কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ১১:২৬ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০২-২০২৬
গ্রীষ্মকালীন ফলের রোগ ও দমন ব্যবস্থাপনা
ড. সৈয়দ মোহাম্মদ মহসিন
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ যেখানে কৃষি পণ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ফল। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ফল যেমন আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, জাম, লেবু ইত্যাদি দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশে এখন অনেক রকম দেশি ফল উৎপাদিত হচ্ছে। বসতবাড়ির আঙ্গিনা ও তার আশে পাশের বাগানেও ফল গাছ লাগানোর পরিমাণ বেড়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বানিজ্যিকভাবে ফলের বাগান স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে অর্থনৈতিক ভাবে কৃষকেরা যেমন লাভবান হচ্ছেন তেমনি পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। দেশি ফলের বাজার সম্প্রসারণ হওয়ার কারণে বিদেশি ফলের চাহিদা কমছে। যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশের বিভিন্ন স্থান ফল উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যেমন- উওরবঙ্গে আম, নাটোরে পেয়ারা, দিনাজপুর ও পাবনায় লিচু, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় কলা, সিলেট ও মৌলভিবাজারের লেবু, টাঙ্গাইল, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে আনারস, নরসিংদীতে লটকন, পটুয়াখালি ও ভোলায় তরমুজ, বরিশাল ও ঝালকাঠিতে আমড়া ইত্যাদি। তবে এসব ফলের উৎপাদনকে নানাবিধ রোগব্যাধি প্রভাবিত করে, যা প্রধানত ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দ্বারা হয়ে থাকে, যার ফলে কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
গ্রীষ্মে বাংলাদেশে আবাদি ফলের মধ্যে আম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল।আম খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিতেও ভরপুর। আমে থাকে প্রোটিন, ক্যারোটিন,আয়রণ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন সি, রিভোফ্লাবিন, থায়ামিন, খনিজ লবণ ও অন্যান্য ভিটামিন।
এনথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউ আমের প্রধান দুটি ছত্রাকজনিত রোগ। এনথ্রাকনোজ রোগটি Oidium mangiferae ছত্রাক দিয়ে হয়ে থাকে, ফলে আমের পাতা ও ফলের পৃষ্ঠে ছোট আকারের বাদামি থেকে কালচে দাগ দেখা দেয়, যা পরে ছোপার আকার ধারণ করে। পেকে যাওয়া ফলের ওপর কালো দাগ পড়ে এবং হালকা গর্তের আকার ধারণ করে। রোগ প্রতিরোধের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে মরা ও আক্রান্ত শাখা-পাতা ছেঁটে ফেলতে হবে। প্রচুর আর্দ্রতা এড়িয়ে চলতে হবে। লক্ষণ দেখা গেলে কার্বেনডাজিম অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড ছত্রাকনাশক স্প্রে করে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ঙরফরঁস সধহমরভবৎধব হল আরেকটি ছত্রাক যা আমের পাউডারি মিল্ডিউ রোগ তৈরির জন্য দায়ী। আক্রান্ত অংশে সাদা- ধূসর ধুলোর মতো ছত্রাকের বৃদ্ধি হয়। বিশেষ করে ফুলের গাঁদায় সাদা ছত্রাকের ফোটা দেখা দেয় এবং ফল ঝড়ে পড়ে যায়। নতুন পাতা মোচড়ানো বা বিকৃত হয়। গাছের বৃদ্ধির হার কমে যায়। সালফার ছত্রাকনাশক স্প্রে করে পাউডারি মিলডিউ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফলগুলোর মধ্যে লিচু অন্যতম। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের পছন্দের তালিকায় লিচুর অবস্থান বেশ উপরে। লিচুতে পর্যাপ্ত পরিমান ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম থাকে। এ ছাড়া অন্য খনিজ উপাদানগুলোর মাঝে আছে আয়রণ, ফলিক এসিড,ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম। এনথ্রাকনোজ লিচুর একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ যা ঈড়ষষবঃড়ঃৎরপযঁস প্রজাতির ছত্রাক দিয়ে হয়ে থাকে। আক্রান্ত ফল, পাতা ও ফুলে গোলাকার বাদামি দাগ পড়ে। ফলের ত্বকে কালচে গর্ত ও রেখাজাত ক্ষত পড়ে। পরিপক্ক ফলের ত্বক কালচে হয়ে দাগ ছাপ পড়ে। কার্বেনজাজিম অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড ছত্রাকনাশক স্প্রে করে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কাঁঠাল হল বাংলাদেশের জাতীয় ফল যা আকারে বেশ বড় হয়। কাঠালে থাকে কার্বোহাইড্রেট, শর্করা, ফ্রুক্টোজ। কাঠালে চর্বি বা কোলেস্টেরলের পরিমান খুব কম থাকে। এতে থাকে পর্যাপ্ত বিটা ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম। এ ছাড়াও এতে রয়েছে প্রচুর পরিমান ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস। বাংলাদেশে কাঁঠালের প্রধান রোগগুলো হল পাতার দাগ রোগ , গামিরোগ এবং ফল পচন রোগ । পাতার দাগ বা স্পট রোগ সাধারণত চযুষষড়ংঃরপঃধ ধৎঃড়পধৎঢ়র জাতের ছত্রাকের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আক্রান্ত পাতা ও ডালপালায় গোলাকার বাদামি দাগ পড়ে, যা পরে ছোপাকৃতি ছত্রাকনাশী দাগে পরিণত হয়। আক্রান্ত পাতা খাঁকি হয়ে নষ্ট হয়। রোগ প্রতিরোধে আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। কার্বেনডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে দেওয়া যেতে পারে। গামিরোগ বা গুমোসিস কাঁঠালের আরেকটি ছত্রাকজনিত রোগ যা Phomopsis artocarpi দ্বারা হয়ে থাকে। ছত্রাকটির আক্রমণের ফলে কা-ের গায়ে ছোট ফাটল দেখা দেয়। ফাটল থেকে বাদামি গাম (গলনের দ্রবণ) বেরিয়ে পড়ে। গাছের কা- দুর্বল হয়ে যায়, কাঠ তন্তু খারাপ হয় এবং ফলন কমে যায়। রোগ দমনের জন্য আক্রান্ত অংশে ছুরি দিয়ে ফাঁটল বড় করে পরিষ্কার করতে হয়। তারপর বোরদো পেস্ট বা কপার ছত্রাকনাশক পেস্ট দিয়ে সেই স্থানে লেপ দিতে হয়। এটি গাম নির্গমনের রোগকে নিয়ন্ত্রণ করে। কাঁঠালের আরেকটি প্রধান রোগ হলো ফল পচন যা Rhizopus stolonifer ছত্রাকের কারণে হয়। পচা ফলের অংশে নরম পানি-মাখানো ফোস্কা তৈরি হয় এবং ছত্রাকের ফোঁটা দেখা যায়। এ রোগটি দমনের জন্য ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক সবচেয়ে কার্যকর।
গ্রীষ্মকাল যেমন লেবু ছাড়া অসম্পূর্ণ। মুখের রুচি বাড়াতে লেবুর জুড়ি নেই। লেবুতে আছে প্রচুর পরিমান ভিটামিন সি। এ ছাড়া আছে ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফসফরাস, ফোলেট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম,পটাশিয়াম সহ অন্যান্য উপাদান। বাংলাদেশে লেবুর প্রধান রোগ হল সাইট্রাস ক্যান্কার . এটি একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ যা Xanthomonas citri নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়ে থাকে। আক্রান্ত পাতায়, ডালে ও ফলের ত্বকে গাঢ় বাদামি দাগ পড়ে। দাগের চারপাশে পানিতে ভেজা অংশের মত হলুদ রিং থাকে। পুরনো দাগগুলো বাঁধাকপি-মতো কর্কের মতো ফেটে যায়। আক্রান্ত ফল গোলাকার দাগ, উঁচু হয়ে ওভাল চিহ্নে পরিণত হয়। রোগ দমনের জন্য আক্রান্ত গাছের ডালি-পাতা যতটা সম্ভব পরিষ্কার করতে হবে। কপার ছত্রাকনাশক স্প্রে করলে সাইট্রাস ক্যান্কার দমনে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।
তীব্র গরমে পানিশুন্যতা দূর করতে তরমুজের জুড়ি নেই। তরমুজ খেতে যেমন সুস্বাদু এর পুষ্টিগুণও অনেক। তরমুজে শতকরা ৯২ ভাগ পানি আছে, এ ছাড়া আছে ভিটামিন এ,সি, বি-২, ক্যালসিয়াম, আয়রণ ,ফসফরাস,নিয়াসিন ও অন্যান্য উপাদান। তরমুজের একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ হল ঢলে পড়া (ডরষঃ) যার প্রধান কারণ হল Fusarium oxysporum নামক ছত্রাক। ছত্রাকের আক্রমণের ফলে গাছের একাংশে পানি-প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যায়। কা- ভেতরকার অংশে গাঢ় বাদমি রং ধারন করে এবং গাছের একাংশ হঠাৎ ঢলে পড়ে। মাটিতে জৈব বালাইনাশক ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের মাধ্যমে এ রোগ দমন করা যায় এবং কার্বেনডাজিম ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গামি স্টেম ব্লাইট হল তরমুজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ যা Stagonosporopsis cucurbitacearum ছত্রাকের সংক্রমনে হয়ে থাকে। আক্রান্ত পাতায় কোণাকৃতি বা গোলাকার গাঢ় বাদামি দাগ পড়ে, মাঝখানে একটু হালকা থাকে। পাতার ধার বা মাঝখানে দাগের ছোঁয়া দেখা যায়। ধীরে ধীরে দাগ একত্রিত হয়ে সারাটা পাতা শুকিয়ে যায়। কা-ের ওপর পানির মত ময়লা দাগ (গামি) পড়ে থাকে। ফলের ডগায় কালচে দাগ পড়ে। প্রতিরোধের জন্য আক্রান্ত পাতা ও ফল সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। বোর্দো মিশ্রণ বা প্রোপামোকার্ব, ক্যাপ্টান, বোর্দো কার্বেনডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে নিয়মিত স্প্রে করতে হবে। খেতের আশপাশের আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও কচি রোগা গাছ ধ্বংস করে খেত পরিষ্কার রাখতে হবে।
বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহ আমাদের খাদ্য, পুষ্টি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ফল উৎপাদনে বিভিন্ন রোগবালাই বড় বাধা। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষকের সচেতনতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক রোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ফল উৎপাদনে যেমন গুণগত মান বজায় থাকবে, তেমনি কৃষক লাভবান হবেন ও দেশের অর্থনীতিও আরও সমৃদ্ধ হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, মোবাইল : ০১৬৭১০৩৫২৫১,