কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ মে, ২০২৫ এ ১০:৩১ PM

জুট জিও-টেক্সটাইল : পাটজাত পণ্যের একটি পরিবেশবান্ধব, সম্ভাবনাময় ও লাভজনক প্রযুক্তি

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: জ্যৈষ্ঠ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৫-২০২৫

জুট জিও-টেক্সটাইল : পাটজাত পণ্যের একটি পরিবেশবান্ধব, সম্ভাবনাময় ও লাভজনক প্রযুক্তি
ড. এ. টি. এম. মোরশেদ আলম১ ড. মো. আবু সায়েম জিকু২
পাট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী আঁশ ফসল। এ দেশের সোনালী আঁশ নামে পরিচিত পাট একসময় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু, বর্তমানে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানী কওে বৈদেশিক মুদ্রার মাত্র ৪-৫% অর্জিত হয়। আশির দশকে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পাটের অগ্রযাত্রাবিঘিœত হয়। নানা ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে বর্তমানে এই পাট পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করেছে অতীত ঐতিহ্য নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী জুড়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় বর্তমান বিশ্বে প্রাকৃতিক আঁশের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ বান্ধব বহুমুখী পাটজাত পণ্য উদ্ভাবনের ফলে অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ব বাজারে পাটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদ্ভাবিত বহুমুখী পাটজাত পণ্যের মধ্যে একটি সম্ভাবনাময় পণ্য হলো জুট-জিও টেক্সটাইল। এটি মূলত পাট দিয়ে প্রস্তুতকৃত একটি পরিবেশবান্ধব পণ্য যা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি প্রযুক্তি হিসেবে সিভিল কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে কৃষি জমিতে মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণে জুট-জিও টেক্সটাইলস মালচিং হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশবান্ধব জুট-জিও টেক্সটাইলস-এর বহুমুখী ব্যবহার দিন দিন এর ব্যবহারকারীদের কাছে সমাদৃত হচ্ছে।
জুট জিও-টক্সটাইল
জুটজিও-টেক্সটাইলস মূলত পাট দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব পাট পণ্য। জুটজিও-টেক্সটাইল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় রাস্তা নির্মাণ, নদীর পাড়, পাহাড়ের ঢাল রক্ষা প্রভৃৃতি কাজে। ইহা মাটির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে দুর্বল ও অকার্যকর মাটিকে  টেকসই করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আধুনিক সিভিল/কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ জুটজিও টেক্সটাইলস-এর কদর দিন দিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জুট জিও-টেক্সটাইলস-এর উৎপাদন এবং ব্যবহার
জুট জিও-টেক্সটাইলস পণ্যটি সম্পূর্ণ পাট দ্বারা তৈরি এক ধরনের কাপড়। পরিবেশবান্ধব এই কাপড় রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড়ের ভাঙ্গন রোধ এবং পাহাড় ধস রোধে ব্যবহার করা হয়। পানিউন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু বিভাগ, রেলওয়ে এবং  সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কার্স অর্গানাইজেশন নির্মিত গ্রামীণ রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণ, নদীর পাড় সংরক্ষণ ও পাহাড়ধস রোধসহ উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে জুটজিও টেক্সটাইলস ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বিজেএমসির লতিফ বাওয়ানি জুটমিল, করিম জুটমিল, ইউএমসি জুটমিল এবং জনতা জুটমিল জুটজিও-টেক্সটাইলস উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ করতে সক্ষম। দেশে উৎপাদিত জুট-জিও টেক্সটাইলসের মান সম্পর্কে বুয়েটের গবেষকরা জানান, কমন ফান্ড ফর কমোডিটিজের অর্থায়নে পরিচালিত এক মাল্টি-কান্ট্রি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে মোট ১৪টি ফিল্ড ট্রায়াল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এগুলোর ফলাফল ভাল। এতে বুঝা যায়, দেশে উৎপাদিত জুট-জিও-টেক্সটাইলসের মান ভাল।
