কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:০৩ PM

টেকসই কৃষিতে সোনালী আঁশ : পাটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বহুমুখী প্রয়োগ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

টেকসই কৃষিতে সোনালী আঁশ : পাটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বহুমুখী প্রয়োগ
কৃষিবিদ উম্মে হাফসা তিম্মি
পাট বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফাইবার ফসল, যা পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই কৃষির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিকভাবে বায়োডিগ্রেডেবল এই ফসল প্লাস্টিক ও কৃত্রিম ফাইবারের একটি টেকসই বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃতি পাচ্ছে। পাট চাষে কম রাসায়নিক সার ও পানি ব্যবহার হয়, ফলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পায়। তথ্য (সূত্র : বিজিএস, কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩)। পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটকে বলা হয় সোনালী আঁশ। এই সোনালী আঁশ বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর ৫-৬ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। পাট থেকে যা অর্জিত হয় তার পুরোটাই বাংলাদেশের নিজস্ব  সম্পদ। কেননা, পাট উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, কাঁচামাল, শ্রম, অর্থ সব কিছুই দেশীয় সম্পদ। আর এই দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করেই আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাট উৎপাদন করি এবং বিদেশে রপ্তানি করি। তাই পাট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ দেশের কৃষকদের নগদ অর্থ উপার্জনে কর্মসংস্থানে দারিদ্র বিমোচনে বৈদেশিক অর্থ  আহরণে ও সর্বোপরী জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তভাবে বিনির্মাণে পাটের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
এক হেক্টর পাট গাছ থেকে বাতাসে ১০.৬৬ টন অক্সিজেন বের হয় এবং ১৪.৬৬ টন  পড়২ পাট গাছ পরিবেশ থেকে শোষণ করে নেয়, এ ছাড়া পাট দিয়ে তৈরি সকল পণ্য ব্যবহারের পর ফেলে দিলে মাটিতে মিশে যায় তাই পাটকে পরিবেশবান্ধব বলা হয়। পাট শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, এটি পরিবেশের জন্যও উপকারী। পাট চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পরিমাণ ন্যূনতম এবং এটি মাটির ঊর্ধ্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাটক্ষেতের সবুজ আবরণ বাতাসে অক্সিজেন তৈরি করে এবং কার্বন নিঃসরণ কমায়। গবেষকরা বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জৈবসার ব্যবহার করে পাট চাষ করলে এটি পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই কৃষি মডেলের অংশ হতে পারে। সোনালী আঁশের পুনর্জাগরণ একটি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্জন্মের সমতুল্য। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সজীব রাখবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দেশের রপ্তানি আয় বাড়াবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই কৃষি ও শিল্পের দুয়ার খুলে দেবে। আজকের প্রজন্মের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য এটি এক নতুন সম্ভাবনার জানালা। সোনালী আঁশ শুধু অতীতের গর্ব নয় এটি বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতীক।
পাটের উৎপাদন ও মাটির ঊর্ধ্বরতা
পাট বাংলাদেশের এক প্রধান অর্থকরী ফাইবার ফসল। এক হেক্টর জমিতে পাট চাষের মাধ্যমে প্রায় ১০.৩৯ টন শুকনো পদার্থ উৎপাদন করা যায় , যার মধ্যে প্রায় ১৮.৫% বা ১.৯২ মেট্রিক টন পাতা এবং ৮.২% বা ০.৮৫ মেট্রিক টন শিকড় মাটিতে পচে গিয়ে জৈবসার হিসেবে কাজ করে। 
(তথ্য সূত্র : বিজেআরআই (২০১৬) পাটের শুকনো পদার্থ এবং বিভিন্ন অংশের পরিমাণ বিশ্লেষণ।)
পাটের শিকড় গভীরভাবে বিস্তৃত হয়ে মাটির পুষ্টি সংগ্রহ করে এবং ডাটা ও অন্যান্য অংশও মাটিতে পচে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ পুনঃযোগ করে। এর ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী ফসলের ফলন উন্নত হয়। জৈবসার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির জলধারণক্ষমতা ও জীবাণুমূলক ভারসাম্য বৃদ্ধি পায়, যা টেকসই কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করলে কৃষক বেশি লাভবান হতে পারে এবং মাটি দীর্ঘমেয়াদে উত্তর ও স্বাস্থ্যকর থাকে।
পাটের খাদ্য ও গৃহস্থালি ব্যবহার
পাটশাক অনেক উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাদ্য। পাটখড়ি বাংলাদেশের মানুষ সারা বছর জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করে। ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্থানের চারপাশের বেড়া বা বাউন্ডারি তৈরিতে টিন, বাঁশ, ওয়াল ইত্যাদির বিকল্প হিসাবে পাটখড়ি ব্যবহার করা হয়। টয়লেট, বাথরুমসহ গৃহস্থালীর অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেই পাটখড়ি ব্যবহৃত হয়। এই সমস্ত  কাজ করার জন্য টিন, বাঁশ, ইট, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি ক্রয় করতে হলে অনেক অর্থ ব্যয় হতো। কিন্তু পাটের উৎপাদনের জন্য এই অর্থগুলো কৃষকের হাতেই থেকে যায়, ফলে কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। রপ্তানি ছাড়াও পাটের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাপক।
পাটের বহুমুখী ব্যবহার
পাটের ব্যবহার কেবল ফাইবারে সীমাবদ্ধ নয়; বীজ থেকে তেল, পাতা ও কচি ডাটা পশুখাদ্য, জৈবসার, সম্পূরক খাদ্য এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, পাটজাত উপকরণ জ্বালানি উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
পাটকে বাংলাদেশের সোনালী আঁশ বলা হলেও বর্তমানে একে ডায়মন্ড ফাইবার বলে অভিহিত করা হয়। এক সময় পাট দিয়ে শুধু চট, বস্তা, রশি এইসব জিনিসই তৈরি হতো। নান্দনিক সৌখিন জিনিসসহ গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতেও পাটের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) আবিষ্কৃত পচনরোধী পাটের তৈরি নার্সারি পট বনবিভাগ ও সামাজিক বনায়নে পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যবহার হচ্ছে। পাট দিয়ে তৈরি হচ্ছে শপিং ব্যাগ ও কম্বল। পাট উল বিজেআরআই উদ্ভাবিত একটি অন্যতম প্রযুক্তি যা ব্যবহার করে অল্প খরচে শীতের সুয়েটার  তৈরি করা হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারজাত হচ্ছে। 
এ ছাড়া বিলাসবহুল গাড়ির বড় অংশ, দমকল কর্মীদের পোশাক এবং নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে জুট জিও-টেক্সটাইল তৈরিতেও পাট ব্যবহৃত হচ্ছে। পাটের ব্যবহার হোম টেক্সটাইল, ফ্যাশন, হ্যান্ডিক্রাফট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করছে। এই বহুমুখী ব্যবহার পাটকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্প কাঁচামাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং দেশের কৃষি ও শিল্পখাতকে শক্তিশালী করছে। অতি সহজে পাটকে ফার্নিসিং ফেব্রিক্স হিসাবে ব্যবহার করা যায়। যেমন- ঘরের দরজা-জানালার পর্দা, সোফার কভার এই জাতীয় অনেক কাজ করা যায় পাটের তৈরি কাপড় দিয়ে। ‘ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট’ নামে সরকার একটি নতুন আইন পাস করতে যাচ্ছে যার ফলে সকল প্রকার দ্রব্যাদি যেমন- চাল, ডাল, চিনি, গম, ধান ইত্যাদি ১৯টি পণ্য প্যাকেজিং এর ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে পাটের তৈরি ব্যাগ বা বস্তা ব্যবহার করতে হবে। এতে পাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার আরও অনেক বেড়ে যাবে। 
নানাবিধ পাট পণ্য
ফ্যাশন শিল্পে পাট ব্যবহার করে হাতব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ, ট্র্যাভেল ব্যাগ, স্কুল ব্যাগ, মানিব্যাগ, ব্রিফকেস, স্যুটকেস ও কনফারেন্স ব্যাগ তৈরিতে বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছে। হ্যান্ডিক্রাফট পণ্য হিসেবে পাট দিয়ে জুতা, জায়নামাজ, জালি ব্যাগ, কাগজের মন্ড এবং সজ্জাসংক্রান্ত অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব। দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য জিনিসে পাটখড়ি জ্বালানি হিসেবে, বাউন্ডারি বা বেড়া নির্মাণে, টয়লেট বা বাথরুমরে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করে। এই নানাবিধ পাট পণ্যের ব্যবহার কৃষক, উদ্যোক্তা ও শিল্পখাতকে একযোগে লাভবান করছে এবং দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। 
    
লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বিজেআরআই, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭১৯৮৮৭৩৮২, 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন