কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:১৫ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬
চায়না কমলা চাষে আলমগীরের মুখে হাসি
মোহা: নুরে আলম
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দুলালপুর গ্রামে বসবাসরত একটি হতদরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান মোঃ আলমগীর হোসেন। মা-বাবা, ভাইবোন নিয়ে ১১ জন সদস্যের পরিবার মোঃ আলমগীর হোসেনের। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে আর্থিকসহ ভরণপোষণের দায়িত্ব তার কাঁধে। আলমগীর হোসেন দিনমজুরের কাজ করে সংসারের যাবতীয় ব্যয় বহন করতে দিশেহারা অবস্থায় কী করবেন ভেবে উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। এমতাবস্থায় ২০০০ সালে তিনি সংসারের এই অভাব-অনটন থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য ধারদেনা করে সৌদি আরব চলে যান। কিন্তু সেখানে ১০ বছর থাকার পরও সংসারের অবস্থার কোনো উন্নতি করতে পারেননি। ফলে দেশে ফিরে আসেন কিন্তু কিছু দিন অবস্থানের পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনায়নের জন্য আবার চলে যান সাইপ্রাস। সেখানেও তিনি আর্থিকভাবে কোনো সুবিধা করতে পারেননি। তাই ১ বছরের মাথায় ফিরে আসেন দেশে। ইতোমধ্যে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। ২০১৯ সালে দেখা হয় বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি অফিসার আব্দুল ওয়াদুদের সাথে, আলমগীর হোসেন তার সব অভাব-অনটনের কথা খুলে বলেন। আঃ ওয়াদুদ তার সকল কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেন এবং তাকে পরামর্শ দিলেন কৃষিবিষয়ক কার্যক্রম গ্রহণের জন্য। তখন তিনি ২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে উক্ত জমিতে ১৮০টি চায়না জাতের কমলার চারা রোপণ করে একটি বাগান করেন। আলমগীর হোসেন তার পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে উক্ত বাগানের চারা রোপণসহ সকল পরিচর্যার কার্যক্রমগুলো করেন। বাগানে প্রথম ফল আসতে শুরু করে ২০২২ সালে। তার বাগানের জন্য জমি লিজ নেওয়া থেকে শুরু করে চারা, সার, বালাইনাশক ক্রয় ও অন্যান্য বাবদ ব্যয় হয় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফল বিক্রয় বাবদ আয় হয় মোট ৫ লাখ টাকা। এ যেন অন্ধকারে আশার আলো দেখা। আলমগীর হোসেন দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে উঠেন এবং ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি ৬ বিঘা অনাবাদি জমিতে কমলা চাষ করার জন্য প্রস্তুতি নেন। জমির উঁচু-নিচু সমান করার জন্য শ্রমিক নিয়োগ করেন। এতে তার খরচ হয় চল্লিশ হাজার টাকা। পরবর্তীতে উপজেলা কৃষি অফিসের দ্বারস্থ হন এবং কীভাবে কমলা চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য কৃষি অফিসারের সহায়তা কামনা করেন।
এমতাবস্থায় তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাব্বির আহমেদ তার লেবুজাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকল্পের আওতায় এক একরের একটি মাল্টা ও কমলা বাগান প্রদর্শন করেন এবং সার, বালাইনাশকসহ সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেন।
২০২৩ সালে আলমগীর হোসেন তার আগের বাগান থেকে ২য় বার ফল আহরণ করেন। আহরিত ফল বিক্রয় করে ১০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা আয় করেন।
২০২৪ সালে তার ১ম বাগান এবং দ্বিতীয় বাগান থেকে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় করেন। বর্তমানে তার কমলা ও মাল্টার ফলন্ত গাছের বাগান রয়েছে ১১ বিঘা যা থেকে তিনি নিয়মিত ফল সংগ্রহ করে ব্যাপক আয় করছেন।
উপ-সহকারী কৃষি অফিসার আ: ওয়াদুদসহ কৃষি বিভাগের লোকজন সার্বক্ষণিক তার পাশে থেকে বাগানের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
আলমগীর হোসেনের কমল বাগান দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিনই মানুষ আসে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের আগমনে মনে হয় এটি কোনো কমলা বাগান নয় যেন একটি দর্শনীয় স্থান। কমলা বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন আলমগীর হোসেন সত্যিকারের একজন সফল কৃষক এবং অন্য কৃষকদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারেন। কোনো বাধাবিপত্তি তাকে হার মানাতে পারেনি। তার বাগানে এখন নিয়মিত ৩ জন শ্রমিক কাজ করছেন যাদের মাসিক বেতন প্রায় ২০ হাজার টাকা করে। যখন ফল আসা শুরু হয় তখন ৫ থেকে ৬ মাসের জন্য ৪-৫ জন শ্রমিক নিয়োগ করে থাকেন যাদের মাসিক বেতন প্রায় ২০ হাজার টাকা করে। তার কমলা বাগান ও মাল্টা বাগান ছাড়াও ২ বিঘা জমিতে আঙ্গুর ফলের বাগান রয়েছে, এক বিঘা জমিতে বারোমাসি কাঁঠাল বাগান রয়েছে, যা থেকে তিনি প্রথম বারের মতো কাঁঠাল বিক্রি করে প্রায় দশ হাজার টাকা আয় করেছেন।
এলাকাতে আলমগীর হোসেন কমলা আলমগীর নামে পরিচিতি লাভ করেছেন।
আলমগীর হোসেনের এ ধরনের সফলতা দেখে এলাকার আরও বহু বেকার যুবক, স্থানীয় ও পার্শ^বর্তী এলাকার লোকজন কমলা বাগান করতে উৎসাহী হচ্ছেন। বর্তমানে আলমগীর হোসেন এখন একজন কৃষিনির্ভর কর্মব্যস্ত মানুষ এবং পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে খুব সচ্ছল ও হাসিখুশিভাবে দিন যাপন করছেন। সত্যিই তিনি কৃষিতে একজন সফল উদ্যোক্তা।
লেখক : উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়, কৃষি সম্প্রারণ অধিদপ্তর, বিজয়নগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মোবাইল ০১৯১৩৩৯৬০৩১