কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ১২:৪৩ PM

দেশীয় শোল মাছের লাভজনক চাষ পদ্ধতি

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩৩ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৪-২০২৬

দেশীয় শোল মাছের লাভজনক চাষ পদ্ধতি
মোঃ তোফাজউদ্দীন আহমেদ
এ মাছটিকে বাংলায় শোল মাছ ইংরেজিতে ঝহধশব ঐবধফ বলে ডাকা হয়; এটি রাক্ষুসে স্বভাবের মাংসাশী প্রাণী; এ মাছটি নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়ে, জলাভূমিতে বিচরণ করতে দেখা যায়; বদ্ধ পরিবেশে প্রজনন করে এবং নিজেদের বাচ্চাকে যত্ন নেয়; পূর্ণ বয়স্ক একটি মা মাছে ১০০০০-২০০০০ ডিম দিতে পারে; মাছটির সামনের অংশ অনেকটা সাপের মতো দেখতে বলে এ মাছের ইংরেজি নাম ঝহধশব ঐবধফ ঋরংয; দ্রুত বর্ধনশীল এ মাছ বছরে ১.৫-২.০ কেজি পর্যন্ত বড় হতে দেখা যায়; বর্ষার সময় অভিপ্রায়ন করতে দেখা যায়।
শোল মাছচাষের সুবিধা : এ মাছটি ছোট বড় সকল ধরনের জলাশয়ে চাষ করা যায়; অধিক ঘনত্বে এ মাছচাষ করা যায়; পানির বাহিরে অনেক সময় ধরে বেচে থাকে ফলে জীবন্ত রেখে বিক্রয় করা যায়; পানির পরিবেশ খারাপ হলেও এ মাছের কোন অসুবিধা হয় না; বাজার অন্যান্য মাছের তুলনায় এ মাছের দাম অনেক বেশি পাওয়া যায়; চাষের পুকুরে এ মাছের তেমন কোন রোগ-ব্যাধি দেখা দেয় না; শোল মাছ রাক্ষুসে প্রকৃতির হওয়ায় যে কোন মাছের পোনা, ছোট প্রজাতির মাছ ও গুড়া চিংড়ি খাইয়ে লালন করা যায়; শোল মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ১ বছরের মধ্যে এদের প্রতিটির ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে ২ কেজি পর্যন্ত হয়।
শোল মাছচাষের অসুবিধা : বর্ষার সময় পুকুর বা ঘেরের পাড় বেয়ে এ মাছ বের হয়ে যাবার চেষ্টা করে; অত্যন্ত রাক্ষুসে স্বভাবের হওয়ায় কেবলমাত্র রুই জাতীয় মাছ ছাড়া অন্যান্য মাছের সাথে চাষ করা যায় না; এরা স্বজাতিভোজী (ঈধহহরনধষরংঃরপ) স্বভাবের, বড়টি ছোটকে খেয়ে ফেলতে পারে; চাষ চলা কালে বড় ছোট আলাদা করে দিতে হয়; পর্যাপ্ত ও নিয়মিত খাবার প্রদান করতে হয়, খাবারের সংকট থাকলে ছোটদের খেয়ে ফেলতে পারে।
চাষের পুকুর প্রস্তুতি : অন্যান্য মাছচাষের ন্যায় এ মাছচাষের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতিতে পুকুর প্রস্তুত করতে হয়। যেহেতু অধিক ঘনত্বে এ মাছচাষ করতে হয় সেজন্য পুকুর পানি শুণ্য করে তলদেশ শুকিয়ে নিতে পারলে ভালো হয়। পুকুরের পাড়ের আগাছা পরিষ্কার করে ভালো করে মেরামত করে নিতে হবে যাতে পাড় মজবুত হয়। পুকুরের পাড় ও তলা মেরামতের পর শতকে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে পানি প্রবেশ করানোর আগে পুকুরের পাড়ের চারিদিকে ৬ ফুট উচু করে নীল নেট মাটিতে শক্ত করে (মাটির নিচে ৯ ইঞ্চি) স্থাপন করতে হবে যাতে বর্ষার সময় কোনভাবে মাছ বের হয়ে যেতে না পারে। পুকুরে বেস্টনি স্থাপন করা শেষ হলে পুকুরে পানি প্রবেশ করাতে হবে। পুকুরে ভাল উৎসের পানি প্রবেশ করাতে হবে এবং পুকুরের পানির গভীরতা ৪-৭ ফুট রাখার চেস্টা করতে হবে।
পোনা প্রতিপালন : নিজেরা উৎপাদন পোনার ক্ষেত্রে বা প্রকৃতিক উৎস হতে পোনা সংগ্রহ করলে অনেক সময় ছোট পোনা আগে লালন পালন করে নিতে হবে। ছোট পোনা সাধারণত পুকুরে হাপা (৩ী৬ী৩ ফুট) সেট করে প্রতিপালন করা হয়ে থাকে। হাপার আকার প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট বড় হতে পারে। হাপায় পোনা রেখে আকার অনুযায়ী খাবার দিতে হয়। ছোট অবস্থায় মুরগী-হাসের ডিম ফেটে দেয়া হয়, ৫-৭ দিন ডিম দেবার পরে পোনা কিছুটা বড় হলে কম দামের মাছ (তেলাপিয়া) সিদ্ধ করে পেস্ট করে খেতে দেয়া হয়। অনেক সময় কার্প জাতীয় মাছের রেণু পোনাও খাবার হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। উপকূলীয় এলাকায় যে ভাতি চিংড়ি পাওয়া যায় সেটাও ছোট পোনার খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সুবিধাজনক অন্য যেকোনো প্রজাতির মাছের পোনা শোল মাছের পোনার বয়স এবং মুখের আকার অনুযায়ী খেতে দেয়া যেতে পারে। এভাবে ২-৩ মাস পোনা প্রতিপালন করতে হয়। পোনার আকার ৭-১০ সেমি. হলে চাষের পুকুরে ছেড়ে দেয়া হয়।
চাষের পুকুরে পোনা মজুদ : চাষের পুকুরে কি পরিমাণ পোনা মজুদ করা যাবে সেটি নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে এ মাছচাষের অভিজ্ঞতা; খাদ্যের যোগান দেবার সামর্থ, পুকুরের গভীরতা এবং পানি ব্যবস্থাপনার ধরন ইত্যাদির বিবেচনায় রেখে মজুদ ঘনত্ব নির্ধারণ করতে হয়। সাধারণভাবে বাহির থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবন্ত ছোট মাছ সরবরাহ করতে পারলে পুকুরের আয়তন অনুযায়ী শতকে ৪০০-১০০০টি পর্যন্ত শোল মাছের পোনা মজুদ করা যেতে পারে। সাথে কার্পজাতীয় মাছ মজুদ করতে চাইলে শতকে ২০০-৩০০ গ্রাম আকারের ৩-৫টি রুই এবং ৩-৪টি সিলভার ও কাতল ছাড়া যেতে পারে। তবে রুই জাতীয় মাছ ছাড়তে হবে ঐ সব পুকুরে যে পুকুরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস এবং বাহির থেকে প্রয়োজনে পানি প্রবেশের ব্যবস্থা আছে। এ সুবিধা দুটি না থাকলে কার্পজাতীয় মাছ না ছাড়ায় ভালো। যেকোনো মাছের পোনা মজুদের সময় পটাশ অথবা লবণ পানিতে গোসল করিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। পোনা মজুদের পর নিয়মিত ২-৩ বার খাবার দিতে হবে। শোল মাছের আকার ১০০-১৫০ গ্রাম হওয়া পর্যন্ত দিনে তিনবার খাবার দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে দিনে দু-বার খাবার দিতে হবে।
শোল মাছের খাদ্য ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা
যেকোনো প্রজাতির মাছচাষের সফলতা অনেকাংশে উপযুক্ত খাদ্য সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শোল মাছচাষে খাদ্য হিসাবে মাছ সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। শোল মাছকে জীবন্ত ছোট তেলাপিয়, কম মূল্যের সিলভার, বিগহেড, মৃগেল ও বাটা মাছের বিভিন্ন আকারের পোনা চাষের শোল মাছের আকারের ওপর ভিত্তি করে খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়।
পৃথক নার্সিারি পুকুরে কম দামের রুই জাতীয় মাছের রেণু যেমন, সিলভার, মৃগেল, বাটা মাছের পোনা অথবা তেলাপিয়া প্রতি পালন করে শোলমাছের চাহিদা অনুযায়ী আকারের (১.৫-২ ইঞ্চি) পোনা ধরে চাষের পুকুরে ছাড়া যেতে পারে। প্রতি দিন এভাবে পোনা দেয়া যেতে পারে। তবে ৬ থেকে ৭ দিন পরপর নার্সারি পুকুর থেকে পরিমাণ মত পোনা ধরে চাষের পুকুরে ছেড়ে দিয়েও চাষ করা যায়। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি পড়ে। তবে এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে চাষের পুকুরে কিছু পোনা আকারে বড় হয়ে যায় যা শোলমাছে আর ধরে খেতে পারে না। এ বড় আকারের পোনা বিক্রয় করে বাড়তি আয় পাওয়া যায়।
শোল মাছচাষ চলা কালে অন্যান্য পরিচর্যা : সাধারণত শোল মাছচাষে তেমন কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। তথাপিও শোল মাছচাষ নিরাপদ রাখার জন্য চাষ চলা কালে যেসব কাজ করতে হবে তা নি¤েœ উল্লেখ করা হল :
