কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০২২ এ ০৫:৩৮ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪২৮ প্রকাশের তারিখ: ১০-০৩-২০২২
ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে ব্রি’র অবদান
ড. মো. শাহজাহান কবীর১ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন২
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। উপরন্তু, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। কৃষি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় দেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি এবং বেশির ভাগ মানুষ তাদের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই কৃষিভিত্তিক শিল্পে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং প্রণোদনা আমাদের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে এবং সেইসাথে একটি ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে পারে, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি
বাংলাদেশ কমপক্ষে ৬৮,০০০ গ্রাম দ্বারা বেষ্টিত। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। তাই ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের কথা আসলে প্রথমেই আসে খাদ্য নিরাপত্তার কথা। আর খাদ্যশস্য বলতে আমরা ধানকেই বুঝে থাকি। ধান এদেশের মানুষের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে চাল বা ভাতের নিরাপত্তাকে বুঝায়। কেননা, আমাদের প্রাত্যহিক চাহিদার শতকার ৭০-৭৫ ভাগ শর্করা, ৬০-৬৫ ভাগ প্রোটিন, ৮ ভাগ ফ্যাট, ৫.৮ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ৯১.৬ ভাগ ফসফরাস চাল থেকে পাওয়া যায়।
আগেই বলেছি, মানুষের ক্যালরির চাহিদার বেশির ভাগ আসে ভাত থেকে। দেশে বছরে মাথাপিছু চালের চাহিদা ১৩৪ কেজি। এছাড়া চাল থেকে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার রয়েছে, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের দৈনিক ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে। তাই বিনা দ্বিধায় বলা যায় ধানই বাংলাদেশের প্রাণ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং পুষ্টি নিরাপত্তার অর্জনের জন্য আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ধান উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
ধান উৎপাদন মওসুম ও পরিবেশ উপযোগী আধুনিক ধান এবং লাগসই ধান উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ১ অক্টোবর ১৯৭০ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশবাসীর খাদ্যচাহিদা পূরণ ও পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে তালমিলিয়ে ধানের ফলন, উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ব্রত নিয়ে এ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে ব্রি এ পর্যন্ত ৭টি হাইব্রিড ও ১০১টি ইনব্রিড জাতসহ মোট ১০৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করার জন্য বিভিন্ন ঘাতসহনশীল ও স্থানভিত্তিক (Location specific) জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গত তেরো বছরে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। যেমন- খরা, বন্যা, লবণাক্ততাসহিষ্ণু, জিংকসমৃদ্ধ, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চফলনশীল। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১২টি লবণাক্ততাসহিষ্ণু, ৩টি খরাসহনশীল, ৩টি বন্যাসহনশীল, ২টি Tidal Submergence tolerant জাত ও ৩টি ঠান্ডা সহনশীল উদ্ভাবন করেছে। উচ্চতাপমাত্রা বা হিটশক ঝুঁকি এড়াতে উচ্চতাপমাত্রা সহনশীল একটি জাত ছাড়করণের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
ব্রি উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২%। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিঞ্চু জাতগুলো সম্প্রারণের মাধ্যমে ১২% আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে যেখান থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০%। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬% এলাকা চাষের আওতায় এসেছে যেখানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯%। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত (ব্রি ধান৭৬, ৭৭) সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ৫৭০০০হে. জমি এই ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি, ২০২০-২১ সালে উচ্চফলনশীল ধানের জাতসমূহ দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়েছে এবং এ থেকে পাওয়া গেছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯১ ভাগ। ঘাতসহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-২১ পর্যন্ত ৬.০ লক্ষ টন হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকা উন্নয়নে উদ্ভাবনী উদ্যোগ
ঘাত সহনশীলতা এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবনই নয় কৃষক সমবায় সংগঠনভিত্তিক যুব উদ্যোক্তা (জীবিকার মাঠ স্কুল, আইপিএম ক্লাব, আইসিএম ক্লাব, ইত্যাদি) বিকাশের মাধ্যমে জীবিকার উন্নতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছে ব্রি। ব্রি উদ্ভাবিত উদ্ভাবনী প্রযুক্তিসমূহ শুধুমাত্র অনুকূল নয় বরং প্রতিকূল ইকোসিস্টেমেও ক্রমাগত বর্ধিত ধান উৎপাদনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ১৯৭০-৭১ সালের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, জনসংখ্যা দ্বিগুণ বাড়লেও ধান উৎপাদন প্রায় চারগুণ হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তায় ব্রির অসামান্য অবদানের কারণে অতীতের তীব্র খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।
তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যে দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অবজ্ঞা করেছিলেন পঞ্চাশ বছর পরে সে দেশটি কে একই দেশের একটি নেতৃস্থানীয় সংবাদপত্র ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের জন্য রোল মডেল বলে আখ্যায়িত করেছে’ (The Christian Science Monitor,17 June 2015)। একসময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি এখন শক্ত ভিত্তির উদ্বৃত্ত খাদ্যের বাংলাদেশ; ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় এবং গড় ফলনের হিসেবে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রথম। স্বাধীনতার পর আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যতম অসামান্য অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি জাতির পিতার সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা, বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ধান বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম। এই অসামান্য অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষকপর্যায়ে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে।
উন্নত জীবিকা এবং অর্থনীতির রূপান্তর
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধানভিত্তিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে আমাদেরও ধান চাষে আধুনিক জাত এবং প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশেই বিদেশের তুলনায় বেশি আয় করা সম্ভব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা মানুষ এখন টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মতো উন্নত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে। ক্রমবর্ধমান ধান উৎপাদনের মাধ্যমে ক্ষুধা মেটানো এ ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যেখানে ব্রির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে দেশে খাদ্য আমদানি হ্রাস পাওয়ায় সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সরকার দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে অবদান রাখছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে।
ক্ষুধামুক্ত জাতি গঠনে ধানভিত্তিক খামার ব্যবস্থা
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়েছে উচ্চফলনশীল ধানের একাধিক জাত ও লাভজনক শস্যক্রম। যেমন- স্বল্প জীবনকালের খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬/খরা পরিহারকারী ব্রি ধান৫৭ এবং জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ চাষ করে বৃষ্টিনির্ভর বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিনা সেচে ছোলা এবং মসুর চাষ করা যায় এমন একটি অধিক লাভজনক শস্যবিন্যাস তৈরি করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। এ শস্যবিন্যাস অবলম্বন করে একটি জমির উৎপাদনশীলতা ১৮-৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব (আরএফএস বিভাগ, ব্রি)।
উত্তরের জেলাগুলোতে যেখানে বৃষ্টিনির্ভর স্বর্ণা জাতের প্রচলন ছিল সেখানে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক আমন জাতগুলো যেমন- ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৯৩ এবং ব্রি ধান৯৪ জাতগুলো প্রবর্তন করার মাধ্যমে ফলনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এ জাতগুলোর ফলন জাতভেদে ৪.৫ থেকে ৬.০ টন/হেক্টর এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই পুরনো জাতের পরিবর্তে ব্রি উদ্ভাবিত এসব জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। এছাড়া অঞ্চলভেদে খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ ও ব্রি ধান৭৯, লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৪ এবং ব্রি ধান৭৩, বন্যাত্তোর বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪১ এবং লবণাক্ত জোয়ার-ভাটা কবলিত যে সব এলাকায় জোয়ারের পানি জমে যায় সেসব এলাকায় ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ চাষ করে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।
উত্তরাঞ্চলের বিশেষ সময়ের খাদ্যাভাব বা মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩/ব্রি ধান৬২-আগাম আলু-মুগ-ব্রি ধান৪৮ অধিক লাভজনক ধানভিত্তিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, যেটি অনুসরণ করে ওই এলাকার কৃষকরা মঙ্গা চিরতরে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের শহরমুখী বা দেশান্তরী হওয়ার যে প্রবণতা পূর্বে ছিল তা হ্রাসে দারুণ কাজে লেগেছে এ চার ফসলি শস্যক্রম। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ধান চাষের সুযোগ ও সম্ভাবনার বিষয়টি চোখে পড়ে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে। গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ধানের ফলন ও উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে যা যথাক্রমে বার্ষিক ০.০৭ টন/হেক্টর ও ০.৯ মিলিয়ন টন/বছর।
আবার বোরো মৌসুমে মেগা জাত (সর্বাধিক জনপ্রিয়) হিসেবে খ্যাত ব্রির জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এর চেয়েও অনেক ভালো জাত বর্তমানে রয়েছে, যার মধ্যে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, বঙ্গবন্ধু ধান১০০, ব্রি ধান১০১, ১০২ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ উল্লেখযোগ্য। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৪৭ এর আধুনিক সংস্করণ ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭ এবং ব্রি ধান৯৯। আউশে পারিজা, জামাইবাবু ও বিআর২৬ এর পরিবর্তে যথাক্রমে ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৬৫, ব্রি ধান৮২, ব্রি ধান৮৩ এবং ব্রি ধান৯৮ চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব।
সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চাল
চাল ছেটে যাতে চিকন করতে না হয় সেজন্য ব্রি ইতোমধ্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন চিকন ও সরু চালের প্রায় ১২টি জাত উদ্ভাবন করেছে। অধিকন্তু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এমন কিছু ধান জাত উদ্ভাবন করেছে যেগুলো উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব ধান জাতের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ করেও লাভজনক খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। যেমন- ব্রি উদ্ভাবিত বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৩ ও ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৬ ও ব্রি ধান৯০ প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন জাত। বিআর১৬, ব্রি ধান৪৬ ও ব্রি ধান৬৯ লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (লো-জিআই) গুণসম্পন্ন জাত, এসব জাতের চালের ভাত ডায়াবেটিক রোগীরা নিরাপদে খেতে পারেন। ব্রি উদ্ভাবিত জিংকসমৃদ্ধ সাতটি ধানের জাত ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, বঙ্গবন্ধু ধান১০০ এবং ব্রি ধান১০২ এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জাতগুলোর ভোক্তা চাহিদা বেশি, বাজারমূল্যও অধিক। তাই ধানভিত্তিক খামার বিন্যাসে এ জাতগুলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অভিবাসনের অন্যতম বিকল্প হতে পারে। এ খাতে বর্ধিত হারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত পুঁজি লাভসহ তুলে আনা সম্ভব। এছাড়া শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করে উদ্ভাবনকৃত জাতগুলো অবমুক্তকরণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া চাল থেকে এনার্জি ডেনস বিস্কুট, কেক, নুডুলস, মুড়ি, চিড়া ও খই তৈরির মাধ্যমে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কাজ করছে ব্রি।
কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে বাড়াচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়
ব্রি বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত দেশের কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী ৩৫টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করছে। চারা রোপণ, আগাছা নিধন থেকে ধান কাটা ও মাড়াই সব কিছুতেই লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। অভিবাসনের চিন্তা পরিহার করে সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কেনা একটি রাইস টান্সপ্লান্টার বা কম্বাইন হার্ভেস্টার স্ব-কর্মসংস্থানের অন্যতম উপায় হতে পারে। এছাড়া যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বর্তমানে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র বা ট্রান্সপ্লান্টার, রোটারি টিলার, ধান-গম কাটার যন্ত্র, ধান-গম মাড়াই যন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টার ও আগাছা দমন যন্ত্র বা উইডার ইত্যাদি। কৃষকরা এসব যন্ত্র নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও অন্যদের এসব সেবা প্রদান করে লাভবান হতে পারেন।
স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
আমাদের কৃষকরা প্রায়ই মানসম্পন্ন বীজের অভাবে প্রতারিত হন। এখন পর্যন্ত মাত্র ৬৩ শতাংশ কৃষক মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারছেন। বাকি ৩৭ শতাংশ অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বীজের উপর নির্ভরশীল। আমন মৌসুমে ২৯.৭২ শতাংশ, আউশে ৫৯.৯৮ শতাংশ এবং বোরোতে ৯৯.৮ শতাংশ কৃষক মানসম্পন্ন বীজ পাচ্ছেন। অথচ কথায় বলে, ভালো বীজে ভালো ফলন। এই বিষয়টি মাথায় রেখে, ব্রি প্রতি বছর ২০০ টনের বেশি ব্রিডার বীজ উৎপাদন করছে এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রি থেকে ব্রিডার বীজ, ভিত্তি বীজ এবং টিএলএস সংগ্রহ করে বীজ ব্যবসায় অল্প পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে, বীজ উৎপাদন এবং সরবরাহের মাধ্যমে আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ব্রি গত ৫০ বছরে এ পর্যন্ত ২৫টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া ২০২০ সালের গ্লোবাল গো টু থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সূচক রিপোর্ট এ ব্রিকে দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা (১ম অবস্থান), এশিয়ায় ২য় এবং বিশ্বের ১৬তম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ঘোষিত আসন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, এসডিজি-২০৩০, ভিশন-২০৪১, ডেল্টা প্লান-২১০০ সহ সকল মাইলফলক অর্জনে ব্রি অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে কাজ করে যাবে।
লেখক : মহাপরিচালক১ ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা২, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ফোন: ০১৭১৬৫৯০৩৮০, ইমেইল : dg@brri.gov.bd