কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৫:৩৯ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
পেঁপে উচ্চমূল্যেরফসল চাষাবাদ
নাহিদ বিন রফিক
দেশি-বিদেশি ফলের মধ্যে পেঁপে অন্যতম। অত্যন্ত সুস্বাদুু এই ফল স্বল্পমেয়াদি। কাঁচা অবস্থায় সবজি আর পরিপক্ব হলে ফল হিসেবে ব্যবহার হয়। বারোমাসি এই ফলের উপকারের কথা কম বেশি জানা থাকলেও পুরোগুণের কথা আমাদের অনেকেরই অজানা। পাকা পেঁপে রোগীর পথ্য। পাকা পেঁপের জুস খেতে বেশ। কাঁচা পেঁপে দিয়ে তৈরি করা যায় সালাদ। এতে সাইমোপ্যাপেইন এবং প্যাপেইন নামক এনজাইম থাকে। এ ছাড়া অ্যান্টি-অক্সিডেন্টও রয়েছে। তবে ডায়াবেটিস রোগীর পাকা ফল খাওয়া ঠিক নয়। তাদের জন্য কাঁচা পেঁপে। নিয়মিত কাঁচা পেঁপে খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ হ্রাস পায়। পাশাপাশি শরীরে ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। পেঁপে গাছ অল্প জায়গা দখল করে। তাই বাড়ির উঠানে একটু জায়গা থাকলেই দু’ চারটি গাছ অনায়াসেই লাগানো যায়।
পুষ্টিগুণ : পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা ফলে ৮ হাজার ১ শত মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন আছে। পাশাপাশি ভিটামিন সি রয়েছে ৫৭ মিলিগ্রাম। অন্য পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ভিটামিন বি ০.১১ মিলিগ্রাম, আমিষ ১.৯ গ্রাম, শর্করা ৮.৩ গ্রাম, লৌহ ০.৫ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩১ মিলিগ্রাম, খনিজ পদার্থ ০.৫ গ্রাম, চর্বি ০.২ গ্রাম এবং খাদ্যশক্তি আছে ৪২ কিলোক্যালরি। কাঁচা পেঁপেতেও যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টিগুণ রয়েছে।
ভেষজগুণ : পেঁেপ ভেষজগুণে ভরপুর। ভেষজবিদদের মতে, পেঁেপ শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল কমায়। হার্টকে সচল রাখে। ওজন কমায়। পাশাপাশি হজমশক্তি বাড়ায়। ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। হাড় মজবুত করে। মুখে রুচি আনে। বয়সের ছাপ এবং মানসিক চাপ কমায়।
জাত : চাষের জন্য পেঁেপর জাত নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিক ফলন পেতে অবশ্যই উন্নত জাত বেছে নিতে হবে। এসব জাতের মধ্যে বারি পেঁপে-১, ইন্ডিয়ান শাহী, ইন্ডিয়ান কাশ্মিরী, ইন্ডিয়ান মাদ্রাজি, জায়ান্ট পার্ল, বাবু, সিনতা, জান্নাত, পুসা বামন, সূর্যোদয় একক, কুর্গ মধু শিশির, রেড লেডি, টপ লেডি, সুইট লেডি অন্যতম।
বীজ শোধন : বীজবাহিত রোগ প্রতিরোধে বপনের আগে কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অটোস্টিন ৫০ দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
জমির ধরন : চাষের জন্য উঁচু এবং মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে। তবে নিচু জমি হলে অবশ্যই মাটি কেটে এমন উঁচু করে নিতে হবে যেন বন্যায় কিংবা বর্ষায় পানি প্লাবিত না হয়। তাই পানি নিষ্কাশনের জন্য অবশ্যই নালার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বীজ ও চারা রোপণ : মূল জমিতে চারা লাগানোর আগে পলিব্যাগে চারা তৈরি করে নেয়া উত্তম। আর এ কাজের উপযুক্ত সময় হচ্ছে আশি^ন এবং পৌষ মাস। যদিও অতি ঠা-া এবং অতি বর্ষণের সময় বাদে বছরের অন্য যেকোনো সময় পেঁপের চারা রোপণ করা যায়। বেডে মাদা তৈরি করে চারা লাগাতে হবে। দুই বেডের মাঝে অবশ্যই নালা রাখা চাই। চারা হতে চারার দূরত্ব হবে ২ থেকে ২.৫ মিটার। রোপণের ১৫-২০ দিন আগে গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা হবে ৬০ সেন্টিমিটার করে। চারা উৎপাদনে ব্যবহৃত পলিব্যাগের আকার (১৫ী১০) সেন্টিমিটার হলে ভালো হয়। এর তলদেশে ৩-৪টি ছিদ্র রাখতে হবে। মাটি, বালু এবং পচা গোবরের সমানুপাতিক মিশ্রণে ভরাটকৃত প্রতিটি পলিব্যাগে ৩টি করে বীজ ত্রিভুজ আকারে বপন করতে হবে। চারার বয়স ৪০-৫০ দিন হলে মূল জমিতে লাগাতে হয়। তখন খেয়াল রাখতে হবে চারা বেষ্টিত মাটির বলটি যেন ভেঙে না যায়। এ ছাড়া চারার শিকড়ও ক্ষতি না হয়। গাছে ফুল আসলে একটি স্ত্রী গাছ রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হবে। পরাগায়নে অসুবিধা যেন না হয় সেজন্য বাগানে প্রতি ১০-১২টি স্ত্রী গাছের জন্য ১টি করে পুরুষ গাছ রাখতে হবে।
