কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ১১:০৯ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০২-২০২৬
ডলোচুন : অম্লীয় মাটি ব্যবস্থাপনার উৎকৃষ্ট হাতিয়ার
ড. মোহাম্মদ মোবারক হোসেন
মাটি হলো কৃষি উৎপাদনের মূল উপাদান, যা ফসলের বৃদ্ধি এবং উৎপাদনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। মাটির পিএইচ মান, অর্থাৎ মাটির অম্লতা এবং ক্ষারীয়তার পরিমাণ ফসলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অম্লীয় বা ক্ষারীয় উভয় মাটি ফসলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে না, যার ফলে ফসলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন হ্রাস পায়। রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরেন্দ্র ও মধুপুরের অধিকাংশ মাটির অম্লতা অত্যধিক হওয়ার কারণে, এখানে উন্নত কৃষির জন্য উপযুক্ত মাটি প্রাপ্তির সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে ডলোচুন প্রয়োগের প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মাটির অম্লতা এবং ক্ষারীয়তার প্রভাব : মাটির অম্লতা ও ক্ষারীয়তা ফসলের জন্য আবশ্যকীয় ১৭টি পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ১৪ টির উপস্থিতি এবং তাদের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করে। মাটির পিএইচের মান ৫.৬ থেকে ৭.৩ এর মধ্যে থাকলে অর্থাৎ মাটি মৃদু অম্ল থেকে মৃদু ক্ষারীয় হলে এসব পুষ্টি উপাদান ফসলের জন্য সহজলভ্য হয়। অন্যদিকে পিএইচ মান ৪.৫ থেকে ৫.৫ এর মধ্যে থাকলে তা অধিক অম্লীয় মাটি, আর মান ৪.৫ এর নিচে থাকলে তা অত্যধিক অম্লীয় মাটি বলে গণ্য হয়। এমন মাটিতে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও মলিবডেনামের স্বল্পতা এবং অ্যালুমিনিয়াম, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজের আধিক্য থাকায় ফসলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন হ্রাস পায়।
বাংলাদেশের অম্লীয় মাটির পরিস্থিতি : বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ লক্ষ ৮৬ হাজার হেক্টর জমি ফসলি জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ ৭৮ হাজার হেক্টর জমির মাটি অত্যধিক অম্লীয় (পিএইচ ৪.৫ এর নিচে), এবং প্রায় ৩৬ লক্ষ ৪৪ হাজার হেক্টর জমির মাটি অধিক অম্লীয় (পিএইচ ৪.৫ থেকে ৫.৫)। এই ধরনের মাটিতে ফসলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন হ্রাস পায়। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিলেট এবং চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলসহ বরেন্দ্র ও মধুপুর গড় অঞ্চলের মাটির অম্লতা অধিকাংশ মাটির অম্লতা অত্যধিক থেকে অধিক। সেখানে ফসলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে (এসআরডিআই, ২০২০)।
ডলোচুন প্রয়োগের উপকারিতা
ডলোচুন, ডলোমাইট বা ডলোঅক্সিচুন নামে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান যা ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামের সমন্বয়ে গঠিত। এটি প্রধানত পাউডার আকারে পাওয়া যায় এবং মাটির অম্লতা কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। ডলোচুনে ২০ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ১১ ভাগ ম্যাগনেশিয়াম থাকে, যা ফসলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। ডলোচুন প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির পিএইচ বৃদ্ধি করা যায় এবং ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে, ডলোচুন ব্যবহার করে অম্লীয় মাটির পিএইচ ৫.৬ এর উপরে আনা সম্ভব। যার ফলে ফসলের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। ডলোচুনে ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম থাকার কারণে এটি মাটির পুষ্টি উপাদান সরবরাহের ক্ষেত্রে সহায়ক। এগুলো আলাদা ভাবে প্রয়োগ করতে হয় না। যা সারের খরচ কমিয়ে দেয়। উপরন্তু, মাটির পিএইচ সঠিক পরিসরে পৌঁছায়, এবং ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, অত্যধিক অম্লীয় মাটিতে ডলোচুন প্রয়োগের মাধ্যমে গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, সরিষা এবং সবজি জাতীয় ফসলের ফলন ১০-৪০ ভাগ বৃদ্ধি পায়, এবং একই সাথে ফসল উৎপাদন খরচ ১৫-৩৫ ভাগ কম হয় (বিডাব্লিউএমআরআই, ২০২৪)। ডলোচুন প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এটি একবার প্রয়োগ করলে সাধারণত পরবর্তী তিন বছর পুনরায় প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। তবে, মাটির বুনট অনুযায়ী প্রয়োগের সময় বৃদ্ধি বা হ্রাস হতে পারে। এটি একটি কম খরচে লাভজনক প্রযুক্তি, যা কৃষকদের জন্য সুবিধাজনক।
ডলোচুন ব্যবহারের সুপারিশকৃত মাত্রা
ডলোচুনের ব্যবহারের পরিমাণ মাটির বর্তমান পিএইচ মান, মাটির বুনট এবং মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত, প্রতি শতাংশ জমিতে চার কেজি অর্থাৎ, একরে ৪০০ কেজি বা হেক্টরে এক টন হারে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয়। মাটির বুনট যদি খুব বেশি ভারী হয়, তবে ডলোচুনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হতে পারে এবং যদি মাটি বেশ হালকা হয়, তবে পরিমাণ কিছুটা কমানো যেতে পারে। এর ভিত্তিতে জমিতে ডলোচুনের প্রয়োগ মাত্রা প্রতি শতকে ৩ কেজি থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে (বিএআরসি, ২০১৮)।
ডলোচুন প্রয়োগের পদ্ধতি
ডলোচুন প্রয়োগের পদ্ধতি বেশ সহজ। প্রথমে, মাটি পরীক্ষা করে মাটির পিএইচ, জৈব পদার্থের পরিমাণ এবং মাটির বুনটের ওপর ভিত্তি করে ডলোচুনের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। সাধারণত জমি শুষ্ক হলে হালকা সেচ দিয়ে জমি ভিজিয়ে তারপর ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগের সময়, জমির এক ভাগ উত্তর-দক্ষিণ বরাবর এবং বাকি অংশ পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রয়োগের পর মাটিতে ডলোচুন ভালোভাবে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য চাষ ও মই ব্যবহার করতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগের ১০ দিন পর ফসল রোপণ বা বপন করতে হয়। ডলোচুন প্রয়োগের জন্য রবি মৌসুম সর্বোত্তম সময়, তবে যেকোনো মৌসুমে আলু, গম, ভুট্টা, ডাল, সবজি এবং মসলাজাতীয় ফসলের জন্য এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে ধান বা জলাবদ্ধ অবস্থায় আবাদ করা ফসলের জন্য ডলোচুন প্রয়োগের প্রয়োজন নেই।
ডলোচুন প্রয়োগের সাবধানতা
ডলোচুন প্রয়োগের কিছু সাবধানতা রয়েছে, যা মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, ফসল রয়েছে এমন জমিতে ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না। সুপারিশকৃত পরিমাণের চেয়ে অধিক ডলোচুন প্রয়োগ করা উচিত নয়। এটি মাটির অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। প্রয়োগের পর মাটিতে ডলোচুন মিশিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া, বাতাস বেশি থাকলে মাঠে ডলোচুন ছিটানো উচিত নয়, কারণ এটি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রয়োগকারীদের জন্য মাস্ক বা কাপড় দিয়ে চোখ এবং মুখ সুরক্ষিত করা অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশে অম্লীয় মাটির সমস্যা কৃষি উৎপাদনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানে ডলোচুন প্রয়োগ একটি কার্যকরী পদ্ধতি। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ডলোচুন প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক, সহজ এবং কার্যকরী প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এজন্য, কৃষকদের মাটির পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক ডলোচুন পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রয়োগ পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।
লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ গম ও ভ্ট্টুা গবেষণা ইনস্টিটিউট, দিনাজপুর মোবাইল : ০১৫৭৭-৩৬৯২৫৭,