চিনির উৎপাদন বৃদ্ধি ও চিনি
শিল্প নিয়ে ভাবনা
ড. মোঃ আনিসুর রহমান
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন চিনি শিল্পগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব চিনি শিল্পকে একমাত্র কাঁচামাল হলো আখ অর্থাৎ দেশের একমাত্র চিনি উৎপাদনকারী ফসল হচ্ছে আখ। আখ বাংলাদেশের উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রধান ফসল। যেখানে ২০১৪-১৫ মাড়াই মৌসুমে আখের মোট আবাদি এলাকা ছিল ১ লক্ষ ৫ হাজার হেক্টর সেখানে মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে বর্তমানে ২০২২-২৩ মাড়াই মৌসুমে বাংলাদেশে মাত্র ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে এবং মোট আখ উৎপাদন হয় ২১.১ লক্ষ মেট্রিক টন। যদিও ১৫টি চিনিকলের চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ২.১ লক্ষ মেট্রিক টন কিন্তু চিনিকলগুলো প্রয়োজনীয় আখের অভাবে এবং নানাবিধ কারণ যেমন-মিলগুলো অনেক দিনের পুরনো জ্বরা জীর্ণ, আখ দীর্ঘমেয়াদি (১০-১২ মাসের) ফসল হওয়াতে এবং অন্যান্য স্বল্পদৈর্ঘ্য দানাদার, সব্জি ও উচ্চ মূল্যের ফসল চাষের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়াতে কৃষকদের আখ চাষে অনীহা, আখের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, চিনিকলের দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব ইত্যাদির কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চিনি উৎপাদন করতে পারছে না এবং ক্রমাগতভাবে মিলগুলোর প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ৬ টি চিনিকলকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর সুপারিশ এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল অনুসারে সুস্বাস্থ্য এবং মস্তিষ্কের সুষ্ঠুভাবে কর্মসম্পাদনের জন্য যথাক্রমে মাথাপিছু বার্ষিক ১৩ কেজি চিনি এবং প্রতিদিন খাদ্যের সাথে গৃহীত সুগারের অতিরিক্ত ৩৭.৫ গ্রাম (পুরুষ) ও ৩০.০ গ্রাম (মহিলা) চিনি খাওয়া অপরিহার্য। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে খাদ্যের শতকরা ১৮ ভাগ ক্যালরি মিষ্টি খাবার অর্থাৎ গুড় বা চিনি থেকে আসা উচিত। এ দেশের বর্তমান জনসংখ্যার জন্য চিনি ও গুড়ের চাহিদা প্রায় ২২.১ লক্ষ মেট্রিক টন। কিন্তু গেল গত বছরে দেশে প্রায় ২৫ হাজার টন চিনি এবং ৪ লক্ষ টন আখের গুড় এবং ১ লক্ষ টন তাল খেজুরের গুড়সহ মোট ৫.২৫ লক্ষ টন চিনি ও গুড় উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে চিনি ও গুড়ের ঘাটতি প্রায় ১৬.৮৫ লক্ষ টন।
চিনি শিল্পের চিনির চাহিদার এই বিশাল ঘাটতি পূরণে শুধু আখ ফসলের উপর নির্ভর করলে হবে না কারণ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একক জায়গায় আখের উৎপাদন ২ থেকে ২.৫ গুণ (ঊর্ধ্বভাবে) পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে কিন্তু আখের জন্য নতুন এলাকা (পার্শ্বত) বাড়ানো সম্ভব নয়। বরং আখের সাথে সাথে বিকল্প ফসলের চিন্তাও করা এখন সময়ের দাবি।
এক্ষেত্রে গ্রীষ্মম-লীয় সুগারবিট চাষ হতে পারে সমস্যার সম্পূরক সমাধান। বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটে ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ শস্যবর্ষে সুগারবিটের উপর “বাংলাদেশে সুগারবিট চাষাবাদ প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য পাইলট প্রকল্প” শীর্ষক একটি প্রকল্প শেষ হয়েছে। প্রকল্প শেষে প্রাপ্ত ফলাফলে জানা যায় যে, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ট্রপিক্যাল সুগারবিট চাষ করা সম্ভব যেখানে বিটের ফলন ৭০-৭৫ টন/হে., এবং বিটের চিনি ধারণ ক্ষমতা ১৩-১৪%। কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনায়ও সুগারবিট বাংলাদেশের সব জায়গায় চাষের উপযুক্ত এমনকি উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল (২২ ডিএস/মি) উপকূলীয় এলাকায়ও চাষাবাদ উপযুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশে সুগারবিট চাষাবাদের অন্তরায় ২টি। প্রথমতঃ বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সুগারবিটের বীজ উৎপাদন করা যায় না। এক্ষেত্রে, পৃথিবীর যে সব দেশে সুগারবিটের বীজ উৎপাদন হয় যেমন-সুইডেন, জার্মান, ব্রাজিল, আমেরিকা, মিসর, ইরান, জাপান ইত্যাদি হতে উচ্চ চিনিযুক্ত বিটের বীজ আনার জন্য তাদের সাথে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত: বিট প্রসেসিং করে চিনি তৈরি করার জন্য আখের মতো আখের ছোবড়ার (ব্যাগাস) ন্যায় কোন জ্বালানি নাই, বাইরের অতিরিক্ত জ্বালানির উপর নির্ভর করতে হবে। এক্ষেত্রে, বিট প্রসেসিং এর জন্য জ্বালানি হিসাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের বর্জ হতে শক্তির অপচয় (ডধংঃব ঃড় ঊহবৎমু) প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি কৃষি প্রধান দেশ, আমাদের আছে যথেষ্ঠ পরিমাণে কৃষি বর্জ্য ও পৌর কঠিন বর্জ্য। অতএব, বিট প্রসেসিং-এ কম খরচে লাভজনক ভাবে উপর্যুক্ত প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হতে পারে।
উল্লেখ্য, যদি শুধু লাভ/লোকসানের উপর ভিত্তি করে মিলের অবস্থা যাচাই করা হয় এবং সুগার মিলগুলোকে সংস্কার ও আধুনিকায়ন না করে বন্ধ করে পুরাপুরি বৈদেশিক আমদানি নির্ভর দেশকে হতে হয়, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট ও পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এর জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনসাধারণকে কঠিন সংকটে পড়তে হবে। সুতরাং, চিনির উৎপাদন বাড়ানো ও সুগার মিলগুলো পুনর্জীবিত করা প্রয়োজন।
চিনি শিল্প নবীকরণসহ পুনর্জীবিত ও চিনির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে করণীয়
া মেরামত খরচ ও প্রসেস লস কমিয়ে আনার সাথে সাথে মিলের সক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে পুরাতন জরাজীর্ণ কলকারখানাকে আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি (ফিডার, ক্রাশার, বয়লার, ইভাপোরেটর, সেন্ট্রিফিউজার ইত্যাদি) নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।
া মিল অপারেটিং-এ অটোমেশন ও দক্ষ জনবল ব্যবহার নিশ্চিত করে উৎপাদন খরচ কমানো।
া মিলগুলো সব একসাথে নবীকরণ (জবহড়াধঃরড়হ) না করে বরং পাইলটিং এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে চালু করা, যাতে অবস্থা বুঝে (মিলের ফিডিং ক্যাপাসিটি, চিনি আহরণ হার, ইত্যাদি) পরবর্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
া চিনি উৎপাদনকারী বেশির ভাগ দেশই শুধু চিনি উৎপাদন করে শিল্পে লাভজনক অবস্থানে নাই। তাই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাইপ্রোডাক্ট ও মিলের বর্জ্যে ভ্যালু এডিশন করে শিল্পকে লাভজনক করা যেতে পারে। প্রতিটি চিনিকলের উৎপাদিত বাইপ্রোডাক্ট মোলাসেস, ব্যাগাস ও প্রেসমাড থেকে যথাক্রমে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় অ্যালকোহলিক উপাদান তৈরি করা, কো-জেনারেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মিলের নিজস্ব প্রয়োজন মিটিয়ে বাকিটা বছরব্যাপী জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এবং প্রেসমাড হতে জৈবসার প্রস্তুত করা অথবা ফ্রেশ প্রেসমাড ও ব্যাগাস নির্দ্দিষ্ট হারে মিশ্রণ করে মিলের বয়লারে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
া জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় চিনির চাহিদা ও ভোক্তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বিধায়, দেশীয় চিনির বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যাতে আগ্রহী ক্রেতাগণ সহজে হাতের কাছে দেশীয় চিনি ক্রয় করতে পারে।
া আখ লাগালেই হয়, এই ধারণা থেকে বের হতে হবে। অন্যান্য ফসলের মতো আখও একটি প্রযুক্তি সংবেদনশীল ফসল তাই বিএসআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ও অনুমোদিত মাত্রার বীজ, সার, সেচ ও বালাইনাশক যথাসময়ে যথাযথ ব্যবহার করে অধিক ফলন নিশ্চিত করা যেতে পারে।
া বিএসআরআই কর্তৃক পরিচালিত দেশব্যাপী গবেষণা প্লট ও প্রদর্শনী প্লটের আখের ফলন জাতভেদে ৮০ থেকে ১০০ টন/হেক্টর অথচ আখের জাতীয় গড় ফলন ৪৮ টন/হেক্টর। গবেষণার ফলাফল ও কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত এই ফলনের ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য বিএসআরআই, বিএসএফআইসি ও ডিএই কর্তৃক সমন্বিতভাবে দেশব্যাপী ব্যাপক ও বিস্তীর্ণভাবে প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী ও অন্যান্য কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।
া বিএসআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত এমন জাতের আখ, চাষের জন্য বাছাই করা যাতে বেশি সময়ব্যাপী মিলে আখ সরবরাহ করা যায় অর্থাৎ যে এলাকায় এবং যে জমিতে যে আখ ভাল হয় তা নির্ধারণ করে আগাম, মধ্য ও দেরিতে পরিপক্বতা আসে এমন জাতের আখের আবাদ নিশ্চিত করা। আখ কর্তনের সাথে সাথে মাড়াইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে আখের কর্তনোত্তর প্রসেস লস কম হয়।
া আখে বিদ্যমান চিনি ধারণের উপর আখের মূল্য নির্ধারণ করা। কারণ আখের ওজনের উপর মূল্য নির্ধারিত হওয়ায় অনেক সময় কম চিনি বেশি ওজনের ইক্ষু জাত নির্বাচন করা হয় এবং হার্ভেস্টের আগে সার ও সেচ প্রয়োগ করে আখের ওজন বাড়ানো হয়।
া আখের টেকসই উৎপাদন ও জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে আখের সাথে একের অধিক সাথি ফসল ও মুড়ি আখ চাষ নিশ্চিত করা।
া বাংলাদেশের কৃষক যেহেতু কৃষিনির্ভর প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের কৃষক, সেহেতু সরবরাহের সাথে সাথে কৃষককে আখের মুল্য পরিশোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
া কৃষককে প্রদেয় আখের মূল্য পরিশোধে অন্যান্য উৎপাদিত ফসলের সাথে সঙ্গতি রেখে আখের একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা। (সূত্র : বিএসআরআই তথ্যভান্ডার ও কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বিএসআরআই, ঈশ^রদী-৬৬২০, পাবনা)
লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষি প্রকৌশল বিভাগ বিএসআরআই, ঈশ্বরদী-৬৬২০, পাবনা, মোবাইল : ০১৭১২০৮৭৭১৭, ই-মেইল :anis.aed.bsri@gmail.com