কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১৮ এ ০৬:৪৫ AM

দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে বিএডিসি’র বীজের অবদান

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪২৫ প্রকাশের তারিখ: ০১-১১-২০১৮

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ফসল উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩টি উপকরণ যেমন-বীজ, সার ও সেচ সরবরাহ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। উপকরণ ৩টির মধ্যে বীজ অন্যতম। বিভিন্ন ফসলের গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় বীজ, চারা ও কলম পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে।

 

মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম : ফসল উৎপাদনে বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অন্যান্য কৃষি উপকরণের কার্যকারিতা গুণগত মানসম্পন্ন বীজের উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া কোনো ফসলের সম্ভাব্য ফলন বীজের মানের সাথে সরাসরি জড়িত। বীজ উৎপাদন ও মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে তুলে দিতে বিএডিসি ৩৪টি ভিত্তিবীজ বর্ধন ও উৎপাদন খামারের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে দানাজাতীয় বীজ উৎপাদন খামার ২৪টি, পাটবীজ খামার ২টি, ডাল ও তৈলবীজ খামার ৪টি, সবজি বীজ খামার ২টি ও আলুবীজ খামার ২টি। ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩১ একর কমান্ড এরিয়া নিয়ে ৭৫টি কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ও ৩৭ হাজার ৬১১ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষক যুক্ত আছেন। ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৫২টি আধুনিক বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, ৩টি অটো সিড প্রসেসিং প্লান্ট ও ডিহিউমিডিফায়েড গুদাম এবং ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার রয়েছে। দেশব্যাপী ট্রানজিট বীজ গুদামসহ ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, ৮ হাজার ৫৬ জন বীজ ডিলার নিয়ে একটি সুসংগঠিত মার্কেটিং চ্যানেল রয়েছে। বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪টি এগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও নয়টি উদ্যান উন্নয়ন  কেন্দ্র রয়েছে। বীজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প, বীজ কার্যক্রম ও চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে বিগত ৯ বছরে বিভিন্ন ফসলের সর্বমোট ১২.৯০ লক্ষ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।


বোরো ধানবীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ : দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য দানা জাতীয় ফসলের মধ্যে বোরো ধানবীজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সর্বমোট ৬৬৪৯৫ মেট্রিক টন বোরো ধানবীজ কৃর্ষক পর্যায়ে সরবরাহ করেছে যা বোরো ধানবীজের চাহিদার প্রায় ৬৪%। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ বিএডিসি কৃষক পর্যয়ে ৬৯,০০০ মেট্রিক টন বোরো ধানবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।


আমন ধানবীজ সরবরাহ : দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দানা জাতীয় ফসলের মধ্যে আমন ধানবীজ  অন্যতম। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সর্বমোট ১৭৭৯০ মেট্রিক টন আমন ধানবীজ কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করেছে। এসব বীজই উফশী জাতের। আমনে কৃষকরা মূলত নিজেদের সংরক্ষণকৃত স্থানীয় জাতের ধানবীজ ব্যবহার করে। ফলে আমনে কৃষকের কাছে বিএডিসি বীজের চাহিদা কম। তবে আশার কথা BRRI এবং BINA কর্তৃক উদ্ভাবিত উফশী জাতের ধানবীজ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যদি BRRI এবং BINA কর্তৃক উদ্ভাবিত উফশী জাতের আমন বীজ বিএডিসি’র মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছানো যায় তাহলে ধান উৎপাদনে কৃষিতে একটি উল্লম্ফন ঘটবে।  ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ২৮,০০০ মেট্রিক টন আমন ধানবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


আউশ ধানবীজ সরবরাহ : বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সর্বমোট ১৩২০ মেট্রিক টন আউশ ধানবীজ কৃর্ষক পর্যায়ে সরবরাহ করেছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ২,৭০০ মেট্রিক টন আউশ ধানবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবারাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আউশ ধান কৃষকের মাঠ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল। এর মূল কারণ আউশের কম উৎপাদনশীলতা। কিন্তু মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নির্দেশে গবেষণা সংস্থা BRRI এবং BINA কর্তৃক উদ্ভাবিত আউশের উফশী জাত ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়েছে। আশা করা যায় আউশের হৃতগৌরব পুনরায় ফিরে আসবে। গত তিন বছরে উফশী আউশ ধান বীজের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।


SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো ধানবীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ : বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে SL-8H জাতের ৬৫৪ মেট্রিক টন সুপার হাইব্রিড বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে বিএডিসি’র ঝখ-৮ঐ জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো ধানবীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। SL-8H জাতের হাইব্রিড ধানবীজের হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ মেট্রিক টন। এ জাতের ধান চাষে দেশে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ১,৮০০ মেট্রিক টন SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো ধানবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


গমবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ : দেশে গমের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সর্বমোট ১৮১১১ মেট্রিক টন গম বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ২৬,০০০ মেট্রিক টন গমবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।    


ভুট্টাবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ : বিএডিসি দেশে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সর্বমোট ১৬ মেট্রিক টন ভুট্টাবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করেছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ৩০০ মেট্রিক টন ভুট্টাবীজ  উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


ডাল ও  তৈলবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ : দেশের জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ডাল জাতীয় ৮৩৪ মেট্রিক টন ও তৈল জাতীয় ২৩১৫ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। ফলে দেশে ডাল ও তৈল ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলায় বিএডিসি কর্তৃক ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে একটি ডাল ও তৈলবীজ বর্ধন খামার স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। উক্ত খামারের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার চর এলাকায় একর প্রতি ডাল ও তৈল ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ৩,০০০ মেট্রিক টন ডাল জাতীয় বীজ ও ২,২০০ মেট্রিক টন তৈলবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


বীজআলু উৎপাদন ও সরবরাহ : বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৩২৬২৭ মেট্রিক টন বীজআলু উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী আলু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ৪৫,০০০ মেট্রিক টন আলুবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


পাটবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ : বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৭৭৫ মেট্রিক টন পাটবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী পাটবীজের আমদানি নির্ভরতা কমেছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ২,৫০০ মেট্রিক টন পাটবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


সবজি ও মসলাবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ : দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৭৭ মেট্রিক টন সবজিবীজ ও ১১০ মেট্রিক টন মসলাবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী আগামী ২০২১ সাল নাগাদ ২০০ মেট্রিক টন সবজিবীজ ও ২০০ মেট্রিক টন মসলাবীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।  


উদ্যান সংক্রান্ত কার্যক্রম : বিএডিসি বিগত ২০১০-১১ হতে ২০১৬-১৭  সময়ে সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প, এগ্রো সার্ভিস সেন্টার কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৫.১৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন সবজি; ০.৩৭ লক্ষ মেট্রিক টন মসলা; ৪.৪৮ লক্ষ মেট্রিক টন ফল; ৩৯৮.৩২ লক্ষ সবজি চারা; ২০১৪.২৫৫ লক্ষ চারা/কলম ও ২৮.৬৮৫ লক্ষ নারিকেল চারা উৎপাদন ও বিতরণ করেছে। ফলে সময়ের সাথে সাথে সবজি, ফল, মসলা ইত্যাদির জাতীয় উৎপাদন বেড়েছে। কৃষক পর্যায়ে মানসম্পন্ন উদ্যান ফসলের চারা বিতরণের ফলে দেশব্যাপী উদ্যান ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিএডিসি ২০২১ সাল নাগাদ বিভিন্ন ফসলের ১,৮০,৯০০ মেট্রিক টন মানস¤পন্ন বীজ কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

 

মো: মাহমুদ হোসেন

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন