জিঙ্ক-বায়োফর্টিফায়েড চাল : নারী ও শিশুর পুষ্টি নিরাপত্তার সম্ভাবনা
কৃষিবিদ হুমায়ুন কবীর
বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনো অপুষ্টি ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর মধ্যে জিঙ্ক ঘাটতি একটি ‘নীরব পুষ্টিহীনতা’ যা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে দরিদ্র নারী ও শিশুদের ওপর। এই প্রেক্ষাপটে জিঙ্ক-বায়োফর্টিফায়েড চাল দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
জিঙ্কের ঘাটতি : জিঙ্কের ঘাটতি নীরব কিন্তু গভীর সংকট হয়ে থাকে। জিঙ্ক আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ, বৃদ্ধিজনিত কার্যক্রম ও মানসিক বিকাশে অত্যাবশ্যকীয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ঘাটতি জন্ম দেয় খর্বাকৃতি (ংঃঁহঃরহম), ঘনঘন ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের। গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘ প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জাতীয় পুষ্টি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪০% শিশুর ও ৩০% নারীর শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি রয়েছে। মূলত চালনির্ভর খাদ্যাভ্যাস, একঘেয়ে ডায়েট এবং প্রোটিনভিত্তিক খাবারের ঘাটতির কারণেই এই সমস্যা প্রকট হয়েছে।
জিঙ্ক-বায়োফর্টিফায়েড চাল
বায়োফর্টিফিকেশন হলো উদ্ভিদ প্রজননের মাধ্যমে ফসলের পুষ্টিগুণ বাড়ানোর একটি প্রাকৃতিক ও টেকসই প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হারভেস্টপ্লাস ও আইআরআরআইের সহায়তায় ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান১০০ ও ব্রি ধান১০২ এর মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) থেকে উদ্ভাবিত বিনা ধান-১০ ও বিনা ধান-২০ জিঙ্কসমৃদ্ধ। এই জাতগুলোতে প্রতি কেজিতে ২২-২৫ মিগ্রা. জিঙ্ক থাকে, যেখানে প্রচলিত জাতগুলোতে থাকে ১৫-১৮ মিগ্রা.। নিয়মিত এই চাল খেলে শিশুদের দৈনিক জিঙ্ক চাহিদার ৬০% এবং নারীদের প্রায় ৪০% পূরণ করা সম্ভব।
ক্ষেত্র পর্যায়ের সাফল্য
সাতক্ষীরা, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই ধানের পরীক্ষামূলক চাষে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। কৃষকরা বলছেন, জিঙ্কসমৃদ্ধ চাল জাতগুলো ভালো ফলন দেয়, রোগবালাই সহনশীল এবং বাজারমূল্যও ভালো।
ব্রি’র ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলগামী শিশুরা ৬ মাস নিয়মিত জিঙ্ক চাল খেয়ে উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি ডায়রিয়া ও সর্দি-কাশির মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার কমিয়েছে। দরিদ্র নারীদের মধ্যে গর্ভকালীন জটিলতা ও প্রসব পরবর্তী দুর্বলতা হ্রাস পেয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই চাল স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে। এর জন্য বহুমূল্য সাপ্লিমেন্ট বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রয়োজন নেই, ফলে এটি স্বল্প-আয়ের মানুষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ও টেকসই সমাধান।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
জিঙ্ক-বায়োফর্টিফায়েড চাল শুধু একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার নয়, এটি বাংলাদেশের এসডিজি লক্ষ্য ২ (ক্ষুধামুক্তি) এবং এসডিজি ৩ (সকলের সুস্বাস্থ্য) অর্জনের দিকেও এক বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। পদক্ষেপ :
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত বীজ বিতরণ;
স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ও সরকারি খাদ্য সহায়তায় জিঙ্কসমৃদ্ধ চাল অন্তর্ভুক্ত;
গণসচেতনতা বৃদ্ধির ক্যাম্পেইন, বিশেষ করে নারীদের টার্গেট করে;
বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে উৎসাহ দেওয়া।
জিঙ্ক-বায়োফর্টিফায়েড চাল হয়তো কোনো ম্যাজিক নয়, তবে এটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি কার্যকর, স্বল্পমূল্যের ও টেকসই সমাধান। যেখানে দরিদ্র নারীরা একটি পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে নিজেদের ও সন্তানদের সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন।
বাংলাদেশ যদি এখনই সঠিক নীতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুস্থ জাতি গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
লেখক : অতিরিক্ত উপপরিচালক (এলআর) ও পিএইচডি ফেলো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৬৮৭০০২০৯৪