কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৪ এ ০৪:৫৪ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ৩১-০১-২০২৪
জলবায়ু পরিবর্তনে গবাদি পশু-পাখির উপর
প্রভাব এবং অভিযোজন কলাকৌশল
ডা. মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ
জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের দেশ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রতি বছর বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। মানুষ হারাচ্ছে তাদের ফসল ও গবাদি পশু-পাখি। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। পার্বত্যঞ্চলে পাহাড়-ধসে ঘটছে জীবনহানির ঘটনা। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, প্রবল বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি কারণে পশুপাখির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে খামার মালিক বা কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাস্তবতা মেনে নিয়েই সামুদ্রিক ঝড়, টর্নেডো, বন্যা, খরা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে বনাঞ্চলের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়াও উপকূলীয় বনায়ন পরিকল্পনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলের বনায়ন সম্প্রসারণ, দেশের নদ-নদী খাল উদ্ধার ও পুনঃখনন এবং ছোট বড় পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশে সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণসহ ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এগুলো হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ব্যবস্থা। এসব বাস্তবায়নের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশ তথা পশু-পাখি রক্ষা করা যাবে। নি¤েœ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গবাদি পশু-পাখি পালনে প্রধান সমস্যাগুলো তুলে ধরা হলো -
খরাজনিত সমস্যা
খরায় যে সকল সমস্যা দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে- কাঁচা ঘাসের অভাব দেখা দেয়; সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়; গবাদিপশু অপুষ্টিতে ভোগে; গবাদিপশুর বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দেয়; মাঠ-ঘাটের ঘাস শুকিয়ে যায়; পশুর বহিঃদেশের (ঊীঃবৎহধষ) পরজীবীর উপদ্রব বৃদ্ধি পায়; অধিক তাপ পশুপাখির জন্য অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি করে; গবাদিপশুর স্বাস্থ্যের অবনতিসহ মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দেয়; তাপপীড়নে (ঐবধঃ ংঃৎবংং) খামারে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির মৃত্যু হয়।
বন্যাজনিত সমস্যা
বন্যা পরিস্থিতিতে যে সকল সমস্যা দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে- জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়; দেশের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায়; রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটে; গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেয়; পানি দূষিত হয়; পশুপাখি রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যার সৃষ্টি হয়; গবাদি পশু অপুষ্টিতে ভোগে; বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ও কৃমির আক্রমণ বৃদ্ধি পায়; ঘাসে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়, গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়ে; পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়, অনেক পশুর মৃত্যু হয়।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসজনিত সমস্যা
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় যে সকল সমস্যা দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে- ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে বহু গবাদিপশু ও জীবজন্তু তাৎক্ষণিক মারা যায়; জলোচ্ছ্বাস-কবলিত এলাকার পানি দূষিত হয়ে সুপেয় পানির অভার দেখা দেয়; সৎকারের অভাবে মৃত পশুপাখি পচে বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি করে পরিবেশ দূষিত করে; পশু খাদ্যের সংকট দেখা দেয়; জীবিত গবাদিপশু উদরাময়, পেটের পীড়া ও পেট-ফাঁপাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গবাদি পশু-পাখির অভিযোজন কলাকৌশল
কোনো প্রজাতি তার পরিবেশে নিজেকে খাপখাইয়ে নেওয়ার কৌশলকে অভিযোজন বলে। তাই অভিযোজন পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ও বায়ুর উপাদান, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ঐসব স্থানের উচ্চতা এবং জীবের শারীরিক গঠন ও দৈহিক অবস্থা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। অভিযোজনের এসব উপাদান মোকাবিলা করেই জীব তার অবস্থানে টিকে থাকে। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। প্রতিকূল ও বিরূপ পরিবেশে পশু-পাখির অভিযোজনের জন্য মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন। তাই খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসজনিত সমস্যা সমাধানের উপর অধিক গুরুত্ব¡ দিতে হবে।
খরায় পশু-পাখি রক্ষার কৌশল : অধিক উৎপাদন ও খরা সহনশীল জাতের ঘাস চাষ বাড়াতে হবে। কাঁঠাল, ইপিল-ইপিল,বাবলাসহ বিভিন্ন গাছ-পাতার চাষ বৃদ্ধি করতে হবে এবং খরার সময় এসব গাছের পাতা পশুকে খাওয়াতে হবে; খরার সময় পশুকে ভাতের ফেন, তরকারির উচ্ছিষ্ট অংশ, কুঁড়া, গমের ভুসি, ডালের ভুসি, খৈল, ঝোলাগুড় পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়াতে হবে; গবাদিপশুকে নিয়মিত সংক্রামক রোগের টিকা দিতে হবে; পশুকে কাঁচা ঘাসের সম্পূরক খাদ্য (যেমন - সবুজ অ্যালজি) খাওয়াতে হবে; খরা মৌসুম আসার পূর্বেই ঘাস দ্বারা সাইলেজ ও হে তৈরি করে রাখতে হবে। যা খরা মৌসুমে গবাদিপশুকে খাওয়ানো যাবে; গবাদিপশুকে শুষ্ক খড় না খাইয়ে ইউরিয়া দ্বারা প্রক্রিয়াজাত খড় ও ইউরিয়া মোলালেস ব্লক খাওয়ানো যেতে পারে; গবাদিপশুকে পর্যাপ্ত দানাদার খাদ্য দিতে হবে; পশুকে বেশি করে পরিষ্কার পানি পান করাতে হবে; পশুকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে; পশুর শরীর সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; গবাদিপশুকে পরজীবী প্রতিরোধে নিয়মিত কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে; পশুকে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে এবং প্রখর রোদে নেওয়া যাবে না।
বন্যায় পশু-পাখি রক্ষার কৌশল: গবাদিপশুকে যথাসম্ভব উঁচু ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে; গবাদিপশুকে পরিষ্কার পানি খাওয়াতে হবে, গবাদিপশুর মৃতদেহ গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে; বন্যার সময় গবাদিপশুকে খাদ্য হিসাবে খড়, চালের কুঁড়া, ভুসি ও খৈল বেশি করে খাওয়াতে হবে; এ সময় কচুরিপানা, দলঘাস, লতাগুল্ম এমনকি কলাগাছও গবাদিপশুকে খাওয়ানো যেতে পারে; কাঁচা ঘাসের বিকল্প হিসাবে হে ও সাইলেজ খাওয়ানো যেতে পারে; বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে পতিত জমিতে বিভিন্ন জাতের ঘাসের বীজ ছিটিয়ে দিতে হবে; গবাদিপশুকে সংক্রামক রোগের টিকা দিতে হবে ও কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে।
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে পশু-পাখি কলাকৌশল : উঁচুস্থানে গবাদি পশু-পাখির বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে; ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে গবাদিপশুকে উঁচু আশ্রয়স্থলে নিয়ে বেঁধে রাখতে হবে। সম্ভব হলে নিকটস্থ ‘মুজিব কেল্লায়’ নিয়ে যেতে হবে; ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর মৃত পশুকে দ্রুত মাটির নিচে চাপা দিতে হবে; এ সময় পশুর জন্য ভাতের মাড় ও ঝাউ, শুকনো খড় এবং দানাদার খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে; গবাদিপশুকে দানাদার খাদ্য যেমন-ভুসি, কুঁড়া, খৈল ও প্রয়োজন মতো লবণ খাওয়াতে হবে; গবাদিপশুকে কাঁচা ঘাসের পরিবর্তে বিভিন্ন গাছ-পাতা খাওয়াতে হবে; জলোচ্ছ্বাস কবলিত এলাকায় জরুরি ‘ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম’ গঠন করে পশুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে; গবাদিপশুকে নিয়মিত সংক্রামক রোগের টিকা দিতে হবে ও কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে; গবাদিপশুকে যাতে পঁচা দূষিত পানি খেয়ে রোগাক্রান্ত হতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে; প্রয়োজনে নিকটস্থ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
গবাদিপশু অসুস্থ হলে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা করাতে হবে; প্রয়োজনে নিকটস্থ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
লেখক : ভেটেরিনারি সার্জন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর; কৃষি খামার সড়ক, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল-০১৮১১-৯৮৬৬০৫, ইমেইল-smmohibullah@gmail.com