কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬ এ ১১:৩১ AM

জীবিকাভিত্তিক কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষির পথে বাংলাদেশ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৩-২০২৬

জীবিকাভিত্তিক কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষির পথে বাংলাদেশ
ড. মোঃ শহিদুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যার সার্বিক উন্নয়ন অনেকটাই কৃষিখাতের অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ কোনো না কোনোভাবে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে কৃষির রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, যা দেশের অর্থনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ। তবুও দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনও জীবিকাভিত্তিক কৃষিকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যেখানে চাষাবাদের মূল উদ্দেশ্য পারিবারিক খাদ্য চাহিদা পূরণ। তারা মূলত নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ফসল উৎপাদন করেন আর প্রায়ই কৃষিকাজ তাদের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু এই ধরনের কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক সীমাবদ্ধতা, যেমন অস্থিতিশীল আয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানের অভাব, এবং দূর্বল বাজার ব্যবস্থা। ফলে কৃষিকাজ অধিকাংশ সময়েই লাভজনক ও টেকসই ব্যবসা হিসেবে গড়ে ওঠে না, যা আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে দেয়।
জীবিকাভিত্তিক কৃষির বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক এখনও জীবিকাভিত্তিক কৃষির মধ্যেই আবদ্ধ, যার একটি বড় বাস্তবতা হলো জমির আকার ও কাঠামো। দেশের অধিকাংশ কৃষকেরই জমির পরিমাণ ৫০ শতকেরও কম এবং অনেক সময় তাও বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত। এর ফলে জমিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কিংবা হারভেস্টার ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন ছোট পরিসরের চাষাবাদে প্রযুক্তি প্রয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায় এবং কৃষককে নির্ভর করতে হয় প্রচলিত ও শ্রমনির্ভর কৃষি পদ্ধতির ওপর।
বর্তমানে অধিকাংশ কৃষিকাজই এখনো প্রথাগত ধাঁচে পরিচালিত হয়, যেখানে উন্নত বীজ নির্বাচন, সঠিক সময়ে সেচ, পরিমিত ও কার্যকর সার প্রয়োগ এবং সমন্বিত কীটনাশক/পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মতো বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োগ দুর্লভ। উন্নত জাতের বীজ, রাসায়নিক ও জৈব সার, নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা বা উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি- এসবের অনেক কিছুই এখনও সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে।
এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা হলো দুর্বল বাজার ব্যবস্থা। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারে সঠিক সময়ে এবং ন্যায্য দামে বিক্রি নিশ্চিত করার মতো কাঠামো এখনো যথেষ্ট মজবুত নয়। কৃষক ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগের অভাব, পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি, এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনা এসবের কারণে কৃষককে অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে উৎপাদিত ফসলের প্রকৃত মূল্য তারা পান না।
ফসল কাটার পর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় বহু কৃষিপণ্য ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যায় বা পচে যায়, যার ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। সব মিলিয়ে কৃষি খাতে আয় স্থায়ী বা পূর্বানুমানযোগ্য থাকে না এবং কৃষক পরিবারগুলো প্রায়ই অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল আর্থিক অবস্থায় দিন যাপন করেন। এ অবস্থা তাদের দারিদ্র্য চক্র থেকে বের হতে দেয় না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা বহন করে চলতে হয়।
বাণিজ্যিক কৃষির প্রয়োজনীয়তা ও সুফল : বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি পণ্য বাজারের প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাদেশের কৃষিকে আধুনিক এবং বাণিজ্যিক রূপে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। বাণিজ্যিক কৃষি বলতে বুঝায় একটি পরিকল্পিত প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাজারমুখী চাষাবাদ যেখানে লাভ অর্জনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
বাণিজ্যিক কৃষির সুফলতা : কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে যেসব সফলতা অর্জন যায় তা নি¤েœ বর্ণনা করা হলো-
কৃষকের আয় বৃদ্ধি : উন্নত জাত ও প্রযুক্তি প্রয়োগ, ফলন বাড়ানো এবং বাজারমুখী ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষকের আয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান : বাণিজ্যিক কৃষি গ্রামে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুদামজাতকরণ এবং পরিবহন খাতে।
ফসল বৈচিত্র্য ও পুষ্টিকর খাদ্য : এক ফসলি চাষাবাদ থেকে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর ফসল চাষ সম্ভব হয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখে।
রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় : কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি : কৃষিতে পুঁজি প্রবাহ বাড়লে গ্রামের সামাজিক-আর্থিক অবকাঠামো উন্নত হয় এবং দারিদ্র্য কমে।
বাংলাদেশে উদ্যান ফসলে বাণিজ্যিক কৃষির অনেক সফল গল্প আছে। একটি উদাহরণ হিসেবে যশোরের এক তরুণ উদ্যোক্তার কথা উল্লেখ করা যায়, যিনি আম বাগান করে সঠিক বাজার সংযোগের মাধ্যমে বছরে ১৫ লক্ষ টাকার বেশি আয় করছেন। তার সফলতা অনেক কৃষককে বাণিজ্যিক চাষাবাদের দিকে উৎসাহিত করছে।
নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের গুরুত্ব : বাণিজ্যিক কৃষিকে সফল করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুসংগঠিত নীতি এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন।
উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ : গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে দ্রুততর প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে। নতুন জাত ও প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষকও উপকৃত হন।
সহজ কৃষিঋণ ও সাশ্রয়ী ফসল বীমা : ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং ক্ষতিপূরণের জন্য কার্যকর ফসল বীমা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
বাজার কাঠামোর উন্নয়ন : ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আধুনিক হিমাগার, কৃষিপণ্য সংগ্রহ কেন্দ্র ও ডিজিটাল মার্কেট প্লেস গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষক সরাসরি বাজারের সাথে যুক্ত হতে পারবেন।
অঞ্চলভিত্তিক বৈচিত্র্যকরণ : বিভিন্ন অঞ্চলের উপযোগী ফসল নির্বাচন করে বিশেষায়িত কৃষি অঞ্চল গড়ে তোলা দরকার, যাতে স্থানীয় পরিবেশ ও চাহিদার সঙ্গে খাপ খায়।
বেসরকারি খাত ও এনজিওর ভূমিকা : বাণিজ্যিক কৃষি প্রসারে বেসরকারি খাত এবং এনজিওর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা কৃষকদের চুক্তিভিত্তিক কৃষি কার্যক্রমে যুক্ত করে নিশ্চিত বাজার প্রদান করতে পারে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে। নগদ সহায়তা ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধার মাধ্যমে বীজ, সার এবং যন্ত্রপাতি কেনায় সাহায্য করা বাণিজ্যিক কৃষিকে আরো জোরদার করবে।
মুখ্য চ্যালেঞ্জসমূহ : বাণিজ্যিক কৃষির পথে কয়েকটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে: ক) জমির খ-ায়ন ও উত্তরাধিকারজনিত সমস্যা, যা বৃহৎ ও সুষম চাষাবাদে বাধা সৃষ্টি করে; খ) আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য কৃষকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি; গ) মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, যারা কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে; ঘ) জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়া ঝুঁকি, যা ফলন ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ঙ) সার, বীজ ও ডিজেলের ঘাটতি, যা মৌসুমের সময় কৃষি কার্যক্রম ব্যাহত করে।
সম্ভাব্য সমাধান ও সুপারিশ
ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ কেন্দ্র : মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকদের আবহাওয়া তথ্য, বাজার দর, ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে; সমবায়ভিত্তিক ফার্মিং : ক্ষুদ্র কৃষকদের সমবায়ে নিয়ে যন্ত্রপাতি ও বিপণনের সুবিধা ভাগাভাগি করা দরকার; ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি : জলবায়ু সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবহাওয়া ঝুঁকি কমাতে হবে।
বাণিজ্যিক কৃষি পার্ক : বিশেষ অঞ্চলগুলোতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক হাব তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ তখনই নিশ্চিত হবে, যখন জীবিকাভিত্তিক কৃষির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে দৃঢ়ভাবে বাণিজ্যিক কৃষির পথে অগ্রসর হবে এবং তা আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করবে। এই রূপান্তর শুধু কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন নয়, দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে। সরকারের দূরদর্শী নীতিমালা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং কৃষকের শ্রম, উদ্যম ও মানসিক প্রস্তুতির সমন্বয়ে গড়ে তোলা সম্ভব একটি আধুনিক, স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও লাভজনক কৃষি ব্যবস্থা- যেখানে কৃষক শুধু উৎপাদক নয়, হবেন একজন সচেতন উদ্যোক্তা; কৃষি হবে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পেশা, আর গ্রাম হবে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির আধার।

লেখক : কৃষি বিজ্ঞানী ও প্রাক্তন মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), মোবাইল : ০১৭১৩০০২১৮০

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন