কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০২৫ এ ০৯:০১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ১৯-০৩-২০২৫
পরিবেশ সুরক্ষা ও পানি সাশ্রয়ে
এডব্লিউডি সেচ পদ্ধতি
ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। আউশ, আমন, বোরো মৌসুমে আমাদের দেশে ধান চাষ হলেও বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ধান চাষ হয়ে থাকে। ফলনও অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে বোরো মৌসুমে বেশি। ধান চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বোরো মৌসুম বৃষ্টিহীন বিধায় সেচের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আমাদের দেশে বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাছাড়া ধান উৎপাদনে যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন তার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি পরিমাণ পানি অপচয় হচ্ছে। ফলে একদিকে ফসল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে ও অন্যদিকে দিন দিন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে ভবিষ্যৎ চরম পানি সংকট ও সেচ ব্যবস্থাপনা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এর থেকে বাঁচতে সেচের পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতির ব্যবহার অতীব জরুরি। ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় সেচ সাশ্রয়ী এডব্লিউডি (অডউ) বা একান্তর সেচ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
কথিত আছে, এক কেজি ধান ফলাতে প্রায় ২৫০০-৩৫০০ লিটার পানি দরকার হয়! যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায় এই পরিমাণ কোনভাবেই ৮০০-১২০০ লিটারের বেশি নয়। ধানের জমিতে যে পানি সেচ হিসেবে সরবরাহ করা হয় তার ৫০% কেবল ধান গাছ গ্রহণ করে বাকি পানি বিভিন্ন উপায়ে ভূগর্ভস্থ পানিতে যুক্ত হয়। সেচে পানির অপচয় রোধে এডব্লিউডি একটি পরীক্ষিত ও কার্যকরী কৃষি প্রযুক্তি। এডব্লিউডি (অডউ) পদ্ধতির মূল বিষয় হলো ধান চাষের ক্ষেত্রে জমিতে সার্বক্ষণিকভাবে পানি না রেখে পর্যায়ক্রমে জমি ভেজা ও শুষ্ক পদ্ধতি অনুসরণ করা। জমির পর্যায়ক্রমে ভেজা ও শুষ্ক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতে হয়। ধান চাষে একবার সেচ দিয়ে পরবর্তী সেচের সঠিক সময় নির্ধারণের জন্য জমিতে ছিদ্রযুক্ত পিভিসি পাইপ (পর্যবেক্ষণ নল) বসাতে হয়। এ পাইপে পরবর্তী নির্দিষ্ট লেভেলে পানি নেমে গেলে সেচ দিতে হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে জমিতে সেচ প্রদান করতে হয়।
সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি
ধানের চারা রোপণের পর জমিতে কম পরিমাণে পানি রাখা উচিত যাতে চারা তলিয়ে না যায়। ধানের জমিতে সবসময় দাঁড়ানো পানি রাখার প্রয়োজন নেই তবে একটি পূর্ণমাত্রায় সেচ প্রদান করে পরবর্তী সেচ প্রদানের পূর্বে জমি দুই-তিন দিন শুকনো রাখলে ধানের ফলন কমে না। উপরন্তু ২৫-৩০ ভাগ পানি সাশ্রয় হয়। এ পদ্ধতিতে আগাছার পরিমাণ বেশি হলে আগাছা নাশক ব্যবহার করে আগাছা দমন লাভজনক হবে। ধানের জমির কাইচ থোড় আসার পূর্ব পর্যন্ত এভাবে সেচ দেওয়া যায়। তবে কাইচ থোড় আসা শুরু হলে ৫-৭ সেমি. দাঁড়ানো পানি রাখা দরকার হয়। আমন ধান কাটার পর জমি পতিত না রেখে একটি বা দুটি চাষ করে রেখে দিলে বোরো মৌসুমে জমিতে ২০ ভাগ পানি কম লাগবে। কারণ পতিত জমিতে ফাটল ধরে জমি তৈরির সময় ফাটল দিয়ে প্রচুর পানির অপচয় ঘটে। সারের উপরিপ্রয়োগের পূর্বে জমিতে পানি কম রেখে সার প্রয়োগ করলে সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। ধান পাকার সময় দানা শক্ত হওয়া শুরু করলে সেচ বন্ধ করতে হবে। এতে ধান পাকার সময় কম নেবে ও সেচের পানির অপচয় কমবে।
এডব্লিউডি বা একান্তর সেচ পদ্ধতি