া চুন প্রয়োগ : চাষ চলা কালে পানির পরিবেশ বুঝে ২-৩ মাস অন্তর শতকে ২০০-৩০০ গ্রাম হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
া লবণ প্রয়োগ : প্রতি মাসে অবস্থা বুঝে শতকে ২০০-৩০০ গ্রাম হারে লাবণ প্রয়োগ করতে হবে।
া শীতে করণীয় : শোল মাছে শীতের সময় ক্ষত রোগ হতে দেখা যায় এ জন্য শীতের সময় শোল মাছচাষের পুকুরে চুন প্রয়োগের পাশাপাশি মাঝে মধ্যে ভোরে পুকুরে নলকূপের পানি দিতে পারলে ভালো হয়। এসময় খাবার কমিয়ে দিতে হবে এবং মরা মাছ বা শুটকি মাছ খাবার হিসেবে না দেয়ায় ভালো। শীতের সময় জীবন্ত ছোট মাছ দেয়া অধিকতর নিরাপদ। কাটা মাছ বা মরা মাছ দিলে এমনভাবে দিতে হবে যেন খাবার অপচয় না হয়। কারণ এ সময় অব্যবহৃত মরা মাছ পচে পুকুরের পানির পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।
া বর্ষার সময় : বৃষ্টির পানি ওপর ভর করে এ মাছ পুকুর থেকে বের হয়ে যেতে চায় এ জন্য এ সময় নেটের বেড়া মাঝে মধ্যে চেক করতে হবে ঠিক আছে কি না।
শোল মাছের রোগ এবং প্রতিকার
প্রথমত ক্ষত রোগ : এ রোগটি শীতের সময় হতে দেখা যায় এবং আক্রান্ত হলে চাষি বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হতে দেখা যায়। মাাছের গায়ে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং মাছ মারা যায়। এ সমস্যা পরিহার করার জন রোগ না দেখা গেলেও শীতের শুরুতে শতকে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হয়। আর যদি মাছে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যায় তবে শতকে ১ কেজি হারে চুন ও লবণ প্রয়োগ করতে হয় এবং সে সাথে শতকে ৫ গ্রাম হারে পটাশ প্রয়োগ করলে উপকার পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত্ব আরগুলাস/উকুন সমস্যা : চাষের পুকুরে অনেক সময় পচনশীল জৈব পদার্থ বেড়ে যেতে দেখা যায়। বিশেষ করে এ মাছকে যেহেতু মরা মাছ খেতে দেয়া হয় ফলে উচ্ছিস্ট মাছ পুকুরে পচে পরিবেশে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় তখন মাছে উকুন হতে দেখা যায়। এ পরজীবী আক্রমণ ধরা পড়লে ভালো মানের কীটনাশকের ৭ দিন অন্তর ৩টি ডোজ দিতে হবে। প্রতি ডোজ কিটনাশক প্রয়োগের সাথে শতকে ৫ গ্রাম হারে পটাশ প্রয়োগ করতে হবে।
মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ
পূর্বে বর্ণিত পদ্ধতিতে নিয়মিত খাদ্য এবং পরিচর্যা চালিয়ে গেলে মোটামুটি ৮-৯ মাস চাষ করলে মাছ বাজারে বিক্রয় উপযোগী হয় তবে যেহেতু এ মাছ রাক্ষুসে প্রজাতির সেজন্য সকল মাছে সমভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারে না এ জন্য উৎপাদিত মাছের মধ্যে ছোট বড় হতে দেখা যায়। একই সময়ে কিছু মাছ ১-২ কেজি আকারের হয় আবার কিছু কিছু ৫০০-৭০০ গ্রামের হতে দেখা যায়। মাছ বড় হলে বাজারে দেবার জন্য বেড় জাল দিয়ে আহরণ করা যায় তবে সম্পূর্ণ মাছ ধরতে হলে পুকুর সেচ দিয়ে পানি অপসারণ করে মাছ ধরতে হয়।
এ মাছ জীবন্ত অবস্থায় বাজারজাত করতে হয়। এ জন্য আহরিত মাছ প্লাস্টিকের ড্রামে করে বাজারে পাঠাতে হয়।

লেখক : সাবেক বিভাগীয় উপপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, ১৭৩/১ নূর হাজিরগলি, শাপলা হাউজিং, পশ্চিম আগারগাঁও, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৭৫১৯৩৯৯৩২

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন