কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৭:৫৬ PM

ঝুঁকিমুক্ত খাদ্য আমদানি সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫

ঝুঁকিমুক্ত খাদ্য আমদানি সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা
মো: কাওছারুল ইসলাম শিকদার
খাদ্য মানবদেহের সুস্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার জন্য অত্যাবশক। নিরাপদ খাদ্যই মানেই পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। খাদ্যে জৈবিক, রাসায়নিক ও ভৌত বিপত্তির কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়। খাদ্য যখন অনিরাপদ হয় এবং বিপত্তি মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে উপনীত হয় তখন স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করে। অনিরাপদ খাদ্য দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। 
খাদ্যকে নিরাপদ রাখার জন্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন, আমদানি-রপ্তানি ও পরিবহনের সাথে সম্পৃক্ত সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে বিপত্তি রোধে সর্বোচ্চ দৃষ্টি প্রদান আবশ্যক। নিরাপদ  খাদ্য নিশ্চিতকরণে বীজ থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, মজুদ, বিপণন ও ভোগ অবধি প্রতিটি স্তরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দেশে উৎপাদিত খাদ্য বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং বহির্বিশ্ব হতে আমদানিকৃত খাদ্যে যাতে বিপত্তি সৃষ্টি না হয় সেজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের আইন ও বিধি বিধান এবং নীতিমালা ও স্ট্যান্ডার্ডসমূহ অনুসরণ করে খাদ্য ও খাদ্যপণ্য  উৎপাদন এবং এক দেশ হতে অন্য দেশে আমদানি ও রপ্তানি করা হয়। দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও আমদানি রপ্তানির সাথে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও বন্দরসমূহ নিরাপদ খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রে দায়িত্ব অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে ।
ঝুঁকি নিরসনে প্রধান কাজ হলো খাদ্যকে নিরাপদ রাখা। বিশেষ করে যেসব অণুজীবের কারণে খাদ্য দূষিত ও অনিরাপদ হয়ে পড়ে, সে সকল অণুজীব যাতে খাদ্যে প্রবেশ করতে না পারে সে পরিবেশ নিশ্চিত করা। সেজন্য খাদ্যকে আমরা তিনভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, আমিষ জাতীয় খাদ্য অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হয়। আমিষ জাতীয় খাদ্যে অনুজীব বা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ইত্যাদি দ্রুত বিস্তার করে। খাদ্যকে দূষিত করে ফেলে। তাই আমিষজাতীয় খাদ্য  মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রায় রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা হয়। দ্বিতীয়ত, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি খাদ্য আমিষ জাতীয় খাদ্যের তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ সে কারণে এ ধরনের খাবারকে পাঁচ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা হয়। এ দুই ধরনের খাদ্য মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে হিমাগার প্রয়োজন হয়। আর পারিবারিক পর্যায়ে রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করা হয়। অপরদিকে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, ডাল ইত্যাদি শস্যজাতীয় খাদ্যকে অনুজীব থেকে রক্ষায় (১২-১৪)% আর্দ্রতার মধ্যে এনে সংরক্ষণ করা হয়। এ ধরনের শস্য হতে যত বেশি আদ্রতা দূরীভূত হবে সেটি ততবেশি সময় সংরক্ষণযোগ্য হবে। কারণ আর্দ্রতা জীবাণুর বংশ বৃদ্ধির জন্য উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করে। 
শুকিয়ে ডানেজ বা মাচায় মাটি থেকে ন্যূনতম ছয় ইঞ্চি উপরে প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি বা স্বাস্থ্যসম্মত পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষণাগারে আলো বাতাসের সুযোগ রাখা জরুরি। যাতে করে শস্যের গুণাগুণ অক্ষুণœ থাকে। অবশ্যই আর্দ্রতামুক্ত পরিবেশ ও উপযোগী তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে হয়। অপরদিকে ধোয়া, ঝাড়াই-বাছাই ইত্যাদির মাধ্যমে খাদ্যের রাসায়নিক ও ভৌত দূষণ বা বিপত্তি দূর করা হয়। অনেকক্ষেত্রে বালাইনাশক প্রয়োগের পর অপেক্ষমাণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর রাসায়নিক দূষণ বা বিপত্তি  হ্রাস পায়। তাই উৎপাদন পরবর্তী খাদ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক জাহাজে পরিবহনে দূষণ বা বিপত্তি  যাতে না বাড়ে সেজন্য খাদ্যের ধরন অনুযায়ী উপযোগী তাপমাত্রা, কন্টেইনার এবং যথাযথ প্যাকেজিং ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়।
কোন পণ্য আমদানির পূর্বে সরকার নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ হতে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করে এল সি বা লেটার অফ ক্রেডিট এর মাধ্যমে পণ্য আমদানির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। যদি কোন পণ্য অনিরাপদ হয় সেক্ষেত্রে  সে পণ্য আমদানির অনুমতি প্রদান করা হয় না। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ আমদানিকারক উপস্থাপিত পত্রাদি বা ডকুমেন্টস যাচাই-বাছাই করে পণ্যের গুণাগুণ নিশ্চিত হয়ে আমদানির জন্য অনাপত্তি প্রদান করে। আমদানিকারক অনাপত্তি সনদ পেয়ে রপ্তানিকারক দেশ হতে প্রয়োজনীয় সকল নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করে।        রপ্তানিকারক দেশের বন্দরে আণয়ন এবং তৎপরবর্তী জাহাজীকরণে উপযুক্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করে। কোন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক দেশ, সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদনকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী বা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিবেচনায় আনা হয়। সেই সাথে এ সকল খাদ্য প্রস্তুতে কি ধরনের  উপকরণ যুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মান, রং এবং সুগন্ধি ইত্যাদি যথাযথ বা উপযুক্ত উৎস হতে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না সে নিশ্চিত করা হয়। সেইসাথে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান, বৈশ্বিক স্বীকৃতি-সনদ যেমন আইএসও সার্টিফিকেশন, হাইজিন ও স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ পানি, মোড়কের গুণগত মান ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। 
রপ্তানিকারক দেশের উৎপাদক বা প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান হতে আমদানিকারক দেশের বন্দর এবং বন্দর হতে পণ্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত উপায়ে খালাসকরণ এবং পরিবহন, মজুদ ও বিপণন করে। পণ্য ভোক্তার নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত মনিটরিং এবং প্রয়োজনে নিম্নমানের পণ্য ডিলার হতে প্রত্যাহার, এবং সরকারি আইন ও প্রবিধানমালা অনুযায়ী জব্দকরণ বা ধ্বংসকরণ করা হয়। যাতে কোনোক্রমে খাদ্য-বিপত্তি মানবদেহে প্রবেশ করে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সৃষ্টি না করে(চালানভিত্তিক পণ্যের রিস্ক প্রোফাইল বা ঝুঁকি শ্রেণী নির্ধারণ সারণি দ্রষ্টব্য)। অতঃপর ঝুঁকির শ্রেণী অনুযায়ী বন্দর হতে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ঝুঁকিমুক্ত পণ্যগুলো গ্রীন চ্যানেল দিয়ে পার হয়ে যায় সেগুলোকে পরিদর্শন বা পরীক্ষা করা হয় না। অপরদিকে যে চালানের পণ্য মিডিয়াম রিস্ক প্রোফাইল বা ঝুঁকির শ্রেণী ইয়েলো বা হলুদ সেগুলো পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শন সন্তোষজনক হলে পণ্য বন্দর হতে খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। আর যেসব  চালানোর পণ্য হাই রিস্ক প্রোফাইল বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো পরিদর্শন এবং কন্টেইনার হতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হয়। পরীক্ষার  ফলাফল সন্তোষজনক হলে  বন্দর হতে ছাড়করণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অসন্তোষজনক হলে সেগুলো বন্দর হতে ফেরত পাঠানো অথবা ধ্বংসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বহির্বিশ^ হতে নিরাপদ খাদ্য আমদানিতে করণীয়  
া সকল খাদ্য আমদানি কারকগণকে নিবন্ধনভুক্ত করে নিরাপদ খাদ্য আমদানি বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন,  বিধিবিধান এবং মান বা স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে অবহিত করন;
া খাদ্য আমদানিতে কোডেক্স স্বীকৃত মান বা স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণে গুরুত্ব আরোপ;
া যে সকল দেশ উত্তম কৃষি চর্চা অনুশীলন করে খাদ্য উৎপাদন করে এবং যেসব খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান বিশ^ স্বীকৃত (ওঝঙ) সনদ প্রাপ্ত তাদের খাদ্য আমদানিকরন;
া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য আমদানিতে কোডেক্স স্বীকৃত মান অনুসরণ;
া খাদ্য আমদানি হতে ভোক্তা অবধি পৌঁছানো পর্যন্ত পণ্যভিত্তিক শীতলীকরণ নির্দেশনা অনুসরণ করে পণ্য মজুদ, পরিবহন এবং আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম সম্পাদন; 
া প্রতিটি পণ্যের ঝুঁকি প্রোফাইল (জরংশ চৎড়ভরষব) তৈরি করে সবুজ, হলুদ, লাল চ্যানেলে পণ্য বন্দর হতে খালাসের ব্যবস্থা গ্রহণ;
া খাদ্যের ধরণ অনুযায়ী বিপত্তি পরীক্ষা সম্পাদনে আধুনিক ও স্বীকৃত পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা;
া প্রতিটি খাদ্যের জন্য প্যারামিটার নির্ধারণ ও স্বীকৃত ল্যাবে তা পরীক্ষাকরণ;
া প্রবেশ বন্দরে খাদ্য সংরক্ষণে আধুনিক ও মানসম্মত অবকাঠামো বিনির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ, যাতে আমদানিকৃত খাদ্যের মান অটুট থাকে;
া প্রবেশ বন্দরে আগত জাহাজ হতে খাদ্য ও খাদ্যপণ্য দ্রুত খালাসে জাহাজ আগমনের আগেই আগাম অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ;
া আধুনিক ও মানসম্মত পরিবহন ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় ভোক্তার নিকট নিরাপদ উপায়ে খাদ্য পৌঁছানো;
া দেশের অভ্যন্তরে আমদানিকৃত খাদ্য ভোক্তা অবধি নিরাপদে পৌঁছাতে পণ্যের সংরক্ষণ, বিপণন, ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ;
া নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য আমদানি নিশ্চিতে সকল  আমদানিকারকদের আমদানি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, মনিটরিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
 
লেখক : যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সেক্টর ০৫, রাস্তা ০৩, বাড়ি ৫৮, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০, মোবাইল : ০১৭৯০১৭৭৯৪৫,ই-মেইল kawserul1173@gmail.com,
ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন