কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৫:২৩ PM

নিরাপদ বাগদা চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধিতেকরণীয়

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

নিরাপদ বাগদা চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধিতেকরণীয়
মো: কাওছারুল ইসলাম সিকদার
বাগেরহাট জেলা বাগদা চিংড়ি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। স্থানীয়ভাবে বাগদা চিংড়ি সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত।  বাগদা চাষের জন্য ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে জমি প্রস্তুত করা হয় এবং বর্ষার আগমনের পূর্বে জুন-জুলাইতে এ মাছ বিক্রির জন্য  বাজারজাত করা হয়। লবণাক্ত পানিতে সমুদ্র উপকূলবর্তী বাগেরহাট জেলায় কালচার পদ্ধতিতে বাগদার উৎপাদন হয়। মিঠাপানিতে উৎপন্ন গলদা চিংড়ির চেয়ে বাগদা চিংড়ি তুলনামূলকভাবে অধিক সুস্বাদু। তাই বাগদা চিংড়ির চাহিদা ও মূল্য দুটোই বেশি। বাগদা চিংড়ির  প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের পিঠে ডোরাকাটা দাগ থাকে। বাগেরহাট জেলার মাটি, পানি ও বায়ু বাগদা চাষের জন্য উপযোগী। 
নিরাপদ বাগদা চিংড়ি উৎপাদনে করণীয়
জমি নির্বাচন ও প্রস্তুতি : বর্জ্য ও দূষণমুক্ত জমি নির্বাচন; অতিরিক্ত কাদা অপসারণ; চুন, ব্লিচিং পাউডার ও জৈবসার প্রয়োগ; শক্ত প্রাচীর নির্মাণ; পানির গভীরতা ≥ ৫ ফুট রাখা।
পানির গুণগত মান : নিয়মিত চুন প্রয়োগ; ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার; পানির লবণাক্ততা ও গুণগত মান পরীক্ষা।
রেণু সংগ্রহ ও ছাড়করণ : মানসম্মত হ্যাচারির রেণু ব্যবহার; লবণাক্ততার সাথে ধীরে ধীরে মানিয়ে দেওয়া; সকাল বেলায় রেণু ছাড়া।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা : চিংড়ির জন্য আলাদা সময়ে খাবার প্রদান; প্রি-বায়োটিক ও প্রোবায়োটিক খাদ্য ব্যবহার; বয়সভিত্তিক খাবার দেওয়া; নিম্নমানের বা নন-ব্র্যান্ড খাবার ব্যবহার না করা।
স্বাস্থ্য ও রোগ ব্যবস্থাপনা : মাসে একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা; বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ঔষধ প্রয়োগ; অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ব্যবহার এড়িয়ে চলা।
বাজার ও অবকাঠামো : বাজার ও সংরক্ষণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা; নিরাপদ পানি ও বরফ ব্যবহার; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানসম্মত করা; ব্যবহৃত সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা।
নীতি ও সহায়তা : সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন; প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান; আইন প্রয়োগ ও মনিটরিং জোরদার।
বাগেরহাট জেলার পরিবেশ ও প্রকৃতি বাগদা চাষের জন্য উপযোগী হলেও উৎপাদনশীলতা কম। এর প্রধান কারণ নিবিড় চিংড়ি চাষে প্রশিক্ষণের অভাব, বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার অপ্রতিকূলতা, নিম্নমানের খাদ্য ও ওষুধ প্রয়োগ, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণে নির্লিপ্ততা, পরিবেশকদের পরামর্শক্রমে খাদ্য ও ওষুধ ক্রয় ও প্রয়োগ, সরকারি ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য সম্পর্কে জ্ঞাত না হওয়া, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে বাধ্যবাধকতা না থাকা, চিংড়ি  উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার অভাব, অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা, অনিরাপদ ও অপর্যাপ্ত বরফের ব্যবহার, দুর্বল অবকাঠামো, মনিটরিং ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে দুর্বলতা ইত্যাদি। নিরাপদ বাগদা চিংড়ি উৎপাদন ও এর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারিভাবে প্রকল্প গ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অংশীজনদের কারিগরি  সহায়তা  প্রদান করা হলে নিবিড় পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশ অধিকতর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবো।
বাগদা চিংড়ি চাষে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও নিরাপদতা নিশ্চিতে করণীয়
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন নীতি : নিবিড় ও অর্ধনিবিড় পদ্ধতিতে বিজ্ঞানভিত্তিক বাগদা চাষে সকল খামারিদের প্রশিক্ষণ প্রদান; ইউনিয়নপর্যায় পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ  নিশ্চিতকরণ; উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান।
মানসম্মত পোনা (রেণু) উৎপাদন ও সরবরাহ নীতি : উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন বাগদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন ও সম্প্রসারণ; বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া রেণুর গুণগত মান যাচাইয়ে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা; রেণু পরিবহন ও ছাড়করণে বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ম বাধ্যতামূলক করা।
মানসম্মত খাদ্য ও ঔষধ ব্যবস্থাপনা নীতি : সব মৎস্য খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের উৎপাদিত খাদ্যে পুষ্টিগুণ সম্পর্কিত লেবেল সংযোজন বাধ্যতামূলক; ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে পরীক্ষিত ব্র্যান্ডভিত্তিক মানসম্পন্ন খাদ্যতালিকা অনলাইন ব্যবস্থাপনায় প্রকাশ এবং খামারিদের নিয়মিত অবহিতকরণ; নিম্নমানের খাদ্য ও ভেজাল ওষুধ সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ; চাষিদের প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি ও মূল্য সহায়তা।
অবকাঠামো ও সরঞ্জাম উন্নয়ন নীতি : বাগদা চিংড়ির সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা; নিরাপদ বরফ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান; পরিবহন ব্যবস্থায় শীতলীকরণ সুবিধাযুক্ত যানবাহন ব্যবহারে সহায়তা; ঘেরে ব্যবহৃত তৈজসপত্র জীবাণুমুক্তকরণে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও কারিগরি সহায়তা।
স্বাস্থ্যবিধি ও কর্মপরিবেশ নীতি : চাষি ও শ্রমিকদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি (গ্লাভস, অ্যাপ্রন, গামবুট) অনুসরণে বাধ্যবাধকতা ও প্রশিক্ষণ; বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে স্যানিটেশন, টয়লেট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন; ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ জীবাণুমুক্ত করার জন্য পটাশিয়াম/ব্লিচিং দ্রবণ ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নীতি : নিবিড় চাষে আগ্রহী চাষিদের স¦ল্পসুদে ঋণ প্রদান ও বীমা সুবিধা; আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কারিগরি সহায়তা ও সরঞ্জাম সরবরাহে সহায়তা; বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রকল্পের সমন্বয়ে অর্থায়ন কাঠামো তৈরি।
বাজার ও রপ্তানি নীতি : নিরাপদ চিংড়ি বিপণন ও রপ্তানিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ; অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ; আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু; চাষি, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের জন্য গাইডলাইন তৈরি, প্রিন্ট ও প্রচার।
সচেতনতা ও গবেষণা উন্নয়ন নীতি : বাগদা চিংড়ি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন; বিশ^বিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্উ কার্যক্রম জোরদার করা; সরকারি ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহজ ভাষায় নির্দেশিকা প্রকাশ।

লেখক : যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, মোবাইল : ০১৭৯০১৭৭৯৪৫, ই-মেইল : kawserul1173@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন