কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০৯:০১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ০১-০১-২০২৬
চর’ আগামীর কৃষির সম্ভাবনাময় কৃষিজমি
ড. মোঃ আলতাফ হোসেন
চর হলো সাগর, মহাসগর, হ্রদ অথবা নদী দ্বারা বেষ্টিত স্থলভাগ। সাধারণত নদীর আপন গতিশীলতায় অথবা মোহনায় পলি জমাট বেঁধে যে স্থলভাগ গড়ে উঠেছে তাকে চর বলে। চরের উল্লেখযোগ্য দুটি বৈশিষ্ট্য হলো- এর সৈকতভাগ বিপুল পলিমাটির কাদাবেষ্টিত থাকে, আর চরের চারপাশ সাধারণত মিঠাপানি বেষ্টিত থাকে। বাংলাদেশের প্রধান চারটি নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের ৫০০ টিরও বেশি অববাহিকায় উপনদীতে ধীরে ধীরে বালু, পলি এবং কাদামাটি জমার ফলে চরগুলো গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে চরের জমির মোট আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর, যা রাজধানী ঢাকার আয়তনের তুলনায় আড়াইগুণ বড়। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় ২ হাজার ২২৫ বর্গকিলোমিটার চরাঞ্চল রয়েছে। ঐ বিশাল চরাঞ্চলের প্রায় ৬৭ শতাংশ উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। যার পরিমাণ প্রায় ১৫০০ বর্গকিলোমিটার। সেখানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস, যারা মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। চরের এই জমির প্রায় ৯০% চাষাবাদের উপযোগী। চরের আবাদযোগ্য জমির ৭৬% ধান চাষের জন্য এবং বাকি অংশ অন্যান্য ফসল চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, কৃষকরা ধান চাষ করে, যা উপার্জন করে তার চেয়ে অনেক বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারে তেলবীজ, চীনাবাদাম, আলু, মসলা, শাকসবজি এবং অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষ করে। চরাঞ্চল যেভাবে আগামীর কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনাময় কৃষিক্ষেত্র হয়ে উঠতে হতে পারে সেটাই নিম্নে আলোকপাত করা হলো
সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে যমুনার চরে উৎপাদিত ফসল
যমুনার চর এলাকা কালক্রমে বন্যায় পলিমাটি জমে উর্বর আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে এবং উঁচু-নিচুভেদে প্রতি বছর তিন থেকে ছয় মাস চরভূমি পানিতে ডুবে থাকার কারণে পলিমাটি সমৃদ্ধ হচ্ছে। যার ফলে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ছাড়াই সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যায়। উর্বরতার এ সুবিধা থাকায় গম, কাউন, ভুট্টা, বাদাম, মিষ্টিআলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, গাজর, মরিচ, হলুদ, শসা, কুমড়া, ধান এবং অন্যান্য শাকসবজিসহ কমপক্ষে ২০ ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে এ চরে। চরের বেলে-দো-আঁশ মাটিতে ডালজাতীয় ফসল যেমন-মাষকলাই, মসুর, খেসারি ও ছোলা প্রচুর আবাদ হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, সিরাজগঞ্জ জেলায় উৎপাদিত গম, ভুট্টা, বাদাম, মরিচ ও সবজিসহ মোট উৎপাদনের সিংহভাগ এখন আবাদ হচ্ছে এ চরে। এমনকি ধান উৎপাদনের পরিমাণও কম নয়। যার কারণে চর এলাকায় দিগন্তজুড়ে বিস্তীর্ণ বালুচর বেশির ভাগ সময় দেখা যাচ্ছে শুধু সবুজের সমারোহ। যার প্রভাব পড়েছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে।
মেঘনা নদীতে জেগে ওঠা চরে স্বপ্ন বুনছেন কৃষক
মেঘনা নদীর জেগে ওঠা চরে সবজি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। শীত মৌসুমে চরের বুকে শসা, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, শিম, খিরা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ হচ্ছে এ চরে। তাঁরা নিজেদের মেধা এবং চাষাবাদের কৌশল কাজে লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করে যাচ্ছেন। চরের মাটি এবং আবহাওয়া সবজি আবাদের জন্য বেশ উপযোগী।
রাজশাহীর পদ্মার চর এখন কৃষকদের স্বপ্নপল্লী
রাজশাহীর মতিহার, বোয়ালিয়া, পবা, গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার প্রায় ১০ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ১৫-২০ ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে। বছরে তিন ফসলের আবাদ হচ্ছে এ চরে। শক্তিশালী হচ্ছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি। পলি মিশ্রিত উর্বর এই ভূমিতে ফলছে- টমেটো, কপি, লাউ, মুলা, গাজর, শসা, আলু, পটোল অন্যান্য শাকসবজী, মরিচ, শিম, পেঁয়াজ, রসুন, গম, ভুট্টা, কলা, সরিষা, সূর্যমুখী, মসুর, খেসারি, মাষকলাই, ধনিয়া, কালিজিরা ও বাদামসহ অর্থকরী আরো অনেক ফসল। কৃষকরা বলছেন- চরে আবাদ করা কষ্টকর হলেও এটাই তাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছে। তারা তাদের মেধা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে সারাবছর ধরে উল্লেখিত ফসলগুলো চাষ করছেন।
তিস্তার চরের পতিত জমিতে সবজি চাষ করে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা
লালমনিরহাটের তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে লাখো কৃষক তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। তিস্তা তীরবর্তী চরবালাপাড়া, কুটিরপাড় বাঁধসহ জেলার পাঁচ উপজেলার অন্তত শতাধিক চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে আবাদ হচ্ছে আলু, শিম, করলা, মিষ্টিকুমড়া, লালশাক, কলমীশাকসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। তিস্তার চরে এসব বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদে পাল্টে যাচ্ছে লালমনিরহাটের তিস্তার চরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। এক সময় অভাব আর অনটন নিত্যসঙ্গী ছিল চরাঞ্চলের এই মানুষগুলোর। পতিত জমিতে সবজি চাষ করে এখন পাল্টে যাচ্ছে তাদের ভাগ্য।