বোরো মৌসুমে ধান আবাদে পানি সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতির নাম অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং বা এডব্লিউডি। অনেকে এটিকে একান্তর সেচ পদ্ধতি হিসেবে চিনেন। এ পদ্ধতির জন্য প্রয়োজন হয় একটি ৭-১০সেন্টিমিটার ব্যাস ও ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা ছিদ্রযুক্ত পিভিসি পাইপ বা চোঙ্গ। এটি চারা রোপণের ১০-১৫ দিনের মধ্যে জমিতে চারটি ধানের গোছার মাঝে খাঁড়াভাবে স্থাপন করতে হবে যেন এর ছিদ্রবিহীন ১০ সেন্টিমিটার মাটির উপরে এবং ছিদ্রযুক্ত ১৫ সেন্টিমিটার মাটির নিচে থাকে। এবার পাইপের তলা পর্যন্ত ভেতর থেকে মাটি উঠিয়ে নিতে হবে। মাটি শক্ত হলে গর্ত করে পাইপটি মাটিতে বসানো যেতে পারে। যখন পানির স্তর পাইপের তলায় নেমে যাবে তখন জমিতে এমনভাবে সেচ দিতে হবে যেন দাঁড়ানো পানির পরিমাণ ৫-৭ সেন্টিমিটার হয়। আবার ক্ষেতের দাঁড়ানো পানি শুকিয়ে পাইপের তলায় নেমে গেলে পুনরায় সেচ দিতে হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানো পদ্ধতিতে সেচ চলবে জাতভেদে ৪০-৫০ দিন পর্যন্ত। যখনই গাছে থোড় দেখা দেবে তখন থেকে দানা শক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষেতে স্বাভাবিক ২-৫ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে।
দেখা গেছে, এডব্লিউডি পদ্ধতিতে বোরো ধানে সেচ দিলে দাঁড়ানো পানি রাখার চেয়ে ৪-৫টি সেচ কম লাগে এবং ফলনও কমে না। ফলে সেচের পানি, জ্বালানি ও সময় সাশ্রয় হয় এবং উৎপাদন খরচও হ্রাস পায়। এ পদ্ধতিতে ধানের জমিতে প্রয়োজনমাফিক সেচ দেওয়া হয়। ফলে পানির অপচয় রোধ হয়। এর জন্য জমিতে একটি পর্যবেক্ষণ নল স্থাপন করে সেই নলের ভিতর পানির অবস্থা দেখে প্রয়োজন মাফিক সেচ দেওয়া হয়।
পর্যবেক্ষণ নল তৈরি
পর্যবেক্ষণ নল হিসেবে পিভিসি পাইপ, বাঁশের চোঙ্গা অথবা প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার করা যায়। নলটি লম্বায় ৩০ সেমি. ও ব্যাস ৭-১০ সেমি. হতে হবে। নলের নিচের দিকে ২০ সেমি. বা ৮ ইঞ্চি ছিদ্রযুক্ত এবং উপরে ১০ সেমি. বা ৪ ইঞ্চি ছিদ্রহীন থাকবে। নলের নিচের ২০ সেমি. এর মধ্যে ১০ মিলিমিটার দূরে দূরে ৫ মিলিমিটির ব্যাসের ছিদ্র থাকবে। ছিদ্রগুলো সারিতে থাকবে এবং এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব থাকবে ১০ মিলিমিটার।
নল জমিতে স্থাপন কৌশল
ধানের চারা রোপণের পূর্বে জমি ভালোভাবে সমতল করতে হবে। জমিতে নলটি স্থাপনের সময় নলের ছিদ্রযুক্ত অংশের চারপাশে পাতলা কাপড় বা মিহি নেট ব্যবহার করতে হবে যাতে কাদা বা ময়লা আবর্জনায় ছিদ্র বন্ধ না হয়ে যায় এবং মাটির ভেতরের পানি নলের ভেতর সহজে প্রবেশ করতে পারে এবং বেরিয়ে যেতে পারে। জমিতে নলটি স্থাপনের সময় ছিদ্রযুক্ত ৮ ইঞ্চি মাটির নিচে ও ছিদ্রহীন ৪ ইঞ্চি মাটির উপরে থাকবে। ফলে সেচের পানির সাথে সংযুক্ত খড়কুটা ময়লা আবর্জনা নলে প্রবেশ করতে পারবে না। নলটি আইলের পাশে সুবিধাযুক্ত স্থানে স্থাপন করতে হবে, যাতে উক্ত স্থানটি সমস্ত প্লটের প্রতিনিধিত্ব করে ও পর্যবেক্ষণ কাজ সহজ হয়। একটি প্লটে কমপক্ষে একটি নল স্থাপন বা দুই থেকে তিনটিও স্থাপন করা যাবে। সাধারনত ১৫ শতক জমির জন্য একটি নল স্থাপন করাই উত্তম ।
সেচ প্রদান পদ্ধতি
জমিতে ধানের চারা রোপণের ১৫ দিন পর্যন্ত ২-৪ সেমি দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে যাতে আগাছা কম জন্মে। চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে উক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে সেচ দিতে হবে। জমিতে সেচ আরম্ভ করার পর যখন জমির উপর ৫ সেমি. দাঁড়ানো পানি জমবে তখন সেচ প্রদান বন্ধ করতে হবে। জমির পানি শুকানোর পর নলের ভেতরে পানির মাত্রা পরিমাপ করতে হবে। পর্যবেক্ষণ নলের ভেতর পানির স্তর জমির লেভেল থেকে ১৫ সেমি. পর্যন্ত নিচে নেমে গেলে সেচ দিতে হবে। এভাবে উক্ত পদ্ধতিতে ধান গাছের থোড় পর্যায় সময় পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সেচ চলবে। পরবর্তীতে ধান গাছে ফুল আসা থেকে দুধ স্তর পর্যন্ত পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই ৫ সেমি. দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে। অতঃপর ধান কাটার দুই সপ্তাহ পূর্বে সেচ দেয়া বন্ধ করতে হবে।
এডব্লিউডি পদ্ধতিতে সেচ প্রদান সুবিধা
এ পদ্ধতিতে সেচের পানি জ্বালানি ও শ্রমিক খরচ সাশ্রয় হয়। শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ সেচের পানি সাশ্রয় হয়। ডিজেল এর ব্যবহার ৩০ ভাগ কম হয়, ধানের ফলন ১২ ভাগ বেশি হয়, পরিবেশবান্ধব ও সর্বোপরি কম খরচে বেশি লাভ করা যায়। ক্রমাগত জলমগ্ন জমি থেকে গ্রীনহাউজ গ্যাস নিংসরণ হতে হয়। কিন্তু এডব্লিউডি সেচ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে জমি পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো হয় বিধায় গ্রীনহাউজ গ্যাস নিংসরণ হ্রাস পায়। ফলে পবিবেশ দূষণ রোধ করা যায়।
লেখক : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ফোন-০১৭১৬-৫৪০৩৮০, ইমেল-smmomin80@gmail.com.