সার প্রয়োগ : চারা লাগানোর আগে এবং পরে সার দিতে হয়। গর্তপ্রতি সারের পরিমাণ হলো: জৈবসার ২৫ কেজি, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, জিপসাম ২৫০ গ্রাম, বরিক এসিড ২০ গ্রাম এবং জিংক সালফেট ২০ গ্রাম। চারা রোপণের পর নতুন পাতা বের হওয়া হতে প্রতি এক মাস পরপর ৫০ গ্রাম করে ইউরিয়া এবং এমওপি সার প্রয়োগ করা জরুরি। ফুল আসলে এর পরিমাণ হবে দ্বিগুণ।
সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা : চারা লাগানো এবং সার দেয়ার পর প্রয়োজনমতো সেচ দিতে হবে। এ কাজ শেষ বিকেলে করতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে প্রতি ১০-১২ দিন পরপর হালকা পানি দিতে হবে। বর্ষার সময় জমিতে পানি জমে যেন না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। পানি জমলে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা, পেঁপে গাছ জলাবদ্ধতা মোটেও সহ্য করতে পারে না।
আন্তঃপরিচর্যা : অন্যান্য ফসলের ন্যায় পেঁপে বাগান আগাছামুক্ত রাখা চাই। গাছ যেন হেলে না পড়ে কিংবা ঝড়ের কারণে ভেঙে না যায় সেজন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। গাছের একটি বোঁটায় একাধিক ফল ধরলে একটি রেখে বাকিগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হয়। এতে গাছে ধরা ফলগুলো আকারে বড় হবে।
সাথী ফসল আবাদ : বাণিজ্যিকভাবে ফসল আবাদে দরকার জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার। তাই পেঁপে গাছ বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত জমিতে সাথী ফসল চাষ করা যায়। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে শীতে এর উপযোগিতা বেশি। তাই লালশাক, পালংশাক, বাটিশাক, ধনেপাতা, লেটুস এ জাতীয় শাক চাষ করা যেতে পারে। তবে বেগুন, টমেটো এবং কপিজাতীয় সবজি আবাদ করা ঠিক নয়। কেননা এসব সবজিতে জাবপোকার আক্রমণ হতে পারে, যা পরবর্তীতে বাগানে ভাইরাসজনিত রোগ বিস্তারে আশঙ্কা থাকবে।
বালাই ব্যবস্থাপনা
বালাই যেকোনো ফসলের অন্তরায়। এর মধ্যে পোকার আক্রমণে পেঁপে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন- মিলিবাগ। তবে ভাইরাস রোগের জীবাণু বহনকারী জাবপোকা আর সাদামাছি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ভাইরাস জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয় আর কিছু আছে কৃমির সাহায্যে ছড়ায়। তবে ভাইরাসজনিত রোগের কোনো প্রতিকার নেই। প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য জীবাণু বহনকারী পোকাকে ধ্বংস করলে ফসলকে রক্ষা করা সম্ভব। পেঁপের বিভিন্ন রোগের মধ্যে চারা ঢলে পড়া, অ্যানথ্রাকনোজ, উইল্টিং, শিকড় গিঁট, পাতা কোঁকড়ানো, মোজাইক অন্যতম। এসব বালাই দমনের জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নেওয়া প্রয়োজন।
ফসল সংগ্রহ এবং ফলন : স্বাভাবিকভাবেই পেঁপের সবজি ও ফল সংগ্রহের ভিন্নতা আছে। উৎপাদিত ফসলে যখন জলীয়ভাব ধারণ করবে, একই সাথে ত্বকের রঙ হালকা হয়ে আসবে তখনি সবজি সংগ্রহ করতে হবে। আর ফল হিসেবে তখনি সংগ্রহ করা উত্তম, যখন হালকা হলুদ রঙ ধারণ করে। ইনব্রিড এবং হাইব্রিড পেঁপের জাতভেদে হেক্টরপ্রতি ফলন ৪০-৮০ টন।
সংরক্ষণ : স্বাভাবিকভাবে বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় পেঁপে সংরক্ষণ করতে হবে। মাটিতে চটের বস্তা বিছিয়ে এর ওপর পেঁপে রাখলে ২-৩ দিন ভালো থাকে। পাকা পেঁপে কেটে বেশিক্ষণ রাখতে নেই। এতে পুষ্টির অপচয় হয়।
উন্নতমানের ইনব্রিড এবং হাইব্রিড জাত ব্যবহার, সুষ্ঠু সার প্রয়োগ, প্রয়োজনীয় সেচ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আর সময়মতো পরিচর্যার মাধ্যমে পেঁপের উচ্চফলন পাওয়া সম্ভব।
লেখক : টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বরিশাল;
মোবাইল : ০১৭১৫৪৫২০২৬,