বর্ণিত সব চরাঞ্চলেই কৃষি ফসল আবাদের পাশাপাশি প্রচুর চারণভূমি রয়েছে, বিশেষ করে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রচুর গবাদিপশু এই চারণভূমিতে বিচরণ করে এবং সেখানে জন্মানো ঘাস খেয়ে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। চরাঞ্চলে গবাদি পশুপালন অনেকেই প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং সেসব পশু ও পশুর দুধ বিক্রয় করে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতা লাভ করে জীবনমান উন্নত করছেন।
চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রধান বাধাসমূহ
চরাঞ্চলে ভালো ফসল ফললেও তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয় না। তার কারণ কৃষকরা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত ও আদি কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করেন। সেখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন ফসলের আধুনিক ও উচ্চফলনশীর জাতের ভালো এবং গুণগত মানসম্পন্ন বীজের অভাব। ভালো বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের যথাযথ জ্ঞানের অভাব থাকায় বীজের গুণগত মান সঠিক থাকে না বিধায় অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কমে যায় এবং সর্বোপরি ফসলের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আর একটি বড় বাধা হচ্ছে- সার ও বালাইনাশকের সরবরাহ ব্যবস্থা। বাজারগুলো চর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত এবং অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা হওয়ায় সার ও বালাইনাশক ক্রয় এবং পরিবহনে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ ছাড়া সারের সুষম ব্যবহার ও বালাইনাশকের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে কৃষকেদের যথাযথ ধারণা না থাকায় এবং অনেক সময় ভেজাল সার ও বালাইনাশকের কারণেও কাক্সিক্ষত উৎপাদন ব্যাহত হয়।
চরাঞ্চলে সেচের পানির অভাব প্রকট। সেখানে বেলে প্রকৃতির মাটিতে পানি ধারণক্ষমতা খুবই কম বলে ফসল চাষে অনেক সেচ লাগে। কিন্তু চরাঞ্চলে গভীর ও অগভীর নলকূপের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল।
চরাঞ্চলে উৎপাদিত ফসলের কোনো সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সংগ্রহের পরপরই কৃষক কম মূল্যে বিক্রয় করতে বাধ্য হন। ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
চরাঞ্চলগুলো সমতল অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন ও দূরবর্তী হওয়ায় এবং ভালো যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় ফসল উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল বা প্রযুক্তিগুলো সেখানে সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি হয় এবং বিলম্বিত হয়।
চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে করণীয়
চরাঞ্চলে কৃষকদেরকে ভালো বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়ে আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে হবে। উচ্চফলনশীল ও উচ্চমূল্য ফসলের প্রদর্শনী ব্লক স্থাপন করে কৃষকদেরকে সেগুলো চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। চরাঞ্চলে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন কর্মসূচি নিয়ে ভালোমানের বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
ফসল উৎপাদনের জন্য পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত সেচপাম্প না থাকায় চাষযোগ্য অনেক জমিকেই চাষের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রণোদনা ও ভর্তুকির মাধ্যমে সেখানে সেচপাম্পের ব্যবস্থা করা।
চরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এজন্য রাস্তা নির্মাণ করতে হবে। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজতর হবে। চরের নিকটবর্তী স্থানে বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে বিক্রয় করতে পারেন।
চরাঞ্চলের কৃষিকে আরও আধুনিক করতে হলে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- সিডার, উইডার, ট্রাক্টর, রোটাভেটর, স্প্রেয়ার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, থ্রেসার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি সরকারি প্রণোদনা ও ভর্তুকির মাধ্যমে সরবরাহ করা। এ ছাড়া সরকারি ব্যবস্থাপনায় পোস্ট-হারভেস্ট প্রসেসিং সেন্টার, বিশেষ করে সবজি জাতীয় ফসলের জন্য কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থা করা।
পরিশেষে বলা যায়, চরের সার্বিক কৃষি উন্নয়নে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কৃষককে প্রশিক্ষিত ও সচেতন করতে হবে। প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা। কৃষি উপকরণসমূহ যেমন- ভালো বীজ, সার, বালাইনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে হবে এবং সেইসাথে কৃষি ঋণেরও ব্যবস্থা করা। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই চরের কৃষি উৎপাদন কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে এবং চরাঞ্চল তথা দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে জীবনমান আরো উন্নত হবে।
লেখক : পরিচালক, কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭২৫০৩৪৫৯৫, ইমেল:hossain.draltaf@gmail.com