রাস্তা নির্মাণে জুট জিও-টেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়, যা মাটিকে শক্তিশালী করে, গ্রামীণ রাস্তার গুণগত মান উন্নত করে, রাস্তা টেকসই করে। ভূমিক্ষয় রোধে জুট জিও-টেক্সটাইল ব্যবহারের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, পানি প্রবাহ, বাতাসের গতি উপরিভাগের মাটি স্থানান্তরিত হওয় রোধ করে, বৃষ্টি ও বন্যার পানি গড়ানোর সময় মাটির ভাসিয়ে নেওয়া প্রতিহত করে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি পাহাড়ের ঢাল ব্যবস্থাপনায় জুট জিও-টেক্সটাইল ব্যবহার করা হয় যা পাহাড়ের ভূমি ধস রোধ করে, ধসে যাওয়া ভূমির স্থায়িত্ব প্রদান করে। এমনকি কৃষি কাজে ও জুট জিও-টেক্সটাইল মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করে, জমিতে আগাছা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শীতকালীন সবজির জমিতে মালচিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জুট জিও-টেক্সটাইলস-এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব 
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকবৃন্দ বিটুমিন ট্রিটেড এবং ন্যাচারাল এডিটিভ ট্রিটেড এই দুই ধরনের জুট-জিও টেক্সটাইলস উদ্ভাবন করেন। বাংলাদেশে উৎপাদিত জুটজিও-টেক্সটাইলস উন্নতমানের। গুণগত মানভেদে প্রতি বর্গমিটার জুট জিও- টেক্সটাইলসের দাম পড়ে প্রায় ৫৬-৫৮ টাকা অথবা ৭০-৮০ টাকা। অথচ এক বর্গমিটার সিনথেটিক জিও টেক্সটাইলসের দাম পড়ে ১৮০-২০০ টাকা। সিনথেটিক জিও-টেক্সটাইলস পরিবেশ বান্ধব নয় এবং একশ বছরেও এটি মাটির সংঙ্গে মিশে না। অথচ জুটজিও- টেক্সটাইলস খুব দ্রুত পচে মাটির সংঙ্গে মিশে যায় যা পরিবেশ বান্ধব এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এটি ব্যবহার করলে পাঁচ বছরের মধ্যেই তা মাটির স্তর তৈরি করে ফেলে। বিশেষজ্ঞরা আরও জানান প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৭ হাজার টন জুটজিও-টেক্সটাইলস বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। (টেক্সটাইল টুডে, ২০১৯) বুয়েট ও বিজেআরআই-এর গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়েছে যে, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ১২ কোটি ৬৯ লাখ বর্গমিটার জুট-জিও টেক্সটাইলের চাহিদা রয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬৬৫ কোটি টাকা। বর্তমানে এই চাহিদা সিনথেটিক জিও টেক্সটাইলসের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। সিনথেটিকের পরিবর্তে জুট-জিও টেক্সটাইলসের ব্যবহার শুরু হলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে যা জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
জুটজিও-টেক্সটাইল প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিজেআরআই-এর সাফল্য 
মাটির ক্ষয়রোধ, নদী ভাঙন, পাহাড়ের ঢাল রক্ষায় ন্যাচারাল এডিটিভ (খধঃবী) ট্রিটেড জুটজিও-টেক্সটাইল নামক নতুন প্রযুক্তি বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবন করা হয়েছে। উক্ত প্রযুক্তি গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা অনুযায়ী ফরিদপুর জেলার বালিয়াকান্দির জঙ্গল বাড়িতে গড়াই নদীতে ৪০০ মিটার তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পে ন্যাচারাল এডিটিভ ট্রিটেড জুটজিও-টেক্সটাইল পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়েছে যা স্বার্থকভাবে ০৬ বছর যাবৎ টিকে আছে। এছাড়াও  গোপালগঞ্জের আঁড়িয়াল খাঁ নদীর ২০০ মিটার তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পেও উক্ত ন্যাচারাল এডিটিভ ট্রিটেড জুটজিও-টেক্সটাইল দ্বারা প্রস্তুতকৃত নদীর তীর রক্ষা বাঁধ টিকে আছে। বুয়েটের প্রফেসর ড. আব্দুল জব্বার খান-এর পরামর্শে বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি বাংলাদেশ আর্মির ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট রংপুরের ঘাঁঘট নদীর তীর রক্ষায় প্রয়োগ করেছে। সম্প্রতি ঢাকা শহরের নান্দনিক স্থান হাতিরঝিল প্রকল্পে জুট জিও- টেক্সটাইল ব্যবহার করা হয়েছে যা সফলভাবে কার্যকর আছে। ন্যাচারাল এডিটিভ ট্রিটেড জুট-জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে যা দুই বছর ধরে সফলভাবে টিকে আছে। উক্ত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে BSTI, JGTFabric-এর একটি Standardization করেছেন। বিজেএমসির অধিনস্থ রাংগুনিয়ার কেএফডি জুট মিলে ন্যাচারাল এডিটিভ ট্রিটেড জুট-জিও টেক্সটাইল প্রযুক্তিটি বিজেআরআই কর্তৃক হস্তান্তর করা হয়। ফলে নব উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে পাটশিল্পে জুটের কাপড় ব্যবহারে এক নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে যাতে বছরে প্রায় ৪০০-৫০০ কোটি টাকার সিনথেটিক জিও-টেক্সটাইলস আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে।
পরিশেষে জুট জিও টেক্সটাইল একটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক ঃ ১ ড. এ. টি. এম. মোরশেদ আলম, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২ ড. মো. আবু সায়েম জিকু, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল ফোন : ০১৭৪০-৫৫৯১৫৫, 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন