবান্ধ্।া মোবাইল : ০১৯৫৯৬৪৬৯০৯,